কুঞ্জপুকুরের কাণ্ড : শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের উনিশতম আখ্যান

একটা কাটা হাত ইচ্ছেমতো ঘুরছে, ফিরছে, কাজ করছে। তাকে যেমনটি নির্দেশ দেওয়া হবে, অক্ষরে অক্ষরে আদেশ পালন করে বসে সেই হাত। মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? কয়েকবছর আগে নেটফ্লিক্সে হইহই করে বেরিয়েছিল ‘Wednesday’ মুভিটা, অ্যাডাম’স ফ্যামিলি মুভি সিরিজের একটা সিক্যুয়েল। অ্যাডামদের পরিবারটি ভারী বিদঘুটে, যাঁরা সিনেমাগুলি দেখেছেন তাঁরা জানেন এ পরিবারর একজন সদস্য হল একটি হাত। কবজি থেকে কাটা স্রেফ একটি হাতের অংশ, সেটুকুরই একটা গোটা মানুষের মতো হাবভাব। একে অ্যাডাম পরিবার ‘থিং’ বলে ডাকে।

১৯৩৮ সালে চার্লস অ্যাডামস দি নিউ ইয়র্কারের পাতায় কিছু কার্টুন আঁকতেন। কার্টুন সিরিজটার বিষয়বস্তু ছিল এই বিদঘুটে বিটকেল অ্যাডামস ফ্যামিলি। তাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে তুলে আনা ছোট ছোট ঘটনা নিয়েই সিঙ্গল প্যানেলে কার্টুনগুলো পাবলিশ করা হত। ভীষণই ডার্ক হিউমর থাকতো সেসবে। হরেকরকম মর্বিড, গথিক ট্যুইস্ট ব্যবহার করা হত। Thing অর্থাৎ কাটাহাতটিও সেরকমই একটি মেসেজ বয়ে আনে। সেটি এমনই একখানা বস্তু যাকে দেখলে ভয়, অস্বস্তি মেশা এক বিজাতীয় অনুভূতির উদ্রেক হয়। কার্টেসিয়ান দ্বৈতবাদের প্রবক্তা রেনে দেকার্তের মতে, মস্তিষ্ক ও শরীর হল দুটি পৃথক সত্তা, কিন্তু Thing মস্তিষ্ক ছাড়াই চিন্তা ও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। সুতরাং, প্রশ্ন ওঠে— কোনও একটি সত্তা কি শুধুমাত্র শরীরের অংশ হয়েও স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে সক্ষম? সম্ভবত থিং হল সামাজিক বাধা কাটিয়ে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে চাওয়া মানুষগুলির প্রতিচ্ছবি। তাই Thing কেবলই একটি কাটা হাত নয়, বরং এটি অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও অস্বস্তিকর রহস্যের প্রতীক। সে প্রশ্ন তোলে— আমরা কি স্রেফ আমাদের শরীর দ্বারাই সংজ্ঞায়িত, নাকি আমাদের কার্যকলাপই আমাদের সত্যিকারের পরিচয়?

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উনিশ নম্বর অদ্ভুতুড়ে ‘কুঞ্জপুকুরের কাণ্ড’ এমনই একটি কাটাহাত নিয়েই। ছোটবই হিসেবে প্রথম প্রকাশ ১৯৯৫-তে। কাটাহাতের এই কনসেপ্ট লেখক যেখান থেকে খুশি ধার করে থাকুন, স্টোরিলাইনে কিন্তু বেশ খানিক অভিনবত্ব আছে। টার্গেট অডিয়েন্স আনন্দমেলার খুদে পাঠকগোষ্ঠী, তাই ভারী ভারী তত্ত্বকথার বোঝা এ গল্পে নেই। বিলিতি গল্পের বিলিতি ইনগ্রেডিয়েন্টের মাইগ্রেশন ঘটেছে। সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর দূরত্ব পেরিয়ে সেই কাটাহাত এসে পড়েছে কুঞ্জপুকুর গ্রামে। এ যেন স্যামন মাছ দিয়ে সুশি বানানোর বদলে তেল ঝাল নুন মশলা দিয়ে কষিয়ে খাঁটি বাঙালি কায়দায় সর্ষে স্যামন রাঁধা।

গল্পে শশীদাদুর কাছে আছে এই কাটাহাতটি। তিনি এটা কোথা থেকে পেয়েছেন, গ্রামের কেউ তা জানে না। এক একরকম গল্প চালু আছে হাতটা নিয়ে। কেউ বলে আল্পস পাহাড়ের পর্বতারোহী সাহেবের কাটাহাত, কেউ বলে গরিলার, কেউ বা বলে ও হাত এক মরা জাদুকরের। কেউ কেউ তো মনে মনেই বানিয়ে ফেলেছে দুর্ধর্ষ প্লটের সাইফাই থ্রিলার— হিটলার চার্চিলকে ঘুষি মারার জন্য এমন একটা রোবটিক হাত বানানোর বরাত দেন বিজ্ঞানীদের, কিন্তু হাত বেমক্কা হিটলারকে ঘুঁষো দিলে বিজ্ঞানী যায় গ্যাস চেম্বারে, হাত যায় প্রথমে ডাস্টবিনে তারপরে শশীদাদুর কাছে। মোটকথা, সবার বক্তব্য ও হাত অশৈলী হাত, সে পারে না এমন কাজ নেই। ভিনগ্রাম থেকে গাইয়ে এলে তবলচির অনুপস্থিতিতে হাত গিয়ে তবলায় ঠেকা দিয়ে আসে। গ্রামের কাছে নৌকাডুবি হলে হাত সবাইকে বাঁচিয়ে তোলে। এলাকার চোর ডাকাতদের শায়েস্তা করে। খতরনাক ডাকাত হাতের ভয়ে নাকেখত দেয়।  হাত বেমক্কা কেউ যে চুরিও করে নেবে, সেটিও হবার জো নেই। শশীদাদু বেঁচে থাকতে হাত কেবল তাঁরই আজ্ঞাবহ।

কিন্তু এইবার শশীদাদু বুঝি মরতে বসেছেন। বয়স তাঁর একশো আট। সেদিন পর্যন্তও সতেজ তরতাজা ছিলেন, কিন্তু হঠাৎই তিনি শয্যাশায়ী। তাই তাঁরও হাতও ঝিমিয়ে পড়ে আছে। হাত নিস্তেজ খবর পেয়ে একে একে চোর গুন্ডা বদমাশরা এলাকায় মাথা গলিয়েছে।

“রাত্রিবেলা হরিবল্লভ রায়ের বাড়িতে ডাকাত পড়ল। রাত বারোটা নাগাদ ভীম দাস তার দলবল নিয়ে দরজা ভেঙে যখন বাড়িতে ঢুকল, তখন তাকে দেখে সকলেই থ। গলায় গাঁদা ফুলের মালা, মাথাভর্তি আবির, কপালে সিঁদুরের টিপ। হুহুঙ্কারে চারদিক প্রকম্পিত করে লুটপাট সেরে চলে যাওয়ার সময় হরিবল্লভ রায়কে বলল, "বউনিটা সেরে গেলাম।"

মহিম ঘোষের বাড়িতে ঢুকল চোর, তাঁর বড় ছেলে জানলার শিক ভাঙার শব্দ পেয়ে উঠে টর্চ জ্বেলে দেখতে পেল, জানলায় গৌরহরি দাঁড়িয়ে।

তাকে দেখে জিভ কেটে বলল, "ইস, কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলাম বুঝি? অনেককালের অনভ্যাস তো, তাই হাতটা সড়গড় নেই। জানলার শিক কাটতে গিয়ে শব্দ করে ফেলেছি। তবে ভাববেন না, কয়েকদিন একটু প্র্যাকটিস করলেই হাত সড়গড় হয়ে যাবে। তখন গেরস্তও নিশ্চিন্তে ঘুমোবে, হস্তশিল্পীরাও নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবে।"

হরিপদ সাহার পাশের বাড়িতেই থাকে তার ভায়রাভাই নবকুমার দাস। দুই ভায়রাভাইয়ে বহুকালের ঝগড়া। হরিপদর জমি নাকি খানিকটা বেদখল করে বসে আছে নবকুমার। নিশুতরাতে জটেশ্বর গিয়ে হরিপদর জানলায় হানা দিল। বলল,

"বউনিতে রেট কম করে দিয়েছি। দুটি হাজার টাকা ফেলুন, আপনার ভায়রার কাটামুণ্ডু আপনার সদর দরজায় রেখে যাব।"

শুনে হরিপদ মূর্ছা যায় আর কি!”

এমন অবস্থায় আরও একটি দুশমন হাজির হয়েছে গ্রামে। সে হল দিনু। শশীদাদুর বাড়ির পুরনো চাকর। চুরির দায়ে তাকে ঘেঁটি ধরে বের করে দেওয়া হয়েছিল। দিনু অবশ্য সেটা ‘চুরি’ বলে মানে না।

“শশীবাবুর বাড়িতে চাকরি পেয়ে প্রথম-প্রথম খুব সুখ ছিল। ভারি ভালবাসতেন আমায়। একেবারে নিজের ছেলের মতো।"

"তা হলে তাড়াল কেন?"

"সেইটেই তো ভাবি। দোষও কিছু তেমন করিনি। ক্ষান্তদিদির একটা বালা সরিয়ে রেখেছিলুম, সেই হল অপরাধ।"

"চুরি করেছিলে?"

"ওসব চুরিটুরি কথাগুলো ফস করে মুখে আসে কেন তোর? আমার এখন একটা সামাজিক মান-মর্যাদা হতে যাচ্ছে। ওসব অসভ্য কথা খবরদার উচ্চারণ করবি না। ব্যাপারটা চুরির পর্যায়েও পড়ে না। নিতান্তই ঘরের ছেলে হিসেবে একটা জিনিস এধার থেকে নিয়ে ওধারে রেখেছিলুম। ওই বদমাশ হাতটা না থাকলে ধরাও পড়তুম না।"

চুরি, ডাকাতি, লুটপাট দিনুর কাছে মোটেই খারাপ কাজ নয়। তার দেখার চোখই আলাদা।

“তোকে একটা কথা বুঝিয়ে বলছি, মন দিয়ে শোন। দুনিয়াটা ভগবানের, ঠিক তো?"

"তা বটে।"

"এই দুনিয়ায় গরিব-বড়লোক মিলে আমরা যারা আছি, সবাই তো ভগবানেরই সন্তান, না কি?"

"তাই তো মনে হয়।"

"আর দুনিয়ার যত টাকা-পয়সা, ধনদৌলত, এসবও হরেদরে ভগবানেরই। ঠিক কথা বলছি তো! ভুল বললে ধরিস।"

"ঠিকই বলছ।"

"তা হলে দ্যাখ, রাপের পাঁচ ছেলে যেমন বাপের সম্পত্তির সমান হিস্যাদার, আমরাও ঠিক তেমনই ভগবানের সব জিনিসেরই সমান হিস্যাদার। বুঝলি? ভুল বললে শুধরে দিস।"

"কথাটা তো ন্যায্যই মনে হচ্ছে।"

"তা হলেই দ্যাখ, ভগবানের দুনিয়ায় কিছু লোক লুটেপুটে খায়, কিছু লোক আঙুল চোষে, এরকমটা হওয়া কি ভাল?"

"মোটেই নয়।"

"তা হলে আমি যা করতে যাচ্ছি, সেটাই যা খারাপ হবে কেন? যাদের ফালতু টাকা আছে, তাদের কাছ থেকে খানিকটা নিয়ে গরিবকে দিলাম। তাতে বড়লোকটা একটু নামল, গরিবটা একটু উঠল। একটা বেশ সমান-সমান ভাব এসে গেল। তাই না?"

"খুব ঠিক।”

"তুই দেবী চৌধুরানী বা রবিন হুডের নাম শুনেছিস?"

"কস্মিনকালেও না। তারা কারা?"

"নমস্য ডাকাত। তাদের নাম শুনলে আজও কত সাধুপুরুষও মাথা নোওয়ায়। তা, তারা যা করেছে, তার চেয়ে আমি আর খারাপটা কী করব বল! দুনিয়ায় যে ভগবানের সন্তানদের প্রতি অবিচার চলছে, তার একটা বিহিত করতেই আমার জন্ম। আরও একটা কথা শুনে রাখ।"

"কী কথা দিনুদাদা?"

"আগের দিনে যত রাজারাজড়া ছিল, যত জমিদার মহাজন, সবাই ছিল আদতে ডাকাত আর লুঠেরা। দলবল আর টাকার জোরে দলবাজ সর্দাররাই রাজাগজা হয়ে বসেছিল। বুঝতে পারছিস তো? না বুঝলে বলিস, আবার বুঝিয়ে দেব।"

"দিব্যি বুঝতে পারছি।"

"তা হলে চোর-ডাকাতের সঙ্গে রাজা-মহারাজাদের আর তফাতটা রইল কী, বল! আলেকজাণ্ডার, তৈমুরলঙ, মামুদ, চেঙ্গিস খানের সঙ্গে রঘু ডাকাত বা কালু সর্দারের কোনও ফারাক দেখতে পাস?"

"কাদের কথা বলছ গো! গণ্ডার, লবঙ্গ, ঝিঙে কীসব বলে গেলে, এরা কারা?"

শশীদাদুর অসুখের খবর পেয়ে দিনু এসেছে হাতটা নিজের কবজায় এনে ফেলার জন্য। সেই হাতের জোরে সে রাজা হতে চায়। তার গাছে না উঠতেই এককাঁদি। হাত এখনও তার হাতে আসেনি। কে মন্ত্রী হবে, কে কোটাল হবে খুঁজে বেড়াতে মশগুল দিনু।

দিনু বেশ খারাপ মানুষ। কিন্তু সে কেন খারাপ, তারও একটা সম্ভাব্য কারণের হদিশ রয়েছে।

“আমার জীবনটা দুঃখে-দুঃখে একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে আছে, বুঝলি? সেই যখন ছোট্ট ছিলুম তখন থেকেই বেঁটে বলে ছেলেরা আমার পেছনে লাগত। যখন-তখন মাথায় চাঁটি কষাত। কারও সঙ্গে পারতুম না।"

ছেলেবেলার ট্রমাটিক অভিজ্ঞতাগুলোর সাংঘাতিক প্রভাব পড়ে যেকোনও মানুষের পরবর্তী জীবনে। বুলি, হ্যারাসমেন্ট সবই খুব মোটাদাগের ছাপ ফেলে যায় শিশুমনে। বেঁটে হওয়ার জন্য দিনুর ছিল inferiority complex। রাজা হয়ে সবাইকে পায়ের নীচে রাখাই তার একমাত্র স্বপ্ন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু রাজা তো সে নিজের ক্ষমতায় হতে পারবে না কখনও। তার চাই ওই অমিত শক্তিধর হাতখানা।

শশীদাদুর বাড়িতে কাজ করার সময় দিনু আবছা শুনে ফেলেছিল হাতকে জাগানোর মন্ত্রটা।

“কিন্তু মন্ত্রটা কী, তা জানা যাবে কী করে? শশীকর্তা বন্ধ ঘরের মধ্যে ব্রাহ্মমুহূর্তে কী মন্ত্র পাঠ করেন, তা শোনার তো উপায় নেই। তবে বুদ্ধি থাকলে উপায় হয়। পাড়ার বসন্ত পাল কানে কম শোনেন। তাঁর একটা কানে শোনার যন্ত্র ছিল। স্নানের সময় সেটা খুলে রাখতে হত। দিনু একদিন ফাঁক বুঝে বসন্ত পালের বাড়ি থেকে সেটা সরিয়ে ফেলল। তারপর যন্ত্রটা কানে লাগিয়ে রোজ ব্রাহ্মমুহূর্তে গিয়ে শশীবাবুর দরজায় কান পাতত।

 

প্রথম কয়েকদিন তেমন সুবিধে হয়নি। তারপর ধীরে-ধীরে যন্ত্রটা কানে সেট করে গেলে একদিন শুনতে পেল, শশীবাবু মন্ত্রটা পড়লেন, "আ মরণ, ফিনাইলের ড্রাম।"

কিন্তু কথাটার তেমন মানে হয় না। 'আ মরণ, ফিনাইলের ড্রাম' কি কোনও মন্ত্র হতে পারে?

আর-একদিন মনে হল, আগুন ও পেত্নির ধাম'। এ-কথাটারও কোনও মানে খুঁজে পেল না সে। তবে রোজ কান পাততে-পাততে একদিন মনে হল, সঠিক মন্ত্রটা ফেরে...' ব্যস, বাকিটা আর ধরতে পারেনি।”

শশীদাদুর কবিরাজের নাতিকে কিডন্যাপ করে দিনু। নাতিকে ফিরে পেতে কবিরাজ শশীদাদুর হাত চুরি করে দিনুকে দেন। দিনুর কথামতো শশীদাদুর ওষুধ ভুল বানিয়ে খাইয়ে দেন। শশীদাদু মারা যান। কবিরাজ কিন্তু তার নাতি ফেরত পায়নি, দুশোটাকায় তাকে বেচে দিয়েছে দিনু বেদেদের কাছে। দিনুর মনে মায়া মমতার লেশমাত্রও নেই। খুদে পাঠকদের কাছে হয়তো এও লেখকের একটা মেসেজ— দুষ্টু লোকেরা ভয় দেখালে, ব্ল্যাকমেল করলে কখনও পিছু হঠতে নেই। তাদের কথামতো কাজ করলেই যে সব ঠিক থাকবে, এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না।

হাত দিনুর কাছে আসতে আবছা শোনা মন্ত্রের শব্দগুলো দিনরাত পার্মুটেশন কম্বিনেশন করে সে বের করে ফেলল সঠিক মন্ত্রটা।

“দিনু শতরঞ্চির ওপর বসে হাতটা মুঠো করে ঘরে ধ্যানস্থ হল, আন উনো এফেন... আন উনো এফেম... আন উনো এফেনড্রাম...

না, হচ্ছে না। আন উনো এটেনখাম... নাঃ, ওটাও নয়....

ধৈর্যশীল দিনু সারারাত ধরে চেষ্টা করতে লাগল। শশী বুড়ো অনেকটা এরকমই কী যে বলত, আন উনো... আন উনো এফ এন ডো... আন উনো....

প্রায় ভোরের দিকে দিনু ঢুলতে-ঢুলতে হঠাৎ চমকে উঠল। কী হল? হাতটা কি একটু নড়ে উঠল নাকি? নাকি মনের ভুল? ঘুম ছুটে গেল দিনুর। হাতটা চেপে ধরে সে মনে করার চেষ্টা করতে লাগল। আন উনো এফ এন ডার... আন উনো এফ এন ড্রো...

দিনুকে প্রায় চমকে দিয়ে হঠাৎ তার হাতের মধ্যে হাতটা নেতানো ভাব থেকে চড়াক করে লাফিয়ে উঠল। পাঁচটা আঙুল টান-টান হয়ে উঠল প্রথমে। তারপর আঙুলগুলো বারবার মুঠো হয়ে খুলে যেতে লাগল। জেগেছে! হাতটা জেগেছে!

দিনু প্রথমটায় হোঃ হোঃ করে খানিকটা হেসে নিল। সারা জীবনের যত স্বাদ-আহ্লাদ সব এবার পূর্ণ হওয়ার মুখে। আর চিন্তা নেই। এখন সে সত্যিই রাজা।”

রাজা হয়েই সে প্রথমেই কী করল? হাতকে হুকুম দিল এক চ্যাঙারি জিলিপি কচুরি নিয়ে আসতে! শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের দুষ্টুলোকেরাও এত কিউট, তারা হাজার বদ মতলব আঁটলেও তাদের ভালো না বেসে উপায় নেই। এ সিরিজে আগেও এমন এক চোরের দেখা মিলেছিল, যে স্বপ্ন দেখত একসাথে অনেক টাকা পেলেই সে আগে ভালো গামছা কিনবে!

তবে দিনু শুধু জিলিপি কচুরিতেই আটকে থাকেনি। মহা শক্তিশালী হাত পেয়ে সে ইচ্ছেমতো কাজে লাগিয়েছে। রাতারাতি রাজপ্রাসাদ বানিয়েছে। রাজপোশাক আনিয়েছে। গ্রামসুদ্ধু লোককে বাধ্য করেছে প্রজা হয়ে তার হুকুম তামিল করতে। এমনকি দৌর্দন্ডপ্রতাপ দারোগাটিকে বানিয়েছে দৌবারিক! দারোগা ‘দৌবারিক’ শব্দের অর্থ যে দারোয়ান, সেটি জানতেন না। মাসমাইনে দু’হাজার টাকায় দৌবারিক পদ গ্রহণে আপত্তি হয়নি। তবে দৌবারিকের অর্থটা জানার পর তিনি ক্ষেপে লাল।

স্যাঙাত ঝিকুকে সে দিয়েছে কোটালের চাকরি।

"কেল্লা মেরে দিয়েছি। কোটালের চাকরি তোর পাকা। এখন আয়, জিলিপি আর কচুরি খা।"

ঝিকুর চোখ চকচক করতে লাগল। বলল, "সত্যি? তা বেতনটা কত দেবে বলো তো?"

"আহা, আগেই বেতনের কথা তুলিস কেন? আগে কাজকর্ম দেখি, তারপর ঠিক হবে। ধর গে, মাসে দু-তিন হাজার তো হবেই।"

"বটে!"

"তার ওপর উপরি আছে। সেও কম নয়। তার ওপর কোটালের কত বড় সম্মান।"

"কিন্তু কোটাল কাকে বলে তাই তো এখনও জানা হল না!"

"জানা আর শক্ত কী? দু'দিন রোস, তারপর সভাপণ্ডিতের কাছে জেনে নিবি।"

"সভাপণ্ডিত! সে আবার কে?"

"রাজাদের ওসব থাকে। তারা তো লেখাপড়া করে না, তাদের হয়ে ওই পণ্ডিতেরা লেখাপড়া করে। রাজার যখন যা জানার, তা ওদের কাছ থেকে জেনে নেয়।"

দিনু রাজা হয়ে বসেই যতরাজ্যের নামকাটা বদমাশদের ডেকে আনল। তার মতে, চুরি-ডাকাতি হল ‘আনঅর্গানাইজড ক্রাইম’। সমাজে শৃঙ্খলা দরকার। তাই সে একটা সংগঠিত দল তৈরি করতে শুরু করল। যারা নিয়মিত নজরানা এবং খাজনা দেবে, তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করা হবে না। কিন্তু যারা তা দেবে না, তাদের ঘটিবাটি চাঁটি করার সংগঠিত ব্যবস্থা হবে। যারা তবু বশ মানবে না, তাদের রাজদরবারে নিয়ে এসে বিচার করা হবে। জেল, জরিমানা, বেত্রাঘাত, শূল, সব ব্যবস্থাই রাখার বন্দোবস্ত করল।

স্কুলের হেডস্যার হয়ে গেলেন দিনুরাজার শিক্ষামন্ত্রী, হেডপণ্ডিতমশাই দিনুরাজার সভাপণ্ডিতের চাকরিতে জয়েন করলেন, বিজ্ঞানের মাস্টার রতন বোস হলেন সভা-প্রযুক্তিবিদ। দিনুরাজা একটা উড়ন্ত চেয়ারে বসে মাঝে-মাঝে গগনপথ থেকে তাঁর রাজ্যের এরিয়েল সার্ভে করবেন। রতন বোস তাঁর চেয়ারে সিটবেল্টের ব্যবস্থা করতে শুরু করলেন। দশটা গাঁয়ের আরও কত মানুষ চাকরির আশায় দিনুরাজার দরবারে ঘুরঘুর করতে শুরু করল।

কিন্তু তলে তলে রাজ্যপাটে গৃহযুদ্ধও লেগে গেল। দিনুর রাজাগিরি করার অভিজ্ঞতা নেই। সব্বাইকে এক রেটে দুহাজার টাকা মাইনে দেওয়ার কথা বলেছে, অথচ একটি পয়সাও কেউ হাতে পায়নি। কোটালের রাগ হচ্ছে তাকে দিয়ে ফাইফরমাশ খাটানো হচ্ছে বলে। বাকি কর্মচারীদের ওপরেও তার জুলুমের শেষ নেই। কে চুরি করে কলা খেয়েছে, তাকে শীতের রাতে পুকুরে চুবিয়ে আনা হল। দিনুরাজার খাওয়ার সময় কে হেঁচেছিল, তার চুলের মুঠি ধরে একটি ঘন্টা শূন্যে ঝুলিয়ে রাখার শাস্তি হল। চাষিদের ঘরের ধান, চাল, সবজি, দুধ, মাছ লুট করছে। দোকানপাট লুট করছে। লোকে ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। দিনু এটাই বোঝে না প্রজাই যদি না থাকে, দিনু রাজাগিরি করবে কার ওপর?

দেখতে দেখতে এসে পড়ল দিনুরাজার অভিষেকের দিনটি। একজন অচেনা পুরোহিত চন্দ্রমাধব দিনুর অভিষেকের নামে কায়দা করে তার অপকীর্তির ফিরিস্তি দিতে থাকলেন।

“আপনারা হয়তো জানেন না এই দিনু বিশ্বেস একসময়ে শশী গাঙ্গুলির বাড়িতে ভৃত্যের কাজ করত। একবার চুরি করে ধরা পড়ায়-"

দিনুর মুখখানা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি উঠে চন্দ্রমাধবকে চুপিচুপি কী যেন বলল। চন্দ্রমাধব বললেন, "আচ্ছা, আচ্ছা। সেসব কথা প্রকাশ করা দিনুর পছন্দ নয়। সুতরাং সেসব কথা আজ থাক।"

“চন্দ্রমাধব নিজের পাকা দাড়িতে হাত বোলাতে-বোলাতে বললেন, "দিনুর জীবনটাই এক সংগ্রামী জীবন। সেই সংগ্রামী জীবনের অনেকটাই তাকে কাটাতে হয়েছে জেলখানায়। অন্ধ কারার অন্তরালে-"

ফের দিনু উঠে চন্দ্রমাধবকে কী যেন বলল।”

 

চন্দ্রমাধব সামলে গিয়ে বললেন, "সে-কথাও আজ থাক। শুধু বলি, দিনুর কীর্তি আমাদের কাছে একটা দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবে। কত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সে যে আজ এই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে, তা ভাবলেও অবাক হতে হয়। যে হাতের জোরে সে আজ এত ওপরে উঠেছে, সেই হাতও সহজে তার হাতে আসেনি। নন্দ কবিরাজের নাতিকে চুরি করে..."

এবার দিনু আর থাকতে না পেরে পেল্লায় একটা ধমক দিল, "চুপ করুন তো ঠাকুরমশাই। ভীমরতি ধরেছে নাকি?"

"তাই তো! বুড়ো বয়সে মুখ বড় আলগা হয়ে যায় কিনা! তা সেসব গুহ্য কথাও আজ মুলতুবি থাক। আমি শুধু আজ দিনুকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করব।"

এই বলে চন্দ্রমাধব হাত বাড়িয়ে দিনুর মাথায় পরম স্নেহে হাত বোলাতে লাগলেন। বললেন, "দেখতে এইটুকু হলে কী হবে, সে একজন মস্ত মানুষ। ঠিক যেন ছোট্ট একটু বেলুন ফুলে এই এত বড় হয়েছে।"

শুনে সকলে হেসে উঠল।

দিনুর চোখ-মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল।”

রাজপুরোহিত দিনুর সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাতটা করলেন। সবার সামনে বলে দিলেন দিনু বেঁটে। দিনু আর থাকতে পারল না। হাতকে আদেশ দিল রাজপুরোহিতকে নিকেশ করার।

এইবার গল্পে একটি চমৎকার ট্যুইস্ট। আসলে শশীদাদুই রাজপুরোহিত। তিনি মরেননি। হাতকে নিজে থেকেই পাঠিয়েছিলেন দিনুর কাছে। কারণ, শশীদাদুর হাত যতদিন চলত, এলাকায় চোর ডাকাতের দৌরাত্ম্য ছিল না। দারোগা তাই ভালোমন্দ খেয়েপরে দিব্যি ভুঁড়ি বাগিয়েছিলেন। লোকজন সাবধান হতে ভুলে গিয়েছিল। তাই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অদৈব শক্তির ওপর ভরসা করে বসে থাকা মানুষগুলোকে একটু শিক্ষা দিতে হবে। ভালোমন্দ জ্ঞান সকলেরই কমবেশি আছে। কিন্তু আত্মবিশ্বাস, সাহস এই গুণগুলোয় শান না দিলে একদিন তারা হারিয়ে যায়।

এর আগের অনেক অদ্ভুতুড়েতে এই বিশেষ বার্তাটি দিতে দেখা গেছে লেখককে। ভিনগ্রহের রামরাহা হোক বা দেড়শো বছরের পুরনো ভূত— সকলেই বারবার এই কথাটিই বলেছে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করো। ভূতের কেরামতিতে বুরুন হঠাৎই এলাকার হিরো হয়েছিল, কিন্তু অঙ্কে তেরো থেকে একশোয় তোলার ক্রেডিট ছিল তার নিজেরই। রামরাহা অত্যাধুনিক গ্যাজেট দিয়েছে, কিন্তু এও বলে গেছে যন্ত্রের ভরসায় থেকে মগজটাকে অকেজো না করতে। এ শিক্ষাগুলো শুধু ছোটদের নয়, বড়দেরও মাঝেমধ্যে মানুষ করে তোলার ভার নেয়।

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১ - মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি - আলোচনার লিংক 

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ২ - গোঁসাইবাগানের ভূত - আলোচনার লিংক 

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৩ - হেতমগড়ের গুপ্তধন - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৪- নৃসিংহ রহস্য - আলোচনার লিংক 

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৫ - বক্সার রতন - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৬ - ভূতুড়ে ঘড়ি - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৭ - গৌরের কবচ - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৮ - হীরের আংটি - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৯ - পাগলা সাহেবের কবর - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১০ - হারানো কাকাতুয়া - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১১ - ঝিলের ধারে বাড়ি - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১২ - পটাশগড়ের জঙ্গলে - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৩ - গোলমাল - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৪ - বনি - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৫ - চক্রপুরের চক্করে - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৬ - ছায়াময় - আলোচনার লিংক 

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৭ - সোনার মেডেল - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৮ - নবীগঞ্জের দৈত্য - আলোচনার লিংক