সোনার মেডেল : শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের সপ্তদশ আখ্যান

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১ - মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি - আলোচনার লিংক 

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ২ - গোঁসাইবাগানের ভূত - আলোচনার লিংক 

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৩ - হেতমগড়ের গুপ্তধন - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৪- নৃসিংহ রহস্য - আলোচনার লিংক 

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৫ - বক্সার রতন - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৬ - ভূতুড়ে ঘড়ি - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৭ - গৌরের কবচ - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৮ - হীরের আংটি - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ৯ - পাগলা সাহেবের কবর - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১০ - হারানো কাকাতুয়া - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১১ - ঝিলের ধারে বাড়ি - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১২ - পটাশগড়ের জঙ্গলে - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৩ - গোলমাল - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৪ - বনি - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৫ - চক্রপুরের চক্করে - আলোচনার লিংক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ ১৬ - ছায়াময় - আলোচনার লিংক 

 

গল্প পড়ে শেষ করার পর যদি মুখ থেকে একটা ‘যাআআহ্ ব্বাবা’ বেরোয়, তাহলে ধরেই নিতে হবে সে গল্পের শুরুটা হয়েছিল ভাল কিন্তু শেষে গিয়ে লেখকমশাইকে ভূতে পেয়েছিল। ভূতই বটে! শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সতেরো নম্বর অদ্ভুতুড়েতে একটা নয়, দু’দুটো ভূত আছে! তার মধ্যে একজন হলেন সুন্দরবনের কেঁদোবাঘের ভূত।

গল্পের প্রথম প্রকাশসাল ১৯৯৩। ততদিনে গুচ্ছ গুচ্ছ স্পাই থ্রিলার, অ্যাকশন থ্রিলার লেখা হয়ে গেছে। সিলভার স্ক্রিনে জেমস বন্ডের দাপট। শীর্ষেন্দুর ‘সোনার মেডেল’ খানিক স্পাই থ্রিলার গোছের। তবে, যতসব অ্যাকশন সবই ফ্ল্যাশব্যাকে।

বাবু মিত্তির, তিনি অলিম্পিকে যাওয়া বক্সার। আরেকটু হলেই সোনার মেডেল পেয়ে যেতেন। কিন্তু বাদ সাধল ডেল্টা নামে এক কুখ্যাত গুন্ডা অর্গানাইজেশনের স্নেহময় পিতৃহৃদয়। ডেল্টার লিডার পল, পলের ছেলেও বক্সার। সেও অলিম্পিকে এসেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে পড়ে গেছে বাবু মিত্তির। প্রথমে তাকে টাকার লোভ দেখানো হল, কাজ হল না। বাবু মিত্তির কিছুতেই হটতে চায় না। শেষে তাকে বিষ খাইয়ে ফুড পয়জনিং করানো হল। অলিম্পিক থেকে বাদ পড়ল বাবু মিত্তির। পলের ছেলে রাউল পৌঁছল সেমিফাইনালে।

পলের ছেলের ভারী পছন্দ হল বাবু মিত্তিরকে। সে ছোট থেকেই গডফাদার বাবাকে দেখে এসেছে। টাকা নিয়ে খুন জখম করে বেড়ানো যে ভালো কাজ নয়, সেই বোধটাই তার নেই।  কৃতজ্ঞতাবোধ জানাতে সে বাবু মিত্তিরকে বাবার গ্যাংয়ে ভিড়িয়ে নিল। বাবু মিত্তিরেরও টাকার লোভ কিছু কম ছিল না। সে ক্রমে পলের ডানহাত হয়ে উঠল। মাঝেমধ্যে শুধু একটু পাপ-পুণ্যের হিসেব তার মনের কোণে উঁকিঝুঁকি দিত।

তারপর একদিন লাশ নামানোর বরাত পেয়ে রাউল আর বাবু মিত্তির দুজনেই গিয়ে পৌঁছেছে অকুস্থলে। রাউল বেকায়দায় পড়ে প্রাণটি খুইয়ে বসে। বাবু মিত্তির ভারী সেয়ানা। সে বন্ধুকে সাহায্য না করে সেখান থেকে দিল চম্পট। সুপারির টাকার পরিমাণ ছিল ভারতীয় মুদ্রায় একশো কোটি। অতগুলো টাকা নিয়ে সে দেশে পালিয়ে আসে। বিয়ে-থা করে সংসারী হয়।

বাবু মিত্তির লোকটি খুব একটা ভালো না। আদর ভালোবাসা দেখানোর আর্টটা তার আসে না। মারাত্মক কন্ট্রোল ফ্রিক সে। অন্যের ইচ্ছে-অনিচ্ছের ধার সে ধারে না। বউটি অকালে মারা যায়। পনেরো ষোলো বছরের ছেলে রকি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কারণ বাবু মিত্তির জোরজবরদস্তি তাকে বক্সার বানাতে চেয়েছিল। ছেলেটি তার মায়ের মতো নরম স্বভাবের। পরে যদিও সে বক্সিং সে শিখেছে , কিন্তু তা স্রেফ শখে। প্রফেশনাল বক্সার হবার ইচ্ছে তার ছিল না।

রকি বাড়ি ছেড়ে গিয়ে পৌঁছয় সুন্দরবনে বাবার বন্ধু কালীপ্রসাদের কাছে। কালীপ্রসাদের কাছে আছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া প্রচুর টাকাকড়ি। এখন সে সুন্দরবনে ল্যাব বানিয়ে এটা সেটা বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে, সাধ হলে প্ল্যানচেটও করে, এমনকি বাঘও পোষে। সে ছেলেটিকে বিদেশে পড়াশোনা করতে পাঠায়। রকি বড় হয়। ইঞ্জিনিয়র হয়। দামী চাকরি নিয়ে আমেদাবাদে থিতু হয়।

ওদিকে বাবু মিত্তির আরও বুড়ো হয়। বয়সের সাথে সাথে মনেরও বদল ঘটে। ছেলের জন্য তার অনুশোচনার শেষ নেই। কালীপ্রসাদ কিন্তু দিব্যি যোগাযোগ রেখে চলেছেন বাবু মিত্তিরের সঙ্গে। কলকাতা টু সুন্দরবন পায়রা উড়িয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে আলাপ চলে! কিন্তু কালীপ্রসাদকে তাঁর পূর্বপুরুষের ভূত বারণ করেছে বাবু মিত্তিরের ব্যাপারে নাক গলাতে। সুতরাং কালীপ্রসাদ স্পিকটি নট।

এতদিন পর হঠাৎ ডেল্টার ডন পলের প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছে হল। এতদিন কেন চুপ ছিল সেই জানে। বুড়ো বাবু মিত্তির এমনিও বেশিদিন বাঁচতেন না। এখন হঠাৎ তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চিঠি আসল। গীতার শ্লোক কোট করে একটা বিদেশী অ্যাসাসিন অর্গানাইজেশন থ্রেট দিচ্ছে! ভাবা যায়! বাবু মিত্তিরের কুকুর মরল। দারোয়ান হাসপাতালে গেল। বাবু মিত্তিরে বিছানার তোষকে বিষাক্ত সূচ পাওয়া গেল, যেইটি বিঁধলে বাবু মিত্তিরের ক্যানসার হয়ে যেত! এইসব লেখার সময় লেখকেরও হয়তো একটু আজগুবি লেগেছিল। তাই ডেল্টার হয়ে সাফাইও দিয়ে রেখেছেন, ডেল্টা আসলে তিলে তিলে মারতে চায়। তবে অ্যাদ্দিন এরা কি করছিল, সেইটিই ভাবনার বিষয়। বাবু মিত্তির অতগুলো ডলার চুরি করে নিয়ে পালিয়ে এসে সদ্য সংসারী হয়েছেন, যৌবনের মধ্যগগনে, ফুটফুটে ছেলে হয়েছে— সেইটিই তো তাকে শাস্তি দেওয়ার মোক্ষম সময় ছিল। সারাজীবন তোফা কাটিয়ে শেষবয়সে পৌঁছে যদি মরতেও হয়, তবে তাতে আফশোসের কি বাকি থাকে! কে জানে, লেখক হয়তো ভারী ভালোমানুষ, তাই এমন কুচু্টে টক্সিক চিন্তাগুলো তাঁর মাথায় আসেনি।

এতদিন রকির ইচ্ছে হলেও সে বাপের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। এখন বাবু মিত্তিরের ঘাড়ের ওপর ডেল্টা শ্বাস ফেলছে, এখনই সে বাবাকে নিজের খবরাখবর দিয়ে বসল। কালীপ্রসাদ আগ বাড়িয়ে দুজনকেই ডেকে নিলেন সুন্দরবনে। তারপর বাবা ছেলের দেখা হল। কেউ কাউকে চিনতে পারেননি। দুজনেই দুজনকে ভেবেছেন এ বুঝি ডেল্টার লোক। বক্সিং শুরু হল দুজনের। তারপর কালীপ্রসাদ এসে বলে দিতে দুজন দুজনকে চিনতে পারলেন। রকি যখন ঘর ছেড়েছিল, তখন সে কিশোর। এখন সে বড়জোর যুবক। সময়ের ব্যবধান খুব খুব বেশি হলে বছর কুড়ি। মাত্র কুড়িটা বছরে বাবু মিত্তিরের মুখে এমন কি বদল ঘটল, যে ছেলে তার বাবাকে চিনতে পারল না?

সুন্দরবনেও ডেল্টার আগমন ঘটল। সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে পল হাজির। তিরিশটা বছর আগে যদি পল বাবু মিত্তিরের প্রায় সমবয়সী একটি ছেলের বাবা হয়ে থাকেন, তাহলে এখন তাঁর অথর্ব বুড়ো হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু লেখকের চোখে গডফাদার, ডন-রা সুপারম্যানের চেয়ে কম কিছু নয়। পল দিব্যি লম্ফঝম্প করে হাজির হয়েছে বদলা নিতে।

এত এত অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও গল্পটা পড়া যায় স্রেফ একটা চোরা থ্রিল আছে বলেই। না, ভালো থ্রিলার বলতে যা বোঝায়, এইটি তা নয়। তবে, একটা গতি আছে। দ্রুত দৃশ্যপট বদলেছে। ভালো অ্যাকশন আছে। কিন্তু শেষটুকু কি যে হল! পল যখন বন্দুকের ট্রিগারটা টিপতে যাবে, কালীপ্রসাদের পোষা বাঘের ভূত এসে ওদের খেয়ে নিল! সিরিয়াসলি? মানছি, আনন্দমেলা ছোটদের পত্রিকা, কিন্তু ছোটরা মোটেই হাবাগোবা প্রাণী নয়, যা খুশি বলেই দিলেই তারা হজম করে নেয় না। টানটান জমাটি থ্রিলার যে শীর্ষেন্দু জমিয়ে লিখতে পারেন, শবরের উপন্যাসগুলিই তার প্রমাণ। এই গল্পটাও ছোটদের পড়ার মতো থ্রিলার হলেও হতে পারত। কিন্তু এমন খাপছাড়া এন্ডিংই সাড়ে সব্বোনাশ করে ছাড়ল গল্পটার।

অদ্ভুতুড়ের হাসি মজা ইয়ার্কি তেমন কিছু নেই এতে। একটি চরিত্র আছে, পলাশ। সে না থাকলেও চলত। তাকে সম্ভবত আনাই হয়েছে, যাতে বাবু মিত্তির এক প্যারাগ্রাফ অন্তর অন্তর বলতে পারেন, ‘তুমি খুব বুদ্ধিমান’! বুদ্ধিমত্তা দেখানোর মতো কিই বা করল পলাশ? বাবু মিত্তির নিজের অন্ধকার অতীতের গল্প বলছেন। এমন ভাবে বলছেন, বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না ঘটনার পারম্পর্যগুলো বা কী থেকে কী হল, কেন হল। হয়তো এই কথাগুলো কথোপকথনের মাধ্যমেই লেখকের বলার ইচ্ছে হয়েছিল, তাই পলাশ চরিত্রটিকে আনা। সে এসেছিল বাবু মিত্তিরের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে। তবে প্রাক্তন সুপারি কিলারের বুড়ো হাড়ে এখনও ভেলকি খেলে।

গল্পে চোখ কটকট করার মতো কিছু আড়ষ্ট বাক্য রয়েছে। বাবু মিত্তির রাউলকে সঙ্গে নিয়ে খুন করতে যাওয়ার দিনটির কথা বলছেন। “আমাকে একটা ছোট্ট হাতবোমা দেওয়া হয়েছিল। একটা নৈনিতাল আলুর চেয়ে বেশি বড় নয়। কিন্তু খুব শক্তিশালী। কথা ছিল সবাই যখন সেই শিল্পপতির স্বাস্থ্যপান করবে সেই সময়ে বোমাটা টপকে দেওয়া। কেউ ধরতে পারত না আমাকে। বোমা ফাটলে সবাই বিভ্রান্ত হয়ে যেত।" ‘টপকে দেওয়া’ শব্দবন্ধটা বিদেশী আদবকায়দায় অভ্যস্ত সুপারি কিলারের মুখে কতটা মানানসই কিংবা ছোটদের পূজাবার্ষিকীর পাতায় ছাপার মতো কিনা— সে তর্ক থাক। কিন্তু, ‘স্বাস্থ্যপান’? এইটা কী লিখলেন শীর্ষেন্দু? এ যে ইংরিজি নভেলের সস্তা অনুবাদের ভাষা। নাকি শীর্ষেন্দু অন্য শব্দ লিখেছিলেন, আনন্দমেলা সেইটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি? অবশ্য ‘টপকে দেওয়া’র মতো ভাষা যদি ছোটদের পত্রিকায় জায়গা পায়, মদ্যপানের এমন কোনও খারাপ প্রতিশব্দ মাথায় আসছে না যেটিকে ছোটদের অনুপযুক্ত বলে নাকচ করে দেওয়া যেতে পারে!

“ঘর একরকম অন্ধকার, বাবু মিত্তির বালিশের পাশ থেকে টর্চটা তুলে নিয়ে দেওয়ালের গায়ে তাঁর বিশাল ওয়ার্ডরোবটা খুললেন, ভেতরে বিস্তর স্যুট, প্যান্ট, শার্ট, টাই ঝুলছে। একসময়ে এসব পোশাক ব্যবহার করতেন। এখন পড়েই থাকে। ওয়ার্ডরোবের বাঁ ধারে একটা সুইচ টিপে ধরলেন বাবু মিত্তির। টুক করে একটা ইলেকট্রনিক লক খুলে গেল। ছোট একটা ঢাকনা পট করে ঝুলে পড়ল। ভেতরে একটা নম্বর-লেখা চৌকো বোর্ড। অভ্যস্ত আঙুলে মুখস্থ কয়েকটা নম্বর ছুঁতেই মৃদু আর-একটা শব্দ হল। বাবু মিত্তির বাঁ দিকের সাইড প্যানেলের গায়ে লাগানো একটা ছোট আংটা ধরে টান দিতেই গোপন একটি খোপ উন্মোচিত হল। তিনি খোপের ভেতরে হাত দিয়ে একটা পুরনো হার্ড টপ মাঝারি মাপের সুটকেস বের করলেন।

কম্বিনেশন লক খুলে ডালাটা তুলতেই দেখা গেল, ওপরে একটা সবুজ তোয়ালের ওপর একটি নয় মিলিমিটার বোরের পিস্তল শুয়ে আছে।”

এই হচ্ছে বাবু মিত্তিরের অন্দরমহল। ১৯৯৩ সালে খাস কলকাতার বুকে এমন ব্যাপার সত্যিই অত্যাধুনিক। এমনটা জেমস বন্ডের মুভিতেই শুধু দেখা গেছে। এমন একজন ঝাঁ চকচকে মানুষের মুখে ‘টপকে দেওয়া’র মতো পাতি মস্তানি ভাষা সত্যিই খাপ খায় না।