জেন অস্টেনের ম্যান্সফিল্ড পার্ক - সপ্তদশ পর্ব
- 07 April, 2026
- লেখক: সুস্মিতা সরকার
(১৭)
এডমন্ড যে নাটকে অভিনয় করতে রাজি হয়ে গিয়েছে, তাতে টম আর মারিয়ার মনে হচ্ছে ওরা যেন দুনিয়া জয় করে ফেলেছে। ওদের কাছে এটা একটা বিশাল জয়ই বটে। এডমন্ড যে এতটা নরম হয়ে যাবে, সেটা ওরা কল্পনাও করে নি। তাই ওরা খুব খুশি। এবার ওদের সাধের পরিকল্পনায় আর কেউ ব্যাগড়া দিতে পারবে না। এডমন্ডের এই বদলের কারণ নিশ্চয়ই মেরির প্রতি ওর দুর্বলতা আর মেরির সঙ্গে অন্য পুরুষ অভিনয় করবে সেই ঈর্ষা। আড়ালে নিজেদের মধ্যে এসব কথা আলোচনা করে টম আর মারিয়া দুজনেই খুব আমোদ পেল। এডমন্ড হয়তো এখনও কিছুটা মুখ গোমড়া করে আছে, বোঝা যাচ্ছে পুরো পরিকল্পনাটা ওর মনমতন হয় নি। বিশেষ করে এই নাটকটা ওর ভারী অপছন্দ। কিন্তু তাতে কী যায় আসে! ওদের উদ্দেশ্য তো সফল হয়েছে! এডমন্ড অভিনয় করতে রাজি হয়েছে, আর সেটাও হয়েছে নিজের স্বার্থেই। এর আগে ও যেরকম আদর্শের ভাব নিয়ে বসেছিল, সেখান থেকে ও নিজেই নেমে এসেছে। আর তাতেই যেন টম আর মারিয়ার বেশি আনন্দ।
তবে সামনাসামনি ওরা খুবই মেপেজুপে কথা বলছে এডমন্ডের সঙ্গে। খুব বেশি উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছে না, ঠোঁটের কোণে শুধু একটু স্মিত হাসি। এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে যেন ইচ্ছের বিরুদ্ধে ওরা চার্লস ম্যাডক্সকে নিতে বাধ্য হচ্ছিল আর এখন বাদ দিতে পেরে ওরা বরং বেঁচে যাবে। ওদের বক্তব্য ওরা সবকিছু নিজেদের পরিবারের মধ্যেই রাখতে চেয়েছিল। বাইরের কেউ সেখানে ঢুকলে সেটা একটু অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতো। তাই সেই কথার সুত্র ধরে যেই না এডমন্ড কম দর্শক রাখার প্রস্তাব দিল, ওরা সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রস্তাবটা লুফে নিল। এই মুহূর্তে এডমন্ডের হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলানোর জন্য হেন জিনিস নেই যাতে ওরা রাজি হবে না। সব কিছু খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে। মিসেস নরিস এডমন্ডের পোশাক বানিয়ে দেবেন বললেন। জন ওকে আশ্বস্ত করল যে ব্যারনের সঙ্গে আনহাল্টের শেষ দৃশ্যে বেশ জোরালো অভিনয় করার সুযোগ আছে। আর এডমন্ডকে কতগুলো সংলাপ মুখস্থ করতে হবে, মিস্টার রাশওয়ার্থ সেটা গুনে দেওয়ার দায়িত্ব নিল।
টম বলল, “ফ্যানি হয়তো এবার আমাদের কথায় রাজি হয়ে যাবে। তুই একবার কথা বলে দেখ না, যদি রাজি করাতে পারিস!”
“না, না, ও একদমই রাজি নয়। ও কিছুতেই অভিনয় করবে না।”
“ও, আচ্ছা, খুব ভালো কথা।” এই নিয়ে কেউ আর একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। কিন্তু ফ্যানির মনে হলো ও আবার বিপদে পড়তে চলেছে। সকালে ও নিজের মনকে বুঝিয়েছিল যে ওকে অভিনয় করতে অনুরোধ করলে ওর কিছু যায় আসে না। কিন্তু এখন সেই মনের জোরটা আর নেই ওর।
এডমন্ডের এই বদলে ওর বাড়িতে সবাই যতো না খুশি হলো, গির্জা বাড়িতেও তার থেকে কম কিছু হলো না। পুরো ব্যাপারটায় মেরি এতো আনন্দ পেলো যে খুশিতে ও যেন ঝলমল করে উঠল। তাই দেখে এডমন্ড নিজেও খুশি না হয়ে পারল না। ও যে নিজের মন ঠিক কী চায় সেটা বুঝে সেই মতন কাজ করেছে, সেটা ভেবে এডমন্ড খুশি হয়ে উঠল। সব কিছু একদম ঠিকমতন না হলেও বেশ একটা মিঠে আমেজে সকালটা কেটে গেল। এতো সবকিছুর ফলে ফ্যানির একটা সুবিধা হলো। মেরির পিড়াপীড়িতে, সবার তালে তাল মিলিয়ে মিসেস গ্রান্ট সেই চরিত্রে অভিনয় করার জন্য রাজি হয়ে গেলেন যেটায় অভিনয় করার জন্য ফ্যানিকে বলা হয়েছিল। মিসেস গ্রান্ট রাজি হয়েছেন জেনে ফ্যানির মনটা খুশি হয়ে উঠল। কিন্তু এডমন্ড যখন তাকে জানাল যে মেরির অনুরোধে মিসেস গ্রান্ট রাজি হয়েছেন, তখন সেটা যেন ফ্যানিকে কাঁটার মতন বিঁধল। কারণ ওকে এখন মেরির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। আর মেরি ফ্যানিকে সাহায্য করেছে সেটা এডমন্ড এত আবেগ নিয়ে বলল যে ফ্যানির মনটা আরও খারাপ গেল। দেখতে গেলে ফ্যানি এখন বিপন্মুক্ত। কিন্তু ওর মনে সেই বিপদ মুক্তির শান্তি রইল না।
সত্যি কথা বলতে কী, এতটা অশান্তি ও আগে কখনও ভোগ করে নি। ও যে নিজে কিছু ভুল করেছে সেটা ওর মনে হচ্ছে না। কিন্তু সব মিলিয়ে ওর মনে অশান্তির শেষ নেই। ফ্যানির মন, মস্তিস্ক এডমন্ডের সিদ্ধান্তকে একেবারেই সমর্থন করতে পারে নি। ওর চোখের সামনে ঘটে চলা এডমন্ডের বদল আর খুশি কোনটাই যেন ও মন থেকে মেনে নিতে পারছে না। ওর মনে তখন একরাশ ঈর্ষা আর অস্থিরতা। হাসিখুশি মেরিকে দেখে ও যেন অপমানে নীল হয়ে গেল। মেরি ফ্যানির দিকে বন্ধুর মতন এগিয়ে এসে সহজ ভাবে কথা বললেও ফ্যানি কিন্তু সহজভাবে কথার পিঠে কথা বলতে পারছে না।
ওর চারপাশের সবাই খুব খুশি, ব্যস্ত। সবাই কে কী করবে সেই নিয়ে মহা ব্যস্ত। যার যা ভালো লাগে, ওদের নাটকের চরিত্র, পোশাকআশাক, পছন্দের দৃশ্য, বন্ধুবান্ধব এসব নিয়ে মেতে রয়েছে। সবাই মিলে একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করছে, মিলিয়ে দেখছে, নিজেদের মধ্যে মজা করছে। একমাত্র ফ্যানিই একা একা মন খারাপ করে বসে আছে। কেউই ওকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না। ও তো কোনও কিছুতেই ভাগ নিতে পারছে না। ওখানে ও বসে থাকল নাকি থাকল না, তাতে কারোর কিছু যায় আসে না। ও ওদের সবার হইহট্টগোলের মধ্যে রইল নাকি উঠে গিয়ে নিজের পুবের ঘরে একা নিঃসঙ্গ হয়ে বসে রইল, কেউ সেটা খেয়ালও করবে না। ও বুঝতে পারছে যে এই পরিস্থিতির থেকে অন্য যেকোনো পরিস্থিতিই হয়তো ওর ভালো লাগত।
এদিকে সবার কাছে মিসেস গ্রান্টের এখন কদরই আলাদা। সবাই তাঁর অমায়িক ব্যবহারের প্রশংসা করছে। তাঁর পছন্দ অপছন্দ বা কখন তাঁর জন্য সুবিধাজনক সময় হবে, সবাই সেটা নিয়ে ভাবছে। সবাই চাইছে তিনি সেখানে উপস্থিত থাকুন। তিনি উপস্থিত থাকলে সবারই সেটা খুব ভালো লাগছে। মিসেস গ্রান্ট যে অভিনয় করতে রাজি হয়েছেন, সেজন্য প্রথমদিকে ফ্যানির বেশ হিংসাই হচ্ছিল। কিন্তু একটু চিন্তাভাবনার পর ধীরে ধীরে নিজেই বুঝতে পারল যে এই আদর সম্মান মিসেস গ্রান্টের প্রাপ্য। এই আদর ফ্যানির জন্য উপযুক্ত নয়। শুধু তাই না, ফ্যানি এটাও বুঝতে পারছে যে যদি ও এর থেকেও বেশি আদর পেত, তবুও ও খুব একটা স্বস্তিতে থাকতে পারত না। কারণ সেক্ষেত্রে ওকে এমন একটা কাজ করতে হতো, যেটা ওর মেসোমশাই মোটেই মেনে নিতেন না।
ওখানে সবার মধ্যে শুধু যে ফ্যানিই মন খারাপ করে বসে আছে, তা কিন্তু নয়। খুব তাড়াতাড়ি ও বুঝতে পারল যে জুলিয়াও কষ্ট পাচ্ছে। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে জুলিয়ার নিজেরও যে কিছুটা দোষ নেই, তা অবশ্য নয়।
হেনরি জুলিয়ার মন নিয়ে ছেলেখেলা করে চলেছে। বেশ অনেকদিন জুলিয়া সেটা মানিয়ে নিয়েছে, এমন কী ও এটাও চেয়েছে যে হেনরি যেন ওর দিকেই মনোযোগ দেয়। মারিয়ার প্রতি হিংসায় ছটফট করেছে। তাতে অবশ্য লাভের লাভ কিছু হয় নি। শেষ পর্যন্ত যখন বুঝল যে হেনরি আসলে মারিয়াকেই বেশি পছন্দ করে, তখন জুলিয়াকে সেটা মেনে নিতেই হলো। আর সেটা মেনে নেওয়ার সময় মারিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা করল না আবার নিজের মনকে শান্ত করারও চেষ্টা করল না। ও এখন হয় সবসময় মনমরা হয়ে চুপচাপ বসে থাকে আর নাহলে জনের সঙ্গে হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকে। যখন চুপচাপ বসে থাকে তখন এতো গম্ভীর হয়ে বসে থাকে যে কোনও হাসি মজাই ওর মন খারাপ করা কমাতে পারে না। অন্যদিকে যখন জনের সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করে তখন যেন কিছুটা জোর করেই অন্য সকলের অভিনয় নিয়ে ব্যঙ্গ করে।
ঝামেলার পর দু একদিন হেনরি আগের মতোই তোষামোদ আর প্রশংসা দিয়ে জুলিয়ার সঙ্গে সবকিছু ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পুরো ঘটনাটার এতটাও গুরুত্ব নেই ওর কাছে যে বারবার সবকিছু ঠিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। কয়েকবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরই ও মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছেড়ে দিল। তাঁর বদলে বরং নাটক নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে মারিয়ার সঙ্গে ফ্লার্ট করার পর জুলিয়ার সঙ্গে ফ্লার্ট করারও সময় রইল না ওর কাছে। ফলে জুলিয়ার সঙ্গে মনমালিন্যের ব্যাপারটাকে ও আর বিশেষ পাত্তা দিল না। বরং ওর মনে হলো এটা ভালোই হয়েছে, এতে এমন কিছু আশা তৈরি হওয়া বন্ধ হলো, যা পরে সমস্যা তৈরি করতে পারত।
এদিকে মিসেস গ্রান্টও খুশি না যে জুলিয়াকে নাটক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে আর ও একা পড়ে গিয়েছে। কিন্তু তাঁর এটাও মনে হলো যে এটা নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তার কিছু নেই। তিনি জানেন হেনরি নিজের ব্যাপার নিজেই বুঝে নেবে। হেনরি হাসিমুখেই বলেছে যে হেনরি আর জুলিয়া একে অপরের জন্য কখনোই সেভাবে আলাদা করে কিছু ভাবে নি। তাই মিসেস গ্রান্ট আগের মতোই হেনরিকে মারিয়ার ব্যাপারে আরেকবার সাবধান করে দিলেন এই বলে যে হেনরি যেন মারিয়ার প্রতি বেশি আকর্ষণে নিজের শান্তি নষ্ট না করে। এসব কিছু হয়ে যাওয়ার পর মিসেস গ্রান্ট খুশি মনে আবার সেই কাজে যোগ দিলেন যেটায় সবাই খুশি হয়। বিশেষ করে যে দুজনকে তিনি খুব ভালোবাসেন তাদের আনন্দে যেন কমতি না পড়ে সেদিকে তিনি নজর দিলেন।
তিনি মেরিকে বললেন, “আমার তো মনে হচ্ছে জুলিয়া হেনরির প্রেমে পড়েনি।”
মেরি ঠান্ডা গলায় বলল, “আমার তো মনে হয় পড়েছে। বরং আমার মনে হয় দুবোনেই হেনরির প্রেমে পড়েছে।”
“সেকি! না, না, সেটা হতে পারে না। এসব কথা হেনরির মাথায় ঢুকিয়ো না। একবার মিস্টার রাশওয়ার্থের কথা ভাবো।”
মেরি বলল, “সে তুমি বরং মারিয়াকেই বলো মিস্টার রাশওয়ার্থের কথা ভাবতে। তাতে মারিয়ারই লাভ। আমি প্রায়ই ভাবি যে মিস্টার রাশওয়ার্থের কত বিষয়সম্পত্তি আর কত স্বাধীনতা। মনে হয় সেসব যদি হেনরির হাতে থাকত! ব্যক্তি মিস্টার রাশওয়ার্থের ব্যাপারে আমি কখনই কিছুই ভাবি না। তবে এত বিষয়আশয় আর টাকাপয়সা থাকলে, কোনও কাজকর্ম না করেও তিনি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে কাউন্টির প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারেন।”
“আমার তো মনে হয় খুব তাড়াতাড়িই মিস্টার রাশওয়ার্থ দেশের পার্লামেন্টে যোগ দেবে। স্যর থমাসকে ফিরতে দাও। আমার মনে হয় স্যর থমাস নিশ্চয়ই মিস্টার রাশওয়ার্থকে কোনও না কোনও উপায়ে পার্লামেন্টে একটা জায়গা করিয়ে দেবেন। আসলে ও এখনও পর্যন্ত সেরকম কাউকে পায় নি, যার থেকে রাজনীতির কিছু শিখবে।”
মেরি একটু থেমে বলল, “স্যর থমাস ফিরে এলে তো বিশাল কিছু হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে! Hawkins Browne এর সেই কবিতাটা মনে আছে, সেই যে পোপের নকলে লেখা ‘Address to Tobacco’?
“ধন্য সেই পাতা (তামাক)! যার সুবাসিত বায়ু বিলায়—
আইনজীবীদের বিনয়, আর যাজকদের কাণ্ডজ্ঞান।”
আমি এটাকে একটু বদলে বলব,
“ধন্য সেই নাইট (স্যর থমাস)! যার একনায়কোচিত চাহনি বিলায়—
সন্তানদের অঢেল সম্পদ, আর রাশওয়ার্থকে সামান্য বুদ্ধি।”
সেরকম হলে কেমন হয় দিদি? মনে তো হচ্ছে সব কিছু যেন স্যর থমাসের ফেরার অপেক্ষাতেই বসে আছে।”
“শোনো, তোমাকে এটা কথা বলি। স্যর থমাস ফিরলে তাঁকে তাঁর পরিবারের মধ্যে দেখলেই বুঝতে পারবে সত্যিই তাঁর কতটা গুরুত্ব। আমার তো মনেই হয় না যে তাঁকে ছাড়া আমাদের চলতে পারে। তাঁর অসম্ভব মার্জিত আর অভিজাত আচার আচরণ এরকম অভিজাত পরিবারের প্রধানের আচরণ হিসেবে একেবারে যথাযথ। স্যর থমাসের অভিজাত আচরণের কারণেই পরিবারের সবাই তাঁকে সমঝে চলে। এই যে লেডি বার্ট্রাম এতো ঝিমিয়ে রয়েছেন, স্যর থমাস বাড়িতে থাকলে সেটা মোটেই হতো না। মিসেস নরিসকেও স্যর থমাস ছাড়া আর কেউ বাগ মানিয়ে চলতে পারে না। তবে মেরি, আরেকটা কথা বলি। তুমি ভুলেও ভেব না যে মারিয়া হেনরিকে বিশেষ চোখে দেখে। আমি তো নিশ্চিত যে জুলিয়াও হেনরির পরোয়া করে না খুব একটা। নাহলে গতকাল রাতে জনের সঙ্গে ওভাবে ফ্লার্ট করত না। হতে পারে মারিয়া আর হেনরি খুব ভালো বন্ধু, কিন্তু আমার মনে হয় সথার্টনের সম্পত্তিটা মারিয়া এতোটাই পছন্দ, যে সেটা হারানোর ঝুঁকি নিয়ে খুব একটা এদিকওদিক ও করবে না।”
“সব কাগজপত্রে সই সাবুদ হওয়ার আগে, বিয়ের আগে হেনরি এগিয়ে এলে আমার মনে হয় না মিস্টার রাশওয়ার্থের খুব বেশি সম্ভাবনা আছে।”
“তোমার মনে যদি সেই সন্দেহই থাকে, তাহলে তো কিছু করা দরকার। নাটক করার পাট চুকুক, হেনরির সঙ্গে আমি কথা বলব। ওর মন কী চায়, সেটা ওকে বুঝতে হবে। আর ও যদি সত্যিই সেরকম কিছু না চায়, দুই বোনের সঙ্গে ছেলেখেলা করে, তাহলে কিছুদিনের জন্য ওকে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে হবে। যদিও হেনরির ক্ষেত্রে সেরকম কিছু করতে হলে আমাদের ভালো লাগবে না, কিন্তু উপায় কী!”
তবে মিসেস গ্রান্ট বুঝুন বা না বুঝুন, ওর পরিবারের আর কেউ সেটা খেয়াল করুক বা না করুক, জুলিয়া কিন্তু সত্যিই কষ্ট পাচ্ছে। ও যে সত্যিই হেনরিকে ভালোবেসেছিল। এখনও ভালোবাসে। এমনিতে জুলিয়া আবেগপ্রবণ আর ওর মেজাজটাও যথেষ্ট চড়া। দেখতে গেলে জুলিয়ার হেনরিকে পাওয়ার আশা অযৌক্তিক, কারণ হেনরি ওকে কখনও সেরকম কথা দেয় নি। কিন্তু তবুও জুলিয়ার মনে হচ্ছে যে হেনরি ওকে ঠকিয়েছে। তাই সব মিলিয়ে ভালোবাসার মানুষটাকে না পাওয়ার কষ্টটা ওর কাছে যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। ওর মনে এখন শুধু রাগ আর কষ্ট। কী করে যে সেই রাগ ঠাণ্ডা হবে হন্যে হয়ে ও শুধুমাত্র সেই উপায় খুঁজছে। যে মারিয়ার সঙ্গে আগে এত ভালো আর সহজ সম্পর্ক ছিল, সেই মারিয়াই এখন ওর সবথেকে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। ফলে দুই বোনের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অপার দূরত্ব। মারিয়া শুধু যে জুলিয়ার সঙ্গে অন্যায় আর লজ্জাজনক ব্যবহার করেছে তা তো নয়, ও মিস্টার রাশওয়ার্থের প্রতিও অন্যায় করেছে। এসবের জন্য মারিয়া যেন শাস্তি ভোগ করে, মারিয়া আর হেনরির মেলামেশার যেন এক খারাপ পরিণতি হয়, এই চিন্তাভাবনার ঊর্দ্ধে কিছুতেই উঠতে পারছে না জুলিয়া।
যেহেতু দুই বোনের চাওয়া একই, তাই কোনও বড়সড় রাগারাগি বা মতবিরোধ ছাড়াই ওদের বন্ধুত্বে চিড় ধরে গেল। এই পরিস্থিতিতে দুজনের কারোরই একে অপরের প্রতি সম্মান বা সহানুভুতি দেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় দয়া বা যথাযথ ব্যবহার করার মতন যথেষ্ট ভালোবাসা বা নীতিবোধের বালাই রইল না। নিজের জয় অনুভব করে জুলিয়ার মনে কী চলছে তার পরোয়া না করেই মারিয়া নিজের মতন করে হেনরির সঙ্গে মেতে আছে। জুলিয়া যখনই দেখে যে হেনরি মারিয়াকে আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছে তখনই ও মনে মনে শুধু একটা কামনাই করে। ও চায় হেনরি আর মারিয়ার এই ঘনিষ্ঠ মেলামেশা যেন কারোর (মিস্টার রাশওয়ার্থের) মনে ঈর্ষার আগুন জ্বালিয়ে দেয় আর সেটা শেষ পর্যন্ত যেন একটা বড়সড় সামাজিক কেলেঙ্কারিতে গিয়ে দাঁড়ায়।
ফ্যানি সবকিছুই দেখছে, জুলিয়ার জন্য ওর খারাপও লাগছে। কিন্তু ওদের মধ্যে সেরকম সম্পর্ক নেই। জুলিয়াও কিছু বলছে না আর ফ্যানিও নিজে থেকে কিছু বলতে যাচ্ছে না। ফ্যানি আর জুলিয়া দুজনেই কষ্ট পাচ্ছে, আলাদা আলাদা করে। আর সেটা শুধু ফ্যানিই মনে মনে বুঝতে পারছে।
জুলিয়ার এই অস্থিরতা ওর দুই দাদা বা নরিস মাসি, কারোরই চোখে পড়ছে না। আর এই দেখতে না পাওয়ার একটাই কারণ। তারা নিজেরা নিজেদের নিয়েই মেতে রয়েছে। টম ওর সখের থিয়েটার নিয়ে এত ব্যস্ত যে সরাসরি নাটকের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন কোনকিছুই ওর চোখে পড়ছে না। এডমন্ডও নিজের অভিনয়, বাস্তব জীবন, মেরির সঙ্গে ওর ব্যবহার, মেরির প্রতি ওর ভালোবাসা আর নিজের নীতিবোধ নিয়ে এতটাই দোটানায় রয়েছে যে এর বাইরে আর কোনকিছুই ওর নজরে আসছে না। আর মিসেস নরিস ভারী ব্যস্ত নাটকের দলের ছোটখাটো নানান বিষয় সামলাতে। তিনি সবার পোশাকআশাক নিয়ে পড়ে আছেন, যাতে খুব কম খরচে কাজ চালানো যায়। আর যদিও এই কৃপণতার জন্য তাঁকে কেউই আলাদা করে ধন্যবাদ দিচ্ছে না, তবুও অনুপস্থিত স্যর থমাসের সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে পেরে তিনি মনে মনে ভারী তৃপ্ত বোধ করছেন। আর সেটা করতে গিয়ে স্যর থমাসের মেয়েদের আচার আচরণের দিকে খেয়াল রাখা বা কী করলে স্যর থমাসের মেয়েরা ভালো থাকবে সেসব দিকে নজর দেওয়ার মতন বাড়তি সময় তাঁর কাছে নেই মোটেই।