জেন অস্টেনের ম্যান্সফিল্ড পার্ক - চতুর্থ পর্ব

প্রথম পর্বের লিংক

দ্বিতীয় পর্বের লিংক

তৃতীয় পর্বের লিংক

ইদানিং টম বার্ট্রাম এতোটাই কম সময় থাকত বাড়িতে যে ও অনুপস্থিতি খুব একটা টের পাওয়াই যায় না। এদিকে লেডি বার্ট্রাম এটা দেখেও বিস্মিত হয়ে গেলেন যে টমের বাবাকে ছাড়াও তাঁরা নিজেরাই কেমন সব কিছু খুব ভালোভাবেই সামলে নিতে পারছেন। এডমন্ড নিখুঁতভাবে পরিবারের কর্তা হিসেবে স্যর থমাসের যা কিছু করণীয় ছিল, তার সব কিছুই খুব সুন্দর সামলে নিচ্ছে। পরিবারের কর্তা হিসেবে খাওয়ার সময় মাংস কাটা থেকে শুরু করে যিনি সবকিছু সামলে রাখেন তাঁর সঙ্গে কথা বলা, সম্পত্তির নানান আইনি ব্যাপারে আইনজীবীকে চিঠি লেখা, চাকরবাকরদের মাইনেপত্র বুঝিয়ে দেওয়া – সবই সমান দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে শুরু করল এডমন্ড। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে শুধুমাত্র নিজের চিঠির ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া ছাড়া লেডি বার্ট্রামকে আর কিছুই করার পরিশ্রম করতে হয় না।  

নিরাপদ যাত্রা শেষে স্যর থমাসরা শেষমেশ নির্বিঘ্নেই অ্যান্টিগায় পৌঁছালেন। কিন্তু সেই খবরটা যতদিনে এসে পৌঁছল ততদিনে মিসেস নরিস ভয়ানক দুশ্চিন্তা করতে শুরু করে দিয়েছেন। শুধু নিজে দুশ্চিন্তা করছেন তাই না, একলা এডমন্ডকে পেলেই তাকে নিজের দুশ্চিন্তায় সামিল করার চেষ্টা করছেন। তাঁর ধারণা ভয়ানক কোনও দুর্ঘটনা হলে সবার আগে তিনিই সেই খবরটা পাবেন। তাই সেই ভয়ানক বিপর্যয়ের খবরটা কী ভাবে সবাইকে দেবেন সেটাও তিনি আগে থেকে মনে মনে ছকে রেখেছেন। তাই তাঁরা দুজনেই যে সুস্থ আছেন সেই খবরটা দিয়ে স্যর থমাস যখন সবাইকে নিশ্চিন্ত করলেন তখন মিসেস নরিসকে তাঁর নিজের উদ্বেগ ও আবেগমথিত ভাষণ তখনকার মতন স্থগিত রাখতে হলো।

সময় দিব্যি চলে যাচ্ছে স্যর থমাস ও টমকে ছাড়াই। শীত এল, চলেও গেল, স্যর থমাসদের ডেকে পাঠানোর প্রয়োজন হলো না। হিসেবনিকেশও সব ঠিকঠাক রইল। মিসেস নরিস ব্যস্ত থাকেন তাঁর বোনঝিদের নিয়ে। তাদের আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা, তাদের সাজসজ্জায় সাহায্য করা, তাদের কৃতিত্ব যাতে সবাই দেখতে পায় – সেই ব্যবস্থা করা, তাদের ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী খুঁজে বের করার মতন কাজগুলো তো ছিলই, এছাড়াও নিজের গৃহস্থালির কাজকর্ম, বোন লেডি বার্ট্রামের সংসারে কিছুটা নাক গলানো, আর মিসেস গ্রান্টের অপচয়ের দিকে নজর রাখা – এতো সব কিছু করার পর তাঁর হাতে যাঁরা আপাতত অনুপস্থিত তাঁদের নিয়ে ভাবার আর বিশেষ সময় থাকে না।

ইতিমধ্যে মিস বার্ট্রামরা এলাকায় বেশ পরিচিত ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তাদের সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা ও সহজাত সাবলীলতার সঙ্গে সযত্নে গড়ে তোলা ভদ্রতা আর সহৃদয় ব্যবহারের ফলে তারা শুধু প্রসংসাই না, সবার আন্তরিক সমর্থনও পায়। এতোটাই সূক্ষ্ম ওদের অহংকার যে অকারণ ভাব আছে বলে মনেই হয় না। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় ওদের বুঝি কোনও অহংকারই নেই। সবাই ওদের এত প্রশংসা করে, এমনকী ওদের মাসিও, যে ওরা বিশ্বাস করে যে ওরা নিখুঁত।

লেডি বার্ট্রাম তাঁর মেয়েদের নিয়ে জনসমক্ষে যান না। তিনি ভারী অলস। এমনকী মেয়েদের সাফল্য দেখার আনন্দ পাওয়ার জন্য যেটুকু ব্যক্তিগত ঝামেলা পোয়াতে হয় তিনি সেটুকু করতেও নারাজ। তাই সেই ভার এসে পড়ল তাঁর দিদির ঘাড়ে। তিনি অবশ্য এরকম সম্মানজনক প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। এর ফলে গাঁটের কড়ি খরচ না করেই নানান সামাজিক মেলামেশার সুযোগ তিনিও পাচ্ছেন, এমনকী যাতায়াতের জন্য একটা ঘোড়াও ভাড়া করতে হচ্ছে না, এটা তিনি খুবই উপভোগ করছেন।

এই আনন্দযজ্ঞে অবশ্য ফ্যানির জন্য বিশেষ কিছু নেই। তবুও বাড়ির সবাই যখন নানান আমোদ প্রমোদে ব্যস্ত থাকে তখন সে তার মাসি লেডি বার্ট্রামের সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে ওঠাটা বেশ উপভোগই করে। মিস লি ততদিনে ম্যান্সফিল্ড ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তাই যে রাতে বল নাচের আসর বা পার্টি থাকে সে রাতে স্বাভাবিকভাবেই সে মাসির কাছে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ফ্যানি মাসির সঙ্গে নানান বিষয়ে কথা বলে, তাঁর যা কিছু বলার সেসব মন দিয়ে শোনে, তাঁকে বিভিন্ন বইপত্র থেকে পড়ে শোনায়। এমনিতে ফ্যানি সাধারণত সর্বক্ষণই ভয়ে ভয়ে আর অস্বস্তিতে থাকে যে এই বুঝি কেউ কোনও কঠিন কথা শুনিয়ে দিল। তাই এমন শান্ত সন্ধ্যে যেখানে কঠিন কথা শোনানোর কেউ নেই, তা যে ফ্যানির কাছে আশীর্বাদস্বরূপ হয়ে উঠবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার মাসতুতো বোনেদের আমোদ আহ্লাদের কথা শুনতে ওর বেশ ভালোই লাগে। বিশেষ করে বল নাচের আসর থাকলে সেদিনের কথা শুনতে, এডমন্ড কার সঙ্গে নেচেছে, সেসব গল্প শুনতে ওর খুবই ভালো লাগে। কিন্তু নিজের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে ওর হীনমন্যতা অপরিসীম। তাই ও নিজেও যে এরকম কোনও আসরে যোগদান করতে পারে, সেটা ও কল্পনাও করতে পারে না। এসব বল নাচের আসর বা পার্টির গল্প ও শুধু শুনেই যায়, নিজেও যে কোনোদিন অংশগ্রহণ করতে পারে, সেসব চিন্তা ওর মাথাতেও আসে না। সব মিলিয়ে শীতকালটা এমনিতে বেশ ভালোই কাটল ফ্যানির। উইলিয়াম এই শীতে ইংল্যান্ডে ফিরল না, তবে ও কবে ফিরবে সেই আশায় থাকাটাই বা খারাপ কীসের!

বসন্ত এলো। ফ্যানির অমূল্য বন্ধু, ওর পুরনো ধুসর টাট্টুটা গেল হারিয়ে। ফ্যানির শরীর ও মন দুটোর জন্যই ঘোড়ায় চড়া প্রয়োজন। কিন্তু বেশ কিছুদিন কেটে গেলেও কারোরই কোনও উদ্যোগ দেখা গেল না ফ্যানির জন্য আরেকটা ঘোড়ার বন্দোবস্ত করার। ওর দুই মাসিরই বক্তব্য, “ফ্যানি তো যেকোনোও সময়ই ওর দুই মাসতুতো বোনের কোনও একজন যখন ঘোড়ায় চড়তে চাইবে না এরকম সময় একটা ঘোড়া নিয়ে তাতে চড়তে পারে।“ কিন্তু মুশকিল হলো এই যে যেদিনই আবহাওয়া ভালো থাকে, মিস বার্ট্রামরা সেদিনই সারাদিন ঘোড়ায় চড়ে ঘুরতে চায়। ফ্যানির জন্য নিজেদের আনন্দ ত্যাগ করার কথা মোটেও মাথাতে আনে না। তাই ফ্যানির ঘোড়া চড়াও আর হয়ে ওঠে না।

ধুসর টাট্টুটাকে হারিয়ে সব মিলিয়ে ফ্যানির শরীর, মন দুটোই বেশ খারাপ হয়ে পড়ল। পুরো এপ্রিল, মে মাস জুড়ে দুই বার্ট্রাম বোন তাদের নিজেদের ঘোড়ায় চড়ে মহানন্দে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়, সুন্দর দিনগুলো উপভোগ করে। এদিকে ফ্যানি হয় এক মাসির সঙ্গে সারাদিন বসে থাকে আর নাহলে অন্য মাসির সঙ্গে হাঁটাহাঁটি করে। নরিস মাসির জোরাজুরিতে ও নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়েও অনেকটা হাঁটতে বাধ্য হয়। যে কোনও রকম শারীরিক কসরত করাটা লেডি বার্ট্রাম যেমন নিজের শরীরের জন্য অপ্রয়োজনীয় ও কষ্টকর বলে মনে করেন, তেমন অন্য যে কারোর জন্যও। আবার অন্য দিকে মিসেস নরিস একদম উল্টো। তিনি নিজে সারাদিন হেঁটে বেরান, আর মনে করেন সবারই সারাদিন হাঁটা উচিত।

যখন এই সব কিছু ঘটছে তখন এডমন্ড বাড়িতে ছিল না। থাকলে ফ্যানির এই অসুবিধা আরও আগেই মিটে যেত। এডমন্ড যখন ফিরে ফ্যানির অসুবিধার কথা জানতে পারল তখন একটা সমাধানের কথাই ওর মাথায় এল, “ফ্যানির নিজস্ব একটা ঘোড়া থাকা জরুরী।“ মায়ের উদাসীনতা বা নরিস মাসির অর্থ সাশ্রয়ের যুক্তি কোনও কিছুই ওকে ওর সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারল না। মিসেস নরিস না ভেবে পারলেন না পার্কের ঘোড়াগুলোর মধ্যে থেকে একটা পুরনো, ভালো ঘোড়া নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে, বা স্টুয়ার্টের কাছ থেকেও একটা ঘোড়া চেয়ে নেওয়া যেতে পারে যেটা দিয়ে কাজ চালানো যায়। কিম্বা, মিস্টার গ্রান্ট প্রায়ই যে ঘোড়াটা ডাকঘরের কাজের জন্য পাঠান চাইলে সেটাও ধার দিতে পারেন বলে মিসেস নরিসের মনে হলো। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছে যে ফ্যানির জন্য তার মাসতুতো বোনেদের যেমন আছে তেমন একটা অভিজাত ঘোড়া কেনা শুধু অকারণ তাইই নয়, অনুচিতও বটে। তাঁর মনে হচ্ছে স্যর থমাস এরকম কখনই চান নি। তাই তাঁর অনুপস্থিতিতে এই ঘোড়া কেনা ঠিক হবে না। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন স্যর থমাসের আয়ের ব্যাপারটা এতটা অনিশ্চিত, তখন তাঁর ঘোড়ার আস্তাবলের জন্য একটা দামি আর অভিজাত ঘোড়া কেনা মিসেস নরিসের চোখে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

কিন্তু এডমন্ডের একমাত্র জবাব এটাই যে, “ফ্যানির নিজের জন্য একটা ঘোড়া লাগবেই লাগবে।“ মিসেস নরিস এটা একদমই মেনে নিতে পারলেন না। তবে লেডি বার্ট্রাম এই বিষয়ে ছেলের সঙ্গে একমত। তাঁর মতে স্যর থমাসও ফ্যানির জন্য একটা ঘোড়া কেনার ব্যাপারে ছেলের সঙ্গে একমত হবেন। তবে বেশি তাড়াহুড়ো না করে তিনি স্যর থমাসের ফেরার জন্য অপেক্ষা করার কথা বললেন ছেলেকে। স্যর থমাস তো সেপ্টেম্বর মাসেই ফিরে আসবেন। ফিরে এসে তিনি নিজেই সবকিছুর ব্যবস্থা যখন করেই দেবেন, তাহলে সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করলে এমন কী ক্ষতি হবে!

মায়ের থেকেও নরিস মাসির ব্যবহারে এডমন্ডের বেশি খারাপ লাগল। ফ্যানির জন্য নরিস মাসির কোনও চিন্তাই যেন নেই। তবুও সে নরিস মাসির কথা ফেলতে পারল না। তাই ভেবেচিন্তে সে এমন একটা উপায় বের করল যাতে বাবার না মনে হয় যে সে বাড়াবাড়ি রকম খরচ করেছে আবার একইসঙ্গে ফ্যানির সমস্যার সমাধানও হয়। ফ্যানির শারীরিক কসরত করার কোনও অসুবিধা হোক সেটা এডমন্ডের সহ্য হবে না।

এডমন্ডের নিজের তিনটে ঘোড়া। কিন্তু কোনটাই মেয়েদের চড়ার উপযুক্ত নয়। দুটো শিকারের ঘোড়া আর একটা রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার জন্য উপযুক্ত ঘোড়া। এডমন্ড এই তিন নম্বর ঘোড়াটা বদল করে এমন একটা ঘোড়া নেওয়ার কথা ভাবল যেটা ফ্যানির জন্য উপযুক্ত হবে। এরকম একটা ঘোড়া কোথায় পাওয়া যেতে পারে সেটা সে জানে। সবকিছু ভালোভাবে ছকে নেওয়ার পর বাকি ব্যাপারটা হতে খুব বেশি সময় লাগল না। নতুন ঘোড়াটা যেন একটা রত্ন। সামান্য প্রশিক্ষণেই ঘোড়াটা ফ্যানির চড়ার জন্য তৈরি হয়ে উঠল। ফ্যানি ঘোড়াটার একচ্ছত্র মালিক হয়ে গেল।

আগের ধুসর টাট্টুটার মতন মানানসই আর কোনও ঘোড়া হতে পারে বলে ভাবেই নি ফ্যানি। কিন্তু এডমন্ডের আনা নতুন ঘোড়াটা পেয়ে আগের ঘোড়াটা পেয়ে যতোটা আনন্দ হয়েছিল তার থেকেও বেশি আনন্দ হলো ওর। এছাড়াও এডমন্ডের এই কাজের পিছনে যে কতটা বিবেচনা আছে সেটা ভেবেই ওর এত আনন্দ হচ্ছে যে তা প্রকাশ করার ভাষা জানা নেই ফ্যানির। জীবনে ভালো আর মহৎ যা কিছু পেয়েছে, এডমন্ডকে তার সেরা উদাহরণ বলে মনে হলো ওর। ওর এটাও মনে হলো যে এডমন্ড এমন একজন মানুষ যার দাম একমাত্র ওই বুঝতে পারে। ও যে কী করে এডমন্ডের প্রতি ওর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না। এডমন্ডের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, বিশ্বাস আর কোমলতা মিশিয়ে এক আশ্চর্য ভালোলাগার মনোভাব গড়ে উঠল ফ্যানির মনে।

ঘোড়াটা এমনিতে এডমন্ডের নামেই নেওয়া হলো, আর বাস্তবিক অর্থেও সেটা এডমন্ডেরই রইল। তাই ফ্যানি সেটায় চড়ছে এই ব্যাপারটা মিসেস নরিস সহ্য করে নিলেন। ঘোড়াটা নেওয়ার ব্যাপারে লেডি বার্ট্রামের যদি বা একটু আধটু আপত্তি থেকেও থাকে, ঘোড়াটার ব্যবস্থা করার জন্য তিনি এডমন্ডকে ক্ষমা করে দিলেন। যতই হোক, সেপ্টেম্বর মাসে স্যর থমাসের ফেরার জন্য অপেক্ষা না করা ছাড়া আর কোনও দোষ তো নেই এডমন্ডের। তবে সেপ্টেম্বর মাস এলে দেখা গেল যে স্যর থমাসের কাজ শেষ হওয়ার বা ফেরার কোনও লক্ষণ অদুর ভবিষ্যতে নেই।

এমনই কপাল তাঁর যে তিনি যখন ইংল্যান্ডে ফেরার কথা ভাবতে শুরু করেছেন, ঠিক সেই সময়ই পরিস্থিতি এমন হলো যে তাঁকে সবকিছু শেষ পর্যন্ত সামলানোর জন্য থেকে যেতেই হলো। তবে তিনি টমকে পাঠিয়ে দিলেন। টম বেশ নিরাপদেই দেশে ফিরে এল। সে এসে জানাল তার বাবার শরীরও বেশ ভালোই আছে। তবে এসব কথায় মিসেস নরিসের খুব একটা মন ভিজল না। স্যর থমাসের ছেলেকে পাঠিয়ে দেওয়া দেখে তাঁর মনটা কু ডাক ডাকতে লাগল। তাঁর মনে হলো হয়তো কোনও বিপদের আঁচ পেয়েই স্যর থমাস বাবা হিসেবে ছেলেকে নিরাপদে রাখার জন্য ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে নিজে সেই বিপদের মধ্যে থেকে গিয়েছেন। এই নিয়ে তিনি এমন দুশ্চিন্তা করতে শুরু করলেন যে নিজের ছোট্ট বাড়িটায় একা একা টিকতে না পেরে রোজ সন্ধ্যায় ম্যান্সফিল্ডের খাবার ঘরে এসে আশ্রয় নিতে শুরু করলেন। এরপর শীত এল শীতের স্বাভাবিক সামাজিক ব্যস্ততা নিয়ে। এই সামাজিক ব্যস্ততার কিছু সুফলও রয়েছে। মিসেস নরিস তাঁর বড় বোনঝির ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, আর এত সব ব্যস্ততার মধ্যে তাঁর মনটা গেল অন্য দিকে ঘুরে। স্যর থমাসের জন্য তাঁর সবসময়ের উদ্বেগও কিছুটা কমলো। ধনী লোকজনের সামনে, বিশেষ করে সদ্য সদ্য বড় এস্টেটের বা ভালো কোনও জায়গাজমির মালিক হয়েছে এমন কোনও তরুণের সঙ্গে আলাপ হলেই তাঁর মনে হয়, “আর কখনও না ফিরে আসাটাই যদি স্যর থমাসের নিয়তি হয়, তাহলে অন্তত মারিয়ার একটা খুব ভালো বিয়ে হলে সেটা তাঁর জন্য ভারী শান্তির ব্যাপার হবে।“

মিস্টার রাশওয়ার্থ প্রথম দেখাতেই মিস বার্ট্রামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়েছেন। যেহেতু তিনি বিয়ে করতেই চান মিস বার্ট্রামকে, তাই কিছুদিনের মধ্যেই তিনি যে মিস বার্ট্রামের প্রেমে পড়েছেন, সেটা কল্পনা করে ভারী পুলকিত হয়ে উঠলেন। তিনি বেশ ওজনদার চেহারার এক যুবক, তবে দারুণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, সেটা বলা যাবে না। তবে তাঁর চেহারায় বা ব্যবহারে আপত্তিজনক কিছু নেই। তাই মিস বার্ট্রামও বেশ খুশি যে তিনি মিস্টার রাশওয়ার্থকে জয় করতে পেরেছেন। মিস মারিয়া বার্ট্রামের বয়স এখন বছর একুশ। এই বয়সে বিয়ে করাটা যে তার একটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, সেটা সে মনে করতে শুরু করেছে। মিস্টার রাশওয়ার্থের রোজগার স্যর থমাসের রোজগারের থেকেও বেশি, তাই অনেক অর্থ উপভোগ করতে পারবে, আবার শহরে তার নিজের একটা বাড়িও থাকবে, এগুলোই এখন মিস বার্ট্রামের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই বিয়ে করার নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গে এই সব উদ্দেশ্যেও সম্ভব হলে মিস্টার রাশওয়ার্থকে বিয়ে করাটা মিস বার্ট্রামের কাছে অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মিসেস নরিস তো ভারী উৎসাহী এই সম্বন্ধটা যাতে পরিণতি পায় সে জন্য। তাঁর তরফ থেকে চেষ্টার ত্রুটি নেই যাতে এই বিয়েটা দুই পক্ষের কাছেই আকাঙ্খিত হয়ে ওঠে। মিস্টার রাশওয়ার্থের মায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা এই সব চেষ্টাগুলোর মধ্যে একটা। মিস্টার রাশওয়ার্থের মা আপাতত মিস্টার রাশওয়ার্থের সঙ্গেই থাকেন। ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলার চেষ্টায় মিসেস নরিস এমন কী লেডি বার্ট্রামকে পর্যন্ত একদিন সকালে প্রায় দশ মাইলের অত্যন্ত খারাপ রাস্তা পেরিয়ে মিস্টার রাশওয়ার্থের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বাধ্য করলেন।

মিসেস নরিস ও মিসেস রাশওয়ার্থের বেশ ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি হতে বেশি সময় লাগল না। মিসেস রাশওয়ার্থ নিজেও স্বীকার করলেন যে তিনিও চান তাঁর ছেলে মিস বার্ট্রামকেই বিয়ে করুক। এখনও পর্যন্ত দেখা সব তরুণীর মধ্যে মিস বার্ট্রামকেই সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে হয় তাঁর। তাঁর মনে হয় মিস বার্ট্রামের মতন মিষ্টি আর সুন্দর স্বভাবের একটা মেয়েই তাঁর ছেলেকে সুখি রাখতে পারবে। মিসেস নরিস মিস বার্ট্রামের এত সব প্রশংসা শুনে তো বেজায় খুশি। মিসেস রাশওয়ার্থ নিজে যে মানব চরিত্রের কত সূক্ষ্ম বিশ্লেষক, তা বলে বাহবা দিতে থাকেন মিসেস নরিস। তিনি আরও বললেন যে মারিয়া সত্যিই তাঁদের সকলের গর্ব আর আনন্দ – একেবারে নিখুঁত – এক কথায় যাকে বলে দেবদূতের মতন একটা মেয়ে। চারপাশের এত প্রেমিকের ভিড়ে সঠিক মানুষটাকে বেছে নেওয়া মারিয়ার জন্য একটা দুরূহ কাজই বটে। তবে অল্পসল্প আলাপে মিসেস নরিস যতটুকু বুঝেছেন তাতে তাঁর মনে হয় যে মিস্টার রাশওয়ার্থই সেই তরুণ যিনি মারিয়াকে পাওয়ার যোগ্য।

বেশ অনেকগুলো বল নাচের আসরে দুজনে একসঙ্গে নাচ করে মিস্টার রাশওয়ার্থ আর মিস বার্ট্রাম দুজনেই এই মতামতকে সঠিক বলে প্রমাণ করল। এরপর অনুপস্থিত স্যর থমাসের মতামত মাথায় রেখে দুজনের বাগদান সম্পন্ন হলো। উভয় পরিবারই এতে খুব আনন্দিত। এমন কী আশেপাশের এলাকার লোকজনও বেশ খুশি, কারণ সবারই গত বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই মনে হচ্ছে যে এই দুজনের বিয়েটা হওয়াই উচিত।

স্যর থমাসের সম্মতি আসতে বেশ কয়েক মাস সময় লেগে গেল। তবে ইতিমধ্যে মিস্টার রাশওয়ার্থের এই সম্পর্কে অনাবিল খুশি হওয়ার বিষয়ে কারোর কোনও সন্দেহ রইল না। দুই পরিবারের এই যোগাযোগ কোনও বাধাবিঘ্ন ছাড়াই মজবুত হয়ে উঠল। সম্পর্কটা নিয়ে এখন আর কোনও লুকোছাপারও চেষ্টা নেই। শুধুমাত্র মিসেস নরিস সব জায়গায় বলে বেরাতে লাগলেন যে বিষয়টা নিয়ে এখনই কথা বলা ঠিক হবে না।

একমাত্র এডমন্ডই এই পুরো বিষয়টায় একটা ত্রুটি দেখতে পাচ্ছে। নরিস মাসি যতই চেষ্টা করুন না কেন, মিস্টার রাশওয়ার্থকে সঙ্গী হিসেবে পছন্দ হওয়ার কোনও কারণই সে দেখতে পাচ্ছে না। দিদিকে তার নিজের সুখের ব্যাপারে সবথেকে বড় বিচারক হিসেবে মেনে নিয়েও যখন সে দেখল যে দিদির এই সুখের ধারণা শুধুমাত্র অনেক টাকাপয়সা রোজগারের উপরই নির্ভরশীল, তখন সে কিছুতেই খুশি হতে পারল না। মিস্টার রাশওয়ার্থের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় তার একটা কথাই বারেবারে মনে হয়, “বছরে বারো হাজার পাউন্ড রোজগার করলেও এই লোক একেবারেই নির্বোধ।“

তবে স্যর থমাস দূর থেকে এই সম্বন্ধের বিষয়ে শুধু ভালো ভালো কথাই শুনেছেন। তাই সম্বন্ধটা যে খুবই ভালো, সেই ব্যাপারে তাঁর কোনও সন্দেহই নেই। আর তাই তিনি কিন্তু সত্যিই খুব খুশি এই সম্বন্ধের সম্ভাবনায়। ঠিক যেমনটা হলে সবদিক দিয়ে ভালো হয়, সম্বন্ধটা ঠিক তেমনই। দুই পরিবার একই কাউন্টিতে থাকে আর দুই পরিবারেরই ঘোরাফেরা একই বৃত্তে, পছন্দ – অপছন্দ একই রকম। তিনি যত দ্রুত সম্ভব তাঁর আন্তরিক সম্মতি জানালেন। শুধু একটা অনুরোধই জানালেন – দেশে ফেরার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে আছেন, তাই বিয়েটা যেন তাঁর দেশে ফেরার আগে না হয়। এপ্রিল মাসে তিনি চিঠি লিখে জানালেন যে মনে হচ্ছে গরমকাল শেষ হওয়ার আগেই অ্যান্টিগায় সবকিছু মনের মতন করে গুছিয়ে দেশে ফিরতে পারবেন তিনি।

জুলাই মাস পর্যন্ত সবকিছু একই রকম রইল। ফ্যানি তখন সদ্য আঠারোতে পা দিয়েছে। এমন সময় গ্রামে একটা নতুন সংযোজন ঘটল – মিসেস গ্রান্টের তরুণ ভাই ও বোন, মিস্টার ও মিস ক্রফোর্ড – মিসেস গ্রান্টের মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের সন্তান। ওরা ধনী পরিবারের সন্তান। নরফোকে মিস্টার ক্রফোর্ডের এক বিশাল এস্টেট আছে, আর মিস ক্রফোর্ডের আছে কুড়ি হাজার পাউন্ড। ছোটবেলায় ওদের দিদি মিসেস গ্রান্ট ওদের খুবই ভালবাসতেন। তারপর তাঁর বিয়ে হলো, আর তার পরপরই মায়ের মৃত্যু। ফলে ওই দুই ভাই বোনকে তাঁদের বাবার এক ভাইয়ের কাছে থাকতে হয়েছিল। বাবার সেই ভাইকে মিসেস গ্রান্ট মোটেই চিনতেন না। ফলে তারপর থেকে এই দুই ভাই বোনের সঙ্গে মিসেস গ্রান্টের খুব কমই দেখা হয়েছে। সেই কাকার বাড়িতে এই দুই ভাই বোন খুব ভালোই ছিল। অ্যাডমিরাল এবং মিসেস ক্রফোর্ড যদিও অন্য কোনো বিষয়ে একমত হতেন না, কিন্তু এই দুই ভাই বোনের প্রতি তাঁরা দুজনেই স্নেহশীল ছিলেন। দুজনের ভালোবাসা একেক ভাই বোনের প্রতি কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট ছিল, তবে এটা ছাড়া অ্যাডমিরাল এবং মিসেস ক্রফোর্ডের আর কোনও মতবিরোধ ছিল না। অ্যাডমিরাল ছেলেটাকে আর মিসেস ক্রফোর্ড মেয়েটাকে বেশি ভালোবাসতেন। কিন্তু মিসেস ক্রফোর্ডের মৃত্যুর কয়েক মাস পর, তাঁর প্রিয় মিস ক্রফোর্ডকে কাকার বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও থাকার যোগাড় করতে হলো। অ্যাডমিরাল ক্রফোর্ডের স্বভাব চরিত্র বড্ড উগ্র। তিনি ভাগ্নিকে বাড়িতে না রেখে বরং তাঁর উপপত্নীকে বাড়িতে আনতে চান। এই সব মিলিয়ে মিস ক্রফোর্ড মিসেস গ্রান্টের কাছে থাকবেন এরকম ঠিক হলো। তাঁর কাছে ব্যাপারটা একদিক দিয়ে যেমন আনন্দের তেমন অন্যদিক থেকে প্রয়োজনও বটে। এই গ্রামে সন্তানহীন জীবন কাটিয়ে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসপত্র আর সুন্দর সুন্দর আসবাবপত্র দিয়ে তাঁর প্রিয় বসার ঘর সাজিয়ে, পছন্দসই গাছপালা আর পশুপাখির যত্ন করে তিনি ক্লান্ত। এবার বাড়িতে তাঁর একটু বৈচিত্র্য চাই। তাই ছোট থেকে যাকে এত ভালোবাসতেন, সেই বোন যখন এখানে আসছে, তখন তিনি ভারী খুশি হয়ে ওঠেন। তিনি তো চান মিস ক্রফোর্ড যতদিন না বিয়ে করে ততদিন যে এখানে তাঁর কাছেই থেকে যায়। আপাতত তাঁর একটাই চিন্তা – লন্ডনের জীবনে অভ্যস্ত তরুণী মিস ক্রফোর্ড এই ম্যান্সফিল্ডের মতন গ্রামে কতটা খুশি থাকবে।

মিস ক্রফোর্ডও যে একই ভয় পাচ্ছে না, তা নয়। প্রাথমিক ভাবে সে চাইছিল যাতে ওরা দুই ভাই বোনে মিলে দাদার নিজের গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে মিস ক্রফোর্ডকে আর অন্য কোনও আত্মীয়র সঙ্গে থাকার ঝামেলা পোয়াতে হয় না। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সে তার দাদাকে রাজি করাতে পারল না গ্রামে গিয়ে তার সঙ্গে থাকার জন্য। এরপরই মিস ক্রফোর্ড চিন্তিত হয়ে পড়ল যে গ্রামে থাকা দিদি মিসেস গ্রান্টের সঙ্গে সে যে থাকতে আসবে, না জানি সেই দিদি কেমন জীবন কাটান! কিম্বা, সেই গ্রামের সামাজিক পরিবেশ কেমন হবে। কোথাও একটানা একটা ধরাবাঁধা সামাজিন জীবনযাপন হেনরি ক্রফোর্ডের একেবারেই অপছন্দের তাই সে বোনের সঙ্গে এরকম কোথাও থাকতে রাজি হলো না মোটেই তবে বোনকে সঙ্গে করে নর্থ্যাম্পটনশায়ার নিয়ে এল পৌঁছে দেওয়ার জন্য। হেনরি বোনকে পৌঁছে দিল বটে, তবে যেই বোন এই গ্রামে আর ভালো লাগছে না বলে জানাবে তার মাত্র আধঘণ্টা পরেই সে এসে বোনকে নিয়ে যাবে বলে কথা দিল

এই পুনর্মিলনে সকলেই ভারী খুশি হয়ে উঠল মেরি ক্রফোর্ড দেখল দিদি মিসেস গ্রান্ট শুধু যে গোঁড়া নন তাই না, তিনি যথেষ্ট রুচিশীলও বটে। দিদির স্বামী বেশ ভদ্র, বাড়িটাও বেশ বড়সড় আর সুন্দর করে সাজানো গোছানো। অন্যদিকে মিসেস গ্রান্টও দুই ভাইবোনকে দেখে যারপরনাই আহ্লাদিত হয়ে উঠলেন। এই দুই ভাইবোনকে তিনি আগের থেকে বেশি ভালবাসতে চান। তাই অসামান্য সুন্দরী মেরি আর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারি হেনরিকে দেখে তিনি খুব খুশি হয়ে উঠলেন। দুই ভাইবোনের ভীষণ প্রাণোচ্ছল আর মনোরম ব্যক্তিত্ব দেখে মিসেস গ্রান্ট সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিলেন যে ওরা নিশ্চয়ই সর্বগুণ সম্পন্ন। তিনি দুই ভাইবোনকে দেখেই খুশি হলেও মেরির প্রতি তাঁর দুর্বলতা একটু বেশি।

নিজে খুব একটা রূপসী না হওয়ায় নিজের রূপের গরবে গরবিনী কোনদিনই হতে পারেননি তিনি। তাই বোনের অপরূপ সৌন্দর্যের গর্বে গরবিনী হওয়ার আনন্দটুকু তিনি চেটেপুটে উপভোগ করেন। বোন কবে আসবে সেজন্য বসে না থেকে আগেভাগেই বোনের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজতে শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি। টম বার্ট্রাম তাঁর নজরে ছিল প্রথম থেকেই। টম একজন ব্যারনেটের বড় ছেলে। এদিকে মেরি কুড়ি হাজার পাউন্ডের অধিকারিণী, অপূর্ব রূপসী আর মিসেস গ্রান্টের হিসেব মতন যথেষ্ট প্রতিভাধর। তাই মেরি আর টমের বিয়ে হলে সেটা মোটেই বাড়াবাড়ি কিছু হবে না। মিসেস গ্রান্ট খুবই খোলা মনের মানুষ আর যথেষ্ট আন্তরিকও, তাই মেরি এসে পৌঁছানর ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই তিনি তাঁর এই পরিকল্পনার কথা মেরিকে বলে দিলেন।

কাছেই এমন এক সম্ভ্রান্ত পরিবার আছে জেনে মিস ক্রফোর্ড তো বেশ খুশি। দিদি যে আগেভাগেই তার জন্য ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন, বা তার জন্য টমের কথা ভেবেছেন তাতেও সে অখুশি নয়। একটা ভালো বিয়ে করতে পারলে সে বিয়ে করতেই তো চায়। মিস্টার বার্ট্রামকে শহরে দেখে ওর মনে হয়েছিল যে টমের চেহারা বা সামাজিক অবস্থান কোনটা নিয়েই আপত্তি করার কিছু নেই। তাই প্রথমে দিদির প্রস্তাবে একটু হাসি মজা করলেও পরে মনে মনে প্রস্তাবটা গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখতে ভুল হলো না মেরির। এই একই প্রসঙ্গ হেনরির কাছেও তোলা হলো খুব তাড়াতাড়ি।

সবকিছু বলে মিসেস গ্রান্ট আরও বললেন, “দেখো, এখন পুরো ব্যাপারটা একদম নিখুঁত কী করে করতে হবে সেজন্য আমি একটা উপায় ভেবেছি। আমি সত্যিই চাই যে তোমরা দুজনেই এখানে থেকে যাও। সেক্ষেত্রে তুমি বার্ট্রাম বাড়ির ছোট মেয়েকে বিয়ে করবে। মেয়েটা খুবই মিষ্টি, হাসিখুশি, অনেক গুণের অধিকারি। ও তোমাকে খুবই আনন্দে রাখবে।“

দিদির প্রস্তাবে হেনরি মাথা ঝুঁকিয়ে ধন্যবাদ জানাল।

এদিকে মেরি হাসতে হাসতে বলল, “দিদি, তুমি যদি হেনরিকে বিয়েতে রাজি করাতে পারো, তাহলে তো আমার আনন্দের আর সীমা থাকবে না! তোমার মতন চালাক চতুর একজন মানুষ যে আমার দিদি, সেতো দারুণ ব্যাপার। একটাই আফসোস যে বিয়ে দেওয়ার মতন গোটা ছয়েক মেয়ে নেই তোমার। তুমি যদি হেনরিকে বিয়ে করতে রাজি করাতে পারো, তাহলে ফরাসি মহিলাদের মতন কুশলী হতে হবে। কারণ, ইংরেজ হিসেবে যতরকম বুদ্ধি খাটানো যায়, সব বুদ্ধি ইতিমধ্যে খাটানো হয়ে গিয়েছে। আমার নিজেরই তো তিনটে বন্ধু ওকে পাওয়ার জন্য পাগল। ওরা নিজেরা, ওদের ভীষণ বুদ্ধিমতি মায়েরা, আমার প্রিয় কাকিমা, আমি নিজে সবাই বিভিন্নভাবে হেনরিকে বিয়ে করতে রাজি করাতে চেষ্টা করেছি, নানাভাবে তুতিয়েপাতিয়ে, বুদ্ধি খাটিয়ে চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাও হেনরি বিয়ে করতে রাজি হয় নি। তবে হেনরি কিন্তু প্রেমের খেলা খেলতে ওস্তাদ, ভয়ানক ফ্লার্ট – তোমার কল্পনার বাইরে। তোমার মিস বার্ট্রামরা যদি প্রেমে পড়ে কষ্ট না পেতে চায়, তাহলে হেনরিকে এড়িয়ে চলাই ভালো হবে ওদের জন্য।“

“হেনরি, এসব কী শুনছি? আমি একটুও বিশ্বাস করি না যে তুমি এরকম!”

“না দিদি, আমি জানি তুমি মেরির মতন না, তুমি সত্যিই খুব ভালো। কম বয়েসের অনভিজ্ঞতা আর বিশ্বাস করতে না পারার বিষয়টা তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে। আমি আসলে একটু সাবধানী প্রকৃতির মানুষ। তাই যেখানে নিজের ভালো থাকার বিষয় জড়িত সেখানে তাড়াহুড়ো করতে চাই না। বিয়েকে আমি যতোটা গুরুত্ব দিই, ততোটা গুরুত্ব হয়তো খুব কম লোকই দেয়। আমার মনে হয় স্ত্রী যে এক আশীর্বাদস্বরূপ এটা কবি সবথেকে ভালো বলেছেন তাঁর এই কবিতায় – তাঁর বলা, ‘স্ত্রী স্বর্গের থেকে সবশেষে পাওয়া সবথেকে ভালো উপহার।‘ পংতিটা আমার ভারী পছন্দের।“ 

“দেখলে? কেমন একটা শব্দ নিয়ে কথার খেলা করে গেল, দেখলে দিদি? আর ওর হাসিটা দেখো! আমি তোমাকে বলছি শোন, ওর মতন নির্লজ্জ আর কেউ নেই। ওই অ্যাডমিরালের থেকে শেখা কলাকৌশল ওকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে।”

মিসেস গ্রান্ট বলেন, “বিয়ের ব্যাপারে ছেলেমানুষের কথা আমি কানেই নিই না। যদি ওরা বলে যে বিয়ে করতে চায় না, তাহলে আমার মনে হয় যে নির্ঘাত সঠিক মানুষকে এখনও খুঁজে পায় নি, তাই বিয়ে করতে আপত্তি।“

মেরির যে বিয়ে করতে কোনও আপত্তি নেই তাতে ডক্টর গ্রান্ট বেশ মজা করেই অভিনন্দন জানালেন মেরিকে।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার তাতে কোনও লজ্জা নেই। আমি তো ঠিকঠাক কাউকে পেলে যে কাউকেই বিয়ে করতে রাজি। শুধু যেন ভুল মানুষকে বিয়ে না করে কেউ। সঠিক সময়ে সঠিক মানুষ পেলে সবারই বিয়ে করা উচিত।