জেন অস্টেনের ম্যান্সফিল্ড পার্ক - ষোড়শ পর্ব

পর্ব - ১৬

ফ্যানির সঙ্গে যেসব অপ্রিয় ঘটনা ঘটল, সেসব ভুলিয়ে দেবে, মেরির কথায় অত দম নেই। তাই সেদিন রাতে ফ্যানি যখন শুতে গেল, তখন ওর মাথায় শুধু সেসব কথাই ঘুরছে। টম দাদা যেভাবে সবার সামনে ওকে জোরাজোরি করছিল সেটা ভেবে ও যেন এখনও ভিতর থেকে কেঁপে উঠছে। তার উপর নরিস মাসির ব্যবহার! মাসির নিষ্ঠুর মন্তব্য আর বকুনি শুনে ফ্যানির মনটা একেবারে ভেঙে গিয়েছে। ওকে সবার সামনে আলাদা করে ডেকে অপমান করা হয়েছে। হুমকি দেওয়া হয়েছে যে এ তো কেবল আরও অনেক বড় বিপদের শুরু, ওকে ওর জন্য একেবারেই অসম্ভব কাজ মানে অভিনয়টা করতেই হবে। আর এতকিছুর পর আবার একগুঁয়ে আর অকৃতজ্ঞ বলা আর ওর অসহায় অবস্থার কথা ইঙ্গিত করে কথা শোনানো হয়েছে। সব মিলিয়ে তখন ফ্যানির এতটাই কষ্ট হয়েছিল যে এখন একা একা সেইসব কথা মনে পড়লেও মনটা খারাপ লাগছে। বিশেষ করে  এসব কিছুর সঙ্গে এখন তো পরের দিন এই বিষয় নিয়ে আবার কী শুরু হবে, সেই নতুন ভয়ও জুড়ে গিয়েছে। তখন নাহয় মেরি ওকে আগলে রেখেছিল, কিন্তু টম আর মারিয়া যেমন জোর জবরদস্তি করতে পারে সেরকম করে যদি আবার ওকে চেপে ধরে, জোরাজোরি করতে শুরু করে, আর যদি তখন ধারেকাছে এডমন্ড না থাকে, তাহলে ও কী করবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার আগেই ফ্যানির ঘুম এসে গেল। কিন্তু পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখনও প্রশ্নটা ঠিক ততোটাই জটিল মনে হলো ওর, ও তখনও কোনও উত্তর খুঁজে পায় নি।

এই বাড়িতে আসার পর থেকে এই ছোট সাদা চিলেকোঠার ঘরটাই ফ্যানির শোবার ঘর। কিন্তু এখন এই ঘরটাও ওকে কোনও সদুত্তর দিতে পারছে না। তাই রাতের পোশাক ছেড়ে দিনের জামাকাপড় পরে তৈরি হওয়া মাত্রই ও অন্য একটা বড় ঘরে চলল। ওই ঘরটা বেশ কিছুদিন থেকেই ও প্রায় নিজের মতন করে ব্যবহার করছে। বেশ বড়সর হওয়ার জন্য ওই ঘরটায় একটু পায়চারি করতে করতে চিন্তাভাবনা করতে পারবে ও। ঘরটা এক সময় ওদের পড়াশোনার জন্য ব্যবহার হতো। স্কুলঘর নামে ডাকা হতো ঘরটাকে। পরে মারিয়া জুলিয়ার ঘরটাকে স্কুলঘর নামে ডাকা অপছন্দ করতে শুরু না করা পর্যন্ত ওই নামেই ডাকা হতো। এঘরে মিস লী থাকতেন। তিনবছর আগে মিস লী চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এঘরেই ওরা সবাই মিলে পড়াশোনা, লেখালেখি করত। কত হাসি গল্প হতো এই ঘরেই। মিস লী চলে যাওয়ার পর থেকে এই ঘরটা আর সেভাবে ব্যবহারই হয় না। শুধুমাত্র কখনও কখনও যখন ফ্যানি ওর গাছগুলো দেখাশোনা করতে, বা কোনও বইয়ের খোঁজে আসতো তখন ছাড়া ঘরটা বেশ কিছুদিন তো একেবারেই ফাঁকা পড়ে থাকত। উপরে ফ্যানির ছোট্ট ঘরে যেহেতু খুব বেশি জায়গা নেই, তাই ফ্যানি প্রথমে শুধু ওর বইপত্র এখানে রাখতে শুরু করে। তারপর ধীরে ধীরে ঘরটার আরাম আর শান্তি ওর এতটাই ভালো লেগে গেল যে ও নিজের কিছু জিনিসও সেখানে নিয়ে এল এবং বেশিরভাগ সময় সেখানেই কাটাতে লাগল। কেউ বাধা না দেওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘরটা যেন ওর নিজের হয়ে গেল। এখন প্রায় সবাই মেনেই নিয়েছে, ঘরটা ফ্যানির। মারিয়ার ষোল বছর বয়স থেকে এই ঘরটাকে পুবের ঘর বলা হয়। এই ঘরটা এখন ঠিক ততোটাই ফ্যানির ঘর বলে সবাই মেনে নিয়েছে যতোটা ওই ছোট্ট সাদা রঙ করা চিলেকোঠাটা ওর একার বলে সবাই জানে। আসলে চিলেকোঠার ঘরটা এতোটাই ছোট যে এই বড় ঘরটা যে ওর লাগবে সেটা যেন একেবারেই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আর এদিকে মারিয়া আর জুলিয়া দুই বোন ওদের নিজেদের ঘর নিয়ে এতোটাই খুশি যে এতে আপত্তির কিছু দেখে নি। নরিস মাসি অবশ্য একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন যে শীতকালে ঘর গরম করার জন্য ওই ঘরে আগুন জ্বালানো যাবে না। তাই ওঘরটা আর কেউই ব্যবহার করে না। আর সে জন্যই যে ঘরটা আর কারোর কাজে আসে না, সেই ঘরটা ফ্যানি ব্যবহার করছে সেটা মিসেস নরিস মেনে নিয়েছেন। অবশ্য মাঝেমাঝে খোঁচা দিতে ছাড়েন না। প্রায় সময়ই এমন করে তিনি মনে করিয়ে দেন যে পুবের ঘরটা ব্যবহার করতে দিয়ে ফ্যানিকে কতটা অনুগ্রহ করা হচ্ছে যেন ওই পুবের ঘরটাই বাড়ির সবথেকে সেরা ঘর।

এমনিতে ঘরটা সত্যিই বেশ ভালো। তাই আগুন জ্বালানো না হলেও শুধু তীব্র শীতের সময়টা বাদ দিলে বাকি সময়ে মোটামুটি সহনশীল তাপমাত্রা থাকে। আর ফ্যানির হিসেবে তো খুবই ভালো ঘর। একটু রোদ উঠলেই ও মনে মনে আশা করে হয়তো শীতকালেও ওকে এই ঘর ছেড়ে যেতে হবে না। হাতে কাজ না থাকলে এই ঘরে এসে অপরিসীম শান্তি পায় ফ্যানি। মন খারাপ করা কিছু ঘটলে এই ঘরে চলে আসে ও, আর কোনও না কোনও কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে ফেলে। নাহলে গভীর কোনও চিন্তায় ডুবে যায়। আর তাতেই যেন অসীম সান্ত্বনা পায়। ওর গাছপালা, বই যেগুলো প্রথম নিজের হাতে এক শিলিং খরচ করার সুযোগ পাওয়ার পর থেকেই জমানো শুরু করেছিল, ওর লেখার টেবিল, দান-খয়রাত ও সেলাইয়ের জিনিসপত্র, সবকিছু ওর হাতের নাগালের মধ্যেই। বা যদি নেহাত কিছুই করতে ইচ্ছে না করে, যদি শুধুই চুপচাপ নিজের চিন্তার জগতে ডুব দেয়, তাহলেও এই ঘরের প্রতিটা জিনিস যে ওর নিজের সংগ্রহ করা, প্রতিটা জিনিসের সঙ্গে যে একটা না একটা স্মৃতি জড়িয়ে আছে, এই কথাটা ভাবতেই ভালো লাগে ওর। এই ঘরের সবকিছুই যেন ওর বন্ধু অথবা কোনো বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেয়।

এখানে থাকার জন্য ওকে অবশ্য অনেক কষ্টও পেতে হয়েছে। ও কেন ওই ঘরে থাকছে, ওর উদ্দেশ্য কী, সেই নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। ওর মন কী চায়, সেটাকে কেউ আমল দেয় নি। ওর বিচারবুদ্ধিকে ছোট করা হয়েছে। ওকে নানানভাবে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, ব্যঙ্গ, অবহেলা করা হয়েছে। তবে সব কিছুর শেষেই কোনও না কোনও সান্ত্বনা ও পেয়েছে। লেডি বার্ট্রাম ওর হয়ে কথা বলেছেন, কখনও বা মিস লী ওকে উৎসাহ দিয়েছেন, আর সবথেকে বড় কথা এডমন্ড ওকে আগলে রেখেছে সবসময়। বন্ধুর মতোই এডমন্ড ওকে সব কিছুতে সমর্থন করেছে, ওর পক্ষ নিয়ে সবাইকে বুঝিয়েছে, কান্নাকাটি করলে ফ্যানির পাশে থেকে সান্ত্বনা দিয়েছে। এমন কী এতোটাই স্নেহ দেখিয়েছে যে চোখের জলও ফ্যানির কাছে আনন্দময় হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব স্মৃতিই এখন মিলেমিশে গিয়ে মধুর হয়ে উঠেছে। তাই এখন সেসব পুরোনো দুঃখের কথা ভাবলে ফ্যানির কিছুটা যেন মায়াই হয়।

এই ঘরটা ওর ভীষণ প্রিয়। এতোটাই প্রিয় যে যদিও এই ঘরের জিনিপত্রগুলো এমনিতে খুবই সাধারণ মানের তবুও বাড়ির সবথেকে সুন্দর আসবাবপত্রের বিনিময়েও ও এই ঘরের কোনও জিনিস বদল করতে রাজি নয়। এই ঘরের জিনিসপত্র সবকিছুই বাচ্চাদের যেমন তেমন ব্যবহারে অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবুও এই ঘরের যে জিনিসটা ফ্যানির সবথেকে বেশি সুন্দর বলে মনে হয় সেটা একটা পুরনো রঙ চটা স্টুল। জুলিয়ার নিজের হাতে সেলাই করা একটা রুমাল দিয়ে ঢাকা। সেলাইটা অতটা সুন্দর হয় নি যে বসার ঘরে সাজিয়ে রাখা যায়। এছাড়া আছে জানালার নিচের তিনটে কাচে লাগানো তিনটে স্বচ্ছ ছবি—একটায় Tintern Abbey, তার পাশে ইতালির এক গুহা, আর অন্য পাশে কাম্বারল্যান্ডের এক চাঁদের আলোয় ভরা হ্রদের দৃশ্য। চিমনির ওপর অন্য কোথাও রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়নি এমন কিছু পারিবারিক সদস্যদের ছবি ঝুলছে। আর এসবের পাশেই দেয়ালে টাঙানো ছোট্ট একটা জাহাজের ছবি, বছর চারেক আগে ভূমধ্যসাগর থেকে উইলিয়াম পাঠিয়েছিল। নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা HMS Antwerp, অক্ষরগুলো যেন জাহাজের প্রধান মাস্তুলের মতোই লম্বা।

এই ঘরে এলেই ফ্যানির এক অদ্ভুত আরাম হয়। এখন ফ্যানি এই ছোট্ট আশ্রয়ে এই ভেবে নেমে এল যে ওর অস্থির আর দ্বিধাগ্রস্ত মনটা হয়তো বা এখানে এলে একটু শান্ত হবে। হয়তো এডমন্ডের ছবির দিকে তাকালে তার কাছ থেকে কোনো পরামর্শ পাওয়া যাবে, অথবা ওর জেরেনিয়াম গাছগুলিকে বাতাসে রেখে দিলে নিজেও হয়তো কিছুটা মনের জোর পাবে। তবে সত্যি কথা বলতে কী, ও যে একেবারেই নাটক করতে চাইছে না সেটা নিয়ে ও এখন আর সেভাবে ভয় পাচ্ছে না। ও বরং বুঝতে পারছে যে আসলে এই মুহূর্তে ওর কী করা উচিৎ সেটা নিয়েই ওর মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। নাটকে অভিনয় উচিৎ হবে কী না, সেই বিষয়ে কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না ও। সারা ঘর জুড়ে পায়চারি করছে, কিন্তু তবুও মনস্থির করতে পারার বদলে যেন আরও বেশি করে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ছে ওর মন। সবাই যেখানে এত আন্তরিকভাবে, এত আগ্রহ নিয়ে ওকে নাটকে অভিনয় করার জন্য বলল, সেখানে ওর রাজি না হওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে? যাদের কাছে সবথেকে বেশি কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ, তাদের মনের মতন একটা কাজে সাহায্য করতে অস্বীকার করা কি ওর খারাপ ব্যবহার আর স্বার্থপরতার প্রকাশ নয়? একই সঙ্গে ওর এই ব্যবহার কি এটারও প্রকাশ নয় যে ও নিজেকে সবার সামনে হাস্যস্পদ করে তুলতে ভয় পাচ্ছে? যতই সবাই খুব আগ্রহী ফ্যানির অভিনয় নিয়ে, তবুও পুরো বিষয়টা নিয়ে এডমন্ডের চিন্তা আর স্যর থমাস যে মোটেই চাইবেন না নাটকটা হোক বলে এডমন্ডের আপত্তি প্রকাশ, এই দুটো কি ফ্যানির নাটকে অভিনয় করতে না চাওয়ার পিছনে যথেষ্ট বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে? অভিনয় করার ব্যাপারটা ওর নিজের কাছে এতোটাই ভয়ংকর বলে মনে হচ্ছে যে নিজের আপত্তির কারণ নিয়ে ওর নিজের মনেই সন্দেহ জেগে উঠছে। ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে ওর মনে হলো, মাসতুতো দাদা দিদিদের প্রতি ওর ঋণ তো নেহাত কম নয়। ওর এই অনুভূতি আরও জোরালো হয়ে উঠল এটা দেখে যে ওদের দেওয়া কত উপহার এখানে রয়েছে। জানলাগুলোর মাঝে যে টেবিলটা রাখা রয়েছে, সেটা সেলায়ের নানান জিনিস ভরা বিভিন্ন বাক্সে উপচে পড়ছে। এইসব বাক্সগুলো বিভিন্ন সময়ে ওকে ওর মাসতুতো দাদা দিদিরাই, বিশেষ করে টম উপহার হিসেবে দিয়েছে। এতো উপহারের দিকে তাকিয়ে ওর মাসতুতো দাদা দিদিদের প্রতি ওর অপরিসীম ঋণের কথা ভেবে ফ্যানি যেন আরও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ছে। ও যখন ওর ঠিক কী করা উচিৎ সেটা ঠিক করা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ, তখনই ওর দরজায় কেউ টোকা দিল। নরম সুরে “ভিতরে এসো” বলতেই যে ঘরে এসে ঢুকল, তাকে দেখে ফ্যানির চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দরজা দিয়ে এডমন্ড ভিতরে এল, আর এডমন্ড তো সেই মানুষ যার কাছে ও সবসময় নিজের মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব খুলে বলতে পারে।

এডমন্ড বলল, “ফ্যানি, তোমার সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?”

“আরে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই।”

“একটু আলোচনা করতে চাইছি আমি। তোমার মতামত চাই।”

“আমার মতামত!” এডমন্ডের এতো বড় কথায় খুশি হলেও লজ্জায় সংকুচিত হয়ে অবাক গলায় বলে উঠল ফ্যানি।

“হ্যাঁ, তোমার পরামর্শ আর মতামত। আমি বুঝতে পারছি না কী করা উচিত। তুমি তো দেখতেই পাচ্ছ, এই অভিনয়ের পরিকল্পনাটা দিন কে দিন আরও খারাপ দিকে এগোচ্ছে। যতোটা বিচ্ছিরি একটা নাটক বাছা সম্ভব, ওরা সেটাই বেছে নিয়েছে। আর এখন বিষয়টা সম্পূর্ণ করতে, আমাদের প্রায় অচেনা এক তরুণকে সাহায্যের জন্য ডাকতে যাচ্ছে। শুরুতে যে গোপনীয়তা আর শালীনতার কথা হয়েছিল, তার তো আর কিছুই বাকি রইল না। এরকম না যে আমি চার্লস ম্যাডক্স সম্পর্কে খারাপ কিছু শুনেছি।  কিন্তু ওকে এভাবে আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া, এই অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা খুবই আপত্তিজনক। আর এই বাড়াবাড়ি রকমের ঘনিষ্ঠতার থেকেও যেটা বেশি আপত্তিজনক সেটা হলো লোক জানাজানি। আমি তো ধৈর্য ধরে ঠিক মতন ভাবতেও পারছি না। আমার তো মনে হচ্ছে এটা এতো বড় এক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে, যা সম্ভব হলে আটকানো উচিত। তোমারও কি তাই মনে হয় না?”

“হ্যাঁ, সেটা তো ঠিকই। কিন্তু কী করা যায় বলো তো? তোমার দাদা যেরকম উঠেপড়ে লেগেছে!”

এডমন্ড বলল, “একটাই উপায় আছে, ফ্যানি। আমাকেই আনহাল্টের চরিত্রটা নিতে হবে। আমি খুব ভালো করেই জানি, তা না হলে টমকে শান্ত করা যাবে না।”

কোনও উত্তর জোগালো না ফ্যানির মুখে।

“এমন না যে এটা আমার খুব ভালো লাগছে। যে আমি এই নাটক অভিনয়ের শুরু থেকেই এত বিরোধিতা করেছি, সেই আমিই যদি এখন অভিনয় করতে রাজি হয়ে যাই, তাহলে তার থেকে বড় অসংগতি আর কী হতে পারে। কারোরই এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হলে ভালো লাগার কথা নয়। বিশেষ করে এখন তো ওরা সব বিষয়ে পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা এগিয়েও গিয়েছে। কিন্তু আমি তো আর কোনও বিকল্প পথ খুঁজে পাচ্ছি না। তোমার মাথায় কি কিছু আসছে ফ্যানি?”

খুব আস্তে আস্তে ফ্যানি উত্তর দিল, “না, আপাতত তো কিছুই মাথায় আসছে না, তবে…”

“তবে কী? বুঝতে পারছি, তোমার মত আমার সঙ্গে পুরো মিলছে না। কিন্তু একটু তলিয়ে ভেবে দেখো। একজন তরুণকে এভাবে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসা, একেবারে ঘরের ছেলে করে তোলা, তাকে যেকোনো সময় আসার অনুমতি দেওয়া, তাতে তো হঠাত করেই সমস্ত রকম বাধা নিষেধ লোপ পাবে। আর এতে যে কত রকম ঝামেলা হতে পারে, কত অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে সেটা আমি যতোটা বুঝতে পারছি, তুমি হয়তো ততোটা ঠিক বুঝতে পারছ না। প্রতিটি মহড়া যে কতটা বাড়াবাড়ি রকমের স্বাধীনতার পরিবেশ তৈরি করবে, শুধু সেটাই ভাবো। সব মিলিয়ে ব্যাপারটা মোটেই খারাপ বৈ ভালো কিছু হবে না! নিজেকে মেরির জায়গায় রেখে ভেবে দেখো, ফ্যানি। একজন অচেনা মানুষের সঙ্গে অ্যামেলিয়ার চরিত্রে অভিনয় করতে কেমন লাগবে? ও নিজেও যেখানে এতে অস্বস্তি বোধ করছে, সেখানে আমাদেরও তো ওর দিকটা একটু বুঝতে হবে। গতকাল রাতে তোমাকে যা বলছিল, তাতে যা বুঝেছি যে একজন অপরিচিত ছেলের সঙ্গে অভিনয় করার ব্যাপারে ওর নিজেরই আপত্তি আছে। ও হয়তো অন্য কিছু আশা করে এই চরিত্রটা নিয়েছিল। হয়তো পুরো বিষয়টা ভেবে দেখেনি। আর এখন ওকে এ অবস্থায় ফেলাটা নিতান্তই নিষ্ঠুরতা আর অন্যায় হবে। ওর ভালো লাগা, মন্দ লাগাকেও তো আমাদের সম্মান করা উচিত। এখন আমার সঙ্গে একমত হতে তুমি দ্বিধা করছ, কিন্তু ফ্যানি, সত্যি বলোতো, কথাটা ভেবে তোমারও কি খারাপ লাগছে না?”

“হ্যাঁ, মেরির কথা ভেবে খারাপ লাগছে আমার। কিন্তু তার থেকেও বেশি খারাপ লাগছে এটা দেখে যে তুমি যেটার বিরদ্ধে ছিলে, যেটায় মেসোমশায়ের এতো আপত্তি হবে বলে তোমার মনে হয়, এখন তুমি সেটাই করতে চলেছ। ওদের জন্য তো এটা একটা বিশাল বড় জয়, বিশাল প্রাপ্তি।”

“ওদের এতো বড় জয়ের আনন্দ বেশিক্ষণ টিকবে না, যখন ওরা দেখবে কত জঘন্য অভিনয় করছি আমি। তবে হ্যাঁ, কিছুটা আনন্দ তো ওদের হবেই, আর সেটা আমাকে সহ্যও করতে হবে। কিন্তু আমি যদি লোক জানাজানি হওয়া থেকে আটকাতে পারি, সবাই এটা দেখবে সেটা যদি আটকাতে পারি, যদি আমাদের এই বোকামিটাকে ছোট গণ্ডিতে আটকে রাখতে পারি, তাহলে আমি তাতেই সন্তুষ্ট। ওদের রাগিয়ে দিয়েছি, তাই এখন ওদের উপর আমার কোনও প্রভাব নেই, আমি কিছুই করতে পারব না। ওরা আমার কোনও কথাই শুনবে না। কিন্তু যদি আমি এইটুকু সমঝোতা করে নিই, তাহলে হয়তো ওরা খুশি হবে। তখন আমিও হয়তো ওদের বোঝাতে পারব, যেন অভিনয়টা খুব ছোট একটি পরিসরের মধ্যেই রাখা হয়। এটা কিন্তু অনেক বড় পাওনা হবে। আমার একমাত্র লক্ষ্য এটাই যে ব্যাপারটা যেন শুধুমাত্র মিসেস রাশওয়ার্থ আর গ্রান্ট পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তুমিই বলো, এটা কি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পাওয়া নয়?”

“হ্যাঁ, যদি সত্যিই সেটা হয়, তাহলে সেটা অনেক বড় প্রাপ্তি হবে।”

“তবুও দেখছি তুমি আমাকে পুরোপুরি সমর্থন করতে পারছ না। বলো তো, একই রকম বড় প্রাপ্তির জন্য এটা ছাড়া আর কী উপায় আছে?”

“না, আর কিছু তো আমার মাথায় আসছে না।”

“তাহলে আমাকে সমর্থন করো, ফ্যানি। তোমার সমর্থন ছাড়া আমি স্বস্তি পাচ্ছি না।”

“ওহ, এডমন্ড…”

“তুমি যদি আমাকে সমর্থন না করো, তাহলে আমার নিজের উপরই বিশ্বাস থাকবে না। কিন্তু... টমকে এভাবে চলতে দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। ও তো চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাকেই পাচ্ছে তাকেই অভিনয়ের জন্য রাজি করাতে চাইছে, সে যে-ই হোক, ভদ্রলোকের মতো দেখতে হলেই হলো! আমি তো ভেবেছিলাম, আর কেউ না হোক, তুমি অন্তত মেরির ভালো লাগা, খারাপ লাগার দিকটা আরও বেশি বুঝবে।”

“মেরি নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে, অনেকটা স্বস্তি পাবে”, একটু বেশি আন্তরিক শোনানোর চেষ্টা করল ফ্যানি।

“গতকাল রাতে তোমার সঙ্গে যেরকম মিষ্টি ব্যবহার করল, তাতে ওর প্রতি আমার মনে বিশেষ শ্রদ্ধা জন্মেছে। এর আগে ওকে কখনও এত ভালো লাগেনি আমার।”

“কাল রাতে সত্যিই খুব ভালো ব্যবহার করেছে। আমার খুব ভালো লাগছে যে ও এই ঝামেলা থেকে বেঁচে গেল…”

কিন্তু এতো উদার অনুভূতির কথা বলতে গিয়েও ফ্যানি থেমে গেল। ওর বিবেক ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিল। তবে এডমন্ড এতেই খুশি।

“সকালের প্রাতরাশ সেরেই আমি নিচে নেমে যাব। আমি ঠিক জানি যে এতে ওরা খুশিই হবে। তবে এখন আমি আর তোমাকে বিরক্ত করবো না ফ্যানি। তুমি নিশ্চয়ই পড়তে চাও। কিন্তু তোমার সঙ্গে কথা বলে একটা সিদ্ধান্তে না পৌঁছনো পর্যন্ত আমার ঠিক স্বস্তি হচ্ছিল না যেন। কাল সারারাত, সে আমি ঘুমিয়ে থাকি না জেগে থাকি, এই একটা বিষয়ই মাথায় ঘুরেছে। এটা খারাপই হচ্ছে বটে, কিন্তু আমি নিশ্চিত যে এতে যতোটা ক্ষতি হতে পারত, আমি সেই ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা হলেও কমাচ্ছি। টম যদি ঘুম থেকে উঠে গিয়ে থাকে, তাহলে এখনই ওর কাছে যাব আর ব্যাপারটা মিটিয়ে নেব। তারপর সকালের প্রাতরাশের সময় যখন সবাই একসঙ্গে হব, তখন আমরা সবাই একমত হয়ে বোকামি করার আনন্দে বেশ খুশি থাকব। আর তুমি নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে চিন ভ্রমণে বেরিয়ে পড়বে। লর্ড ম্যাকার্টনি কেমন এগোচ্ছেন? (এই বলে সে টেবিলের ওপর রাখা একটা বই খুলে দেখল, তারপর আরও কয়েকটা তুলে নিল।) “এই তো ক্র্যাবের Tales, আর The Idler—তোমার বড় বই পড়তে ক্লান্ত লাগলে এগুলো পড়ে মন বদলাতে পারবে। তোমার এই ছোট্ট গুছানো জায়গাটা আমার ভীষণ পছন্দ ফ্যানি। আমি চলে গেলে তুমি নিশ্চয়ই অভিনয়ের এইসব আজেবাজে ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে আরামে টেবিলে বসে পড়বে। তবে এখানে বসে ঠান্ডা লাগিও না যেন।”

এই বলে এডমন্ড তো চলে গেল। কিন্তু ফ্যানির পড়া মাথায় উঠল। চীন ভ্রমণ তো দূরের কথা, ওর মনে কোনো শান্তিও এলো না। এডমন্ড ওকে যা বলল, সেটা ওর কাছে সবচেয়ে অদ্ভুত, সবচেয়ে অবিশ্বাস্য, আর সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত। এখন আর অন্য কিছুই ওর মাথায় আসছে না। এত স্পষ্ট করে সবার সামনে এত আপত্তি তোলার পর এডমন্ড নিজেই অভিনয় করবে? এডমন্ড যে কী ভাবে আপত্তির কথা জানিয়েছে, কী ভাবে সবার দিকে তাকিয়ে থেকেছে, ওর মনের ভিতর কী চলছে সেসব দেখার পর, জানার পর এখন ফ্যানির একটা কথাই শুধু মনে হচ্ছে, এটাও কি সম্ভব? এডমন্ডের কাজে এতটা অসংগতি! এডমন্ড কি নিজেকেই ঠকাচ্ছে না? ও কি ভুল করছে না? ইশ, এসবই নির্ঘাত মেরির কারসাজি। এডমন্ডের প্রতিটি কথাতেই ফ্যানি মেরির প্রভাব টের পেয়েছে। আর তাতেই যেন ওর কষ্টটা আরও অসহ্য হয়ে উঠেছে। এর আগে পর্যন্ত নিজের আচরণ নিয়ে সন্দেহ আর দুশ্চিন্তা ফ্যানিকে অস্থির করে রেখেছিল কিন্তু এডমন্ডের কথা শোনার সময় সেসব কথা মাথা থেকে একেবারেই বেরিয়ে গিয়েছে। তবে এখন আর সেগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না ওর। এই নতুন, গভীর উদ্বেগ সবকিছুকে ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে। এখন যা হওয়ার হোক। শেষ পর্যন্ত কী হবে সেই নিয়ে ওর আর কোনও মাথাব্যথা নেই। মাসতুতো দাদা দিদিরা ওকে জোরাজোরি করতেই পারে, কিন্তু তাতে ওর কিচ্ছু যায় আসে না। ফ্যানি যেন ওদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। আর যদি শেষে বাধ্য হয়ে রাজি হতেও হয়, তাতে বা কী? এখন তো এমনিতেই সবকিছু ওর কাছে শুধুই দুঃখময়। 

প্রথম পর্বের লিংক

দ্বিতীয় পর্বের লিংক

তৃতীয় পর্বের লিংক

চতুর্থ পর্বের লিংক

পঞ্চম পর্বের লিংক 

ষষ্ঠ পর্বের লিংক

সপ্তম পর্বের লিংক

অষ্টম পর্বের লিংক 

নবম পর্বের লিংক 

দশম পর্বের লিংক 

একাদশতম পর্বের লিংক 

দ্বাদশতম পর্বের লিংক

 ত্রয়োদশতম পর্বের লিংক 

চতুর্দশতম পর্বের লিংক 

পঞ্চদশ পর্বের লিংক