জেন অস্টেনের ম্যান্সফিল্ড পার্ক - চতুর্দশ পর্ব
- 07 January, 2026
- লেখক: সুস্মিতা সরকার
(১৪)
এডমন্ড ভেবেছিল চাইলে দলের সবাই মিলে একটা উপযুক্ত নাটক খুব তাড়াতাড়ি খুঁজে নেবে। বাস্তবে দেখা গেল, ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়। বরং এই বিষয়ে ফ্যানি যেটা ভেবেছিল সেটাই সত্যি হতে দেখা গেল। সবার মন মতন হবে এমন নাটক খুঁজে পাওয়া খুব একটা সহজ হলো না। কাঠের মিস্ত্রিকে ডেকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হলো। সে এসে নানান মাপজোপ নিলো। দু একটা অসুবিধা বুঝে সে সব ঠিকও করে দিল। তবে পরিকল্পনা যে আরেকটু বড় করে করা দরকার আর সেজন্য যে আরও বেশি খরচ করতে হবে, সেটাও জানিয়ে দিল। কাঠ মিস্ত্রির কাজ তো শুরু হয়ে গেল, এদিকে কোন নাটক করা হবে সেটাই ঠিক করা গেল না তখনও পর্যন্ত! অন্যান্য প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছে। নর্থ্যাম্পটন থেকে সবুজ বেইজ কাপড়ের সুবিশাল এক রোল এসে হাজির হয়েছে। মিসেস নরিস সেই কাপড় কেটে দিয়েছেন। এই কাজে তিনি এতোটাই দক্ষ যে প্রয়োজন মতন কাপড় কেটে নেওয়ার পরেও প্রায় পৌনে এক গজ কাপড় বেঁচে গিয়েছে। মিসেস নরিসের কেটে দেওয়া সেই কাপড় দিয়ে বাড়ির কাজের মেয়েরা পর্দা বানানোও শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু ততদিনেও নাটক বেছে নেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয় নি। এভাবেই দিন দুই তিন কেটে গেল। অবস্থা দেখে এডমন্ডের মনে আশা জেগে উঠল যে শেষ পর্যন্ত তাহলে ওদের পছন্দমতন নাটক আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সত্যি কথা বলতে কী, এতো কিছু দেখা সত্যিই মুস্কিল। এতো গুলো মানুষ। সবাই খুশি হবে, সবার জন্য খুব ভালো চরিত্র থাকবে নাটকে, আর সব থেকে বড় কথা নাটকটাকে একই সঙ্গে বিয়োগান্তকও হতে হবে আবার কমেডি মানে মজার নাটকও হতে হবে। এদিকে নানা মুনির নানা মত। যতই উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে চেষ্টা করুক না কেন, সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্তে যে পৌঁছবে, দেখা গেল সে সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।
যারা চায় বিয়োগান্তক নাটক অভিনীত হোক তাদের মধ্যে আছে মারিয়া, হেনরি আর টমের বন্ধু জন। অন্যদিকে টম নিজে চায় মজার নাটক করা হোক। অবশ্য টম একা নয়, খুব ভদ্রতার মোড়কে গোপন রাখলেও মেরিরও যে মজার নাটক করার দিকেই পক্ষপাত তা বোঝা যাচ্ছে। টমের মনের দৃঢ়তা আর জোর এতোটাই যে আর কারোর সমর্থনের দরকার নেই ওর। একে তো নাটকের ধরণ কেমন হবে সেই নিয়েই মতবিরোধ। অন্যদিকে ওরা চায় এমন একটা নাটক যেটায় চরিত্র থাকবে খুব কম, কিন্তু প্রতিটি চরিত্র যেন একেবারে প্রথম সারির ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়। তিনজন প্রধান নারী চরিত্র থাকবে তাতে। Hamlet, Macbeth, Othello, Douglas, এমন কী The Gamester, সব নাটকই সবাই নেড়েচেড়ে দেখল, কিন্তু ট্র্যাজেডিপ্রেমীদের এগুলোর কোনওটাতেই মন উঠল না। The Rivals, The School for Scandal, Wheel of Fortune, Heir at Law এরকম আরও অনেক, অনেক নাটক নিয়ে আলোচনা হলো, কিন্তু সেসব নাটক নিয়ে তো আরও বেশি আপত্তি দেখা গেল। আর তাই একের পর এক সে সবই বাতিল হয়ে গেল। কেউ এমন একটা নাটকের নাম বলতে পারল না, যেটা নিয়ে কারোর আপত্তি নেই। কেউ একটা নাটকের নাম বলছে আর তার পরই কোনও না কোনও পক্ষ থেকে শোনা যাচ্ছে, “ধ্যাত, না, না, ওটা একেবারেই চলবে না। ওরকম হাউকাউ করা ট্র্যাজেডি চলবে না। বাবারে, এতো গুলো চরিত্র – মেয়েদের চরিত্রগুলো তো একেবারে অসহ্য, একটাও ভালো নয় – টম, আর যেটাই করা হোক, দয়া করে এটা বাদ দাও। ওটা কোনওমতেই করা যাবে না। কে করবে ওই চরিত্র শুনি? শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তো শুধুই ভাঁড়ামি। হাবিজাবি কিছু চরিত্র হিসেবে সেটা মানানসই হলেও আমার মতে ইংরেজি ভাষায় লেখা সবথেকে খাজা নাটক এটা। না, না, আমি ঝামেলা টামেলা করতে চাই না, সে তোমরা সবাই মিলে যেমন চাও তেমনই হবে, শুধু এটুকু বলতে চাই যে এর থেকে খারাপ আর কিছু বাছা সম্ভবই না।”
সবকিছু চুপচাপ দেখে, শুনে ফ্যানির তো বেশ মজাই লাগছে। যতই আড়াল করার চেষ্টা থাকুক না কেন, সবার মধ্যেই যে স্বার্থপরতা কাজ করছে সেটা দেখে ও ভাবছে শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে! যেহেতু ও নিজে কখনও আধখানা নাটকও দেখে নি, তাই যে কোনও একটা নাটক হলেই ওর ভালো লাগবে। কিন্তু যা পরিস্থিতি, সেটা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত টম বলল, “নাহ, এভাবে হবে না মোটেই। আমরা শুধুই সময় বরবাদ করছি। কিছু একটা ঠিক করতে হবে। যেটাই হোক, কিছু একটা বেছে নিতেই হবে আমাদের। সব কিছু নিয়ে এতো খুঁতখুঁত করলে চলবে না। চরিত্র বেশি হলেও ভয় পেলে চলবে না আমাদের। দরকার হলে একেকজনকে দুটো করে চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। সেরকম হলে আমাদের নাটকের মান একটু হলেও কম করতে হবে। কোনও চরিত্র সেরকম গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সেটা ফুটিয়ে তোলার মধ্যেই তো আসল কৃতিত্ব। এই মুহূর্ত থেকে আমি আর কোনো আপত্তি তুলছি না। তোমরা আমাকে যে চরিত্র দেবে, আমি সেটাই করব। শর্ত শুধু একটাই, সেটা কমেডি হতে হবে। নাটকটা একটা কমেডি হলেই চলবে, যে কোনও কমেডি, আর কিছু চাই না আমার।”
এবার টম আবার The Heir at Law নাটকের নাম প্রস্তাব করল। এই নিয়ে বোধহয় পাঁচবার ও এই একই নাটকের প্রস্তাব দিল। ও শুধু মনে মনে ভাবছে যে কোন চরিত্রটা ও নিজে অভিনয় করবে। Lord Duberley না কী Dr. Pangloss! সবাইকে খুব করে বোঝানোর চেষ্টা করল যে বাকি চরিত্রগুলোতে অনেক ট্র্যাজিক ব্যাপার স্যাপার আছে। কিন্তু সেকথা কেউ বুঝলে তো!
এই ব্যর্থ চেষ্টার পর যে নীরবতা নেমে এলো, সেটাও ভাঙল টম নিজেই। টেবিলে পড়ে থাকা বহু নাটকের বইয়ের একটাকে তুলে নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ সে চেঁচিয়ে উঠল, “Lovers’ Vows! রেভেনশ পরিবার যদি এটা করতে পারে, তাহলে আমরাই বা পারব না কেন শুনি? ইশ, এটা আগে কারোর মাথায় এলো না? আমার তো মনে হচ্ছে, এটা একদম ঠিকঠাক হবে। তোমরা কী বলো? এখানে জন আর হেনরির জন্য দুটো বেশ গুরুত্বপূর্ণ ট্র্যাজিক চরিত্র আছে। আবার ছড়া কেটে কথা বলা চাকরের চরিত্রটা আছে। যদি কেউ না করতে চায়, আমি আছি ওটা করার জন্য। চরিত্রটা ছোট, কিন্তু এরকম চরিত্র আমার অপছন্দের নয়। আর আগেই তো বলেছি, যে কোনও চরিত্র করতে রাজি আমি। আর যে চরিত্রটা করব, সেটাই আমি খুব মন দিয়ে করব। আর বাকি চরিত্রগুলো যার যেটা ইচ্ছে করলেই হলো। এই নাটকে Count Cassel আর Anhalt, এই দুটোই তো মূল চরিত্র।”
এই প্রস্তাবটা সবারই মোটামুটি পছন্দ হলো। কোনও কিছু ঠিক করতে না পেরে সবারই ক্লান্ত লাগছে। এখন টমের এই প্রস্তাব শুনে সবারই মনে হলো যে এর আগে কেউ এরকম কোনও প্রস্তাব করে নি, যেটা কমবেশি সবারই ভালো লেগেছে। বিশেষ করে টমের বন্ধু জন খুব খুশি। এক্লেসফোর্ডে এই নাটকের ব্যারন চরিত্রটা করার জন্য ও এতদিন হেদিয়ে মরছিল। লর্ড রেভেনশ যখন গলা ফাটিয়ে সংলাপ বলতেন, তখন হিংসেয় জ্বলে যেত ওর মন। এমন কী নিজের ঘরে গিয়ে সেই সংলাপগুলোই ও একা একা বলত। Baron Wildenhaimএর চরিত্রে অভিনয় করে ঝড় তুলে দেওয়াটাই ছিল ওর অভিনয় জীবনের চূড়ান্ত উচ্চাশা। এছাড়া ওর আরেকটা বড় সুবিধাও আছে। এই নাটকের অর্ধেক ওর মুখস্থ। তাই টম প্রস্তাব দেওয়া মাত্র ও এই নাটকে প্রস্তাবিত চরিত্রে অভিনয়ে রাজি হয়ে গেল সাগ্রহে। তবে জন যে প্রথমেই ওই ব্যারনের চরিত্র বাগিয়ে নিতে চাইল তা নয়। কারণ ওর মনে পড়ে গিয়েছে যে ফ্রেডরিক চরিত্রেও বেশ ভালো রকম চেঁচামেচি করার সুযোগ আছে। তাই সেই চরিত্রটা করতেও যে ও সমপরিমাণ আগ্রহ দেখাল, সেটা না বললে জনের প্রতি অবিচার করা হবে। হেনরিও ওই দুই চরিত্রের মধ্যে যে কোনও চরিত্র করতে রাজি। জন প্রথমে পছন্দ করে যে চরিত্র নেবে, সেটা বাদে বাকি চরিত্রটা হেনরি খুব আনন্দের সঙ্গেই করবে। এই নিয়ে দুজনে বেশ কিছুক্ষণ একে অপরকে তেল দিল। চরিত্র বাছা নিয়ে যখন জন আর হেনরি ‘পহেলে আপ, পহেলে আপ’ করে চলেছে তখন মারিয়া ওদের দুজনের কে কোন চরিত্রটা নেবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে এগিয়ে এল। মারিয়া নিজে আগাথা চরিত্রটা করতে চায়, আর সেই কারণেই জন আর হেনরির কে কোন চরিত্র করবে সেটা বেছে দেওয়ায় ওর আগ্রহ। মারিয়া বলল, এক্ষেত্রে উচ্চতা আর শরীরের গঠনটা বিবেচনা করা দরকার। আর যদি সেটা বিবেচনা করা হয়, তাহলে যেহেতু জন সবথেকে বেশি লম্বা, তাই ব্যারনের চরিত্র হিসেবে জনই সবথেকে বেশি মানানসই হবে। সবাই একবাক্যে মেনে নিল যে মারিয়ার কথায় যুক্তি আছে। সেই মতন জন আর হেনরি কে কোন চরিত্রে অভিনয় করবে সেটা ঠিক হয়ে গেল। মারিয়াও নিশ্চিন্ত হলো যে ফ্রেডরিক চরিত্রে উপযুক্ত লোককেই পাওয়া গিয়েছে। এভাবে আপাতত তিনটে চরিত্রে কে কে অভিনয় করবে সেটা ঠিক হয়ে গেল। মিস্টার রাশওয়ার্থকে নিয়ে অবশ্য কোনো চিন্তা ছিল না। মারিয়া আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিল যে তিনি যেকোনো চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি। এদিকে মনে মনে জুলিয়াও মারিয়ার মতোই আগাথা চরিত্রে অভিনয় করতে চায়। তাই মেরি এখানে উপস্থিত নেই, সেই বাহানায় নিজের ধান্দাবাজি শুরু করল।
“অনেকেই তো এই মুহূর্তে এখানে নেই। ওদের বাদ দিয়ে সব কিছু ঠিক করে নেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। এই নাটকে তো যথেষ্ট মেয়ে চরিত্রই নেই। মারিয়া আর আমি নাহয় এমেলিয়া আর আগাথার চরিত্র করলাম, কিন্তু হেনরি, তোমার বোন অভিনয় করবে এমন কোনও চরিত্র তো নেই নাটকে।”
হেনরি বলল এই নিয়ে খুব বেশি ভাবার দরকার নেই। কারণ ও একেবারে নিশ্চিত যে ওর বোনের একেবারেই ইচ্ছে নেই অভিনয় করার। আর আপাতত মেরি নিজেকে এই ব্যাপারে জড়াবে না। সুতরাং, যেহেতু অভিনয় করার ইচ্ছেই নেই, তাই এক্ষেত্রে ও না থাকলেও কোনও অসুবিধে নেই। হেনরি একথা বলল বটে, কিন্তু একথা শুনেই টম সঙ্গে সঙ্গে এর বিরোধিতা করল। ও বেশ জোর দিয়েই বলল, যদি মেরি অভিনয় করতে রাজি হয়, তাহলে এমেলিয়া চরিত্রটা ওরই করা উচিৎ, কারণ ওই চরিত্রে ওকেই সবথেকে বেশি মানাবে। “যেমন আগাথা চরিত্রটা আমার দুই বোনের যে কোনও একজনের জন্য মানানসই, ঠিক তেমনই এমেলিয়া চরিত্রটাও মেরির জন্য একদম মানানসই। যেহেতু এমেলিয়া চরিত্রটা বেশ মজার একটা চরিত্র, তাই মারিয়া বা জুলিয়ার থেকে মেরিকেই বেশি মানাবে।”
টমের কথায় সবাই একটু থমকে গেল। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে মারিয়া, জুলিয়া দুই বোনই চিন্তায় পড়ে গিয়েছে। দুজনেই মনে করছে আগাথা চরিত্রটা তারই প্রাপ্য। আবার দুজনেই নিজে মুখে না বলে মনে মনে এটাই চাইছে যে সেই কথাটাই অন্যরা জোর দিয়ে বলুক। ইতিমধ্যে হেনরি নিতান্তই অবহেলার সঙ্গে নাটকের বইটা হাতে নিয়ে প্রথম অংকটা পাতা উল্টে দেখতে শুরু করেছে। সেটা দেখতে দেখতেই আলগোছে বলে উঠল, “আমার মনে হয় জুলিয়ার এই আগাথা চরিত্রে অভিনয় না করাই ভালো হবে। সেক্ষেত্রে আমার গম্ভীর ভাবটা ধরে রাখতে পারব না। জুলিয়া, তুমি কিছুতেই, মানে কিছুতেই কিন্তু এই চরিত্রে অভিনয় করার কথা ভেব না। এরকম দুঃখী দুঃখী মুখের বিবর্ণ একটা চরিত্রে তোমাকে কিছুতেই দেখতে পারব না আমি। আমরা এতো হাসিঠাট্টা করেছি, সেসব কথা আমার মনে পড়ে যাবে। আর তখন ফ্রেডরিক তার থলে নিয়ে পালাতে পথ পাবে না।”
যতই ভদ্রতা আর হাসির মোড়কে বলা হোক না কেন, হেনরির বলা কথাগুলো জুলিয়াকে ভীষণ কষ্ট দিল। একঝলক মারিয়ার দিকে তাকিয়ে জুলিয়ার মনের কষ্টটা আরও বেড়ে গেল। ওর মনে হলো, এটা নির্ঘাত একটা চাল – পরিকল্পিত একটা চাল। ওকে বাদ দিয়ে মারিয়াকে বেছে নেওয়ার চাল। নিজের পছন্দের চরিত্র করতে পারবে সেই আনন্দ প্রকাশ করতে না চাইলেও লুকাতে পারছে না মারিয়া। মারিয়ার চাপা হাসি দেখেই সেটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। জুলিয়া কিছু বলার জন্য নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই এবার ওর নিজের দাদা ওর বিপক্ষে দল ভারি করল এই বলে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। মারিয়ারই আগাথা হওয়া দরকার। আগাথা চরিত্রের জন্য মারিয়াই সবথেকে বেশি উপযুক্ত হবে। সে জুলিয়া যতই বলুক যে বিয়োগান্তক নাটক ওর বেশি ভালো লাগে, আমি ওকে মোটেই বিশ্বাস করি না। জুলিয়ার মধ্যে দুঃখ টুক্ষের ব্যাপারটাই নেই একেবারে। ওকে দেখলেও দুঃখী দুঃখী মনে হয় না একদম। ওর চেহারাটাই এমন যে দুঃখের লেশমাত্র নেই সেখানে। হাঁটে হনহন করে, কথাও বলে তড়বড়িয়ে। ও ওর মুখে দুঃখী দুঃখী ভাবটা ধরে রাখতে পারবে না। বরং ওই যে গ্রামের কুঁড়ে ঘরে থাকে যে বুড়িটা, সেই চরিত্রটা ওর জন্য ভালো হবে। আমার মতে, ওই বুড়ির চরিত্রটা কিন্তু বেশ ভালো একটা চরিত্র। জুলিয়া, তুই বরং ওই চরিত্রটাই কর। ওই বুড়ি ওর অতিরিক্ত ভালমানুষ বরকে বেশ ভালোই সামলে রাখে। তুই ওই বুড়িটাই করবি।”
টমের কথা শুনে জন চেঁচিয়ে উঠল, “আরে, ধ্যাত, কী বলছিস কী! ওই বুড়িটা! ওটা আবার একটা চরিত্র হলো নাকি? সবথেকে তুচ্ছ, ফালতু আর গুরুত্বহীন একটা চরিত্র। পুরো নাটকে একটা ভালো সংলাপ পর্যন্ত নেই ওই বুড়ির মুখে। সেই চরিত্রটা করবে কী না তোর বোন! এটা বলাই তো ওকে অপমান করার সামিল। এক্লেসফোর্ডে তো এই চরিত্রটা ওই বাড়ির গভর্নেসের করার কথা ছিল। ওখানে আমাদের সবারই মনে হয়েছিল যে এরকম একটা চরিত্র কাউকেই করতে বলা যায় না। মিস্টার ম্যানেজার, একটু সবদিক বুঝে, সবার কথা ভেবে কথা বল! নিজের দলের সদস্যদের প্রতিভার মুল্য না বুঝতে পারলে কীসের ম্যানেজার তুই শুনি?”
“দেখ ভাই, আমার দল সত্যিকারের অভিনয় না করা পর্যন্ত একটু আধটু আন্দাজ তো করতেই হবে, তাই না? তবে জুলিয়াকে ছোট করার কোনও ধান্দা নেই আমার। যত যাই হোক, আমরা তো আর দুজনকে আগাথা করতে পারব না। আবার ওই গ্রামের কুঁড়েঘরে থাকা বুড়িটার চরিত্রও তো কাউকে না কাউকে করতেই হবে। এই যে আমাকেই দেখ না। আমি নিজেই তো ওই বুড়ো চাকরের চরিত্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকছি। ছোট একটা চরিত্রকে ভালো অভিনয়ের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলতে পারলেই তো বরং ওর অভিনয় দক্ষতা আরও বেশি ফুটে উঠবে। আর জুলিয়া যদি নেহাতই হালকা, মজার কোনও চরিত্র না করতে চায়, তাহলে ওই বুড়ির সংলাপ না বলে ওর বরটার সংলাপগুলো বলতে পারে। আমরা সেভাবে চরিত্রদুটো বদলে নিতে পারি। বুড়োটা যথেষ্ট গম্ভীর আর আবেগী। আর এই বদলে নাটকের কোনও তারতম্য কিছু হবে না। বুড়িটা যদি ওর বরের সংলাপগুলো বলে, তাহলে বুড়ো ওর বউয়ের সংলাপগুলো নাহয় বলবে। সেক্ষেত্রেও আমি তো খুব খুশি হয়েই ওই চরিত্রটা করতে পারি।”
হেনরি বলল, “দেখো, গ্রামের কুঁড়েঘরে থাকা ওই বুড়ির জন্য যতই দরদ থাকুক না কেন তোমার, ওই চরিত্রে তোমার বোনকে মোটেই মানাবে না। ও কিছু বলে না বলে ওর উপর এটা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। ওকে এই চরিত্রটা করতে দেওয়া যাবে না। ও ভদ্রভাবে সবার সঙ্গে সবকিছু মানিয়ে নেয় বলে ওর সঙ্গে এটা করা অন্যায় হবে। এমেলিয়া চরিত্রে বরং জুলিয়ার অভিনয় দক্ষতার বেশি প্রকাশ পাবে। আগাথা চরিত্রের থেকে এমেলিয়া চরিত্রটাকে ঠিকঠাক ফুটিয়ে তোলা বেশি কঠিন। আমার তো মনে হয় পুরো নাটকের মধ্যে এমেলিয়া চরিত্রটাই সবথেকে বেশি কঠিন। বাড়াবাড়ি না করেও এমেলিয়ার চঞ্চলতা আর সরলতা ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলতে হলে অভিনয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্মতা আর দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। অনেক ভালো ভালো অভিনেত্রীকে দেখেছি এই চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে সেরকম ভালো করে করতে পারে নি। সরলতা ব্যাপারটা পেশাদার অভিনেত্রীদের ধরাছোঁয়ার একেবারে বাইরে। তার জন্য অনুভূতির যে সূক্ষ্মতা থাকা দরকার সেটাই ওদের থাকে না। সেই সরলতা ফুটিয়ে তোলার জন্য দরকার একজন ভদ্রমহিলাকে। একজন জুলিয়া বার্ট্রামকে। কি, জুলিয়া, তুমি এমেলিয়া চরিত্রটা করবে তো?” এসব বলে হেনরি এমন অনুনয়ের দৃষ্টিতে জুলিয়ার দিকে তাকাল যে জুলিয়া সেই দৃষ্টিতে ঘায়েল না যায় কোথায়! তবে এর উত্তরে ও কী বলবে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এদিকে জুলিয়া ভাবছে কী উত্তর দেবে, আর ওদিকে এমেলিয়া চরিত্রের জন্য মেরি কতটা মানানসই হবে আবার সেকথা বলে উঠল টম।
“আরে না, না, জুলিয়া এমেলিয়া হলে চলবে না। ওকে একেবারেই মানাবে না। ওর ভালোও লাগবে না চরিত্রটা আর ভালো করে চরিত্রটা ফুটিয়েও তুলতে পারবে না। ও এতো লম্বা আর এতো মজবুত ওর গঠন। এমেলিয়া হবে রোগাপাতলা, ছোটখাটো গড়নের। বেশ মেয়েলি আর চঞ্চল। এই চরিত্রে মেরিকে, একমাত্র মেরিকেই মানাবে। ওর চেহারাটাই এই চরিত্রের সঙ্গে মানানসই আর আমি ঠিক জানি যে ও খুব ভালোভাবেই এই চরিত্রটা জীবন্ত করে তুলবে।”
টমের কথাকে পাত্তা না দিয়ে হেনরি জুলিয়াকে তেল দিয়েই চলল। “আমাদের অনুরোধ রাখতেই হবে তোমাকে। সত্যিই রাখতে হবে। আমি জানি, চরিত্রটা নিয়ে একটু নাড়াঘাঁটা করলেই তুমি বুঝতে পারবে যে এই চরিত্রটার জন্য তুমি কতটা উপযুক্ত। হতে পারে যে বিয়োগান্তক নাটক তোমার বেশি ভালো লাগে, তবে চরিত্রটা নাড়াঘাঁটা করলেই বুঝতে পারবে যে মজার হাসির নাটক নিজে তোমাকে বেছে নিয়েছে। একটা খাবারের ঝুড়ি হাতে নিয়ে তুমি আমার সঙ্গে গারদে দেখা করতে আসবে। কী, আসবে তো? তখন অস্বীকার করবে না তো তুমি? আমি তো এখনই যে দেখতে পাচ্ছি, তুমি খাবারের ঝুড়ি হাতে আমার সঙ্গে গারদে দেখা করতে আসছ।”
হেনরির এত তেল দেওয়ার কিছুটা হলেও প্রভাব হলো। জুলিয়া মনে মনে একটু দুর্বল হয়ে পড়ল। ব্যাপারটা কী? হেনরি ঠিক কী চাইছে? ও কি এটাই চাইছে যাতে জুলিয়া আপাতত একটু শান্ত হয় আর একটু আগের অপমানটা যেন ভুলে যায়? হেনরিকে একটুও বিশ্বাস নেই। একটু আগের অপমানটা বড্ড স্পষ্ট ছিল। নাকি হেনরি ওর সঙ্গে চালাকি করছে! জুলিয়া সন্দেহের চোখে মারিয়ার দিকে তাকাল। মারিয়ার চোখমুখের চেহারা দেখলেই সব কিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। ওর মুখে কি বিরক্তি বা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে? কই না তো! মারিয়ার মুখে অপার শান্তি আর তৃপ্তি। জুলিয়া খুব ভালো করেই জানে যে মারিয়া একমাত্র জুলিয়া কষ্ট পেলে তবেই খুশি হতে পারে। আর কিছু না ভেবে ও তাড়াহুড়ো করে উত্তর দিল। এমন কী উত্তর দিতে গিয়ে ওর গলাটাও কেঁপে উঠল, “সে কী হেনরি, তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না আমি খাবারের ঝুড়ি হাতে দেখা করতে গেলে নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখার ব্যাপারে তোমার একটুও চিন্তা হচ্ছে। যদিও তোমার একটু আগে বলা কথাটায় সেটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। নাকি শুধুমাত্র আমি আগাথা হলেই তোমার ওই ভয়টা হচ্ছিল!” কথাটা বলে জুলিয়া থেমে গেল আর ওর কথা শুনে হেনরি একেবারে বোকা বনে গেল। দেখে মনে হচ্ছে ও যে ঠিক কী উত্তর দেবে সেটা ওর মাথায় আসছে না। এবার টম আবার বলতে শুরু করল,
“মেরিই এমেলিয়া হবে। ওকেই ওই চরিত্রে দারুণ মানাবে।”
একথা শুনে রেগে গিয়ে তাড়াতাড়ি চেঁচিয়ে উঠল জুলিয়া, “দাদা, তুমি ভয় পেয়ো না। আমি এমেলিয়া চরিত্রটা মোটেই করতে চাইছি না। এটা তো ঠিক হয়েই গিয়েছে যে আমি আগাথা করছি না। আর আমি জানি যে অন্য কোনও চরিত্রই আমি করব না। তবে এমেলিয়া চরিত্রটার কথা যদি বলো – ওটা আমার কাছে পৃথিবীর সবথেকে জঘন্য একটা চরিত্র। আমার একেবারে পছন্দ নয়। একঘেয়ে, নিচু মনের, উদ্ধত, কৃত্রিম, বেয়াদপ একটা মেয়ে। আমি তো সবসময়ই বলি যে কমেডি আমার এক্কেবারে জঘন্য লাগে। আর এই এমেলিয়া তো কমেডি হিসেবেও অসম্ভব বিচ্ছিরি একটা চরিত্র।” কথাটা বলেই তাড়াহুড়ো করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল জুলিয়া। সব মিলিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো যে কারোর কারোর মনে অস্বস্তি হলো, তবে ফ্যানি ছাড়া করোর মনেই জুলিয়ার প্রতি বিশেষ সহানুভুতি জাগল না। ফ্যানি চুপচাপ সবকিছু দেখছিল। জুলিয়াকে এরকম হিংসায় জ্বলতে দেখে জুলিয়ার প্রতি ওর বেশ মায়াই হচ্ছিল।
জুলিয়া বেরিয়ে গেলে কিছুক্ষণের জন্য ঘরে নীরবতা নেমে এল। তবে একটু পরেই টম আবার কাজের কথায় ফিরে এল, আবার Lovers’ Vows নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কী রকম দৃশ্যপট লাগবে সেটা বোঝার জন্য জনের সাহায্য নিয়ে ও খুব আগ্রহের সঙ্গে নাটকটা দেখতে লাগল। এদিকে মারিয়া আর হেনরি নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করল। মারিয়া বলল, “আমি তো খুশি মনেই জুলিয়ার জন্য আগাথার চরিত্রটা ছেড়ে দিতে পারতাম। কিন্তু কি বলতো, হয়তো আমি খুব খারাপ অভিনয়ই করব, কিন্তু আমার মনে হয় ও সেটা আরও খারাপ করবে।” মারিয়ার মুখে একথা শুনে ও যেমন আশা করেছিল, হেনরি ঠিক ততোটাই প্রসংসায় ভরিয়ে তুলল মারিয়াকে।
এরকম কিছুক্ষণ চলার পর দলটা ভেঙে গেল। টম আর জন দুজনের এক সঙ্গে বেরিয়ে গেল সেই ঘরটায় আরও আলোচনা করার জন্য, যে ঘরটাকে এখন সবাই থিয়েটার বলতে শুরু করেছে। অন্য দিকে মারিয়া ঠিক করল গির্জা বাড়িতে গিয়ে নিজেই মেরিকে এমেলিয়া চরিত্রে অভিনয় করার কথাটা বলবে। সবাই চলে গেলে ফ্যানি একাই পড়ে রইল ওখানে।
একলা হওয়ার সুযোগে ফ্যানি যে নাটকটার কথা সে এতক্ষণ ধরে শুনে আসছে, সেটার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য প্রথমেই টেবিলে পড়ে থাকা বইটা তুলে নিল। ওর খুবই কৌতূহল হচ্ছে। খুব আগ্রহ নিয়ে নাটকটা পড়তে শুরু করল ও। মাঝে মাঝে শুধু এই ভেবে অবাক হয়ে থেমে যাচ্ছে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করে এই নাটক বেছে নেওয়া হলো! নিজেরা ব্যক্তগতভাবে নাটকে অভিনয় করা হবে, সেক্ষেত্রে এরকম একটা নাটকের নাম কেউ কী করে প্রস্তাব করতে পারে! আর সেই প্রস্তাব গৃহীতই বা হয় কী করে! এসব কী করে সম্ভব হলো! আলাদা আলাদা কারণে আগাথা আর এমেলিয়া, দুটো চরিত্রই বাড়িতে অভিনয় করার জন্য একেবারে অনুপযুক্ত বলে মনে হচ্ছে ওর। একজনের পরিস্থিতি আর অন্যজনের মুখের ভাষা, দুটোই এমন যে সভ্য ভদ্র কোনও মহিলার অনুপযুক্ত। ফ্যানি এটা বিশ্বাসই করতে পারছে না যে ওর মাসতুতো দিদিরা আদৌ বুঝতে পারছে যে ওরা ঠিক কী করতে চলেছে। ও মনেপ্রাণে চাইছে এডমন্ড যে আপত্তি জানাবে, তাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের ভুলটা যেন ভেঙে যায়।