জেন অস্টেনের ম্যান্সফিল্ড পার্ক - পঞ্চদশ পর্ব

(১৫)

অ্যামেলিয়া চরিত্রটা করতে হবে শুনে মেরি তো একবাক্যে রাজি। তারপর মারিয়া গির্জাবাড়ি থেকে ফেরার পর মিস্টার রাশওয়ার্থ এসে পৌঁছালেন। তখন আরেকটা চরিত্র নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, কাউন্ট ক্যাসেল আর আনহাল্ট, এই দুটো চরিত্রের কোনটা তিনি করতে চান। প্রথমে তো তিনি কিছুতেই মনস্থির করতে পারলেন না। তাই মারিয়ার কাছেই জানতে চাইলেন যে তিনি কোনটা করলে ভালো হয়। কিন্তু যখন তাকে দুটো চরিত্রের আলাদা আলাদা ধরণ আর কোনটা কেমন সেটা বুঝিয়ে বলা হলো তখন তার মনে পড়ে গেল যে লন্ডনে একবার এই নাটকটা তিনি দেখেছেন বটে। নাটকটা দেখে তখন আনহাল্টকে তার খুবই বোকাসোকা ধরণের মনে হয়েছে। তাই তিনি শেষ পর্যন্ত ক্যাসেল কাউন্টের চরিত্র বেছে নিলেন।

রাশওয়ার্থকে যত কম সংলাপ মুখস্থ করতে হবে, ততই ভালো। তাই মারিয়া তার এই সিদ্ধান্তে বেশ খুশি। তবে কাউন্ট আর আগাথার যেন একসঙ্গে অভিনয়ের দৃশ্য থাকে, রাশওয়ার্থের এই ইচ্ছাটার সঙ্গে একেবারেই একমত হতে পারল না মারিয়া। রাশওয়ার্থ ধীরে ধীরে নাটকের পাতাগুলো উল্টে কাউন্ট আর আগাথার একসঙ্গে অভিনয়ের কোনো দৃশ্য খুঁজছেন দেখে সে আর ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারল না। নিজ দায়িত্বে যে সব সংলাপ ছোট করা সম্ভব, সেগুলো কেটে-ছেঁটে ছোট করে দিল। সেই সঙ্গে চরিত্র অনুযায়ী তাকে কেমন সাজগোজ করতে হবে, আর কী রঙের পোশাক মানাবে তাও ঠিক করে দিল।

সাজসজ্জার ভাবনাটা রাশওয়ার্থ বেশ উপভোগই করছেন। যদিও বাইরে এমন ভান করছেন যেন এতে তার কিছুই যায় আসে না। সেজেগুজে তাকে কেমন দেখাবে সেই চিন্তায় তিনি এমনই মগ্ন যে আর কোনও কিছু নিয়ে ভাবার সময়ই পেলেন না। খারাপ লাগা বা কিছু ভেবে নেওয়া কিছুই করলেন না তিনি। ফলে তার তরফ থেকে যেরকম প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য মারিয়া কিছুটা তৈরি হয়েই ছিল, সেসব কিছুই ঘটল না।

এডমন্ড সারাটা সকাল বাইরে ছিল, তাই এসব কিছুই তার জানা নেই। কিন্তু দুপুরের খাবারের আগে সে যখন বসার ঘরে ঢুকল, তখন টম, মারিয়া আর জনের মধ্যে আলোচনা তুঙ্গে। এডমন্ডকে দেখে মিস্টার রাশওয়ার্থ খুব তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে আনন্দের খবরটা তাকে জানালেন।

“যাক বাবা, কোন নাটকটা করা হবে, শেষ পর্যন্ত সেটা ঠিক করে ফেলেছি আমরা। Lovers’ Vows। আমি কাউন্ট ক্যাসেলের চরিত্রটা করব। প্রথমে নীল জামা আর গোলাপি সাটিনের চাদর পরে ঢুকব, আর পরে শিকারের পোশাকের মতো আরেকটা ঝকঝকে সাজ থাকবে। আমি শুধু এটা বুঝতে পারছি না, আমাকে ঠিক কেমন দেখাবে।”

ফ্যানির চোখ এডমন্ডের দিকেই ছিল। মিস্টার রাশওয়ার্থের কথা শুনে আর এডমন্ডের মুখের ভাব দেখে ওর বুক কেঁপে উঠল। ও বুঝে গেল যে এডমন্ড এখন ঠিক কী ভাবছে।

Lovers’ Vows!”—চরম বিস্ময়ের সুরে শুধু এটুকুই বলল এডমন্ড। তারপর ঘুরে ভাই বোনদের দিকে তাকাল, যেন এখনও আশা করছে যে কেউ বলবে ওরা ফাজলামি করছে।

জন বলে উঠল, “হ্যাঁ, অনেক তর্কবিতর্ক আর ঝামেলার পর বোঝা গেল আমাদের জন্য Lovers’ Vows-এর চেয়ে ভালো আর কোনও নাটক হতেই পারে না। এত নির্দোষ আর মানানসই আর কোনো নাটক হয় না। এটা যে আগে কেন মাথায় এল না, সেটা ভেবেই অবাক লাগছে! আমার বোকামিটা সত্যিই বিশাল। কারণ এক্লেসফোর্ডে যা যা দেখেছিলাম এখানে তো আমরা তার সব সুবিধাই পাচ্ছি। একটা নমুনা থাকলে যে কত কাজে লাগে! প্রায় সব চরিত্রই ভাগ হয়ে গিয়েছে।”

মারিয়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে এডমন্ড জানতে চাইল, “তা, মেয়েদের চরিত্রগুলো নিয়ে কী করা হবে শুনি?”

উত্তর দিতে গিয়ে নিজের অজান্তেই লাল হয়ে গেল মারিয়া। “আমি সেই চরিত্রটা করব যেটা লেডি রেভেনশ করবেন বলে ঠিক করা হয়েছিল।” তারপর একটু সাহসী চোখে তাকিয়ে বলল, “মেরি করবে এমেলিয়া চরিত্রটা।”  

“আমাদের মতো লোকজন দিয়ে যে এত সহজে এই নাটকের সব চরিত্র পূরণ হয়ে যাবে, আমি সেটা ভাবতেই পারিনি।” কথাটা বলতে বলতে এডমন্ড আগুনের পাশে, যেখানে তার মা, নরিস মাসি আর ফ্যানি বসে ছিল, সেখানে গিয়ে খুব বিরক্ত মুখে তাদের পাশে বসে পড়ল।

মিস্টার রাশওয়ার্থও তার পিছু নিলেন আর বললেন, “আমাকে তিনবার মঞ্চে ঢুকতে হবে, আর আমার মুখে বিয়াল্লিশটা সংলাপ আছে। সেটাও তো কম নয়, তাই না? তবে এত সাজগোজের ব্যাপারটা আমার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। নীল জামা আর গোলাপি সাটিনের চাদর গায়ে চড়িয়ে আমি নিজেই নিজেকে চিনতে পারব কিনা কে জানে।”

এডমন্ডের কাছে এই কথার কোনও উত্তর নেই। মিনিট কয়েক পর কাঠমিস্ত্রির কিছু প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য টমকে ডাকা হলো। জনের সঙ্গে টম ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আর একটু পরেই মিস্টার রাশওয়ার্থও বেরিয়ে গেলেন। তখনই সুযোগ পেয়ে এডমন্ড বলল, “এই নাটকের বিষয়ে আমার ঠিক কী মনে হচ্ছে জনের সামনে সেটা আমি বলতে পারছি না। তাতে ওর এক্লেসফোর্ডের বন্ধুদের বিষয়ে একটু বিরূপ মন্তব্য করা হয়ে যায়। কিন্তু মারিয়া, এখন আর সেটা না বলে পারছি না আমি। তুই একটু ভেবে দেখ ঘরোয়া অভিনয়ের জন্য এই নাটকটা একেবারে অনুপযুক্ত। আমার মনে হয় এটা বাদ দিলেই ভালো হয়। আমার তো মনে হয় নাটকটা ভালো করে পড়ে দেখলেই তুই বুঝতে পারবি যে কেন আমি একথা বলছি। বেশি কিছু না, শুধুমাত্র প্রথম অংকটাই একবার মা বা নরিস মাসি, যে কোনও একজনের কাছে জোরে জোরে পড়ে শোনা, তাহলেই বুঝতে পারবি যে এই নাটকটা আদৌ করা ঠিক হবে কি না। আমি নিশ্চিত, তারপর আর তোকে বাবার মতামতের জন্য ভাবতে হবে না।”

কথাটা শুনেই মারিয়া হইহই করে বলে উঠল, “দেখ, এই ব্যাপারে তোর আর আমার দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে আলাদা। তুই নিশ্চিন্ত থাকতে পারিস, নাটকটা আমি খুব ভালো করেই পড়ে দেখেছি। কিছুটা বাদছাদ দিলে আর কিছুটা অদলবদল করে নিলেই এই নাটক নিয়ে আপত্তির আর কিছু থাকবে বলে আমার মনে হয় না। আর এমন তো নয় যে আমিই একমাত্র একজন তরুণী যে মনে করছে এই নাটকটা ঘরোয়া অভিনয়ের জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত!”

এডমন্ড উত্তর দিল, “সেটাই তো খারাপ লাগছে আমার। কিন্তু এই ব্যাপারে এগিয়ে গিয়ে তোকেই উদাহরণ হয়ে উঠতে হবে। আর সবাই যখন ভুল করছে, তখন সত্যিকারের আভিজাত্য কাকে বলে সেটা দেখিয়ে তোকেই তো তাদের আবার ঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। সব দিক থেকেই তোর আচরণ যেন সবার কাছে অনুকরণীয় হয়ে ওঠে।”

যেহেতু যে কোনও ব্যাপারে আগ বাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া স্বভাব, তাই এডমন্ডর কথাগুলো মারিয়ার উপর বেশ প্রভাব ফেলল। এবার ও একটু নরম হয়ে বলল, “কথাটা তুই অবশ্য ঠিকই বলেছিস। আমি জানি, তুই আমাদের ভালো ভেবেই বলেছিস । কিন্তু তারপরেও আমার মনে হচ্ছে তুই একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছিস। আর এরকম কিছু নিয়ে আমি মোটেই সবাইকে বক্তৃতা দেওয়ার দায়িত্ব নিতে পারব না। সেটা বাড়াবাড়ি রকমের বেমানান দেখাবে।”

“তোর এটা মনে হচ্ছে কেন যে তুই এরকম কিছু করবি বলে আমি ভাবছি? মোটেই না। তোর আচরণই হবে তোর বক্তব্য। তুই এটা তো বলতেই পারিস যে তোর চরিত্রটা ভালো করে পড়ার পর তুই বুঝতে পারছিস ওই চরিত্রটা তোর জন্য কতটা বেমানান। তুই বলতে পারিস যে এই চরিত্রটা করার জন্য যে পরিমাণ পরিশ্রম করার ইচ্ছে আর আত্মবিশ্বাস দরকার ততোটা তোর নেই। শুধু এটুকুই বল, আর জোর দিয়ে বল। তাহলেই হবে। যারা বোঝার তারা ঠিকই তোর কথার পিছনে আসল কারণটা বুঝতে পারবে। সেক্ষেত্রে নাটকটাও বাতিল হবে আর তোর সংযমের যথাযোগ্য সম্মানও রক্ষা পাবে।”

লেডি বার্ট্রাম বললেন, ‘মা, বেমানান কোনও কাজ করিস না যেন। তোর বাবা কিন্তু সেটা মোটেই পছন্দ করবেন না। আচ্ছা ফ্যানি, ঘণ্টিটা বাজিয়ে দে তো এবার। খুব খিদে পেয়েছে, এবার রাতের খাবারটা না খেলেই নয়। জুলিয়া নিশ্চয়ই এতক্ষণে তৈরি হয়ে গিয়েছে।”

“মা, আমি খুব ভালো করেই জানি যে বাবা এই নাটকটা মোটেই পছন্দ করবেন না”, ফ্যানিকে থামিয়ে দিয়ে এডমন্ড বলল।

“ব্যস, তাহলে আর কী! মারিয়া, এডমন্ড যা বলল কানে গেল তোর?”

“আমিও খুব ভালো করেই জানি যে যেই আমি বলব যে আমি এই চরিত্রটা করব না, অমনি জুলিয়া একেবারে লুফে নেবে চরিত্রটা”, মারিয়া মরিয়া হয়ে বলে উঠল। 

চেঁচিয়ে উঠল এডমন্ড, “কী! চরিত্রটা তুই নিজে কেন ছেড়ে দিচ্ছিস জানার পরেও?”

“আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ। ও ভাবতে পারে যে ওর আর আমার পরিস্থিতি আলাদা। আমার যতোটা সংযম দেখানো প্রয়োজন, ওর ততোটা না দেখালেও চলবে। আমি খুব ভালো করেই জানি যে ও নির্ঘাত এই যুক্তিটাই দেবে। না রে এডমন্ড, তুই আমাকে মাফ কর। কথা দিয়ে কথা ফিরিয়ে নিতে পারব না আমি। ব্যাপারটা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সবাই খুব হতাশ হয়ে পড়বে। টম তো রাগই করবে। আর আমরা যদি এতই খুঁতখুঁতে হই, তাহলে কখনোই কোনো নাটক করা হবে না।”

এবার মিসেস নরিস বলে উঠলেন, “এক্ষুনি আমিও ঠিক এই কথাটাই বলতে যাচ্ছিলাম। সব নাটক নিয়েই যদি খুঁতখুঁত করা হয়, তাহলে তো কোনটাই করা হবে না। সেক্ষেত্রে এতো কিছুর যে আয়োজন, এত খরচ, সব জলে যাবে। সেটা যে আমাদের সবার জন্যই লজ্জার হবে, তাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই। নাটকটা আমি পড়ি নি ঠিকই, কিন্তু যেমন মারিয়া বলছে, যদি সেরকম বাড়াবাড়ি কিছু থাকে, যেটা কিনা সব নাটকেই কমবেশি থাকে, তাহলে সেসব জায়গাগুলো বাদ দিয়ে দিলেই তো ঝামেলা চোকে। এত খুঁতখুঁতে হলে চলে না এডমন্ড। এই নাটকে মিস্টার রাশওয়ার্থও তো অভিনয় করছে, তাহলে আর অসুবিধে কীসের?

“আমার শুধু একটাই আফসোস হচ্ছে যে কাঠমিস্ত্রি কাজ করা শুরু করার আগে যদি টম সব কিছু ভেবে মনস্থির করে নিতে পারত, তাহলে পাশের দরজাগুলো নিয়ে এই যে অর্ধেক দিনের কাজ হলো, সেটা নষ্ট হতো না। তবে পর্দাটা বেশ ভালোই হবে। কাজের মেয়েগুলো খুব সুন্দর কাজ করছে, আর আমার মনে হয় বেশ কয়েক ডজন রিং ফেরত দেওয়া যাবে। এত কাছাকাছি লাগানোর দরকার নেই। আশা করি জিনিসপত্র ঠিকঠাক কাজে লাগিয়ে অপচয় কমানোর কাজে কিছুটা হলেও কাজে আসতে পারছি আমি। এইসব বাচ্চাবাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর মাথার উপর একজন স্থির মস্তিস্কের লোক থাকা খুব দরকার।

“আরে হ্যাঁ, আজকে কী হয়েছে সেটা তো টমকে বলতে ভুলেই গিয়েছি আমি। আজ মুরগির খোঁয়াড়ের দিকে দেখাশোনা করছিলাম। সেখান থেকে বেরোচ্ছি, এমন সময় মনে হলো কে যেন আসছে। তাকিয়ে দেখি ডিক জ্যাকসন, হাতে দু’টুকরো কাঠ নিয়ে সোজা কাজের লোকদের ঘরের দরজার দিকে যাচ্ছে। ওর বাবার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। নির্ঘাত ওর মা বলে পাঠিয়েছে, তাই ওর বাবা ওই কাঠের টুকরো দুটো আনতে বলেছে এই বলে যে ওর কাঠের টুকরো দুটো ওর না হলেই নয়। আমি তো সঙ্গে সঙ্গে সব বুঝে গেলাম। ও নির্ঘাত ভিতরে গিয়ে রাতের খাবার খাবে। কারণ ঠিক সেই সময় চাকরবাকরদের রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ঘণ্টি বাজছিল মাথার উপর। আমি তো সবসময় বলি যে এই জ্যাকসন পরিবারটার লোকজন বড্ড ধান্দাবাজ। এরা সবসময় যতোটা পারে বাগিয়ে নেওয়ার ধান্দায় থাকে। আর এরকম উটকো ধান্দাবাজ লোকজন আমার একদম দু-চক্ষের বিষ। তাই ছেলেটাকে সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘ডিক, কাঠের টুকরো দুটো আমাকে দে, আমিই তোর বাবাকে দিয়ে দেব। তুই বরং যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এখনই বাড়ি ফিরে যা।‘ ছেলেটা এমনিতেই যথেষ্ট বড় হয়েছে। বছর দশেক বয়স। একটু হাবাগোবা ধরনের। তবুও ওর নিজেরই লজ্জা পাওয়া উচিৎ। আমার কথা শুনে বোকার মতন আমার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আর একটাও কথা না বাড়িয়ে উল্টোদিকে হাঁটা লাগাল। হয়তো আমি একটু বেশিই কড়া গলায় কথাটা বলে ফেলেছি। তবে আমার মনে হয় এতে ওর এই বাড়িতে ঘুরঘুর করে সুযোগ নেওয়ার অভ্যাসটা কিছুদিনের জন্য হলেও কমবে। এমন লোভ দেখলে গা জ্বলে যায় আমার। বিশেষ করে যখন তোমার বাবা ওদের পরিবারটার জন্য সবসময় এত কিছু করেন, সারা বছর লোকটাকে কাজ দেন!”

কেউই আর উত্তর দেওয়ার ঝামেলায় গেল না। একটু পর বাকিরাও ফিরে এল, আর এডমন্ড বুঝল, সবাইকে ঠিক পথে আনার চেষ্টা করেছিল, এখন এটুকুই ওর একমাত্র সান্ত্বনা।

রাতের খাওয়াটা বেশ থমথমে পরিবেশে শেষ হলো। মিসেস নরিস আবার ডিক জ্যাকসনের ওপর নিজের ‘জয়’-এর গল্প শোনালেন, কিন্তু নাটক বা প্রস্তুতির কথা আর তেমন উঠল না। মুখে স্বীকার না করলেও এডমন্ডের আপত্তির ভাবটা এমন যে টমও সেটা টের পাচ্ছে। মারিয়াও হেনরির উচ্ছ্বাসভরা সমর্থন না পেয়ে বিষয়টা এড়িয়ে চলাই ভালো মনে করল। জন জুলিয়াকে খুশি করার চেষ্টা করলেও জলিয়ার মনমরা ভাবটা কোনো কথাতেই কাটছে না। বরং ও দল ছেড়ে চলে গেছে, জনের এই আক্ষেপের কথাতেই জুলিয়া সবচেয়ে বেশি অনীহা দেখাচ্ছে। এদিকে মিস্টার রাশওয়ার্থের মাথায় তো শুধু নিজের চরিত্র আর নিজের পোশাক। আর এই দুটো নিয়ে যা বলার ছিল, সব কিছু তিনি আগেই বলে ফেলেছেন।

তবে নাটকের আলোচনা মাত্র এক দু’ঘণ্টার জন্যই থামল। এখনও অনেক কিছু ঠিক করা বাকি রয়েছে। সন্ধ্যার ফুরফুরে মেজাজ নতুন সাহস এনে দিল। তাই আবার ড্রইংরুমে জড়ো হওয়া মাত্র টম, মারিয়া আর জন আলাদা একটা টেবিলে দল বেঁধে বসে পড়ল, সামনে খোলা নাটকের বই। ওরা সবাই সবেমাত্র গভীর আলোচনায় ঢুকতে যাচ্ছে, এমন সময় মেরি আর হেনরি এসে হাজির হলো। এতে ওদের গভীর আলোচনায় বাধা পড়লেও এই বাধাটা ওদের খুব খুশি করে তুলল। রাত হয়ে গিয়েছে, বাইরে অন্ধকার আর কাদা জল, তবু ওরা না এসে থাকতে পারে নি। সবাই খুব আনন্দের সঙ্গে ওদের স্বাগত জানাল।

“তারপর, তোমাদের সবকিছু কেমন চলছে?” “শেষ পর্যন্ত কী ঠিক হলো?” “আরে, তোমাদের বাদ দিয়ে কি কিছু হয় নাকি?” মেরি আর হেনরিকে স্বাগত জানানোর পরই এসব নানান কথাবার্তা শুরু হয়ে গেল। হেনরি দ্রুত বাকি তিনজনের সঙ্গে টেবিলে বসে পড়ল, আর অন্যদিকে মেরি লেডি বারট্রামের কাছে গিয়ে হাসিমুখে তাঁকে তেল দিয়ে কথা বলতে শুরু করল। “যাক বাবা, শেষ পর্যন্ত একটা নাটক বেছে নেওয়া গিয়েছে। আপনি যে কতো ধৈর্য নিয়ে আমাদের সব হইচই আর ঝামেলা সহ্য করেছেন, সে আর বলার নয়। আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি আপনি কতটা বিরক্ত হয়েছেন আমাদের এত চেঁচামেচি আর মত বিরোধে। একটা সিদ্ধান্তে যে পৌঁছনো গিয়েছে তাতে অভিনয় যারা করবে তারা তো খুশিই হবে, কিন্তু দর্শকদের স্বস্তি আরও বেশি। তাই আমি মন থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি ম্যাডাম; আর মিসেস নরিসকেও, আর এই অবস্থায় থাকা সবাইকেই,” বলতে বলতে ও ফ্যানির পাশ দিয়ে এডমন্ডের দিকে কিছুটা ভয় কিছুটা দুষ্টুমিভরা দৃষ্টিতে তাকাল।

লেডি বারট্রাম ভদ্রভাবে তার কথার জবাব দিলেন, কিন্তু এডমন্ড কিছুই বলল না। সে যে শুধু দর্শক হিসেবেই আছে, এ কথা অস্বীকারও করল না। আগুনের পাশে বসা সবার সঙ্গে মিনিট কয়েক গল্পগুজব করে মেরি আবার নাটক নিয়ে আলোচনার টেবিলে ফিরে গেল। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সাজসজ্জার কথা মন দিয়ে শুনতে শুনতে হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়ে গেছে, এমন ভঙ্গিতে বলে উঠল, “বন্ধুরা, তোমরা তো খুব শান্তভাবে এসব কুটির আর সরাইখানার ভেতর বাইরের সাজ নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, কিন্তু এর মধ্যেই দয়া করে আমার ভাগ্যটা ঠিক করে দাও। আনহাল্ট কে হবে? তোমাদের মধ্যে কোন ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার প্রেম করার সৌভাগ্য হবে?”

কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। তারপর সবাই মিলে একসঙ্গে একই দুঃখের কথা বলল। এখনও আনহাল্টের জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। “মিস্টার রাশওয়ার্থ কাউন্ট ক্যাসেল হবেন বলে ঠিক হয়েছে, কিন্তু আনহাল্টের দায়িত্ব কেউ নেয়নি।”

মিস্টার রাশওয়ার্থ বললেন, “আমার কাছে দুটো চরিত্রই ছিল, যে কোনও একটা নিতেই পারতাম। কিন্তু চরিত্র হিসেবে আমার কাউন্টটাই বেশি ভালো লেগেছে। যদিও এত সাজগোজের ব্যাপারটা আমার খুব একটা যুতের লাগছে না।”

তাই শুনে মেরি হাসিমুখে বলে উঠল, “আমি জানি আনহাল্ট চরিত্রটার জন্য অনেক বেশি খাটাখাটনি করতে হবে। ভালোই করেছেন যে আপনি খুব বুদ্ধিমানের মতো কাউন্ট চরিত্রটা বেছে নিয়েছেন।”

“কাউন্ট চরিত্রটাও অত সহজ কিছু নয়। গোটা বিয়াল্লিশটা সংলাপ আছে কাউন্টের মুখে”, উত্তর দিলেন মিস্টার রাশওয়ার্থ।

একটু চুপ করে থেকে মেরি বলল, “আনহাল্ট করার জন্য এখনও কাউকে পাওয়া যায় নি, তাতে আমি একটুও অবাক হচ্ছি না। এমেলিয়া ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য নয়। ওর মতন অতিরিক্ত সাহসী মেয়ে হলে পুরুষরা ভয় পাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।”

টম জোর গলায় বলল, “পারলে আমিই চরিত্রটা করতাম, খুব খুশি হয়েই করতাম। কিন্তু এমনই কপাল! চাকরটা আর আনহাল্ট দুজনেই একই সঙ্গে মঞ্চে আসে। তবে একেবারে হাল ছেড়ে দিচ্ছি না আমি। পুরো ব্যাপারটা আবার ভালো করে খতিয়ে দেখব। দেখা যাক, কী করা যায়।”

জন নিচু গলায় বলল, “তোমার ভাইই তো চরিত্রটা করতে পারে। নাকি তোমার মনে হচ্ছে ও পারবে না?”

“আমি ওকে বলব না”, ঠাণ্ডা আর দৃঢ় গলায় বলল টম।

মেরি কিছুক্ষণ একথা সেকথা বলার পর আবার আগুনের ধারে বসে থাকা সবার সঙ্গে যোগ দিল। “নাহ, ওরা আমাকে চায় না মোটেই। আমাকে দেখলে ওরা আরও ঘেঁটে যায়। বেশি বেশি ভদ্রতা দেখাতে শুরু করে। এডমন্ড তুমি তো নিজে অভিনয় করছ না। তুমিই বরং ভালো বলতে পারবে। তাই তোমাকেই জিজ্ঞাসা করছি। এই আনহাল্টের কী ব্যবস্থা করা যায় বলো তো? তোমার কি মত?”

“আমার মত? আমার মতে এই নাটকটাই বরং বদলে ফেলো”, এডমন্ড শান্ত গলায় জবাব দিল।

“তাতে আমার মোটেই আপত্তি নেই। সবকিছু ঠিকঠাক চললে এমেলিয়া চরিত্রটা করতে যে আমার খুব একটা যে খারাপ লাগবে, তা নয়। কিন্তু আমার জন্য কারোর অসুবিধে হলে সেটা আমার মোটেই ভালো লাগবে না। তবে যেহেতু ওই টেবিলের ওরা তোমার মতামত শুনতে চায় না, তাই তুমি কিছু বললেও ওরা সেটা শুনবে না।“ চারিদিকে তাকিয়ে মেরি উত্তর দিল।

এডমন্ড আর কিছুই বলল না।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটু দুষ্টুমির গলায় মেরি আবার বলল, “যদি কোনোও চরিত্র তোমাকে অভিনয়ে টানতে পারে তাহলে সেটা নিশ্চয়ই আনহাল্ট, কারণ সে তো একজন যাজক।”

“ঠিক সেই কারণেই বরং আমার ইচ্ছে হবে না। খারাপ অভিনয় করে চরিত্রটাকে হাস্যকর বানাতে চাই না। আনহাল্ট একজন গম্ভীর স্বভবের মানুষ। তাঁকে রীতিনীতি মেনে চলছেন, সবসময় নানান উপদেশ দিচ্ছেন এরকম ছাড়া আর অন্য কোনও ভাবে দেখানো সম্ভবই না। আর যে মানুষটা নিজেই এই পেশা বেছে নিয়েছে, হতে পারে সেই মানুষটাই মঞ্চে সেটা দেখাতে সবার চেয়ে কম আগ্রহী হবে।”

মেরির মুখে আর কথা ফুটল না। একটু রাগ করে আর লজ্জা পেয়ে চেয়ারটা চা-টেবিলের কাছে টেনে নিল। তারপর মিসেস নরিসের কথায় মন দিল। ওখানে মিসেস নরিস তখন একাই রাজত্ব করছেন।

এদিকে অন্য টেবিল যেখানে জোর আলোচনা চলছে সেখান থেকে টম ডাকল, “ফ্যানি, তোমাকে আমাদের একটু সাহায্য করতে হবে যে!”

সেই শুনে ফ্যানি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। ভাবল হয়তো আবার কোনো কাজ দেওয়া হবে, কারণ এডমন্ড যতই চেষ্টা করুক না কেন, সবার তাকে এভাবে ব্যবহার করার অভ্যাসটা এখনও পুরো কাটেনি।

“ওহ না, না, তোমাকে উঠে দাঁড়াতে হবে না। এক্ষুনি তোমার কিছু করতে হবে না। আসলে আমরা চাই তুমি এই নাটকে অভিনয় করো। ওই যে কুঁড়ে ঘরে বাস করে যে লোকটা, তোমাকে তার স্ত্রী হিসেবে অভিনয় করতে হবে।”

“আমি!” ফ্যানি ভয়ে চমকে আবার বসে পড়ল। “না না, দয়া করে আমাকে ছাড় দাও। দুনিয়ার সব কিছু দিলেও আমি অভিনয় করতে পারব না। সত্যি, অভিনয় টভিনয় আমার দ্বারা হয় না।”

“কিন্তু তোমাকে পারতেই হবে। আমরা তোমাকে ছাড় দিতে পারব না। এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। চরিত্রটা প্রায় কিছুই না, মোটে পাঁচ-ছয়টা সংলাপ। তুমি কী বলছ কেউ সেটা কেউ না শুনতে পেলেও খুব একটা কিছু যায় আসে না, তাই ইচ্ছেমতো লাজুক থাকতে পারো। কিন্তু তোমাকে আমাদের দরকার, অন্তত দেখার জন্য হলেও।”

“পাঁচ-ছয়টা সংলাপে যদি তোমার ভয় লাগে, তাহলে আমার মতো চরিত্রে কী করতে? আমাকে তো বিয়াল্লিশটা মুখস্থ করতে হবে!” মিস্টার রাশওয়ার্থ বলে উঠলেন।

“মুখস্থ করতে ভয় পাচ্ছি তা নয়। কিন্তু সত্যিই অভিনয় করতে পারি না আমি”, প্রায় সবাই ওর দিকেই তাকিয়ে আছে আর একমাত্র ওই কথা বলছে, সেটা দেখে ফ্যানি আরও অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

“আরে, যতটুকু যা করতে পারবে, আমাদের জন্য সেটাই যথেষ্ট। তুমি শুধু তোমার অংশটা মুখস্থ করো, বাকিটা আমরা সব শিখিয়ে পড়িয়ে নেব। তোমার মাত্র দুটো দৃশ্য আছে, আর যেহেতু আমিই ওই কুঁড়ে ঘরে থাকা লোকটার চরিত্র করব, তাই তোমাকে মঞ্চে ঢুকিয়ে দেওয়া বা এদিক-ওদিক যেখানে পাঠানোর সবটাই করব। আমার মনে হয় তুমি সবটা খুব ভালো করেই করতে পারবে।”

“না, না, সত্যি বলছি মিস্টার বারট্রাম, আমাকে মাফ করতেই হবে। তুমি বুঝতেই পারছ না। এটা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। যদি আমি রাজিও হই, শেষে তোমাদের লজ্জায় পড়তে হবে।”

“আরে ধুর! ধুর! এত লজ্জা পেও না তো। তুমি খুব ভালোই করবে। তোমার জন্য সব রকম ছাড় দেওয়া হবে। এমন তো নয় যে আমরা নিখুঁত অভিনয় আশা করছি। তোমাকে একটা বাদামি গাউন, সাদা এপ্রন আর মাথায় সাদা টুপি পরাতে হবে। তারপর মুখে একটু ভাঁজ আর চোখের কোণে সামান্য কাকের পায়ের মতো দাগ এঁকে দিলেই তুমি একেবারে ঠিকঠাক ছোটখাটো বুড়ি বনে যাবে।”

“না, না। আমাকে ছেড়ে দাও। সত্যি বলছি, আমাকে ছেড়ে দিতেই হবে।” ফ্যানি অসহায়ভাবে বলল। বাড়াবাড়ি রকমের অস্থিরতায় ওর মুখটা ক্রমশ হালকা লাল থেকে আরও গাঢ় লাল হয়ে উঠল। ও ব্যাকুল চোখে এডমন্ডের দিকে তাকালেও এডমন্ড কিছুই বলল না। এডমন্ড আসলে টমকে আর বেশি উত্তেজিত করতে চায় না। তাই এই কথোপকথনে মুখে কিছু না বলে ফ্যানির দিকে শুধুমাত্র সমর্থন ভরা হাসি হাসল। ফ্যানির কাতর অনুনয় শুনে টমের বিশেষ হেলদোল কিছু হলো না অবশ্য। সেই আগের কথাই বলে চলল। এখন আর শুধু টম না, মারিয়া, হেনরি আর জন, এরাও টমের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। টমের মতন জোরাজোরি না করলেও সব মিলিয়ে ওদের ভদ্র আর নরম অনুরোধ সহ্য করা ফ্যানির জন্য মুস্কিল হয়ে উঠল। ওদের সবার অনুরোধের পর ফ্যানি একটু দম নেওয়ার আগেই মিসেস নরিসের কথা যেন বৃত্তটা সম্পূর্ণ করে দিল। রাগ মেশানো কিন্তু স্পষ্ট শোনা যায় এমন ফিসফিসে গলায় ফ্যানিকে বললেন, “এত সামান্য ব্যাপার নিয়ে কী নাটক শুরু হয়েছে! ফ্যানি, তোমার জন্য তো আমারই লজ্জা হচ্ছে। এতটুকু কাজে তোমার মাসতুতো দাদা দিদিদের কাজে আসতে এত আপত্তি! ওরা তোমার সঙ্গে কত ভালো ব্যবহার করে! ভালো মুখে রাজি হয়ে যাও। এ নিয়ে আর একটা কথাও শুনতে চাই না।”

“ওকে জোর করবেন না, নরিস মাসি, এই বিষয়ে এভাবে চাপ দেওয়াটা ঠিক নয়। দেখতেই তো পাচ্ছেন, ও অভিনয় করতে পছন্দ করে না। আমরা সবাই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছি, আমাদের মতো ওকেও নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে দিন। ওর বিচারবুদ্ধির ওপরও ভরসা করা যায়। দয়া করে আর চাপ দেবেন না।” এডমন্ড বলে উঠল।

মিসেস নরিস কড়া গলায় বললেন, “আমি মোটেই চাপ দিচ্ছি না। কিন্তু ও যদি ওর মাসি আর মাসতুতো দাদা দিদিদের কথা শুনে না চলে, তাহলে আমি ওকে খুব জেদি আর অকৃতজ্ঞ মেয়ে বলেই মনে করব। বিশেষ করে ও কে আর কী, সেটা ভাবলে মনে হচ্ছে ও সত্যিই ভীষণ অকৃতজ্ঞ।”

মিসেস নরিসের কথা শুনে এডমন্ড এতটাই রেগে গেল যে আর কিছু বলতেই পারল না। মেরি এক মুহূর্ত বিস্মিত চোখে একবার মিসেস নরিসের দিকে তাকিয়ে তারপর ফ্যানির দিকে তাকাল। ফ্যানির চোখে তখন জল এসে গেছে। তাই দেখে মেরি একটু তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল, “এখানে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না। ভারি দমবন্ধ লাগছে আমার।” তারপর চেয়ারটা টেবিলের অন্য পাশে ফ্যানির একদম কাছে সরিয়ে সেখানে বসতে বসতেই ফ্যানিকে নিচু, নরম গলায় বলল, “কিছু মনে কোরো না, মিস প্রাইস। আজ সন্ধেটাই খুব খারাপ যাচ্ছে। সবাই খিটখিটে আর বিরক্ত হয়ে আছে। কিন্তু ওদের পাত্তা দেওয়ার কোনও মানে হয় না।” তারপর নিজে মন খারাপ থাকা সত্ত্বেও, ইচ্ছে করেই ফ্যানির সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল, ওর মনটা ভালো করার চেষ্টা করতে লাগল। মেরি হেনরির দিকে একবার তাকাতেই হেনরি সব বুঝতে পারল, আর তারপর ওই দল থেকে ফ্যানিকে নাটকে অভিনয় করার জন্য আর কেউ অনুরোধ করল না। মেরি যা কিছু করল, সেটা কোনও হিসেব না করে ভালো মনেই করল, তবে ওর এই ব্যবহারের ফলে এডমন্ডের চোখে যেটুকু মর্যাদা হারিয়েছিল ও, সেটা আবার খুব দ্রুত ফিরে পেল।

ফ্যানি যে মেরিকে খুব একটা ভালোবাসে তা নয়। তবে এখন ওর সদয় আচরণে ভারী কৃতজ্ঞ বোধ করল। মেরি ফ্যানির হাতের সেলাই দেখে আফসোস করতে শুরু করল যে যদি ও নিজেও ফ্যানির মতন সুন্দর সেলাই করতে পারত। সেলাইয়ের নক্সাটাও চেয়ে রাখল। মেরি ধরেই নিয়েছে যে যেহেতু এবার মারিয়ার বিয়ে হয়ে যাবে, তাই ফ্যানি এবার থেকে সামাজিক ভাবে মেলামেশা শুরু করবে। সেক্ষেত্রে ফ্যানি নিজেকে কতটা তৈরি করছে সেসব কথা বলতে বলতে মেরি ফ্যানির দাদার কথা জিজ্ঞাসা করল। সমুদ্র থেকে ফ্যানির দাদা কোনও খবর পাঠিয়েছে কিনা জানতে চাইল। মেরি ফ্যানিকে এটাও বলল যে ও ফ্যানির দাদাকে দেখতে আগ্রহী। ওর ধারণা ফ্যানির দাদা নিশ্চয়ই এক সুপুরুষ তরুণ। তারপর ফ্যানিকে এই বুদ্ধিটাও দিল যে ফ্যানি যেন এর পরের বার দাদা সমুদ্রে যাওয়ার আগে দাদার একটা ছবি আঁকিয়ে রাখে। মেরি যে এসব কথা ওর মনকে ভালো করার জন্যই বলছে সেটা ফ্যানি নিজের কাছেও অস্বীকার করতে পারল না। তবুও ফ্যানি মেরির সব কথাই খুব মন দিয়ে শুনল, আর না চাইতেও বেশি বেশি আগ্রহ নিয়ে মেরির কথার জবাব দিল।  

এদিকে নাটক নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকল। ফ্যানির দিক থেকে মেরির মন ফেরাল টম। খুব আফসোসের সঙ্গে জানাল যে বাটলারের সঙ্গে সঙ্গে আনহাল্টের চরিত্রে অভিনয় করা ওর পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। ও খুবই চেষ্টা করেছে যদি কোনোভাবে দুটো সামলানো যায়, কিন্তু হচ্ছে না, তাই ছাড়তেই হবে।

টম এটাও বলল, “তবে ওই চরিত্রে অভিনয় করার মতন কাউকে পেতে একটুও অসুবিধা হবে না। শুধু একবার সবাইকে বলতে হবে, তাহলেই পছন্দমতো লোক বেছে নিতে পারব আমরা। এই মুহূর্তেই আমি অন্তত ছয়জন তরুণের নাম বলতে পারি, তারা সব আশেপাশেই থাকে, আর তারা আমাদের দলে ঢুকতে মরিয়া। আর এক-দু’জন আছে যারা আমাদের মানও রাখবে। অলিভার ভাইদের যেকোনো একজনকে, বা চার্লস ম্যাডক্সকে নিতে ভয় নেই। টম অলিভার খুব বুদ্ধিমান ছেলে, আর চার্লস ম্যাডক্স তো একেবারে পাক্কা এক ভদ্রলোক। তাই আমি কাল ভোরেই ঘোড়া নিয়ে স্টোক-এ যাব, আর ওদের একজনের সঙ্গে কথা পাকাপাকি করে আসব।”

টম যখন এসব বলছে, মারিয়া উদ্বিগ্ন চোখে এডমন্ডের দিকে তাকাচ্ছিল। ওর দৃঢ় বিশ্বাস যে এডমন্ড নিশ্চয়ই এই পরিকল্পনা এত বড় করার বিরোধিতা করবে, কারণ এটা তাদের শুরুতে করা সব প্রতিশ্রুতির একেবারে উল্টো। কিন্তু এডমন্ড কিছুই বলল না।

একটু ভেবে মেরি শান্ত গলায় বলল, “তোমরা যেমন উপযুক্ত মনে করো, আমার দিক থেকে তাতে কোনো আপত্তি নেই। আচ্ছা, আমি কি ওই ভদ্রলোকদের কাউকে আগে দেখেছি? ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, চার্লস ম্যাডক্স একদিন আমার দিদির বাড়িতে ডিনারে এসেছিল, তাই না হেনরি? বেশ চুপচাপ। মনে আছে আমার। তোমরা চাইলে ওকেই বলা হোক, একেবারে অপরিচিত কাউকে নেওয়ার চেয়ে আমার কাছে সেটা কম বিরক্তিকর হবে।”

শেষ পর্যন্ত চার্লস ম্যাডক্সকেই ঠিক করা হলো। টম আবার বলল, ও পরদিন ভোরেই তার কাছে যাবে। জুলিয়া এতক্ষণ প্রায় মুখই খোলেনি। এখন একবার মারিয়ার দিকে, তারপর এডমন্ডের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে বলে উঠল, “ম্যান্সফিল্ডের এই নাটক আশপাশের পুরো এলাকাটাই বেশ জমিয়ে তুলবে দেখছি!”

তবু এডমন্ড চুপ করেই রইল। ও যে কী ভাবছে সেটা শুধু কঠোর গম্ভীর মুখেই ফুটে উঠছে।

একটু চিন্তা করে কিছুক্ষণ পরে মেরি নিচু গলায় ফ্যানিকে বলল, “এই নাটকটা নিয়ে আমি খুব একটা আশাবাদী নই। আর একসঙ্গে মহড়া শুরু করার আগে আমি মিস্টার ম্যাডক্সকে বলেই দেব যে আমি তার কিছু আর আমার অনেকগুলো সংলাপ কাটছাট করব। ব্যাপারটা খুব বিরক্তিকর হবে দেখছি। যেমনটা আমি ভেবেছিলাম, তেমনটা নয় একেবারেই।” 

প্রথম পর্বের লিংক

দ্বিতীয় পর্বের লিংক

তৃতীয় পর্বের লিংক

চতুর্থ পর্বের লিংক

পঞ্চম পর্বের লিংক 

ষষ্ঠ পর্বের লিংক

সপ্তম পর্বের লিংক

অষ্টম পর্বের লিংক 

নবম পর্বের লিংক 

দশম পর্বের লিংক 

একাদশতম পর্বের লিংক 

দ্বাদশতম পর্বের লিংক

 ত্রয়োদশতম পর্বের লিংক 

চতুর্দশতম পর্বের লিংক