জেন অস্টেনের এমা - চতুর্থ পর্ব

প্রথম অধ্যায়ের লিংক

দ্বিতীয় অধ্যায়ের লিংক

তৃতীয় অধ্যায়ের লিংক

 

চতুর্থ অধ্যায়

কিছুদিনের মধ্যেই হার্টফিল্ডের সাথে হ্যারিয়েট স্মিথের ঘনিষ্ঠতা পাকাপোক্ত হয়ে উঠল। এমনিতেই মন ঠিক করে ফেললে এমার কোনো কাজে তর সইত না। তার উপর সে মহা একগুঁয়ে। অতএব হ্যারিয়েটের কাছে ঘনঘন নিমন্ত্রণ যেতে লাগল। এমা তাকে বারবার হার্টফিল্ড আসতে উৎসাহ দিতে লাগল। তাদের দেখাশোনা যত বাড়ছিল, একে অন্যের প্রতি আকর্ষণও পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল। তাছাড়া হাঁটার সঙ্গী হিসেবে হ্যারিয়েটের উপযোগিতা এমা অনেক আগেই ধরতে পেরে গেছিল। মিসেস ওয়েস্টনের বিয়ের পর থেকে তার হাঁটার সঙ্গী ছিল না। তার বাবা তো বাগান পেরিয়ে যেই জংলি ঝোপঝাড় শুরু হত, অমনি আর এগোতে চাইতেন না। নিজেদের জমির ভিতর পাক মারাই তাঁর দীর্ঘ, বা ঋতুবিশেষে হ্রস্ব, পদচারণার জন্য যথেষ্ট ছিল। তাই মিসেস ওয়েস্টনের বিয়ের পর থেকে এমার শরীরচর্চা নামমাত্র হয়ে পড়েছিল। সে একবার সাহস করে একা র‍্যান্ডালস হেঁটে গেছিল বটে, কিন্তু যাওয়াটা তার মোটেই সুখকর হয়নি। আজকাল হ্যারিয়েট স্মিথকে ডাকলেই সে এমাকে হাঁটতে সঙ্গ দিত। এইভাবে মেয়েটি এমার বিশেষ সুবিধাগুলির তালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমা তাকে যত দেখছিল, ততই পছন্দ করছিল। আর তার নিজের সদয় ব্যবহারের ভিতর দিয়ে নানাভাবে সেটা জানানও দিচ্ছিল।

হ্যারিয়েটকে ঠিক বুদ্ধিমতী বলা যায় না, কিন্তু তার স্বভাবে একটা মিষ্টি, বাধ্য, কৃতজ্ঞ ভাব ছিল। মনে অহঙ্কার ছিল না, ছিল শুধু তার শ্রদ্ধাভাজন মানুষগুলির কাছ থেকে শেখার ইচ্ছে। তবে সে যখন মাঝেমধ্যে নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করত, সেটা দেখতে ভারি মজা লাগত। ভদ্রজনের সাথে মেলামেশার ইচ্ছে, সুন্দর বা বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা উপভোগ করার ক্ষমতা – এসবে তার কমতি ছিল না। যদিও সবার সব কথা বুঝতে পারবে, এমনটা নিশ্চয়ই তার থেকে আশা করা যেত না। সব মিলিয়ে এমার সন্দেহ ছিল না যে, তরুণী বন্ধু হিসেবে হ্যারিয়েট স্মিথের চেয়ে যোগ্য কাউকে সে বা তার পরিবার চট করে পাবে না। মিসেস ওয়েস্টনের মতো আরেকজন বন্ধু পাওয়ার কথা অবশ্য সে কল্পনাও করতে পারে না। ঠিক তেমন দ্বিতীয় আর কাউকে পাওয়া অসম্ভব। ঠিক তেমন দ্বিতীয় আর কাউকে এমা চায়ও না। তিনি ছিলেন একেবারে অন্যরকম, আলাদা, এমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার পাত্রী। হ্যারিয়েটের জন্য এমাই হয়ে উঠবে সমস্ত সুযোগসুবিধার দাত্রীবিশেষ। মিসেস ওয়েস্টনের কোনো দরকারে এমাকে গতর বা বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু করতে হবে এমন সম্ভাবনাই ছিল না। আর হ্যারিয়েটের জন্য এমাকে স-ব করতে হবে।

প্রথমেই, এমা ঠিক করল, হ্যারিয়েটের বাবা-মা-কে খুঁজে বার করতে হবে। কিন্তু হ্যারিয়েট এ নিয়ে কিছু বলতেই পারল না যে! মানে, যেটুকু তার জানা ছিল, সমস্তটাই বলল, তবু দেখা গেল এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা-না করা সমান। এমা তার বাবা-মা বিষয়ে যা ইচ্ছে কল্পনা করে নিক – তাতে হ্যারিয়েটের কোনো আপত্তি ছিল না। আশ্চর্য! এমা নিজে যদি এমন অবস্থায় পড়ত, সে তো সত্যি কথাটা না জেনে থাকতেই পারত না! হ্যারিয়েটের কিন্তু তেমন কোনো ইচ্ছে ছিল না। মিসেস গডার্ড তাকে যা বলেছেন, সে তাই নিয়েই খুশি।

মিসেস গডার্ড, বাকি শিক্ষিকারা, ছাত্রীরা, স্কুলের নানা গল্প, এসব নিয়েই তাদের কথাবার্তা বেশি হত। আর বাকি কথা হত অ্যাবে-মিল ফার্মের মার্টিন পরিবারকে নিয়ে। মার্টিনরা হ্যারিয়েটের মনের অনেকখানি নিয়ে ছিল। আসলে তাদের সাথে হ্যারিয়েট জীবনের ভারি আনন্দময় দু’টি মাস কাটিয়েছিল। তাই সেসব নিয়ে কথা বলতে তার খুব ভালো লাগত। সেখানে থাকতে তার কেমন লেগেছিল, কী কী দেখেছিল। এমা তাকে কথা বলতে উৎসাহই দিত। অচেনা এক পরিবারের কথা শুনতে তার মজা লাগত। হ্যারিয়েট তার অল্প বয়েসের উচ্ছলতায় কলকল করে বলে চলত, ‘তারপর বুঝলেন, মিসেস মার্টিনের দুটো বসার ঘর – দারুণ দুটো বসার ঘর – তার একটা তো প্রায় মিসেস গডার্ডের বসার ঘরটার মতোই বড়! তারপর মিসেস মার্টিনের কাজের লোকটি – সে প্রায় পঁচিশ বছর ওঁদের বাড়ি কাজ করছে! ওদের পোষা আটখানা গোরু, তার মধ্যে দুটো অ্যালডার্নি, একটা ছোট্ট ওয়েল্‌চ্‌, সেটাকে যে কী মিষ্টি দেখতে কী বলব! আমি ওকে এত ভালোবাসতাম, মিসেস মার্টিন বলতেন ও আসলে আমারই পোষ্য। তারপর ওঁদের না, একটা বাগান ঘেরা গ্রীষ্মাবাস আছে। সামনের বছর কোনোসময় আমরা ঠিক সময় করে সবাই মিলে ওখানে চা খেতে যাব – অপূর্ব দেখতে সে বাড়িটা, প্রায় এক ডজন লোক থাকতে পারে…’

প্রথমে আগুপিছু না ভেবে শুধু গল্প শোনার আনন্দেই এমা শুনছিল। কিন্তু যতই সে পরিবারটির বিষয়ে আরও গভীরে জানতে শুরু করল, তত তার মনে নানারকমের চিন্তা জেগে উঠতে লাগল। আসলে শুরুতে সে ভুল ভেবেছিল। তার মনে হয়েছিল মার্টিনরা বুঝি মা, মেয়ে, ছেলে আর ছেলের বউ মিলে একসাথে থাকতেন। কিন্তু যেই সে বুঝতে পারল যে, তরুণ মিস্টার মার্টিন, যিনি হ্যারিয়েটের গল্পে অনেকখানি জায়গা নিয়ে ছিলেন আর সবসময়ই নিজের পরোপকারী মিষ্টি স্বভাবের জন্য প্রশংসা লাভ করছিলেন, আসলে অবিবাহিত, ওবাড়িতে আসলে কোনো তরুণী মিসেস মার্টিন নেই, অমনি তার মনে হতে লাগল, তবে তো তার কিশোরী বান্ধবীর কপালে অনেক দুঃখ আছে! এসব দয়াদাক্ষিণ্যের পিছনে কার কী মতলব থাকতে পারে কে জানে? তাই হ্যারিয়েটকে চোখে চোখে না রাখলে সে কোন ফাঁদে গিয়ে পড়বে কে বলতে পারে!

এই চিন্তা মাথায় আসামাত্র এমার প্রশ্নের ধার আর সংখ্যা বাড়তে লাগল। বিশেষ করে সে মিস্টার মার্টিনের ব্যাপারে হ্যারিয়েটের পেট থেকে কথা বার করার জোর চেষ্টা করতে লাগল। অবশ্য এজন্য তাকে খুব বেগ পেতে হল, এমন বলা যায় না। হ্যারিয়েট তাদের চাঁদনি রাতের হাঁটাহাঁটি আর সন্ধ্যেবেলার হৈ চৈ নিয়ে কথা বলবে বলে সর্বদাই একপায়ে খাড়া। মিস্টার মার্টিন কেমন হাসিখুশি আর বাধ্য স্বভাবের, সে নিয়ে এক কাঁড়ি গল্প শোনা হল। হ্যারিয়েট আখরোট ভালোবাসে, তাই শুনে তিনি নাকি একদিন তিন মাইল হেঁটে আখরোট যোগাড় করে এনেছিলেন। সব ব্যাপারেই তিনি এমন করতেন। তাঁদের পরিবারের মেষপালক ছেলেটিকে তিনি একদিন বসার ঘর অবধি নিয়ে এসেছিলেন, যাতে হ্যারিয়েট তার মিষ্টি গলার গান শুনতে পায়। তিনি নিজেও একটু আধটু গাইতেন বৈ কী। হ্যারিয়েটের মতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান। কোনোকিছুই তাঁর চোখ এড়াত না। তাঁর পোষা ভেড়াগুলো ছিল খুবই ভালো জাতের। যেসময় হ্যারিয়েট মার্টিনদের সাথে থাকছিল, দেশের সবচাইতে ভালো উল তাঁর ভেড়াগুলোর লোম থেকেই তৈরি হচ্ছিল। হ্যারিয়েটের মতে এমন মানুষ ভূভারতে ছিল না যে মিস্টার মার্টিনকে পছন্দ করত না। তাঁর মা-বোনও তাঁকে ভীষণ ভালোবাসতেন। মিসেস মার্টিন তাকে একদিন বলেছিলেন (এইখানে এসে মেয়েটির গালে লাল আভা দেখা দেয়), ছেলের মা হিসেবে তাঁর মতো ভাগ্যবতী যেমন আর কেউ নেই, তিনি নিশ্চিত যে মেয়ে তাঁর ছেলেকে স্বামী হিসেবে পাবে, তার মতো ভাগ্যবতী স্ত্রী-ও আর কেউ হবে না। অবশ্য তাই বলে তিনি ছেলের বিয়ের জন্য তাড়াহুড়ো করছেন এমন একেবারেই নয়। একটুও না।

‘বাহবা মিসেস মার্টিন!’ এমা মনে মনে বলল, ‘কথাটা ভালোই বলেছেন তো!’

আর হ্যারিয়েট যখন ওবাড়ি ছেড়ে চলে এল, তখন মিসেস মার্টিন মিসেস গডার্ডকে চমৎকার একটা হাঁস উপহার দিয়েছিলেন। তেমনটি নাকি মিসেস গডার্ড কখনো দেখেননি। তিনি এক রবিবার তাঁর স্কুলের তিনজন শিক্ষিকা – মিস ন্যাশ, মিস প্রিন্স আর মিস রিচার্ডসনকে ডেকে নিজে হাতে সেই হাঁস রান্না করে খাইয়েছিলেন।

‘মিস্টার মার্টিন তার মানে নিজের কাজের বাইরে খুব একটা কিছু খোঁজখবর রাখেন না, তাই তো? মানে, বই-টই তো বিশেষ…’

‘কী যে বলেন! উনি তো – না মানে আমি ঠিক জানি না – কিন্তু আমার মনে হয় উনি অনেক পড়াশুনো করেছেন – তবে আপনি যেমন ভাবছেন তেমন না। ওঁর কৃষি সংবাদ পড়ায় খুব ঝোঁক। আরও কয়েকটা বই আছে, জানলার তাকে রাখা, সেসবও উনি নিজে নিজে পড়েন। তবে মাঝে মাঝে সন্ধ্যেবেলা আমরা তাস খেলতে বসার আগে উনি এলিগ্যান্ট এক্সট্র্যাক্ট থেকে হয়তো বা খানিকটা পড়লেন – সবাইকে শুনিয়ে – আর সেটা ওঁর মুখে খুবই ভালো লাগত শুনতে। আমি ভালোভাবেই জানি যে উনি ভিকার, ওয়েকফিল্ড – এগুলো সব পড়েছেন। অবশ্য রোমান্স অফ দা ফরেস্ট বা চিলড্রেন অফ দা অ্যাবে ওঁর পড়ে ওঠা হয়নি। আমি বলার আগে উনি ওগুলোর কথা জানতেনও না। কিন্তু জানেন তো, আমি বলার পরে উনি বইগুলো যোগাড় করে ফেলবেন বলে ঠিক করে ফেলেছেন!’

পরের প্রশ্ন – ‘মিস্টার মার্টিনকে দেখতে কেমন?’

‘ওহ্‌, মানে, দেখতে ঠিক ভালো বলা যায় না। আমার তো প্রথমে খুবই সাধারণ বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন আর ওরকম লাগে না। ওঁকে চেনার সাথে সাথে… আপনি তো ওঁকে কখনো দেখেননি, না? উনি কিন্তু মাঝে মাঝেই হাইবারি আসেন। তাছাড়া প্রতি সপ্তাহে এই এলাকা হয়ে উনি কিংস্টন যান। আপনার বাড়ির গা দিয়েই তো।’

‘আচ্ছা। হ্যাঁ, আমি নিশ্চয় তাঁকে হাজার বার দেখেছি। কিন্তু তখন তো আর আমি জানতাম না, উনি কে। এক ছোকরা চাষি, হয়তো ঘোড়ার পিঠে, বা পায়ে হেঁটে চলেছে, তা দেখে আমার কৌতূহল জাগবেই বা কেন, বলো? আসলে এই ছোট ছোট চাষি পরিবারগুলোর সাথে আমি কী নিয়ে কথা বলব কিছু ভেবে পাই না। কেউ যদি আরও একটু বেশি গরিব হয়, আর তাকে দেখে যদি মনে হয় একটু সাহায্য পেলে সে জীবনে কিছু একটা করতে পারবে, তখন আমি হয়তো তার পরিবারের কোনো কাজে লাগলেও লাগতে পারি। তা নয়তো একটি চাষি পরিবারের জীবনে আমার কী-ই বা ভূমিকা থাকতে পারে, তাই না? সেদিক থেকে এজাতীয় লোকেরা আমার চেয়ে এক কাঠি উপরে, এরকম বলা যেতে পারে, অন্য নানা অর্থে নিচের স্তরের হলেও…’

‘ঠিকই। আপনার ওঁকে খেয়াল করার কথা না। উনি কিন্তু আপনাকে ভালোই চেনেন, মানে, আলাপ না থাকলেও অনেকবার দেখেছেন আর কী।’

‘উনি নিশ্চয় অত্যন্ত ভদ্র একজন তরুণ, সে আমি তোমার কথা থেকেই বুঝতে পারছি। ওঁর জন্য আমার শুভেচ্ছা রইল। আচ্ছা, ওঁর বয়েস কেমন হবে তোমার কোনো ধারণা আছে?’

‘গত বছর জুনের আট তারিখে ওঁর বয়েস ছিল চব্বিশ। আর আমার জন্মদিন হল ওই মাসেরই তেইশ তারিখ – ঠিক দু’সপ্তাহ বাদে। কী অবাক কান্ড, না?’

‘মোটে চব্বিশ? তবে তো সংসার পাতার মতো বয়েসই হয়নি। ওঁর মা তাড়াহুড়ো না করে ঠিকই করেছেন। ওঁরা তো মনে হয় যেমন আছেন ভালোই আছেন। জোর জবরদস্তি করে বিয়ে দিতে গেলে হয়তো উল্টে সমস্যাই হবে। বছর ছয়েক পরে হয়তো ওঁদের পরিবারের উপযুক্ত একটি মেয়ের সাথে উনি বিয়ের কথা ভাবতে পারেন। মেয়েটির যদি অল্পস্বল্প পারিবারিক সম্পত্তি থাকে, তাহলে তো কথাই নেই।’

‘ছ’বছর! কিন্তু মিস উডহাউজ, ততদিনে তো ওঁর বয়েস তিরিশে গিয়ে ঠেকবে!’

‘ত্রিশের আগে কতজন পুরুষমানুষই বা বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারে বলো তো? এক যদি না তার বিস্তর টাকাপয়সা থাকে। মিস্টার মার্টিনকে তো নিশ্চয় নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়তে হবে, তাই না? জীবনে তাড়াহুড়ো না করাই ভালো। ওঁর বাবা যখন থাকবেন না, তখন হয়তো উনি হাতে কিছু টাকা পাবেন – মানে, তাঁর ভাগে যেটুকু যা রেখে যাওয়া হবে। কিন্তু সেসব এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে। নিজের শ্রম আর বুদ্ধি দিয়ে উনি একদিন ধনী হয়ে উঠবেন ঠিকই, কিন্তু এখনই সেসব ধরে নিয়ে এগোনোটা ঠিক হবে না।’

‘আপনি ঠিকই বলছেন। তবে ওঁরা কিছু খুব আরামেই থাকেন, জানেন তো? খালি বাড়ির ভিতর কাজ করার জন্য এই মুহূর্তে কেউ নেই, তা বাদ দিয়ে ওঁদের অভাব আমি তো কিছু দেখতে পাইনি। তবে মিসেস মার্টিন ঠিক করেছেন, এবছরই দেখেশুনে একটি ছেলেকে রাখবেন।’

‘তোমার কিন্তু একদম এসবের মধ্যে ঢোকা উচিত না হ্যারিয়েট, মানে, আমি বলতে চাইছি, মিস্টার মার্টিনের স্ত্রীর সাথে আলাপ করতে যাওয়ার ব্যাপারে আর কী… দ্যাখো, ওঁর বোনেরা হয়তো খানিকটা পড়াশুনো করেছেন, তাঁরা একেবারে ফেলনা নন। তাই বলে এটা ধরে নিও না যে উনি এমন কাউকে বিয়ে করবেন, যে তোমার সাথে একটুও মেশার যোগ্য। দুর্ভাগ্যবশত তোমার বাবা-মা পরিবার কে বা কারা তা হয়তো সবিস্তারে জানা নেই, কিন্তু তুমি যে ভদ্রপরিবারের সন্তান তাতে কোনো সন্দেহই নেই। তাই তোমার পক্ষে যতটা সম্ভব, ভদ্রসমাজে জায়গা করে নেওয়ার অধিকারের লড়াই লড়ে যেতেই হবে। তা নয়তো কিন্তু জীবনে এমন অনেক লোকের সাথে তোমার আলাপ হবে যারা আসলে তোমায় টেনে নামাতে পারলেই খুশি হবে।

‘হ্যাঁ, কিন্তু দেখুন না, আমি যখন হার্টফিল্ডে আসি, আপনি আমায় কত আদরযত্ন করেন, মিস উডহাউজ, তাই এখন আর আমি কাউকে ভয় পাই না।’

‘মানুষের ভালোমন্দের তফাত তুমি ভালোই বুঝতে পারো। কিন্তু আমি তোমায় ভদ্রসমাজে প্রতিষ্ঠিত করবই, হ্যারিয়েট। তখন তোমার আর হার্টফিল্ড বা মিস উডহাউজের দরকার পড়বে না। এর জন্য তোমার পরিচিতদের মধ্যে যত কম আলটপকা লোকজন থাকে, ততই ভালো। মিস্টার মার্টিন যতদিনে বিয়ে করবেন, ততদিন তুমি যদি গ্রামের দিকে থাকোও বা, ওঁর বোনেদের সাথে বা ওঁর স্ত্রীর সাথে তোমার যোগাযোগ রাখাটা ঠিক হবে না। বিশেষ করে ওঁর স্ত্রী নিশ্চয় কোন এক সাধারণ চাষি পরিবারেরই মেয়ে হবে – শিক্ষাদীক্ষাহীন।’

‘তাই হয়তো হবে। তবু আমার কিন্তু মনে হয় না মিস্টার মার্টিন এমন কাউকে বিয়ে করবেন যে একেবারে বোকাসোকা গেঁয়ো পরিবারের মেয়ে, বা যে মোটেও পড়াশুনো করেনি। না না আপনি নিশ্চয় ঠিকই বলছেন, আমার নিশ্চয় ওঁর বউয়ের সাথে আলাপ করতে ইচ্ছেই হবে না। কিন্তু ওঁর বোনেদের ব্যাপারে আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসা কখনো কমবে বলে তো মনে হয় না। বিশেষ করে মিস এলিজাবেথ। ওঁদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ হয়ে গেলে আমার একটুও ভালো লাগবে না। আচ্ছা, ওঁরাও তো আমার মতোই লেখাপড়া করেছেন। তবে মিস্টার মার্টিন যদি সত্যিই একদম মুখ্যু একটা মেয়েকে বিয়ে করে আনেন, যে খালি হাঁউমাউ করে কথা বলে, সেক্ষেত্রে আমি তার সাথে একটুও ভাব করতে যাব না।’

হ্যারিয়েট যখন এসব কথা বলছিল, এমা তাকে মন দিয়ে লক্ষ্য করছিল। মিস্টার মার্টিনের ব্যাপারে মেয়েটির মনের অবস্থা যে খুব বিপজ্জনক, তার চোখে তো অন্তত তেমনটি ধরা পড়ল না। ছেলেটিকে সে তার নারীজীবনে প্রথম অনুরাগী হিসেবে চিনেছে ঠিকই, কিন্তু জল হয়তো তার চেয়ে বেশি গড়ায়নি। অতএব এমার পরিকল্পনা নিয়ে হ্যারিয়েটের দিক থেকে গোলমালের সম্ভাবনা নেই।

পরদিনই তাদের মিস্টার মার্টিনের সাথে দেখা হয়ে গেল। ডনওয়েল রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখা গেল তিনি উল্টোদিক থেকে আসছেন। এমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাসূচক অভিবাদন জানালেও এমার সঙ্গিনীকে দেখে তিনি যে খুশি ধরে রাখতে পারছেন না, সে আর কাউকে বলে দিতে হল না। তারা দু’জনে যখন কথা বলছিল, এমা তখন একটু দূর থেকে তাদের দেখার সুযোগ পেয়ে খুশিই হল। তার অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে মিস্টার রবার্ট মার্টিনকে মেপে নিতে তার বেশি সময় লাগল না। বেশ গোছানো, ঠান্ডা মাথার বুদ্ধিমান তরুণ। কিন্তু ওইটুকুই মাত্র। ভদ্রযুবকদের সাথে তুলনা করতে গেলে হ্যারিয়েটের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব যেটুকু এগিয়েছে, তাকে এই মুহূর্তে গোড়া থেকে কেটে ফেলা দরকার। হ্যারিয়েটের ভদ্রতাবোধ সূক্ষ্ম। এমার বাবার নরম স্বভাবটি সে নিজের বুদ্ধিতেই ধরে ফেলেছে এবং তাঁর প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধাও দেখিয়েছে। মিস্টার মার্টিনকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে উনি ভদ্রতার ভ-ও জানেন না।

তারা কয়েক মিনিট নিজেদের ভিতর কথাবার্তা বলল। কিন্তু মিস উডহাউজকে তো আর দাঁড় করিয়ে রাখা যায় না। তাই শিগগিরই হ্যারিয়েট দৌড়ে ফিরে এল। কিন্তু তার মুখ দেখে এমা প্রমাদ গুনল। আশা করা যায়, তার মুখ ভরা হাসি আর ছটফটে ভাব কিছুক্ষণের মধ্যে শান্ত হয়ে আসবে।

‘ভাবুন তো! আজই ওঁর সাথে দেখা হয়ে গেল! কী অবাক কান্ড! একদম কাকতালীয় ব্যাপার। উনি বলছিলেন, ওঁর আর এর মধ্যে র‍্যান্ডালের দিকে যাওয়া হয়নি। আমরা এ রাস্তায় আসি উনি জানতেনই না! ওঁর মাথায় ছিল আমরা নিশ্চয় র‍্যান্ডালের আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করি। উনি না রোমান্স অফ দা ফরেস্টটা এখনো পাননি, জানেন তো? কিংস্টনে গিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, ওটার কথা ভুলেই গেছিলেন। কিন্তু তাতে কী, উনি তো কালকেই আবার ওখানে যাবেন। ইশ্‌! কী অদ্ভুত ভাবে দেখা হয়ে গেল, না? আপনার কেমন লাগল ওঁকে? খুব সাদামাটা?’

‘সাদামাটা তো বটেই। বিলক্ষণ সাদামাটা। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল ভদ্রজনোচিত ব্যবহার একেবারেই জানেন না। ওঁর ব্যাপারে আমার বেশি আশা করা উচিত নয়, তা আমি করিওনি। কিন্তু উনি যে কথাবার্তায় এমন ভাঁড়ের মতো, এমন ফুটো বেলুনের মতো হবেন, তা আমার ধারণায় ছিল না। সত্যি বলতে আমি ওঁকে আরেকটু পরিশীলিত বলে ভেবেছিলাম।’

‘হ্যাঁ, সেই…’ হ্যারিয়েট বিমর্ষ হয়ে বলল, ‘সত্যিকারের ভদ্রলোক ওঁকে ঠিক বলা যায় না।’

‘হ্যারিয়েট, আমার মনে হয় তুমি যদি আমাদের পরিচিত ভদ্রলোকদের আরেকটু আলাপ-পরিচয় করো, তাহলে তুমি নিজেই দেখতে পাবে মিস্টার মার্টিন কোন দিক থেকে তাঁদের চেয়ে খাটো। হার্টফিল্ডে এজাতীয় অনেকেই আছেন, যাঁরা জন্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতির দিক থেকে যথার্থ ভদ্রলোক। তাঁদের সাথে পরিচয় হওয়ার পরেও যদি তোমার মার্টিনের সাথে সমানভাবে মেলামেশা করতে ইচ্ছে করে, তাতে আমি অবাকই হব। বরং তোমার নিজেরই মনে হবে, তুমি কীকরে আগে ওঁর সাথে এতটা সময় কাটিয়েছিলে! তোমার কি ইতিমধ্যেই এরকম মনে হচ্ছে না? সত্যি করে বলো? ওঁর খাপছাড়া ধরনধারণ, সাধারণ চেহারা, আর কী অমার্জিত কথাবার্তা! আমি যা বুঝলাম, উনি তো ঠিক করে কথা বলতেই পারেন না!’

‘হ্যাঁ উনি ঠিক মিস্টার নাইটলির মতো নন… মিস্টার নাইটলির কথাবার্তা, চলনবলন দেখলেই বোঝা যায় উনি বড়ঘরের মানুষ। আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু মিস্টার নাইটলি তো অসাধারণ একজন লোক…’

‘মিস্টার নাইটলি এতটাই অন্য স্তরের মানুষ যে ওঁর সাথে মিস্টার মার্টিনের তুলনা করাটাই ভুল হবে। মিস্টার নাইটলির মতো ভদ্রলোক শ’য়ে একটা পাওয়া যায়। কিন্তু শুধু উনি কেন, তুমি তো মিস্টার ওয়েস্টন আর মিস্টার এলটনকেও দেখেছ। মিস্টার মার্টিনকে ওঁদের সাথে তুলনা করে দ্যাখো। ওঁদের হাঁটাচলা, কথা বলা, এমনকি চুপ করে থাকাটাও… ভেবে দ্যাখো। তুমি নিজেই বুঝতে পারবে।’

‘একদম ঠিক বলেছেন! উফ্‌ কী আলাদা ওঁরা! কিন্তু মিস্টার ওয়েস্টন তো প্রায় বুড়ো হতে চললেন। ওঁর তো বোধহয় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর বয়েস হবে, না?’

‘সেজন্যই তো ওঁর ভদ্রতাবোধকে আরও প্রশংসা করতে হয়। হ্যারিয়েট, মানুষের বয়েস যত বাড়ে, তার স্বভাব ঠিক রাখাটা ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বয়েসের সাথে সাথে জোরে জোরে কথা বলার অভ্যেস, কর্কশ অথবা খাপছাড়া ব্যবহার আরও বেশি চোখে পড়তে শুরু করে। যৌবনে কুক্কুরী ধন্যা, জানো তো? মিস্টার মার্টিনকে এখন দেখলে একটু অদ্ভুত লাগবে মাত্র। উনি যখন মিস্টার ওয়েস্টনের বয়েসে পৌঁছবেন, তখন কী হবে ভাবো!’

‘হ্যাঁ, সে অবশ্য কিছুই বলা যায় না,’ হ্যারিয়েট আরও মন খারাপ করে বলল।

‘বলা না গেলেও আন্দাজ করা যায়! উনি ক্রমশ হয়ে উঠবেন গেঁয়ো, রুক্ষস্বভাবের একজন চাষি। নিজের চেহারা বা ব্যবহার নিয়ে ওঁর কোনো মাথাব্যথা থাকবে না। চাষের লাভক্ষতি ছাড়া ওঁর মাথায় কোনো সূক্ষ্ম চিন্তাই আসবে না।’

‘ইশ্‌, সে তো ভীষণ খারাপ হবে…’

‘ওঁর ভাবনাচিন্তা যে ওঁর চাষের চারদিকেই ঘোরাফেরা করে, সেটা তো এর থেকেই প্রমাণ হয়ে যায় যে, উনি শহরে গিয়েও তোমার বলা বইটার কথা ভুলে মেরে দিয়েছেন। আসলে বাজারে গিয়ে বই পড়া-টড়ার কথা ওঁর আর মাথাতেই ছিল না – আর সেই ভুলটা ওঁর মতো লোকের জন্য ভুল বলে ধরা উচিত না। ভেবে দ্যাখো, ওঁর বই পড়ার দরকারটাই বা কী? আমার কোনো সন্দেহই নেই যে, কালে-কালে উনি ভালোই আয় করবেন। কিন্তু তার জন্য উনি অশিক্ষিত না গেঁয়ো সে নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা করার কোনো দরকার আছে কি?’

‘আমি ঠিক জানি না উনি বইটার কথা ভুলেই গেছিলেন, নাকি…’ এইটুকু বলে হ্যারিয়েট থেমে গেল। তার গলায় অসন্তোষের সুর এমন তীব্র স্বরে বাজছিল যে, এমা ঠিক করল আপাতত চর্চাটা এইখানে সাঙ্গ করাই ভালো। সে খানিকক্ষণ চুল করে রইল। তারপর বলল,

‘একটা বিষয়ে অবশ্য, মিস্টার এলটনকে মিস্টার নাইটলি বা মিস্টার ওয়েস্টনের চেয়ে বেশি নম্বর দিতে হবে। ওঁরা দু’জন ভদ্রসমাজে চলাফেরার ব্যাপারে বেশি অভিজ্ঞ। ওঁদের একটা নিজস্ব ধরন আছে। মিস্টার ওয়েস্টন যেমন চটপটে, খোলামেলা – সরাসরি কথা বলেন। ওঁর হাসিখুশি স্বভাবের কারণে সবাই ওঁর এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে পছন্দই করে। কিন্তু তাই বলে অন্য কেউ ওঁর মতো হতে গেলে সেটা সবার ভালো নাও লাগতে পারে। আবার মিস্টার নাইটলি ধীরস্থির, গভীর স্বভাবের। ওঁর কথা বলা মানেই যেন আদেশ। ওঁর চেহারা, ধরন, সামাজিক অবস্থার কারণে এটা ওঁর জন্য মানানসই। অল্পবয়স্ক কোনো পুরুষ যদি ওঁর মতো হাবভাব করতে শুরু করে, তাকে সহ্য করাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। অথচ মিস্টার এলটনকে দ্যাখো – এই বয়েসের পুরুষমানুষদের মধ্যে তাঁকে আদর্শ বলে ধরা যায়। তাঁর হাসিখুশি স্বভাব, বাধ্য, নম্র ধরন – আজকাল তো আমার মনে হয় ওঁর ভদ্রতাবোধ যেন নিজের সাথেই পাল্লা দিয়ে আরও সূক্ষ্ম হয়ে চলেছে। জানি না ওঁর মনে কী আছে, হ্যারিয়েট, কিন্তু আমার মনে হয় উনি যেন আজকাল আগের চাইতেও নরম স্বরে কথা বলেন। আর যেটুকু বলেন, যেন তোমার উদ্দেশ্যেই বলেন। আচ্ছা, উনি সেদিন কী বলছিলেন তোমায় বললাম?’

এরপর এমা মিস্টার এলটনের কিছু প্রশংসাবাক্য, যা আসলে তারই প্রতি নিবেদিত ছিল, হ্যারিয়েটের নাম করে তাকে শুনিয়ে দিল। আর তাতে ফলও হল। হ্যারিয়েটের মুখ লজ্জায় লাল করে হেসে ফেলল। আর স্বীকার করল যে, মিস্টার এলটনকে তার ভালোই লাগে।

কিশোরী হ্যারিয়েটের মাথা থেকে ছোকরা চাষির ভূত তাড়াবার জন্য মিস্টার এলটনই এমার অস্ত্র। সে নিশ্চিত ছিল, বৈবাহিক ভবিতব্যের নিরিখে এই বন্ধনটাই সবচাইতে স্বাভাবিক হবে। এতে সবপক্ষের ভালো হবে। যদিও তার মনে ভয় ছিল, সবাই হয়তো আগে থাকতেই এদের দু’জনের বিয়ের কথা ভেবে ফেলেছে, কিন্তু তার মতো আটঘাট বেঁধে আর কেউ নিশ্চয় বিয়েটা ঘটাতে নামেনি। আসলে সেই যবে হ্যারিয়েট হার্টফিল্ডে প্রথম পা রেখেছিল, তবে থেকেই বুদ্ধিটা এমার মাথায় ঘুরঘুর করছে। সে যত ভাবছে, তত তার মনে হচ্ছে এর চেয়ে সুবিধাজনক আর কিছু হতেই পারে না। মিস্টার এলটনের অবস্থা ভালো, তিনি ভদ্র, সুসভ্য, তাঁর পরিচিতির বৃত্তে নিচু তলার লোকজন কেউ নেই। অন্যদিকে আবার তাঁর পরিবারে এমন কেউ নেই যে হ্যারিয়েটের অস্পষ্ট জন্মপরিচয় নিয়ে আপত্তি তুলতে পারে। তাঁর বাড়িটায় হ্যারিয়েট আরামেই থাকতে পারবে। আর এমার হিসেব অনুযায়ী তাঁদের আর্থিক অবস্থাও বেশ স্বচ্ছল হবে, কারণ হাইবারির ভিকারের মাইনে বেশি না হলেও শোনা যায় মিস্টার এলটনের কিছু নিজস্ব সম্পত্তি আছে। এমা নিজে মিস্টার এলটনকে একজন বিবাহযোগ্য ভদ্র যুবক হিসেবে খুবই পছন্দ করত। বিশ্বসংসার সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানবুদ্ধির কোনো অভাব আছে বলে তার মনে হত না।

হ্যারিয়েটের রূপ নিয়েও তার মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। তাই মিস্টার এলটনের মনে সে বাবদে কোনো আপত্তি উঠবে, তার সম্ভাবনা ছিল না। উল্টোদিকে, মিস্টার এলটনের মনোযোগ লাভ করলে হ্যারিয়েটের দিক থেকেও যে যথাযথ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে, তা-ও ছিল তার সন্দেহের অতীত। সবচেয়ে বড় কথা হল, মিস্টার এলটন আদতেই যোগ্য পাত্র। নেহাত খুঁতখুঁতে না হলে কোনো মেয়ের পক্ষে তাঁকে অপছন্দ হওয়া কঠিন। সবাই বলে, তাঁকে দেখতে খুবই সুন্দর, তাঁর ব্যবহার ভালো, গুণ অনেক। এমা নিজের জন্য তাঁকে ঠিক যোগ্য মনে করত না বটে, কারণ তার মনে হত, মিস্টার এলটনের মুখেচোখে কী যেন একটা নেই-নেই! কিন্তু যে মেয়ে গেঁয়ো ঘোড়সওয়ার মিস্টার রবার্ট মার্টিনের আনা আখরোট খেয়ে মুগ্ধ, তাকে জয় করার জন্য এই ভদ্র যুবকটিকে নিশ্চয় কোনো কষ্ট করতে হবে না।     

………………………………

১ জেন অস্টেনরা নিজেই অ্যালডার্নি গোরু পুষতেন। জেনের মা – শ্রীমতী অস্টেন ১৭৭৩ সালে একটি চিঠিতে লেখেন “আমাদের গোয়ালটা বেশ ভরে উঠেছে। আমি এখন একটা ষাঁড় আর ছ’টা গোরুর মালকিন।” অ্যালডার্নি গোরুর দুধ থেকে অনেক মাখন তৈরি হত। শ্রীমতী অস্টেন জানান, তাঁদের অ্যালডার্নি গোরু তাঁদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই মাখনের জোগান দিচ্ছে। সেই মাখন বেচে অস্টেনদের বিরাট পরিবারের ব্যায়ভার হয়তো কিছুটা কমত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যালডার্নি গোরুর প্রজাতিটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

ওয়েল্‌চ্‌ বা ওয়েল্‌শ্‌ গোরু একধরনের বড় কালো গোরুর প্রজাতি, ওয়েল্‌শ্‌ অঞ্চলে পাওয়া যেত। ব্রিটেনের সবচেয়ে পুরনো গোরুর প্রজাতিগুলির মধ্যে একটি, রোমানদের আসারও আগে থেকে ওই অঞ্চলে এই গোরু পোষা হত।

২ এলিগ্যান্ট এক্সট্র্যাক্ট ধর্ম ও নীতিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে একটি লিখিত সংকলন – আঠেরো শতকে পাঠকের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল।

৩ রোমান্স ইন দা ফরেস্ট অ্যান র‍্যাডক্লিফের লেখা একটি রোমাঞ্চকর গথিক উপন্যাস (১৭৯১)। চিলড্রেন অফ দা অ্যাবে আইরিশ রোমান্টিক উপন্যাস লেখক রেজিনা মারিয়া রোশের লেখা (১৭৯৬)।