এভারেস্ট বেস ক্যাম্প : সাগর মাথার পায়ের কাছে - তৃতীয় পর্ব
- 07 September, 2026
- লেখক: তনুশ্রী গোস্বামী
প্রথম পর্বের লিংক
দ্বিতীয় পর্বের লিংক
তৃতীয় পর্ব -
প্রত্যাগমন প্রস্তুতি
বুদ্ধিরাজ (টু) কে তাড়াতাড়ি পাঠালাম নন্দিনীদিকে খুঁজে আনতে।
আমাদের টিমটা এবার বেশ হয়েছে। প্রতিদিন পালা করে কেও না কেও হারায়। বেশ কিছুক্ষন পর পূরবী আর সুপ্রিয় এসে পৌঁছলো। ওদেরকে ঘটনাটা জানালাম। ওরা তো শুনেই ঘাবড়ে গেছে। বুদ্ধিরাজ (টু) অনেকক্ষন পর খুঁজে এসে জানালো নন্দিনীদিকে কোথাও দেখতে পায়নি। তখন বুদ্ধিরাজ (ওয়ান) হাল ধরলো ۔۔ ও স্যাক রেখে বেড়িয়ে গেলো খুঁজতে। আমরা ডাইনিং এই বসে আছি۔۔۔ড্রেস চেঞ্জ করারও মুড্ নেই۔۔চারিদিক কুয়াশায় ঢেকে গেছে۔۔আর হুহু করে ঠান্ডা বাড়ছে۔۔বিকেল প্রায় চারটে বাজে۔۔এক ফ্লাক্স কফির অর্ডার দিয়ে বসে আছি চিন্তিত মুখে۔۔শুধু চিন্তা করছি এতো ঠান্ডার মধ্যে মানুষটা পথ হারিয়ে কোথায় না কোথায় চলে গেলো।

প্রায় ঘন্টা খানেক পর ডাইনিঙের জানালা দিয়ে দেখি ওপরের দিকের রাস্তা দিয়ে নন্দিনীদি আর ওয়ান নামছে۔۔ডাইনিং এ ঢুকে ক্লান্ত বিদ্ধস্ত নন্দিনীদিকে কফি খাইয়ে চাঙ্গা করার পর আসল রহস্যটা জানা গেলো۔۔গাইডরা উপরের বামদিকের রাস্তা দিয়ে আমাদেরকে হোটেলে এনেছে۔۔আর নন্দিনীদি ঢুকেছে ডানদিকে গ্রামের ভিতরের রাস্তা দিয়ে۔۔সেখানে বুদ্ধিরাজটুকে দেখতে না পেয়ে ও আরও ওপর দিকে হাঁটা শুরু করেছিল۔۔তারপর ওপর দিকে আর যাওয়ার রাস্তা নেই দেখে এক জায়গায় বসেছিল۔۔আমরাতো বুদ্ধিরাজটুকে খুব বকা দিলাম۔۔ওর উচিত ছিল রাস্তার ওপর অপেক্ষা করা۔۔বেচারা নিজেও অপরাধবোধে ভুগছে۔۔আসলে উনিশ বছরের কলেজে পড়া ছেলে۔۔দশাই এর ছুটিতে গাইডের কাজ করতে চলে এসেছে۔۔এখনো এতটা দায়িত্ত্ববোধ আসেনি۔۔ওকে মাথা নিচু করে চুপটি করে বসে থাকতে দেখে আমাদেরও খারাপ লাগছিলো۔۔আমরাও আর বিশেষ কিছু না বলে গল্পগুজব শুরু করলাম۔۔এর মধ্যে রাতের খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে۔۔এখানে সমস্ত রুটেই আটটার মধ্যে ডিনার করে নিতে হয়۔۔۔পাহাড়ি মানুষরা অনেক সকালে ঘুম থেকে ওঠে۔۔দিনের আলোটাকে কাজে লাগায়۔۔তাই তাড়াতাড়ি রাতের সব কাজ সেরে নেয়۔۔আমরাও ওদের নিয়মেই চলার চেষ্টা করি۔۔
এই হোটেলটা বেশ বড় হোটেল কিন্তু বেশ ফাঁকা۔۔কথায় কথায় জানা গেলো নিচে বেশ কিছুদিন ওয়েদার খারাপ ছিল বলে কাঠমান্ডু-লুকলার ফ্লাইট বন্ধ থাকায় ওদের খুব বড় একটা টিমের বুকিং ক্যানসেল হয়েছে আজকে۔۔সারা রাস্তাতেই এই একই কারণে সব জায়গাতেই আমরা মোটামুটি ফাঁকায় ফাঁকায় ঘুরতে পেরেছি۔۔নাহলে শুনলাম সিজনে নাকি এক একদিনে চারশো থেকে পাঁচশো লোক বেস ক্যাম্প যায়۔۔থাকার জায়গা পাওয়া মুশকিল হয়۔۔বিশেষ করে ডিংবোচের পর থেকে۔۔কারণ এরপর থেকে বাকি ক্যাম্পসাইটে তিন চারটের বেশি হোটেল নেই۔۔কারও পৌষ মাস তো কারও সর্বনাশ।
রাতে চিকেন খাওয়া হলো এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আর চিকেন খাওয়া হবেনা۔۔কারণ ফ্রোজেন চিকেন ভীষণ শক্ত ছিলো۔۔আরও ওপরে উঠলে আরও বাজে হবে۔۔তবে ওপরে আর চিকেন পাওয়াও যায়নি এটাই রক্ষে।
খাওয়ার পর বেশ কিছুক্ষন গল্প করে ঘুমোতে যাওয়া হলো۔۔আজকে আমরা প্রায় দুহাজার ফিট উঠেছি۔۔এখন প্রায় সাড়ে চোদ্দ হাজার ফিটের কাছাকাছি রয়েছি۔۔ট্রি লাইন প্যাংবোচেতেই শেষ হয়ে গেছে۔۔অক্সিজেন লেভেল কমের দিকে۔۔মাঝরাত্রিতে ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছি বেশ শ্বাসকষ্ট নিয়ে۔۔উঠে বসেও শান্তি হচ্ছেনা দেখে রুমের দরজা জানালা খুলে দিলাম۔۔ইনহেলার নিয়েও দেখলাম কোনো উপকার হচ্ছেনা۔۔হোটেলের করিডোরে বেশ কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করলাম۔۔তাও কষ্ট রয়েই গেলো۔۔এদিকে জানালা খোলা থাকায় বেশ ঠান্ডাও লাগছে۔۔অগত্যা কম্বল মুড়ি দিয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসে রইলাম۔۔۔সারারাত এইভাবে প্রায় জেগে বসে রইলাম۔۔ভোরের দিকে অল্প ঘুমিয়ে পড়েছিলাম۔۔۔সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কী করা হবে আমরা সবাই চিন্তিত۔۔এটা তো অল্টিটিউড সিকনেস এর লক্ষণ মনে হচ্ছে۔۔কিন্তু মাথা যন্ত্রনা বা বমিভাব কিছু ছিলোনা।
লিডার পরামর্শ দিলো বাইরে খোলা হাওয়াতে হাঁটাহাঁটি করে দেখতে শরীর ঠিক হচ্ছে কিনা۔۔সেই মতো আমরা সকলে আশেপাশে ঘুরে দেখতে বেড়ালাম।

আজকে সকালের দিকে ঝলমলে রোদ উঠেছে۔۔۔আমাদের হোটেলের পিছনেই উত্তর দিকে আইল্যান্ড পিক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে۔۔১৯৫১ সালে জিওলজিস্ট গোপেন্দ্রনাথ দত্ত এই শৃঙ্গ আরোহন করেন۔۔তিনিই প্রথম বাঙালি শিখর আরোহণকারী۔۔ডিংবোচে থেকে চুকুং গ্রামের রাস্তা চলে গেছে যা আইল্যান্ড পিক বেস ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছে۔۔এই রাস্তাতেই নন্দিনীদি গতকাল হারিয়ে গেছিলো۔۔হোটেলের বামদিকে আমাদাবলাম দাঁড়িয়ে۔۔ডিংবোচে থেকে এই শৃঙ্গের বেস ক্যাম্পও যাওয়া যায়۔۔ডানদিকে তেবোচে শৃঙ্গ একই রকম ঘাড় কাত করে দাঁড়িয়ে আছে۔۔টপের দিকে একটা চোর্তেন۔۔সব মিলিয়ে খুবই মনোরম পরিবেশ۔۔আমার শ্বাসকষ্টও কমতে শুরু করেছে কিন্তু একটু ক্লান্ত লাগছে۔۔আমরা ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতে শুরু করলাম।
এমনিতে সবাই অ্যাক্লাইমেটাইস করার জন্য ডিংবোচেতে দুদিন থাকে۔۔আমরা আগেই ঠিক করেছিলাম এখানে দুদিন না থেকে আরও দুশো মিটার ওপরে থুকলাতে থাকবো۔۔
শ্বাসকষ্ট কমতে শুরু করলেও আমি শুধু ভাবছিলাম আমার জন্য টিম যেন বিপদে না পড়ে۔۔কারণ আরও অল্টিটিউড এ উঠে গিয়ে শরীর খারাপ হলে ব্যাক করা মুশকিল হবে۔۔۔তাই হোটেলে ফিরে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি নেমে আসবো۔۔লিডার আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলো۔۔۔এই সিদ্ধান্তমতো টিম ভাগ করা হলো۔۔আমাকে নিয়ে বুদ্ধিরাজটু প্যাংবোচে নেমে আসবে আর বাকি দল থুকলার দিকে রওনা দেবে۔۔সেই মতো জামাকাপড় আলাদা করে একটা স্যাকে বাকি তিনজনের আর একটা স্যাকে আমারটা গোছানো হল।

The last supper
আমার আর পূরবীর মধ্যে প্রথম থেকেই এবারে একটা ডিল ছিলো۔۔কলকাতা থেকেই বলে রেখেছিলাম কোনো কারণে শরীর পারমিট না করলে আমি ব্যাক করবো۔۔তুই ট্রেক কমপ্লিট করবি۔۔۔এত হাই অল্টিটিউড ট্রেক যেহেতু আমি আগে করিনি তাই একটু চাপ প্রথম থেকেই ছিলো۔۔তার ওপর রওনা দেওয়ার কিছুদিন আগে আমার সার্ভিক্যাল স্পনডাইলোসিস ধরা পড়েছে۔۔সেই নিয়েও চাপে ছিলাম۔۔যেহেতু প্রাথমিকভাবে শুধু আমরা দুজন যাবো এটাই ঠিক ছিলো۔۔বাকি দুজন পরে জয়েন করেছে তাই নিজেদের মধ্যে আমরা এগুলো ঠিক করে রেখেছিলাম۔۔কিন্তু সত্যি যখন সেইদিনটা ডিংবোচেতে এলো তখন লিডার তো কেঁদেই ফেলেছে۔۔আর আমি ভাব দেখাচ্ছি কিছুই যেন হয়নি۔۔ব্যাক করা কোনো ব্যাপার নয়۔۔সেফটি সিকিউরিটি ফার্স্ট۔۔এখান থেকে ফিরে গেলেও হারানোর কিছু নেই ইত্যাদি ইত্যাদি۔۔এদিকে বুক তো ফেটে যাচ্ছে۔۔۔সবাই জানে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প আসার জন্য আমাদের কত প্রস্তুতি কত ত্যাগ(ওয়েট কমানোর জন্য খাবার ত্যাগ)সব জলে যাবে!!নন্দিনীদি আর সুপ্রিয় সমানে বলে যাচ্ছে ব্যাক না করতে۔۔পূরবীর ভার্শনে ওরা নভিস তাই পরবর্তী বিপদটা আন্দাজ করতে পারছেনা۔۔একমাত্র খুশি বুদ্ধিরাজ টু۔۔তার আবার কাঠমান্ডুতে বন্ধুর ব্যাচেলর পার্টিতে যোগ দেওয়ার কথা۔۔তাই মনে মনে মহা খুশি۔۔
এইসব আলাপ আলোচনার মধ্যেই বুদ্ধিরাজ ওয়ান এসে বুদ্ধি দিলো ব্যাক না করে থুকলা পর্যন্ত যেতে۔۔থুকলা যেতে বেশি সময়ও লাগবেনা۔۔আর শরীর যদি বেশি খারাপ করে তাহলে নিচে ফেরিচে গ্রামে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে۔۔কারণ ওটাই ফেরার রাস্তা۔۔বুদ্ধিরাজের বুদ্ধিটা ভালো লাগলো ঠিকই۔۔কিন্তু তখনও ঠিক করতে পারছিলামনা কী করবো۔۔আগেই বলেছি নিজের থেকেও এখানে টিমের কথা বেশি ভাবছিলাম۔۔তারা যাতে আমাকে নিয়ে বিপদে না পড়ে এটাই কনসার্ন ছিলো۔۔যাইহোক প্যাকিঙ শেষ করে দুধ কর্নফ্লেক্স আর সাথে গার্লিক সুপ্ খেয়ে বেরোনো হলো۔۔গার্লিক সুপ্ হাই অল্টিটিউড এ উপকারী۔۔ তাই নেওয়া হলো।

আজকে কী করা হবে আর হবেনা এই টালবাহানায় বেরোতে বেরোতে সাড়ে দশটা বেজে গেছে۔۔۔যে রাস্তা দিয়ে গতকাল ডিংবোচে ঢুকেছি সেই রাস্তায় অল্প কিছুটা এসে ডানহাতে একটা রাস্তা একটা উঁচু টপে চলে যাচ্ছে۔۔ওপরে একটা চোর্তেন۔۔ওখান থেকেই ডানদিকে থুকলা যাওয়ার রাস্তা۔۔প্রথমে পূরবী এগোচ্ছে۔۔আমি তারপর প্যাংবোচে ফেরার রাস্তা ধরবো۔۔পিছনে সুপ্রিয় আর নন্দিনীদি۔۔সবাই বিষন্ন হৃদয়ে এগিয়ে চলেছে۔۔আমি হঠাৎ ফেরার রাস্তা না ধরে টপে ওঠার রাস্তা ধরেছি দেখে টিমের মুখে হাসি ফুটেছে۔۔۔মরি মরবো কিন্তু এভারেস্ট তো বার বার আসবেনা এই মনোভাব নিয়ে এগিয়ে গেলাম۔۔সামনে কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে না দেখেই ফিরবো!!আমাকে প্যাংবোচে নামিয়ে দেওয়া খুম্বু রিজিওনে আমার আত্মাতো পেত্নী হয়ে ঘুরে বেড়াবে۔۔????এ হতে দেওয়া যায়না۔۔۔আসলে চড়াই উঠে দেখলাম আমার খুব কিছু কষ্ট হচ্ছেনা۔۔পরে যা হবে দেখা যাবে এই ভেবে এগোতে শুরু করলাম۔۔ততক্ষনে চারিদিক অসম্ভব কুয়াশায় ঢেকে গেছে۔۔ওয়েদার অত্যন্ত খারাপ۔۔ঐ উঁচু টপে উঠে যাওয়ার পর সেদিনের রাস্তায় আর কোনো চড়াই ছিলোনা۔۔হালকা ঢেউ খেলানো উঁচু রিজের উপর দিয়ে আমরা হাঁটছি۔۔নিচে বামদিকে ফেরিচে গ্রাম দেখা যাচ্ছে۔۔সাথে সোলা খোলা চলেছে۔۔নন্দিনীদি যথারীতি আগে এগিয়ে গেছে۔۔পূরবী সামনে মাঝে আমি পিছনে সুপ্রিয়۔۔আজকে দুজন বডিগার্ড নিয়ে হাঁটছি۔۔শরীর খারাপ তো তাই۔۔বুদ্ধিরাজ ওয়ান আমাদের সাথে۔۔আর টু নন্দিনীদির সাথে এগোচ্ছে আবার কিছুটা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে۔۔ওয়ান মাঝেমাঝেই আমাকে জিজ্ঞেস করছে আমি ঠিকাছি কিনা۔۔আমার এমনিতে কিছু অসুবিধা হচ্ছিলোনা কিন্তু খুব ক্লান্ত লাগছিলো۔۔তাই বেশি দাঁড়াচ্ছিলাম।
চারিদিক এত কুয়াশায় ঢেকে গেছে যে দশ মিটার দূরের কিছুও চোখে ঠাওর হচ্ছেনা۔۔আর অসম্ভব শীত করছে۔۔এতদিন শুধু একটা উইন্ডপ্রুফ জ্যাকেট বা একটা ডাউন জ্যাকেট পরে হেঁটেছি۔۔আজকে এত শীত করছে দাঁড়িয়ে পরে উইন্ডপ্রুফ জ্যাকেটের নিচে ডাউন জ্যাকেট পরে নিলাম۔۔۔শীত লাগা কম হতে হাঁটার স্পিড বেড়ে গেলো۔۔আর শরীরটাও বেশ সুস্থ লাগতে শুরু করলো۔۔এখন রিজের পাশের সরু একটা রাস্তা দিয়ে চলেছি۔۔এইভাবে প্রায় ঘন্টা আড়াই পরে আমরা থুকলাকে দূর থেকে দেখতে পেলাম۔۔নিচে সোলা খোলার ওপর একটা ব্রিজ তারপাশেই একটু ওপরে তিনটে হোটেল নিয়ে থুকলা۔۔দূর থেকে দেখা যাচ্ছে প্রচুর লোক থুকলায় রেস্ট করছে۔۔আরও অনেক মানুষ থুকলা পার করে থুকলা পাসের ওপরে ওঠার পথে এগিয়ে চলেছে۔۔আমরাও বোল্ডার রাস্তায় নিচে নেমে এসে ব্রিজ ক্রস করে থুকলা পৌঁছলাম বেলা একটা নাগাদ۔۔۔আজকে ওয়েদার খারাপ থাকায় আমরা কোথাও দাঁড়ায়নি তাই খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেছি ক্যাম্প সাইট।
থুকলার উচ্চতা প্রায় চার হাজার সাতশো মিটার۔۔এখান থেকেই গ্লেসিয়ার জোনে শুরু হয়ে গেছে۔۔চারিদিকে কোনো গাছপালা নেই۔۔۔হোটেলে ঢুকেই একটা অসাধারণ দৃশ্য দেখে আমার সব শরীর খারাপ সেরে গেলো۔۔۔আগেই বলেছি থুকলায় মাত্র তিনটে হোটেল۔۔তারই একটাতে ঢুকেই সামনেই ডাইনিং হল۔۔সেখানে প্রচুর লোক লাঞ্চ করছে۔۔ডাইনিং হল গমগম করছে۔۔
এই হোটেলটিও দুই মহিলা চালাচ্ছেন۔۔তারা সম্পর্কে ননদ বৌদি۔۔খুব গল্প করতে ভালোবাসেন তারা সেটা রাতের দিকে বোঝা যাবে۔۔এখন অতিথি সেবায় ব্যস্ত۔۔কিন্তু ডাইনিংয়ে ঢুকেই দেখি বিভিন্ন ধরণের খাবারের সাথে গরম গরম ফোলা ফোলা বাটোরাও পরিবেশন হচ্ছে۔۔সেই দেখে তো আমরা এখানেই থাকবো ঠিক করে ফেললাম এবং রাতে অবশ্যই বাটোরা খাবো۔۔
থুকলা জায়গাটা একটা রেস্ট পয়েন্ট۔۔এখানে সাধারণত কেও থাকেনা۔۔যারা সেদিনই বেস ক্যাম্প থেকে ফিরছে তারাও এখানে লাঞ্চ করছে আবার যারা ওপরের দিকে লোবুচেতে উঠছে তারাও এখানে লাঞ্চ করছে۔۔এই জায়গাটাতে তাই খুবই ভিড়۔۔সবার মুখেই খুব উচ্ছাস যারা বেস ক্যাম্প থেকে ফিরছে۔۔একটি বড় ভারতীয় দল লাঞ্চ করছিলো۔۔তারা বেস ক্যাম্প থেকে ফিরছে সেদিন۔۔গ্রূপ লিডার খুব মজা করছিলেন۔۔۔সেই আনন্দ যেন আমাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছিলো۔۔সোজা কথায় খুব জমজমাট পরিবেশ۔۔আমার শরীরও এখন পুরো ফিট۔۔তাই আমাদের মনেও বেশ আনন্দ۔۔সেই আনন্দে আমরা এগ কারী ভেজ কারী ডাল ভাত অর্ডার দিলাম۔۔খাওয়া দাওয়া করে বাইরে ঘুরতে বেরোলাম۔۔۔বাইরে ভীষণ ঠান্ডা۔۔বিকেল বিকেল হয়ে এসেছে۔۔চারিদিক কুয়াশায় ঢাকা তাই সানসেট দেখা গেলোনা۔۔শুধু মেঘের ফাঁক দিয়ে অল্প একটু আমাদাবলামকে দেখা যাচ্ছে۔۔ঠান্ডা লাগছে বলে আমরা ডাইনিংয়ে ঢুকে পড়লাম।
এখন সব সুনসান۔۔কেও ওপরে উঠে গেছে কেও নিচে নেমে গেছে۔۔আমরা যেকজন রয়েছি সবাই মিলে ডাইনিংয়ে গল্প করতে বসলাম۔۔হাঁটা শেষ করে আমাদের এটাই কাজ۔۔মোটামুটি সকল আটটা থেকে বেলা দুটো আড়াইটা পর্যন্ত হাঁটা আর তারপর সন্ধ্যে আটটা পর্যন্ত ডাইনিংয়ে বসে বসে গল্প۔۔আমরা ছাড়াও একজন অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রমহিলা রয়েছেন۔۔উনি একা এসেছেন۔۔বললেন আগে ছেলের সাথে এসেছেন কিন্তু ছেলে এত তারা করে নিয়ে গেছে যে ভালো করে এনজয় করতে পারেননি۔۔তাই আবার এসেছেন۔۔আর দুটি ছেলে রয়েছে তারা রোমানিয়ার۔۔যাবে গোকিও সরোবর۔۔ননদ ভদ্রমহিলার থেকে ভালো করে রুট বুঝে নিচ্ছে۔۔আর আমরা চারজন۔۔এত বোরো হোটেলে এই কজন রয়েছি۔۔টুকটাক গল্প করতে করতে সময় কাটছে।
তার মধ্যেই আমাদের বহু আকাঙ্খিত বাটোরা চলে এসেছে۔۔সাথে আলুর তরকারী۔۔এত সুন্দর ভারতীয় খাবার কী করে শিখলো জানতে চাওয়ায় বৌদি জানালেন ওনার স্বামী দিল্লিতে কাজ করেন উনি অনেকদিন ওখানে ছিলেন۔۔আমি আবার বাটোরা চিনি দিয়ে খেলাম۔۔আজকের রাতের খাওয়া মোটামুটি আমাদের শেষ খাওয়া۔۔কারণ এরপরের দুদিন আমরা কেওই ভালো করে খেতে পারিনি۔۔শুধু লিকুইডের ওপরেই ছিলাম۔۔হাই অল্টিটিউড আমাদের খাবার ইচ্ছা একদমই চলে গেছিলো۔۔
খাওয়ার পর বসে বসে গল্প চলছে۔۔রাত আটটা মতো বাজে۔۔হঠাৎ দূরে ওপর দিক থেকে টর্চের আলো আর তার সাথে জুতোর আওয়াজ ভেসে এলো۔۔আমরা সবাই বেশ অবাক۔۔এই জনমানবশূন্য প্রান্তরে এত রাতে ওপর থেকে কে নামছে!!
স্মরণসভা
ডাইনিংয়ের দরজা ঠেলে ধরমর করে একজন ভদ্রলোক এবং দুজন ভদ্রমহিলা ঢুকলেন۔۔۔তিনজনের মুখই ভীষণ গম্ভীর এবং চিন্তিত۔۔পরে জানলাম তিনজনেই ফ্রেঞ্চ۔۔মহিলাদের মধ্যে একজনের ভীষণ শরীর খারাপ হওয়ায় তারা বিকেল চারটের সময় লাস্ট ক্যাম্প গোরকশেপ থেকে রওনা দিয়ে রাত আটটায় থুকলা নেমে এসেছেন۔۔۔সেদিন সকালেই তারা বেস ক্যাম্প গেছিলেন۔۔উচ্চতাজনিত কারণে শরীর খারাপ۔۔۔ভদ্রমহিলার এত মাথা যন্ত্রনা করছে যে উনি ঘরে ঢুকেই ডাইনিং টেবিলে মাথা ধরে বসে পড়লেন۔۔۔মুখচোখ লাল হয়ে রয়েছে۔۔এগুলো সবই হাই অল্টিটিউড সিকনেসের সিম্পটম۔۔অক্সিজেন কমে গেলে এই ধরণের উপসর্গ দেখা দেয়۔۔সাথে বমি ভাব নাক দিয়ে রক্ত পড়া অসংলগ্ন কথা বলা থেকে শুরু করে এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে۔۔এই অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব নিচের দিকে নেমে আসাই নিয়ম۔۔তাই ওনারাও অন্ধকার উপেক্ষা করেই নেমে এসেছেন۔۔۔সবাই ওনাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো۔۔ওনাদের বসিয়ে সেবা শুশ্রূষা করে জল খাবার খাইয়ে আমরা যে যার ঘরে শুতে চলে এলাম۔۔এবং সবার মনেই একটা ভীতির সঞ্চার হলো ওনার অবস্থা দেখে۔۔আমাদেরও তো একই অবস্থা হতে পারে۔۔গতকাল রাতে তো একজনের এরকম কিছু সিম্পটম দেখাও গেছিলো۔۔যে নন্দিনীদি কলকাতায় থাকলে সারাদিনে এক লিটার জলও খায়না সে এইসব দেখে এমন জল খাওয়া শুরু করলো যে বেচারাকে আধ ঘন্টা অন্তর ঐ শীতে ছোট বাইরে দৌড়োতে হচ্ছে۔۔আসলে অল্টিটিউড সিকনেস কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় বেশি করে জল খাওয়া۔۔۔জল না পারলে যেকোনো লিকুইড۔۔
যাইহোক সেইরাতটা কিন্তু সবার ভালোই কাটলো۔۔আমিও মোটামুটি ভালো করেই ঘুমোলাম۔۔পরেরদিন সকালে শরীর একেবারেই ফিট۔۔এবং মনে বিশাল উত্তেজনা۔۔কারণ আজ আমরা থুকলা পাস উঠবো۔۔এবং তারপরই আমরা সেই বিখ্যাত খুম্বু গ্লেসিয়ার রিজিওনে প্রবেশ করে যাবো۔۔এত যার নাম শুনেছি সেই ভয়ঙ্কর খুম্বু গ্লেসিয়ারের দেখা পাওয়া যাবে۔۔
সেই ভদ্রমহিলার ঘর আমাদের ঘরের উল্টো দিকেই ছিলো۔۔জিজ্ঞেস করে জানলাম তার শরীর একেবারেই ভালো নেই ۔۔তারা হয়তো আজকে ফেরিচে বা তারও নিচে নেমে যাবে۔۔ভদ্রমহিলা ইংলিশ একেবারেই ভালো না বোঝার জন্য কথা আর বিশেষ এগোলোনা۔۔
আজকে সকাল থেকে বেশ ভালো আবহাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে۔۔দুধ কর্নফ্লেক্স সাথে গার্লিক সুপ আর ডিম সেদ্ধ খাওয়া হলো۔۔۔গার্লিক সুপ্ সবসময়েই দুটো নিয়ে ভাগ করে খাওয়া হচ্ছে۔۔۔যত উচ্চতায় উঠছি খাবারের দাম তত বাড়ছে۔۔۔কিন্তু খাবার ব্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইস করা যাবেনা۔۔যেহেতু রোজ এত শক্তিক্ষয় হচ্ছে۔۔দুটো ডিম্ সেদ্ধ চারশো নেপালি টাকা দিয়ে খাওয়া শুরু করেছিলাম۔۔থুকলায় সেটা সাড়ে ছশো টাকা দিয়ে খেলাম۔۔
বিরসবদনে সাড়ে এগারো হাজার নেপালি টাকা বিল পেমেন্ট করে সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা রেডি হয়ে বেড়িয়ে পরলাম۔۔হোটেলের সামনে থেকেই পাসে পৌঁছনোর রাস্তা উঠে গেছে۔۔۔দুরন্ত চড়াই রাস্তা۔۔۔পুরোটাই বোল্ডার জোন۔۔ডানদিকে আমাদের চলার রাস্তার নিচেই খুম্বু গ্লেসিয়ার বয়ে চলেছে۔۔কিন্তু এখান থেকে দেখা যাচ্ছেনা۔۔আমরা ধীরে ধীরে উঠছি۔۔লিডার বলে দিয়েছে আজকে নো তাড়াহুড়ো۔۔যতক্ষণ পর্যন্ত না ওয়েদার পুরো ক্লিয়ার হচ্ছে ততক্ষন পর্যন্ত পাসে উঠবেনা۔۔তাই আমরাও যত পারছি দাঁড়াচ্ছি বসছি আর লক্ষ লক্ষ ফটো তুলছি۔۔আর মাঝে মাঝেই ইয়াকদের পাশ দিচ্ছি۔۔এই প্রাণীটিকে আবার আমার খুব পচ্ছন্দ۔۔কী গ্রাভিটিসম্পন্ন!আক্ষরিক অর্থেই!
আমাদের সামনেই উঁচুতে তাকালেই পাস্ দেখা যাচ্ছে আর পিছনে ফিরলেই আমাদাবলাম۔۔থাকে থাকে বাম দিক থেকে ডান দিকে নেমে গেছে۔۔এই একটা পিক আমাদের কখনো নিরাশ হতে দেয়নি۔۔ডান পাশে তেবোচে শৃঙ্গ۔۔ঘন নীল আকাশ۔۔আর আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সিরাস মেঘ۔۔নিজেরাই কল্পনা করে নাও চারিদিকে কী দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি۔۔আজকের দিনটায় মনে যে কী অসম্ভব আনন্দ আর উত্তেজনা হচ্ছে তা বলে বোঝানোর মতো ভাষা আমার অন্তত জানা নেই۔۔আর প্রকৃতিও আজকে ঢেলে সাজিয়েছে নিজেকে۔۔এইভাবে চলতে চলতে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে থুকলা পাস্ পৌঁছে গেলাম۔۔আসলে ঘন্টা খানেক সময়ই লাগে কিন্তু আমরা অনেক সময় বসেছি তাই এতটা সময় লেগে গেলো۔۔উঠেই সমস্ত পরিবেশটাই যেন নিমেষের মধ্যে নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেলো۔۔একটা ফুটবল খেলার মাঠের সাইজের পাসের টপ۔۔চারিদিকে সব আট হাজারী শৃঙ্গ۔۔পাসের মাথায় বুদ্ধিস্টদের প্রার্থনা পতাকা উড়ছে۔۔বাম পাশে দূরে দেখা যাচ্ছে চোলা পাস্ যাওয়ার রাস্তা۔۔সেখান থেকে গোকিয়ো সরোবর যাওয়া যায় যা কিনা আপার দুধকোশী ভ্যালিতে পড়ছে۔۔۔অনেকে সেই রাস্তাতেও চলেছেন।

আর চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দেশ বিদেশের প্রায় একশজন এভারেস্ট অভিযাত্রীর স্মৃতিস্তম্ভ যারা দুঃসাহসিক এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে নিজেদের প্রাণ হারিয়েছেন۔۔রয়েছে শেরপাদের স্মৃতিস্তম্ভ۔۔যাদের ছাড়া যেকোনো পর্বত অভিযান অসম্ভব۔۔۔তাদের মধ্যে এমনসব শেরপারা রয়েছেন তারা হয়তো নয় দশ বার সফল এভারেস্ট অভিযান করেছেন۔۔কিন্তু শেষবারে কোনো অসাবধানতাবশত প্রাণটা চলে গেছে۔۔۔সবাই এখানে পৌঁছে চুপ করে বসে এই জায়গাটা অনুভব করছে۔۔۔যেন সেইসব মহানপ্রানদের উদ্দেশ্যে স্মরণসভাযয় বসেছে۔۔এখান থেকে যেন কারও চলে যেতে ইচ্ছা করছেনা۔۔আমরা এখানেও প্রচুর ফটো তুলে প্রায় ঘন্টা দুয়েক সময় কাটিয়ে লোবুচের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
পাস্ থেকে বেশ কিছুটা উঁচু নিচু বোল্ডার রাস্তায় হেঁটে নিচের দিকে নেমে এলাম۔۔এখন থেকে রাস্তা একদম সমতল۔۔পাশে ডানদিকে প্রখর বেগে খুম্বু খোলা বয়ে চলেছে۔۔ডানদিকে পাহাড় উঠে গেছে খাড়া۔۔ যেহেতু বেশ বেলা হয়ে এসেছে তাই চারিদিক কুয়াশায় ঢেকে যেতে শুরু করেছে۔۔এই রাস্তায় সুপ্রিয় আর নন্দিনীদি আর বুদ্ধিরাজদ্বয় আগে এগিয়ে গেছে۔۔পূরবী সামনে চলেছে আর পিছনে চলেছি আমি۔۔সামনের দৃশ্য এত সুন্দর লাগছে আমি সমানে দাঁড়িয়ে ফটো তুলে চলেছি۔۔এইভাবে প্রায় একঘন্টা চলার পর পৌঁছে গেলাম লোবুচেতে۔۔প্রায় পাঁচ হাজার মিটার ওপরে চলে এসেছি۔۔আর মাত্র একদিনের হাঁটা বাকি۔۔তাহলেই পৌঁছে যাবো আমাদের বহু আকাঙ্খিত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে۔۔۔আমাদের হোটেলের নাম কালাপাত্থর লজ۔۔হোটেলের সামনে খুম্বু খোলা বয়ে চলেছে۔۔۔হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে চারিদিক একেবারে কুয়াশায় ঢেকে গেছে۔۔۔হালকা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে۔۔۔সাথে ভয়ঙ্কর ঠান্ডা হাওয়া - এ কিসের পূর্বাভাস তখনও জানিনা।