জেন অস্টেনের প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস - পর্ব ১

১

বয়স অল্প, বাৎসরিক মোটা আয় বাঁধা, এমন একলা এক অবিবাহিত পুরুষের একটি স্ত্রী চাই ই চাই - পাঁচ জনে যে একথা বলবে, তাতে কোনও ভুল নেই।

তেমন কোন মানুষ যখন প্রতিবেশী হয়ে পাড়ায় এসে বসবাস শুরু করে, তার উদ্দেশ্য যাই থাক না কেন, পাড়ার পাঁচটি পরিবার মনে করে যে মানুষটি তাদেরই সম্পত্তি অর্থাৎ তাদের কারুর-না-কারুর বিবাহযোগ্যা মেয়ের বর হবে সে।

বেনেট-গিন্নী একদিন স্বামীকে বললেন, 'ওগো শুনেছ, নেদারফিল্ড পার্কে শেষ অব্দি ভাড়াটে এল'।

মি. বেনেট নিঃশব্দে মাথা নেড়ে জবাব দিলেন যে তিনি কোন খবর রাখেন না।

'হ্যাঁ গো, লং-গিন্নী এসেছিলেন এখুনি। তার মুখেই সব শুনলাম'।

স্বামীর সাড়া পাওয়া গেল না দেখে অধীর কণ্ঠে বললেন তিনি, 'কিন্তু কে ভাড়া নিল তা জিজ্ঞেস করলে না তো?'।

'তোমার বলতে ইচ্ছে হয় তো বল না। আমার শুনতে কোনওই আপত্তি নেই'।

এটুকু সাড়াই যথেষ্ট ছিল। মিসেস বেনেট শুরু করে দিলেন। 'নেদারফিল্ড নাকি এক অল্পবয়সী যুবক ভাড়া নিয়েছে। উত্তর-ইংল্যাণ্ডে মস্ত সম্পত্তির মালিক। গত সোমবার চার ঘোড়ার গাড়ি চড়ে দেখতে এসে বাড়ি-বাগান ভারি পছন্দ হয়ে যায়। তখুনি মি. মরিসের সঙ্গে কথাবার্তা সব ঠিকঠাক। মাইকেলমাস-পর্বের আগেই নাকি এসে উঠবে এখানে। চাকর-বাকর তো শুনেছি আগামী সপ্তাহে এসে পড়ছে সব'।

'লোকটির নাম শুনেছ কিছু?'।

'বিংলে'।

'একলা না স্বামী-স্ত্রী দুজনে?'।

'না গো, একলা মানুষ। বছরে চার-পাঁচ হাজার বাঁধা আয়। আমাদের মেয়েগুলোর একটা হিল্লে হবে বলেই তো মনে হচ্ছে'।

'সে কি? তার সঙ্গে তোমার মেয়েদের সম্বন্ধ কি?'।

'কি যে তুমি বল, বুঝি না! আমার ইচ্ছে, আমার একটি মেয়ে ওর হাতে দিই'।

'সেই ইচ্ছেতেই বুঝি এখানে এসে বাসা করল ছোকরা?'।

'তার আবার ইচ্ছে কি! না, তুমি যে কি ছাই-ভস্ম বল! আমি ভাবছি এমনও তো হতে পারে, ছেলেটি আমারই কোন মেয়ের সঙ্গে প্রেমে পড়বে। তুমি বাপু সে এলেই একবার গিয়ে আলাপ করে আসবে কিন্তু'।

'আমার পক্ষে তা হয়ে উঠবে না। তোমরাই একদিন গিয়ে আলাপ করে এস। না, তার চেয়ে বরং মেয়েদেরই একলা পাঠিয়ো, তাতে ফল হবে আরও ভালো। তুমি তোমার মেয়েদের চেয়েও সুন্দরী। তোমাকে দেখলে সে আর মেয়েদের দিকে ফিরেও তাকাবে না'।

'কি যে বল তুমি! তা ছিল বটে একদিন, যখন রূপের দন্ত আমিও করতাম। কিন্তু এখন তার কিছু অবশিষ্ট নেই। পাঁচটি সোমথ মেয়ে যার, তার কি আর নিজের রূপের হিসেব-নিকেশ করা মানায়, না-ভালো দেখায়?'।

'সে-কথা সত্যি যে-সব মেয়েদের রূপ নেই। তোমার বেলা তা খাটে না!'।

'কিন্তু সে এসে পড়লে তুমি বাপু, একবার তাড়াতাড়ি গিয়ে আলাপ করে আসবে'।

'আমার কাজ-কর্মের ভিড়ে সে হয়ে উঠবে না, আমি বলেই রাখছি'।

'মেয়েদের দিকটা একবার ভাব তুমি বাপ হয়ে। যে-মেয়ে তার হাতে পড়বে, তার সৌভাগ্যটা একবার ভেবে দেখ। স্যর লুকাস তো বউকে নিয়ে আগেভাগেই গিয়ে পড়বেন। ওর উদ্দেশ্য ঐ একই। নইলে ওরা সচরাচর নতুন প্রতিবেশীদের খবরই রাখেন না। নানা, তুমি না গেলে, আমাদের যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে'।

'তোমাদের এত লজ্জা কিসের বল তো? বলছি, তোমায় দেখে মি. বিংলে যথার্থ খুশি হবে। তাছাড়া তোমার হাতে আমি একখানা হাত-চিঠিতে লিখে দেব'খন, আমার যে-কোন একটি মেয়েকে সে পছন্দ করে বিয়ে করতে পারে। অবশ্য আমার উপদেশ, সে যেন লিজিকেই ভালো করে বিবেচনা করে দেখে'।

'এমন কাজও করো না। লিজি আমার অন্য মেয়েদের চেয়ে কিসে ভালো শুনি? জেনের চেয়ে সুন্দরী নয় সে। তোমার আদুরে লিজির চেয়ে লিডিয়া আমার ঢের হাসি-খুশি মেয়ে। তোমার ঐ বাপ-সোহাগী মেয়ে লিজি!'।

'অন্য মেয়েদের খুব একটা প্রশংসা করে পাঠানো যায় না,' বললেন বেনেট। 'মেয়েরা বোকা-বোকা হালকা-যেমন সাধারণ মেয়েরা হয়। লিজিই আমার যা-কিছু বুদ্ধিমতী মেয়ে। যেমন সতেজ তেমনি প্রাণময়ী'।

'কি করে নিজের মেয়েদের সম্বন্ধে তুমি অমন কথা বলতে পার, বল তো? আমায় রাগিয়ে তুমি ভারি মজা পাও, না? আমার দুর্বল স্নায়ুগুলোর ওপর তোমার বিন্দুমাত্র মায়া নেই!'।

'সে কি? আমায় ভুল বুঝ না। তোমার ঐ স্নায়ু আমার কতদিনের সুহৃদ। কমপক্ষে কুড়ি বছর তাদের নিয়ে ঘর করছি'।

'কিন্তু আমার কষ্ট তুমি বোঝ না!'।

'ও কিছু নয়। এ তুমি কাটিয়ে উঠবে। এ পাড়ায় আরও কত চার-হাজারী জামাই আসবে, তুমি তাদের দেখবার জন্য বেঁচে থাকবে'।

'অমন বিশজন এলেই বা আমার কি? তুমি তো আর তাদের কাছে ঘেঁষবে না'।

'আচ্ছা, বেশ। কুড়ি জন হোক, আমি সকলের সাথে একসঙ্গে দেখা করে আসব'।

মানুষটির কথাবার্তায় ব্যবহারে গুরু-লঘু পরিহাস, গাম্ভীর্য আর খেয়ালিপনার এমন অদ্ভুত সংমিশ্রণ যে তেইশ বছর ঘর করার পরও স্ত্রী আজও তার প্রকৃতি সম্পূর্ণ জানতে পারেননি। গৃহিণীর মেজাজের স্থিরতা নেই। সব কথার গুরুত্ব বোঝেন না মহিলা। খবরও রাখেন না জগৎ-সংসারের। যখন মেজাজ ভালো থাকে না, তখন স্নায়ু-দৌর্বল্য ঘটেছে মনে করেন। অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর একমাত্র কামনা, মেয়েগুলিকে ভালো ঘরে-বরে দেবেন। সেই নিয়ে যত খবরা-খবর, তাই তাঁর মনের খোরাক।  

২

বিংলের সঙ্গে গোড়ার দিকে যারা আলাপ করলেন বেনেট তাঁদের মধ্যে একজন। যাবার পুরো ইচ্ছেই ছিল তাঁর। তবে স্ত্রীকে এ-সম্বন্ধে নিরাশ করে এসেছিলেন এই ক-দিন। যেদিন বিকেলে দেখা-শোনা হল সেদিন সন্ধ্যে-বেলাতেও স্ত্রী এ-সম্বন্ধে বিন্দু-বিসর্গ জানতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা এই ভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ল। সন্ধ্যে-বেলা মেজ মেয়ে লিজি একটা টুপি নিয়ে টুকিটাকি কাজ করছিল, এমন সময় তাকেই লক্ষ্য করে বাবা বললেন, 'সুন্দর হয়েছে, বিংলে পছন্দ করবে নিশ্চয়ই'।

স্ত্রী বিরক্তির সুরে বললেন, 'তার ভালো লাগা-না-লাগা আমরা জানব কি ক'রে, আমাদের তো আর যাওয়াই ঘটে উঠবে না'।

লিজি মাকে বলল, 'তুমি ভুল করছ কেন, মা! গির্জায় তো দেখা হবেই। তা ছাড়া মিসেস লং তো নিজে বলেছেন আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবেন'।

'মিসেস লং আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি না। ওঁর নিজেরই দুটি ভাইঝি রয়েছে। এমন ভণ্ড স্বার্থপর মেয়েমানুষ কে দেখেছে? আমি তো ওঁকে দু-চোখে দেখতে পারি না'।

'আমারও বিশ্বাস তাই,' বললেন বেনেট। 'তাঁর কাছ থেকে কোন সাহায্য পাবে না। তোমার এ জ্ঞান হয়েছে দেখে খুশি হলাম'।

কি জবাব দেবেন ভেবে না পেয়ে গৃহিণী এক মেয়েকে বকতে শুরু করলেন, 'অমন করে কাশছিস কেন কিটি! আমার মাথাটা ফেটে যাচ্ছে যেন। তোদের একটু মায়া হয় না আমার ওপর!'।

'কিটি কি আর ইচ্ছে করে কাশছে! তবে ওর ঐ কাশি-টাশিগুলো একটু অসময়ে এসে পড়ে আর কি!' বললেন বেনেট।

কিটি রেগে বলল, 'আমি কি মজা করার জন্য কাশছি! তোর নাচ কবে রে, লিজি?'।

'এসে তো পড়ল। পনের দিন পরে'।

মা বললেন, 'তবেই হয়েছে! মিসেস লং তার আগের দিনও এসে পৌঁছবেন না। সুতরাং নিজেই চিনবেন না তাকে, আমাদের আর পরিচিত করিয়ে দেবেন কেমন ক'রে?'।

'সে তো ভালোই হল। বরং তুমিই তাঁর সঙ্গে বিংলের পরিচয় করিয়ে দিও'।

'সে কি করে হয়? তুমি আর আমায় জ্বালিয়ো না বাপু'।

'সে-কথা সত্যি। পনের দিনের পরিচয় কিছুই নয়। এই ক-দিনের পরিচয়ে মানুষের সম্বন্ধে কতটুকুই বা জানা সম্ভব! যাই হোক, তুমি নিজে যদি সাহস করে এগিয়ে না যাও, অন্য কেউ সুবিধে ছিনিয়ে নেবে। মিসেস লং তার ভাইঝিদের জন্যে চেষ্টা তো করবেনই। আর তুমি যদি দায়িত্ব নিয়ে তার সঙ্গে বিংলের পরিচয় করিয়ে না দাও, তোমার জায়গায় আমিই না হয় সে-দায়িত্ব নিলাম'।

মেয়েরা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। তাদের মা শুধু বললেন, 'বোকামি- স্রেফ বোকামি'।   ১৬ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ও ছোটগল্প

'ওই কথাটার মানে কি?' মি. বেনেট চেঁচিয়ে উঠলেন। 'আলাপ-পরিচয়ের কায়দা বা তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া-কোন্টা তোমার মতে বোকামি! না, এ-ব্যাপারে আমি ঠিক তোমার সঙ্গে একমত হতে পারছি না। তুমি-ই বল তো, মা মেরি। তুমি তো খুব চিন্তা-ভাবনা কর। বড় বড় বই পড়ে সব টুকে রাখ। তুমিই বল!'।

মেরি কি বলবে ভাবছিল, এমন সময় বেনেট আবার বললেন, 'আচ্ছা, মেরি ততক্ষণ ভাবুক। আমরা বিংলের কথায় ফিরে আসি'।

'আমি আর বিংলের কথা শুনতে পারি না, বাপু,' বললেন মিসেস বেনেট।

'সে কি গো! শুনে ভারি দুঃখ পেলাম। আগে আমায় তোমার বলা উচিত ছিল। অন্তত একথা জানলে আমি সকালে তার কাছে ছোটাছুটি করতাম না। যাক, আলাপ যখন হয়ে গেছে, তখন তার বোঝাও বইতে হবে আমাদের'।

আকস্মিক ঘোষণায় মেয়েদের মহলে যে-বিস্ময়ের বন্যা বইবে, সেই প্রত্যাশাই করেছিলেন মি. বেনেট। গিন্নীর আনন্দের তো আর সীমা রইল না। অবশ্য প্রথম আনন্দের হৈ-চৈ শেষ হলে তিনি এমন ভাব দেখালেন, যেন এই রকমটাই আশা করেছিলেন ক-দিন থেকে।

'সত্যি, কি ভালো কাজ তুমি করেছ! আমি জানতাম তুমি যাবেই। তোমায় আমি বোঝাতে পারব এ-বিশ্বাস আমার বরাবরই ছিল। এমন একটা পরিচয় করার ব্যাপারে তুমি যে উদাসীন থাকবে না, এ আমি জানি। নিজের মেয়েদের ভালো-মন্দ বাপ হয়ে তুমি তো বুঝবেই। এমন খুশি হয়েছি-সত্যি! আর সকাল বেলা দেখা করে এসে দিব্যি চুপচাপ আছ, ভারি মজার লোক কিন্তু তুমি!'।

স্ত্রীর আনন্দ-দেখে বেনেট ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। যাবার সময় হেসে বলে গেলেন, 'মা কিটি, এবার যত খুশি কাশতে পার তুমি!'।

'অমন বাপের জন্য নিজেদের ভাগ্যবতী মনে করা উচিত তোমাদের'।

দরজা বন্ধ হবার পর মা বললেন, 'ওঁকে যে কি করে তোমরা কৃতজ্ঞতা জানাবে তাই ভাবি আমি। অবশ্য এ-ব্যাপারে আমারও কিছু প্রাপ্য আছে। আমাদের বয়স-কালে কিন্তু জীবন এত মধুর ছিল না। রোজ নতুন-নতুন পরিচয়। আর তোমাদের জন্যে তা-ও আমাদের করতে হবে। লিডিয়া মা, তুমি সব থেকে ছোট, কিন্তু সে তোমার সঙ্গে নাচতে চাইবেই'।

লিডিয়া সাহসের সঙ্গে বলল, 'তাতে আমি ভয় পাই না। সবার ছোট বটে, কিন্তু আমি দিদিদের চেয়েও মাথায় লম্বা'।

বাকি সন্ধ্যেটুকু বিংলের আলোচনাতেই কাটল। কবে নাগাদ যে লোকটি তাদের বাড়িতে আলাপ করতে আসবে! কবে তাঁকে দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করা হবে!।  

৩.

পাঁচ মেয়ের সঙ্গে যোগ দিয়ে বেনেট-গিন্নী স্বামীকে কত রকম করে প্রশ্ন করলেন মানুষটির চেহারা সম্বন্ধে কিছু জানবার জন্যে। কত জোরালো প্রশ্ন করল তারা। কত সোজা প্রশ্ন। কত অনুমান। কত পূর্ব-সিদ্ধান্ত। কিন্তু স্বামী তার উত্তরে এমন রহস্যময় হয়ে রইলেন যে তাদের আকাঙ্ক্ষা মিটল না।

শেষে লেডি লুকাসের শোনা-গল্পের উপরেই নির্ভর করে থাকতে হল। তাঁর বিবরণ খুবই আশাপ্রদ। স্যর উইলিয়ম খুবই পুলকিত। ছেলেটি নাকি অতি সুপুরুষ। অতি মিষ্টভাষী। আগামী উৎসবে সদলে আসবে বলে কথা দিয়েছে। এর চেয়ে আনন্দের সংবাদ আর-কিছু নেই। যে নৃত্যপ্রিয়, সে সহজেই প্রেমিক। সুতরাং বিংলের হৃদয়-জয়ের অতি উজ্জ্বল সম্ভাবনা মেয়েদের মনে জেগে উঠল।

'ঐ ঘরে কোন-একটি মেয়েকে গৃহিণী করতে পারলে ভারি সুখী হব। আর বাকি মেয়েগুলোকেও অমনি ভাবে ঘর করতে দেখলে আমার আর প্রত্যাশার কিছু অবশিষ্ট থাকবে না,' বললেন তিনি।

ইতিমধ্যে বিংলে একদিন এসে লাইব্রেরি-ঘরে বেনেটের সঙ্গে মিনিট দশেক কাটিয়ে গেল। এ বাড়ির মেয়েদের রূপের খ্যাতি আগেই শোনা ছিল তার, তাই মেয়েদের সঙ্গে পরিচিত হবার জন্যেই এসেছিল সে। কিন্তু তাদের বাবার সঙ্গে আলাপ করেই সেদিন ফিরতে হল তাকে। তবে মেয়েরা ভাগ্যবতী। উপরের জানালা থেকে তারা দেখল কালো ঘোড়া থেকে নামল একটি নীল কোট-পরা লোক। কিন্তু ঐ পর্যন্ত।

এরপর নিমন্ত্রণ-লিপি গেল। মা মেয়েদের নিয়ে সেই বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে উদ্যোগ-পর্ব সারছেন, কেমন ভাবে আহারের পদগুলি করবেন যাতে তাঁর গৃহিণীপনার তারিফ হয়। কিন্তু এমন সময় সংবাদ পাওয়া গেল যে বিংলে পরদিনই শহরে যেতে বাধ্য হচ্ছে, সুতরাং নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব হল না। এ কিরকম মানুষ! এসে বসতে-না-বসতেই শহরে যাবার তাড়া পড়ে অনবরত! মা মনে মনে আশঙ্কা করলেন, হয়ত-বা লোকটি কোন জায়গায় স্থায়িভাবে বাস করতে পারে না। অথচ নেদারফিল্ডে স্থির হয়ে বসা খুব-ই উচিত কাজ। কিন্তু লুকাস-গিন্নী তাঁর ভুল ভাঙ্গলেন। বিংলে শহরে গেছে, সেখান থেকে সদলে ফিরে নৃত্যোৎসবে যোগ দেবার জন্য। তার সঙ্গে না-কি আসবে বার-জন সুন্দরী মহিলা আর সাত-জন পুরুষ। এতগুলি মেয়ে আসার সম্ভাবনায় মেয়েরা মর্মাহত হল। কিন্তু যখন শোনা গেল যে লণ্ডন থেকে তাঁর সঙ্গে এসেছে মাত্র ছ-টি মেয়ে -পাঁচটি বিংলের নিজের বোন, আর একটি দূর সম্পর্কীয় বোন, তারা অনেকটা আশ্বস্ত হল। অবশ্য নাচ-ঘরে যখন তারা উপস্থিত হল, তখন দলে মোট পাঁচ-জন-বিংলে, তার দুই বোন, বড় বোনের স্বামী আর একটি যুবক।

বিংলে খুব সুশ্রী ও ভদ্র। মুখখানি হাসিখুশি। কথাবার্তায় সহজ, অমায়িক। বোন দুটিও চমৎকার। ভগ্নীপতি মি. হার্স্ট লোকটি সুন্দর। কিন্তু নাচ-ঘরে ঢোকার পরই যে দীর্ঘাঙ্গ সুদর্শন অভিজাত ভঙ্গিমার তরুণ যুবকটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল সে হল বিংলের বন্ধু। মিনিট পাচেকের মধ্যে সারা ঘরে কানাকানি হল যে এই লোকটির বাৎসরিক আয়ের পরিমাণ দশ হাজার। উপস্থিত ভদ্রজনের মতে তার চেহারাটি ভারি পুরুষালি। যেমন ব্যক্তিত্ব, তেমনি রূপ। মেয়েদের চোখে তাকে বিংলের চেয়েও সুন্দর ঠেকল। উৎসবের প্রথমার্ধ সেই লোকটিকে নিয়েই গুঞ্জন চলল অবিরাম। কিন্তু তার আচরণে শেষের দিকে সকলেই বেশ বিরক্ত বোধ করলেন। সবাই দেখল, লোকটির ভিতরে একটি অহঙ্কারী মানুষ সদর্পে আত্ম-ঘোষণা করে চলেছে, কিছুতেই তার তুষ্টি নেই, সে যেন সব-কিছুরই উপরে। তখন আর দশ-হাজারী সম্পত্তির জৌলুস তাকে বন্ধু বিংলের চেয়ে প্রিয়তর করতে পারল না কারুর কাছে।   বিংলে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘরের প্রধান লোকজনদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠল। তার সপ্রাণ খোলা-মেলা স্বভাবে, সবাই খুশি হল। প্রত্যেকটি নাচে সে যোগ দিল এবং ক্ষুব্ধ হল এত তাড়াতাড়ি নাচ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। যাবার সময় নিজের বাড়িতে একদিন নাচের মজলিস বসাবার কথাও বলে গেল সে। দুই বন্ধুর এই আপাত-বৈষম্য অতি সহজেই চোখে পড়ল সকলের। বন্ধু ডার্সি সারা সন্ধ্যায় দু-বার নাচল, তাও বিংলের দুই বোনের সঙ্গে। অন্য-কোন মহিলার সঙ্গে আলাপ-পরিচয়েও সে রাজি হল না। বাক্যালাপ যা-কিছু হল তাও ঐ পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই। সারা ঘরে ঘুরে ঘুরে বেড়াল একা-একা। সে যেন আর কখনও না আসে এই রকম রায় দিল সবাই-তার দাম্ভিকতায় বিরক্ত হয়ে। তাঁর অতগুলি মেয়ের একটিকেও যে সে চোখ তুলে দেখল না, এই অপরাধে বেনেট-গৃহিণীর আক্রোশ পর্বত-প্রমাণ হয়ে উঠল।

পুরুষদের সংখ্যাল্পতার দরুন লিজিকে দুটি নাচের সময় বিশ্রাম নিতে হল। এই রকম একবার বিশ্রাম নেবার সময় সে দুই বন্ধুর টুকরো টুকরো কথাবার্তা শুনতে পেল। বিংলে বন্ধুকে নাচে যোগ দেবার জন্য পীড়াপীড়ি করে বলল, 'এস ডার্সি। তুমি এভাবে আনাড়ির মতো দাঁড়িয়ে থাকবে তা চলবে না। এস-নাচবে চল'।

'তোমার দুটি বোনই ব্যস্ত হয়ে আছে, আর এ-ঘরে তৃতীয় কোন মহিলা চোখে পড়ছে না যার সঙ্গে নাচাটা শাস্তি মনে হবে না। না, সুবিধে হবে না বন্ধু,' বলল ডার্সি। 'যে আমার নাচের সঙ্গিনী হবে তার সঙ্গে চেনা না থাকলে আমার খুব খারাপ লাগে। এ আসরে তাই অন্য-কোন উপায় নেই'।

'তোমার বাড়াবাড়িরও সীমা নেই। খুব কম নাচের মজলিসেই এত সুন্দরী মেয়ের দেখা মেলে। কয়েকজনকে তো দিব্যি সুন্দরী ঠেকছে আমার চোখে'।

'এ ঘরের একমাত্র তিলোত্তমাটির সঙ্গেই তো তুমি নাচছিলে,' বলে বেনেটের বড় মেয়ের দিকে দেখাল সে।

'সত্যি, অমন সুন্দরী আগে আমার চোখে পড়েনি কখনও। কিন্তু তোমার পেছনেই তার যে-বোনটি বসে আছে সে-ও কম নয়। বল তো, আমার নাচের সঙ্গিনীকে বলে তোমার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিই'।

'কার কথা বলছ!' মুখ ঘুরিয়ে ডার্সি এক ঝলক এলিজাবেথের চোখে চোখ রেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তারপর ঠাণ্ডা গলায় বলল, 'মোটামুটি মন্দ নয়, কিন্তু আমার মন টানছে না দেখে। তাছাড়া যে-মেয়েকে অন্যসব পুরুষ অবহেলা করল, তাকে মমতা দেখাবার মতো সুস্থ মেজাজ এখন আমার নেই। যাঁক, আমার সঙ্গে সময় নষ্ট না করে সুন্দরী সঙ্গিনীর হাস্য-সুধা পান করগে-যাও'।

বিংলে বন্ধুর সদুপদেশ অমান্য করল না। বন্ধুও অন্যদিকে পা বাড়াল। সেইখানে বসে লিজির মন ঐ লোকটির উপর প্রসন্ন হল না। কিন্তু স্বাভাবিক কৌতুকপ্রিয় এলিজাবেথ এই কাহিনী সোল্লাসে বিবৃত করতে ছাড়ল না বান্ধবী-মহলে। তার সহজ সজাগ মন যে-কোন আজগুবি ঘটনা থেকে মজা নিঙড়ে নিতে জানে। 

বেনেট-পরিবারের পক্ষে এই মধুর সন্ধ্যাটি অতি আনন্দের স্মৃতি হয়ে রইল। বিংলে ও তার বোনেরা তাঁদের বড় মেয়েটি সম্বন্ধে যে প্রশংসাস্তুতি জানাল বেনেট-গৃহিণীর কানে তা মধু বর্ষণ করল। বিংলে নিজে তার সঙ্গে দু-বার নেচেছে। জেন নিজেও স্বভাব অনুযায়ী এই সৌভাগ্যে নীরব আনন্দে মগ্ন হয়ে ছিল। জেনের খুশিতে খুশি হয়ে উঠেছিল এলিজাবেথ। এখানকার মহিলা-সমাজের সব থেকে বিদুষী ও মার্জিত রুচির মেয়ে হিসেবে তাকে পরিচিত করিয়ে দেওয়ায় মেরিরও আনন্দের সীমা ছিল না। আর ক্যাথারিন ও লিডিয়া-তাদের আনন্দ, বল-নাচে তারাও জুড়ি পেয়েছিল। তার বেশি কিছু চাইবার আকাঙ্ক্ষা আজও তাদের মনে জাগেনি। রাতে সকলে বাড়ি ফিরে দেখে-বাবা তখনও জেগে। আজকের সন্ধ্যায় মেয়েদের ও তাদের মায়ের মনে যে প্রকাণ্ড আশা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছিল, তার কতখানি সফল হয়েছে, সে-সম্বন্ধে জানার কৌতূহল তাঁরও কম ছিল না। তাই একটা বই নিয়ে তিনি অপেক্ষা করে বসেছিলেন। নবাগতের সঙ্গে পরিচয়ে স্ত্রীর যে গভীর আশা-ভঙ্গ হবে এমনি ধারণা ছিল তাঁর মনে। কিন্তু স্ত্রীর কণ্ঠে তিনি অন্য সুর শুনলেন।

ঘরে ঢুকেই বেনেট-গিন্নী স্বামীকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আজ কি সুন্দর কাটল সন্ধ্যে-বেলাটা! এমন ভালো নাচের আসর দেখা যায় না। তুমি যদি থাকতে খুব ভালো হত। সব থেকে খুশির খবর কি জান, সবাই জেনকে প্রশংসা করল একমুখে। সবাই বলল, অমন সুন্দরী দেখা যায় না। বিংলের চোখে ধরেছে তাকে। দু-দুবার তার সঙ্গে নাচল সে। ভাব একবার ব্যাপারটা! দু-বার যেচে এসে তার হাত ধরল নাচবার জন্যে। ভাব ঐঘরে অত মেয়েদের মধ্যে জেনের সঙ্গেই সে যেচে নাচল দ্বিতীয়বার। প্রথমে তো মিস লুকাসকে অনুরোধ করল। অমন একটা সুপুরুষ ছেলে-সে কিনা ঐ মেয়ের সঙ্গে নাচতে দাঁড়াল! যাই হোক, তাকে খুব একটা পছন্দ করল না। আর তা কি কেউ করতে পারে? জেন যে-রকম সাবলীল ভঙ্গিতে নাচছিল, তাই দেখছিল বিংলে। তারপর ওর সম্বন্ধে সব জিজ্ঞেস করে জেনে নিল। তখন দ্বিতীয় নাচের জন্য তার সঙ্গী হতে তাকে অনুরোধ করল। তৃতীয়টি নাচল মিস কিংয়ের সঙ্গে। তার পরের বারের সঙ্গিনী মারিয়া লুকাস। পঞ্চম নাচে আবার জেনকে। ষষ্ঠ নাচে লিজি আর বুলেঙ্গার'।

'নিজের ওপর কিছুমাত্র দরদ থাকলে, কারুর অত নাচা উচিত নয়। ওর অর্ধেক হলেই যথেষ্ট হত।' বেনেট অধৈর্য হয়ে বললেন, 'আর আমি তার সঙ্গিনীদের নাম শুনে পারছি না-প্রথম নাচের সময়েই যদি ওর গোড়ালিতে টান ধরত বেঁচে যেত ছোকরা'।

'তুমি যাই বল,' বেনেট-গিন্নী বলে চললেন, 'আমার তো বাপু, ওকে খুব ভালো লেগেছে। কি সুন্দর দেখতে বল তো! ওর বোনগুলিও ভালো। আর যা সাজগোজ করে এসেছিল, এমন সুন্দর ফ্যাশানের পোশাক বাপু, আমি জীবনে দেখিনি। মিসেস হার্স্টে'র গাউনে যে-জরির ফিতে ছিল-'।

বেনেট তাকে বাধা দিলেন। তিনি ওসব সৌখিনতার কথা জানতে চান না। বাধ্য হয়ে স্ত্রী গল্পের গতির মোড় ফেরালেন। তখন অতি কটু কণ্ঠে কিছুটা আতিশয্যে রাঙিয়ে তিনি ডার্সির দাম্ভিকতার উল্লেখ করলেন, 'ওরকম লোকের নজর না পেয়ে লিজির বা আমাদের কোনই ক্ষতি হয়নি। এমন আত্মাভিমানী বদমেজাজী লোককে সহ্য করা যায় না। ওকে খুশি করার কোন মানেই হয় না। ঘরের মধ্যে ঘুরছে ফিরছে, নিজেকে মনে করছে কি নাকি! বলে কিনা নাচের জুড়ি হবার মতো লিজি সুন্দরী নয়। সেই আসরে তুমি যদি থাকতে, রীতিমতো একটা শিক্ষা দিতে পারতে তাকে। এমন লোক আমি মোটেই দেখতে পারি না'।  

৪

দুই বোন-জেন আর এলিজাবেথ যখন একলা হল, এতক্ষণের অতি-সাবধানী কথাবার্তার পর জেন তার মনের কথা খুলে বলল বোনের কাছে। মি. বিংলেকে তার খুব ভালো লেগেছে।

'চমৎকার মানুষ। আধুনিক যুবকের যেমনটি হওয়া উচিত ঠিক তাই। যেমন ভদ্র তেমনি বুদ্ধিমান আর সুরসিক। এমন সহজ শালীনতা আমার আগে কখনও চোখে পড়েনি'।

এলিজাবেথ বলল, 'দেখতেও খুব সুন্দর-যেমনটি একজন যুবকের হওয়া উচিত। তার চরিত্রটি এ থেকে সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে'।

'সত্যি, দ্বিতীয়বার আমাকে নাচের সঙ্গিনী করার প্রস্তাবে আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। এতখানি সৌভাগ্য আশা করতে পারিনি আমি'।

'তাই নাকি? আমি কিন্তু আশা করেছিলাম তোর হয়ে। তোতে আমাতে একটা গোড়াকার তফাত কি জানিস, সম্মান তোকে বিস্মিত করে, আমায় করে না। তোকে দ্বিতীয়বার অনুরোধ করার চেয়ে স্বাভাবিক অন্য-কিছু আমি ভাবতেও পারি না। তোর মতো সুন্দরী রূপসী মেয়ে সেখানে দ্বিতীয় কেউ ছিল না। তবু তার সাহসের প্রশংসা করি আমি। ঐ রকম পুরুষের অনুরাগিণী হলে আমি খুশিই হব। ওর চেয়ে ঢের নিরেস লোককেও তো তুই পছন্দ করেছিস আগে'।

'কি যে বলিস তুই, লিজি!'।

'সত্যিই তো। তুই নিজে এত ভালো যে সকলেই তোর কাছে ভালো। লোকের দোষের দিকটা তোর চোখেই পড়ে না কখনও। তোর চোখে জগতের সব-ই ভালো, সব-ই পছন্দসই। আমি তোর মুখে কখনও তো কারুর নিন্দে শুনিনি আজ অব্দি'।

'আমার মতে অবিবেচকের মতো ধপ করে কারুর নিন্দে করা উচিত নয়। কিন্তু তাই বলে সত্যি কথা বলতেও আমি পিছ-পা নই'।

'আমি জানি। আর সেটাই তোর চরিত্রের মাধুর্য। তোর উদার স্বভাবের জন্যে লোকের বোকামি আর ইতরামি চোখেও দেখতে পাস না। সরলতার ভান অবশ্য অনেকেই করে-এটা হামেশাই চোখে পড়ে। কিন্তু বিনা মতলবে বা বাইরে আড়ম্বর না দেখিয়েই সরলতার প্রকাশ-মানুষের স্বভাবের ভালো দিকটা দেখে তাকে আরও ভালো করে তোলা, আর মন্দটার দিকে চোখ বুজে থাকা--এ কেবল তোর মধ্যেই দেখেছি আমি। আর সেইজন্যেই ঐ লোকটির বোনেদের তোর পছন্দ হয়েছে। তাই না? ওদের স্বভাব তোর ধারেকাছেও লাগে না'।  

'প্রথম দৃষ্টিতে তাই মনে হয় বটে। কিন্তু ওদের সঙ্গে আলাপ করলে তোরও ভালো লাগত। শুনলাম বোনটি দাদার কাছেই থাকবে। ওর সংসারের হাল ধরবে। আমার তো মনে হয়, প্রতিবেশী হিসেবে ভাইবোন খাসা হবে'।

নিঃশব্দে শুনল এলিজাবেথ, কিন্তু সে দিদির কথা সমর্থন করতে পারল না। ঐ সম্মিলনীতে ওরা যেভাবে ব্যবহার করেছে তার মধ্যে সকলের মনোরঞ্জন করবার কোন প্রয়াস ছিল না। বোনের চেয়ে তার দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা বেশি। আর সব-কিছু মেনে নেওয়ার স্বভাবও তার নয়। ওর প্রতি বিশেষ মনোযোগ না দেওয়ায় সে যুক্ত মন নিয়েই তাদের বিচার করতে পারছে এবং ওদের আচরণ সে সমর্থন করতে পারল না। মহিলা হিসেবে ওদের সুখ্যাতি করতেই হয়। প্রসন্ন থাকলে সরস হাস্যময়ী। তবে প্রয়োজনে দাম্ভিক ও আত্মসচেতন। দেখতে সুরূপা। শহরের বে-সরকারী স্কুলে লেখাপড়া করেছে। আর খরচের হাত ওদের আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। আর্থিক সঙ্গতি ভালো-কুড়ি হাজার পাউণ্ড। সমাজের উঁচু তলার মানুষদের সঙ্গে মেশে। নিজেদের সম্বন্ধে যেমন ধারণা উঁচু, অন্যের সম্বন্ধে তেমনি হীন ধারণা। উত্তর-ইংল্যাণ্ডের বাসিন্দা। ওদের আর ওদের ভাইয়ের বাড়-বাড়ন্ত সব ব্যবসা-বাণিজ্যে।

বাবার কাছ থেকে বিংলে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে এক লক্ষ পাউণ্ডের সম্পত্তি। তাঁর বাবার ইচ্ছে ছিল একটা জমিদারি কেনা, কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় তা ঘটে ওঠেনি। বিংলের নিজের ইচ্ছেও তাই। সেইমতো জায়গা নির্বাচনপর্ব চলছিল। কিন্তু এখানকার এই উদ্যান-প্রাসাদে তার এমন মন পড়ে গেছে, আর তার স্বভাবই এমন সহজে খুশি হয় যে তাতে মনে হয় এখান থেকে সে আর জীবনে নড়বে না। জমিদারি কেনার ব্যাপারটা হয়ত তোলা রইল পরবর্তী বংশধরদের জন্যে।

তার বোনেদেরও ইচ্ছে যে বিংলে একটা জমিদারির মালিক হয়ে বসুক। তবে এখানে এই সম্পত্তিতে যদিও প্রজা হিসেবে সে বসল, তবু মিস বিংলে তার তত্ত্বাবধানে অরাজি নয়। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে যার সঙ্গে, ফ্যাশানের সঙ্গে যার অর্থ-সঙ্গতির মিল নেই। সে এখানে থাকতে ততটা উৎসুক নয়। বিংলে সাবালক হবার বছর দুয়েকের মধ্যে এই নেদারফিল্ড বাগানবাড়ি তাকে হঠাৎ একদিন দেখানো হয়। দেখেই তার মন বসে যায়। আধ-ঘণ্টা দেখাশুনোর পর এর পরিবেশ আর ঘরদুয়ারের পরিকল্পনা তার রুচিমতো হওয়ায় বিংলে আর দ্বিরুক্তি করেনি। এটি নেওয়ার সম্বন্ধে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

বিংলে আর ডার্সির চরিত্রের গঠনে মিলের চেয়ে অমিল অনেক বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্ব। বিংলের খোলা স্বভাব, তার স্নিগ্ধ মেজাজ ও সারল্যের জন্য ডার্সি তাকে খুব পছন্দ করত। নিজের চরিত্রে এর কোনটিই নেই বটে, কিন্তু তার জন্যে ডার্সির কোন অসন্তোষ নেই। ডার্সির বিচার-বুদ্ধির উপর বিংলের দৃঢ় প্রত্যয়। তার ব্যক্তিত্বের উপর তার দারুণ শ্রদ্ধা। বিজ্ঞতায় বোধ করি ডার্সিই সেরা। বিংলের তুলনায় ডার্সি চতুরও খুব। কিন্তু ডার্সির দাম্ভিক আত্মকেন্দ্রিক ও খুঁতখুঁতে স্বভাবের দরুন তার ব্যবহারে যতই আভিজাত্য ফুটে উঠুক তাকে জনপ্রিয় করে না। সেদিক থেকে বিংলের সমাদর বেশি। যেখানে যাবে সেখানেই তার জনপ্রিয়তা। আর ডার্সির স্বভাব হল মানুষকে ঘা দেওয়া। এই দুটি বন্ধু সেদিনকার নাচের সভায় যে-অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেছিল, তার মধ্যেই তাদের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছিল। এমন মনোরম পরিবেশ ও সুন্দরী নারীর সমাবেশ বিংলে আগে দেখেনি। এখানে সকলেই তাকে প্রগাঢ় স্নেহ ও প্রীতি দেখিয়েছে, কৃত্রিমতা বা জড়তার কোন স্পর্শ সেখানে ছিল না। সব বাড়ির সঙ্গেই তার পরিচয় হয়েছে। বেনেট-পরিবারের বড় মেয়ের চেয়ে কোন রূপবতী মেয়ে এ পর্যন্ত তার চোখে পড়েনি। আর ডার্সির চোখে এ-একটা জনারণ্য মাত্র-যেখানে কোন আধুনিক আদব-কায়দা নেই, সৌন্দর্য ও রুচির অভাব। কেউই তাকে সমাদর করেনি বা তার দিকে মনোযোগ দেয়নি, সে-ও কারুর জন্যে আকর্ষণ অনুভব করেনি। জেনের সম্বন্ধে ডার্সির ধারণা মেয়েটির রূপ আছে বটে, কিন্তু সে হাসে বড় বেশি।

বিংলের বোন দুটিও জেন সম্বন্ধে তাদের রায় দিল এই বলে যে, মেয়েটি ভারি সুন্দরী আর মিষ্টি। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় করায় কোন আপত্তির কারণ থাকতে পারে না। সুতরাং জেন মোটামুটি সকলের মতে প্রিয়ভাষিণী ও প্রিয়দর্শিনী প্রমাণিত হওয়ায় বিংলে তার সম্বন্ধে আপন অভিরুচিমতো অগ্রসর হতে আর-কোন বাধা দেখল না। 

 ৫

এখান থেকে সামান্য হাঁটা-পথ দূরে যারা থাকে, তাদের সঙ্গেই বেনেট-পরিবারের একটু বেশি ঘনিষ্ঠতা। পরিবারের কর্তা স্যার লুকাস আগে মেরিটন শহরে ব্যবসাদি করে কিছু ধন-সম্পত্তি করেছিলেন। তিনি যখন মেয়র ছিলেন তখন সম্রাটকে এক মানপত্রে অভিনন্দিত করে নাইট হন। রাজ-সম্মান তাঁর মানসিকতায় দারুণ পরিবর্তন আনে। সামান্য ব্যবসা ও ছোট শহরে বাস, দুইয়ের উপরই তাঁর বিতৃষ্ণা জন্মাল। সে-সব ছেড়ে তিনি সপরিবারে মেরিটন থেকে মাইল খানেক দূরে এই বাড়িটিতে এসে বাস করছেন। লোকে এটিকে 'লুকাস-লজ' বলেই জানে। এখানে নিজের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তিনি বাস করছেন। ব্যবসার ঝঞ্ঝাট নেই। দুনিয়ার সকলের সঙ্গে ভালো সম্বন্ধ বজায় রেখে চলেন। সমাজের অভিজাতমহলের মানুষ হয়েও তাঁর চরিত্রে সেই উন্নাসিকতা নেই। স্বভাবত নিরীহ বন্ধুবৎসল পরোপকারী মানুষটি, রাজ-সম্মানে ভূষিত হয়ে আরও বেশি সজ্জন হয়েছেন।

লেডি লুকাসও শান্ত ভালোমানুষ মহিলা। মিসেস বেনেটের মতো নন। লুকাসদের অনেকগুলি পুত্র-কন্যা। বড়টি মেয়ে এখন বয়স হবে সাতাশ। বুদ্ধিমতী মেয়েটি এলিজাবেথের প্রিয় সখি।

এমন দুটি পরিবারের মেয়েরা আসন্ন নাচের প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে, এ আর আশ্চর্য কি? পরের দিন সকালেই সবাই লংবোর্নে এসে উপস্থিত হল নিজেদের মধ্যে মতামত বিনিময় করতে।

বেনেট-গিন্নী ভারিক্কি চালে লুকাস-পরিবারের একটি মেয়েকে বসলেন, 'কালকের আসরে তুমিই তো প্রথম ভাগ্যবতী, শার্লোটি। তুমিই প্রথম বিংলের জুড়ি হয়েছিলে, না?'।

'কিন্তু তার ভালো লেগেছিল দ্বিতীয় জুটিকে'।

'তুমি জেনের কথা বলছ-তাকে দুবার সঙ্গিনী করার জন্য? মনে হয় বটে যে তার ওপর ছেলেটির আকর্ষণ বেশি। আর সেই রকমই যেন শুনেছিলাম কার কাছে! রবিনসন কি যেন সব কানাকানি-'।

'আমিও সে-কথা শুনেছি অনেকটা। আপনাকে বলিনি বুঝি? রবিনসন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন লাগছে এখানকার সমাজ? এই আসরে অনেক রূপসী মেয়েই তো এসেছে-তাদের মধ্যে কোন্টিকে তাঁর সর্বোত্তমা মনে হয়? শেষ প্রশ্নটির জবাব তো তখুনি দিলেন তিনি, 'এ সম্বন্ধে দ্বিমত থাকতেই পারে না যে বেনেট-পরিবারের বড় মেয়েটিই সবচেয়ে সুন্দরী'।

'খুবই স্বস্তির কথা। অবশ্য নিজের মনের কথা দ্বিধাহীন ভাবেই বলেছে সে-মনে হয় বটে যে সবই ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু না, হয়ত-বা শেষ অব্দি সব-কিছু মরীচিকা হয়ে দাঁড়াবে। কিছুই তো এখুনি বলা যায় না'।

শার্লোটি বলল, 'জানিস লিজি, তোর চেয়ে আমি যা শুনেছি তার মূল্য অনেক বেশি। মি বিংলের কথা শোনার চেয়ে তার বন্ধুর কথা শোনা ঢের মজার। আহা লিজিরে- কোনরকমে চলনসই!'।

'না, মা। ঐ রকম অপ্রিয় মানুষের বাজে ব্যবহারের কথা আর তুমি ওকে মনে করিয়ে দিয়ো না। ঐ রকম কোন ছেলে লিজির ভালোলাগার মানুষ হলে তা হবে ভাগ্যেরই বিড়ম্বনা। আমায় মিস লং কাল রাতে বলছিলেন যে আধ ঘণ্টা মি. ডার্সির পাশে বসেও তিনি তার মুখ থেকে একটি কথাও শুনতে পাননি'।

'সে কি?' জেন বলল, 'আমি দেখেছি মি. ডার্সি তাঁর সঙ্গে কথা কইছেন'।

'সে যখন-মিসেস লং সেধে জিজ্ঞেস করলেন যে নেদারফিল্ড কেমন লাগছে। তখন আর জবাব না দিয়ে উপায় ছিল না। কিন্তু এই গায়ে-পড়া আলাপে সে যেন বেশ রাগের ভাব দেখিয়েছিল'।

'আমায় তো বিংলের বোন বলছিলেন যে মানুষটি এমনিই মিতভাষী। খুব পরিচিত সমাজ ছাড়া বেশি কথা বলেন না। যেখানে বলেন সেখানে তিনি অতি সদালাপী'।

'এর একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না, মা। লোকটি যদি খুব সামাজিক হত মিসেস লংয়ের সঙ্গে নিশ্চয় কথা বলত। কিন্তু কেন যে বলেনি তার কারণ আমি অনুমান করতে পারি। সবাই বলে লোকটি অতিমাত্রায় দাম্ভিক। ও নিশ্চয়ই শুনেছিল যে মিসেস লংয়ের নিজের গাড়ি নেই। ভাড়া-গাড়িতে এসেছিলেন নাচের মজলিসে'।

'না-ই কথা বলুন মিসেস লংয়ের সঙ্গে, কিন্তু লিজির সঙ্গে তার নাচা উচিত ছিল,' মিস লুকাস বলল।

মা ফোঁস করে বললেন, 'আমি যদি হতাম, কখনও আর ভবিষ্যতে তার সঙ্গে নাচতাম না'।

'আমিও তোমায় কথা দিচ্ছি, মা, ওর সঙ্গে জীবনে কখনও নাচব না'।

শার্লোটি বলল, 'জানেন, লোকের দন্ত দেখলে রাগ হয়, কিন্তু মি. ডার্সির দম্ভ দেখে আমার রাগ হয়নি। কেন বলছি। অমন বংশ-গৌরব, অত টাকা, অমন সুপুরুষ- তাতে বাপু, একটু অহঙ্কার হবারই কথা। আমার তো মনে হয়, তাঁরই দাম্ভিক হওয়ার অধিকার আছে'।

'খুবই খাঁটি কথা।' বলল এলিজাবেথ, 'আমি ওঁর দম্ভ মেনে নিতে পারতাম যদি আমার দাম্ভিকতায় তিনি না আঘাত দিতেন'।

মেরি আপন চিন্তায় মগ্ন ছিল। কৌতূহলী হয়ে সে যোগ দিল এই আলোচনায়। 'আমার ধারণা, অহঙ্কার মানুষের একটা স্বাভাবিক দুর্বলতা। পড়েশুনে দেখলাম তো, আমাদের সকলেরই এ-দুর্বলতা আছে। মানুষের চরিত্রের প্রবণতাই এই দিকে। অধিকাংশ লোকই নিজের বিশেষ বিশেষ কোন গুণপনা নিয়ে-তা সে বাস্তবই হোক বা কাল্পনিকই হোক-আত্মমগ্ন থাকে। কিন্তু শূন্য দম্ভে আর আত্মগরিমায় কিছু প্রভেদ আছেই- যদিও লোকে দুটো কথাকেই সমার্থক মনে করে। দাম্ভিক না হয়েও মানুষ অহঙ্কারী হতে পারে। মানুষের নিজের সম্বন্ধে ধারণার মধ্যেই অহং বোধ সীমাবদ্ধ, আর দাম্ভিক লোক অপরকে নিজের সম্বন্ধে উঁচু ধারণা পোষণ করানোর জন্য অপচেষ্টা করে'।

লুকাসদের একটি কমবয়সী ছেলে তার দিদিদের সঙ্গে এসেছিল। সে বেশ জোর গলায় জানাল, 'আমি যদি মি. ডার্সির মতো বড়লোক হতাম, আমি তো খুবই দেমাকী হতাম। এক দঙ্গল শিকারী হাউণ্ড রাখতাম আর রোজ এক বোতল করে মদ খেতাম'।

বেনেট-গিন্নী বললেন, 'তাহলে আর মদ গেলার সীমা-পরিসীমা থাকত না। তোমার হাতে ও জিনিস দেখলে আমি তখুনি ছিনিয়ে নিতাম'।

ছেলেটি খুব প্রতিবাদ জানাল, 'তা করা কিন্তু মাসিমার উচিত হবে না'।

বেনেট-গিন্নী কিন্তু না-ছোড় বান্দা। ছেলেটিও রাজি নয়-এই ভাবে কেউ তার ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। লুকাসরা যখন বিদায় নিতে উঠে দাঁড়াল, তখনই এই বাদ-বিসংবাদ থামল।