জেন অস্টেনের ম্যান্সফিল্ড পার্ক - অষ্টাদশ পর্ব
- 07 May, 2026
- লেখক: সুস্মিতা সরকার
(১৮)
সবকিছুই নিয়মমাফিক যেমন চলার কথা তেমনই চলছে। থিয়েটার, অভিনেতা অভিনেত্রী, পোশাকআসাক, সবই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে যতই সেরকম অসুবিধা কিছু বোঝা যা যাক, সবাই যে ঠিক সেভাবে খুশি নয় এটা বুঝতে ফ্যানির খুব বেশি দিন সময় লাগল না। শুরুর দিকে সবাই যতোটা খুশি আর সব বিষয়ে একমত ছিল, যা দেখে ওর কিছুটা অস্বস্তিই হচ্ছিল, সেটাও এখন আর সেরকম নেই। একটু একটু করে সবাই কোনও না কোনও ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হতে শুরু করেছে।
এডমন্ড বিরক্ত নানান কারণে। ওর মতের একেবারে বিরুদ্ধে গিয়ে শহর থেকে একজন দৃশ্যশিল্পী আনা হয়েছে। তিনি কাজও শুরু করে দিয়েছেন। ফলে শুধু যে খরচের বহরটা বাড়ল তা নয়, তার থেকেও ভয়ের ব্যাপার যে পুরো আয়োজনটা আরও বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে উঠল। তাছাড়া, এডমন্ড চায় নাটক অভিনয়ের ব্যাপারটা শুধু নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে। কিন্তু ওর দাদা টম সে কথা শুনলে তো! সে তো যাকেই পাচ্ছে, তাকেই পরিবারসহ নিমন্ত্রন করে বসছে।
অভিনয় করার লোক কম হওয়ায় টম শুধু যে বাটলারের চরিত্রে অভিনয় করছে তা নয়, ও আরও ছোট ছোট বিভিন্ন চরিত্র বাটলারের চরিত্রের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছে। আর সব চরিত্রের সমস্ত সংলাপ মুখস্ত করেও ফেলেছে। তাই অভিনয়ের মহড়া শুরু করার জন্য ওর যেন আর তর সইছে না। এদিকে শহর থেকে আনা দৃশ্যশিল্পীর কাজ এতো ধীরে সুস্থে এগোচ্ছে যে অপেক্ষা করতে করতে টম নিজেও তিতিবিরক্ত। কোনও কিছু না করে শুধু বসে বসে একেকটা দিন পেরোচ্ছে, আর টমের মনে হচ্ছে এসব চরিত্রগুলোর আদতে কোনও মূল্যই নেই। যত সময় যাচ্ছে, অভিনয় করার জন্য অন্য কোনও নাটক কেন বেছে নেওয়া হলো না, সেই নিয়ে টমের আক্ষেপ বেড়ে চলেছে।
ফ্যানি সব সময়ই খুব ভালো শ্রোতা। ও সবার সব কথা খুব ভদ্রভাবে, ধৈর্যের সঙ্গে মন দিয়ে শোনে। কিছুটা সেজন্য আর কিছুটা আর অন্য কাউকে না পেয়ে সবাই ওর কাছেই ওদের মনের সব দুঃখ কষ্টের কথা, বিভিন্ন অভিযোগ উজার করে দেয়। একমাত্র ওই জানে যে জন নাকি খুব চড়া দাগের অভিনয় করে। আবার অন্যদিকে জন যে হেনরির ব্যাপারে বেশ হতাশ, সেটাও ওর জানা। ওর কানে এটাও এসেছে যে টম নাকি এতো তাড়াতাড়ি সংলাপ বলে যে কিছুই বোঝা যায় না। আর মিসেস গ্রান্ট নাকি সব কিছুতেই এমন হেসে ফেলেন যে সব মাটি হয়ে যায়। এডমন্ড তো নাকি নিজের সব সংলাপ মুখস্তই করে উঠতে পারে নি এখনও। ওদিকে ফ্যানি জানতে পেরেছে যে মিস্টার রাশওয়ার্থের সঙ্গে অভিনয় করাটাই এক দুরূহ ব্যাপার, কারণ সে চায় প্রতিটা সংলাপ বলার সময় আড়াল থেকে কেউ তাকে প্রম্পট করুক। ফ্যানি এটাও জানে যে বেচারা রাশওয়ার্থ ঠিকমতো মহড়া দেওয়ার জন্য কাউকেই পায় না। যেভাবে আর সবার সব অভিযোগ ওর কানে আসে, ঠিক সেভাবেই রাশওয়ার্থের অভিযোগটাও ওর কানে এসে পৌঁছিয়েছে। এছাড়া মারিয়া যেখানে বেচারা রাশওয়ার্থকে কিছুটা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাচ্ছে, সেখানে হেনরির সঙ্গে ওর অভিনয়ের প্রথম দৃশ্যটা যে বারে বারে অকারণেই মহড়া দিচ্ছে, এটাও ফ্যানির নজর এড়ায় নি। ব্যাপারস্যাপার দেখে ফ্যানির তো আতঙ্ক জাগছে যে, শিগগিরই রাশওয়ার্থ না আবার নতুন কোনো অভিযোগ নিয়ে তার কাছে হাজির হয়। এই নাটক নিয়ে মহড়াটা আনন্দ করে উপভোগ করা তো দূরের কথা, ফ্যানি দেখছে সবারই কোনও না কোনও অভাব থেকে যাচ্ছে। আর সবাই একে অন্যের উপর কিছু না কিছু নিয়ে অসন্তুষ্ট। কারোর যদি মনে হচ্ছে যে তার অভিনয়ের অংশটা অনেক বড়, তো কারোর আবার মনে হচ্ছে তার অভিনয়ের অংশটা বড্ড ছোট। সবারই মনে হচ্ছে অন্যরা নাটকের ব্যাপারে যতোটা দরকার ততোটা মনোযোগ তো দিচ্ছেই না, এমন কী মঞ্চের কোন পাশ দিয়ে ঢুকতে হবে সেটা পর্যন্ত মনে রাখছে না। আসলে ফ্যানির কাছে যেই অভিযোগের ঝুলি খুলে বসছে, তারই মনে হচ্ছে যে সে ছাড়া আর কেউই নিয়মটিয়ম মেনে চলার ধার ধারে না।
আর সবাই যতোটা আনন্দ পাচ্ছে, ও নিজেও এই নাটক থেকে ঠিক ততোটাই নির্মল আনন্দ পাচ্ছে, ফ্যানি অন্তত মনে মনে এটাই বিশ্বাস করে। হেনরি বেশ ভালোই অভিনয় করছে। এমনিতে মারিয়ার উদ্দেশ্যে বলা হেনরির কিছু সংলাপে একটু অস্বস্তি হয় বটে, তবুও হেনরির ভালো অভিনয়ের কারণেই চুপচাপ থিয়েটারে ঢুকে নাটকের প্রথম অংকের মহড়া দেখতে বেশ ভালোই লাগে ফ্যানির। মারিয়ার অভিনয়ও ওর বেশ ভালোই লাগছে। সত্যি কথা বলতে কী, মারিয়া যেন একটু বেশিই ভালো অভিনয় করছে। দু একবার মহড়া হওয়ার পর থেকে দেখা গেল, ফ্যানিই ওদের একমাত্র দর্শক হয়ে উঠেছে। ও কখনও প্রম্পট করার কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে আবার কখনও একজন দর্শক হিসেবে নিজের মতামত জানিয়েও সবার কাজে আসছে। ফ্যানির বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী হেনরিই সবথেকে দড় অভিনেতা। একদিকে যেমন এডমন্ডের চেয়ে ওর আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি, তেমনই অন্যদিকে টমের চেয়ে ওর বিচারবোধও প্রখর, আর জনের চেয়ে ওর প্রতিভা ও রুচিও অনেক উন্নত মানের। মানুষ হিসেবে হেনরিকে ভালো না লাগলেও সেরা অভিনেতা হিসেবে ওকে অস্বীকার করতে পারছে না ফ্যানি। আর সত্যি কথা বলতে গেলে, এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করার মতো খুব বেশি কেউ নেইও। জনের অবশ্য হেনরির অভিনয়ের এই শান্ত ও নিস্তরঙ্গ ভঙ্গিমা পছন্দ নয়। ওর মতে হেনরির এই অভিনয়ের ধরণ বড্ড ম্যাড়মেড়ে আর প্রাণহীন। শেষ পর্যন্ত সেই দিনটাও ঘনিয়ে এল, যেদিন মিস্টার রাশওয়ার্থ একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফ্যানির দিকে তাকিয়ে বলেই ফেলল, “তোমার কি মনে হয় হেনরির অভিনয়কে ভালো বলার কোনও জায়গা আছে? আর সে তুমি যাইই বলো না কেন, মরে গেলেও আমি ওর প্রশংসা করতে পারব না। আর দেখো, শুধু তোমাকেই বলছি, এইটুকুন এক পুঁচকে বেঁটেখাটো আর পাতি চেহারার লোককে ভালো অভিনেতা হিসেবে খাড়া করা হচ্ছে দেখে আমার তো হাসিই পেয়ে যাচ্ছে।”
একদিকে মারিয়া আর হেনরির ক্রমে বেড়ে চলা ঘনিষ্ঠতা দেখে মিস্টার রাশওয়ার্থ আবার হিংসেয় জ্বলেপুরে যাচ্ছে আর অন্যদিকে হেনরির মন জেতার আশায় মারিয়া ওর হবু বরের জ্বলনে প্রলেপ দেওয়ার কোনও প্রয়োজনই মনে করছে না। ফলে সব মিলিয়ে মিস্টার রাশওয়ার্থের নিজের ৪২টা সংলাপ ভালো করে আয়ত্ত্ব করার যেটুকু সম্ভাবনা ছিল, সেটুকুও গায়েব হয়ে গেল। তবে সত্যি বলতে কী, ও যে মোটামুটি অভিনয় করে হলেও উতরে দিতে পারবে সেটা এক ওর নিজের মা ছাড়া আর কেউ আদৌ আশাই করে না। ওর মা’ই একমাত্র একজন যিনি শুধু মিস্টার রাশওয়ার্থ ভালো অভিনয় করবে বলে আশা করেন তা নয়, বরং নাটকে তার ছেলের চরিত্রটা বড্ড ছোট বলে আক্ষেপও করেন। মহড়া যথেষ্ট এগোলে তবেই তিনি ম্যান্সফিল্ডে আসবেন বলে ঠিক করলেন, যাতে ছেলের সব গুলো দৃশ্য একবারে দেখে বুঝতে পারেন। বাকিদের অবশ্য মিস্টার রাশওয়ার্থের কাছে প্রত্যাশা বলতে কিছুই নেই। সবাই ভাবছে মিস্টার রাশওয়ার্থ শুধু তার আগের অভিনেতার দেওয়া ইঙ্গিত বুঝে নিজের সংলাপের প্রথম লাইনটা মনে করে বলতে পারলেই যথেষ্ট। বাদবাকি সবটা কোনমতে প্রম্পটার দিয়ে ঠিক সামলে নেওয়া যাবে। সব দেখে কিছুটা মায়া দয়া করেই মিস্টার রাশওয়ার্থকে ভালো করে শেখানোর ঝামেলা নিজের ঘাড়ে তুলে নিলো ফ্যানি। ওর ক্ষমতায় যতোটা কুলায়, ও মিস্টার রাশওয়ার্থকে সংলাপ মুখস্ত করতে সাহায্য করল। এমনকি যেহেতু মিস্টার রাশওয়ার্থ স্বাভাবিকভাবে সংলাপ মনে রাখতে পারছে না, তাই ফ্যানি আরও নানা ভাবে সংলাপ মনে রাখার উপায় শেখানোর চেষ্টা করল। কোনও একটা বিশেষ শব্দের সঙ্গে কোনও ঘটনা বা দৃশ্যকল্প জুড়ে, বা অন্য শব্দের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে সংলাপগুলো আয়ত্ত্ব করানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেল। এমনকি সে কারণে ও নিজেও মিস্টার রাশওয়ার্থের সমস্ত সংলাপ মুখস্ত করে ফেলল। কিন্তু দেখা গেল সে সবই ভস্মে ঘি ঢালা ছাড়া আর কিছুই না। কোনও কিছুতেই মিস্টার রাশওয়ার্থের বিশেষ কোনও উন্নতি হলো না।
কোনো সন্দেহ নেই যে ফ্যানির মনে একইসঙ্গে একরাশ অস্বস্তি, উদ্বেগ আর ভয় কাজ করছে। তবে এই মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যেও সবাই ক্রমাগত ওর সময় আর মনোযোগ পেতে চাইছে। তাতে যেমন এই নাটকে ওর যে ঠিক কোনও কাজ বা প্রয়োজন নেই, সেরকম মনে করার কোনও সুযোগ ও পাচ্ছে না, তেমনই এই মানসিক অস্থিরতার মধ্যে নিজেকে একা ভাবার অবকাশও নেই ওর। সবার ওর ফাঁকা সময়ের উপর যতোটা দাবি, ঠিক ততোটাই দাবি ওর সহমর্মিতার উপরেও। শুরুতে ও যেমনটা আশঙ্কা করেছিল, বাস্তবে দেখা গেল পরিস্থিতি ততটাও খারাপ নয়। এছাড়া মাঝেমধ্যেই ও সকলের বিভিন্ন উপকারে আসছে। সব মিলিয়ে এই অস্থিরতার পরিস্থিতিতে আর সবাই যতোটা শান্তিতে আছে, ফ্যানির মনেও বলতে গেলে ততোটাই শান্তি।
এতো কিছুর সঙ্গে ফ্যানির হাত লাগাতে হবে এরকম অনেক সেলাইয়ের কাজও জমে গিয়েছে। মিসেস নরিস যেভাবে ওকে হাঁকডাক করে কাজের ফরমায়েস করলেন, তাতে বোঝা গেল যে তিনি ভাবছেন আর সকলের মতোই ফ্যানিও যথেষ্ট ভালো আছে, আরামে আছে। “আরে ফ্যানি, এদিকে এসো তো দেখি! বুঝতে পারছি এই কদিন খুব ভালো সময় কাটছে তোমার। তাই বলে এরকম শুধু এঘর থেকে ওঘর আর ওঘর থেকে এঘর করলে তো চলবে না। নিজের ইচ্ছে মতন এভাবে শুধু দেখে বেরালেও চলবে না। তোমাকে এখানে আমার কাজেও হাত লাগাতে হবে। মিস্টার রাশওয়ার্থের চাদরটা বানানোর জন্য যেন আর অতিরিক্ত সাটিন কাপড় না আনাতে হয় তার একটা উপায় বের করতে গিয়ে আমি জান লড়িয়ে দিচ্ছি। আর সেই চেষ্টা করতে গিয়ে এতো খাটুনি খাটতে হচ্ছে যে আমি তো প্রায় বেঁকেই গেলাম, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত নেই। আমার মনে হয় পুরো সেলাইটা শেষ করার জন্য এবার তোমাকে হাত লাগাতেই হবে। মাত্র তিনটে সেলাই ছাড়া বাকিটা আমি করেই ফেলেছি। আর এই তিনটে সেলাই করতে তোমার কতক্ষণই বা সময় লাগবে বলো, এক্ষুনি হয়ে যাবে। আমার তো মনে হয়, সব কিছু দেখে শুনে সামলে রেখে পুরো ব্যাপারটা পরিচালনার বদলে আমাকে যদি শুধু একটু গায়েগতরে খেটে কিছু করতে হতো, তাহলেই বরং আমার সুবিধা হতো। তুমিই সবথেকে আরামে আছো বুঝলে, দিব্বি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছ। তবে এটা কিন্তু বলতে পারি যে সবাই যদি তোমার মতই কোনও কাজ না করে শুধু গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরঘুর করত, তাহলে কিন্তু আর দেখতে হতো না, কোনও কাজই এগোত না।”
এসব কথায় কান না দিয়ে, নিজের হয়ে সাফাই দেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে একেবারে চুপচাপ মুখ বুজে শান্তভাবে সেলাইটা হাতে নিল ফ্যানি। তবে বার্ট্রাম মাসি ফ্যানির পক্ষ নেওয়ার চেষ্টা করে বললেন,
“দেখো দিদি, ফ্যানি যে এত মেতে আছে তাতে তো অবাক হওয়ার মতন কিছু নেই। জানোই তো, এ সব কিছুই তো ওর কাছে একেবারে নতুন। মনে আছে, আমরাও নাটক নিয়ে কেমন পাগল ছিলাম! আমি তো এখনও পাগল। একটু হাত খালি হলেই আমি মহড়াও দেখতে যাব বলে ভেবে রেখেছি। আচ্ছা, নাটকটা ঠিক কী নিয়ে? সেটাই তো ফ্যানি তুমি আমাকে এখনও বললে না?”
“ওহ দিদি, ওকে এখন কিছু জিজ্ঞাসা কোরো না তো। কথা বলতে বলতে একই সঙ্গে হাতের কাজটাও যে সেরে ফেলবে, সেটা ফেলা ফ্যানির দ্বারা হয় না। আর হ্যাঁ, নাটকটা ‘Lovers’ Vows’ নিয়ে।”
ফ্যানি বার্ট্রাম মাসিমাকে বলল, “আমার যতদূর মনে হয় কাল সন্ধ্যায় তিনটে অঙ্কের মহড়া হবে। তখন চাইলে একসঙ্গে সবার অভিনয় দেখতে পারবেন আপনি।”
ফ্যানিকে থামিয়ে ওর কথার মাঝখানে মিসেস নরিস বলে উঠলেন, “আরে না, না দিদি, এই পর্দাগুলো লাগানো পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যাও বরং। এই তো, আর দুই এক দিনের মধ্যেই পর্দাগুলো ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। যাই বলো না কেন, পর্দা ছাড়া আবার নাটক হয় নাকি! যখন খুব সুন্দর মিহি ভাঁজে পর্দাগুলো উঠবে, তখন তোমার যদি দারুণ সুন্দর না লাগে, তাহলে বুঝব আমারই বুঝতে ভুল হয়েছে।”
লেডি বার্ট্রামের অপেক্ষা করতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু বার্ট্রাম মাসিমার মতো অতটা স্থির থাকতে পারছে না ফ্যানি। যদি তিনটে অঙ্কই কাল মহড়া দেওয়া হয়, তাহলে কালকেই এডমন্ড আর মেরি প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করবে। তাই কালকের দিনটা ওর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় অঙ্কে ওদের একটা দৃশ্য আছে, আর সেটা দেখাই ফ্যানির মূল আকর্ষণ। ওই দৃশ্যে ওরা যে ঠিক কেমন অভিনয় করে সেটা দেখার জন্য ওর যেমন তীব্র আগ্রহ, তেমনই মনে মনে এক ধরণের ভয়ও কাজ করছে ওর। ওই দৃশ্যের মূল বিষয়ই হলো প্রেম। সেখানে নায়ক প্রেমের বিয়ের বিষয়ে কথা বলবে আর নায়িকাও যা বলবে তা প্রেমের স্বীকারোক্তি থেকে কম কিছু না।
ওই দৃশ্যটা ফ্যানি কতবার যে পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আর যতবার পড়েছে, ততবারই কষ্টমিশ্রিত এক অদ্ভুত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়েছে। তাই মঞ্চে কীভাবে ওই দৃশ্যের অভিনয় করা হবে সেটা ভাবতে গেলে ওর মনে হয় ও বোধহয় সেটা হজম করতে পারবে না। ওর মনে হয় না যে নিভৃতে আলাদা করে হলেও এই দৃশ্যের মহড়া দিয়েছে ওরা।
অবশেষে পরের দিনটা এল। সন্ধ্যার পরিকল্পনারও কোনও বদল হলো না। কিন্তু ফ্যানির মনটা যেন আরও অস্থির হয়ে উঠল। মাসিমার হুকুম শুনে একমনে নিজের কাজ করে চলেছে ঠিকই, কিন্তু সেই মনোযোগ আর নীরবতার আড়ালে ওর উদাসীন মনটা চিন্তায় অস্থির হয়ে রয়েছে। বেলা গড়িয়ে দুপুর হতেই সেলাই হাতে উঠে চুপিচুপি পূবের ঘরে গিয়ে যেন পালিয়ে বাঁচল ও। হেনরি তখন আরও একবার প্রথম অঙ্কের মহড়ার প্রস্তাব দিচ্ছিল। প্রস্তাবটা নেহাতই অহেতুক বলে মনে হওয়ায় ফ্যানির মনে হলো ওই বাড়তি ঝামেলা থেকে দূরে থাকাই মঙ্গল। ও যে শুধু কিছুটা সময় নিজের মতো করে কাটাতে চায় তাই না, একই সঙ্গে মিস্টার রাশওয়ার্থের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে চাওয়াটাও ছিল ওর আরেকটা উদ্দেশ্য। হলঘর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পেল গির্জার দিক থেকে হেঁটে আসছে মেরি আর মিসেস গ্রান্ট। কিন্তু সেটা দেখেও নিজের একলা থাকার ইচ্ছাটা ওর বিন্দুমাত্র বদলাল না। প্রায় মিনিট ১৫ ধরে পূবের ঘরে নিভৃতে নিজের কাজ আর নিজের ভাবনা নিয়ে মগ্ন থাকার পর দরজায় একটা হালকা টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকল মেরি।
“এটাই তো পূবের ঘর, তাই না? আমি ঠিক ঘরেই এসেছি, তাই তো? ফ্যানি, তুমি কিছু মনে কোরো না যেন, আসলে তোমার সাহায্য পাওয়ার উদ্দেশ্যেই আমি তোমার কাছে এসেছি।”
বেশ অবাক হলেও সৌজন্য বজায় রেখে ফ্যানি ওর ঘরে আসা অতিথিকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু নিজের ঘরে মেরিকে একটু উষ্ণতা দিতে পারছে না বলে একটু অস্বস্তি নিয়ে ফাঁকা ফায়ার প্লেসের সামনের শিকগুলোর দিকে একবার তাকাল। এই ফায়ার প্লেসে ওর আগুন জ্বালানোর অধিকার নেই বলেই কখনও আগুন জ্বালানো হয় না। আর সে জন্যই শিকগুলোতে একটুও কালি লেগে নেই, একেবারে ঝকঝক করছে।
“অনেক ধন্যবাদ ফ্যানি। না, না, তুমি একদম চিন্তা কোরো না, আমার একটুও ঠাণ্ডা লাগছে না ফ্যানি। বরং বেশ গরমই লাগছে। কিছুক্ষণ আমাকে এঘরে থাকতে দাও আর দয়া করে নাটকের তৃতীয় অঙ্কটা বলছি, সেটা একটু মন দিয়ে শোনো। আমি বইটা এনেছি। তুমি একটু যদি আমার সঙ্গে এই অঙ্কটা মহড়া দাও, তাহলে আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ থাকব। আজকে সন্ধ্যেবেলার কথা ভেবে আমি এখানে এসে একান্তে এডমন্ডের সঙ্গে মহড়া দেব বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু ও তো দেখছি এখন আশেপাশে নেই। আর যদি থাকতোও তাহলেও আমার মনে হয় না যে ওর সঙ্গে এই দৃশ্যটার মহড়া আমি দিতে পারতাম। সত্যি কথা বলতে কী আমাকে একটু নিজের জড়তা কাটিয়ে উঠতে হবে। আসলে এই অংশে এমন দুই একটা সংলাপ আছে যে… তুমি আমার সঙ্গে মহড়া দেবে তো?”
ফ্যানি ভীষণ ভদ্রভাবেই মেরির প্রস্তাবে রাজি হলো। তবে সম্মতি জানানোর সময় দেখা গেল খুব একটা জোর নেই ওর গলায়।
বইটা খুলে মেরি জানতে চাইল, “আচ্ছা, যে অংশটার কথা আমি বলছি, সেটা কি কখনও পড়ে দেখেছ তুমি? এই যে, এই অংশটা। প্রথমে অবশ্য আমি এটা নিয়ে অত ভাবিনি, কিন্তু এখন দেখছি... দেখো কোন অংশটার কথা বলছি, এই যে এইখানটা… এই সংলাপগুলো, আর এগুলো, আর এগুলো। এডমন্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে এসব কথা আমার মুখ দিয়ে কী করে বেরোবে বলো তো দেখি! তুমি হলে পারতে? অবশ্য ও তো তোমার মাসতুতো দাদা। সেটা যে একটা বড় তফাৎ, সেটাও ঠিক। তোমাকে কিন্তু আমার সঙ্গে মহড়া দিতেই হবে। আমি নাহয় প্রথমে তোমাকে এডমন্ড হিসেবে ভেবে নেব, তারপর একটু একটু করে ধাতস্ত হবো। জানো তো, কখনও কখনও তোমাকে কিন্তু এডমন্ডের মতোই দেখতে লাগে।”
“তাই? সেরকম লাগে নাকি? আচ্ছা, সে না হয় তোমার সঙ্গে মহড়া দেওয়ার আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব আর খুব আনন্দের সাথেই করব। কিন্তু আমার তো এই অংশটা মুখস্ত নেই, তাই আমাকে বইটা দেখে দেখেই পড়তে হবে।”
“সে তো আমার মনে হয় এ নাটকের কিছুই মুখস্ত নেই তোমার। কি, তাই তো? তোমাকে বই দেখে দেখেই তো পড়তে হবে। আচ্ছা চলো, এবার শুরু করা যাক। আমাদের হাতের কাছে দুটো চেয়ার থাকা দরকার মঞ্চের সামনের দিকে এগিয়ে আনার জন্য। এই তো, এগুলো দিয়ে কাজ চলে যাবে। আরে, এগুলো তো স্কুল ঘরের চেয়ার। ঠিক নাটকে ব্যবহার করার মতো না। বরং আমার তো মনে হচ্ছে ছোট ছোট মেয়েরা পড়াশোনা করার সময় চেয়ারে বসে দোলাতে পারবে, ঠিক যেন সেরকম এই চেয়ারগুলো। নাটকের কাজে লাগালে তোমার গভর্নেস আর মেসোমশাই কিছু মনে করবেন না তো আবার? স্যর থমাস এখন এসে গেলে তাঁর হয়তো চোখ কপালে উঠে যেত এই দেখে যে আমরা তাঁর পুরো বাড়িটা জুড়েই নাটকের মহড়া দিতে শুরু করেছি। জন তো বসার ঘর দখল করে প্রাণের সুখে গলা ফাটিয়ে সংলাপ বলছে। এখানে আসার জন্য সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় শুনতে পেলাম। ওদিকে থিয়েটার বানানো হয়েছে যেখানে, সেখানে আগাথা আর ফ্রেডরিক যথারীতি ঘর দখল করে আছে। ওরা এতো মহড়া দিচ্ছে যে যদি ওদের অভিনয় নিখুঁত না হয়, তাহলে আমি বেশ অবাকই হবো। আর তারপর কী কাণ্ড হয়েছে শোনো। মিনিট পাঁচেক আগে আমি ওখানে একবার উঁকি দিতে গিয়েছি। আমার সঙ্গে মিস্টার রাশওয়ার্থও ছিল। আর এমনই কপাল যে ঠিক তখনই ওরা একে অপরকে না জড়িয়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। মিস্টার রাশওয়ার্থের চেহারা দেখে আমার মনে হলো ওর হয়তো একটু অস্বস্তিই হচ্ছে। তাই আমি ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় ফিসফিস করে বললাম, ‘আগাথা চরিত্রটা কিন্তু দারুণ ফুটে উঠবে আমাদের নাটকে। ওর হাবভাব, গলা, মুখ, সব কিছুতেই কী সুন্দর বেশ একটা মা মা ভাব।’ আমার কথায় মিস্টার রাশওয়ার্থ অস্বস্তি কাটিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চনমনে হয়ে উঠল। তুমিই বলো, কেমন বুদ্ধি খাটালাম আমি? আচ্ছা, চলো, এবার আমার একার সংলাপটা মহড়া দেওয়া শুরু করা যাক।”
মেরি নিজের সংলাপ বলতে শুরু করলে খুব নরম গলায় ফ্যানিও শুরু করল। ও যে আর কেউ নয়, এডমন্ডের বদলে এই চরিত্রে অভিনয় করছে এটা ভেবেই ওর মধ্যে যেন দুনিয়ার সমস্ত জড়তা আর সংকোচ এসে জড়ো হয়েছে। এছাড়া, ওর চেহারা বা গলা দুটোই এতো মেয়েলি মেয়েলি যে পুরুষালি ভাবটা ঠিক ফুটে উঠছে না। তবে এরকম অদ্ভুত অ্যানহাল্ট পেয়েই হয়তো সাহস করে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো মেরির। দৃশ্যটা প্রায় অর্ধেক হয়ে এসেছে, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ায় ওরা একটু থমকে গেল। আর তারপর দরজা ঠেলে এডমন্ড ঘরে ঢুকতেই পুরো ব্যাপারটা যেন এক নিমেষে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল।
না চাইতেই এরকম হঠাত দেখা হয়ে যাওয়ায় ওরা তিনজনেই যেমন অবাক হলো, তেমন লজ্জাও পেল আর খুশিও হয়ে উঠল। আর যেহেতু এডমন্ডও মেরির মতোই একই উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে, তাই ওদের লজ্জা লজ্জা ভাব আর খুশির রেশ রইল বেশ অনেকক্ষণ। এডমন্ডও নিজের বই বগলদাবা করে নিয়ে এসেছে যাতে ফ্যানি ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ মহড়া দেয়। তাহলে সন্ধ্যার জন্য ওর নিজেকে তৈরি করে নেওয়াটা একটু সহজ হবে। মেরিও যে এখন এই বাড়িতেই আছে, সেটা এডমন্ডের জানা ছিল না। আগে থেকে ঠিক করে দেখা করার বদলে এরকম আচমকা দেখা হয়ে যাওয়ার আনন্দ আর উচ্ছ্বাস, তার আলাদাই মাত্রা। তার উপর ফ্যানির এত সাহায্য, এ যেন একেবারে সোনায় সোহাগা।
এডমন্ড আর মেরির এই প্রবল উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ফ্যানি কোনোভাবেই পাল্লা দিতে পারল না। ওদের দুজনের আনন্দের দীপ্তির সামনে ফ্যানির মন যেন দমে গেল। ওর মনে হতে লাগল ওদের দুজনের কাছেই ওর অস্তিত্ব যেন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। তাই ওরা দুজনেই যে ওকে খুঁজতে এসেছিল, এই ভেবেও ও মনে মনে কোনো সান্ত্বনা পাচ্ছে না। এবার তো ওদের একসঙ্গে মহড়া দিতেই হবে। প্রথমে রাজি না হলেও যতক্ষণ পর্যন্ত না মেরি এডমন্ডের প্রস্তাবে রাজি হলো ততক্ষণ পর্যন্ত এডমন্ড একসঙ্গে মহড়ার প্রস্তাবটা দিয়ে বারবার অনুরোধ উপরোধ করেই গেল। আর ফ্যানি? এবার তো ফ্যানির কাজ বলতে শুধু পাশ থেকে সংলাপ ধরিয়ে দেওয়া আর দর্শক হয়ে ওদের দেখে যাওয়া। অবশ্য ওদের অভিনয় ঠিক কেমন হচ্ছে সেটা বিচার করে তার সমালোচনা করে ওদের ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্বও ওর কাঁধে এসে পড়ল। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, মন থেকেই সেই কাজ করতে চাইলেও ফ্যানির মনে যে ঝড় চলছে তা সামলে ও সেই কাজটা করার সাহস জুটিয়ে উঠতে পারল না কিছুতেই। এমন কী ওর যদি সমালোচনা করার যোগ্যতা থাকতোও তাহলেও বিবেকের ঠেলায় ও সেটা করে উঠতে পারত না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটা ওর কাছে এতটাই অসহ্য হয়ে উঠেছে যে ছোটখাটো কোনো ভুল নিয়ে মন্তব্য করাটা ওর কাছে ঠিক নিরাপদ মনে হচ্ছে না। ওর ভয় হচ্ছে , পাছে বিশেষ কোনো সমালোচনা করতে গিয়ে ওর মনের মধ্যে জমে থাকা পাহাড়প্রমাণ ক্ষোভ না বেরিয়ে আসে। কেবল সংলাপ ধরিয়ে দেওয়ার কাজটুকুই ওর জন্য অনেক বলা যায়। তবে সত্যি বলতে গেলে সেটাও যেন ও আর পারছে না। কারণ, সবসময় বইয়ের দিকে খেয়াল রাখাটাও ওর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, খেই হারিয়ে ফেলছে। ওদের অভিনয় দেখতে দেখতে ও যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। এডমন্ডের অভিনয়ের আবেগ যত বাড়ছে, ও ততো অস্থির হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি এমন হয়ে উঠল যে যখন এডমন্ডকে সংলাপ ধরিয়ে দেওয়ার কথা, তখন ও বইটাই বন্ধ করে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। সেটা দেখে ওরা ভাবল ফ্যানি হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে আর সেটাই স্বাভাবিক। তাই ফ্যানিকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি ফ্যানির উপর দিয়ে যে এত ধকল যাচ্ছে সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করল। ওদের সহানুভুতি তো ফ্যানির অবশ্যই দরকার, তবে ও মনে মনে চাইল ওরা যেন কোনোদিনই টের না পায় যে আসলে ওর ঠিক কতটা আর কেন সহানুভূতির প্রয়োজন। অবশেষে দৃশ্যটা শেষ হলে এডমন্ড আর মেরি একে অপরের প্রশংসায় পঞ্ছমুখ হয়ে উঠল। সেই পারস্পরিক প্রসংসায় ফ্যানি কিছুটা জোর করেই নিজেকে সামিল করল। ওরা চলে গেলে পরে যখন একলা বসে পুরো ব্যাপারটা ভাবার সুযোগ হলো তখন ওর মনে বিশ্বাস জন্মাল যে ওরা সত্যিই অনেক আবেগ নিয়ে বেশ সাবলীলভাবে অভিনয় করছে। ওর এটাও চিন্তা হচ্ছে যে হয়তো সবাইই ওদের অভিনয়ের কদর করবে, কিন্তু সেই একই দৃশ্য চোখের সামনে দেখা ওর নিজে সহ্য করতে পারবে তো! কিন্তু সে যত যাই হোক না কেন, এ যন্ত্রণা তো ওকে হজম করতেই হবে, আর সেটাও সেদিনই করতে হবে।
প্রতিদিন প্রথম তিন অঙ্কের নিয়মিত মহড়া যেমন হয় তেমনই সেদিন সন্ধ্যাতেও হওয়ার কথা। সেজন্য রাতের খাওয়াদাওয়ার পর মিসেস গ্রান্ট আর দুই ভাইবোন, হেনরি আর মেরিরও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসার কথা। এই নিয়ে সবাই বেশ আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করছে। সবার মধ্যেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। নাটকটা যে শেষের দিকে এগোচ্ছে, তাতে টম খুশিতে একেবারে ডগমগ। সকালে মেরির সঙ্গে মহড়া দিয়ে এডমন্ডও চনমনে। মনে হচ্ছে ছোটখাটো ঝামেলাগুলোও যেন মিটে গিয়েছে। সবাই এক অদ্ভুত অস্থিরতা আর উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে। বাড়ির মহিলারা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘর ছাড়লেন, আর পুরুষরাও দ্রুত তাঁদের অনুসরণ করলেন। লেডি বার্ট্রাম, মিসেস নরিস আর জুলিয়া, এই তিনজন বাদে বাকি সবাই সময়ের অনেক আগেই থিয়েটার ঘরে গিয়ে হাজির হলো। ঘরটা তখনও পুরোপুরি তৈরি হয়ে ওঠেনি, তবে সেই অসমাপ্ত অবস্থাতেই যতটুকু সম্ভব আলো জ্বালিয়ে সবাই তৈরি হয়ে রইল। এখন শুধু মিসেস গ্র্যান্ট আর ক্রফোর্ড ভাইবোনের আসার অপেক্ষা। ওরা এলেই মহড়া শুরু হবে।
ক্রফোর্ড ভাইবোনের জন্য খুব একটা দেরি করতে হলো না, কিন্তু মিসেস গ্র্যান্ট এলেন না। ডক্টর গ্র্যান্ট অসুস্থতার দাবি তোলবার পর তাঁর সুন্দরী শ্যালিকা মেরি মনে মনে সেটাকে মোটেই পাত্তা না দিলেও, ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে রেহাই দেন নি।
মেরি বেশ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, “ডক্টর গ্র্যান্টের শরীরটা বড়ই খারাপ। আজ যখন থেকে ফেজান্ট পাখির মাংসটা তাঁর মুখে রুচল না, তখন থেকেই তাঁর এই দশা। তাঁর মনে হয়েছে মাংসটা বেশ শক্ত, তাই পাতের খাবার ফিরিয়ে দিলেন। আর তখন থেকেই তাঁর শরীরটা ঠিক ভালো লাগছে না!”
কী এক হতাশাজনক পরিস্থিতি! মিসেস গ্রান্টের না আসাটা সত্যিই খারাপ লাগার মতো ঘটনা। মিষ্টি ব্যবহার আর সবকিছু সহজভাবে মানিয়ে নেওয়ার স্বভাবের কারণে সবার কাছেই তিনি প্রিয়। কিন্তু এখানে আজ তাঁর উপস্থিতিটা যে নিতান্তই জরুরী। তাঁকে বাদ দিয়ে নাটক বা মহড়া কোনোটাই ঠিক জুতসই হবে না। এক লহমায় পুরো সন্ধ্যার আনন্দটাই যেন মাটি হয়ে গেল। এখন কী করা যায়? টম, যে কুঁড়ে ঘরের মালিকের চরিত্রে অভিনয় করছে, সে তো একেবারে হতাশ হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ ভাবার পর, কয়েকজনের নজর গেল ফ্যানির দিকে। দুই একজন এটাও বলল, “মিস ফ্যানি দয়া করে চরিত্রটার সংলাপগুলো পড়ে দিলে হয় না!” ব্যাস, সবাই মিলে অনুরোধ উপরোধের বন্যা বইয়ে দিল। এমন কী এডমন্ডও বলল, “খুব আপত্তি না থাকলে করে দাও না ফ্যানি!”
কিন্তু ফ্যানি তখনও রাজি হতে পারছ না। কী যে এক ঝামেলায় পড়ল! ওর মনে হচ্ছে, সবাই মেরিকে কেন বলছে না? ওর এটাও মনে হচ্ছে, কেন যে ও মহড়ায় না এসে যেখানে নিজেকে সবথেকে বেশি নিরাপদ বলে মনে করে, সেই নিজের ঘরেই চলে গেল না। ও তো জানতই যে এখানে এলে ওর বিরক্ত লাগবে, কষ্ট হবে। কাজেই এতো কিছু জেনে বুঝে ওর তো উচিৎ ছিল নিজেকে দূরে রাখা। এখন মনে হচ্ছে এই পরিস্থিতি যেন ওর সেই ভুলেরই উপযুক্ত শাস্তি।
হেনরি আরেকবার নতুন উদ্যমে অনুরোধ জানাল, “বেশি কিছু না, তুমি শুধু সংলাপগুলো পড়ে দিলেই চলবে।”
মারিয়া যোগ দিল, “আমার তো স্থির বিশ্বাস যে প্রতিটা শব্দ ওর আয়ত্ত্বে। আগের দিন মিসেস গ্রান্টকে প্রায় বার কুড়ি শুধরে দিয়েছে। ফ্যানি, আমি নিশ্চিত যে এই চরিত্রটা তোমার পুরোটাই মুখস্থ।”
ফ্যানি বলতে পারল না যে ও মুখস্থ নেই। সবাই যখন এত নাছোড়বান্দার মতো অনুরোধ করছে, আর এডমন্ডও যখন আবার এমন এক ভরসাভরা দৃষ্টিতে চাইল যেন ও পুরোপুরি ফ্যানির ওপরই নির্ভর করছে, তখন ফ্যানির পক্ষে না বলার আর কোনো উপায় রইল না। ওকে রাজি হতেই হলো। ও জানাল, যতটা পারে চেষ্টা করবে। সবাই তাতে মহা খুশি। এবার বাকিরা যখন মহড়া শুরুর প্রস্তুতি নিতে শুরু করল, ফ্যানি তখন দুরুদুরু বুকে একা বসে রইল।
মহড়া শুরু হয়ে গেলো। নিজেদের সংলাপ আর চেঁচামেচিতে ওরা এতোটাই ডুবে রয়েছে যে বাড়ির অন্য দিক থেকে যে অন্যরকম আওয়াজ আসছে সেটা আর ওদের খেয়াল হলো না। মহড়া কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে, এমন সময় ঘরের দরজা হাট করে খুলে গেল। ভীত মুখে জুলিয়া এসে উদয় হলো। “বাবা এসে গিয়েছেন! তিনি এই মুহূর্তে হলঘরে।”
প্রথম খণ্ডের সমাপ্তি।