জেন অস্টেনের এমা - অষ্টম পর্ব

অষ্টম অধ্যায়

 

হ্যারিয়েট সে রাতটা হার্টফিল্ডেই কাটাল। এমনিতেও গত কয়েক সপ্তাহ অর্ধেকের বেশি সময় তার ওখানেই কাটছিল। ওবাড়ির একটা শোয়ার ঘর ক্রমশ তার নিজের হয়ে উঠছিল। এমার মতে হ্যারিয়েটের নিজের ভালোর জন্যই যতটা সম্ভব এমাদের কাছে-কাছে থাকা দরকার। পরদিন সকালে এক-দু’ঘন্টার জন্য ওকে মিসেস গডার্ডের সাথে দেখা করতে যেতে হল বটে, কিন্তু তারপর ও যেন আবার হার্টফিল্ডেই ফিরে আসে, সেটা পই পই করে বলে দেওয়া হল।

হ্যারিয়েট চলে যাওয়ার পর মিস্টার নাইটলি এলেন। এদিকে মিস্টার উডহাউজ আবার আগে থাকতে ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি একটু হাঁটতে যাবেন। স্বাস্থ্যরক্ষার যাতে অন্যথা না হয়, তাই খানিকক্ষণ আলাপ-আলোচনার পর এমা তাঁকে ঠেলেঠুলে বাইরে পাঠিয়েই ছাড়ল, মিস্টার নাইটলিও তার সাথে যোগ দিলেন। শেষে, আতিথেয়তা মাথায় তুলে বেচারা ভদ্রলোককে হাঁটতে বেরোতেই হল। তাঁর দীর্ঘ সবিনয় ক্ষমাপ্রার্থনার বিপরীতে মিস্টার নাইটলির অতিরিক্ত ভদ্রতার বালাই না থাকা চটপটে জবাবগুলো মজাদার চাপানউতোর তৈরি করছিল।

‘আশা করি আপনি আমায় ক্ষমা করবেন, মিস্টার নাইটলি। দেখুন, যদি কিছু মনে না করেন, এমার পরামর্শ অনুযায়ী আমি মিনিট পনেরো হেঁটে আসি। সূর্য উঠে গেছে, তাই বার তিনেকের বেশি পাক দিতে পারব না। আপনি আমাদের নিজের লোক, তাই আপনাকে একা ফেলে এই একটুখানি ঘুরে আসছি। আসলে আমরা যারা অথর্ব হয়ে পড়েছি, বুঝলেন, আমরা মনে করি আমাদের দরকারগুলোই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

‘আহা! কেন যে আমায় পর ভাবছেন!’

‘আমার মেয়েটি কিন্তু আতিথেয়তায় কিছুমাত্র কম যায় না। এমা আপনাকে যথেষ্ট পারদর্শিতার সাথে সঙ্গ দেবে, দেখবেন। তাহলে আপনার অনুমতি নিয়ে তিনটে পাক মেরে আসি? শীতকালীন পদচারণা…’

‘অবশ্যই!’

‘আমি কিন্তু আপনার সাথে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে পারলেও খুব খুশি হতাম, মিস্টার নাইটলি। কিন্তু জানেন তো, আমি বড্ড আস্তে হাঁটি তো। আপনারই একঘেয়ে লাগবে। তাছাড়া আপনাকে তো আবার সেই ডনওয়েল অ্যাবে পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে!’

‘ধন্যবাদ। আমিও আর বেশিক্ষণ বসব না। আপনার কিন্তু এবার বেরিয়ে পড়া উচিত। আমি আপনার গ্রেটকোটটা নিয়ে এসে বাগানের দরজাটা খুলে দিচ্ছি।’

মিস্টার উডহাউজ শেষ পর্যন্ত বেরোলেন বটে। কিন্তু মিস্টার নাইটলি তৎক্ষণাৎ উঠে পড়লেন না, বরং গুছিয়ে বসে তিনি সোজাসুজি হ্যারিয়েটের কথা পাড়লেন। আজ তাঁর মুখে হ্যারিয়েটের যত প্রশংসা ঝরে পড়ছিল, ততখানি এমা আগে কখনো শোনেনি।

‘মেয়েদের রূপ বিষয়ে তোমার যতটা বোঝাবুঝি, আমার তত নেই বটে। তবে এ মেয়েটি খুবই মিষ্টি, আর স্বভাবও চমৎকার। এখনো ওর চরিত্র খানিকটা সঙ্গগুণের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু ভালো হাতে পড়লে মেয়েটি রত্ন হয়ে উঠবে।’

‘আমারও তাই মনে হয়। তবে সঙ্গগুণের অভাব ওর আছে বলে তো আমার মনে হয় না।’

‘আহ্‌,’ মিস্টার নাইটলি বললেন, ‘তুমি নিজের প্রশংসা শুনতে চাও। বেশ। আমার বলতে দ্বিধা নেই যে তোমার সাথে মিশে ওর উন্নতি হয়েছে। ওর সেই শিশুসুলভ খিলখিল হাসিটা অন্তত দূর হয়েছে। সেটা তোমারই গুণ বলতে হবে।’

‘ধন্যবাদ। আমার সাথে মেশায় ওর কোনো লাভই হয়নি জানলে আমি দুঃখই পেতাম। তবে ঠিক জায়গায় ঠিক প্রশংসা তো সবার মুখ দিয়ে বেরোয় না। আপনি অন্তত আমার প্রশংসার ব্যাপারে অকৃপণ, এমন দোষ কেউ আপনাকে দিতে পারবে না।’

‘তা তুমি কি বলছ ও আজ সকালেই আবার ফিরে আসবে?’

‘হ্যাঁ। এই এল বলে। এর মধ্যে এসে যাওয়াই উচিত ছিল।’

‘হয়তো কোনো বিশেষ কারণে ওর দেরি হচ্ছে! হয়তো ওর সাথে কেউ দেখা করতে এসেছে!’

‘উফ্‌, হাইবারির কূটকচালি – বুড়িগুলোর কি আর কোনো কাজ নেই?’

‘তোমার যেসমস্ত মানুষকে ক্লান্তিকর মনে হয়, হ্যারিয়েটের না-ও মনে হতে পারে।’

এমা জানত কথাটা সত্যি, তাই প্রতিবাদ করল না। তার চুপ করে থাকার উত্তরে অল্প হেসে মিস্টার নাইটলি বললেন, ‘কখন-কোথায় বলতে পারব না, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তোমার ছোট্ট বন্ধুটি শিগগিরই একটা ভালো খবর পেতে চলেছে।’

‘তাই! কীরকম?’

‘রকমটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ – এইটুকু বলতে পারি,’ মিস্টার নাইটলি আবার হাসলেন।

‘এত গুরুত্বপূর্ণ মানে কেউ না কেউ ওর প্রেমে পড়েছে, তাই তো? কিন্তু আপনি জানলেন কীকরে?’

এমা মনে মনে প্রার্থনা করছিল, মিস্টার এলটন বুঝি শেষ পর্যন্ত প্রেম নিবেদনটা করে ফেলতে পেরেছেন। সে জানত, মিস্টার নাইটলি তাঁর বন্ধু ও পরামর্শদাতা – এলটন তাঁকে মেনে চলেন।

‘আমি জানি যে হ্যারিয়েট স্মিথ একটি অভাবনীয় বিবাহপ্রস্তাব পেতে চলেছে। পাত্রটি হলেন রবার্ট মার্টিন। গত গ্রীষ্মে অ্যাবে-মিল-এ যাতায়াত করতে করতে তিনি ওকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছেন, ওকে বিয়ে করতে চান।’

‘বাঃ, চমৎকার প্রস্তাব,’ এমা বলল, ‘কিন্তু হ্যারিয়েট ওঁকে বিয়ে করতে চায় তো?’

‘জিজ্ঞেস করতে তো ক্ষতি নেই, তাই না? উনি দিন দুয়েক আগে অ্যাবে-তে এসেছিলেন। আসলে মার্টিন জানেন, আমি ওঁকে এবং ওঁর পরিবারকে মন থেকে শ্রদ্ধা করি – আমাকে উনি ওঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের মধ্যে একজন বলে গণ্য করেন। তো সেদিন এসে উনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, এত তাড়াতাড়ি সংসার পেতে ফেলাটা ঠিক কাজ হবে কিনা। বিশেষত, হ্যারিয়েটের বিয়ের বয়স হয়েছে কিনা – সে বিষয়ে আমার কী মত। মানে, সব মিলিয়ে গোটা ব্যাপারটায় আমার মত আছে কিনা, সামাজিক ভাবে তাঁর পক্ষে এটা বামন হয়ে চাঁদ ধরতে যাওয়া হবে কিনা – কারণ উনি তো জানেন, তুমি হ্যারিয়েটের কাছের লোক… তা আমার কিন্তু ওঁর সাথে কথা বলে খুবই ভালো লাগল। রবার্ট মার্টিনের মতো বিচক্ষণ মানুষ কমই দেখা যায়। উনি অত্যন্ত সৎ, ভেবেচিন্তে সোজাসাপটা কথা বলেন। আমার কাছে উনি কিছুই লুকোননি – ওঁর বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বিয়ে বিষয়ে চিন্তাভাবনা… এমন চমৎকার স্বভাবের যুবক কমই দেখা যায় – ভাই হিসেবেও, ছেলে হিসেবেও। আমি তখনই এই বিয়ের সপক্ষে মত দিয়েছি। উনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে বিয়ের খরচ সামলাবার ক্ষমতা ওঁর আছে – আমার সে নিয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। তাই আমি ওঁর সামনে হ্যারিয়েটের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে ওঁকে খুশিমনে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। যদি আগে ওঁর আমার উপর তেমন ভরসা না-ও থেকে থাকত, পরশু রাতে এই কথাবার্তার পর উনি নিশ্চয় আমায় ওঁর প্রিয়তম বন্ধু এবং শ্রেষ্ঠ পরামর্শদাতা বলে ঠাউরে ফেলেছেন। এখন আশা করি, মেয়েটিকে মনের কথা জানাতে উনি বেশি দেরি করবেন না। গতকাল ওঁদের কথা হতে পেরেছে বলে তো মনে হল না। কিন্তু আমার মনে হয় আজ উনি নিশ্চয় মিসেস গডার্ডের বাড়ি যাবেন। তাই বলছিলাম, হ্যারিয়েট আজ হয়তো ওখানে একটু বেশি সময়ের জন্য আটকে যেতে পারে, আর তাতে ওর যে খুব খারাপ লাগবে এমনটা বলা যায় না।’

‘কিন্তু মিস্টার নাইটলি,’ এমা মনে মনে হেসে বলল, ‘কাল যে ওদের কথা হয়নি তা আপনি জানলেন কীকরে?’

তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘তা-ও তো ঠিক। আমি জানি না মানেই কথা হয়নি তা না-ও হতে পারে। কিন্তু কাল হ্যারিয়েট সারাদিন তোমার সাথে ছিল না?’

‘তাহলে এবার আমার তরফেও খবর শুনুন। কাল মিস্টার মার্টিন ওঁর প্রস্তাব রেখেছেন, আর সে প্রস্তাব খারিজও হয়ে গেছে।’

মিস্টার নাইটলির কথাটা একবার শুনে বিশ্বাস হল না। তারপর যখন এমা দ্বিতীয়বার কথাটা ভালো করে গুছিয়ে বলল, তখন বিস্ময় ও বিরক্তিতে তাঁর মুখ লাল হয়ে গেল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তাহলে মেয়েটিকে আমি যত বড় বোকা ভেবেছিলাম, সে তার চাইতে অনেক বেশি বোকা! ও চায়টা কী?’

‘ওহ্‌! একটি মেয়ে যে একটা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারে, এটা ভাবতে ছেলেদের খুব অসুবিধা হয়, তাই না? আপনারা মনে করেন, মেয়েদের ডাকলেই তারা চলে আসবে।’

‘বোকার মতো কথা বোলো না। ছেলেরা এমন কিছু ভাবে না। কিন্তু এটা হল কীকরে! হ্যারিয়েট স্মিথ রবার্ট মার্টিনকে খারিজ করে দিল! এ তো পাগলের কাণ্ড! তুমি নিশ্চয় ভুল বুঝেছ।’

‘আমি ওর লেখা উত্তরটা নিজের চোখে দেখেছি – ভুল ভাবার কোনো প্রশ্নই নেই।’

‘ওহ্‌! তা তুমি ওর উত্তরটা শুধু দেখেছ, নাকি উত্তরটা নিজের হাতে লিখেও দিয়েছ? এমা, এটা তোমারই কাজ। তোমার কথাতেই ও প্রস্তাবটা খারিজ করেছে।’

‘আর যদি তা হয়ও (যদিও এরকম অভিযোগ করার কোনো অধিকার আপনার নেই), তাতে ভুলটা কী হয়েছে? মিস্টার মার্টিন একজন ভদ্র যুবক, কিন্তু তাঁকে হ্যারিয়েটের সমান মনে করা আমার পক্ষে অসম্ভব। উনি এই প্রস্তাবটা রাখলেন কীকরে সেটা ভেবেই আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। আপনার কথা শুনে তো মনে হল ওঁর মাথায় কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। খুবই দুঃখের কথা যে এই ক্ষেত্রে উনি তার পরিচয় দিতে পারলেন না।’

‘উনি হ্যারিয়েটের সমান নন!’ মিস্টার নাইটলি চেঁচিয়ে উঠলেন। তারপর সংযত হয়ে বললেন, ‘নাহ্‌, ঠিকই, সমান নন, কারণ হ্যারিয়েট ওঁর যোগ্য নয়। এমা, তুমি মেয়েটির প্রতি তোমার আকর্ষণবশত ওর সর্বনাশ করতে বসেছ। বংশমর্যাদা বলো, শিক্ষাদীক্ষা বলো, হ্যারিয়েটের যোগ্যতাটা ঠিক কোথায় বলতে পারবে? ওর বাবা-মা কে কেউ জানে না, সম্ভবত কোনো বিষয়সম্পত্তিও নেই, ওর দায়িত্ব নেবে এমন কোনো আত্মীয়-পরিজনও নেই। ও একটি সাধারণ আবাসিক বিদ্যালয়ে থাকে। বিচক্ষণতা বলো, সাধারণ জ্ঞান বলো, কোনটা ওর আছে? কোনো কাজেই ও দক্ষ নয়। ওর যা বয়েস বা কর্মক্ষমতা, তাতে ও নিজে নিজে কিছু শিখে নেবে, এটাও সম্ভব না। বুদ্ধিও তেমন বেশি কিছু না, যা দিয়ে নিজের দেখাশুনো নিজে করে নিতে পারবে। হ্যাঁ, ওকে দেখতে সুন্দর, স্বভাব মিষ্টি – কিন্তু তার চেয়ে বেশি কিছু ওর ব্যাপারে বলা যায় না। মিস্টার মার্টিনের জন্য হ্যারিয়েট যোগ্য কিনা একথা প্রথম উঠলে আমার মনে হয়েছিল, ওর চেয়ে অনেক ভালো জীবনসাথী উনি পাবেন। কিন্তু মিস্টার মার্টিন মেয়েটিকে ভালোবাসেন, তাই আমি এসব নিয়ে তর্ক করতে যাইনি। তাঁর মতো বিচক্ষণ মানুষের সাথে সংসার করতে করতে হ্যারিয়েট ধীরে ধীরে মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে পারত, কারণ তার স্বভাবে মালিন্য নেই। আমার মনে হয়েছিল, এই বিয়েতে হ্যারিয়েটের ভালো হবে, তার ভাগ্য খুলে যাবে – এ নিয়ে আমার এখনো কোনো সন্দেহ নেই। তোমার কথাও আমার মাথায় ছিল। ভেবেছিলাম, বন্ধুর সৌভাগ্যে খুশি হয়ে তুমি তার হাইবারি ছেড়ে চলে যাওয়াটা মেনে নেবে। ভেবেছিলাম, “এ বিয়েতে এমা নিশ্চয় খুশি হবে।”’

‘তাহলে বলতে হবে, এমাকে আপনি একেবারেই চেনেন না। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে তুলে দেব একজন চাষির হাতে! (আপনি যাই বলুন না কেন, উনি একজন চাষি বৈ আর কিছু নন।) এমন একজনের জন্য ওকে হাইবারি ছেড়ে চলে যেতে দেব, যাকে আমি আমার সমকক্ষ বলে মনেই করি না! আপনি এরকম ভাবলেন কীকরে জানি না, কিন্তু ভুল ভেবেছেন। আমি আপনার কথাগুলোর সাথে একটুও একমত হতে পারছি না। আপনি হ্যারিয়েটের ব্যাপারে যাচ্ছেতাই কথাবার্তা বলে চলেছেন। আমার মতো আরও অনেকেই কিন্তু এ ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে। মিস্টার মার্টিনের কাছে হ্যারিয়েটের চেয়ে বেশি টাকা থাকতে পারে, কিন্তু সামাজিক স্তরের বিচারে তিনি অনেক নীচে। হ্যারিয়েট যে স্তরের মানুষের সাথে ওঠাবসা করে, তাতে এই বিয়ে তার জন্য অপমানজনক।’

‘শিক্ষাদীক্ষাহীন, বংশপরিচয়হীন একটি মেয়ের পক্ষে একজন বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, সৎ ও ভদ্র কৃষকের স্ত্রী হওয়াটা অপমানজনক!’

‘আইনি মতে ওর বংশপরিচয় না থাকতে পারে। কিন্তু সেটা কি ওর দোষ? অন্যের কর্মফলে, ও যাদের সাথে ঘোরাফেরা করে, তাদের তুলনায় ওকে নত হয়ে থাকতে হবে? ওর বাবা অবশ্যই একজন ভদ্রলোক ছিলেন, তাঁর বিষয়সম্পত্তির অভাব ছিল না, তিনি ওকে যথেষ্ট হাতখরচা দিতেন। ওকে জীবনে কখনো কষ্ট করতে হয়নি – এতে আমার কোনো সন্দেহই নেই। আর এখনো যে ও ভদ্রঘরের মেয়েদের সাথেই মেলামেশা করে, তা নিয়েও নিশ্চয় কারো মনে সন্দেহ থাকতে পারে না। ওর সামাজিক অবস্থান অবশ্যই মিস্টার মার্টিনের তুলনায় উঁচুতে!

ওর বাবা-মা যেই হ’ন, যাঁরাই ওর অভিভাবক হয়ে থাকুন, তাঁরা ওকে – তুমি যাকে সমাজের উচ্চস্তর বলে মনে করো – সেখানে পৌঁছে দেওয়ার কোনো চেষ্টাই করেননি। যা হোক কিছু একটা পড়াশুনো করিয়ে ওকে তড়িঘড়ি মিসেস গডার্ডের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং নিঃসন্দেহে মনে করা হয়েছে, ওর জন্য এটাই যথেষ্ট। হ্যারিয়েটের নিজের মনেও এর চাইতে বেশি কোনো উচ্চাকাঙ্খা ছিল না, গত গ্রীষ্মে মার্টিনের সাথে সুন্দর সময় কাটাতে ওর কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু তুমি ওর মাথায় এসব ভূত ঢোকাতে শুরু করেছ। তুমি হ্যারিয়েট স্মিথের বন্ধু নও, এমা। রবার্ট মার্টিন যদি মনে মনে না বুঝতেন যে হ্যারিয়েট ওঁকে পছন্দ করে, তাহলে কখনোই উনি এই প্রস্তাব রাখতেন না। আমি ওঁকে খুব ভালো করে চিনি। উনি কখনোই নিজের স্বার্থে বা হঠকারিতার বশে একটি মেয়ের জীবন নিয়ে টানাটানি করবেন না। অহঙ্কার জিনিসটা ওঁর শরীরেই নেই। উনি নিশ্চয় জানতেন, হ্যারিয়েট ওঁর প্রতি বিমুখ নয়।

একথাটার সরাসরি জবাব না দেওয়াটাই সমীচীন মনে করে এমা আবার স্বপক্ষে কথা বলতে শুরু করল।

আপনি তো দেখছি সত্যিই মিস্টার মার্টিনের ভালো বন্ধু! কিন্তু আমি আগেও বলেছি, হ্যারিয়েটের দিকটা আপনি দেখছেনই না। মেয়েটিকে আপনি বিয়ের পাত্রী হিসেবে যতটা হেলাফেলা করছেন, ও কিন্তু তেমন নয়। হ্যাঁ, ও হয়তো খুব বুদ্ধিমতী নয়, কিন্তু ওর চরিত্রের গভীরতা বিষয়ে আপনার কোনো ধারণা নেই, আর আপনি যেভাবে ওর বোধবুদ্ধিকে ছোট করে কথা বলছেন, সেটা কিন্তু একেবারেই ঠিক হচ্ছে না। তা-ও যদি ধরে নিই, আপনার কথাই ঠিক – রূপ আর মিষ্টি স্বভাব ছাড়া ওর মধ্যে আর কিছু নেই – কিন্তু সেই গুণগুলি ওর মধ্যে যেমন অপর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে, বাইরের জগতের পরিপ্রেক্ষিতে তার মূল্য কি কিছু কম? শতকরা নিরানব্বই জন মানুষ স্বীকার করবে, ও অসাধারণ রূপসী। যতক্ষণ না একজন পুরুষ জেনেবুঝে রূপের চেয়ে জ্ঞানবুদ্ধিকে বড় করে দেখবে, ততক্ষণ হ্যারিয়েটের পাণিপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়বে বৈ কমবে না। ওর স্বভাবটিও সাধারণ নয়। অন্যকে বুঝতে পারা, অন্যকে আনন্দ দেওয়াকেই নিজের কর্তব্য মনে করা, নিজেকে নিয়ে গর্ব না করা, বিরক্ত না হওয়া বা রাগ না করা – আমি যেটুকু বুঝি, পুরুষরা এই বিষয়গুলিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

‘বাঃ এমা, তুমি যেভাবে তোমার যুক্তিবুদ্ধির অপব্যবহার করছ, তাতে আমার বলতে ইচ্ছে করছে, এর চেয়ে বুদ্ধি না থাকাই শ্রেয়।’

‘সে তো বটেই!’ এমাও উগ্র ঠাট্টার সুরে বলল, ‘আপনাদের সবার মনের কথা আমার বুঝতে বাকি নেই। আমি ভালো করেই জানি, হ্যারিয়েটের মতো একটি মেয়েকে পেলে প্রতিটি পুরুষমানুষই বর্তে যাবে – ওর রূপ পুরুষটিকে মুগ্ধ করবে, আর ওর স্বভাব বারবার প্রমাণ করে দেবে পুরুষটি কত বুদ্ধিমান। একাধিক পুরুষ ওর জন্য ভিড় করে আসবে। এমনকী আপনিও যদি বিয়ে করেন, তাহলে ও-ই হবে আপনার যোগ্য পাত্রী। সেই হ্যারিয়েট – মাত্র সতেরো বছর বয়েসে প্রথম যে লোকটি ওর পাণিপ্রার্থনা করেছে, চোখ-কান বুজে তাকেই বেছে নেবে! জীবনের চাওয়াপাওয়া বুঝতে একটুও সময় নেবে না?’

‘তোমাদের বন্ধুত্ব যে আসলে দুই মূর্খের সভা মাত্র, তা বুঝতে পেরেও আমি মুখ বন্ধ রেখেছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, এর ফল হ্যারিয়েটের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে। তুমি ওকে ওর রূপের প্রশংসা করে ওকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলবে। রূপ ওর আছে। কিন্তু ক্রমশ ওর মনে হতে থাকবে, কেউই সে রূপের যোগ্য নয়। দুর্বল মনে অহঙ্কারের প্রলেপ দিয়ে তুমি ওর সর্বনাশের পথ তৈরি করছ। ওর আশা-আকাঙ্খাগুলোকে গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়ার চেয়ে সহজ আর কিছু নেই। কিন্তু শত রূপ সত্ত্বেও দেখবে, মিস হ্যারিয়েট স্মিথ অত সহজে বিয়ের প্রস্তাব পাচ্ছেন না। বিচক্ষণ পুরুষরা বোকা বউ চায় না। যে পুরুষদের পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করার দায় আছে, তারা ওর বংশমর্যাদার অভাব মেনে নিতে পারবে না। আর যারা সবদিক বুঝে কাজ করে, তারা কখনোই বাপ-মা’র খোঁজ না থাকা একটি মেয়েকে বিয়ে করার ঝুঁকি নেবে না। ও রবার্ট মার্টিনকে বিয়ে করুক – ওঁদের পরিবারটি সম্ভ্রান্ত – ওখানে ও নিরাপদে থাকবে, আনন্দে থাকবে। কিন্তু তুমি যদি ওকে বড়ঘরের স্বপ্ন দেখাতে থাকো, তাহলে মিসেস গডার্ডের আবাসিক বিদ্যালয়েই ওকে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে, অন্তত যতদিন না (কারণ হ্যারিয়েট স্মিথের পক্ষে একা জীবন কাটানো সম্ভব না) ও হতাশ হয়ে যাকে হাতের কাছে পাবে তাকেই বিয়ে করে না ফেলছে।

‘এ নিয়ে আমাদের মত এতটাই আলাদা, মিস্টার নাইটলি, যে কথা বাড়াতে গেলে শুধুই একে অন্যকে রাগিয়ে তোলা হবে। আপনি যা-ই বলুন, ও রবার্ট মার্টিনকে বিয়ে করবে – এ আমি হতে দেব না। ইতিমধ্যেই প্রত্যাখ্যানের চিঠি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে, দ্বিতীয়বার প্রস্তাব আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই সিদ্ধান্তটা নিতে আমি ওকে একেবারেই প্রভাবিত করিনি, এটা বললে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু আসলে এতে আমার বা আর কারো খুব বেশি কিছু করার দরকার ছিল না। মিস্টার মার্টিনের চেহারাছবি, ভাবভঙ্গি এতটাই গেঁয়ো যে, হ্যারিয়েট যদি আগে কখনো ওঁকে পছন্দ করেও থাকে, এখন আর তা করে উঠতে পারত না। আগে যখন ও তেমন কাউকে চিনত না, তখন হয়তো যা-হোক করে ওঁকে সহ্য করে নিতও বা। যতই হোক, উনি ওর বন্ধুদের ভাই এবং ওকে খুশি করার জন্য উনি যথেষ্ট চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু তাসত্ত্বেও হ্যারিয়েটের অভিজ্ঞতার অভাবটা নিশ্চয় অ্যাবে-মিলে থাকাকালীন মিস্টার মার্টিনের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠেছিল। এখন সেই অবস্থাটা পাল্টে গেছে। এখন শিক্ষিত ভদ্রলোক মানে কী, হ্যারিয়েট সেটা বুঝে গেছে।’

‘যা মুখে আসছে তুমি তাই বলছ!’ মিস্টার নাইটলি উত্তরোত্তর রেগে উঠতে লাগলেন, ‘রবার্ট মার্টিনের সততা, বিচক্ষণতা, সহৃদয়তা আর ভদ্রতাবোধের মূল্য হ্যারিয়েট বুঝেই উঠতে পারবে না।’

এমা উত্তর দিল না। যদিও সে যথাসম্ভব শান্ত থেকে কিছুতেই কিছু আসে যায় না, এমন হাবভাব করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে উতলা হয়ে পড়েছিল। মিস্টার নাইটলি এবার গেলেই ভালো হয়, এই তার মনের ইচ্ছে। তার কৃতকর্মের কথা ভেবে যে তার অনুশোচনা হচ্ছিল তা একেবারেই নয়। মেয়েদের অধিকার এবং সূক্ষ্ম অনুভূতির ব্যাপারে সে নিজেকে বিশেষজ্ঞ বলেই মনে করত। কিন্তু তাসত্ত্বেও মিস্টার নাইটলির বোধবুদ্ধির উপর তার একটা স্বভাবগত শ্রদ্ধা ছিল, তাই তিনি তাঁর প্রতি এতটা রুষ্ট হয়েছেন ভেবে সে অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছিল, বিশেষ করে তিনি যখন রেগেমেগে ঠিক তার নাকের সামনেই গুম হয়ে বসে রইলেন। খানিকক্ষণ দু’জনের কেউই কথা বলতে পারল না। এমা একবার আবহাওয়া বিষয়ে মন্তব্য করলেও তাঁর দিক থেকে সাড়া পাওয়া গেল না। তিনি যেন কী একটা ভাবছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে তিনি মনের ভাবনাগুলিকে গুছিয়ে তুলে বললেন –

‘যা ঘটে গেল, তাতে রবার্ট মার্টিনের বিশেষ কিছু ক্ষতি হয়নি – সেকথা তিনি কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারবেন। হ্যারিয়েটের ব্যাপারে তুমি কী ভাবছ তুমিই জানো। কিন্তু তোমার ঘটকালি করার উৎসাহটা যেহেতু কারো অজানা নয়, তাই বন্ধু হিসেবে পরামর্শ দিচ্ছি, সম্বন্ধটা যদি মিস্টার এলটনের সাথে করার কথা ভেবে থাকো, সে চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য।’

এমা হেসে উঠল। তিনি তাতে ভ্রূক্ষেপ না করে বলে চললেন –

‘এলটনের উপর ভরসা করে থেকো না, ওঁকে দিয়ে তোমার কাজ হবে না। উনি অত্যন্ত সজ্জন, হাইবারিতে সবাই ওঁকে ভিকার হিসেবে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু তাই বলে উনি যেমন-তেমন একটা বিয়ে করে ফেলতে রাজি হবেন না। টাকার গুরুত্ব উনি আর পাঁচজনের চেয়ে কম বোঝেন না। ওঁর কথার ধরন আবেগপ্রবণ হতে পারে, কিন্তু কাজের বেলায় তিনি অযৌক্তিক কিছু করবেন না। তুমি যেমন হ্যারিয়েটের কথা ভাবছ, উনিও কিন্তু নিজের কথা ভাববেন। উনি জানেন, উনি একজন রূপবান যুবক – সমাজে পাত্র হিসেবে ওঁর ভালোরকম চাহিদা আছে। শুধুমাত্র পুরুষদের ভিতরে যখন উনি থাকেন, তখন ওঁর কথাবার্তার ধরন শুনে আমি এইটুকু বুঝেছি যে উনি যার-তার সাথে জীবনটা কাটাতে রাজি হবেন না। ওঁকে আমি বেশ উৎসাহের সাথে একটি পরিবারের কথা বলতে শুনেছি, যেখানে অনেকগুলি অবিবাহিতা তরুণীর সাথে ওঁর বেশ ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।’

‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ,’ এমা হেসে বলল, ‘আমার যদি মিস্টার এলটনের সাথে হ্যারিয়েটের বিয়ে দেওয়া ইচ্ছে থাকত, তাহলে আপনার কথা শুনে নিশ্চয়ই আমার চোখ খুলে যেত। কিন্তু আপাতত আমি হ্যারিয়েটকে আমার কাছেই রাখতে চাই। ঘটকালি আমি করেছি বটে – এই র‍্যান্ডালেই। কিন্তু সময় থাকতে থাকতে ও কাজটা থেকে পিছিয়ে আসাই এখন ভালো মনে করছি।’

হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে মিস্টার নাইটলি বলে উঠলেন ‘তোমার দিন ভালো কাটুক।’ তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। তাঁর মনমেজাজ ভয়ানক বিগড়ে গেছিল। তিনি সেই শান্ত, ভদ্র তরুণটির হতাশা নিজের ভিতর অনুভব করতে পারছিলেন। তার উপর ছেলেটির মনে আশা জাগিয়ে তোলায় তাঁর নিজের ভূমিকার কথা ভেবে তাঁর লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল। আর এই অবস্থার পিছনে এমার কতটা হাত আছে সেটা জানতে পেরে রাগে তাঁর গা জ্বালা করছিল।

এমার মনের অবস্থাও ভালো ছিল না। কিন্তু সে ঠিক বুঝতে পারছিল না তার মন খারাপের কারণ কী। তার একেবারেই মনে হচ্ছিল না যে সে কোনো ভুল করেছে। উল্টে মিস্টার নাইটলির মতো প্রতিপক্ষরাই যে আসলে ভুল ভাবছেন, এই ছিল তার দৃঢ় ধারণা। এমনিতেও মিস্টার নাইটলি যে তার কথায় উঠে চলে গেলেন এরকমটা তার মনে হল না। বরং তিনি যেন নিজেকে ঠিক প্রমাণ করতেই হঠাৎ ওভাবে বেরিয়ে গেলেন। যাই হোক, হ্যারিয়েট যে তখনো ফিরছে না, তাই নিয়ে এমার মনটা কু-ডাক ডাকতে শুরু করল। যদি লোকটা মিসেস গডার্ডের ওখানে ফিরে এসে থাকে? যদি সে হ্যারিয়েটকে সাধ্যসাধনা করে তার মন বদলে দেয়? তাহলে এমা যে হেরে যাবে – এই কথা ভেবে তার মন ছটফট করতে লাগল। শেষে যখন হ্যারিয়েট সত্যি ফিরে এল, এবং বেশ হাসিমুখেই এল, তখন তার ধড়ে প্রাণ এল। সে মনে মনে ভাবল, এবার মিস্টার নাইটলি এসে দেখে যান, সে এই মেয়েটির সত্যিকারের বন্ধু কিনা।

নাইটলি অবশ্য মিস্টার এলটনের ব্যাপারে এমাকে একটু ঘাবড়ে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু (এমা অনেক ভেবে ঠিক করল) এমার মতো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর মানুষের মন বোঝার ক্ষমতা বা ইচ্ছে বা দৃষ্টিভঙ্গি তো আর মিস্টার নাইটলির নেই। অতএব তিনি নিশ্চয় রাগের মাথায় যা ইচ্ছে তাই বলেছেন। ওসব কথা সত্যি বলে বিশ্বাস করতে পারলে তাঁর হয়তো আত্মতৃপ্তি হবে। কিন্তু সত্যি তিনি ভিতরের কথা অত জানেন বলে তো এমার মনে হল না। হ্যাঁ, হয়তো তিনি মিস্টার এলটনকে এমন কিছু কথা বলতে শুনেছেন, যা এমা শোনেনি। তাছাড়া এলটন হয়তো বিষয়সম্পত্তির ব্যাপারে তত উদাসীন নন, হয়তো তিনি টাকাপয়সা জিনিসটা পছন্দই করেন। কিন্তু প্রেমের যুদ্ধে যে শেষ অবধি আবেগই জেতে, টাকা নয়, তা নিয়ে মিস্টার নাইটলির কোনো ধারণা নেই। অন্যদিকে মিস্টার এলটনের আবেগের মহিমার প্রতি এমার এমন দৃঢ় বিশ্বাস যে কোনো বিরুদ্ধযুক্তিই তার কাছে ধোপে টিকছিল না।

হ্যারিয়েটের হাসিখুশি ভাবটা ক্রমে এমার ভিতরে চারিয়ে গেল, বিশেষ করে তার মুখে মিস্টার মার্টিনের বদলে মিস্টার এলটনের নাম শুনে। হ্যারিয়েট মহানন্দে বলতে শুরু করল, মিস ন্যাশ নাকি কাউকে একটা বলছিলেন, মিসেস গডার্ডের বোর্ডিং-এ তাঁর মিস্টার পেরির সাথে দেখা হয়েছে – পেরি গেছিলেন একটি অসুস্থ শিশুর চিকিৎসা করতে। সেখানে পেরি নাকি মিস ন্যাশকে বলেছেন, গতকাল ক্লেটন পার্ক থেকে ফেরার সময় তাঁর নাকি মিস্টার এলটনের সাথে দেখা হয়েছে। আর আশ্চর্যের কথা হল মিস্টার এলটন নাকি লন্ডনের দিকে যাচ্ছিলেন, আর তিনি নাকি কালকের আগে ফিরবেন না, যদিও এর ফলে তাঁর সেই সন্ধ্যায় হুইস্ট-ক্লাবের নৈশ সমাবেশে থাকা হবে না। মিস্টার পেরি তো শুনে হাঁ। তিনি নাকি তখনই মিস্টার এলটনকে ভর্ৎসনা করে প্রশ্ন তুলেছেন, ওখানকার শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন হয়েও খেলতে না গেলে তাঁর দলের কী হবে? সেকথা মাথায় রেখে তাঁর পক্ষে কি লন্ডন যাত্রা একদিনের জন্য পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়? কিন্তু মিস্টার এলটন সে ভর্ৎসনায় কর্ণপাত করেননি। বরং উল্টে রহস্যভরা গলায় বলেছেন, তিনি এমন একটি বিশেষ কাজে লন্ডন যাচ্ছেন, যা সম্পন্ন করতে কোনোমতেই দেরি করা যাবে না। সে কাজ করার জন্য আরও অনেকে অপেক্ষা করে আছে, তবু ভাগ্যদেবী তাঁরই প্রতি সদয় হয়েছেন। মিস্টার পেরি অবশ্য তাঁর কথার মাথামুন্ডু তেমন বুঝতে পারেননি, কিন্তু এর পিছনে যে একটি নারীঘটিত ব্যাপার আছে তা নিয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই। তিনি মিস্টার এলটনকে সেকথা বলেওছেন। উত্তরে এলটন লাজুক হেসেছেন মাত্র। তারপর ফাঁক পেতেই মহা উৎসাহে লন্ডন পাড়ি দিয়েছেন। মিস ন্যাশ শুধু যে মিস্টার পেরির গল্পটা বলে ক্ষান্ত দিয়েছেন তাই না, তিনি মিস্টার এলটনের বিষয়ে হ্যারিয়েটকে আরও নানা গল্প বলে শেষে বলেছেন, তিনি যে এলটনের মতিগতি পুরোটা বুঝতে পারছেন, তা না, কিন্তু তিনি এটুকু জানেন – যে মেয়ের দিকে এলটন চোখ তুলে তাকিয়েছে, সে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতীদের মধ্যে একজন, কারণ মিস্টার এলটনের মতো রূপবান ভদ্রযুবক খুঁজে পাওয়া ভার।