হান কাং এর হিউম্যান অ্যাক্টস- বাংলা তরজমা - ৮

সম্পাদকঃ ১৯৮৫

এক বুধবারের বিকেল চারটের সময়ে সম্পাদক কিম ইউন-সুক গালে ঠিক সাতটা চড় খেল। একদম একই জায়গায় এত জোরে চড়গুলো লাগল যে ওর গালের রক্তজালিকাগুলো ফেটে কষ বেয়ে রক্ত পড়োছিল ফোঁটা ফোঁটা করে। ঠিক কত নম্বর চড়টার পরে এই রক্ত বেরোনো শুরু হল, কিম নিশ্চিত হতে পারছিল না। হাতের পিছন দিয়ে রক্তটা মুছে সে রাস্তায় বেরিয়ে এল। নভেম্বরের শেষের পরিস্কার বাতাসে বেশ শিরশিরানি ভাব। পথচারিদের রাস্তা পেরোনোর ক্রসিংটার সামনে দাঁড়িয়ে সে একবার চিন্তা করল এখন অফিসে ফিরে যাওয়াটাই ঠিক হবে কি না। গালের কাছটা দ্রুত ফুলে যাচ্ছে বলে ওখানে চামড়াটায় টান ধরেছে। ডান কানে সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। আরেকটা চড় খেলে বোধ হয় কানের পর্দাটাই ফেটে যেত ওর। মুখের ভিতর জমাট বেঁধে থাকা রক্তের দলাটাকে গিলে নিয়ে সে বাড়ি যাওয়ার বাসস্টপের দিকে এগোল।

প্রথম চড়

এবারে এই সাতটা চড়কে ভোলবার পালা শুরু। প্রতিদিন একটা করে ভুলতে পারলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে সবটা হয়ে যাবে। বেশ, তাহলে আজ প্রথম দিন।

তালা খুকে নিজের ভাড়া ঘরটায় ঢুকল সে। পা থেকে জুতো খুকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখল, তারপর মেঝেতেই এক কাত হয়ে শুয়ে পড়ল – কোটের বোতামগুলোও না খুলে। ভাঁজ করা বাহুর উপর নিজের বাঁ গালটা রাখল সে – ডান গালটা এখনো ফুলছে। ওপরের দিকের চাপে তার ডান চোখটা ঠিকমত খুলতে অসুবিধে হচ্ছে এখন। দাঁতের উপরের পাটিতে যে ব্যথাটা আরম্ভ হয়েছিল, সেটা এখন মাথার মধ্যে যেন দপদপ করছে।

প্রায় মিনিট কুড়ি এভাবে শুয়ে থাকার পর সে উঠে পড়ে। জামাকাপড় খুলে নিজের সাদা অন্তর্বাসটুকু পরে সে কাপড়গুলি আলনায় ঝুলিয়ে দেয়, পায়ে চটিটা গলিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। তার ফুলে থাকা মুখের উপর ঠান্ডা জলের ছিটে দিয়ে সে যতটা আরে মুখটা হাঁ করে ব্রাশ করতে থাকে, এতই আস্তে যে সে যেন দাঁতটার উওর ব্রাশটা স্রেফ বুলিয়ে দিচ্ছে। ফোনটা একবার রিং হয়ে কেটে গেল। শুকনো কাপড়ে হাত-পা মুছে ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ফোনটা আবার বাজল। ও এগিয়ে এসে ফোনটা তুলতে গিয়েও মত বদলে ফোনের তারটাই দেওয়াল থেকে টেনে বার করে ফেলল।

“কী হবে উত্তর দিয়ে?” নিজের মনেই বিড়বিড় করতে করতে সে পাতলা গদিটা বিছিয়ে তার উপরে সুতির বালাপোশটা টেনে নেয়। খিদে পায়নি একটুও। জোর করে কিছু খাওয়াই যায়, কিন্তু তাতে করে শুধু শুধু বদহজম ছাড়া কিছুই হবে না। বালাপোশটার ভিতরে ঢুকেও বেশ শীত করছে, সে হাঁটু গুটিয়ে জড়োসড়ো হয়ে শোয়। ওই ফোন কলটা সম্ভবতঃ অফিসের – বস মনে হয় আসতে চায়। তারপরে তার হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে তাকে। না না, আমি ঠিক আছি, ওরা আমাকে একটু মেরেছে না না, শুধুই চড় মেরেছে কাজে আসতে পারব, চিন্তা নেই, আমি ঠিকই আছি না না, হাসপাতালে যাবার কোনো দরকার নেই আমার মুখটা একটু ফুলে গেছে শুধু  নাহ, ভালোই হয়েছে যে ও ফোনের তারটা খুলে নিয়েছে।

বালাপোশটা আস্তে আস্তে গরম হতে শুরু করার পর ও খুব সাবধানে সোজা হয়ে শোয়। সবে ছটা বাজে, বাইরে এখনই অন্ধকার হয়ে গেছে। কাচের একদিক দিয়ে বাইরের রাস্তার কমলা রঙের ঘোলাটে আলো এসে পড়ছে। এভাবে শুয়ে একটু আরাম পেয়ে টেনশনটা একটু কমতে হাতের সমস্যার দিকে মন দেয় সে।

তাহলে প্রথম চড়টা কিভাবে ভুলতে পারি আমি?

লোকটা যখন প্রথম চড়টা মারল, সে কোনো শব্দ করেনি। পরের চড়টার ভয়ে গুটিয়েও যায়নি। নিজের সিট থেকে লাফ মেরে সাক্ষাৎকার কক্ষের টেবিলের পিছনে লুকিয়ে কিংবা দরজার দিকে পালিয়ে না গিয়ে সে চুপচাপ, নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসেছিল,অপেক্ষা করছিল, কখন লোকটা মারা থামাবে। দ্বিতীয়, তৃতীয়, এমনকি চতুর্থ চড়টার পরেও সে নিজেকে বলে গেছে, এটাই শেষ। কিন্তু অঞ্চমবার যখন সেই হাতটা আবার তার দিকে ধেয়ে এল, তখন সে ভাবতে শুরু করল, থামবে না, আমাকে মেরেই যাবে ছ নম্বরটার পর ও আর কিছুই ভাবছিল না। গোনাও বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু শেষ চড়টা মেরে লোকটা যখন হাঁপাতে হাঁপাতে ওর সামনের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ল, তখন নীরবে ও নিজের মনের গুন্তিতে এই দুটোকে যোগ করে নিল। সাতটা।

লোকটাকে খুবই সাধারণ দেখতে। পাতলা ঠোঁট, চেহারায় কোনো বৈশিষ্ট্য কিংবা খুঁত নেই। চওড়া কলারের হালকা হলুদ রঙের একটা শার্ট পরেছিল লোকটা, ধুসর সুটের প্যান্টটা কোমরে বেল্ট দিয়ে আটকানো। তার বকলসটা চকচক করছিল। রাস্তায় কোথাও এই লোকটাকে দেখলে সে ওকে কোনো কোম্পানির দিন আনা দিন খাওয়া ম্যানেজার কিংবা সেকশন চিফ ছাড়া আর কিছুই ভাবত না।

“কুত্তি। তোর মতন একটা কুত্তি এরকম একটা জায়গায় কী করছে? যা খুশী হয়ে যেতে পারে, কেউ জানতেও পারবে না কিছু।“

ততক্ষণে লোকটার থাপ্পড়ের আঘাতে ওর গালের শিরাগুলো ফেটে গেছে, লোকটার নখের খোঁচায় চামড়াটাও ছড়ে গেছে। তবে ইউন্সুক তখনো সেটা টের পায়নি। ও তখনো লোকটার চোখের দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে। “যদি এমন কোনো গর্তের মধ্যে মরে পড়ে থাকতে না চাস যেখানে কাক কিংবা ইঁদুরও তোর লাশ খুঁজে পাবে না, তবে যা বলছি মন দিয়ে শোন। সেই হারামজাদাটা কোথায় আছে, বলে দে।“

সেই “হারামজাদা” – সেই অনুবাদকের সাথে দিন পনেরো আগে চেউঙ্গে নদীর ধারে একটা বেকারিতে ওর দেখা হয়েছিল। সেদিনই হঠাৎ করে আবহাওয়াটা পালটে গেছিল, ওকে শীতের জামাকাপড়ের স্তুপ হাতড়ে একটা সোয়েটার খুঁজে বার করে নিতে হয়েছিল বেরোনোর সময়ে। বার্লি-চায়ের কাপটা টেবিলে যে দাগ ফেলেছিল, সেটা একটা ন্যাপকিন দিয়ে মুছে ও প্রুফটা টেবিলের উপর অনুবাদকের দিকে মুখ করে মেলে দিয়েছিল। যতটা সময় নেবার, নিন সার। তারপর ও স্ট্রুসেল রুটির কুড়মুড়ে টুকরো গুলো ছিঁড়ে ঠান্ডা চায়ের সাথে গলাঃধকরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল আর অনুবাদক মন দিয়ে পাণ্ডুলিপিটা দেখছিলেন। প্রায় এক ঘন্টা ধরে উনি সবটা পড়লেন, মাঝে মাঝে ওকে এটা ওটা প্রশ্ন করে জেনে নিলেন, পরামর্শও নিলেন। তারপরে সবশেষে সূচীপত্রটা দুজনে একসাথে একবার ঝালিয়ে নেওয়ার কথা বললেন। ও তখন চেয়ারটা ওনার পাশে টেনে নিয়ে বসল, তারপরে দুজনে মিলে পাতা ধরে ধরে পুরোটা একবার, দুবার করে পরীক্ষা করে নিল – যা নতুন যোগ হয়েছে, পালটানো হয়েছে, সব সূচীপত্রে ঠিকঠাক এসেছে কি না। চলে আসার আগে ও জানতে চেয়েছিল, বইটা বেরোলে ওনার সাথে যোগাযোগ করা যাবে কিভাবে। অনুবাদক একটু হেসেছিলেন।

“আমি কোনো দোকানে গিয়ে খুঁজে নেব”

নিজের ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করে ওনার দিকে এগিয়ে ধরে ইউন সুক।

“প্রথম সংস্করণের রয়ালটির টাকা এটা। আমার বস চান এটা আপনি অগ্রিম নিন।“ অনুবাদক বিনা বাক্যব্যয়ে খামটি নিয়ে নিজের জ্যাকেটের ভিতরের পকেটে রাখলেন, “পরের রয়ালটির টাকা আপনাকে কিভাবে দেব?” “আমি পরে যোগাযোগ করে নেব।“

ওঁকে দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি যে উনি কোনো ফেরারী অপরাধী। বড়জোর একটু বিষণ্ণ, মনমরা মনে হয়েছিল ওঁকে। ত্বকে একটা হলুদ ছাপ  যেন ওঁর লিভারের কোনো সমস্যা আছে – অথবা স্রেফ বহুদিন কোনো ঘরের ভিতরে কাটানোর কারণেও হতে পারে। ওঁর ছোট্ট ভুঁড়িটা আর মাংশল চোয়ালও সেকথাই বলছিল। “দুঃখিত, এই ঠান্ডার মধ্যে আপনাকে এতদূরে টেনে আনলাম।“ নিজের থেকে অনেকটা বেশী বয়সী একজনের কাছ থেকে এরকম একটা অপ্রয়োজনীয় ক্ষমা প্রার্থনায় সে মনে মনে একটু হাসল।

“এটা তোরই ড্রয়ারে ছিল খানকি মাগি – এটা সেই বেজন্মাটারই লেখা, আর তুই বলছিস তুই জানিস না ও কোথায়?”

লোকটা যখন ওর টেবিলের উপর থেকে প্রুফের কাগজগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছিল, তখন লোকটার চোখের দিকে না তাকিয়ে ও উপরের ফ্লুরোসেন্ট আলোর ধুলোপড়া টিউবটার দিকে তাকিয়ে ছিল। আবার আমাকে মারবে ভেবে ও চোখ পিটপিট করছিল।

সেই মুহুর্তে কেন তার ফোয়ারাটার কথা মনে হল তা ও নিজেই জানেনা। বন্ধ চোখের পাতা থেকে গড়িয়ে আসা জলকনাগুলো জুন মাসের আকাশে বাষ্প হয়ে মিশে যাচ্ছিল। ওর এই আঠেরো বছরের শরীরটাকে বাসের সিটের জিম্মা করে ও চোখটা বন্ধই রেখেছিল সারা রাস্তা। সূর্যের আলো চোখের উপর পড়ে আরও বেশী জল এনে দিচ্ছিল ওর চোখে, আর সেগুলো সবই বাষ্প হয়ে যাচ্ছিল একের পর এক, ফোঁটায় ফোঁটায়। তার বাড়ির সামনের বাসস্টপটায় নামার পর সে প্রথমেই কপালের ঘাম মুছতে মুছতে সামনের পাবলিক ফোন বুথটায় গিয়ে একটা কয়েন ফেলে ১১৪ ডায়াল করল। “প্রভিন্সিয়াল অফিস, অভিযোগ বিভাগ” ওপার থেকে শোনার পর ওদের দেওয়া নম্বরটা আবার ডায়াল করলে সে, “এক্ষুণি দেখে এলাম যে ফোয়ারাটা দিয়ে জল বেরোচ্ছে, সেটা হওয়া ঠিক না মনে হয়”, তার গলা শুরুতে একটু কাঁপলেও কথা বলতে বলতে ক্রমশঃ পরিস্কার হয়ে আসে, “মানে আমি বলতে চাইছি, এর মধ্যেই ওটা চালু হয়ে যেতে পারে কিভাবে? সেই বিদ্রোহের সময় থেকে ওটা বন্ধ আছে, আর এখনও তো সবকিছু স্বাভাবিক হয়নি, তাহলে ওটা কেন চালু হবে এখনই? এটা কিভাবে সম্ভব?”

“একজন সহকারী সম্পাদক, যাকে সে আগে থেকে চিনতই না, তাকে ওর যোগাযোগের ঠিকানা কেন দেবে ও? ওর নিজের পরিবারের লোকেরাও তো সেটা জানে না।“

 

বারবার চোখ পিটপিট করে ও কোনমতে বলে যে ও সত্যিই জানে না, কোনোমতেই না।

 

টেবিলে একটা চাপড় মারে লোকটা, ও আবার গুটিয়ে যায়, হাতটা নিজে থেকেই নিজের গালের কাছে চলে যায়, যেন আবার মার খেয়েছে। আর তখনই হাতটা নামিয়ে অবাক হয়্ব দেখে যে ওর হাতের তালুতে রক্ত লেগে।

 

কিভাবে ভুলব এটা? অন্ধকারে বসে ভাবতে থাকে সে।

সেই প্রথম চড়টা কিভাবে ভুলব?

 

লোকটার সেই চোখদুটো, যেগুলো প্রথমে অনেক্ষণ নিঃশব্দে ওর দিকে শুধু তাকিয়েছিল, শান্ত, সমাহিত, যেন কেউ একজন খুব জরুরী ব্যবসার কাজে বসে আছে।

 

লোকটা যখন হাতটা তুলল প্রথম, ও নিজে বসে বসে তখনো ভাবছিল, না না, নিশ্চই ও আমায় মারবে না।

সেই প্রথম চড়টা, যখন গালে এসে পড়ল, মনে হয়েছিল ওর ঘাড়টাই মটকে গেল যেন।