হান কাং এর হিউম্যান অ্যাক্টস- বাংলা তরজমা - ৭

আরও স্মৃতি চাই আমার।

আরও অনেক স্মৃতিকে আমার মনের মধ্যে অবিরাম ঘুরিয়ে চলা দরকার।

সেই গ্রীষ্মের রাতে উঠোনে আমাদের চান। পাম্প করে করে বালতিতে জল ভরছিলি তুই, জলের ফোঁটাগুলো চকচকে মুক্তোর দানার মতন আমার ঘামে ভেজা পিঠটায় ছিটকে ছিটকে পড়ছিল। আমি কেঁপে উঠে উহ আহ করছিলাম আর তুই কেমন হাসছিলি, মনে আছে?

নদীর ধার দিয়ে আমাদের সেই সাইকেল রেস, মুখেচোখে হু হু হাওয়ার ঝাপটা যেন জাহাজের পালের মত আমার মুখে এসে লাগছে। আমার সাদা ফতুয়াটা হাওয়া লেগে পাখির ডানার মত ঝটপট করছে। পিছন থেকে তোর গলা শুনতে পাচ্ছি, আমাকে চিৎকার করে ডাকছিস, আর আমি কোনোদিকে না তাকিয়ে প্রাণপণে প্যাডেল করে চলেছি। তোর সঙ্গে আমার দূরত্ব বেড়ে চলেছে আর তোর আওয়াজটা ক্ষীণ হয়ে আসছে, আমি আনন্দে চিৎকার করছি।

সেদিন রোববার ছিল – ওহ, সেদিন তো বুদ্ধের জন্মজয়ন্তী ছিল। আমি আর দিদি গ্যাংজিন যাচ্ছিলাম, সারাদিনের জন্য – সেখানকার মন্দিরে আমাদের মায়ের সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিতে – সেখানে তাঁর স্মৃতি উপাসনা করা হয়। ইন্টারসিটি বাসটার জানলার বাইরে ধানক্ষেতগুলো সরে সরে যাচ্ছিল। চারপাশটা একটা মাছের বাটির মতন লাগছিল। ধানক্ষেতগুলোতে পরিস্কার জল আয়নার মত চকচক করছিল – তখন ছিল চারা বোনার ঠিক আগের সময়টা – মাঠে শুধু নীল আকাশের ছায়া দেখা যাচ্ছিল। বন্ধ জানলার সার্সির ভিতর দিয়ে ভেসে আসা অ্যাকাসিয়ার গন্ধে আমার নাকটা নিজে থেকেই কাঁপছিল।

দিদির দেওয়া একটা আলুসিদ্ধ মুখে পুরে আমার জিভটা প্রায় পুড়েই যাচ্ছিল, আমি হুস হুস করে ফুঁ দিচ্ছিলাম আর ওটা মুখের মধ্যে এদিক ওদিক নাড়ছিলাম।

চিনির মত মিষ্টি একটা তরমুজ, আমি আর তার চকচকে কালো কালো বিচিগুলোও ফেলার দরকার মনে করিনি।

দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি ফেরা, সেখানে দিদি দাঁড়িয়ে আছে, আমার জ্যাকেটের চেন আটকে বুকের ভিতরে চেপে ধরে আছি একটা ক্রিসেন্থিমামের রুটি, ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি কিন্তু ওই রুটির টুকরোটা আমার বুকের কাছে এক টুকরো আগুনের মত উষ্ণ।

আমি লম্বা হতে চাইছি।

একদমে চল্লিশটা ডন দিতে চেষ্টা করছি।

প্রথমবার যখন কোনো নারীর হাত ধরলাম – সেই প্রথম নারী, যে সেটা করার অনুমতি দিল, তার মুখটা আর এখন আমার মনে নেই। কী ভীষণভাবে আমি তার হৃদয়টা ছুঁতে চাইছিলাম।

আমার পচে ওঠা ক্ষতটার কথা ভাবছিলাম

ওখানে ঢুকে যাওয়া বুলেটটার কথা

সেই অদ্ভুত শীতল, প্রচণ্ড ভোঁতা একটা অনুভুতি, সেই প্রথম অভিঘাতের সময়টা, সেটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আমার ভিতরে একটা আগুনের গোলার মত পুড়িয়ে দিচ্ছিল সবকিছু, অন্যদিকের সেই গর্তটার কথা, যেখান দিয়ে ওটা বেরিয়ে গেল, আমার সব রক্তকে সঙ্গে টেনে নিয়ে, যে ব্যারেলটা থেকে ওটা চিটকে বেরিয়ে এসেছিল, সেটার কথা

ওই মসৃণ ট্রিগারটার কথা

যে চোখটা আমাকে দেখেছিল, লক্ষ্য স্থির করেছিল, সেটার কথা

যে ফায়ার করার আদেশটা দিয়েছিল, তার চোখদুটোর কথা

আমি ওদের মুখগুলো দেখতে চাই, একটা নিভু নিভু আলোর শিখার মতন ওদের ঘুমন্ত চোখের পাতার উপর ভেসে বেড়াতে চাই, ওদের স্বপ্নের ভিতর ঢুকে পড়তে চাই, সারারাত ওদের মাথা আর চোখের পাতায় সেই শিখার কাঁপন দিয়ে যেতে চাই। যতক্ষণ না ওদের দুঃস্বপ্নে শুধু আমার চোখটাই ভাসতে থাকে, রক্তশূন্য আমার দুটো চোখ। যতক্ষণ না ওরা আমার আওয়াজ শুনতে পায় – আমি জানতে চাই – কেন?

*

তারপর কাটতে লাগল একঘেয়ে দিন আর রাত। ভোর হয়, সন্ধ্যে নামে, প্রতিবেলায় আকাশের নীল সেই একই ভাবে রঙ পালটায়। সেটা ছাড়া সময় যে এগোচ্ছে, তা বোঝার আরেকটা উপায় হল প্রতি রাতে মিলিটারি ট্রাকের ইঞ্জিনের ওই গুড়গুড় আওয়াজ, অন্ধকার চিরে হেডলাইটের আলো আর মৃতদেহের স্তুপে কিছু কম্পন।

প্রতিবার ওদের আসার পর লাশগুলোর ওপরে নতুন করে খড় ছাওয়া হয়। এই লাশগুলোর মধ্যে গুলির ক্ষতের বদলে বেশীরভাগের মাথার খুলি ফাটা কিংবা কাঁধের হাড় ভাঙা। আর মাঝেমধ্যে একেকটা দেহ আসে, যেগুলো প্রায় ঠিকঠাক আছে, হাসপাতালের গাউন পরা, শরীরে ব্যান্ডেজ করা।

একবার ওরা গোটা দশেক লাশ এনে ফেলল, যেগুলোর মনে হল মাথাটাই নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম ওদের মনে হয় মাথা কেটে নিয়েছে কেউ – তারপরে বুঝতে পারলাম যে মুখগুলো সাদা রঙে ঢেকে দেওয়া হয়েছে – যেন মুছে দেওয়া হয়েছে। তাড়াতাড়ি নিজেকে গুটিয়ে নিলাম আমি। ঘাড় ভাঙা মাথাগুলো পিছন দিকে ঝুলে ওই ঝোপগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে – যেন কিছুই নেই।

এই লাশগুলো সবই কি ওই রাস্তাটা থেকেই তোলা হয়েছে?

এরা কি সবাই আমার পাশেই ছিল, আমার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেই বিরাট জমায়েতের অংশ হয়ে, যারা সবাই একসাথে একসুরে আওয়াজ তুলছিল, ভীড় কেটে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলা বাস আর ট্যাক্সিগুলোর দিকে হাত নাড়তে নাড়তে গান গাইছিল, সংহতি দেখাচ্ছিল?

স্টেশনের সামনে যে দুজনকে গুলি করে মেরেছিল, তাদের লাশগুলোর কী হল, যেগুলো কয়েকজন একটা ঠেলাগাড়িতে তুলে একদম সামনের সারিতে নিয়ে ঠেলছিল? দুটো নগ্ন পা আকাশের দিকে তোলা, একটু একটু দুলছিল? ওদের দেখামাত্র তুই কেঁপে উঠেছিলি। খুব জোরে জোরে চোখ পিটপিট করছিলি। আমি তোর হাতটা চেপে ধরে তোকে সারির সামনের দিকে টানছিলাম আর তুই আপনমনে বিড়বিড় করছিলি, আমাদের সেনারা গুলি চালাচ্ছে ওরা আমাদের দিকেই গুলি চালাচ্ছে আমি তোকে ওদের দিকেই টানছিলাম সমস্ত শক্তি দিয়ে, প্রাণপণে কোরাসে গলা মেলাবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম আর তোর চোখে প্রায় জল এসে গেছিল। জাতীয় সঙ্গীত গাইতে গাইতে আমার বুকটা ফেটে যাবে মনে হচ্ছিল। তারপর ওরা সেই সাদা, গরম সীসার বুলেটটা পাঠালো, আমার কানের পাশ দিয়ে সেটা ঢুকে গেল। আশেপাশের সেইসব মুখগুলো মুছে গেল, যেন সেগুলোয় সাদা রঙ বুলিয়ে দিল কেউ।

স্তুপের নীচের দিকে থাকা লাশগুলোই সবার আগে পচে যাচ্ছিল। সাদা সাদা পোকাগুলো শরীরের প্রতিটা অংশে ছেয়ে গেল। নীরবে তাকিয়ে দেখতে থাকছিলাম আমার দ্রুত কালো হয়ে যেতে থাকা মুখটা একটু একটু করে ফুলতে থাকল, যে সব খাঁজ ভাঁজের জন্য আমাকে আমি বলে চেনা যেত সেগুলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে যেতে এমন একাকার হয়ে গেল যে আমাকে চিনে নেবার আর কোনো উপায়ই থাকল না।

যত রাত যেতে থাকল, আরও নতুন নতুন ছায়ারা এসে আমার চার পাশে ভিড় জমাচ্ছিল। সেসব স্পর্শ আগের মতই উদ্ভাবনী সম্ভাবনাহীনই ছিল প্রায়। আমরা কেউই একে অপরকে চিনতে পারতাম না, তবে কে কতদিন এখানে আছে, সেটা অল্প অল্প বুঝে নিতে পারতাম। যখন শুরু থেকে থাকা কোনো ছায়া আর সদ্য নতুন আসা একটা ছায়া একসাথে আমাকে ছুঁতো দু পাশ থেকে, কোনোভাবে আমি সেটা বুঝতে পারতাম – যদিও কিভাবে, তা আমি জানিনা। কিছু ছায়া আছে, যাদের দীর্ঘ বেদনার ভারের কোনো তল খুঁজে পাওয়া যায় না যেন। এরা কি ঐ শরীরগুলোর আত্মা, যাদের জামাকাপড়গুলো শতচ্ছিন, যাদের আঙুলগুলোর নখের নীচে বেগুনি রক্ত গাঢ় হয়ে জমে আছে? যতবার তাদের ছায়াশরীরের সাথে আমারটার ঘষা খাচ্ছিল, একটা তীব্র কষ্ঠের বোধ যেন বিদ্যুতের শকের মত আমার মধ্যে চারিয়ে যাচ্ছিল।

আরেকটু বেশী সময় পেলে কি আমরা একটা বোঝাপড়ায় চলে আসতে পারতাম এক সময়ে? হয়তো বা আমরা এই ঘষাঘষি করতে করতেই নিজেদের মধ্যে দুয়েকটা কথা, ভাব বিনিময়ও করে ফেলতে পারতাম?

কিন্তু সেই একটানা ঘটনাহীন দিনরাতের ধারায় ছেদ পড়ল।

সেদিন দুপুর থেকেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই প্রবল ধারায় আমাদের জমাট বাঁধা রক্তগুলো ধুয়ে যাচ্ছিল আর আমাদের শরীরগুলোয় আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল পচন। সেদিন রাতে পূর্ণচন্দ্রের আলোয় আমাদের নীলচে কালো মুখগুলো ঔজ্জ্বল্যহীন কিন্তু চকচকে দেখাচ্ছিল।

সেদিন ওরা এলো অন্যদিনের থেকে তাড়াতাড়ি – মাঝরাতের আগেই। ওদের আসার শব্দ পেলেই যেমন করে থাকি, আমি শরীরগুলোর থেকে কোনাকুনি একটু দূরে সরে গিয়ে বাকি ছায়াশরীরগুলোর সাথে এককোনে নিঃশব্দে মিশে গেলাম। গত কয়েকদিন ধরে দুটো লোকই শুধু যাওয়া আসা করছিল, কিন্তু আজ শুরুতেই অন্ততঃ জনা ছয়েক লোক দেখতে পেলাম। এরা নতুন আসা লাশগুলোকে যেমন তেমনভাবে ধরে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ডাঁই করছিল, সাধারণতঃ যেমন ক্রস করে করে রাখে, তেমন কিছু না করে। সেটা কোনমতে হয়ে যেতেই ওরা দ্রুত নাকমুখ চেপে ধরে পিছিয়ে গেল – যেন ওই দুর্গন্ধে ওদের দম আটকে আসছে। লাশের স্তুপটার দিকে ভাবলেশহীন শূন্য দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল ওরা।

ওদের মধ্যে একজন ট্রাকটার কাছে ফিরে গিয়ে একটা পেট্রোলের ক্যান নিয়ে এল। ভারী জিনিষটা নিয়ে কোনোমতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে গিয়ে ওর কাঁধ, পিঠ আর হাতের মাংসপেশীগুলো শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছিল।

এবার তাহলে, ভাবলাম আমি। চারপাশের অনেক ছায়ারা কেঁপে উঠল, আমরা সবাই পরস্পরের গা ঘষছিলাম আর অল্প অল্প কাঁপছিলাম। হাওয়ায় মৃদু কাঁপন উঠেই মিলিয়ে যাচ্ছিল, আমাদের শরীরের ধারগুলো আবার একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছিল, যেন একটা পাখি নিঃশব্দে ডানা ঝাপটাচ্ছে।

পিছন থেকে আরও দুজন সৈন্য এগিয়ে এসে প্লাস্টিকের ক্যানটা সবাই মিলে ধরল। ঠান্ডা মাথায় ধীরে ধীরে তারা ক্যানের ঢাকনাটা খুলে লাশের স্তুপটার উপর পেট্রোল ছড়াতে শুরু করল। ওরা খেয়াল রাখছিল যেন প্রতিটা লাশে ঠিকঠাক পেট্রোল পড়ে, কেউ যেন কম বা বেশী না ভিজে থাকে। ক্যান থেকে শেষ ফোঁটাটাও ঝেড়ে ফেলে ওরা নিরাপদ দূরত্বে সরে দাঁড়াল। কাছের ঝোপ থেকে প্রত্যেকে একটা করে শুকনো ডাল ভেঙে বা কুড়িয়ে নিল, নিজেদের লাইটার জ্বেলে সেগুলোকে জ্বালল, তারপর সেগুলো ধরে যাবার পর সর্বশক্তি দিয়ে সামনের দিকে ছুঁড়ে দিল।

আমাদের রক্তমাখা জামাকাপড়ের পচে যাওয়া কাপড়গুলো, যেগুলো আমাদের লাশগুলোর সাথে লেপটে ছিল, সেগুলোই সবার আগে জ্বলে উঠল। তারপর সেই আগুনের শিখা একটু একটু করে আমাদের চুল, শরীর ঢেকে রাখা চামড়া, মেদ, মাংসপেশী আর ভিতরের হাড়গোড়গুলো খেতে লাগল। শিখাটা এত দাউ দাউ করে জ্বলছিল যেন পাশের জঙলটাকেও জ্বালিয়ে দেবে। সেই খোলা জায়গাটা দিনের আলোর মত উজ্জ্বল হয়ে গেছিল।

ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম যে এই শরীরগুলোই, ওই চুল, ওই মাংস, ওই পেশী, ঐসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই আমাদের এতক্ষণ এই জায়গাটায় আটকে রেখেছিল। যে প্রবল চৌম্বক শক্তিটা আমাদের এতদিন আমাদের শরীরের সাথে আটকে রেখেছিল, সেটা দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছিল। প্রথমে আমাদের ছায়াশরীরগুলো গুটিয়ে যেতে যেতে আমরা একে অপরের মধ্যে দিয়ে গলে যাচ্ছিলাম যেন, একটা সুড়সুড়ির মত অনুভূতি, তারপর আস্তে আস্তে একসময়ে আমাদের শরীর থেকে বেরিয়ে আসা কালো ধোঁয়ার মতই, বা যেন একটা দীর্ঘনিঃশ্বাসে আমরা আমাদের শরীর থেকে বেরিয়ে হাওয়ায় ভেসে গেলাম।

সৈন্যগুলো তাদের ট্রাকের দিকে ফিরে যাচ্ছিল; শুধু দুজন বাদে, তাদের উপর সম্ভবতঃ শেষ অবধি অ্যাটেনশনে দাঁড়িয়ে থেকে সবটা দেখে আসার আদেশ ছিল। আমি ওদের দিকে নেমে এলাম হুশ করে, ওদের ঘাড় আর কাঁধের আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম একজনের একটা বেসরকারি উচ্চ শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানের চিহ্ন, আরেকজন একজন সার্জেন্ট। আমি ওদের মুখগুলোর দিকে তাকালাম ভালো করে। কী অল্প বয়স দুজনেরই। ওদের ভয় পাওয়া কালো চোখের তারাগুলোয় আমাদের লাশগুলোর বহ্ন্যুৎসবের ছায়া তিরতির করে কাঁপছিল।

সেই আগুনের শিখা থেকে মাঝে মাঝেই আতশবাজির মত ফুলকি ছিটকে আসছিল। আমাদের ভিসেরার মধ্যের জলীয় অংশগুলো হিশিস শব্দ করতে করতে ফুটতে ফুটতে একসময়ে শুকিয়ে গিয়ে প্রত্যঙ্গগুলো কুঁকড়ে গুটিয়ে যাচ্ছিল। গলাপচা শবগুলোর থেকে হাঁপানি রুগির নিঃশ্বাসের মত থেকে থেকে কালো ধোঁওয়া বেরোচ্ছিল, আর যেখানে কিছুই নেই, সেখানে সাদা হাড়গুলো চকচক করছিল। যাদের শরীরগুলো ইতিমধ্যেই পুড়ে খাক হয়ে গেছে, সেই আত্মাগুলো ক্রমশঃ দূরে দূরে চলে যাচ্ছিল, ওদের সেই কম্পমান ছায়াগুলোর অস্তিত্ব আর টের পাওয়া যাচ্ছিল না। এভাবেই আমরাও এক সময়ে মুক্ত হয়ে যাব, যেখানে ইচ্ছে যেতে পারব।

কোথায় যাব আমি? আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম।

তোমার দিদির কাছে

কিন্তু কোথায় আছে সে?

আমি নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলাম। আমার লাশটা আছে একেবারে নীচের দিকে, তাই ওটায় আগুন লাগতে আরও কিছুক্ষণ সময় লাগবে।

তাহলে বরং যারা তোমাকে মারল, তাদের কাছেই যাও।

কিন্তু তাদেরই বা পাব কোথায়?

স্যাঁতসেঁতে বালিভর্তি সেই ফাঁকা জায়গাটা পাশের জঙ্গলের কালো ছায়ায় ঢাকা পড়েছিল। সেই আলোছায়ার মাঝখানে আমি এদিক ওদিক করছিলাম আর ভাবছিলাম, আমি কোথায় যাব, কিভাবেই বা যাব? আমার মনে হয় এই সহজে চলাফেরা করতে পারার জন্য কৃতজ্ঞই থাকা উচিত, বা যেভাবে আমার ওই বিশ্রী কালশিটে পড়ে যাওয়া মুখটা হারিয়ে যাবে, সেজন্য। যে শরীরিটা নিয়ে এত লজ্জা পেয়েছি, সেটাকে এবার গিলে খেয়ে নেবে আগুনের শিখা – সেটা কোনো আফশোসের কারণ হতে পারে না। আমি নিজেকে কেটেছেঁটে একটা খুব সাধারণ অস্তিত্বে পরিণত করতে চাইছিলাম – ঠিক যেমনটি ছিলাম যখন আমি বেঁচে ছিলাম। আমি স্থির করে নিয়েছিলাম যে কোনো কিছুকেই ভয় পাব না আর।

আমি তোর কাছেই যাব

হঠাৎই, সবকিছু খুব স্পষ্ট হয়ে উঠল।

কোনো তাড়াহুড়োর দরকারই নেই। সূর্য ওঠার আগে রওনা দিলেই হল, জানলার আলো দেখে দেখেই আমি শহরের মাঝখানে পৌঁছে যেতে পারব। তারপর রাস্তার আলো দেখে দেখেই আমি পৌঁছে যাব, যেখানে তুই আর আমি থাকতাম। তুই মনে হয় এর মধ্যে দিদিকে খুঁজে পেয়ে গেছিস। হয়তো ওর সাথে আবার আমি কথা বলতে পারব, অবশ্য আমার তো কথা বলার একটাই উপায় এখন – ওর গা টা একটু ছুঁয়ে দিয়ে। কিংবা কে জানে, ও হয়তো আগেই ওখানে চলে এসেছে, যে ঘরটায় আমরা থাকতাম, তার জানলার ধারটায় কিংবা ঠান্ডা পাথরের বারান্দাটার আশেপাশে আমার মতই ভেসে বেড়াচ্ছে।

আমি নিভে আসা আগুনটার কমলা শিখাগুলোর মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলাম। সেই লাশের স্তুপটা এখন একাকার হয়ে একটা জ্বলন্ত কয়লার স্তুপের মত পরে আছে, আলাদা আলাদা লাশগুলো সব একসাথে মিলেমিশে গেছে।

আগুনটা নিভে যাবার পর জঙ্গল জুড়ে আবার অন্ধকার ঘনিয়ে এল।

অল্পবয়সী সৈন্যগুলো সেই অন্ধকারে হাঁটু মুড়ে বসে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ে মরার মত ঘুমাচ্ছিল।

ঠিক এই সময়েই আমি সেই শব্দটা পেলাম; বাজ পড়ার মত প্রচণ্ড একটা আওয়াজ, যেন একসাথে হাজার হাজার আতশবাজি ফাটছে। ঘাড় ভাঙার মত করে নিঃশ্বাসগুলো মট করে ভেঙে গেল। আত্মাগুলো তাদের শরীর থেকে মুক্ত হয়ে হারিয়ে গেল।

*

তখনই তুই মারা গেলি ডং হো।

কোথায়, আমি জানিনা – শুধু এটুকু জানি যে এরকমটাই হয়েছিল তোর মারা যাবার সময়টায়।

আমি একটা অন্ধকার আকাশের মধ্যে দিয়ে ঘুর্নীর মত উড়ে যাচ্ছিলাম। চারপাশে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার শুধু। শহরের কোথাও না, কোনো জেলা বা অন্য কোনো জায়গাও না, কোথাও কোনো বাড়ির আলো জ্বালা নেই। শুধু অনেক অনেক দূরে একটাই আলোর বিন্দু, সেখান থেকে একের পর এক আগুনের ঝলক বেরোচ্ছিল, বন্দুকের নল থেকে আগুনের দলাগুলো মুহুর্তের জন্য চারপাশটা আলোকিত করে তুলছিল।

আমার কি ওখানে যাওয়া দরকার ছিল সেই সময়টায়? গেলে হয়তো তোকে খুঁজে পেতাম ডং হো, হঠাৎ করে নিজের শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাবার সেই আতঙ্কটা কিছুটা কমত তোর, আমি থাকলে। কিন্তু আমার সেই ছায়াশরীরের চোখগুলো থেকে তখনো ভারী, ঘন রক্ত গড়াচ্ছিল, ভোরের আলো যখন রাতটাকে একটা হিমবাহের মত ধীর গতিতে বেঁধে ফেলছিল, আমি টের পেলাম যে আর একটুও নড়াচড়া করার উপায় নেই আমার, আমি স্থির হয়ে গেছি।