হান কাং এর হিউম্যান অ্যাক্টস- বাংলা তরজমা - ১৭

ওদের একজন ছুটে গেল নিজের ট্রাকটা আনতে। আমি তখনো সেই সিঁড়িটার উপর আচ্ছন্নের মতই শুয়েছিলাম। লোকটা যখন ট্রাকটা নিয়ে ফিরে এল, আমি ভাবছিলাম আমার কী করা উচিৎ। আমি কি সত্যিই কোনো জীবন্ত মানুষের বুকে বন্দুক তাক করে গুলি ছুঁড়তে পারব?

আমাদের ট্রাকটা যখন বার দুয়েক পথ ভুল করার পর শহরের মাঝখানে এসে পৌঁছাল, তখন গভীর রাত। ব্যারাকে পৌঁছে দেখা গেল, বন্দুকগুলো আগেই লুট হয়ে গেছে – বেকারই আসা। সেই রাস্তার যুদ্ধে ঠিক কতজন মারা পড়েছে জানবারও কোনো উপায় ছিল না আমার। শুধু মনে আছে, পরের দিন সকালে হাসপাতালগুলোর দরজায় রক্ত দেবার জন্য মানুষের লম্বা লাইন। শহরের রাস্তায় সর্বত্র ডাক্তার আর নার্সেরা হাতে স্ট্রেচার নিয়ে তাঁদের রক্তমাখা গাউনগুলো পরে ছোটাছুটি করছেন। মনে আছে আমাদের ট্রাকটায় মহিলারা বাসি ভাতের দলা, স্ট্রবেরি আর জল দিচ্ছিলেন সবাই। আর চারিদিকে সকলে তারস্বরে গাইছিলেন জাতীয় সঙ্গীত আর আরিরাং, আকাশে বাতাসে তার সুর ভাসছিল। সেইসব ছবির মত মুহুর্তগুলিতে মনে হচ্ছিল সত্যিই আমরা সবাই মিলে হয়তো নিজেদের ভিতরের খোলসটা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছি – এক মানুষ আরেক মানুষকে স্পর্শ করছি, বিশ্বহৃদিয়ের সাথে একাত্ম বোধ করতে শুরু করেছি, বয়ে যাওয়া রক্তকে মুছে ফেলে ক্ষতস্থানগুলো আবার জুড়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে, আমাদের বুকে যেন হৃদস্পন্দন ফিরে আসছে। এই অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল – এখনো সেটাই আমার মনে আছে শুধু। আপনার এরকম কখনো হয়েছে প্রোফেসার? সেই অসামান্য অনুভূতি – যেন আপনি কোনো আশ্চর্য জাদুবিক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছেন – বিশুদ্ধ, সম্পূর্ণ হয়ে? সেই অসাধারণ মুহুর্ত, যখন আপনার অন্তরাত্মা বিশুদ্ধতায় ঝকঝক করছে আপনার সামনে?

হয়তো যে বাচ্চাগুলো সেদিন আঞ্চলিক অফিসে থেকে গেছিল, তাদেরও এরকমই কিছু অনুভূতি হয়েছিল সেদিন। সেই মুহুর্তের সেই পরিশুদ্ধ অন্তরাত্মার টানে মৃত্যুকেও হয়তো তুচ্ছ বলে মনে হয়েছিল ওদের সেদিন। কিন্তু এখন আর সেই দৃঢ়তা ফিরে আসার কোনো উপায় নেই। এখন বাচ্চাগুলো জানলার নীচে উপুড় হয়ে বসে আছে বন্দুকগুলো ধরে, ওরা ক্ষুধার্ত। ওরা জানতে চাইছে টুক করে গিয়ে পাশের কনফারেন্স রুমে রেখে আসা ওদের স্পঞ্জ কেক আর ফান্টার বোতলটা নিয়ে আসতে পারে কি না? কী বোঝে ওরা মৃত্যুর? না হলে এই সময়ে এরকম বায়না কেউ করতে পারে?

বেতারবার্তায় যখন জানা গেল সেনারা আর মিনিট দশেকের মধ্যে আঞ্চলিক অফিসটার সামনে এসে পড়বে, নিজের বন্দুকটা দেওয়ালে টেকনা দিয়ে উঠে দাঁড়াল জিন-সু। “হয়তো আমাদের সকলের প্রাণের বিনিময়ে আমরা আজকের রাতটা ওদের ঠেকিয়ে রাখতে পারব, কিন্তু এই বাচ্চাদের প্রাণের বিনিময়ে সেটা করার কোনো অর্থ নেই।“ এমনভাবে কথাগুলো বলল সে, যেন সে নিজে কোনো সদ্য স্কুলের পড়া শেষ করে বেরোনো কোনো তরুণ নয় – তিরিশ কি চল্লিশ বছর বয়সী পোড় খাওয়া এক যোদ্ধা। “আমাদের আত্মসমর্পন করা ছাড়া অন্য পথ নেই। যদি দেখা যায় মৃত্যুই একমাত্র অবশ্যম্ভাবী পথ, তাহলে সকলে সোজা বন্দুক নামিয়ে রেখে আত্মসমর্পন করবে। বেঁচে থাকলে সব কিছুই আবার হতে পারে।“

 

এরপর যা ঘটল, তা নিয়ে আর আলোচনা করতে চাই না আমি।

কারুর অধিকার নেই সেসব কথা আমাকে জিজ্ঞেস করার – আপনারও নয় প্রোফেসর।

না, আমরা কেউ এক রাউন্ড গুলিও চালাইনি।

আমরা কেউ একটা মানুষকেও হত্যা করিনি।

সেনারা যখন সদলবলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল, আমাদের দলের একজনও বন্দুক চালায়নি। তাদের গুলিতে অন্যদিকে একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষ মরে যাবে জেনেও গুলি চালানো তাদের পক্ষে সম্ভবই ছিল না। ওরা তো নেহাৎই বাচ্চা সবাই। আমরা ওই বাচ্চাগুলোর হাতে বন্দুক তুলে দিয়েছিলাম। যে বন্দুক চালাবার ক্ষমতাই ওদের নেই।

পরে জানতে পেরেছিলাম সেদিন সেনাবাহিনীকে একদিনে আট লক্ষ রাউন্ড গুলি চালানোর মত রসদ দেওয়া হয়েছিল। আমাদের শহরের জনসংখ্যা সে সময়ে চার লক্ষের কাছাকাছি – অর্থাৎ ওদেরকে প্রতিটা নাগরিককে দুবার গুলি করার মত রসদ দেওয়া হয়েছিল সেদিন। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে পরিস্থিতি একটু এদিক ওদিক হলে সেদিন ওদের অফিসারেরা ঠিক সেটাই করার হুকুম দিত নির্দ্বিধায়। ছাত্র প্রতিনিধিরা যেমন বলেছিলেন, আমরা যদি ঠিক সেটাই করতাম, অর্থাৎ আঞ্চলিক অফিসের উঠোনে আমাদের বন্দুকগুলো জমা করে পরিস্কার আত্মসমর্পনের চেষ্টা, তাহলে সম্ভবতঃ সৈনিকেরা সেই বন্দুকগুলো দিয়েই আমাদের নিরস্ত্র নাগরিকদের গুলি করে মারত। সেই আক্ষরিক অর্থেই রক্তস্রোতের কথা, নিকষ অন্ধকারের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া রক্তের স্রোত, যতবার মনে পড়ে ততবারই আমার মনে হয়, যারা সেদিন মারা গেল, তাদের মৃত্যুগুলো শুধু তাদের ছিল না মোটেই। অন্য কারুর মৃত্যুর বদলে তারা মরেছিল সেদিন। হাজার হাজার মানুষ মরেছিল, আরও হাজার হাজার হৃদয় রক্তাক্ত হয়েছিল সেদিন।

আড়চোখে দেখছিলাম, যাদের সঙ্গে এই কিছুক্ষণ আগেই হয়তো কথা বলেছি, তাদের বুক দিয়ে এখন রক্তের ফোয়ারা ছুটছে। কে বাঁচল আর কে মরল, বোঝা অসম্ভব জেনে আমি শুধু মেঝেতে মুখটা চেপে পড়েছিলাম নিঃশব্দে। কেউ একটা ম্যাজিক মার্কার দিয়ে আমার পিঠে লিখে দিচ্ছিল, বিপজ্জনক  ব্যক্তি। বন্দুকসহ পাওয়া গেছে। আসলে অন্য একজন পরে বলেছিল যে এটা লেখা আছে আমার পিঠে। যখন ওরা আমাদের ধরে নিয়ে গিয়ে মিলিটারি অ্যাকাডেমির সেই সেলে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল।

*

গ্রেফতারির সময়ে যাদের হাতে কোনো বন্দুক ছিল না, তারা শেষ পর্যন্ত “সাহায্যকারী” হিসাবে চিহ্নিত হল এবং এক দল এক দল করে জুন মাস অবধি তাদের একে একে মুক্তি দিল ওরা। মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে থেকে গেলাম আমরা, “বিপজ্জনক লোক”এরা, যাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র সমেত গ্রেফতার করা হয়েছিল। এরপরেই সেই “অত্যাচার অনুষ্ঠান” একটা নতুন মাত্রা পেল। বেধড়ক মারের বদলে ওরা আমাদের যন্ত্রণা দেবার অন্য সূক্ষ্মতর সব উপায় বেছে নিল – যে সব পদ্ধতিতে ওদের শারিরীক পরিশ্রম কম হয়, কিন্তু আমাদের যন্ত্রণা বাড়ে। যেমন ধরুন হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে সেই দুটো হাতের বাঁধনের জায়গা থেকে ঘাড় পর্যন্ত একটা কাঠের শক্ত লগ আটকে রেখে দেওয়া – এর নাম “চুলের কাঁটা”। জলে ডুবিয়ে রাখা, ইলেকট্রিক শক। তাছাড়া ছিল “মুরগি ভাজা” পদ্ধতি, সেখানে শিকারকে ছাদ থেকে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে বনবন করে ঘুরিয়ে দেওয়া হত আর তার মধ্যে চলত এলোপাথাড়ি মার। প্রথম দিকে ওরা আমাদের ঠিক কী অপরাধ করেছি জানার জন্য অত্যাচার করত। কিন্তু ক্রমশঃ ওদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল যেন তেন প্রকারেণ আমাদের মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা, যাতে ওদের ইতিমধ্যেই বানানো ছকে আমাদের নামগুলো খাপে খাপ বসে যায়।

কিম জিন-সু আর আমাকে ওরা সেই একই থালায় অতি সামান্য অখাদ্য খাবার দিয়ে চলেছিল। তার কিছুক্ষণ আগেই “জেরা”র নামে আমাদের উপর যা চলত, তারপর খাবার এলে জন্তুর মতন ওই একটুখানি ভাত বা এক টুকরো কিমচির উপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে নীরবে চামচ দিয়ে নিজের ভাগেরটুকু মুখে তোলার জন্য প্রচণ্ড মনের জোর দরকার হত আমাদের। আমাদের মধ্যে একজন একদিন চিৎকার করে উঠেছিল, আমি এরকম আর পারছি না। আমি যদি সবটা খেয়ে নিই, কী হবে? এই বলে সে যখন তার সঙ্গীর সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করেছিল, একটা অল্পবয়সী ছেলে ওদের দুজনের মাঝখানে এসে দুজনকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “এরকম ক-কোরো না”। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম সেদিন, কারণ এই মুখচোরা ছেলেটাকে আগে কোনোদিন একটা কথাও কখনো বলতে শুনিনি।

আ-আমরা মরার জন্য তৈরি ছিলাম, জানোই তো।

এটা শুনেই কিম জিন-সু আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল।

সেই মুহুর্তে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এসবের উদ্দেশ্য আসলে কি। এইসব অত্যাচার, অর্ধাহার, এরা আসলে খুব স্পষ্ট করে আমাদের কী বলতে চাইছিল। আমরা তোদের বুঝিয়ে দেব যে এই যে তোরা কজন মিলে জাতীয় পতাকা নাড়াতে নাড়াতে জাতীয় সঙ্গীত গাইছিলি, এসব কত ফালতু ব্যাপার। আমরা দেখিয়ে দেব যে তোরা আসলে কতগুলো নোংরা পচা লাশ ছাড়া কিছুই না। একটা মরা জানোয়ারের পচাগলা কঙ্কালের থেকে তোরা কোনো অংশে উন্নত কিছু নোস।

তোতলা ছেলেটার নাম ইয়ং চে। সেদিনের সেই কাণ্ডের পর থেকে কিম জিন-সু র মুখেই আমি নামটা শুনেছিলাম। খাবার মিনিট দশেক পরে যখন প্রহরীদের নজরদারী একটু ঢিলেঢালা থাকত, ও ওই ছেলেটাকে নরম সুরে ডাকত। তোর খিদে পেয়েছে, তাই না ইয়ং চে? কিম ইয়ং চে – তুই কোন বাড়ির ছেলে রে? আমিও গিমহা কিম। তোরা কোন শাখা? তোর তো পনেরো বছর হয়ে গেছে মনে হয় – তাহলে আমার সাথে আর আপনি আজ্ঞে করতে হবে না। আমি তোর থেকে বড়জোর বছর চারেকের বড়। আমাকে দেখে মনে হয় না, বল? আচ্ছা বেশ, চাইলে আমাকে কাকু বলতে পারিস। আমরা তো যতই হোক লতায় পাতায় আত্মীয়ই।

ওদের কথায় কথায় ক্রমশঃ জানতে পারলাম যে ছেলেটা মিডল স্কুলের পর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, এখন ওর কাকার কাঠের কাজের দোকানে ছুতোরের কাজ শিখছে। ওর খুড়তুতো ভাই ওর থেকে দু বছরের বড় – তার দেখাদেখিই ও ও নাগরিক যোদ্ধাদলে যোগ দিয়েছিল। ওর সেই খুড়তুতো ভাই সেই রাত্রে ওয়াই এম সি এ চত্বরে মারা পড়েছে। আ-আ-আমি স্প-স্প্রাইট দিয়ে স্প-স্প-স্পঞ্জ কেক খেতে সবচেয়ে ভ-ভ-ভালোবাসি। যখন ওর খুড়তুতো ভাইতার মারা যাবার কথা বলছিল, ইয়ং চে-র চোখ শুকনোই ছিল, কিন্তু যখন ওর প্রিয় খাবারের কথা বলছিল, ও হাতের কোন দিয়ে চোখ মুছে নিচ্ছিল। মানে ডান হাতের কোন দিয়ে। বাঁ হাতটা কোলের উপর নিশ্চল পড়ে ছিল। আমি সেদিকেই দেখছিলাম – ওর আঙুলের ফাঁক থেকে উঁকি মারতে থাকা তুলোর বলগুলোর দিকে।