জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩৯
- 07 November, 2026
- লেখক: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল
(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)
মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
পর্ব – ৩৯
আলবের্তো ইয়েরাস কামার্গো উপরাষ্ট্রপতির পদ থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা রেডিয়োতে তাঁর নিখুঁত গলার স্বর ও শব্দ দিয়ে দেশকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল যতক্ষণ না লোপেস মুক্তি পান ও শৃঙ্খলা পুণঃস্থাপিত হয়। কিন্তু কঠোর সামরিক আইন জারি হয় ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব হয়। ভবিষ্যতে কী হবে তা ছিল অনিশ্চিত। ১৮৩০ সালে স্পেনের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে ওলাইয়া এরেরার নির্বাচন পর্যন্ত এক শতাব্দী যাবৎ রক্ষণশীলেরা দেশ শাসন করে এসেছেন, কিন্তু উদারতার কোনও চিহ্ন দেখাননি। বিপরীতে উদারপন্থীরা আরও বেশী বেশী করে রক্ষণশীল হয়ে উঠেছেন আর দেশ তার ইতিহাসে রেখে গেছে নিজেরই আবর্জনা। সেই সময়ে উদারপন্থীদের এক দল তরুণ ও সম্ভ্রান্ত বুদ্ধিজীবি ক্ষমতার জন্য লালায়িত ছিলেন। তাঁদের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এলিয়েসের গাইতান১। আমার ছোটবেলার আদর্শদের অন্যতম ছিলেন গাইতান। কারণ তিনি কলা কোম্পানির দমনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। যবে থেকে আমার জ্ঞান হয়েছে তখন থেকে না বুঝলেও তাঁর এই প্রতিবাদের কথা শুনে এসেছি। আমার দিদিমা তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু আমার মনে হয় সেই সময় কম্যুনিস্টদের সঙ্গে তাঁর মিল থাকায় দিদিমা খানিক আতঙ্কিতও ছিলেন। সিপাকিরার এক বারান্দা থেকে জ্বলাময়ী বক্তৃতা দেওয়ার সময় আমি তাঁর পিছনে ছিলাম। আমি চমৎকৃত হয়েছিলাম তাঁর তরমুজ আকৃতির মাথা, ঘন ও সোজা চুল, খাঁটি আদিবাসীদের মতো চেহারা দেখে ও বজ্রগম্ভীর গলার স্বরে বোগোতার ফচকে ছেলেদের মতো উচ্চারণ শুনে। তবে হতে পারে রাজনৈতিক কারণে এটা একটু বাড়িয়ে বলা হত। তিনি তাঁর ভাষণে চিরাচরিত উদারপন্থী বা রক্ষণশীল, কিংবা শোষণকারী ও শোষিতের কথা বলেননি; পরিবর্তে বলেছিলেন দরিদ্র ও অভিজাততন্ত্রের শাসকদের কথা। ‘অভিজাততন্ত্রের শাসক’ কথাটা সেই আমি প্রথম শুনি। তিনি প্রতিটি বাক্যে এমন জোর দিয়ে কথাটা বলছিলেন যে আমি দ্রুত অভিধানে তার অর্থ দেখে নিই।
এলিয়েসের গাইতান ছিলেন উকিল; রোমের সুবিখ্যাত অপরাধ বিষয়ক আইনজীবি এনরিকো ফেরির উল্লেখযোগ্য ছাত্র। সেখানেই তিনি মুসোলিনির বক্তৃতার ধরণ শিখেছিলেন আর কিছুটা ছিল তাঁর নিজের মঞ্চাভিনয়ের স্টাইল। দলে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গাব্রিয়েল তুরবাই ছিলেন সম্ভ্রান্ত ও সংস্কৃতিমনষ্ক একজন চিকিৎসক। চোখে সোনার সরু ফ্রেমের চশমা। সেটা পরলে তাঁকে সিনেমার অভিনেতার মতো লাগত। সাম্প্রতিক কালে কম্যুনিস্ট পার্টির একটি মিটিংয়ে গাব্রিয়েল এমন একটি অপ্রত্যাশিত ভাষণ দেন যে অনেকে বিস্মিত হয়েছিল আর দলেরই কয়েকজন বুর্জোয়া সদস্যের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তিনি মানতে রাজি ছিলেন না যে তাঁর কথায় বা কাজে না উদারপন্থী মতবাদ, না তাঁর পারিবারিক উৎস অভিজাততন্ত্রের সঙ্গে কোনও বিরোধ ছিল। ১৯৩৬ সাল থেকে তাঁর সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, কেননা সেই সময়ে ইটালিতে কলোম্বিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসাবে রোমে থাকাকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। সাত বছর পরে উত্তর আমেরিকায় কলোম্বিয়ার মন্ত্রী হিসাবে ওয়াশিংটনে এই সম্পর্ককে আরও পোক্ত করে তোলেন।
বোগোতায় সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে গাব্রিয়েলের সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। কলোম্বিয়ার কম্যুনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের মধ্যে কয়েকজন তাঁর কাছের বন্ধু ছিলেন যাঁরা উদারপন্থীদের সঙ্গে ভোটে জোট বাঁধার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। সেই সময় লোকে প্রায়ই এই বিষয়ে কথা বলত। ওই সময়েই, ওয়াশিংটনে কলোম্বিয়ার রাষ্ট্রদূত থাকার সময় তাঁর সম্বন্ধে জোর গুজব রটেছিল যে হলিউডের এক বিখ্যাত অভিনেত্রীর সঙ্গে নাকি তাঁর প্রেম। অভিনেত্রীটি হতে পারেন জোন ক্রফোড বা পলেট গদাদ। কিন্তু সারা জীবনই তিনি নিজের চরিত্রবান অবিবাহিত নামটি অক্ষুন্ন রেখেছিলেন।
গাইতান ও তুরবাইয়ের দলের লোকেরা একজোট হয়ে ভোটে দাঁড়ালে সঙ্গবদ্ধ উদারপন্থী দল তৈরি করে সহজেই দলের অন্দরে নতুন পথ তৈরি করতে পারতেন, কিন্তু এঁরা কেউই অর্ধেক শক্তি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ও সশস্ত্র রক্ষণশীলতাকে পরাজিত করতে পারেননি।
এই খারাপ সময়েই আমাদের ‘গাসেতা লিতেরারিয়া’ (সাহিত্যিক গেজেট) প্রকাশিত হল। আমরা যারা প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করেছিলাম তারাও এই পেশাদারি-সুলভ সুন্দরভাবে বিন্যস্ত ও ছাপানো আট পাতার কাগজ দেখে বিস্মিতই হলাম। আমাদের দু’জন প্রধান প্রেরণাদাতা ছিলেন কার্লোস মার্তিন আর কার্লোস হুলিও কালদেরোন। বিরতির সময়ে এঁরা দুজনেই কয়েকটি প্রবন্ধ সম্বন্ধে মন্তব্য করলেন। তার মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য আমাদের অনুরোধে লেখা কার্লোস মার্তিনের প্রবন্ধ। তিনি লিখেছিলেন, আমাদের প্রয়োজন যারা দেশের স্বার্থ বিদেশে বিক্রি করছে, উচ্চাকাঙ্খী রাজনীতিক এবং ফাটকাবাজ যারা দেশের উন্নতিতে হস্তক্ষেপ করছে তাদের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে সচেতন থাকা। এই লেখাটা তার একটা বড় ছবিসহ প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল। কোনবের্সের একটা প্রবন্ধ ছিল স্প্যানিশ-ভাষী-পৃথিবীকে নিয়ে আর আমার একটা কাব্যময় গদ্য হাবিয়ের গার্সেস নাম দিয়ে। কোনবের্স আমাদের জানাল যে বোগোতায় তার বন্ধুদের মধ্যে খুব আলোড়ণ পড়ে গেছে আর এটি আরও বড় মাপের আন্ত-বিদ্যালয় কাগজ হিসাবে প্রকাশ করলে টাকা পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
পাস্তো অভ্যুত্থানের জন্য প্রথম সংখ্যা বিতরণ করা যায়নি। সেই দিনই স্বাভাবিক জনজীবন ব্যহত হয় এবং সিপাকিরার মেয়র সশস্ত্র বাহিনী সঙ্গে নিয়ে লিসেয়োতে ঢুকে বিতরণের জন্য রাখা প্রথম সংখ্যার সমস্ত কাগজ বাজেয়াপ্ত করেন। প্রায় সিনেমার মতো কায়দায় ঘটনাটা ঘটে এবং আগে থেকেই ঠিক করে আসা একমাত্র যে অভিযোগ করা হয় তা হল কাগজে নাশকতামূলক বিষয় নিয়ে লেখা আছে। ওই দিনই রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে নির্দেশ এল যে সামরিক আইনের সেন্সর ব্যবস্থার কাছে ওই কাগজ না পাঠিয়েই ছাপা হয়েছে এবং কার্লোস মার্তিনকে কোনও রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই রেক্টর পদ থেকে নিলম্বিত করা হল।
আমাদের কাছে এই নিদান চূড়ান্ত অযৌক্তিক বলে মনে হল। এতে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত হলাম এবং একই সঙ্গে নিজেদের গুরুত্বও উপলব্ধি করলাম। কাগজটা বড় জোর দু’শোটা ছাপা হয়েছিল বন্ধুদের মধ্যে বিলি করার জন্য। কিন্তু আমাদের বলা হল যে সামরিক আইনের অধীনে সেন্সরশিপের মধ্যে দিয়ে যাওয়াটা বাধ্যতামূলক। কাগজের অনুমতিপত্র বাতিল করা হল নতুন নির্দেশ না আসা পর্যন্ত, যা আর কোনদিনই আসেনি।
পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় পরে এই স্মৃতিকথা লেখার জন্য কার্লোস মার্তিন সেদিনের সেই ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেন। যেদিন আমাদের কাগজ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল সেদিনই যে শিক্ষামন্ত্রী আন্তোনিয়ো রোচা তাঁকে নিয়োগ করেছিলেন তিনিই কার্লোস মার্তিনকে ডেকে পদত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি দেখেন যে মন্ত্রীর হাতে আমাদের ‘গাসেতা লিতেরারিয়া’ কাগজ এবং তাতে বহু বাক্য লাল পেন্সিল দিয়ে দাগ দেওয়া বিরুদ্ধ মতামতের জন্য। তাঁর সম্পাদকীয় প্রবন্ধ ও মারিও কোনবের্সের লেখারও এক অবস্থা। এমনকি একজন সুপরিচিত কবির কবিতাতেও সংকেতে কিছু লেখা আছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। কার্লোস মার্তিন তাঁদের বলেন যে, ‘এভাবে তো বাইবেলের অনেক অংশে মূল অর্থের বদলে অন্য অর্থ প্রকাশিত বলে দাগ দেওয়া যায়।’ তিনি এতটাই রেগে গিয়েছিলেন যে স্বয়ং মন্ত্রী পুলিশ ডাকবেন বলে তাঁকে ভয় দেখান। তাঁকে ‘সাবাদো’ পত্রিকার অধিকর্তা হিসাবে নিয়োগ করা হয়। একজন বুদ্ধিজীবি হিসাবে এটি তাঁর পক্ষে বিশেষ পদোন্নতি হিসাবেই ধরা যায়। যাই হোক, ব্যাপারটাকে তিনি রক্ষণশীলদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন বলে মনে করেন। একবার বোগোতা কাফেয় তিনি আক্রমণের শিকারও হয়েছিলেন। আততায়ী তাঁর দিকে গুলি ছুঁড়তে সমুদ্যত ছিল। পরে এক নতুন মন্ত্রী তাঁকে বিচার ব্যবস্থার প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করেন এবং একটি উজ্জ্বল জীবন কাটিয়ে অবসর গ্রহণ করেন ও শেষ জীবন কাটান তাঁর মরুদ্যান তারাগোনায় বই আর স্মৃতি পরিবৃত হয়ে।
কার্লোস মার্তিনের অপসারনের সময়, যখন তাঁর সঙ্গে আমাদের আর কোনও যোগাযোগ নেই, একটা নাম-গোত্রহীন গুজব ছড়িয়ে পড়ল লিসেয়োয়, বাড়িতে বাড়িতে আর শহরের সব খাবার জায়গায়। গুজবটি বলছে ১৯৩২ সালে পেরুর সঙ্গে যুদ্ধ ছিল অনিয়ন্ত্রিত রক্ষণশিলদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য উদারপন্থীদের প্রতারণা। এমনকি স্টেনশিলে লিখে বিলি করাও হয়েছিল। বলা হয়েছিল পেরুর একজন লেফটেন্যান্ট সেনা টহলদারদের নিয়ে আমাজন নদী পেরিয়ে কলোম্বিয়ার উপকূলের শহর লেতিশিয়া থেকে একজন প্রশাসকের গোপন প্রেমিকাকে অপহরণ করায় বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক প্ররোচনা ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। প্রেমিকাটি ছিল মুলাতা ও আকর্ষণীয়া, নাম পিলার, সংক্ষেপে পিলা। কলোম্বিয়ার প্রশাসক যখন অপহরণের কথা জানতে পারে সে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে দেশের সীমানা পার হয়ে পেরুর মাটি থেকে পিলাকে উদ্ধার করে। কিন্তু পেরুর একনায়ক জেনারেল লুইস সাঞ্চেস সেরো এই অজুহাতে কলোম্বিয়াকে অধিকার করতে চান এবং নিজের দেশের স্বার্থ অনুযায়ী আমাজনের সীমান্তকে পরিবর্তনের চেষ্টা করেন।
অর্ধ শতাব্দী যাবৎ প্রবল প্রতাপের সঙ্গে দেশ শাসন করার পর হেরে গিয়ে রক্ষণশীলরা যে হিংস্র গর্জন করছিল তার সামনে দাঁড়িয়ে ওলাইয়া এরেরা যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘোষণা করলেন। তিনি জাতীয় সংহতির কথা বললেন, সেনাবাহিনীতে নিজের বিশ্বস্ত লোক বসালেন এবং সেনা পাঠালেন পেরু-অধিকৃত কলোম্বিয়ার অংশ দখলমুক্ত করতে। যুদ্ধের দৃপ্ত হুঙ্কারে দেশ কেঁপে উঠল আর আমাদের শৈশব জ্বলে উঠল চিৎকারে: ‘কলোম্বিয়া দীর্ঘজীবি হোক, পেরু নিপাত যাক।’ যুদ্ধের আকস্মিক আক্রমণে গুজব রটে গেল যে কলোম্বো-আলেমানা বিমান ব্যবস্থার যাত্রীবাহী বিমানকে সশস্ত্র যুদ্ধ বিমানে পরিণত করা হয়েছে এবং এরকম একটি বিমান পেরুর গুয়েপি শহরে সেমানা সান্তার শোভাযাত্রার উপর বোমার অভাবে নারকেল ফেলে তা ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। সুবিখ্যাত লেখক হুয়ান লোসানো ই লোসানো রাষ্ট্রপতি ওলাইয়ার আহ্বানে পারস্পরিক মিথ্যাচারের এই যুদ্ধে তাঁর অসাধারণ গদ্যে এই ঘটনার সত্য উদঘাটন করলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় যাবৎ মিথ্যা প্রচারটাকেই লোকে বিশ্বাস করেছে।
জেনারেল লুইস মিগেল সাঞ্চেস সেরো অবশ্যই এই যুদ্ধের ফলে নিজের লৌহ শাসনকে শক্তিশালী করে তোলার একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেলেন। অন্যদিকে ওলাইয়া এরেরা কলোম্বিয়ার সেনাবাহিনীর কম্যান্ডার করে দিলেন রক্ষণশীল জেনারেল আলফ্রেদো বাস্কেস কোবোকে, যিনি তখন প্যারিসে ছিলেন। জেনারেল একটি সশস্ত্র জাহাজে আটলান্টিক অতিক্রম করে আমাজন নদী বেয়ে যখন লেতিশিয়ার কাছে পৌঁছলেন, দুই দেশের কূটনীতিকরা ততক্ষণে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন।
পাস্তো অভ্যুত্থান বা খবরের কাগজের ঘটনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্ক-রহিতভাবে কার্লোস মার্তিনের জায়গায় এলেন ওস্কার এস্পিতিয়া ব্রান্দ। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাব্রতী ও অসামান্য পদার্থবিদ। এই নিয়োগ স্কুলের মধ্যে নানা ধরনের সন্দেহর জন্ম দিল। প্রথম দেখাতেই তিনি যেভাবে আমার কবিদের মতো বড় চুল ও অশিষ্ট গোঁফের দিকে তাকালেন তাতেই আমার ভেতর পর্যন্ত ভয়ে কেঁপে উঠল। তাঁর চেহারায় একটা কাঠিন্যের ভাব ছিল আর গম্ভীর দৃষ্টি নিয়ে সোজা চোখের দিকে তাকাতেন। তারপর খবর পেলাম তিনি আমাদের জৈব রসায়নের শিক্ষক হবেন। আমার ভয়ের ঘড়া পুর্ণ হল।
সেই বছর এক শনিবারে আমরা ম্যাটিনি শোয়ে সিনেমা দেখছি, হঠাৎ একটি বিচলিত স্বর মাইকে ঘোষণা করল যে লিসেয়োর এক ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। মনের মধ্যে এমন চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল যে কী সিনেমা আমরা দেখছিলাম সেটা আর মনে নেই। কোনোদিন ভুলতে পারব না ক্লাউদেত্তে কোলবের্তের ব্রিজের রেলিং থেকে উত্তাল একটি নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার ঘটনা। মৃত ছাত্রটির বয়স সতের বছর, সেভেনে পড়ত। বহুদূরের একুয়াদোরের সীমান্তবর্তী পাস্তো শহর থেকে সবেমাত্র এসেছিল। খেলার মাস্টার তাঁর অলস ছাত্রদের জন্য সপ্তাহান্তে দৌড়ের আয়োজন করেছিলেন। তাতে এই ছাত্রটির হঠাৎ নিঃশ্বাসের খুব কষ্ট হয়েছিল। লিসেয়োতে আমার থাকার সময় এই একটি ছাত্রেরই যে কোনও কারণে হোক মৃত্যু হয় এবং শুধু স্কুলেই নয়, সারা শহরেই তোলপাড় হয়েছিল। আমার সঙ্গীরা আমাকেই বেছে নিয়েছিল সমাধি দেওয়ার সময় দু’-একটা কথা বলার জন্য। সেই রাতেই নতুন রেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম আমার বক্তৃতা তাঁকে দেখানোর জন্য। কিন্তু ঢোকার সময় আমাকে সেই অলৌকিক ভয় চেপে ধরল যা একবারই হয়েছিল আগের মৃত রেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে। এস্পেতিয়া স্যার খুব দুঃখের সঙ্গে আমার লেখাটা পড়লেন এবং কোনও কিছু না বলেই অনুমোদন করলেন। কিন্তু আমি যখন চেয়ার থেকে উঠেছি বেরিয়ে আসার জন্য তিনি ইশারায় আমাকে বসতে বললেন। তিনি আমার লেখা গদ্য ও কবিতা দুই-ই পড়েছিলেন। যেগুলো বিরতির অবকাশে এ-ওর হাতে ঘুরে বেড়ায় তার কিছু কিছু। আর তাঁর মনে হয়েছিল সেই লেখার কয়েকটি কোনও সাহিত্য-কাগজে প্রকাশিত হওয়া উচিত। আমি যখন আমার লজ্জা পাওয়ার নিষ্করুণ স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি তখনই তিনি তাঁর প্রকৃত অভিপ্রায় জানালেন। আমাকে উপদেশ দিলেন কবি-সুলভ চুল কেটে ফেলার, যা একজন গুরুগম্ভীর মানুষকে মানায় না। আরও বললেন গোঁফ ঠিকভাবে ছাঁটতে ও কার্নিভালের পোশাকের মতো ফুল-পাখি ছাপ শার্ট না পরতে। তাঁর কাছ থেকে এই সব কথা একেবারেই আশা করি নি। আমার ভাগ্য ভালো যে ভয়ের জন্য আমি কোনও রকম অশিষ্ট উত্তর দিয়ে ফেলিনি। আমার ভাব দেখে তিনি তা বুঝতে পারলেন এবং উদার স্বরে আমাকে বললেন যে তিনি চান না আমার এই কবিসুলভ ধরণ ছোট ছেলেমেয়েরা নকল করুক। তাঁর অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম গর্বের সঙ্গে আমার স্টাইল এবং কবি-সত্তার এই পর্যায়ের মান্যতা পেয়ে এবং এই রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পর রেক্টরকে খুশি করার জন্য নিজের হাবভাব বদলের চেষ্টায় ব্রতী হলাম। এমনকি মৃত ছাত্রটির পরিবা্রের অনুরোধে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের অনুষ্ঠান বাতিল হলে তা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলেই মেনে নিলাম।
কিন্তু শেষটা হল ভয়ংকর। স্কুল লাইব্রেরিতে যখন কফিন নিয়ে আসা হল একজন আবিষ্কার করল যে কফিনের কাচ ধোঁয়াটে হয়ে আছে। পরিবারের কথায় আলবারো রুইস তোরেস ঢাকনাটা খুললেন। দেখা গেল কাচের ভেতরটা সত্যিই সেঁতসেঁতে হয়ে আছে। বন্ধ কফিনে এই জলীয় বাষ্পের উৎস খুঁজতে তিনি মৃতের বুকে দুই আঙুল দিয়ে হালকা চাপ দিলেন আর তখনই মৃতদেহের গলা দিয়ে বেরিয়ে এল হৃদয়বিদারক এক শব্দ। পরিবারের লোকজন চূড়ান্ত বিচলিত হয়ে ভাবলেন যে নিশ্চয়ই জীবিত অবস্থায় কফিনে শোয়ানো হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক ব্যাখ্যা করে বোঝালেন যে শ্বাসযন্ত্র কাজ না করায় বাতাস ফুসফুসের মধ্যে আটকে ছিল আর বুকে চাপ দেওয়ায় সেই বাতাস বেরিয়ে এসেছে। ব্যাখ্যা এতটা সহজ হলেও বা সহজ ব্যাখ্যা বলেই কেউ কেউ মনে করলেন যে কফিনে রাখার সময় ছেলেটা বেঁচে ছিল। এই ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে আমি চতুর্থ বর্ষের ছুটিতে বাড়ি গেলাম এই ভেবে যে মা-বাবাকে বুঝিয়ে একটু ঠান্ডা করতে হবে যাতে আমাকে আর স্কুলের পড়াশোনা করতে না হয়।
এক অদৃশ্য ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে সুক্রেতে নামলাম। ডকের দেওয়ালটা যেন আমার স্মৃতির দেওয়ালের থেকে ভিন্ন। প্লাজাটাও যেন আমার স্মরণে যা আছে তার থেকে অনেক ছোট আর নগ্ন। গীর্জায় আর খোলা মাঠে ছাঁটা বাদাম গাছের নিচে অনাথ আলো ঝুলছে। রাস্তার উপর বিভিন্ন রঙিন মালা ঘোষণা করছে বড়দিনের আগমন। কিন্তু এই আগত বড়দিন অন্যান্য বারের মতো আমার মধ্যে আলোড়ন তৈরি করল না। ডকের উপর ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গুটিকয় মানুষের কাউকেই যেন চিনতে পারছি না। এমনকি তাঁদের মধ্যে একজন নির্ভুল উচ্চারণ ও স্বরে যখন আমায় বললেন, ‘কী ব্যাপার?’ তখনও নয়।
তিনি আমার বাবা। এত রোগা হয়ে গেছেন যে চেনা যায় না। তাঁর সেই যৌবনের পোশাক সাদা লিনেনের স্যুট, যা দেখে দূর থেকেই চেনা যেত, তা তিনি পরেননি। তাঁর পরণে বাড়িতে ব্যবহারের প্যান্ট, ছোট হাতা গ্রীষ্মমন্ডলীয় শার্ট আর মাথায় ওভারসিয়রদের পরার মতো এক অদ্ভুত টুপি। তাঁর সঙ্গে এসেছিল ভাই গুস্তাবো। তাকেও চিনতে পারিনি, ন’ বছর বয়সেই এত লম্বা হয়ে গেছে।
ভাগ্যক্রমে আমার পরিবার দারিদ্রের পরিমন্ডল বজায় রেখেছে এবং সময়ের আগেই যে রাতের খাবার পরিবেশন করা হল তা যেন আমাকে বোঝানোর জন্যই যে এই আমার বাড়ি, এ ছাড়া আর কোনও বাড়ি আমার নেই। খাবার টেবিলে সুখবর পেলাম যে আমার বোন লিহিয়া লটারি জিতেছে। ঘটনাটা সে নিজেই আমাকে বলল। ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল যখন আমাদের মা একদিন স্বপ্নে দেখলেন যে আরাকাতাকার বাড়িতে একটা চোর চুরি করতে ঢুকলে তাকে ভয় দেখাতে বাবা শূণ্যে গুলি চালিয়েছেন। আমাদের পরিবারের রীতি অনুযায়ী জলখাবার খাওয়ার সময় মা স্বপ্নটা বললেন আর তার সঙ্গে একটা লটারি কিনতে বললেন যার শেষ সংখ্যা সাত। কেননা দাদুর রিভালবারে এই সংখ্যার আকৃতি ছিল। টিকিট কিনলেন মা, তবে ধারে। পুরস্কারের টাকা থেকে শোধ দিয়ে দেবেন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু সেটায় কিছু হল না। তখন এগারো বছরের লিহিয়া বাবার কাছে দুটো তিরিশ সেন্তাবো চায়, একটা হারা টিকিটের টাকা দেওয়ার জন্য আর অন্যটা পরের সপ্তাহের টিকিট কেনার জন্য ওই একই অদ্ভুত নম্বরেঃ ০২০৭।
টীকা
১৮৩। এলিয়েসের গাইতান – হোর্হে এলিয়েসের গাইতান আইয়ালা কলোম্বিয়ার রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। তিনি ছিলেন উদারপন্থী নেতা। ১৯৪৮ সালে তাঁকে হত্যা করার পর বোগোতায় এক প্রবল রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয় যা ইতিহাসে ‘বোগোতাসো’ নামে উল্লিখিত।