জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩৮
- 07 October, 2026
- লেখক: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল
(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)
মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
পর্ব – ৩৮
পরিবর্তে এলেন কবি কার্লোস মার্তিন। ‘পাথর ও আকাশ’ দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠ কবি। বাররানকিয়ায় তাঁকে আমায় চিনিয়েছিল সেসার দেল বাইয়ে। তাঁর বয়স তিরিশ এবং এর মধ্যেই তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। আমি তাঁর কবিতা পড়েছি। একবার বোগোতার একটা বইয়ের দোকানে তাঁর বই দেখেও ছিলাম। কিন্তু কোনোদিন তাঁকে কিছু বলিনি বা তাঁর একটা বইতে সই চাইতেও যাইনি। এক মঙ্গলবারে দুপুরের খাবার সময় কোনও কিছু না জানিয়ে তিনি হঠাৎ আবির্ভূত হলেন। এত তাড়াতাড়ি তাঁকে আমরা আশা করিনি। তাঁকে কবির চেয়েও বেশি একজন উকিল বলে মনে হচ্ছিল। তাঁর পরণে সরু আঁজি কাটা কাপড়ের পোশাক, মাথার সামনে চুল নেই আর একটা সরু লাইনের মতো গোঁফ যার মধ্যে ঠিক তাঁর কবিতার মতোই নিপুণ কাঠিন্য আছে। কাছেই যে দলটি বসেছিল তাদের দিকে মাপা পদক্ষেপে, শান্তভাবে কিন্তু দূরত্ব বজায় রেখে তিনি এগিয়ে এসে আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন:
- ‘আমি কার্লোস মার্তিন।’
সেই সময়ে ‘এল তিয়েম্পো’ (সময়) কাগজের ও ‘সাবাদো’ (শনিবার) পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে প্রকাশিত এদুয়ার্দো কাররানসার লেখায় আমি মুগ্ধ ছিলাম। আমার মনে হত যে লেখাগুলো হুয়ান রামোন হিমেনেসের ‘প্লাতেরো ই ইয়ো’১ (প্লাতেরো আর আমি) গোত্রের। সেই সময়ের যুবক কবিদের ধরণটা ছিল এমনই – গিয়েরমো বালেন্সিয়ার২ মিথকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চাইছিল। কবি হোর্হে রোহাস ক্ষণস্থায়ী ঐশ্বর্যের মালিক হয়ে নিজের টাকায় ও নামে কয়েকটি মৌলিক পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন। এই বইগুলি তাঁর সময়কালে বিশেষ আগ্রহের সূচনা করেছিল এবং পরিচিত কবিদের নিয়ে একটি দলও তৈরি হয়েছিল।
স্কুলের মধ্যে এক বিরাট পরিবর্তনের ঢেউ উঠল। আগেকার রেক্টরের অলৌকিক ভাবমূর্তি বদলে গেল এই রেক্টরের মূর্ত উপস্থিতি দিয়ে। ইনি উপযুক্ত দূরত্ব রক্ষা করতেন ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজন হলেই তাঁকে হাতের কাছে পাওয়া যেত। তিনি নিয়ম করে আমাদের অবস্থা ঠিক আছে কিনা দেখতে আসতেন এবং অন্যান্য অনর্থক রীতিনীতিও দেখতেন। কখনও কখনও রাতের বিশ্রামের সময় আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন।
এই নতুন ধরণ আমায় জীবন-পথের নিশানার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। সম্ভবত কালদেরোন স্যার নতুন রেক্টরকে আমার সম্বন্ধে কিছু বলে থাকবেন। প্রথম দিকে রাতে যখন কথা বলতে আসতেন তখন এক দিন আমাকে কবিতা পড়া নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন। আমি ভেতরে ভেতরে যা ভাবছিলাম সব তাঁকে বলে ফেললাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন ‘লা এক্সপেরিয়েন্সা লিতেরারিয়া’ (সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা) বইটি পড়েছি কিনা। আলফোন্সো রেইয়েসের লেখা বইটা সম্বন্ধে বহু আলোচনা হয়েছে। তাঁকে সত্যি কথা বললাম যে না, পড়িনি। পরের দিন তিনি বইটা আমাকে এনে দিলেন। পরের তিনটে ক্লাসে ডেস্কের নিচে লুকিয়ে রেখে অর্ধেক বই গোগ্রাসে গিলে ফেললাম আর বাকিটা পড়লাম ফুটবল খেলার বিরতির সময়। আমার জেনে খুবই ভালো লাগলো যে তাঁর মতো একজন নামী প্রাবন্ধিক আগুস্তিন লারার গানের জন্য এতখানি সময় দিয়েছেন যেন বা তা গার্সিলাসোর৩ কবিতা। তা তিনি লিখেছেন একটি অসাধারণ বাক্যের ভনিতায়, ‘আগুস্তিন লারার জনপ্রিয় গান জনপ্রিয় নয়।’ আমার কাছে বইটা মনে হল প্রতিদিনের জীবনের স্যুপে ভেজানো কবিতা।
মার্তিন আগের রেক্টরের অপূর্ব ঘরগুলোয় থাকলেন না। পরিবর্তে প্রধান চত্বরে নিজের অফিস খুলে বসলেন যার দরজা সবসময় খোলা থাকত। এর ফলে রাতের খাবারের পরে আমাদের আড্ডা দেওয়ার সময় তিনি আরও কাছে চলে এলেন। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে থাকতে শুরু করলেন প্রধান প্লাজার মোড়ে ঔপনিবেশিক আমলের একটি বড় বাড়িতে। তাঁর পড়ার ঘরের সমস্ত দেওয়াল ভর্তি ছিল সেই সব বইতে যা সেই সময়ের একজন আধুনিক, নিবিড় পাঠক পড়ার স্বপ্ন দেখে। সেখানে সপ্তাহান্তে তাঁর বোগোতার বন্ধুরা আসতেন, বিশেষ করে ‘পাথর ও আকাশ’ দলের সঙ্গীরা। এক রবিবার কোনও একটা কাজে গিয়েরমো লোপেসের সঙ্গে আমায় তাঁর বাড়িতে যেতে হয়েছিল। সেখানে ছিলেন এদুয়ার্দো কাররানসা আর হোর্হে রোহাস, দুই প্রধান তারকা। রেক্টর আলোচনা বন্ধ না করার জন্য আমাদেরকে দ্রুত ইশারায় বসতে বললেন। সেখানে আধ ঘন্টা বসে তাঁদের আলোচনা শুনছিলাম কিন্তু একটা শব্দও বুঝতে পারিনি, কেননা তাঁরা পল ভালেরিকে নিয়ে কথা বলছিলেন যাঁর নামই আগে কখনও শুনিনি। বইয়ের দোকানে ও বোগোতার কাফেতে কাররানসাকে একাধিকবার দেখেছি। তাছাড়াও তাঁকে সহজেই চিনে নিতে পারলাম তাঁর গলার স্বরে ও কথা বলার চঞ্চলতায় যা তাঁর সস্তার পোশাক ও কবি চরিত্রের সঙ্গে ভালো মানিয়ে যেত। বিপরীতে হোর্হে রোহাসকে চিনতেই পারতাম না তাঁর মন্ত্রীসুলভ পোশাক ও আচরণের জন্য, যদি না কাররানসা তাঁর নাম ধরে ডেকে কথা বলতেন। তিন বিখ্যাত সাহিত্যিক নিজেদের মধ্যে কবিতা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ভেবেছিলাম, কিন্তু তা হল না। কথার শেষে রেক্টর আমার কাঁধে হাত দিয়ে অতিথিদের বললেন:
- ‘এই একজন খুব বড় কবি।’
তিনি কথাটি বলেছিলেন ভদ্রতার সঙ্গে, কিন্তু আমার মনে হল ধরণী দ্বিধা হোক, আমি পাতালে প্রবেশ করি। কার্লোস মার্তিন বারবার বললেন এই বিখ্যাত কবিদের সঙ্গে একটা ছবি তুলতে এবং তুললেনও। কিন্তু সেই ছবি সম্বন্ধে আর কিছুই আমার জানা ছিল না। প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরে কাতালানের উপকূলে তাঁর বাড়িতে তিনি যখন বাণপ্রস্থের আনন্দ উপভোগ করছেন তখন সেটি আবার দেখতে পাই।
লিসেয়োতে নবীকরণের ঝোড়ো বাতাস বইতে লাগল। যে রেডিয়োকে আমরা ব্যবহার করতাম শুধুমাত্র একজন অন্যজনের সঙ্গে নাচের সময়, কার্লোস মার্তিন তাকে পরিবর্তীত করলেন সামাজিক যোগাযোগের যন্ত্র হিসাবে। সেই প্রথম সন্ধ্যের খবর শুনে বিরতির সময় চত্বরে বসে তার আলোচনা হল। একটি সাহিত্যিক কেন্দ্র তৈরি ও একটি খবরের কাগজ প্রকাশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক কাজকর্ম বৃদ্ধি পেল। সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ অনুযায়ী যখন আমরা ছাত্রদের নামের একটা তালিকা তৈরি করলাম। মোট নামের সংখ্যা থেকেই উদ্ভুত হল আমাদের দলের নাম: ‘তের জনের সাহিত্য কেন্দ্র’। মনে হল যেন এক বিরাট ভাগ্য আমাদের। কেননা নামটা একটা কুসংস্কারের বিরোধীতাও করছে। এই কজন ছাত্রই উদ্যোগ নিল। আমরা সপ্তাহে একবার করে একসঙ্গে বসতাম সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে, যদিও বাস্তবে স্কুলের ভেতরে ও বাইরে অবসর সময়ে সাহিত্য ছাড়া আর কিছুই করতাম না। প্রত্যেকে নিজের লেখা নিয়ে আসত, সেটা পড়ত এবং তারপর অন্যরা সেটা বিচার করত। এই ঘটনায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে আমিও একদিন কিছু সনেট পড়লাম, নিজের নাম না দিয়ে ব্যবহার করেছিলাম ছদ্মনাম ‘হাবিয়ের গার্সেস’। এর কারণ নিজেকে আলাদা করা নয়, বরং আত্মগোপন করা। সেগুলো ছিল নেহাৎই কলাকৌশলের অভ্যাস, তাতে না ছিল প্রেরণা, না আকাঙ্খা। আমার আত্মা থেকে উদ্গত হয়নি, তাই সেগুলোর কোনও কাব্যমূল্য নেই। আসলে শুরু করেছিলাম কেবেদো৪, লোপে দে বেগা, এমনকি গার্সিয়া লোরকাকেও৪ অনুকরণ করে। এঁদের আট মাত্রার কবিতাগুলো এতই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল যে শুধু শুরু করে দিলেই হত, তারপর আপনা থেকেই যেন এগিয়ে যেত। এই নকল করার জ্বর এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে নিজেই স্থির করলাম গার্সিলাসো দে লা বেগার চল্লিশটা সনেট নকল করব। তাছাড়াও কয়েকজন ছাত্র আমার কাছে সনেট চাইল। তাদের নামে লিখে দিতে হবে তাদের রবিবাসরীয় প্রেমিকাদের জন্য। সেও লিখলাম। সেই প্রেমিকাদের একজন তার প্রেমিক লিখেছে বলে সঙ্গোপনে একটা কবিতা আমায় পড়ে শোনাল। তখন তার খুবই আবেগমথিত অবস্থা।
কার্লোস মার্তিনি আমাদের একটা ছোট্ট ঘর দিলেন। দ্বিতীয় চত্বরে গুদাম ঘরের মতো। জানলাগুলো পাকাপাকিভাবে বন্ধ করা নিরাপত্তার কারণে। আমরা পাঁচজন মতো সদস্য পরের মিটিংয়ের জন্য কাজ ঠিক করে নিলাম। তাদের কেউই লেখাকে জীবনের পাথেয় হিসাবে বেছে নেয়নি, কিন্তু প্রশ্নটা সেটা ছিল না, ছিল প্রত্যেকের সাহিত্যিক সম্ভাবনার পরীক্ষা। আমরা অন্যদের লেখা নিয়ে কথা বলতাম। কিন্তু এত তিক্ত আলোচনায় পৌঁছে যেতাম যে মনে হত যেন ফুটবলের দলেরা বসেছে। একদিন আলোচনার মাঝপথে রিকার্দো গোন্সালেস রিপোলকে বেরিয়ে যেতে হল আর বাইরে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল যে রেক্টর দরজার কাছে বসে আমাদের আলোচনা শুনছেন। তাঁর কৌতূহল হওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ তিনি আশা করতে পারেননি যে আমাদের সমস্ত ফাঁকা সময়টাই সাহিত্যের জন্য নিবেদন করে দেব।
মার্চ মাসের শেষে খবর পেলাম আমাদের প্রাক্তন রেক্টর বোগোতার জাতীয় উদ্যানে মাথায় গুলি লেগে মারা গেছেন। কেউই এই ঘটনাকে তাঁর একাকীত্ব ও অবসাদগ্রস্ত (সম্ভবত) জীবনের সঙ্গে মেলাতে রাজি হলেন না। আবার কেউ তাঁর আত্মহত্যার কোনও কারণই খুঁজে পেলেন না। তিনি মারা গিয়েছিলেন জেনারেল রাফায়েল উরিবে উরিবের স্ট্যাচুর পেছনে, যিনি উদারপন্থী দলের পক্ষে চারটি গৃহযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং দুজন গোঁড়া হত্যাকারী তাঁকে কাপিতোলিয়োর হলঘরে কুঠার দিয়ে হত্যা করেছিল। নতুন রেক্টরের নেতৃত্বে লিসেয়োর একদল প্রতিনিধি শিক্ষক আলেহান্দ্রো রামোসের সমাধি দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিল। এক অন্য যুগের প্রতিনিধিকে বিদায় জানানোর মধ্যে দিয়ে তিনি আমাদের মনে রয়ে গেলেন।
ছাত্রদের মধ্যে দেশের রাজনীতি সম্বন্ধে জানার ইচ্ছা প্রায় ছিল না বললেই হয়। কিন্তু দাদুর বাড়িতে থাকার সময় প্রায়ই একটা কথা শুনতাম যে ‘হাজার দিনের যুদ্ধ’-এর পর দুই দলের মধ্যে একটাই পার্থক্য রয়ে গেছে – উদারপন্থীরা প্রার্থণায় যান সকাল পাঁচটায় যাতে তাঁদের কেউ না দেখেন আর রক্ষণশীলরা যান আটটার সময় যাতে লোকে তাঁদের ঈশ্বরবিশ্বাসী বলে ভাবেন। যাই হোক, প্রকৃত পার্থক্যটা বোঝা যেতে শুরু করল যখন রক্ষণশীলরা হেরে গেলেন এবং উদারপন্থীদের প্রথম দিকের রাষ্ট্রপতিরা বিশ্বের নতুন ঢেউয়ের দিকে দেশের মুখ উন্মুক্ত করতে সচেষ্ট হলেন। রক্ষণশীল পার্টি তাদের চরম ক্ষমতায় জং ধরার ফলে পরাজিত হলে দূরে ইটালির মুসোলিনির উজ্জ্বলতা ও স্পেনের জেনারেল ফ্রাঙ্কোর অন্ধকারাচ্ছন্নতার প্রভাবে দলে শৃঙ্খলা ও শুদ্ধতার দিকে মন দিল। অন্যদিকে তখন প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান আলফোন্সো লোপেস পুমারেহো শিক্ষিত যুবকদের নিয়ে একটা বিশেষ দল তৈরি করে আধুনিক উদারবাদী সংশোধনের চেষ্টা করলেন যা, সম্ভবত না বুঝেই, দেশকে দুটি দলে দ্বিধাবিভক্ত করার ঐতিহাসিক ভুল করলেন যে দুই বিভাগে সারা পৃথিবী বিভক্ত। এটা ছিল অনিবার্য। মাস্টারমশাইরা যে সব বই আমায় পড়তে দিয়েছিলেন তার কোনও একটায় লেনিনের একটি উক্তি পাই: ‘তুমি যদি রাজনীতি না কর, রাজনীতি তোমাকে তার মধ্যে নামিয়ে ছাড়বে।’
যাই হোক, রক্ষণশীল রাষ্ট্রপতিদের ছেচল্লিশ বছরের প্রাগৈতিহাসিক আধিপত্যের পর শান্তি আসন্ন সম্ভব বলে মনে হতে লাগল। তিন তরুণ রাষ্ট্রপ্রধানের আধুনিক মানসিকতা ও উদারবাদী দৃষ্টিকোণ অতীতের কুয়াশা ভেদ করতে উদ্যত হল। এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আলফোন্সো লোপেস পুমারেহো যথেষ্ঠ সাহসী সংস্কারক ছিলেন। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হন এবং কোনও কিছুই এই পরিবর্তনের ছন্দকে আটকাতে পারেনি বলেই মনে হয়। লিসেয়োতে আমার প্রথম বছর ইউরোপের যুদ্ধের খবরে খুবই মগ্ন ছিলাম। দেশের রাজনীতি নিয়েও আগে কখনও এতটা উদ্বেগ আমাদের ছিল না। বিশেষ সময় ছাড়া খবরের কাগজ স্কুলে আসত না। কেননা এই বিষয়টা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। ট্রানজিস্টার আমাদের ছিল না। ছিল একটা পুরনো বড় ইলেক্ট্রিক রেডিও যেটা শিক্ষকদের হলঘরে থাকত আর সন্ধ্যে সাতটার সময় আমরা প্রচন্ড জোরে চালাতাম শুধুমাত্র নাচার জন্য। সেই মুহূর্তে যে পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তাক্ত ও বিভীষিকাময় যুদ্ধ ঘটে চলেছে সে খবর থেকে আমরা অনেক দূরে বাস করতাম।
হঠাৎ করে এক ঝটকায় রাজনীতি এসে পড়ল লিসেয়োর চত্বরে। আমরা ভাগ হয়ে গেলাম উদারপন্থী ও রক্ষণশীল দুই দলে এবং সেই প্রথম জানতে পারলাম কে কোন দলে। স্কুলের অন্দরে একটি শক্তি সক্রিয় হল, প্রথমে অত্যন্ত ভদ্রভাবে ও সংস্কৃতি মনষ্কতার সঙ্গে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার অবনয়ন ঘটে এবং দেশকে যেভাবে নষ্ট করতে শুরু করেছিল স্কুলের ভেতরের অবস্থাও তাই হল। প্রথম দিকে সমস্যাগুলো অতটা সহজে লক্ষণীয় হল না। কিন্তু কার্লোস মার্তিনির প্রভাবের সদর্থক প্রভাব কেউ অস্বীকার করতে পারত না, যদিও তিনি একদল শিক্ষক নিয়ে একটা দল তৈরি করেছিলেন যাঁরা নিজেদের মতাদর্শ কখনও আড়াল করেননি। নতুন রেক্টর প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শণ করেননি, তবে অন্ততপক্ষে হলঘরে রেডিয়োতে সন্ধ্যের খবর শোনার ব্যবস্থাটা তিনিই করেছিলেন এবং তারপর থেকে রাজনীতির খবর নাচের চেয়ে বেশি আগ্রহের জন্ম দিল। নিশ্চিত করে না হলেও বলা হত যে তাঁর অফিসে লেনিন অথবা মার্ক্সের ছবি টাঙানো ছিল।
লিসেয়োতে যে একমাত্র দাঙ্গার ভয় তৈরি হয়েছিল তা এই অদ্ভুত আবহাওয়ার ফলশ্রুতি। হস্টেলের শোবার ঘরে বালিশ আর জুতো উড়তে লাগল পড়াশোনা ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে। কারণটা ঠিক কী ছিল তা সঠিকভাবে বলতে পারছি না। তবে আমার যা মনে আছে এবং অনেক সহপাঠীও আমার সঙ্গে একমত যে সেদিন রাতে চেঁচিয়ে পড়ার সময় রোমুলো গাইয়েগোসের৫ ‘কান্তাক্লারো’-র একটা অধ্যায় পড়ার জন্যই ঘটনাটা ঘটেছিল। মারামারির জন্য এক আজব কারণ।
জরুরী ভিত্তিতে ডেকে পাঠানো হলে কার্লোস মার্তিন দ্রুত চলে আসেন এবং তিনি আসতেই সবাই চুপ করে যায়। সেই ভয়ংকর নৈঃশব্দের মধ্যে তিনি শোবার ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বারবার পায়চারি করলেন। তারপর এক অকস্মাৎ কর্তৃত্বের প্রভাবে, তাঁর মতো চরিত্রের মানুষের পক্ষে যা স্বাভাবিক নয়, তিনি আমাদের নির্দেশ দিলেন শুধু পায়জামা আর চটি পরে বাইরের বরফ-ঠান্ডা চত্বরে জড়ো হতে। সেখানে তিনি আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিলেন কাতিলিনার মানুষের রক্ত মদের সঙ্গে বিতরনের৬ স্টাইলে এবং তাঁরই নির্দেশে আমরা আবার ঘুমোতে ঘরে ফিরে এলাম। লিসেয়োতে থাকাকালীন এই একটি মাত্র ঘটনা যা আমার বিশেষ ভাবে মনে আছে।
সেই বছর মারিও কোনবের্স নামে এক ছাত্র ভর্তি হল একাদশ শ্রেণীতে। সে অন্যান্য স্কুলের ধরা বাঁধা পত্রিকার থেকে আলাদা একটা পত্রিকা করার জন্য আমাদের খুব উৎসাহিত করল। সে প্রথম যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল তাদের মধ্যে আমি একজন। তার ধারণা আমার এতই মনে ধরেছিল যে পত্রিকার সম্পাদক হয়ে যেতে রাজি হলাম, যদিও আমায় ঠিক কী কাজ করতে হবে সে সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা তখন ছিল না। কাগজের শেষের দিকের প্রস্তুতির সময় রাষ্ট্রপতি লোপেস পুমারেহোকে সশস্ত্র বাহিনীর একটি দল গ্রেপ্তার করল ১৯৪৪ সালের ৮ জুলাই। সেই সময় তিনি দেশের দক্ষিণ দিকে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি এই ঘটনার হবহু বর্ণনা দিয়েছিলেন, কোনও ভুল বা অতিরঞ্জন না করে। সম্ভবত অনির্দেশ্যভাবেই তিনি অদন্তকারী দলকে এক অভূতপূর্ব গল্প বলেছিলেন এবং সেই গল্প অনুযায়ী মুক্তি পাওয়ার পর তবে তিনি জানতে পেরেছিলেন ঘটনার সত্যাসত্য। সেই গল্প বাস্তব জীবনের এত নিকটে ছিল যে ‘পাস্তো অভ্যুত্থান’ দেশের অসংখ্য হাস্যকর ঐতিহাসিক ঘটনার অন্যতম হয়ে রয়েছে।
টীকা
১। প্লাতেরো ই ইয়ো – Platero y yo – স্পেনের নোবেলপ্রাপ্ত কবি হুয়ান রামোন হিমেনেসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় গ্রন্থ। প্রকাশকাল – ১৯১৪। এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব সুস্পষ্ট।
২। গিয়েরমো বালেন্সিয়া – কলোম্বিয়ার কবি, অনুবাদক ও রাজনীতিবিদ। তিনি কলোম্বিয়ার কবিতায় আধুনিকতার জনক এবং রক্ষণশীল দলের সদস্য। জন্ম ২৯ অক্টোবর ১৮৭৩ এবং মৃত্যু ৮ জুলাই, ১৯৪৩।
৩। কেবেদো – ফ্রান্সিসকো গোমেস দে কেবেদো সপ্তম শতাব্দীর স্পেনের বাররোকো যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।
৪। গার্সিয়া লোরকা – ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যের অন্যতম কবি। তিনি একাধারে একজন কবি, নাট্যকার ও মঞ্চ পরিচালক ছিলেন। তিনি প্রজন্ম ২৭-এর সদস্য হিসাবেই মূলত বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় তাঁকে হত্যা করা হয়।
৫। রোমুল গাইয়েগোস – ভেনেসুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের অন্যতম বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক। ১৯৪৮ সালে তিনি ভেনেসুয়েলার ইতিহাসে প্রথম স্বাধীনভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু মাত্র নয় মাস পরে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দোন্যিয়া বারবারা’, প্রকাশকাল – ১৯২৯।
৬। কাতিলিনার মানুষের রক্ত মদের সঙ্গে বিতরণ – রোমান আমলে জনৈক কাতালিনা তাঁর পক্ষের লোকেদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করার সময় প্রথা মাফিক কোনও প্রতিজ্ঞা গ্রহণের আগে একজন দাসকে মেরে তার রক্ত মদের সঙ্গে মিশিয়ে সবাইকে দিয়েছিলেন।