জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩৬

জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল

(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)

মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

পর্ব – ৩৬

লিসেয়ো নাশিয়োনালে বন্দী থেকে বাস্তবিক কী শিখেছিলাম জানিনা, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে সুন্দরভাবে একসঙ্গে থাকার ফলে দেশের ঐক্য সম্বন্ধে মনের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল। সেখানেই প্রথম আবিষ্কার করি আমাদের মধ্যে কত বৈচিত্র, আমরা কে কী করতে সক্ষম আর তৃতীয় একটা বিষয় শিখেছিলাম, যা কখনও ভুলব না, তা হল আমাদের এই প্রতিটি মানুষের যোগফলেই আমার স্বদেশ। দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যে বিস্তার বলতে শিক্ষা দপ্তর সম্ভবত এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন আর এক্ষেত্রেই সরকার সাহায্য করার চেষ্টা করছে। অনেক বছর পরে, যখন বয়স হয়েছে, আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়া এক বিমানের ককপিটে আমায় নিমন্ত্রণ করে পাইলট প্রথমেই আমায় জিজ্ঞাসা করলেন আমি কোথাকার মানুষ। উত্তর দেওয়ার জন্য আমাকে শুধুমাত্র তাঁর কথাগুলো শুনতে হয়েছিল:

  • ‘আপনি যেমন সোগামোসোর আমিও তেমনি উপকূলের।’

কারণ লিসেয়োর চতুর্থ বছরে ক্লাসে আমার পাশে বসত যে মার্কো ফিদেল বুইয়া তার কথা বলার ধরণ ও হাবভাবের সঙ্গে অবিকল মিল রয়েছে এই পাইলটের। আমার এই অন্তর্দৃষ্টির ক্ষমতা আমাকে শিখিয়েছিল সিয়েনাগা অঞ্চলে ওই অনিশ্চিত সম্প্রদায়ের সঙ্গে কীভাবে চলতে হয়। তাই আমার কোনও কম্পাস লাগত না। বিরুদ্ধ স্রোতও বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। তাছাড়া সম্ভবত এই দক্ষতাই ছিল আমার লেখক জীবনের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।

যাই হোক, মনে হল যেন স্বপ্নে ভাসছি। স্কলারশিপ পাওয়ার কোনও আশাই মনের মধ্যে ছিল না। কিন্তু পড়াশুনো করতে চেয়েছিলাম, তবে নিজের স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে বজায় রেখে, অন্যের বোঝা হয়ে নয় এবং অবশ্যই পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রক্ষা করে। দিনে তিনবার খাবারের নিশ্চয়তাই ছিল আমাদের পক্ষে যথেষ্ঠ। তার জন্যই ওই গরীবদের হস্টেলে আমরা বাড়ির চেয়ে বেশি ভালো থাকতাম। সেখানকার শাসন ছিল অনেকটাই স্বায়ত্বশাসনের মতো, তবে নজরদারির অধীনে আর তাই বাড়ির থেকে অনেক কম কঠোর। খাবারের জন্য একটা বাজারের মতো ব্যবস্থা ছিল। প্রতিটি ছাত্র তার পছন্দের পরিমাণে খাবার নিয়ে নিত। টাকার কোনও মূল্য সেখানে ছিল না। সকালের জলখাবারের দুটো ডিম ছিল সবচেয়ে বেশি মূল্যবান, তার বদলে তিনবারের খাবারের যে কোনও পদ কেনা যেত। প্রত্যেকটা জিনিষের নির্দিষ্ট মূল্য ছিল এবং কোনোকিছুই সেই বৈধ ব্যবসার পরিবর্তন করতে পারেনি। এমনকি যে চার বছর আমি ওখানে ছিলাম সেই সময়ে এই ব্যবস্থা নিয়ে একটা হাতাহাতি পর্যন্ত কখনও হয়নি।

যে শিক্ষকরা ওই ঘরে একটা আলাদা টেবিলে খেতেন তাঁরাও এই বিনিময় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলেন না। তাঁরা যে স্কুলে শেষ পড়াশোনা করেছেন সেখানকার অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন অবিবাহিত অথবা স্ত্রীদের ছাড়াই এখানে রয়েছেন। তদুপরি মাইনে ছিল আমাদের বাড়ি থেকে যে হাতখরচ আসত তার মতোই যৎসামান্য। আমাদের মতো তাঁরাও খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ করতেন এবং একবার একটা ভয়ংকর ঝামেলার সময়ে তাঁদের কয়েকজন আমাদের সঙ্গে অনশন করবেন এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। যখন তাঁরা উপহার পেতেন বা বাইরে থেকে তাঁদের কোনও অতিথি আসতেন তখন ভালো-মন্দ খাবার আনতেন। এর ফলে প্রতিদিনের একঘেয়েমির বাইরে যাওয়া যেত। স্কুলে আমার চতুর্থ বছরের সময় এরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। লিসেয়োর ডাক্তার অ্যানাটমি ক্লাসের জন্য আমাদের একটা ষাঁড়ের হৃদযন্ত্র দেবেন বলেছিলেন। পরের দিন তিনি সেটা হস্টেলের রান্নাঘরের ফ্রিজে রাখতে দিয়েছিলেন, তখনও তাজা ও রক্তাক্ত। কিন্তু আমরা যখন ক্লাসের জন্য আনতে গেলাম তখন আর সেটা পাইনি। এইজন্য শেষ মুহূর্তে ষাঁড়ের হৃৎপিন্ডের বদলে একজন অনাথ রাজমিস্ত্রির হৃৎপিন্ড ব্যবহার করা হয়েছিল, যে চার তলা থেকে পা পিছলে পড়ে মারা গিয়েছিল। কিন্তু রাধুঁনিরা সবার কুলোবে না বলে সেটাকেই ষাড়েঁর হৃৎপিন্ড ভেবে বিশেষ মশলা দিয়ে মাস্টারদের জন্য রান্না করেছিলেন। মনে হয় মাস্টারমশাই ও ছাত্রদের মধ্যে এই সহজ সম্পর্ক সম্ভব হয়েছিল শিক্ষার সাম্প্রতিক সংস্কারের জন্য, যার সামান্যই ইতিহাসে বেঁচে আছে। তবে নিয়ম-কানুন সহজ করতে আমাদের সাহায্য করেছিল। বয়সের ফারাক কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টাই পরে থাকাও বাধ্যতামূলক ছিল না। তারপর মাস্টার ও ছাত্র উভয়ে একসঙ্গে মদ্য পান করে যখন শনিবারের একই নাচের আসরে মেয়েদের সঙ্গে নাচতেন তখন কারুরই কিছু বলার থাকত না।

এই আবহ সৃষ্টি হয়েছিল এমন মাস্টারমশাইদের নিয়োগের জন্য যাঁরা ছাত্রদের সঙ্গে ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রাখতে সক্ষম। আমাদের অঙ্কের শিক্ষক তাঁর জ্ঞান ও রুক্ষ রসবোধ দিয়ে ক্লাসকে করে তুলতেন এক ভয়ংকর উৎসব। তাঁর নাম হোয়াকিন হিরালদো সান্তা এবং কলোম্বিয়ার প্রথম ব্যক্তি যিনি অঙ্কে ডক্টরেট করেছিলেন। দুর্ভাগ্য যে আমার অনেক চেষ্টা এবং মাস্টারমশাইয়েরও চেস্টা সত্ত্বেও তাঁর ক্লাসে আমি কিছুতেই ভালো করতে পারতাম না। তখন লোকে বলাবলি করত যে কবিতার ভাব অঙ্কের মধ্যে ঢুকে পড়ায় আমার এই অবস্থা। আর লোকে যে শুধু সেকথা বিশ্বাস করবে তাই নয়, শেষ অবধি অঙ্কে হাবুডুবু খাবে। জ্যামিতিটা অপেক্ষাকৃত দয়ালু ছিল, সম্ভবত তার সাহিত্যিক খ্যাতি থাকার জন্য। বিপরীতে পাটিগণিত শত্রুতাপূর্ণ ব্যবহার করত। আজও যদি মনে মনে কিছু হিসাব করতে হয় তাহলে আমি সংখ্যাগুলোকে ছোট সহজ সংখ্যায় ভেঙে নিই, বিশেষ করে সাত আর নয় সংখ্যার ক্ষেত্রে, কারণ এই দুটো সংখ্যার নামতা আমি কোনোদিন মুখস্ত করতে পারিনি। যেমন সাত আর চার যোগ করতে গেলে আমি সাত থেকে দুই বাদ দিয়ে দেব, তারপর পাঁচ আর চার যোগ করে নিয়ে শেষে তার সঙ্গে দুই যোগ করে দেব। হয়ে গেল এগারো! গুন আমি সবসময় ভুল করতাম কেননা হাতে থাকা সংখ্যাটা মনে রাখতে পারতাম না। বীজগণিত শেখার জন্য আমি সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছি। তার একটা কারণ এর ক্লাসিক ঐতিহ্য আর মাস্টারমশাইয়ের প্রতি আমার ভয় ও ভক্তি। কিন্তু সবই গেল জলাঞ্জলি। প্রতি ত্রৈমাসিক পরীক্ষায় ফেল করতাম। মাস্টারমশাইরা দ্বিতীয়বার পরীক্ষা নিতেন। দুটোয় পাশ করলাম। কিন্তু যখন তাঁরা আমার প্রতি করূণায় নিয়মের বাইরে গিয়ে তৃতীয় বার পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেন, আমি আবার ফেল করলাম। 

ভাষার তিনজন শিক্ষক ছিলেন সবচেয়ে নিঃস্বার্থ। ইংরাজির মাস্টারমশাই মিঃ আবেইয়া খাঁটি ক্যারিবীয়ার লোক, কিন্তু তাঁর উচ্চারণটা ছিল পুরো অক্সফোর্ডের মত। ওয়েবস্টারের অভিধানের প্রতি তাঁর বোধহয় ধর্মীয় আকর্ষণ ছিল। তিনি চোখ বন্ধ করে অভিধানটা মুখস্থ বলতে পারতেন। তাঁর উত্তরসূরি ছিলেন এক্তোর ফিগেরোয়া। তিনি যুবক এবং বোলেরোর অন্ধ ভক্ত। বিরতির সময়ে অনেকবার আমরা একসঙ্গে গান গেয়েছি। ক্লাসে সাধারণত প্রচন্ড ঘুম পেলেও তাঁর বিষয়ে যতটা পারতাম ভালো করতাম এবং ফাইনাল পরীক্ষাতেও ভালো হয়েছিল। তবে এই ভালো নম্বর পাওয়া যত না শেক্সপীয়রের জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি লেও মারিনি ও উগো রোমানির জন্য। তাঁরা কত যে প্রেমের স্বর্গ-সৃষ্টি আর কত যে আত্মহত্যার জন্য দায়ী! ফরাসী ভাষার শিক্ষক মঁসিয়ে আন্তোনিয়ো ইলিয়া আলবঁ বুঝতে পেরেছিলেন যে আমি গোয়েন্দা গল্পের পোকা। তাঁর ক্লাস অন্যান্যদের মতোই খুব ক্লান্তিকর ছিল, তবে তিনি রাস্তায় ব্যবহৃত যেসব ফরাসী ভাষার উদাহরণ দিতেন তা কাজে লেগেছিল দশ বছর পরে, প্যারিসে অন্তত না খেতে পেয়ে মরতে হয়নি।

শিক্ষকদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন নোরমাল সুপেরিয়রে ডক্টর হোসে ফ্রান্সিসকো সোকারাসের অধীনে। তিনি একজন মনোবিদ এবং রক্ষণশীল সরকারের শতাব্দী ব্যাপী করণিক শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন করে মানবতাবাদী যুক্তিবাদে পরিণত করার প্রচেষ্টায় ছিলেন। মানুয়েল কুয়েইয়ো দেল রিও ছিলেন একজন যুক্তিবাদী মার্কসবাদী। সম্ভবত এই কারণেই তিনি লিন ইউতাং-কে শ্রদ্ধা করতেন এবং ভূতে বিশ্বাস করতেন। কার্লোস হুলিও কালদেরোনের গ্রন্থাগারের দায়িত্ব ছিল তাঁর জায়গারই মানুষ হোসে এউস্তাসিয়ো রিবেরার উপর, ‘ঘূর্ণিজল’-এর লেখক। গ্রন্থাগারটিতে সমান ভাগে রাখা ছিল গ্রিক ক্লাসিক, লাতিন আমেরিকার ‘পাথর ও আকাশ’ আন্দোলনের লেখকদের বই এবং সব জায়গার রোমান্টিক আন্দোলনের বই। এর ফলে আমাদের মতো নিয়মিত পাঠকরা সান হুয়ান দে লা ক্রুশ বা হোসে মারিয়া বার্গাস বিলার মতো লেখকদের বইয়ের পাশাপাশি শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবের প্রচারকদের বই পড়তে পেরেছিলাম। সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক গোনসালো ওকাম্পোর ঘরে ছিল একটা ভালো রাজনৈতিক গ্রন্থাগার। তবে তিনি কোনও উদ্দেশ্য ছাড়াই সেই বই বড় ছাত্রদের মধ্যে বিতরণ করতেন। কিন্তু যেটা আমি কোনোদিন বুঝতে পারিনি তা হল ফ্রেডরিক এঙ্গেলেসের ‘পরিবারের উৎস, ব্যক্তিগত সম্পদ এবং রাষ্ট্র’-র মতো বই কেন রুক্ষ বিকেলে রাজনৈতিক অর্থনীতির ক্লাসের বদলে মানুষের দুঃসাহসিক অভিযানের সুন্দর মহাকাব্য হিসাবে সাহিত্যের ক্লাসে পড়ানো হয় না। গিয়ের্মো লোপেস গেররা এঙ্গেলসেরই ‘ডুরিংয়ের বিপক্ষে’ বইটি গোনসালো ওকাম্পোর কাছ থেকে নিয়ে এসে বিরতির সময়ে পড়েছিলেন। কিন্তু লোপেসের সঙ্গে আলোচনা করব বলে ওকাম্পোর কাছে যখন বইটা চাই তিনি আমায় বলেন যে গিয়ের্মো এই বিরক্তিকর কাজটা করবেন না। কেননা বইটি মানুষের উন্নতির ক্ষেত্রে বিরাট অপরিহার্য হলেও এত দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যে ইতিহাস সম্ভবত মনে রাখবে না। বোধহয় মতাদর্শের এই মুক্ত আদান-প্রদানের জন্যই লিসেয়োর বদনাম ছিল বিকৃত রাজনীতির পরীক্ষাগার হিসাবে। যাই হোক, আমার অর্ধেক জীবন কেটে গেল এটা বুঝে উঠতে যে সম্ভবত এ সবই ছিল এমন এক স্বতঃস্ফূর্ত অভিজ্ঞতা যা দূর্বলদের ভয় পাইয়ে দেবে আর শক্তিমানদের সমস্ত গোঁড়ামির বিরুদ্ধে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলবে। 

আমার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সরাসরি যোগাযোগ ছিল কার্লোস হুলিও কালদেরোনের। তিনি ছিলেন প্রথম দিকের পাঠক্রমে কাস্তেইয়ানো, চতুর্থ পাঠক্রমে বিশ্বসাহিত্য, পঞ্চমে স্প্যানিশ সাহিত্য ও ষষ্ঠয় কলোম্বিয়ার সাহিত্যের শিক্ষক। এদিকে অদ্ভুতভাবে তাঁর পছন্দের বিষয় ছিল অ্যাকাউন্টেন্সি। তাঁর জন্ম উইলা রাজ্যের রাজধানী নেইবায় আর হোসে এউস্তাশিয়ো রিবেরার প্রতি তাঁর ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। ডাক্তারি ও শল্যচিকিৎসার পড়াশুনো মাঝপথে ছেড়ে দিতে হয়েছিল এবং সেটা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কিন্তু শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রবল আবেগও উল্লেখযোগ্য। তিনিই ছিলেন প্রথম মাস্টারমশাই যিনি আমার লেখার খসড়া কেটে-কুটে নস্যাৎ করে দিয়ে প্রয়োজনীয় মন্তব্য লিখে দিতেন।

সে যাই হোক, শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে এ এক ব্যতিক্রমী ও স্বতস্ফূর্ত সম্পর্ক। শুধু ক্লাসের মধ্যেই নয়, রাতের খাবার খাওয়ার পর চবুতরে বিরতির সময়েও এই সম্পর্ক দীর্ঘায়িত ছিল। আমরা যে আচার-আচরণে অভ্যস্ত ছিলাম এটা তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং এর জন্যই আমরা শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আবহের মধ্যে বাস করতে পারতাম।

গ্রন্থাগার থেকে ফ্রয়েডের সমগ্র রচনা নিয়ে পড়ে মনে হল যেন একটা ভয়ংকর অভিযানের মধ্যে দিয়ে গেলাম। অবশ্যই তাঁর বিদঘুটে ব্যাখ্যার কিছুই বুঝতে পারিনি, কিন্তু ক্লিনিকাল কেসগুলো, যেমন জুলে ভার্নের কল্পনা, সেগুলো আমি টানটান হয়ে শেষ অবধি পড়েছিলাম। কাস্তেইয়ানোর ক্লাসে কালদেরোন মাস্টারমশাই আমাদের একটা গল্প লিখতে বলেছিলেন। বিষয়, যার যেমন ইচ্ছে। আমার মাথায় এল সাত বছরের একটা মেয়ের গল্প যে কিনা মনরোগী আর কোনও রকম কাব্যিক ভাব নেই এমন একটা জ্ঞানগর্ভ নাম দিলাম – ‘বাধ্যতামূলক আবেগের একটি ঘটনা’ (‘Un caso de sicosis obsesiva)। মাস্টারমশাই গল্পটি ক্লাসে পড়ে শোনালেন। আমার পাশে যে বসত, আউরেলিয়ো প্রিয়েতো, সঙ্গে সঙ্গে গল্পটির সমালোচনা করল। তার মতে বিন্দুমাত্র বৈজ্ঞানিক বা সাহিত্যিক ভিত্তি ছাড়াই একটা অত্যন্ত জটিল বিষয় নিয়ে অহংকারী লেখা। অপমানের চেয়ে বেশি রেগে গিয়ে আমি তখন বললাম যে বিষয়টা আমি নিয়েছি ফ্রয়েডের স্মৃতিকথার ক্লিনিকাল কেস থেকে আর ক্লাসের প্রয়োজনে সেটা ব্যবহার করা ছাড়া আমার আর কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। কালদেরোন স্যার ভাবলেন বিভিন্ন সহপাঠীদের কাছ থেকে প্রচন্ড বিরূপ মন্তব্য শোনায় আমি বোধহয় ক্ষুব্ধ হয়েছি, তাই বিরতির সময় আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন এই পথেই এগিয়ে যেতে। আমাকে আরও বললেন যে আমার লেখা গল্পে আধুনিক সাহিত্যের কৌশলের অভাব আছে এটা সত্যি, কিন্তু আমার আছে সহজাত প্রবৃত্তি ও বাসনা। তাঁর লেখাটাকে ভালোই মনে হয়েছিল, অন্ততপক্ষে মৌলিক কিছু লেখার ইচ্ছাটা ছিল। সেই প্রথম তিনি আমাকে অলংকারশাস্ত্রের কথা বললেন। কবিতার বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ও ছন্দের ব্যাপারে আমাকে কিছু সহজ পন্থা শিখিয়ে দিয়ে শেষে বললেন যেভাবেই হোক না কেন আমার লেখা চালিয়ে যাওয়া উচিত, সে যদি শুধু মনের খোরাকের জন্য হয়, তাহলেও। সেদিন ছিল তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ কথাবার্তার প্রথম দিন। লিসেয়োতে থাকা কালীন টিফিনের সময় বা অন্য ফাঁকা সময়ে বহুবার বহু কথা বলেছেন আমায়। আমার লেখক জীবনের জন্য সেই কথাগুলোর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

এখানকার আবহাওয়াটা ছিল আমার পক্ষে চমৎকার। সান হোসে স্কুল থেকে যে কোনও বই হাতে এলেই তা পড়ে নেওয়ার এমন বদ অভ্যাস আমার তৈরি হয়েছিল যে সমস্ত ফাঁকা সময় আর স্কুলের সব ক্লাস বই পড়েই কেটে যেত। আমার ষোল বছর বয়সে, ঠিক বা ভুল যে বানানই লিখি না কেন, সান হোসে স্কুলে যা যা কবিতা পড়েছিলাম সব এক নিঃশ্বাসে মুখস্থ বলতে পারতাম। সেগুলো একবার পড়তাম, আবার পড়তাম, কারুর সাহায্য নিয়ে নয়, ধারাবাহিকভাবেও নয়, কিন্তু ক্লাস চলাকালীন প্রায় সবসময় লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। মনে হয় লিসেয়োর সেই বিশৃঙ্খল গ্রন্থাগারের সব বই পড়ে ফেলেছিলাম। এটি তৈরি হয়েছিল অন্যান্য গ্রন্থাগারের অব্যবহার্য ফেলে দেওয়া বইয়ের স্তুপেঃ কিছু স্কুলের সংগ্রহ, পাঠে অনিচ্ছুক শিক্ষকদের দান থেকে কিছু এবং জাহাজডুবির পর তীরে ভেসে আসা বর্জের মতো কিছু এলোমেলো বই। আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না মিনের্বা প্রকাশনীর আলদেয়ানা গ্রন্থাগারের কথা। তার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মাননীয় দোন সামপের ওর্তেগা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্কুলে বইগুলো বিতরণ করা হত। তখনও পর্যন্ত কলোম্বিয়ায় যত ভালো ও যত খারাপ যা কিছু লেখা হয়েছে সব বইয়ের সংকলন তৈরি হয়েছিল মোট একশো খন্ডে। আমি সেগুলো পড়তে শুরু করলাম, নম্বর ধরে ধরে, একটার পর একটা, যতক্ষণ পর্যন্ত না আত্মা বিরাম চায়। আজও আমার ভেবে ভয় লাগে যে ওই স্কুলের অন্তিম দু’ বছরে এই সংকলন প্রায় শেষ করে এনেছিলাম। কিন্তু বাকি সারা জীবন ধরেও বুঝে উঠতে পারলাম না যে সেই পরিশ্রম আমার কোন কাজে লাগল।

হস্টেলে যারা ভোরে উঠত তাদের সঙ্গে খুশির একটা সন্দেহজনক মিল খুঁজে পাওয়া যেত। তবে ছ’টার প্রাণনাশক অ্যালার্মটি বাদে। আমরা অবশ্য তাকে বলতাম মাঝরাতের ছ’টা। শুধু দু’-তিনজন দুর্বল মস্তিষ্কের ছেলে ঘন্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে চলে যেত হিমবাহের জলে স্নান করতে। ছ’টি স্নান করার জায়গার প্রথম লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে। বাকি আমরা চেষ্টা করতাম ঘুমের শেষ ছিটে-ফোঁটাকে আঁকড়ে ধরতে যতক্ষণ না সেদিন যে মাস্টারমশাইয়ের পালা তিনি হলঘরের এক পাশ থেকে আরেক পাশে চলে যেতেন ঘুমন্তদের গায়ের কম্বল টেনে নিয়ে। এবার দেড় ঘন্টার জন্য মুক্ত ঘনিষ্ঠতার সময় – জামা-কাপড় ঠিক করে রাখা, জুতো পালিশ করা, শাওয়ার বিহীন পাইপের থেকে তরল বরফ ধরে স্নান করা, স্নান করতে করতে নিজেদের যত হতাশা আছে সব চিৎকার করে উগড়ে দেওয়া ও যারা বাইরে আছে তাদের পেছনে লাগা, গোপন প্রেমের কথা বলে দেওয়া, চুক্তি ও বিবাদ দুই-ই প্রকাশ করা আর খাবার টেবিলে কার কী বিনিময় হবে তার কথা বলে নেওয়া। তবে সকালে যে বিষয়টা সবসময় আলোচিত হত তা হল আগের রাতে যা পড়া হয়েছে তাই নিয়ে।

 

 

টীকা

১। সোগামোসো – কলোম্বিয়ার বোইয়াকা রাজ্যের একটি শহর।

২। লেও মারিনি – আর্হেন্তিনার সুবিখ্যাত বোলেরো গায়ক। জন্ম ২৩ আগস্ট, ১৯২০ এবং মৃত্যু ১৫ অক্টোবর, ২০০০।

৩। উগো রোমানি – আর্হেন্তিনার আরেক সুবিখ্যাত বোলেরো গায়ক। জন্ম ২৩ ডিসেম্বর, ১৯১৯ এবং মৃত্যু ১৬ অক্টোবর, ২০১৬।

৪। লিন ইউতাং – চিনের বিখ্যাত লেখক ও ভাষাবিদ। চিনা এবং ইংরাজি উভয় ভাষাতেই তাঁর সমান দক্ষতা ছিল এবং আধুনিক চিনা সাহিত্যে হাস্যরসাত্মক গদ্যশৈলীর পথিকৃৎ।

৫। সান হুয়ান দে লা ক্রুশ – স্পেনের ষোড়শ শতাব্দীর ক্যাথলিক ধর্মযাজক ও লেখক।

৬। হোসে মারিয়া বার্গাস বিলা – বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কলোম্বিয়ার লেখক ও সাংবাদিক। নিজস্ব মুক্তচিন্তা, ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের সমালোচনা ও উত্তর আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের প্রতিবাদ করার জন্য তাঁর লেখা খুবই বিতর্কিত ছিল।

৭। প৭রিবারের উৎস, ব্যক্তিগত সম্পদ ও রাষ্ট্র – ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের ১৮৮৪ সালের একটি নৃতাত্ত্বিক গ্রন্থ।

৮। ডুরিংয়ের বিপক্ষে – ‘অ্যান্টি ডুরিং’ ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস রচিত বই, যেটি ১৮৭৮ সালে জার্মানিতে প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি প্রকাশের আগে সাময়িকপত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। এঙ্গেলসের জীবৎকালেই এই বইয়ের আরো দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের তিনটি পরিচ্ছেদ দর্শন, অর্থনীতি ও সমাজতন্ত্র-তে পূর্ণাকারে প্রকাশ পায় মার্কসবাদের মতাদর্শগত ঐশ্বর্য।