জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩৫
- 07 July, 2026
- লেখক: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল
(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)
মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
পর্ব – ৩৫
বোগোতা তখন এক দূরবর্তী বিষন্ন শহর। সেখানে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম থেকে একটানা বিনিদ্র ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। খেয়াল করলাম রাস্তায় যেন প্রচুর ব্যস্ত ভদ্রলোক রয়েছেন। তাঁদের পোশাক ঠিক আমি যে পোশাক পরে এসেছি তার মতোন, কালো উলের কোট আর মাথায় শক্ত টুপি। বিপরীতে একজনও সান্ত্বনাদাত্রী ভদ্রমহিলাকে রাস্তায় দেখলাম না। বাজারের অন্ধকারাচ্ছন্ন কাফেগুলোতে তাঁদের প্রবেশ নিষেধ, ঠিক যেমন নিষিদ্ধ আলখাল্লা পরিহিত পুরোহিত ও ইউনিফর্ম পরিহিত মিলিটারির প্রবেশ। বিভিন্ন গাড়িতে ও সাধারণের জন্য শৌচালয়ে লেখা রয়েছে একটি দুঃখের বাক্য: ‘ভগবানকে ভয় না পেলেও সিফিলিসকে ভয় পাও।’
আমার খুব ভালো লাগল ঘোড়ায় টানা বিয়ারের ওয়াগন, মোড় ঘোরার সময় গাড়িগুলোর বিশেষ শব্দ ও আলোর স্ফুলিঙ্গ আর বৃষ্টির মধ্যে পদাতিক শববাহীদের জায়গা করে দিতে সব গাড়ির থেমে যাওয়া। এই শববাহীরাই সবচেয়ে বেশি বিষাদগ্রস্ত। তাদের সঙ্গে ছিল সব বহুমূল্য ঘোড়ার গাড়ি। ঘোড়াগুলো ভেলভেটের কাপড়ে সাজানো আর তাদের মাথার শিরস্ত্রাণে কালো রঙের পালক। মৃতদের পরিবারেরা ধনী বংশজাত, তাই তারা এমন ভাব করছে যেন তারাই মৃত্যুর আবিষ্কারক। নিয়েবেস গীর্জার প্রবেশ পথে প্রথম একজন মেয়েকে দেখলাম ট্যাক্সির ভেতর থেকে। রোগা মতোন, গম্ভীর সেই মহিলাকে মনে হচ্ছিল যেন শোকগ্রস্ত কোনও রাণী। কিন্তু আমি চিরকালের জন্য অর্ধেক বিভ্রমে থেকে গেলাম কেননা তার মুখ ঢাকা ছিল অভেদ্য ওড়নায়।
তখন আমার মনটা অবষন্ন হয়ে গিয়েছিল। রাত্রে যে বাড়িতে থাকলাম সেটা খুব বড় এবং আরামদায়ক। কিন্তু তাদের ঘন রঙের গোলাপের ছায়াচ্ছন্ন বাগানের জন্য ভৌতিক বাড়ি বলে মনে হচ্ছিল। তার সঙ্গে প্রবল ঠান্ডা হাড়ের ভিতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তোররেস গাম্বোয়া পরিবার আমার বাবার আত্মীয় এবং আমারও পরিচিত। কিন্তু ঘুমানোর কম্বল গায়ে জড়িয়ে যখন রাতের খাবার খেতে বসলেন তখন তাদের কেমন অদ্ভুত মনে হচ্ছিল। তবে চাদরের নিচে যেই বিছানায় শুয়েছি আমি ভীষণ চমকে গিয়ে ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। আমি ভেবেছিলাম বিছানাটা বুঝি বরফ জলে ভিজে। তাঁরা আমায় বোঝালেন যে প্রথম প্রথম এরকম মনে হবে। তারপর ধীরে ধীরে নতুন আবহাওয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাব। অনেকক্ষণ ধরে কাঁদলাম। তারপর ঘুমোলাম। কিন্তু সে এক অসুখী ঘুম।
চার দিন পর এই মনের অবস্থা নিয়ে ঠান্ডা আর বৃষ্টির মধ্যে প্রচন্ড জোরে হেঁটে পৌঁছলাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। সেখানে জাতীয় স্কলারশিপ প্রতিযোগিতায় নাম লেখানো আরম্ভ হয়েছে। তার জন্য লাইন শুরু হয়েছে দপ্তরের তৃতীয় তলায় দরখাস্ত নেওয়ার ঘরের দরজার সামনে থেকে আর সেই লাইন সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে ঢোকার দরজা পর্যন্ত। পুরো ব্যাপারটা ছিল ভীষণভাবে হৃদয়হীন। বেলা দশটা নাগাদ যখন আকাশ পরিষ্কার হল ততক্ষণে লাইন বেড়ে গেছে আরও কয়েকশো মিটার দূরে হিমেনেস দে কেসাদা এভিনিউ পর্যন্ত। এছাড়াও হলঘরে আরও অনেক প্রতিযোগী রয়েছে। এই রকম একটা প্রতিযোগিতায় আমার মনে হল না যে আমি কিছু অর্জন করতে পারব।
দুপুরের একটু পরে কাঁধের উপর কেউ যেন টোকা দিলেন। তিনি জাহাজের সেই অতৃপ্ত পাঠক। লাইনের শেষের দিকে দাঁড়ানো আমায় তিনি চিনতে পেরেছেন। কিন্তু মাশরুম আকৃতির টুপি ও কাচাকোদের শবযাত্রার পোশাক পরিহিত তাঁকে চিনতে আমার বেশ বেগ পেতে হল। তিনিও কিছুটা হতবুদ্ধ হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
- ‘এখানে তুমি কী করছ?’
তাঁকে সবটা বললাম।
- ‘কী মজার ব্যাপার!’ প্রচন্ড হাসতে হাসতে তিনি বললেন, ‘আমার সঙ্গে এসো।’
এই বলে তিনি আমার হাত ধরে মন্ত্রনালয়ের দিকে নিয়ে গেলেন। তখন জানতে পারলাম যে তিনি হচ্ছেন আদোলফো গোমেস তামারা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কলারশিপের অধিকর্তা।
এ এক আশ্চর্য সমাপতন। আমার জীবনের আশ্চর্য সৌভাগ্যও বটে। ছাত্রসুলভ একটা মজার কথা বলে তিনি তাঁর সহায়কদের সঙ্গে আমার পরিচয় করালেন রোমান্টিক বোলেরোর প্রতিভাবান গায়ক হিসাবে। তাঁরা আমাকে কফি খাওয়ালেন ও নিয়ম-কানুনের বেশি ঝামেলা না করেই আমার নাম নথিভুক্ত করলেন। তার সঙ্গে এও বললেন যে তাঁরা কোনও নিয়মভঙ্গ করছেন না, সমাপতনের রহস্যময় দেবতার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা অপর্ণ করছেন মাত্র। তারপর আমাকে জানালেন যে সান বার্তোলোমে স্কুলে পরের সোমবার সকলের পরীক্ষা নেওয়া হবে। হিসাব করে বললেন যে সাড়ে তিনশো স্কলারশিপের জন্য প্রায় এক হাজার দরখাস্ত জমা পড়েছে। সুতরাং লড়াইটা বেশ দীর্ঘ ও কঠিন। এবং আমার স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ঠ। যাদের ভেতরে যোগাযোগ আছে তারা এক সপ্তাহ বাদেই ফলাফল জেনে যাবে। এমনকি কোন স্কুলে হবে সেটাও জানা হয়ে যাবে। এটা আমার কাছে একেবারেই নতুন তথ্য এবং গুরুতর সন্দেহ নেই। কেননা এই স্কলারশিপ আমাকে পাঠিয়ে দিতে পারে মেদেজিন কি বিচাদা যেখানে খুশি। আমাকে বুঝিয়ে বললেন যে এই ভৌগলিক লটারির ব্যবস্থা করা হয়েছে দূরবর্তী স্থান পর্যন্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলন বিস্তৃত করে দেওয়ার জন্য। যখন সমস্ত কাজ শেষ হল গোমেস তামারা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, বোলেরো শোনার পরে যে সোৎসাহে হাত বাড়িয়েছিলেন, তেমনই।
- ‘চালাক-চতুর হয়ে যাও,’ আমাকে বললেন, ‘তোমার জীবন এখন তোমার নিজের হাতে।’
মন্ত্রণালয় থেকে বেরোতেই যাজকের মতো দেখতে একটা বেঁটে লোক আমাকে বললেন যে তিনি নিশ্চিতভাবে স্কলারশিপ পাইয়ে দেবেন, পরীক্ষাও দিতে হবে না, এমনকি আমি যে স্কুলে চাইব সেখানেই পাব, শুধু পঞ্চাশ পেসোর বিনিময়ে। পঞ্চাশ পেসো আমার কাছে বিরাট অঙ্কের টাকা। তবে মনে হয় আমার সে সামর্থ্য থাকলে শুধু পরীক্ষার ভীতি এড়ানোর জন্য আমি ওনাকে তা দিয়ে দিতাম। কয়েক দিন পরে আমি খবরের কাগজে এই লোকটার ছবি দেখলাম। একটা প্রতারক দলের মাথা, যারা যাজকদের মতো পোশাক পরে বিভিন্ন অফিসে অবৈধ কাজ করে বেড়ায়।
যতক্ষণ না নিশ্চিত করে জানতে পেরেছি স্কলারশিপ আমায় কোথায় পাঠাচ্ছে ততক্ষণ অবধি ট্রাঙ্কের জিনিষপত্র সব বের করিনি। আমি এমনই হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম যে পরীক্ষার আগের দিন জাহাজের সেই গানের দলের সঙ্গে অমার্জিত ক্রুসেস অঞ্চলের এক অন্ধকার পানশালায় চলে গিয়েছিলাম। পানীয়ের বিনিময়ে আমরা গান গাইছিলাম। একটা গান, এক গ্লাস চিচা। ভুট্টা পচিয়ে এই মারাত্মক কড়া মদ তৈরি হয়, যা বেহেড মাতালরাও ‘গান পাউডার’ মিশিয়ে তবে খায়। ফলত পরীক্ষায় দেরিতে পৌঁছলাম। মাথা ধরে আছে তখনও। এটা পর্যন্ত মনে করতে পারছি না আগের দিন কোথায় ছিলাম আর কেই বা আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। একটা বড় হলঘর ছাত্র-ছাত্রীতে পূর্ণ। সেখানে আমায় সস্নেহে ভেতরে যেতে বলল। প্রশ্নপত্র এক ঝলক দেখেই বুঝতে পারলাম যে শুরু করার আগেই আমি হেরে বসে আছি। পরীক্ষার গার্ডদের দৃষ্টি থেকে বাঁচতে সমাজ বিদ্যার অংশটায় হাত দিলাম। সেই প্রশ্নগুলো মনে হল অপেক্ষাকৃত কম নিষ্ঠুর। অকস্মাৎ আমার উপর যেন প্রেরণা ভর করল আর কিছু প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর লিখতে পারলাম। এমনকি অনুমানের ক্ষেত্রেও আমার ভাগ্য সহায় হল। শুধু অঙ্কটায় কিছু করতে পারলাম না। সেক্ষেত্রে ভগবানও আমায় সাহায্য করতে অসমর্থ হলেন। কিন্তু আঁকার পরীক্ষাটা তাড়াহুড়োয় করলেও বেশ ভালো হল আর আমি খানিক স্বস্তি পেলাম। যাই হোক, শেষ করলাম আত্মসমর্পণের ভঙ্গীতে আর তারপর ঠিক করলাম বাবা-মাকে একটা চিঠি লিখব, আমার বাড়ি না ফেরার যুক্তি ও অধিকার বিশ্লেষণ করে।
আপন কর্তব্য অনুযায়ী পরের সপ্তাহে ফলাফল জানতে গেলাম। সেখানকার কর্মচারিটি সম্ভবত আমার কাগজপত্রে কোনও একটা কিছু দেখতে পেলেন। তাই আমাকে সোজা নিয়ে গেলেন অধিকর্তার ঘরে। তাঁর মন-মেজাজ বেশ ভালো বলেই মনে হল। হাফ-হাতা শার্ট ও লাল রঙের হাল-ফ্যাশনের গ্যালিস পরে আছেন। পেশাদারিত্বের সঙ্গে আমার পরীক্ষার ব্যাপারে যা লেখা আছে পড়লেন, দু’-এক বার দ্বিধা করলেন, সবশেষে গভীর শ্বাস নিলেন।
- ‘খুব খারাপ নয়,’ নিজেই নিজেকে বললেন, ‘অঙ্কটা বাদ দিলে, আঁকাটায় পাঁচ পাওয়ার জন্য একেবারে কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেছ।’
স্প্রিং দেওয়া চেয়ারে পিঠ হেলিয়ে দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন কোন কলেজের কথা ভেবেছি আমি।
তখন আমি আমার জীবনের অন্যতম ঐতিহাসিক ধাক্কা সামলাচ্ছি, তবে দ্বিধা না করেই বললাম:
- ‘সান বার্তালোমে, এখানে, বোগোতায়।’
তাঁর টেবিলের উপর স্তুপীকৃত হয়ে থাকা কাগজের উপরে হাত রাখলেন।
- ‘এই সব হচ্ছে প্রভাবশালীদের সুপারিশপত্র, ছেলে-মেয়ে, আত্মীয় বা বন্ধুদের জন্য লিখেছেন এখানকার কলেজে পাওয়ার জন্য,’ তিনি বললেন। পরমুহূর্তেই বুঝতে পারলেন যে এসব কথা অবান্তর, তাই বললেন, ‘যদি আমার মতামত শোনো তো বলব সিপাকিরার লিসেও নাশিয়োনালে পড়ো, এখান থেকে ট্রেনে এক ঘন্টার পথ।’
সেই শহর সম্বন্ধে একটা কথাই জানতাম যে সেখানে নুনের খনি আছে। গোমেস তামারা আমাকে বললেন যে লিসেও নাশিয়োনাল ঔপনিবেশিক আমলের একটা স্কুল। আগে খুবই ধর্মীয় প্রাধান্য ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক উদারবাদী সংস্কার ধর্ম থেকে স্কুলকে বের করে এনেছে এবং এখন বেশ কিছু আধুনিক মনোভাবাপন্ন শিক্ষক আছেন। মনে মনে ভাবলাম ব্যাপারটা খুলে বলাই ভালো।
- ‘আমার বাবা একজন গথ১,’ তাঁকে সাবধান করে দিলাম।
তিনি খুব হাসলেন, বললেন:
- ‘অত গুরুত্ব দিয়ে নেওয়ার কিছু নেই। উদারপন্থি বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছি চিন্তাভাবনায় তাঁরা উদার।’
পরমুহূর্তে তিনি নিজস্ব সত্তায় ফিরে গেলেন এবং এক ঘুমন্ত জনপদে সপ্তদশ শতকের সুপ্রাচীন কনভেন্ট যা এখন অবিশ্বাসীদের স্কুলে পরিণত হয়েছে যেখানে পড়াশুনো ছাড়া মনোবিক্ষেপের আর কোনও স্থান নেই সেখানেই আমার ভাগ্য নির্ধারণ করলেন। সেই বৃদ্ধ কনভেন্ট বাস্তবিক অনন্তের সম্মুখে যেন অবিচলিত। তার প্রথম জীবনে পাথরের পোর্টিকোতে খোদাই করা ছিল: ঈশ্বরের প্রতি ভয় হল জ্ঞানের সূচনা। কিন্তু ১৯৩৬ সালে প্রেসিডেন্ট আলফোন্সো লোপেস পুমারেহোর উদারপন্থী সরকার যখন শিক্ষার জাতীয়করণ করলেন এই খোদাইয়ের পরিবর্তে দেখা দিল কলোম্বিয়ার জাতীয় প্রতীক। ট্রাঙ্কের প্রচন্ড ভারে বিদ্ধস্ত অবস্থা থেকে স্বাভাবিক হলাম স্কুলের প্রবেশ পথের সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু জীবন্ত পাথর কেটে তৈরি ঔপনিবেশিক তোরণ দেওয়া ছোট্ট চত্বর, সবুজ রঙ করা কাঠের বারান্দা ও রেলিংয়ের টবে বিষন্ন ফুলেদের দেখে আমি একটু হতাশ হলাম। সমস্ত কিছু মনে হল স্বীকারোক্তির পবিত্র শৃঙ্খলায় বিন্যস্ত এবং প্রতিটি জিনিষে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে তিনশত বছরের বেশি সময় ধরে কোথাও কোনও নারীর হাতের প্রশ্রয় নেই। ক্যারিবীয়ার নিয়ম-বিহীন পরিবেশে বড় হয়ে বয়ঃসন্ধির চারটি গুরুত্বপূর্ণ বছর এখানে আটকে পড়ে থাকতে হবে ভেবে আমাকে ভয় ঘিরে ধরল।
স্কুলের স্বল্পায়তনের চবুতরকে ঘিরে দোতলা বাড়ি আর পেছনের দিকের এক টুকরো জমির উপর একটা অপরিকল্পিত কংক্রিটের বাড়িতে ছিল রেক্টরের আবাস ও অফিস, প্রশাসনিক কক্ষ, রান্নাঘর, খাবার ঘর, গ্রন্থাগার, ছটি ক্লাসরুম, পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের পরীক্ষাগার, শৌচালয় এবং পঞ্চাশ জন ছাত্রের জন্য সার দিয়ে রাখা লোহার খাট দেওয়া শোবার ঘর। ওইটুকু জায়গায় এত কিছু যে ছিল তা আজও আমার অসম্ভব বলে মনে হয়। হস্টেলের ছাত্ররা আসত হতাশাগ্রস্ত শহরতলী থেকে, রাজধানী থেকে নয়। সৌভাগ্যক্রমে পরবাসে থাকাটা আমার জীবনে আশীর্বাদের মতো হয়েছিল। তার জন্যই বিশ্বের লটারিতে যে দেশকে আমি জিতেছি সেই নিজের দেশকে দ্রুত ও ভালোভাবে বুঝে নিতে পারলাম। ক্যারিবীয়া থেকে আসা গন্ডা তিনেক ছাত্র আমাকে আপন করে নিল এবং আমিও। এভাবেই একটা দ্বিধাবিভাজন হয়ে গেল আমরা আর ওরা: দেশের লোক আর বহিরাগত।
প্রথম দিনই সান্ধ্যকালীন অবকাশে চবুতরের বিভিন্ন কোন ভিন্ন ভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। তারা দেশের সব উজ্জ্বল নমুনা। প্রত্যেকে যে যার নিজের গন্ডিতে থাকলে এই সব দলের মধ্যে কোনও ঝামেলা হত না। সূচনা থেকেই আমার কাছের লোক হয়ে উঠেছিল ক্যারিবীয়ার উপকূলের ছাত্ররা যাদের খ্যাতি ছিল প্রচন্ড গন্ডগোল করা, নিজের দলের জন্য জান দিয়ে দেওয়া আর নাচের বন্য উন্মাদনার জন্য। নাচের ক্ষেত্রে আমি অবশ্য ব্যতিক্রম ছিলাম, কিন্তু রুম্বা২ নাচিয়ে আন্তোনিয়ো মার্তিনেস সিয়েররা রাতের অবকাশে জনপ্রিয় গানের সঙ্গে আমাকে নাচতে শিখিয়ে দিল। রিকার্দো গোন্সালেস রিপোল, আমার সব গোপন পূর্বরাগের সাকরেদ, পরে বিখ্যাত স্থপতি হয়েছিল। সে গুনগুন করে গান গাইত, প্রায় শোনাই যেত না, কিন্তু সে থামত না আর তার দিন শেষ হওয়া পর্যন্ত সে একটানা নেচে যেত।
মিঞ্চো আনাইয়া, প্রতিভাবান পিয়ানোবাদক, পরবর্তীকালে নাচের একটি জাতীয় অর্কেস্ট্রার প্রধান হয়েছিল। সে স্কুলে গানের দল তৈরি করেছিল আর কেউ একটা বাদ্যযন্ত্র শিখতে চাইলেই তাকে দলে নিয়ে নিত। সেই আমাকে শিখিয়েছিল বোলেরো আর বাইয়েনাতোর দ্বিতীয় স্বরের রহস্য। যাই হোক, তার সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ ছিল আদ্যন্ত বোগোতানিবাসী গিয়েরমো লোপেস গেররাকে ক্যারিবীয় তিন-দুই তিন-দুই কায়দায় ক্লাবে৩ বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখানো।
এল বাঙ্কোর৪ উম্বের্তো হাইমে মারাত্মক অধ্যয়নশীল ছিল। নাচের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। এমনকি সপ্তাহ শেষেও সে বই নিয়ে বসে থাকত। মনে হয় পড়াশোনার সময় সে কখনও ফুটবল চোখে দেখেনি বা কোনও ধরণের খেলার খবরও পড়েনি। সে বোগোতা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ‘এল তিয়েম্পো’ কাগজে খেলার বিভাগে নবিশ হয়ে ঢুকে সেই দপ্তরেরই অধিকর্তা হয়ে একজন দক্ষ ফুটবল-সাংবাদিক হয়েছিল। তবে সবথেকে অদ্ভুত ছিল সিলবিয়ো লুনা, চোকো৫ থেকে আগত শ্যামলা ছেলেটি প্রথমে ল পাশ করে তারপর ডাক্তারি পাশ করে যখন তৃতীয় একটি বিষয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন তার সঙ্গে যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যায়।
দানিয়েল রোসো – পাগোশিও – এমন পন্ডিতি ভাব দেখাত যেন মানবিক ও স্বর্গীয় বিজ্ঞানের সবকিছু জানে আর ক্লাসে বা বিরতির সময়েও সে তার প্রতিভা জাহির করত। বিশ্বযুদ্ধের খবর পাওয়ার জন্য তার কাছেই যেতাম। আমাদের কাছে শুধু কিছু গুজবই আসত কেননা স্কুলে খবরের কাগজ বা পত্র-পত্রিকা ঢুকত না আর রেডিয়োটা ব্যবহার করতাম নাচের সময়। পাগোশিও কোথা থেকে যে তার ঐতিহাসিক যুদ্ধের খবরগুলো জানতে পারত তা আমরা আবিষ্কার করতে পারিনি, তবে তার খবরে সবসময় মিত্রপক্ষ জয়লাভ করত।
কেতামে৬ থেকে আগত সেরহিয়ো কাস্ত্রো সম্ভবত লেসিয়ো স্কুলের সর্বকালের সেরা ছাত্র। যবে থেকে স্কুলে ঢুকেছে সব পরীক্ষায় সে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেত। তার কারণ মনে হয় মার্তিনা ফোনসেস্কা সান হোসে স্কুলে আমাকে যে কাজ করতে বলেছিল সেটা সে করত। মাস্টারমশাইদের এবং ছাত্রদেরও সমস্ত কথা মন দিয়ে শুনত, সেগুলো লিখে রাখত মায় শিক্ষকদের নিশ্বাসটুকু পর্যন্ত এবং পরে তা একটা সুন্দর খাতায় ভালো করে লিখত। এই কারনেই বোধহয় পরীক্ষার সময় তাকে আর অধিক সময় ব্যয় করতে হত না। সপ্তাহ শেষে সে রহস্য গল্প পড়ত আর তখন আমরা পড়ার ভারে বিদ্ধস্ত হয়ে যেতাম।
বিরতির সময়ে আমার সবচেয়ে একনিষ্ঠ বন্ধু ছিল আরেক নিখুঁত বোগোতার ছেলে আলবারো রুইস তোররেস। রাতের বিরতির সময়ে যখন আমরা চবুতরকে ঘিরে মার্চিং করতাম সে আমাকে তার প্রেমিকাদের গল্প করত। অন্যান্য ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা হল হাইমে ব্রাভো, উম্বের্তো গিয়েন আর আলবারো বিদালেস বারোন। স্কুল-জীবনের পরেও দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হত। প্রতি সপ্তাহান্তে আলবারো রুইস বোগোতায় পরিবারের কাছে যেত আর ফিরে আসত অনেক সিগারেট ও প্রেমিকাদের গল্পসহ। এই দুটি বিষয়ে স্কুল জীবনে সে-ই আমায় সবথেকে বেশি উৎসাহ দিত আর সম্প্রতি দু’ বছর ধরে সে-ই আমাকে তার স্মৃতি ধার দিয়েছে যাতে এই স্মৃতিকথাকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারি।
টীকা
১। গথ – রোমান সাম্রাজ্য আক্রমণকারী জার্মানির একটি জাতি। রোমানদের পশ্চিম অঞ্চলের পতন ও ইউরোপে মধ্যযুগের সূচনায় এদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাসী এবং রক্ষণশীলদের কথা বোঝানো হয়েছে।
২। রুম্বা – উনিশ শতকের শেষের দিকে কুবায়, বিশেষত কুবার উত্তরাঞ্চলে আফ্রিকার ক্রীতদাসদের মধ্যে জন্ম নেয় এই রোমান্টিক রুম্বা নাচ।
৩। ক্লাবে – বা ক্লেভ পার্কাসন জাতীয় একটি বাদ্যযন্ত্র যা দুটি বেলনাকৃতির কাঠের লাঠি দিয়ে তৈরি।
৪। এল বাঙ্কো – কলোম্বিয়ার মাগদালেনা রাজ্যের একটি শহর।
৫। চোকো – কলোম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি বিভাগ যেখানে সবচেয়ে বেশি আফ্রো-কলোম্বিয়ান জনবসতি রয়েছে।
৬। কেতামে – কলোম্বিয়ার কুন্দিনামার্কা রাজ্যের একটি শহর।