জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩৩

জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল

(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)

মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

পর্ব - ৩৩

সুক্রেতে ছুটি কাটানো আমার পক্ষে বেশ কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। মার্তিনা ফোন্সেসকার অনুপস্থিতিই তার কারণ। কিন্তু তার পক্ষেও আমার সঙ্গে এখানে আসার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। দু’ মাস তার সঙ্গে দেখা হবে না—এই ভাবনাটাই আমার কাছে অবাস্তব বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু মার্তিনার মধ্যে সেরকম কিছু ছিল না। বরং প্রসঙ্গটা উত্থাপন করতেই বুঝতে পারলাম অন্য সব বিষয়ের মতো এ ব্যাপারেও সে আমার থেকে তিন পা এগিয়ে।

  • ‘এই ব্যাপারটা নিয়ে আমিও কথা বলতে চাইছিলাম,’ কোনও রহস্য না করেই সে আমাকে বলল, ‘যদি তুমি অন্য কোথাও পড়তে যাও তা আমাদের দুজনের পক্ষেই ভালো হবে, কেননা এখন আমরা পাগলের মতো জড়িয়ে আছি। অন্য জায়গায় গেলে তবেই তুমি বুঝতে পারবে যে আমরা যেমন ছিলাম তার চাইতে বেশি আর কখনও থাকতে পারব না।’

ভাবলাম মজা করছে।

  • ‘আমি কালকেই চলে যাচ্ছি আর তিন মাস পরে ফিরে এসে তোমার সঙ্গে থাকব।’

সে তাঙ্গো সঙ্গীতের মতো করে আমায় উত্তর দিল:

  • ‘হা হা হা হা!’

তারপর বুঝতে পারলাম যে মার্তিনা যখন ‘হ্যাঁ’ বলে তখন তাকে বোঝানো সহজ, কিন্তু ‘না’ বললে তাকে কিছুতেই বোঝানো যাবে না। সুতরাং হাত মুঠো করলাম, চোখের জলে ভেসে গেলাম এবং নিজেকে নিজে বললাম, আমার ভবিষ্যত নিয়ে মার্তিনা যা ভেবেছিল তার থেকে এক পৃথক জীবন তৈরি করব: অন্য শহর, অন্য স্কুল, অন্য বন্ধু-বান্ধব আর অন্যরকম হয়ে ওঠা। এসব ভাবলাম মাত্র। আমার মেডেলের সৌজন্যে প্রথমেই বাবাকে বেশ গম্ভীরভাবে বললাম যে আর সান হোসে স্কুলে যাব না, বাররানকিয়াতেও নয়।

  • ‘ভগবান রক্ষা করুক,’ তিনি বললেন, ‘সব সময় আমার মনে হয়েছে জেসুইটদের সঙ্গে পড়ার রোমান্টিসিজম কোথা থেকে পাও।’

মা অবশ্য তাঁর মন্তব্যকে পাত্তা দিলেন না। তিনি বললেন:

  • ‘যদি ওখানে না যাও তাহলে বোগোতায় যেতে হবে।’
  • ‘তাহলে কোথাও গিয়ে কাজ নেই,’ বাবা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘কেননা কাচাকোদের সঙ্গে এঁটে ওঠার টাকা আমাদের নেই।’

যদিও বিরল ব্যাপার, তবুও পড়াশোনার পাততাড়ি গোটানো—যা আমার সারাজীবনের স্বপ্ন—মনে হল যেন একেবারেই অচিন্তনীয়। এমনকি এমন একটা স্বপ্নের কথা মনে হল যা একেবারে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

  • ‘অনেক স্কলারশিপ আছে,’ আমি বললাম।
  • ‘প্রচুর আছে,’ বললেন বাবা, ‘কিন্তু বড়লোকদের জন্য।’

এটা এক দিক দিয়ে সত্যি, তবে পক্ষপাতিত্বের জন্য নয়, দরখাস্ত করার পদ্ধতিটাই খুব জটিল আর নিয়মগুলো লোকে ভালো করে জানতে পারে না। রাষ্ট্রব্যবস্থায় কেন্দ্রীকরণের জন্য যারা স্কলারশিপ পেতে চায় তাদের বোগোতায় যেতে হবে। হাজার কিলোমিটার দূরের বোগোতায় শুধু যেতেই লাগবে আট দিন আর যাত্রাপথে যা টাকা লাগবে তা ছাত্রাবাস সহ ভালো কলেজের তিন মাসের খরচের সমান। এমনকি যাওয়ার পরও কিছুই না হতে পারে। মা উত্তেজিত হয়ে বললেন:

  • ‘টাকার কলের ঢাকনা যখন কেউ খোলে, সে জানে কোথা থেকে শুরু হবে, কিন্তু কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা সে বুঝতে পারেনা।’

তাছাড়া সংসারে অন্যান্য দায়-দায়িত্বও তো রয়েছে। আমার থেকে এক বছরের ছোট এনরিকে স্থানীয় দুটো স্কুলে ম্যাট্রিকের পড়া পড়েছে, কিন্তু দুটো জায়গাতেই পড়া শেষ করেনি। মার্গারিতা আর আইদা সন্ন্যাসিনীদের প্রাথমিক স্কুলে ভালোই পড়াশুনো করছে, কিন্তু তাদের সেকেন্ডারি পড়ানোর জন্য কাছের শহরে অপেক্ষাকৃত কম খরচের স্কুলের কথা ভাবা হচ্ছে। গুস্তাবো, লিহিয়া, রিতা আর হাইমের জন্য তখনও তাড়াহুড়োর কিছু নেই, কিন্তু শীঘ্রই তারা বড় হয়ে উঠবে। তারা এবং পরবর্তী তিনজন যারা ভবিষ্যতে জন্মাবে তারা সকলেই আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে যেন সবসময়ই আমি এসেছি শুধু চলে যাওয়ার জন্য।

সেটা ছিল আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বছর। প্রতিটা ট্যাবলোর প্রধান আকর্ষণ ছিল সৌন্দর্য ও লাবণ্যের আধারে বেছে নেওয়া মেয়েরা। তারা সব রানির মতো পোশাক পরেছে আর দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া শহরের প্রতীকি যুদ্ধকে উদ্দিষ্ট করে কবিতা আবৃত্তি করছে। তখনও পর্যন্ত আমি ছিলাম বহিরাগত, তাই নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে সব কিছু উপভোগ করতাম আর ব্যবহারও করতাম সেরকম। কিন্তু সেই বছরে কোঙ্গোবেয়ো দলের মাথাদের অনুরোধে আমার বোন কার্মেন রোসা, যে একটা বিরাট ট্যাবলোর রানি হতে চলেছে, তার জন্য কবিতা লিখে দিতে রাজি হলাম। আনন্দের সঙ্গেই কাজটা করেছি, কিন্তু খেলার নিয়ম-নীতি না জানায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটু বেশিই রূঢ় কথা লিখে ফেলেছিলাম, ফলে সেটা সংশোধনের জন্য দুটি শান্তিস্থাপনের কবিতা লেখা ছাড়া আর দ্বিতীয় পথ রইল না: একটি হল কোঙ্গোবেয়োর সুন্দরীর উদ্দেশে—সান্ত্বনাদায়ক কবিতা, আর অন্যটি ছিল পুনর্মিলনের, সুলিয়ার সুন্দরীর প্রতি। কিন্তু সবাই ব্যাপারটা জেনে গেল। এই যে অনামী কবি, মানুষজন যাকে অল্পই চেনে, সে হয়ে গেল সেদিনের হিরো। এই ঘটনায় এলাকায় আমার পরিচিতি তৈরি হল আর দু’ দলের সঙ্গেই আমি বন্ধু হয়ে গেলাম। সেই থেকে বাচ্চাদের জন্য নাটক লেখায়, চ্যারিটি বাজারে, জনহিতকর মেলায়, এমনকি মিউনিসিপাল কাউন্সিলের একজন প্রার্থীর বক্তৃতা লেখায় পর্যন্ত সাহায্য করতে গিয়ে আমার সব সময় ব্যয় হয়ে যেত।

লুইস এনরিকে যে ভবিষ্যতে গিটার বাজাতে অনুপ্রাণিত হবে তার চিহ্ন ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। সে আমাকে তিপলে বাজানো শিখিয়ে দিয়েছে। ফিলাদেলফো বেলিয়া আর লুইস এনরিকের সঙ্গে আমরা হয়ে উঠলাম প্রেমের গানের ওস্তাদ আর আমাদের প্রথম পুরস্কার ছিল—যে বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে গান করছি সেই বাড়ির মেয়েরা দ্রুত পোশাক পরে নিয়ে দরজা খুলবে ও পাশের বাড়ির মেয়েদেরও ডেকে তুলবে, আর আমরা জলখাবারের সময় পর্যন্ত গান গেয়ে যাব। সে-বছর আমাদের দল সমৃদ্ধ হল হোসে পালেন্সিয়া যোগ দেওয়ায়। সে একজন ধনী ও দয়ালু জমিদারের নাতি। হোসের সঙ্গীতে এমনই প্রতিভা ছিল যে কোনও ধরণের বাদ্যযন্ত্র তার হাতে পড়লেই সে তা বাজাতে পারত। তাকে দেখতে ছিল সিনেমার নায়কদের মতো। চমৎকার নাচতে পারত, ভীষণ বুদ্ধিমান এবং বহু প্রেমিকা ছিল। তার জন্য তাকে ঈর্ষার যোগ্য বলে মনে হলেও তার সৌভাগ্য আসলে অতটা ঈর্ষান্বিতও আবার ছিল না।

বিপরীতে আমি নাচতে পারতাম না। এমনকি লোইসেউদের বাড়ির ছয় বোনের বাড়িতে গিয়েও নাচ শিখতে পারিনি। এই বোনেরা ছিল জন্ম থেকেই বিশেষভাবে সক্ষম এবং রকিং চেয়ার থেকে না উঠেই তারা নাচের ক্লাস করাত। আমার বাবা কখনোই খ্যাতিকে অগ্রাহ্য করতেন না। তিনি আমার কাছে এলেন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। সেই প্রথম আমরা দীর্ঘক্ষণ কথা বললাম। আসলে আমরা দুজন দুজনকে খুব কমই জানতাম। বাস্তবিক এখন পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি বাবা-মায়ের সঙ্গে আমি মোট তিন বছরের বেশি থাকিনি—আরাকাতাকা, বাররানকিয়া, কার্তাহেনা, সিন্সে ও সুক্রের সমস্ত যাপন মিলিয়ে। তাঁদের আরও বেশি করে জানতে পারা এক মধুর অভিজ্ঞতা। মা আমাকে সেটাই বললেন, ‘কী ভালো লাগছে যে, বাবার সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলছ!’ কিছুদিন পরে, রান্নাঘরে কফি তৈরি করতে করতে মা আরও বললেন:

  • ‘তোমার বাবার তোমাকে নিয়ে খুব গর্ব।’

পরের দিন পা টিপে টিপে মা আমার ঘরে ঢুকে কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘বাবার কাছ থেকে তোমার জন্য একটা চমক অপেক্ষা করছে।’ যখন জলখাবার খেতে নামলাম সবার সামনে বাবা নিজেই আমাকে খবরটা দিলেন:

  • ‘সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও, তুমি বোগোতা যাচ্ছ।’

শুনে আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হল এক বিরাট হতাশা! কেননা তখন আমার একমাত্র ইচ্ছা অন্তহীন হৈ-হল্লা ও মদ্যপানে ডুবে থাকা। কিন্তু জয়ী হল আলোর জীবন। বোগোতার ঠান্ডায় পরার পোশাকের কোনও সমস্যা হল না। বাবার একটা কালো রঙের শেভিয়ট কোট ছিল, আর-একটা ছিল কডের—কোনোটারই পেটের কাছে বোতাম লাগাতে পারতেন না। তাই আমরা গেলাম সেই অলৌকিক দর্জি পেদ্রো লেয়োন রোসালেসের কাছে এবং তিনি কোটদুটো আমার মাপে তৈরি করে দিলেন। তাছাড়াও মা এক মৃত সেনেটের সদস্যের উটের লোমের ওভারকোট কিনে আনলেন। সেটা এনে যখন আমার গায়ে মেপে দেখা হচ্ছে তখন অলোকদৃষ্টিসম্পন্ন বোন লিহিয়া আমায় চুপি চুপি ওই কোট পরতে বারণ করল কেননা ওই কোট পরেই সদস্যের ভূত রাতের বেলা তার বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। তার কথায় তখন পাত্তা দিইনি, কিন্তু দেওয়া উচিত ছিল—কারণ বোগোতায় এসে ওটা পরে আয়নায় মুখ দেখতে গিয়ে সেই সদস্যের মুখ দেখেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ওটা দশ পেসোয় বাঁধা দিয়ে দিই এবং আর কখনও ছাড়িয়ে আনিনি।

বাড়ির সবকিছু এমন সুন্দর হয়ে উঠেছিল যে বিদায় নেওয়ার সময় আমার চোখে প্রায় জল চলে এল। কিন্তু গোটা ঘটনাটাই পরিকল্পনামাফিক একের পর এক হয়ে গেল এবং সেখানে অনুভূতির প্রাধান্য রইল না। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে এক রাত্রি মুক্ত মানুষ হয়ে কাটানোর পর আমি মাগাঙ্গে থেকে নাবিয়েরা কলোম্বিয়ানা কোম্পানির একটি প্রধান জাহাজে চেপে রওনা দিলাম। আমার কেবিনযাত্রী ছিল দুশো কুড়ি পাউন্ড ওজনের এক দেবদূত। তার সারা শরীরে কোনও লোম ছিল না। তার নাম জ্যাক দ্য রিপার এবং সে এশিয়া মাইনরের সার্কাসে ছুরি ছোঁড়ার খেলোয়াড়দের বংশের সর্বশেষ টিকে থাকা ব্যক্তি। প্রথম দর্শনেই মনে হল আমাকে ঘুমের মধ্যে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু পরের কয়েক দিনে বুঝতে পারলাম যে তাকে যেমন দেখতে সে ঠিক তেমনই: এক বিশালাকায় শিশু যার হৃদয়টা শরীরের তুলনায় অনেক বড়।

প্রথম রাতে কোম্পানি থেকে একটা বড় পার্টি দিল, অর্কেস্ট্রা আর তার সাথে প্রচুর খাওয়া-দাওয়া, কিন্তু আমি পালিয়ে চলে গেলাম জাহাজের ডেকে। শেষ বারের মতো তাকিয়ে থাকলাম আমার সেই জগতের দিকে আর বিষণ্ণ না হয়ে তাকে ভুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। আকুল হয়ে কেঁদে চললাম ভোর হওয়া পর্যন্ত। আজ আমি বলতে পারি একটি মাত্র কারণ যার জন্য আমি আবার ছোটবেলায় ফিরে যেতে চাই তা হল সেই যাত্রাকে আবার উপভোগ করতে পারা। ম্যাট্রিকুলেশনের জন্য যে চার বছর বাকি ছিল আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’ বছর, সেই মোট ছ’ বছরে আমাকে বহুবার পারাপার করতে হয়েছে আর প্রতিটি যাত্রাপথে স্কুলের চেয়েও অনেক বেশি এবং উচ্চমানের শিক্ষা আমি পেয়েছি। বছরের যে সময় জল বেড়ে উঠত তখন বাররানকিয়া থেকে পুয়ের্তো সালগার পৌঁছতে লাগত পাঁচ দিন। তারপর পুয়ের্তো সালগার থেকে ট্রেনে চড়ে যেতে হবে বোগোতা। কিন্তু শুকনো সময়ে জল কম থাকলে আর ব্যস্ততা না থাকলে এই যাত্রা হতে পারে তিন সপ্তাহ দীর্ঘ এবং অতীব মনোরম।

জাহাজের নামগুলো ছিল সহজ এবং যথাযথ: আতলান্তিকো, মেদেজিন, কাপিতান দে কারো, দাভিদ আরাঙ্গো। এদের ক্যাপ্টেনরা কোনরাদের ক্যাপ্টেনদের মতোই কর্তৃত্বপূর্ণ, কিন্তু তাঁদের ব্যবহার খুব ভালো। রাক্ষসদের মতো খেতেন আর তাঁদের রাজকীয় কেবিনে কখনোই একা ঘুমোতেন না। ধীরে ধীরে চলছে জাহাজ আর মাঝে মাঝে চমকের আবির্ভাব। আমরা যাত্রীরা জাহাজের মাথায় বসে সারাদিন ধরে দেখতাম বিস্মৃত গ্রাম, শায়িত কাইমানের দল হাঁ করে আছে অসতর্ক প্রজাপতিদের অপেক্ষায়, চকা পাখির দল জাহাজের তৈরি জলোচ্ছ্বাসের ভয়ে উড়ে পালাচ্ছে, ভেতরের হ্রদে হাঁসের দল আর বড় বড় শুশুকেরা তীরে বাচ্চাদের দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে গান গাইছে। পুরো যাত্রায় ভোরবেলা ঘুম ভাঙবে ছোট ছোট বাঁদর আর টিয়া পাখির কোলাহলের বিস্মিত অনুভবে। মাঝে মাঝে জলে ডুবে থাকা গরুর বিশ্রী গন্ধে সিয়েস্তা ভেঙে যেতে পারে, আর দেখা যাবে ধীরে প্রবাহিত জলের মধ্যে গরুগুলো নিষ্পন্দ হয়ে রয়েছে ও তার পেটের উপর একা একটি শকুন বসে আছে।

আজকাল বিমানের মধ্যে কারুর সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু নদীতে জাহাজে করে যেতে যেতে আমরা ছাত্ররা মনে হত যেন একটা পরিবার। কেননা প্রতি বছরে আমরা পরিকল্পনা করে যাত্রার সময় ঠিক করতাম যাতে একসঙ্গে যেতে পারি। মাঝে মাঝে জাহাজ বালুতটে আটকে পনের দিন পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকত। কেউই চিন্তা করত না, পার্টি চলতেই থাকত এবং ক্যাপ্টেনের আংটির ছাপ দেওয়া চিঠি নিয়ে গেলেই দেরিতে আসার জন্য স্কুলে আর কিছু বলত না।      

প্রথম দিনই আমার চোখে পড়েছিল একটি পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য একটি ছেলে। প্রথম শ্রেণীর একটি কেবিনের মধ্যে সে যেন আধোঘুমে বান্দোনেয়োন বাজিয়ে চলে, সারাদিন। আমি ঈর্ষা চাপতে পারছিলাম না। আরাকাতাকায় ২০ জুলাইয়ের উৎসবে ফ্রান্সিসকো দে ওম্ব্রের বাজানো অ্যাকর্ডিয়ান শোনার পর থেকে দাদুর কাছে বায়না করেছিলাম আমাকে একটা কিনে দেওয়ার জন্য। কিন্তু দিদিমা তাঁর সেই চিরন্তন অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে বারণ করে দিলেন যে অ্যাকর্ডিয়ান নিচু শ্রেণীর লোকেদের বাদ্যযন্ত্র। প্রায় তিরিশ বছর পরে প্যারিসে নিউরোলজিস্টদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমার মনে হয় জাহাজের সেই সুন্দর অ্যাকর্ডিয়ান বাদকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। সময় তার কাজ করেছে ঠিকই, তাঁর মুখে ভবঘুরে দাড়ি, পোশাকও গায়ের মাপের সঙ্গে কয়েক গুণ বড় হয়েছে। কিন্তু তাঁর সেই বাদন-দক্ষতা আমার মনে এমন উজ্জ্বল হয়ে গেঁথে গিয়েছিল যে আমার ভুল হবার নয়। যাই হোক, নিজের পরিচয় না দিয়েই কথা বলতে গেলে তাঁর প্রতিক্রিয়া এর চেয়ে বেশি শীতল হতে পারত না:

  • ‘বান্দোনেয়োন বাজানোর খবর কী?’

অবাক হয়ে আমায় বললেন:

  • ‘কীসের কথা বলছেন ঠিক বুঝতে পারছি না।’

আমার মনে হল মাটির নিচে লুকিয়ে পড়ি। লজ্জা পেয়ে তাকে বলি যে ছাত্র বয়সের একজনের সঙ্গে গন্ডগোল করে ফেলেছি। চুয়াল্লিশ সালের প্রথম দিকে সে দাভিদ আরাঙ্গো জাহাজে বান্দোনেয়ন বাজিয়েছিল। এই বাদক ছিলেন বিশ্বের একজন বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট, কলোম্বিয়ারই মানুষ, নাম সালোমোন আকিম। তবে আমি হতাশ হয়েছিলাম যে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের বদলে বান্দোনেয়োনকে বলি দিয়েছিলেন।

টীকা

১। তিপলে – গিটারের মতো কিন্তু আকারে আরেকটু ছোট এক ধরণের তারের বাদ্যযন্ত্র।

২। বান্দোনেয়োন – অ্যাকর্ডিয়ানের মতো হাতে ধরে বাজানোর একটি বাদ্যযন্ত্র।