জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩২

জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল

(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)

মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

পর্ব - ৩২

যে আনন্দের সঙ্গে সান হোসে স্কুল আমার প্রত্যাবর্তনকে গ্রহণ করল তা সারা জীবনে ভুলতে পারব না। তার সঙ্গে ছিল আমার বাবার হোমিয়োপ্যাথি ওষুধের সুখ্যাতি। এবারে আর বালদেব্লাঙ্কেসদের সঙ্গে থাকলাম না। তাদের দ্বিতীয় সন্তান হওয়ায় সে বাড়িতে স্থানাভাব দেখা দিয়েছে। থাকতে শুরু করলাম এলিয়েসের গার্সিয়ার বাড়িতে। তিনি আমার ঠাকুমার এক ভাই। তিনি দয়া ও সততার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। একটি ব্যাঙ্কে কাজ করতেন, সেখান থেকেই অবসর নিয়েছেন। তাঁর যে ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগল তা হল ইংরাজি ভাষার প্রতি তাঁর অনন্ত আসক্তি। সারা জীবন ধরে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি ইংরাজি পড়তেন। সুন্দর গলায় ও সুন্দর উচ্চারণে গান করে পাঠ তৈরি করতেন। যত বয়স পর্যন্ত পেরেছেন এই পড়াশুনো করেছেন। উৎসবের দিনে বন্দরে গিয়ে পর্যটকদের ধরতেন কথ্য ইংরাজি অভ্যাসের জন্য। তারপর যখন ফিরে আসতেন তখন কাস্তেইয়ানোর সমান দখল হয়ে যেত ইংরাজিতে। কিন্তু মুখচোরা স্বভাবের মানুষ ছিলেন বলে তিনি চেনা লোকের সঙ্গে কখনও ইংরাজিতে কথা বলতেন না। তাঁর তিন ছেলে, সবাই আমার চেয়ে বড়, আর মেয়ে বালেন্তিনা। সে কখনও বাবাকে ইংরাজি বলতে শোনেনি।

বালেন্তিনা আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। সে একজন উৎসাহী পাঠকও। তার মাধ্যমেই আবিষ্কার করলাম ‘বালি ও আকাশ’ (Arena y Cielo) সাহিত্য আন্দোলন। একদল তরুণ কবি এর স্রষ্টা। তাদের উদ্দেশ্য পাবলো নেরুদার উদাহরণকে সামনে রেখে ক্যারিবিয়া উপকূলের কবিতায় নতুনত্বের সংস্কার। আসলে এরা ছিল বোগোতার ‘পাথর ও আকাশ’(Piedra y Cielo) দলের প্রতিরূপ। এই কবির দল তখন বোগোতার কাফে ও এদুয়ার্দো কাররানসার সম্পাদিত সাহিত্যিক ক্রোড়পত্রগুলিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। স্পেনের হুয়ান রামোন হিমেনেসের ছত্রছায়ায় এদুয়ার্দো তখন উনিশ শতকের মৃত পাতার আবর্জনা ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে এক স্বাস্থ্যকর সংকল্প নিয়েছিলেন। তাদের দলের সদস্য ছিল সদ্য বয়ঃসন্ধি উতরানো বড়জোর ছ’ জন কবি। কিন্তু উপকূলের পত্র-পত্রিকায় তাদের দমকা হাওয়া এমন সজোরে আছড়ে পড়েছিল যে লোকজন তাদের বিরাট প্রতিশ্রুতিবান বলে মনে করেছিল।

‘বালি ও আকাশ’-এর ক্যাপ্টেন বছর কুড়ির সেসার আউগুস্তো দেল বাইয়ে তাঁর অনন্য সংস্কার-প্রতিভা শুধু কবিতার বিষয় ও আবেগের ক্ষেত্রেই প্রকাশ করেছিলেন তা নয়, বানান ও ব্যকরণেও সেই পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। নীতিবাগীশদের চোখে তিনি ছিলেন বিধর্মী, শিক্ষাবিদদের কাছে বোকা আর ধ্রুপদী বিশেষজ্ঞদের কাছে নিতান্তই পাগল-ছাগল। সে যাই হোক, এ বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই যে তাঁর সংক্রামক উগ্রপন্থী হাবভাব থাকলেও আসলে তিনি, নেরুদার মতোই, আদ্যন্ত রোম্যান্টিক।

আমার পিসি বালেন্তিনা এক রবিবারে আমায় নিয়ে গেল সেসারের বাড়িতে, যেখানে সে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত। এলাকাটার নাম সান রোকে, শহরের সবচেয়ে কোলাহলমুখর জায়গা। সেসারের হাড়ের কাঠামো বেশ চওড়া কিন্তু যেমন রোগা, তেমন কালো। খরগোসের মতো বড় বড় দাঁত ও মাথার চুলগুলো এলোমেলো, ঠিক যেমন তখনকার সব কবিদের হত। আর সবার উপরে সে হৈচৈ করতে ভালোবাসত ও নারীসঙ্গে আসক্ত। তাদের বাড়িটা গরিব মধ্যবিত্তদের মতো। সর্বত্র বইয়ে ঠাসা। আরেকজন বাড়তি লোকেরও জায়গা হবে না। তার বাবা গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ; বিষণ্ণ বললেই আরও সঠিক বলা হবে। তারসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত অফিসারের মতো একটা ভাব আছে, আর মনে হল ছেলের এই অকাজের পেশা নিয়ে তিনি খানিক বিধ্বস্ত।

সেসারের বাড়িটা আমার কাছে ছিল এক অন্য জগতের উন্মোচন। আমার সেই চোদ্দ বছর বয়সে হয়তো সেরকম কিছুই খুঁজছিলাম, কিন্তু কল্পনাও করতে পারিনি তা কোন পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। প্রথম দিনের পর থেকেই আমি ছিলাম সেই বাড়ির একনিষ্ঠ অতিথি। কবির কত সময় যে আমার জন্য অপচয় হয়েছে তা মনে পড়লে আজ ভাবি কীভাবে সে আমায় সহ্য করেছিল। আবার অনেক সময় ভাবি যে সে আমায় ব্যবহার করেছিল তার সাহিত্যতত্ত্ব চর্চার জন্য। সেসব হতে পারে অযৌক্তিক, কিন্তু নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ—আর তা করেছিল একজন বিস্ময়াবিষ্ট কিন্তু নিরীহ শ্রোতার সঙ্গে। আমাকে এমন সব কবির কবিতার বই পড়তে দিত যাঁদের নাম পর্যন্ত তখনও শুনিনি আর আমি তার সঙ্গে সেইসব কবিদের সম্বন্ধে আলোচনা করতাম তা করার স্পর্ধা আছে কিনা তা না বুঝেই। সবার উপরে নেরুদা। তাঁর ‘কুড়িটি প্রেমের কবিতা’ (Veinte poemas de amor y una canción desesperada) মুখস্থ করে ফেলেছিলাম যাতে জেসুইটদের কাউকে কাউকে রাগিয়ে দেওয়া যায়। তাদের বিদ্যের দৌড় অবশ্য ওইসব কবিতা পর্যন্ত পৌঁছায়নি। সেই সময় কার্তাহেনা দে ইন্দিয়াস শহরের সাংস্কৃতিক আবহাওয়া আন্দোলিত হয়ে উঠল মেইরা দেলমারের একটি কবিতায়, যার খবর উপকূলের সমস্ত কাগজে বেরিয়েছিল। এমন স্বরে ও উচ্চারণে সেসার আমাকে সেই কবিতাটা পাঠ করে শোনাল যে দু’বার শুনেই তা আমার মুখস্থ হয়ে গেল।

অনেক সময় সেসারের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না কারণ সে তখন নিজের মতো করে কিছু লিখত। ঘর ও বারান্দা দিয়ে এমনভাবে পায়চারি করত যেন সে এক অন্য জগতে আছে। প্রতি দু’-তিন মিনিট অন্তর আমার সামনে দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে ঘুমের ঘোরে হাঁটার মতো করে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই বসে পড়ত টাইপরাইটারের সামনে—একটা লাইন, একটা শব্দ, একটা দাঁড়ি বা কমা লিখত, তারপর ফের হাঁটতে শুরু করত। আমি তাকে প্রত্যক্ষ করতাম আর কবিতা লেখার একমাত্র ও গোপন পন্থা আবিষ্কারের স্বর্গীয় অনুভূতিতে আবিষ্ট হয়ে যেতাম। সান হোসে স্কুলে আমার জীবনের পুরো সময়টা ছিল এমনই যা আমার ভেতরের প্রদীপের দৈত্যকে জাগিয়ে তোলার শৈল্পিক বীজ বপন করেছিল। এই অবিস্মরণীয় কবির শেষ খবর আমি পেয়েছিলাম দু’ বছর বাদে বোগোতায় থাকার সময়। বালেন্তিনা তিনটি মাত্র শব্দ লিখে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিল: ‘সেসার মারা গেছে’। নিচে নিজের নামটুকু লেখার মতো মনের অবস্থা তার ছিল না।

এমন এক বাররানকিয়া—যেখানে বাবা-মা’র অভিভাবকত্ব নেই, সেখানে আমার প্রথম অনুভূতি ছিল স্বাধীন ইচ্ছার দেদার স্বাধীনতা। স্কুলের গন্ডির বাইরেও প্রচুর বন্ধু হয়েছিল। আলবারো দেল তোরো টিফিনের সময় আমার দ্বিতীয় স্বর হয়ে উপস্থিতি জানিয়ে দিত আর আমি আরতেতাদের সঙ্গে স্কুল পালিয়ে চলে যেতাম বইয়ের দোকানে ও সিনেমা দেখতে। আমাকে রাখার দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে একমাত্র যে নিয়ম এলিয়েসের দাদুর বাড়িতে আমাকে মানতে হত, তা হল রাত আটটার মধ্যে বাড়ি ফেরা।

একদিন যখন সেসার দেল বাইয়ের বাড়ির হলঘরে বসে বই পড়তে পড়তে তার অপেক্ষা করছি তখন হঠাৎই তাকে খুঁজতে এল একটি মেয়ে। তার নাম মার্তিনা ফোন্সেসকা। বুদ্ধিমতী ও স্বেচ্ছাধীন এক মেয়ে। মুলাতা ছাঁচ কুঁদে তৈরি করা সেই সাদা মেয়ে কবির প্রেমিকা হলে বেশ হত। প্রায় দু’-তিন ঘণ্টা ধরে তার সঙ্গে কথা বলা দারুণ উপভোগ করলাম। তারপর সেসার বাড়ি ফিরল আর মেয়েটির সঙ্গে কোথায় বেরিয়ে গেল, আমাকে কিছুই বলল না। সেই বছরের ভষ্ম বুধবারের আগে পর্যন্ত মেয়েটির সম্বন্ধে কিছুই জানতে পারলাম না। তারপর একদিন বড় প্রার্থনা সভা থেকে বেরিয়ে দেখি সে আমার জন্য একটা পার্কের বেঞ্চে অপেক্ষা করছে। যেন এক অতিলৌকিক আবির্ভাব। এমব্রয়ডারি করা লিনেনের পোশাকে তার রূপ হয়ে উঠেছে শুদ্ধতার প্রতিমূর্তি, গলায় পুঁতির মালা আর পোশাকের গভীর করে কাটা গলার খাঁজে ফুলের জীবন্ত আগুন। যাই হোক, সে স্মৃতিমালার যা আজও সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে আছে তা হল পূর্বপরিকল্পনার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও আমাকে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করল সে। এমনকি ভষ্ম বুধবারের ভষ্মের ক্রশ তখনও আমাদের দুজনের কপালে আঁকা, কিন্তু আমরা কেউই সেই পবিত্র চিহ্নকে ধর্তব্যের মধ্যে আনলাম না। তার স্বামী মাগদালেনা নদীর জাহাজের পাইলট। সে তার নিয়ম মাফিক বারো দিনের যাত্রার কারণে বাইরে ছিল। এখন তার স্ত্রী যদি একটা শনিবারে আমাকে বাড়িতে চকোলেট দেওয়া আলমোহাবানা খেতে নিমন্ত্রণ করে এতে রহস্যের কী আছে? শুধু এই আছে যে ঘটনাটা বছরের বাকি সময়ে পুনরাবৃত্ত হতে থাকল ঠিক তখন, যখন তার স্বামী সমুদ্র যাত্রায় বাইরে থাকে। প্রত্যেকবার বিকেল চারটে থেকে সাতটা আমাদের দেখা হত। ঠিক ওই সময়েই রেক্স হলে ছোটদের একটা অনুষ্ঠান দেখানো হত আর সেটাই ছিল এলিসের দাদুর কাছে আমার অনুপস্থিতির অজুহাত।

মার্তিনার পেশা ছিল প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উন্নতির জন্য তৈরি করা। যারা উল্লেখযোগ্য ফল লাভ করত তাদের সে অবসর সময়ে ডাকতো আর চকোলেট দেওয়া আলমোহাবানা খেতে দিত। এর ফলে শনিবারের নতুন একটি ছাত্র কৌতূহলী প্রতিবেশীদের আলাদা করে নজরে পড়ল না। সেই গোপন প্রেমের প্রবাহ সত্যিই বিস্ময়কর ছিল। এক পাগল করা আগুনে জ্বলে উঠেছিল মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। প্রথম দুই শনিবারের পরে ভেবেছিলাম যে তার সঙ্গে সারাক্ষণ থাকার প্রবল ইচ্ছাকে বোধহয় দমন করতে পারব না।

আমাদের কোনও আকস্মিক বিপদের ভয় ছিল না কারণ তার স্বামী শহরে আগমন ঘোষণা করার একটা ইশারা ছিল যা থেকে সে জানতে পারত যে সেই ভদ্রলোকটি শহরের দরজা দিয়ে ঢুকছে। আমাদের প্রেমের তৃতীয় শনিবারে যখন আমাদের অবস্থান বিছানায়, সে দূরে একটা হল্লার আওয়াজ শুনতে পেল। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল সে।

  • ‘শান্তভাবে বসে থাকো’ আমায় বলল এবং আরও দু’বার হল্লার শব্দ অবধি অপেক্ষা করল। সে কিন্তু ভয় পেয়ে লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়ল না, যেমনটা আমি আশা করছিলাম। বরং বিপদের সামনে শান্ত ভঙ্গিমায় বলল, ‘আমাদের এখনও তিন ঘণ্টার জীবন বাকি আছে।’

স্বামী সম্বন্ধে মার্তিনা আমায় বর্ণনা দিয়েছিল যে সে দু মিটার ও প্রায় এক বিঘৎ লম্বা বিশালদেহী কালো মানুষ আর তার মেশিনটা গোলন্দাজ সৈনিকদের মতো। হিংসার চোটে আমি এই খেলার নিয়ম প্রায় নষ্ট করতে বসেছিলাম এবং সেটাও কোনো ছোটখাটো ভাবে নয়, লোকটাকে খুন করতে চেয়েছিলাম। মার্তিনা তার পরিণত বুদ্ধি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলল। সেই সময় থেকে বাস্তব জীবনের ঝড়-ঝাপটার মধ্যে দিয়ে সে আমাকে শান্ত ভেড়ার মতো চালনা করতে লাগল। যে ভেড়ার মুখোশের মধ্যে আসলে এক নেকড়ে বাস করত। 

স্কুলে আমার পড়াশোনার অবস্থা তখন শোচনীয় এবং সে ব্যাপারে কোনও আগ্রহও ছিল না। কিন্তু মার্তিনা আমায় পড়াশোনা করানোর দুর্গম দায়িত্ব কাঁধে নিল। জীবনের এক অপ্রতিরোধ্য আবেগের দানবকে খুশি করার জন্য স্কুলের পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহের এই ছেলেমানুষী তাকে বিস্মিত করল। আমি বললাম: ‘এটাই যুক্তিসঙ্গত। যদি এই বিছানাটা স্কুল হত আর তুমি হতে শিক্ষিকা তাহলে আমি শুধু ক্লাসের মধ্যে নয় সারা স্কুলের মধ্যে প্রথম হতাম।’ সে আমার কথাটা একটা ভালো উদাহরণ হিসাবে গ্রহণ করল আর বলল: ‘সেটাই আমরা এখন করতে চলেছি।’

বেশি পরিশ্রম না করেই সে আমার পুনরুত্থানের জন্য একটা নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করে ফেলল। একদিকে বিছানায় উল্লাস আর অন্যদিকে মায়ের মতো কড়াক্কড়ি—এ দুয়ের মধ্যে সে আমাকে পরের সপ্তাহের জন্য তৈরি করতে শুরু করল। যদি পড়াশোনা সময়ের মধ্যে ভালো করে না করতাম তাহলে প্রতি তিনটে ভুলের জন্য একটি শনিবারের উপবাস ছিল আমার শাস্তি। কখনও দুটোর বেশি ভুল করিনি। আমার পরিবর্তন স্কুলে সবার চোখে পড়ল।

সে যাই হোক, সে আমাকে শিখিয়েছিল এক অব্যর্থ ফর্মুলা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেটা শুধুমাত্র স্কুলের শেষ পরীক্ষাতেই কাজে লেগেছিল। এর বদলে যদি ক্লাসে মন দিতাম আর বন্ধুদের দেখে না টুকে নিজে নিজে হোমওয়ার্ক করতাম তাহলে অনেক ভালো ফল হত। তাছাড়া সারা রাত ধরে অহেতুক কষ্ট না করে ও ভয় না পেয়ে অবসর সময়ে নিজের ইচ্ছে মতো বই পড়তে পারতাম। তবে তার সেই জাদু ফর্মুলাকে ধন্যবাদ, ১৯৪২-এর সেই বছরে আমি ক্লাসের মধ্যে প্রথম হয়ে উৎকর্ষের মেডেল পেলাম ও আমার প্রচুর সুখ্যাতি হতে লাগল। তবে ডাক্তারদের আলাদাভাবে কৃতজ্ঞতা জানানো হল আমাকে পাগল থেকে সুস্থ করে দেওয়ার জন্য। পার্টিতে গিয়ে উপলব্ধি করলাম যে বিগত বছরগুলোয় যে মেধা আমার নয় তার প্রশংসায় যে আবেগের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি তার মধ্যে ভন্ডামির বোধ ক্রিয়াশীল ছিল। কিন্তু সর্বশেষ বছরে যখন সত্যিই সেই প্রশংসা প্রাপ্য ছিল তখন মনে হল কাউকে কৃতজ্ঞতা না জানানোই যথোচিত। যাই হোক, শেষ অনুষ্ঠানে মনের সবটুকু আবেগ দিয়ে গিয়ের্মো বালেন্সিয়ার ‘সার্কাস’ কবিতাটি সম্পূর্ণ আবৃত্তি করেছিলাম। পাশ থেকে কাউকে বলে দিতে হয়নি। তবে খুব ভয় পেয়েছিলাম, একজন খ্রিস্টান যেমন সিংহের সামনে দাঁড়ালে ভয় পায়, তেমন।

সেই সুন্দর বছরে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে ছুটিতে আরাকাতাকায় যাব দিদিমা ত্রাঙ্কিলিনার কাছে। কিন্তু দিদিমাকেই তাড়াতাড়ি বাররানকিয়ায় নিয়ে যেতে হল চোখের ছানি অপারেশনের জন্য। তাঁকে আবার দেখতে পাওয়ার আনন্দ সম্পূর্ণ হল তাঁরই দেওয়া উপহার একটি অভিধান পেয়ে। দিদিমা বুঝতেই পারেননি যে অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন, বা হয়তো সেকথা স্বীকার করতে চাননি যতক্ষণ না এমন অবস্থা হল যে নিজের ঘর থেকেও বেরোতে পারছেন না। কারিদাদ হাসপাতালে দ্রুত অপারেশন করানো হলে পর ডাক্তাররা বললেন যে ভালো হয়ে যাবেন। যখন হাসপাতালের খাটে বসে তাঁর চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হচ্ছে দিদিমা তাঁর নব যৌবনের উজ্জ্বল চোখ নিয়ে তাকালেন। মুখে আনন্দের আলো। এই সমূহ আনন্দের প্রকাশ করলেন শুধু মাত্র দুটি শব্দে:

  • ‘দেখতে পাচ্ছি।’

শল্যচিকিৎসক নির্দিষ্ট ভাবে জানতে চাইলেন ঠিক কী কী দেখতে পাচ্ছেন। দিদিমা সারা ঘরে নবীন দৃষ্টি বুলিয়ে সবকিছু নিখুঁতভাবে বলে গেলেন। চিকিৎসক স্তব্ধ হয়ে রইলেন, কেননা শুধু মাত্র আমিই জানতাম যেসব জিনিসের কথা দিদিমা বললেন তা হাসপাতালের ঘরে চোখের সামনে যা রয়েছে তা নয়, আসলে সেসব তাঁর আরাকাতাকার ঘরের বর্ণনা যা তাঁর স্মৃতিতে থরে থরে সাজানো। আর তাঁর দৃষ্টি ফিরে আসেনি।

বাবা-মা জোরাজুরি করলেন যাতে পুরো ছুটিটা আমি সুক্রেতে তাঁদের সঙ্গে থাকি এবং দিদিমাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসি। দিদিমাকে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধ লাগছিল। তাঁর মনও যেন সুস্থিত নয়, ভাসমান। কিন্তু তাঁর গলার স্বর আরও বেশি মধুর হয়ে উঠেছে আর গানও গাইছেন আগের থেকে অনেক বেশি এবং অধিকতর দক্ষতায়। একটা বিরাট বড় পুতুলের মতো করে মা তাঁর সেবা-যত্ন করতেন যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকেন। এটা ঠিক যে তিনি জগৎ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলেন, কিন্তু যা বলতেন সবই অতীতের কথা। বিশেষ করে রেডিয়োর অনুষ্ঠান—যা তাঁর মধ্যে এক শিশুসুলভ আগ্রহের জন্ম দিত। বিভিন্ন ঘোষকের গলার স্বরে তাদের চিনতে পারতেন রিওয়াচায় তাঁর যৌবনের বন্ধু বলে। কেননা তাঁর আরাকাতাকার বাড়িতে কোনোদিন রেডিও প্রবেশ করেনি। কোনও কোনও ঘোষকের মন্তব্যের বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করতেন বা সমালোচনা করতেন। তাদের সঙ্গে অজস্র বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতেন বা তাদের ব্যকরণের ভুল ধরতেন, মনে হত যেন তারা রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে তাঁর বিছানার পাশটিতে বসে আছে। তারা চলে না যাওয়া পর্যন্ত পোশাক পালটাতেন না। তখন অত্যন্ত পরিশীলিত ভাষায় তাদের বলতেন:

  • ‘শুভ রাত্রি, মহাশয়।’

অনেক ভুলে যাওয়া জিনিস, গোপনে রক্ষিত কাহিনি ও নিষিদ্ধ বিষয়ের রহস্য উন্মোচন করতেন তাঁর স্বগতোক্তিতে: আরাকাতাকার বাড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়া জলের বেসিন কে তাঁর ট্রাঙ্কের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল কিংবা মাতিলদে সালমোনার প্রকৃত বাবা কে, যার ভাইয়েরা তাকে অন্য লোক ভেবে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল।

 

 

টীকা

১। পাথর ও আকাশ – পাথর ও আকাশ – বিংশ শতাব্দীর কলোম্বিয়ায় অন্যতম প্রধান সাহিত্য আন্দোলন। ১৯৩৯-’৪০ সময়কালে কলোম্বিয়ার একদল তরুণ কবি পুরনো মডার্নিস্টদের ধরণ থেকে বেরিয়ে এসে ইউরোপের অনুকরণের বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকার নিজস্ব কথা লিরিক ও সুস্পষ্ট ইমেজারির ব্যবহারে কবিতার এক নতুন দিগন্ত তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এই আন্দোলনের মুখ্য শরিকরা হলেন হোর্হে রোহাস, এদুয়ার্দো কাররানসা, দারিয়ো সাম্পের, কার্লোস মার্তিন, আর্তুরো কামাচো রামিরেস, তোমাস বার্গাস ওসোরিয়ো এবং হেরার্দো বালেন্সিয়া। তাঁরা ধারাবাহিকভাবে কিছু পুস্তিকা প্রকাশ করেন যাদের নাম দেন ‘পাথর ও আকাশ’ (Piedra y Cielo)। হুয়ান রামোন হিমেনেসের একটি বইয়ের থেকে এই নাম গ্রহন করা হয়।

২। এদুয়ার্দো কাররানসা – ‘পাথর ও আকাশ’ আন্দোলনের পথিকৃৎ। কলোম্বিয়ার কবি, লেখক ও কূটনীতিবিদ। জন্ম ২৩ জুলাই, ১৯১৩ এবং মৃত্যু ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৫।

৩। হুয়ান রামোন হিমেনেস – স্পেনের নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত কবি। স্ত্রী সেনোবিয়া কাম্প্রুবির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের কিছু অংশ স্প্যানিশে অনুবাদ করেন। জন্ম ২৩ ডিসেম্বর ১৮৮১ এবং মৃত্যু ২৯ মে, ১৯৫৮। তাঁর সর্বাধিক খ্যাত গ্রন্থ ‘প্লাতেরো ও আমি’ (Platero y yo)।

৪। মুলাতা – সাদা মানুষ ও আফ্রিকার কালো মানুষের মিশ্রণে জন্ম নেওয়া ছেলেদের বলে মুলাতো আর মেয়েদের বলে মুলাতা। 

৫। আলমোহাবানা – চিজ দেওয়া এক ধরণের পাউরুটি। এটি খুব নরম, ফাঁপা ও সোনালি-বাদামি রঙের। কলোম্বিয়া ও অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশে এই পাউরুটি পাওয়া যায়।