জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩০
- 07 February, 2026
- লেখক: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
বাররানকিয়ায় ফিরে এসে ব্রিজে দাঁড়িয়ে সেই একই ‘কাপিতান দে কারো’ দেখলাম, মাত্র তিন মাস আগেই যাতে করে আমরা যাত্রা করেছিলাম। আমার হৃদয় আলোড়িত হল, মনে হল যেন বাস্তব জীবনে ফিরে এলাম। সৌভাগ্যক্রমে বাবা-মা আমার থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন আমার মামাতো ভাই হোসে মারিয়া বালদেব্লানকেস১ ও তাঁর স্ত্রী ওরতেনসিয়ার বাড়িতে। এই দুজন প্রিয় যুবক-যুবতী তাদের অনাড়ম্বর জীবনে আমাকে জড়িয়ে নিল। তাদের বাড়িতে ছিল একটাই শোবার ঘর, অতি সাধারণ একটা বসার ঘর আর ছোট্ট একটা উঠোন—যেখানে লাইন করে শুকোতে দেওয়া কাপড়ের জন্য সারাক্ষণ ছায়া ঘনিয়ে থাকত। ওরা শোবার ঘরে ঘুমোত ছ’মাসের বাচ্চা নিয়ে আর আমি শুতাম বসার ঘরে সোফায়—যা রাত হলে রূপান্তরিত হত বিছানায়।
সান হোসে স্কুল ছিল ছ’শো মিটার মতো দূরে একটা বাদাম গাছে ঘেরা পার্কের মধ্যে যেখানে ছিল শহরের সবচেয়ে পুরনো কবরখানা। বাঁধানো পাথরের মধ্যে হাড়ের টুকরো বা মৃতদেহের কাপড়ের অংশ তখনও পাওয়া যেত। প্রথম যেদিন স্কুলের প্রধান কোর্ট ইয়ার্ডে ঢুকলাম, সেদিন প্রথম বর্ষের ছাত্রদের জন্য একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিল। সবাই রবিবারের পোশাক পরেছিল—সাদা প্যান্ট ও নীল রঙের ফ্লানেলের জ্যাকেট। আমি কিছুতেই ভয় চেপে রাখতে পারছিলাম না যে ওরা সবকিছু জানে যা আমি একেবারেই জানিনা। কিন্তু দ্রুত বুঝে গেলাম যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে তারাও আমার মতোই অজ্ঞ ও ভয়কাতর।
এই স্কুলে আমার ব্যক্তিগত বিভীষিকা ছিল পেদ্রো রেইয়েস—ছোটদের বিভাগের প্রিফেক্ট। সে স্কুলে বড়দের বুঝিয়ে বেড়াত যে আমি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত নই। যেখানে যেখানে আমি ভাবতেই পারতাম না যে সে থাকবে ঠিক সেই সেই জায়গায় দুঃস্বপ্নের মতো আমার পথের মধ্যে উদয় হত, আর সঙ্গে সঙ্গে শয়তানদের অতর্কিত আক্রমণের মতো সে আমার পরীক্ষা নিতো: ‘ভগবান কি এরকম পাথর সৃষ্টি করবেন যা তিনি নিজে বইতে পারবেন না?’ প্রশ্ন করত, কিন্তু ভাবার একটুও সময় দিত না। কিংবা একটা জঘন্য ধাঁধা জিজ্ঞাসা করত: ‘যদি আমরা বিষুবরেখা বরাবর পঞ্চাশ সেন্টিমিটার পুরু একটা বেল্ট পরিয়ে দিই তাহলে পৃথিবীর ওজন কতটা বাড়বে?’ উত্তর জানা থাকলেও একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারতাম না, কেননা প্রথম টেলিফোন করার মতো ভয়েই আমার জিভ আড়ষ্ট হয়ে যেত। এই ভয়ের ভিত ছিল শক্ত, কারণ পেদ্রো রেইয়েসের কথাগুলো ভুল ছিল না। আমি সত্যি সত্যিই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, আবার ভাগ্যের আশাও ছেড়ে দিতে পারিনি, যদি পরীক্ষা ছাড়াই আমাকে গ্রহণ করে নেয়! ছেলেটাকে শুধু দেখলেই ভয়ে কাঁপতাম। কিছু পড়ুয়া এই ভয়ের বাজে ব্যাখ্যা দিত, কিন্তু সেগুলো সত্যি ভাবার কোনও কারণ খুঁজে পাইনি। তাছাড়া আমার বিবেক আমায় সাহায্য করেছিল—তার প্রধান কারণ প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় কোনও বাধা না পেয়েই পাশ করে গেলাম। আমি ফ্রাই লুইস দে লেয়োনের কবিতা জলের মতো মুখস্ত বলেছিলাম আর রঙিন চক দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে যীশু খ্রিস্টের এমন ছবি এঁকেছিলাম যে সেটা জীবন্ত মনে হচ্ছিল, আর তাতে পরীক্ষকরা এত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে তাঁরা পাটিগণিত আর জাতীয় ইতিহাসের পরীক্ষা নিতে ভুলেই গেলেন।
এর মধ্যে পেদ্রো রেইয়েসের সঙ্গে ঝামেলার মিটমাট হয়ে গেল। সেমানা সান্তার সময় তার উদ্ভিদবিদ্যা ক্লাসের কিছু ছবি আঁকার দরকার ছিল। চোখের পলক ফেলার আগেই সেগুলো আমি করে দিই। তারপর থেকে সে ভয় দেখানো বন্ধ করল। তাছাড়া মাঝে মাঝে টিফিন পিরিয়ডে আমি যেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি সেগুলো ভালো করে শিখিয়ে দিত। এমনকি কিছু অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর বলে দিত যেগুলো ঘটনাচক্রে আমার প্রথম বছরের পরের পরীক্ষাগুলোয় এসেছিল। কিন্তু যখনই আমি একটা দলের মধ্যে থাকতাম সে আমাকে নিয়ে প্রচন্ড হাসাহাসি করত আর বলত যে সপ্তম শ্রেণীর আমিই একমাত্র ছাত্র যে ফাইনাল পরীক্ষায় ভালো করবে। এখন আমি ভেবে দেখি যে সে ঠিকই বলত। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল বানান। পুরো পড়াশুনোর সময় ওটাই ছিল আমার দূর্বলতম স্থান। এখনও পর্যন্ত আমার পান্ডুলিপি যাঁরা সংশোধন করেন, তাঁদের কাছেও এটা ভয়ের ব্যাপার। তাঁরা নিজেদের সান্ত্বনা দেন এই বলে যে সেগুলো আমার টাইপ করার ভুল।
এইসব দুরবস্থার মধ্যে আমার একটু স্বস্তি হল যখন শিল্পী ও লেখক এক্তোর রোহাস এরাসো স্কুলে আঁকার শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হলেন। তাঁর বয়স বছর কুড়ি। ক্লাসে ঢুকলেন ফাদার প্রিফেক্টের সঙ্গে আর সেই ঘামে ভেজা দুপুর তিনটের সময়ে তাঁর প্রথম বলা কথাগুলো যেন সজোরে দরজা বন্ধ করার আওয়াজের মতো প্রতিধ্বনিত হল। তাঁকে দেখতে অনেকটা সিনেমার নায়কের মতো সুন্দর। তেমনই স্মার্ট। তাঁর পরণে উটের লোম দিয়ে তৈরি একটা টাইট জ্যাকেট, বোতামগুলো সোনালি, ভেতরের জামাটা বিচিত্র রঙের আর টাইটা ছাপা সিল্কের। তবে সব থেকে উল্লেখযোগ্য তাঁর টুপি—তরমুজের মতো তার আকৃতি, আর সেটা তিনি পরে আছেন যখন ছায়ায় দাঁড়ালেও তিরিশ ডিগ্রি গরম। তিনি প্রায় দরজার মাথা পর্যন্ত লম্বা। তাই সামনের দিকে ঝুঁকে তবেই বোর্ডে ছবি আঁকতে পারতেন। তাঁর পাশে ফাদার প্রিফেক্টকে মনে হচ্ছিল তাঁকে যেন ঈশ্বরের হাতে সঁপে দেওয়া হয়েছে।
ক্লাস শুরু করতেই বোঝা গেল শিল্পীর না আছে শেখানোর পদ্ধতি না ধৈর্য। কিন্তু তাঁর দুষ্টু রসিকতায় আমরা খুবই কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। তেমনই বিভিন্ন রঙের চক দিয়ে বোর্ডে তাঁর দক্ষ হাতে আঁকা ছবি দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে যেতাম। মাত্র তিন মাস স্কুলে ছিলেন। কেন চলে গিয়েছিলেন তা কোনোদিন জানতে পারিনি, তবে ধারণা করা হয় যে তাঁর মুক্ত মনের শিক্ষকতা যীশুখ্রিস্টের সহকারীদের শৃঙ্খলার সঙ্গে ঠিক খাপ খায়নি।
স্কুল শুরুর প্রথম থেকেই আমি কবি হিসাবে বিখ্যাত হয়ে গেলাম। প্রথম কারণ হল পাঠ্য বইয়ের স্পেনের ক্লাসিক ও রোমান্টিক কবিতাগুলো সব আমার মুখস্থ ছিল আর আমি সেসব গলা খুলে আবৃত্তি করতাম। তারপর সহপাঠীদের পেছনে লাগার জন্য ওই সব কবিতার প্যারডি বানিয়েছিলাম যা স্কুলের পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ওই প্যারডি আমি লিখতামই না বা লিখলেও আরেকটু যত্ন নিতাম যদি কল্পনা করতে পারতাম যে সেগুলো ছাপা হওয়ার গৌরব অর্জন করবে। আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল কি বন্ধুভাবে মজা করে লেখা প্যারডিগুলো ছোট ছোট কাগজে চুপি চুপি ঘুরে বেড়াচ্ছিল দুপুর দুটোর ঘর্মাক্ত ক্লাসে। সেকেন্ড ডিভিসনের প্রিফেক্ট ফাদার লুইস পোসাদা তার একটা ধরে ফেললেন। ভ্রু কুঁচকে তা পড়লেন ও আমাকে যথাযোগ্য বকলেন, কিন্তু চিরকুটটা পকেটে রেখে দিলেন। এরপর ফাদার আর্তুরো মেহিয়া আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠিয়ে বললেন যে বাজেয়াপ্ত করা ওই প্যারডি স্কুলের ছাত্রদের সংঘটন ‘হুবেন্তুদ’-এর পত্রিকায় ছাপা হবে। আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়, লজ্জা ও ভালোলাগা। যদিও উত্তরে যা বললাম তা না বলার জন্য খুব একটা যুৎসই হল না:
- ‘ওগুলো নেহাৎই আমার খ্যাপামি।’
ফাদার মেহিয়া আমার উত্তরটা খাতায় লিখে নিলেন এবং যেসব ছাত্রদের উদ্দেশ্যে মজা করা হয়েছিল তাদের অনুমোদন নিয়ে পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায় কবিতাগুলো ছাপা হল ‘গাবিতো’ নামের অধীনে আর শিরোনাম দেওয়া হল ‘আমার খ্যাপামি’২। পরের আরও দুটো সংখ্যায় আবার কতগুলো প্যারডি ছাপালাম সহপাঠীদের একান্ত অনুরোধে। ভালো হোক বা খারাপ, সঠিকভাবে বলতে গেলে ওই ছেলেমানুষী পদ্যই ছিল আমার প্রথম লেখা।
যা হাতে আসবে তাই পড়ে ফেলার নেশা আমার অবসর সময় ভরিয়ে রাখত এবং প্রায় সব ক্লাসের সময়ও। তখনকার কলোম্বিয়ায় যেসব কবিতা বা ছড়া লোকমুখে ঘুরে বেড়াত সেগুলোও পুরো বলতে পারতাম। তার পাশাপাশি মুখস্থ বলতাম স্পেনের স্বর্ণযুগের রোমান্টিক কবিতাদের মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে বিখ্যাত। বেশির ভাগটাই শিখেছিলাম পাঠ্য বই থেকে। ওই বয়সে আমার মুখস্থবিদ্যা শিক্ষকদের বিস্মিত করেছিল, কারণ যখনই আমাকে একটা কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেন আমি হয় কবিতার লাইন তুলে তার উত্তর দিতাম নাহলে এমন কেতাবি বিদ্যে ফলাতাম যা বিচার করার মতো অবস্থায় তাঁরা থাকতেন না। এই জন্য ফাদার মেহিয়া ‘ছেলেটা অসহ্য’ বলতে না পেরে বলেছিলেন—‘ছেলেটার দেখনদারি আছে’। মুখস্থ করতে আমায় বেগ পেতে হত না। কবিতা বা ক্লাসিক কোনও গদ্যের একটা অংশ তিন-চারবার পড়লেই আমার মাথায় গেঁথে যেত। আমি প্রথম ফাউন্টেন পেন উপহার পেয়েছিলাম ফাদার প্রিফেক্টের কাছ থেকে, গাসপার নুন্যিয়েস দে আরসের৩ ‘এল বের্তিগো’ কবিতার দশ লাইন স্তবকের সাতান্নটা স্তবক নির্ভুল আবৃত্তি করার জন্য।
ক্লাসের মধ্যে কোলের উপর গল্পের বই রেখে অসভ্যের মতো পড়তাম, তবুও যে শাস্তি পেতাম না তার প্রধান কারণ আমার এই অসভ্যতা মেনে নেওয়ার জন্য মাস্টারমশাইদের দুষ্ট চক্রান্ত। কাব্যিক চটকদারিতা সত্ত্বেও যেটা আমি অর্জন করতে পারিনি তা হল প্রতিদিনের সকাল সাতটার প্রার্থনা থেকে অব্যাহতি। ভুলভাল কবিতা লেখা ছাড়াও আমি ছিলাম কোরাসের একমাত্র একক গায়ক, মজার কমিক আঁকতাম, গুরুগম্ভীর অনুষ্ঠানে কবিতা বলতাম এবং পাঠ্যক্রম-বহির্ভূত এত রকমের কাজ করতাম যে কেউ বুঝতেই পারত না আমি পড়তাম কখন। এর উত্তর ছিল জলের মতো সহজ: আমি পড়তাম না।
এত রকমের সক্রিয়তার পরেও কেন যে শিক্ষকরা আমায় নিয়ে মাথা ঘামাতেন তা আজও বুঝে উঠতে পারিনি। অথচ আমার ভুল বানান দেখে তাঁরা কোনোদিন আঁতকে উঠে চিৎকার করেননি। বিপরীতে মা আমার কিছু চিঠি বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন যাতে তা দেখে বাবার না ভবলীলা সাঙ্গ হয়। বাকিগুলো সংশোধন করে আমাকে ফেরত পাঠাতেন। মাঝে মাঝে আমার ব্যাকরণের উন্নতির প্রশংসাও করতেন আর শব্দের ভালো ব্যবহারেরও সুখ্যাতি করতেন। তবে দু’বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও কোনও উন্নতি দৃষ্টিগোচরে এল না। আজও সেই সমস্যা একই রকম আছে। কখনও বুঝতে পারিনি শব্দের মধ্যে কেন অনুচ্চারিত অক্ষর থাকে বা দুটো পৃথক অক্ষরের কেন একই উচ্চারণ হয় এবং এই জাতীয় আরও অজস্র অনর্থক নিয়ম।
এখানেই আমি আবিষ্কার করলাম আমার এক অন্য পছন্দ যা সারা জীবন ধরে আমার সঙ্গে থেকেছে—আমার থেকে বয়সে বড় ছাত্রদের সঙ্গে গল্প করার মজা। এমনকি আজও যদি কোনও সভায় যাই, যেখানে সবাই আমার নাতি-নাতনির বয়সী, আমাকে রীতিমতো চেষ্টা করে সজাগ থাকতে হয়—যাতে তাদের থেকেও কম বয়সের অনুভূতি না হয়। দুজন বড় ছাত্রের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হল যারা আমার পরবর্তী ঐতিহাসিক জীবনের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল। একজন হুয়ান বি ফেরনান্দেস, বাররানকিয়ায় ‘এল এরালদো’ কাগজের প্রতিষ্ঠাতা-মালিকের ছেলে। এই কাগজেই আমার সাংবাদিকতার হাতে খড়ি আর সে সেখানে অ-আ শেখা থেকে শুরু করে শেষে প্রশাসন অবধি পৌঁছে যায়। অন্যজন এনরিকে স্কোপেল—কুবার একজন প্রতিথযশা আলোকচিত্রীর ছেলে, আর সে নিজে ছিল গ্রাফিক সাংবাদিক। যাই হোক, এনরিকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ কাগজের অফিসে একসঙ্গে কাজ করার জন্য ততটা নয় যতটা তার অন্য কাজ—সারা পৃথিবীতে বন্য জন্তুদের চামড়া রপ্তানি করার জন্য। আমার প্রথম দিকের বিদেশ যাত্রার সময় একবার কাইমানের৪ একটি তিন মিটার লম্বা চামড়া উপহার দিয়েছিল সে।
‘এই চামড়া বহুমূল্য,’ কোনও মেলোড্রামা ছাড়াই সে আমায় বলেছিল, ‘তবে তোকে একটা কথাই বলব, না খেতে পেয়ে মরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এটা যেন বিক্রি করিস না।’
এখনও পর্যন্ত ভাবি জ্ঞানী কিনকো স্কোপেল কীভাবে এত ভালো করে জানত যে আসলে আমাকে সে এক অনন্ত কবচকুন্ডল দিয়েছে। কেননা আমার জীবনের বহু দুর্ভিক্ষের পর্যায়ে কতবার যে সেটা বিক্রি করবার মতো অবস্থায় পৌঁছেছিলাম! কিন্তু আজও তা রক্ষিত আছে, ধুলোমাখা ও প্রায় প্রস্তরীভূত অবস্থায়। যবে থেকে ওটা ব্যাগে নিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরেছি তবে থেকে আর আমার খাওয়ার পয়সার অভাব হয়নি।
জেসুইট শিক্ষকরা ক্লাসে ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর, কিন্তু টিফিনের সময় তাঁদের মূর্তি আলাদা। যা ক্লাসের মধ্যে বলতে পারতেন না তাই তখন বলতেন এবং আসলে যা শেখাতে চাইতেন সেটাই উগরে দিতেন। সেই বয়সে আমার পক্ষে যতটুকু বোঝা সম্ভব তাই দিয়ে মনে হত যে এ দু’য়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাছাড়া এতেই আমাদের আরও বেশি সাহায্য হত। ফাদার লুইস পোসাদা, একজন প্রগতিশীল কাচাকো যুবক, যিনি অনেক বছর শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁর কাছে ছিল বিশ্বকোষের সব ধরণের বিষয়ের সংক্ষিপ্ত আকারের কার্ডের একটা ফাইল, বিশেষ করে বই ও লেখকদের সম্বন্ধে। ফাদার ইগনাশিয়ো সালদিবার ছিলেন বাস্কের পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ, যাঁর সঙ্গে মাঝে মাঝেই কার্তাহেনায় দেখা হত। তারপর তিনি সান পেদ্রো ক্লাবের কনভেন্টে চলে যান বৃদ্ধ বয়সে। কলোম্বিয়ার সাহিত্য নিয়ে ফাদার এদুয়ার্দো নুন্যিয়েসের তখনই বিরাট খ্যাতি ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর খবর আর কখনও পাইনি। সঙ্গীতশিক্ষক মানুয়েল ইদালগো খুবই বয়স্ক ছিলেন এবং কার মধ্যে সঙ্গীত-প্রতিভা আছে তা সহজে বুঝে নিতে পারতেন। যে গান গাইতে পারত সে যদি অকস্মাৎ পৌত্তলিক গানও গাইত তিনি বারণ করতেন না।
স্কুলের রেক্টর ফাদার পিয়েসচাকোনের সঙ্গে কয়েকবার আমার খুবই সাধারণ কথাবার্তা হয়েছিল। তাতে মনে হয়েছিল তিনি আমাকে বড়দের দলেই গণ্য করেন। শুধু যে বিষয় নির্বাচন দিয়ে আমার এই নিশ্চয়তা গড়ে উঠেছিল তা নয়, তার সঙ্গে ছিল সেইসব বিষয়ে তার দেওয়া সাহসী ব্যাখ্যার জন্যও। প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে স্বর্গ ও নরক নিয়ে খ্রিস্টধর্ম যে ব্যাখ্যা দিত শুধুমাত্র ভৌগলিক প্রতিবন্ধকতার জন্য তা আমি মেনে নিতে পারতাম না। ফাদার পিয়েসচাকোনই আমার জীবনের সেই ধন্দ দূর করে দেন। এইসব ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি বেশ সাহসী ব্যাখ্যা দিয়ে আমায় নিশ্চিন্ত করেছিলেন। জটিল ধর্মতত্ত্বে না গিয়ে তিনি বলেছিলেন আকাশ হচ্ছে ভগবানের প্রতিরূপ। নরক অবশ্যই তার বিপরীত। কিন্তু দুটো ক্ষেত্রে তিনি আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন তাঁর সমস্যা—‘যাই হোক না কেন নরকে আগুন আছে’—কিন্তু তার ঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ক্লাসের থেকেও বেশি টিফিনের সময় এইসব আলোচনার জন্য বছরের শেষে আমার বুক ভরে উঠেছিল বেশ কিছু মেডেলে।
টীকাঃ
১। হোসে মারিয়া বালদেব্লানকেস - গার্সিয়া মার্কেসের মাতামহ কর্নেল নিকোলাস রিকার্দো মার্কেস মেহিয়ার প্রথম বিবাহবহির্ভূত সন্তান হোসে মারিয়া বালদেব্লানকেসের সন্তান হোসে মারিয়া বালদেব্লানকেস মোরেউ।
২। আমার খ্যাপামি – মূল শব্দ ‘Bobadas mías’।
৩। গাসপার নুন্যিয়েস দে আরসের - উনবিংশ শতকে স্পেনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবি, নাট্যকার ও রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর জন্ম ৪ আগস্ট, ১৮৩২ এবং মৃত্যু ৯ জুন, ১৯০৩। বার্সেলোনার গভর্নর ছিলেন, বাইয়াদোলিদের পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন এবং সাগাস্তার লিবেরাল পার্টির মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তিনি ১৮৭৪ সালে স্পেনের রেয়াল আকাদেমিয়া এস্পান্যিয়োলার সদস্য হিসাবে মনোনীত হন।
৪। কাইমান - কুমির জাতীয় একটি প্রাণী। কলোম্বিয়ায় কাইমানের বিভিন্ন প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায় এবং আঞ্চলিক লোককথায় এর স্থান আছে।