জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ২৯

জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল

(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)

মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

পর্ব – উনত্রিশ

সেই হাসি-কান্নার দোলাচলের দিনগুলোয় কখনও কিন্তু স্কুল কামাই করিনি। কিছু না খেতে পেলেও নয়। কিন্তু বাড়ির কাজ করতে গিয়ে পড়ার সময় পেতাম না। আবার মাঝরাত পর্যন্ত যে পড়ব তার জন্য ইলেক্ট্রিসিটি খরচ করার সামর্থ্য ছিল না। যাই হোক, সে সমস্যার সমাধান একভাবে করতে পেরেছিলাম। স্কুলে যাওয়ার পথে অনেকগুলো রুটের বাসের গ্যারেজ ছিল যার একটায় আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতাম বাসের গায়ে তাদের পথ-নির্দেশ কিভাবে আঁকছে তা দেখতে দেখতে। একদিন শিল্পীকে অনুরোধ করলাম কয়েকটা অক্ষর যদি আমায় লিখতে দেন তাহলে দেখতাম আমি পারি কিনা। আমার স্বাভাবিক দক্ষতা দেখে তিনি অবাক হলেন এবং মাঝে মাঝে তাঁকে সাহায্য করতে দিতেন। তার জন্য খুচরো কিছু দিতেন আমায় আর তাতে বাড়ির বাজেট সামান্য হলেও বর্ধিত হত। আরেকটি সৌভাগ্য ছিল তিন গার্সিয়া ভাইয়ের সঙ্গে হঠাৎ বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়া। তারা ছিল মাগদালেনা নদীর এক নাবিকের ছেলে। শুধুমাত্র শিল্পের প্রতি ভালোবাসায় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়কে আরও আনন্দের করে তোলার জন্য তারা তিনজনে মিলে জনপ্রিয় গানের আসর বসাত। এই ত্রয়ী শিল্পীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘চৌপদী গার্সিয়া’ গড়ে তুলেছিলাম আর আটলান্টিক রেডিও স্টেশনে নবিশদের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। প্রথম দিন প্রচুর হাততালি সহযোগে জিতেছিলাম, কিন্তু নাম নথিভুক্ত করার সময় একটি ভুল করার জন্য পুরস্কারের পাঁচ পেসো আমাদের দেয়নি। বছরের শেষ অবধি একসঙ্গে মহড়া দিয়েছিলাম, মাঝে মাঝে পারিবারিক অনুষ্ঠানে গানও গাইতাম, তবে ততদিন পর্যন্তই যতদিন না জীবন আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দিল।

        যে ধৈর্য্য সহকারে বাবা দারিদ্র্যের সঙ্গে বোঝাপড়া করতেন তাকে কখনও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার নঞর্থক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দেখিনি। বরং মনে হয় যে এসবই ছিল তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যেকার অব্যর্থ সম্পর্কের মহাকাব্যিক পরীক্ষা যা ধ্বংসের চূড়ায় পৌঁছেও তাঁদের অন্তর্গত শক্তিকে বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। বাবা জানতেন যে হতাশার চেয়েও মা আতঙ্ককে অধিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন আর এটাই ছিল আমাদের টিকে থাকার রহস্য। তবে সম্ভবত বাবা যেটা ভাবেননি তা হল তাঁর দুঃখ দূর করতে গিয়ে মা তাঁর জীবনের সেরা সময়টা পেছনে ফেলে রেখে যাচ্ছেন। আমরা কোনোদিন বুঝতে পারিনি বাবার অসংখ্য যাত্রার প্রকৃত কারণ। প্রায়শই এরকম হত যে শনিবারের মাঝরাতে আমাদের ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল কাতাতুম্বোর একটি পেট্রোলিয়াম শিবিরের এক স্থানীয় এজেন্টের কাছে যেখানে রেডিয়োটেলিফোনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন বাবা। কখনও ভুলতে পারিনা কান্নায় ভেঙে পড়া মায়ের সেই কথোপকথন, যদিও যান্ত্রিক গোলো্যোগে তা দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল।

  • ‘ওঃ গাব্রিয়েল,’ মা বলছিলেন, ‘একবার দেখে যাও এতগুলো ছেলেপুলে নিয়ে কী অবস্থায় আমি আছি। খাওয়া অবধি জুটছে না আমাদের।’

কিন্তু বাবা তাঁকে দুঃসংবাদ দিলেন যে তাঁর লিভার বড় হয়েছে। এটা তাঁর মাঝে মাঝে হত, তবুও মা খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না। কেননা কখনও কখনও বাবা এই অজুহাত ব্যবহার করতেন নিজের মিথ্যা ঢাকতে।

  • ‘যখন খারাপ কিছু কর তখনই তোমার এটা হয়,’ মা মজা করে বললেন।

কথা বলার সময় মা ফোনের দিকে তাকাচ্ছিলেন যেন বাবা আছেন তার মধ্যে। কথা শেষ করে বাবাকে চুমু দিতে গিয়ে মা বিভ্রান্ত হয়ে ফোনেই চুমু খেলেন। তারপর নিজেই হেসে অস্থির। এই গল্পটা কোনোদিন মা পুরোটা বলতে পারতেন না, তার আগেই হেসে গড়িয়ে পড়তেন। যাই হোক, সেদিন সারাটা দিনই মা নিমগ্ন হয়ে রইলেন। অবশেষে খাবার টেবিলে কথাটা এমনভাবে বললেন যেন নিজের সঙ্গে নিজে বলছেন,

  • ‘গাব্রিয়েলের গলার স্বরটা যেন কেমন লাগল।’

মাকে আমরা বোঝালাম যে টেলিফোনে গলার স্বরই শুধু ভেঙে যায় না, ব্যক্তিত্বও পালটে দেয়। পরের দিন রাতে আধো ঘুমের মধ্যে বললেন, ‘যাই হোক না কেন গলার স্বরেই বুঝতে পারলাম যে খুব রোগা হয়ে গেছে।’ খারাপ সময়ে মার নাক খুব তীক্ষ্ণ হয়ে উঠত আর নিজের মনে বিড়বিড় করতেন বাবা কেমন আছেন, কী করছেন ওই ধর্মহীন, নিয়মহীন, লাগামছাড়া দেশে। তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা গেল পরের টেলিফোনে। তিনি বাবাকে প্রতিজ্ঞা করালেন যে পরের দু’ হপ্তার মধ্যে কিছু না হলে সোজা বাড়ি ফিরে আসবেন। তবে এই নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই আলতোস দে রোসারিয়ো থেকে বাবার একটি নাটকীয় টেলিগ্রাম পেলাম, যাতে শুধু একটা শব্দ লেখা আছে – অমীমাংসিত। এই শব্দের মধ্যে মা তাঁর অভূতপূর্ব ভবিষ্যৎ দর্শনের নিশ্চয়তা দেখতে পেলেন ও তাঁর আপিল-অযোগ্য রায় ঘোষণা করলেন,

  • ‘হয় তুমি সোমবারের মধ্যে ফিরে আসছো, নতুবা এখনই আমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওখানে যাচ্ছি।’

এ হল ঈশ্বর-কৃত সমাধান। মায়ের হুমকির যে কী শক্তি তা বাবা জানতেন। এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বাররানকিয়ায় ফিরে এলেন। যেভাবে তিনি বাড়ি ঢুকলেন আমরা অবাক হয়ে গেলাম। পোশাকের কোনও শ্রী নেই, গায়ের ত্বক সবুজবর্ণ, দাড়ি না কামানো। এমনকি মা ধরেই নিলেন যে তাঁর অসুখ করেছে। তবে এই ভাবটা ছিল মুহূর্তের জন্য। কেননা দু’দিন পরেই প্রকাশ করলেন তাঁর উদ্দীপনাময় পরিকল্পনা – সুক্রেতে একটি বহুমুখী ফার্মেসি খুলবেন। বাররানকিয়া থেকে জল পথে এক দিন ও এক রাতের দূরত্বে এই মনোরম ও উন্নত শহর সুক্রে। বাবা যৌবনে ওই জায়গার টেলিগ্রাফ অপারেটর ছিলেন। তাই গোধূলির আলোমাখা খাল ও সোনালি জলাভূমির মধ্যে দিয়ে যাত্রার কথা মনে করতেই তাঁর হৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠল। মনে পড়ে গেল সেই অনন্ত নৃত্যের কথাও। এক সময় ওখানে থাকার খুব চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অন্যান্য জায়গার মতো, যেমন আরাকাতাকা, তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। যদিও তাঁর চাহিদা ছিল আরও বেশি। পাঁচ বছর পরে কলা কোম্পানির তৃতীয় সঙ্কটের সময় আরেকবার এ কথাটা ভেবেছিলেন, কিন্তু তখন সে জায়গা অধিকার করে নিয়েছিল মাগাঙ্গের হোলসেলাররা। বাররানকিয়া ফিরে আসার এক মাস আগে হঠাৎই সেই হোলসেলারদের এক জনের সঙ্গে দেখা হয়। সে সুক্রের যে ছবি আঁকে তা আগের থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত, এমনকি সেখানে তাঁকে ভালো ধার দেওয়ার কথাও বলে। সেটা তিনি গ্রহণ করেননি, কারণ তখন আলতোস দে রোসারিয়োর সোনালি স্বপ্নটা প্রায় হাতে চলে এসেছিল। কিন্তু তখনই স্ত্রীর নির্দেশ আসায় মাগাঙ্গের সেই লোকটাকে খুঁজে বের করেন, সে তখনও নদীতীরের সেই শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এবং দুজনের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়ে যায়।

দু’ সপ্তাহ ধরে হোলসেলার বন্ধুদের কাছ থেকে সব কিছু জেনে ও জিনিষপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাবা তাঁর চেহারা ও প্রতিভা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে বেরিয়ে পড়লেন সুক্রের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে তাঁর এত ভালো লাগল যে প্রথম চিঠিতে লিখলেন, ‘বাস্তব স্মৃতির চেয়ে অধিকতর সুন্দর।’ শহরের প্রধান প্লাজায় বারান্দা দেওয়া একটা বাড়ি ভাড়া করলেন এবং পুরনো মানুষজন যাঁরা তাঁকে উদার মনে গ্রহণ করলেন তাঁদের সঙ্গে ফিরে বন্ধুত্ব স্থাপন করলেন। এদিকে আমরা যা পারলাম বিক্রি করে, বাকিটা, যদিও যৎসামান্য, তাই বেঁধে সঙ্গে নিয়ে মাগদালেনা নদী দিয়ে চলাচল করা একটা বাষ্পীয় পোতে যাত্রা করলাম। আগের চিঠিতেই আমাদের তখন যা প্রয়োজন তা ভালোভাবে হিসাব করে বাবা টাকা পাঠালেন আর পথে যেতে যা লাগবে সেটাও পরে দেবেন বলেছিলেন। আমার মায়ের মতো কল্পনাপ্রবণ মানুষের কাছে এর থেকে ভালো কোনও খবরের কথা আমি অন্তত ভাবতে পারিনা। ফলত ভীষণ ভালো করে ভেবে তবেই চিঠির উত্তর দিলেন যাতে স্বামীকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করা যায় এবং তারই সঙ্গে জানালেন একটি শুভ সংবাদ, তিনি অষ্টম বারের জন্য গর্ভবতী হয়েছেন।

আমি ফর্ম ভরে বিখ্যাত জাহাজ ‘কাপিতান দে কারো’-র টিকিট কাটলাম। এই জাহাজ এক রাত ও আধ বেলায় বাররানকিয়া থেকে মাগাঙ্গে পৌঁছে যায়। তারপর গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আমাদের মোটর লঞ্চে করে যেতে হবে সান হোর্হে নদী ও অপূর্ব মোহানা খাল দিয়ে।

  • ‘যত তাড়াতাড়ি এখান থেকে যাওয়া যায় ততই ভালো, এমনকি নরকে যেতে হলেও,’ মা বললেন। কারণ তিনি কখনোই সুক্রের যে ব্যাবিলনীয় খ্যাতি তাতে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর মতে, ‘ওরকম একটা জায়গায় স্বামীকে একা রাখা একেবারেই অনুচিত।’

তিনি আমাদেরকে এত তাড়া দিতে লাগলেন যে যাওয়ার তিনদিন আগে থেকে আমরা মাটিতে শুচ্ছিলাম, কেননা খাটসহ সমস্ত আসবাব বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। বাকি সব কিছু ছিল বাক্সের ভিতরে আর যাওয়ার জন্য রেখে দেওয়া টাকাটা ছিল মায়ের কোনও এক গুপ্ত স্থানে। সেই টাকা তিনি ভালো করে গুনে রেখেছিলেন। তা সত্ত্বেও হাজারবার গুনতেন।

জাহাজের যে কর্মচারিটির সঙ্গে কথা বলেছিলাম তাকে দেখতে এত সুন্দর ছিল যে তার সঙ্গে ভালো ব্যবহারের জন্য আমাকে দেঁতো হাসি হাসতে হয়নি। ক্যারিবীয়ার লোকেদের মতো সে স্পষ্ট ও যথাযথভাবে টিকিটের ভাড়া নিয়ে আমাকে যা বলেছিল তার আদ্যপান্ত আমি খুঁটিয়ে দেখেছিলাম বলে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম। তবে যেটায় আমি সবচেয়ে খুশি হয়েছিলাম আর তাই ভুলেও যাইনি সেটা হল বারো বছরের নিচের বাচ্চাদের অর্ধেক ভাড়া দিতে হবে। তার মানে আমি বাদে সব ভাই-বোনেদের জন্য অর্ধেক টাকা। সেই অনুযায়ী হিসেব করে যাত্রার টাকাটা সরিয়ে রেখে বাকি সব টাকা, মায় শেষ সেন্তাবো পর্যন্ত মা খরচ করে ফেললেন বাড়ি গোটাতে।

শুক্রবারে আমি গেলাম টিকিট কাটতে আর সেই কর্মচারিটি আমায় অবাক করে দিয়ে বলল যে বারো বছরের নিচের বাচ্চাদের জন্য অর্ধেক নয়, টিকিটের দামের তিরিশ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে। এর ফলে যে বাড়তি টাকা লাগবে সেটা দেওয়া আর আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সে দাবি করল যে এটা আমার ভুল আর যে নোটিশে এটা ছাপার অক্ষরে লেখা আছে সেটা সে আমার চোখের সামনে মেলে ধরল। বাড়ি ফিরলাম বিদ্ধস্থ হয়ে। কিন্তু মা কিছু বললেন না। তিনি তাঁর বাবার মৃত্যুতে যে শোকের পোশাক ব্যবহার করছেন সেটা পরে আমার সঙ্গে জাহাজের কোম্পানিতে গেলেন। তিনি বিষটা পরিষ্কার করে নিতে চাইলেনঃ একজন ভুল করেছে আর সে হতে পারে তাঁর নিজের ছেলে, কিন্তু সেটা ব্যাপার নয়। মূল বিষয়টা হল আমাদের কাছে আর টাকা নেই। কোম্পানির লোক তাঁকে বুঝিয়ে বলল যে তাদেরও কিছু করার নেই।

  • ‘আপনি একটু বোঝার চেষ্টা করুন’, মাকে বলল, ‘কেউ একজন আপনাকে সাহায্য করতে চাইছে বা চাইছে না, ব্যাপারটা এরকম নয়, এটা একটি নামকরা কোম্পানির আইন, চাইলেই তা হাওয়া মোরগের মতো দিক পাল্টাতে পারে না।’
  • ‘ঠিক আছে, কিন্তু এরা যে বাচ্চা’, আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে উদাহরণ দিয়ে মা বললেন, ‘চিন্তা করুন, এই হচ্ছে সবচেয়ে বড়, সে-ই সবে বারোয় পড়েছে।’ তারপর হাত দিয়ে উচ্চতা দেখিয়ে বললেন,
  • ‘ওরা এই এতটুকুন, সব ছোট ছোট।’

লম্বা না বেঁটে সেটা ব্যাপার নয়, লোকটা বলল, এটা বয়সের ব্যাপার। শুধুমাত্র সদ্যজাত বাচ্চা ছাড়া সবাইকেই ভাড়া দিয়ে যেতে হবে। মা তখন উচ্চ পদাধিকারী কারুর সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন,

  • ‘কার সঙ্গে কথা বলে এটা ঠিক করতে পারি?’

লোকটা এ কথার কোনও উত্তর দেওয়ার আগেই এই ঝামেলার মধ্যে বেশ বয়স্ক, পূর্ণ গর্ভাবস্থার মতো ভুঁড়ি নিয়ে ম্যানেজার দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে দেখেই এই লোকটা উঠে দাঁড়ালো। ম্যানেজারের চেহারা বিশালাকায়, বেশ শ্রদ্ধা জাগানোর মতো হাবভাব। হাফ হাতা জামা পরলে ও প্রচুর ঘেমে গেলেও দেখেই মনে হচ্ছে তাঁর অনেক ক্ষমতা। তিনি মন দিয়ে মায়ের কথা শুনলেন এবং খুব শান্ত গলায় মাকে বললেন যে শুধুমাত্র অংশীদারদের মিটিংয়ে এই ধরণের নিয়ম-কানুনের বদল সম্ভব হয়।

  • ‘বিশ্বাস করুন, আমি সত্যিই দুঃখিত,’ বলে তিনি শেষ করলেন।

মা ক্ষমতার আঁচ পেলেন ও নিজের যুক্তিকে আরও ক্ষুরধার করে তুললেন।

  • ‘আপনি ঠিকই বলছেন,’ মা বললেন, ‘কিন্তু আপনার ওই কর্মচারী আমার ছেলেকে সবটা ঠিক করে বলেনি, অথবা আমার ছেলেই বুঝতে ভুল বুঝেছে এবং আমি সেই ভুলের উপরেই হিসাব করেছি। এখন আমাদের সব বাঁধাছাদা হয়ে গেছে, যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত। আমরা কদিন ধরে মাটিতে শুচ্ছি আর যা টাকা আছে তাতে আজকের বাজারটুকুই হবে মাত্র। তাছাড়া সোমবারেই নতুন ভাড়াটিয়াকে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে।’ মা বুঝতে পারছিলেন সেই হলঘরে থাকা সমস্ত কর্মী আগ্রহের সঙ্গে তাঁর কথা শুনছে। তাই এবার তাদের উদ্দেশ্যে মা বললেন, ‘এই রকম একটা নামী কোম্পানির কাছে এই ব্যাপারটার কী কোনও মূল্য নেই?’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই ম্যানেজারের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করলেন,
  • ‘আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?

ম্যানেজার ধন্দে পড়ে গেলেন। গোটা অফিস উদ্বেগের সঙ্গে নিশ্চুপ। দীর্ঘ নিস্তব্ধতা। তারপর মা তাঁর চেয়ারে গুছিয়ে বসলেন। কাঁপতে থাকা হাঁটুদুটো এক জায়গায় জড়ো করলেন। হাত ব্যাগটা কোলের উপর নিয়ে দু’ হাত দিয়ে ধরে বড় কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে ঠিক যে দৃঢ়তা নিয়ে কথা বলেন তেমনভাবেই বললেন,

  • ‘বেশ, যতক্ষণ না কোনও সমাধান হচ্ছে আমি এখান থেকে নড়ব না।’

ম্যানেজার বেজায় ঘাবড়ে গেলেন আর সব কর্মীরা তাদের কাজ ফেলে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মা নির্বিকার, নাক হয়ে উঠেছে তীক্ষ্ণ, ঘামে গায়ের বিবর্ণ ত্বক মুক্তোর মত শুভ্র লাগছে। এর আগেই তিনি বাবার মৃত্যুর জন্য শোকের পোশাক খুলে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেদিন পরেছিলেন কেননা তাঁর মনে হয়েছিল সেই কঠিন কাজের জন্য ওই পোশাকটাই উপযুক্ত। ম্যানেজার আর মায়ের দিকে তাকাচ্ছেন না, বরং কী করবেন বুঝতে না পেরে আর সব কর্মচারীর দিকে দেখছেন। তারপর সবার উদ্দেশ্য মন্তব্য করলেন,

  • ‘এ তো নজিরবিহীন!’

মায়ের চোখের পলক পড়ল না। শুধু আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার গলার কাছে কান্না ঠেলে উঠছিল। তবুও চেপে রেখেছিলাম, নাহলে সব পন্ড হয়ে যেত।’ তারপর ম্যানেজার ওই কর্মীকে বললেন সব কাগজপত্র তাঁর অফিসে নিয়ে আসতে। সে তাই করল আর পাঁচ মিনিট পরেই প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়ে ম্যানেজার বেরিয়ে এলেন, কিন্তু যাত্রার সব টিকিট কাটা হয়ে গেছে।’

পরের সপ্তাহে সুক্রে পৌঁছে গেলাম। মনে হল যেন এখানেই আমরা জন্মেছি। সেই সময়ে দেশের অন্যান্য বহু শহরের মতো এই শহরের জনসংখ্যা হবে প্রায় ষোল হাজার। বাসিন্দারা সকলেই একে অপরকে যত না নামে চেনে তার চেয়ে বেশি জানে তাদের জীবনের গোপন কথা। শুধু শহরই নয়, গোটা এলাকাটাই যেন অচঞ্চল জলের এক সমুদ্র। স্থান, কাল ও আমাদের মন-মর্জি অনুযায়ী এই জল তাকে আচ্ছাদিত করে রাখা ফুলের বাগিচার রঙের সঙ্গে রঙ বদলায়। এই শহরের সৌন্দর্য্য মনে করিয়ে দেয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্বপ্নিল স্থির জলাভূমির কথা। বহু বছর ধরে ওখানে থাকার সময় একটাও মোটরগাড়ি এলাকায় ছিল না। মোটরগাড়ি ব্যাপারটাই সেখানে চলত না। কেননা সোজা রেখার মতো সমভূমির রাস্তাগুলো যেন খালি পায়ে চলার জন্যই সৃষ্ট। এমনকি অনেক বাড়িতেই রান্নাঘরের লাগোয়া ব্যক্তিগত ঘাট থাকত জিনিষপত্র আনা-নেওয়ার জন্য।

আমার প্রথম যে অনুভূতি হল তা অকল্পনীয় স্বাধীনতা। আমারা সব বাচ্চারা যা কিছু পেতাম না বা যা কিছু চাইতাম তা আমাদের হাতের নাগালে পেয়ে গেলাম। প্রত্যেকে খিদে পেলেই খেয়ে নিত আর ঘুম পেলেই ঘুমতো, তা সে দিনের যে সময়েই হোক না কেন। কাউকে নিয়েই চিন্তা করার কিছু ছিল না, কারণ নিয়ম-কানুনের কাঠিন্য থাকলেও বড়রা নিজস্ব কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতেন যে নিজেদের নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করার মতোই সময় কুলোত না। নিরাপত্তার একটি মাত্র শর্ত ছিল বাচ্চাদের জন্য আর তা হল হাঁটতে শেখার আগে সাঁতার শিখে নেওয়া। কারণ একটি ঘোলা জলের খাল দিয়ে শহরটা দু’ ভাগে বিভক্ত ছিল আর খালটা একই সঙ্গে জলাধার ও নর্দমার কাজ করত। এক বছর বয়স হলেই বাচ্চাদের রান্নাঘরের ব্যালকনি থেকে জলে ছুঁড়ে দেওয়া হত – প্রথমে লাইফ-জ্যাকেট সহ যাতে জলের ভয় দূর হয়ে যায় আর পরে লাইফ-জ্যাকেট ছাড়া যাতে মৃত্যুভয় চলে যায়। কয়েক বছর পরে আমার ভাই হাইমে ও বোন লিহিয়া প্রাথমিক ঝুঁকি কাটিয়ে উঠে ছোটদের সাঁতার প্রতিযোগিতায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল।

সুক্রে যে আমার কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে তার কারণ আমরা বাচ্চারা স্বাধীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে পারতাম। দু’-তিন সপ্তাহের মধ্যেই জেনে গেলাম কোন বাড়িতে কে বাস করে। তাঁদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করতাম যেন কতদিনের চেনা-জানা। বহু ব্যবহারে সহজসাধ্য হওয়া সামাজিক রীতি-নীতি ছিল সামন্ততন্ত্রের কাঠামোয় আধুনিকতার প্রলেপঃ যারা ধনী – পশুপালক বা চিনি কলের মালিক – বাস করে প্রধান প্লাজায় আর গরীবরা যে যেখানে পারেন সেখানে। এই বিশাল জলের রাজত্বকে পরিচালনা করত যে মিশন তার অধীন ছিল শহরের ধর্মীয় প্রশাসন। সুক্রের প্রধান প্লাজায় অবস্থিত প্যারিশ গীর্জাটি ছিল ওই জগতের কেন্দ্রবিন্দু। এই গীর্জাটি কোলোন ক্যাথিড্রালের ছোট সংস্করণ, একজন স্পেনীয় ধর্মযাজক বনাম স্থপতির স্মৃতির অনুকরণ-জাত। এদের ক্ষমতা ছিল আশু ও চূড়ান্ত। প্রতিদিন সন্ধ্যেয় প্রার্থণার পর চার্চের চূড়া থেকে ঘন্টা বাজানো হত। ক্যাথলিক অফিসের সিনেমার ক্যাটালগ অনুযায়ী যে চলচ্চিত্র কাছের সিনেমা হলে দেখানো হবে তার নৈতিক চরিত্র অনুসারে ঘন্টাটি বাজত। যে ধর্মপ্রচারকের যেদিন দায়িত্ব থাকত সেদিন সে তার অফিসের দরজায় বসে রাস্তা পেরিয়ে যারা সিনেমা হলে ঢুকছে তাদের লক্ষ্য রাখত যাতে যাদের দেখার কথা নয় তারা ঢুকতে না পারে।

আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ ছিল এই বয়সে সুক্রেতে এসেছিলাম বলে। সৌভাগ্যের তের বছরে পড়তে তখনও তিন মাস বাকি। বাড়িতে আমাকে না ছোট বলে গণ্য করা হত না বড়দের দলে। আর বয়সের সেই ত্রিশঙ্কু অবস্থার ফলে ভাই-বোনেদের মধ্যে আমিই একমাত্র যে সাঁতার শিখতে পারিনি। খাবার টেবিলে আমায় কোথায় বসাবে তা তারা বুঝতে পারত না, ছোটদের দলে না বড়দের সঙ্গে। কাজের মহিলারা আর আমার সামনে জামা-কাপড় ছাড়তেন না। আলো নেভানো অবস্থাতেও না। তবে ওদের মধ্যে একজন সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বহুবার আমার বিছানায় শুয়েছেন, কিন্তু আমার ঘুমের কোনও অসুবিধা হয়নি। তবে সুক্রের সেই স্বাধীন জীবনে সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত হওয়ার আগেই পরের বছর জানুয়ারি মাসে আমাকে বাররানকিয়ায় ফিরে যেতে হল। কেননা কাসালিনাস স্যারের স্কুলের মতো অত ভালো সেকেন্ডারি স্কুল সুক্রেতে ছিল না।

অনেক তর্ক-বিতর্ক ও আলাপ-আলোচনার পর, যেখানে আমার অংশগ্রহণ খুবই নগণ্য, বাবা-মা স্থির করলেন বাররানকিয়ার সান হোসে দে লা কোম্পান্যিয়া দে হেসুস স্কুলে আমাকে ভর্তি করবেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে কোথা থেকে এত টাকা জোগার করলেন তার কিছুই আমি জানতে পারলাম না। অথচ ফার্মেসি ও হোমিয়োপ্যাথিক ডাক্তারখানা তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। অবশ্য আমার মা সব সময়ে যে যুক্তি দেন তার জন্য প্রমাণের কোনও প্রয়োজন নেইঃ ‘ঈশ্বর সর্ব শক্তিমান।’ সুক্রেতে পরিবারের যাওয়া ও সেখানকার খরচ চালানোর কথা না হয় আগে থেকেই ভাবা ছিল, কিন্তু আমার স্কুলে ভর্তি তো সেই ভাবনার মধ্যে ছিল না। তখন আমার একটা ছেঁড়া জুতো আর দুটো জামা (একটা পরে অন্যটা কেচে দেওয়ার জন্য) ছাড়া আর কিছুই ছিল না। অথচ মা এক বেঢপ বাক্স ভর্তি নতুন জামা কিনে দিলেন একথা না ভেবেই যে ছ’মাসের মধ্যে আমি লম্বা হয়ে যাব। আবার মা-ই ঠিক করে দিলেন যে আমি ফুল প্যান্ট পরা শুরু করব। যদিও সামাজিক রীতি অনুসারে গলার স্বর বদল না হওয়া পর্যন্ত হাফ প্যান্ট পরার চল ছিল আর বাবা সেটাই মেনে চলতেন।

সত্যি বলতে কি আমাদের পড়াশুনো নিয়ে আলোচনা হলেই আমি আশা করতাম যে বাবা তাঁর মহাকাব্যিক রাগের বশে ডিক্রি জারি করে দেবেন যে আমাদের কাউকে আর স্কুলে যেতে হবে না। এটা যে অসম্ভব ছিল তা নয়। তিনি নিজেই ছিলেন স্ব-শিক্ষিত, তবে তা অত্যন্ত দারিদ্র্যের জন্য। তাছাড়া তাঁর বাবা আবার সপ্তম ফেরনান্দোর নৈতিকতায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন।  সপ্তম ফেরনান্দো ঘোষণা করেছিলেন যে প্রতিটি মানুষের শিক্ষা হওয়া উচিত বাড়িতে থেকে যাতে পারিবারিক অখন্ডতা বজায় থাকে। সেকেন্ডারি স্কুলকে আমি কারাগারের মতো ভয় পেতাম। ঘন্টার নিয়মের মধ্যে নিজেকে সঁপে দিতে হবে ভেবেই আমি ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। আবার তের বছর বয়স থেকে স্বাধীন জীবন আস্বাদনের জন্য এটাই ছিল একমাত্র সুযোগ। পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকার সুযোগ থাকবে, কিন্তু তাঁদের নির্দেশ থেকে, তাঁদের বসবাসের প্রেরণা থেকে, তাদের কষ্টের দিনগুলো থেকে অনেক দূরে আর পাশাপাশি থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আলো জ্বালা যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত দম বন্ধ করে একনাগাড়ে পড়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ।

সান হোসে স্কুল ছিল ক্যারিবীয়ার সবচেয়ে দামী স্কুল। এর চাহিদাও প্রচুর। তবে এই স্কুলের বিরুদ্ধে আমার এক মাত্র যুক্তি ছিল ওখানকার প্রায় সামরিক বাহিনীর মতো শৃঙ্খলা নিয়ে। কিন্তু মা আমাকে থামিয়ে দিল তাঁর ভবিষ্যৎবাণী দিয়েঃ ‘ওখান থেকে গভর্ণর হয়ে বেরোয়।’ ফলে পিছিয়ে আসার আর কোনও অবসর নেই দেখে বাবাও হাত ধুয়ে ফেললেন,

  • ‘মনে রেখো, আমি হ্যাঁ-ও বলিনি, না-ও বলিনি।’

তিনি হয়তো আমেরিকানো স্কুল পছন্দ করতেন যাতে ইংরাজি শিখতে পারি। কিন্তু মা তা খারিজ করে দিলেন বাজে যুক্তি দিয়ে যে ওখানে লুথেরানদের আড্ডা। আজ বাবার ইচ্ছাকেই আমি বেশি গুরুত্ব দিই, কেননা লেখক জীবনে আমার অন্যতম সমস্যা হচ্ছে ইংরাজি বলতে না পারা।

টীকা

১। কাতাতুম্বো – উত্তর কলোম্বিয়ার একটি নদী ও তৎসংলগ্ন এলাকা।

২। আলতোস দে রোসারিয়ো – কলোম্বিয়ার উত্তর দিকে বোলিবার রাজ্যের অন্তর্গত একটি শহর।

৩। মাগাঙ্গে – বোলিবার রাজ্যেরই আরেকটি শহর, মাগদালেনা নদীর তীরে এর অবস্থান।

৪। সপ্তম ফেরনান্দো – উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে স্পেনের রাজা।

৫। লুথেরান – প্রোটেস্টান খ্রীস্টানদের সদস্য এবং বিখ্যাত জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ মার্টিন লুথারের অনুসারী।