সাহিত্যে বাস্তবতা প্রসঙ্গে কার্ল মার্ক্স
- 07 November, 2026
- লেখক: অন্যস্বর আর্কাইভ
সাহিত্যে বাস্তবতা
কার্ল মার্ক্স
[ক] উপন্যাসে বাস্তবতা
মিঃ ভিজেটেলি-র মারফৎ আমাকে আপনার 'নগর বালিকা' (City Girl) পাঠাবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। অত্যন্ত আনন্দ ও আগ্রহ নিয়ে আমি বইটি পড়ে ফেলেছি।..... বাস্তববাদী সত্যতা ছাড়াও আপনার কাহিনীর আর যা আমার মনে সবচেয়ে বেশি রেখাপাত করেছে তা হচ্ছে এই যে, এতে প্রকাশ পেয়েছে যথার্থ শিল্পীর সাহসিকতা। কেবল 'স্যালভেশন আমি'-কে যে-ভাবে আপনি উপস্থাপিত করেছেন, তাতেই নয়, আত্মসন্তুষ্ট ফিলিস্তিনদের ধারণা আপনি যেমন শাণিত ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাতেও; আপনার কাহিনীটি থেকে সম্ভবত এই প্রথম তাঁদের শিক্ষা হবে কেন 'স্যালভেশন আর্মি' ব্যাপক জনগণের মধ্যে এত সমর্থন ভোগ করে। কিন্তু সর্বোপরি, আপনার সাহসিকতা প্রকাশ পেয়েছে যেমন অনলংকৃত রূপে আপনি উপস্থিত করেছেন গোটা বইখানার মৌল ভিত্তিটিকে-বুর্জোয়া শ্রেণীর একজন লোকের দ্বারা সর্বহারা শ্রেণীর একজন বালিকাকে ফুসলানোর সেই পুরনো, অতি পুরনো গল্প। একজন মাঝারি মাপের লেখক চেষ্টা করতেন 'প্লট'-টির মামুলি চরিত্রকে ও অলংকরণের বাহুল্যের কৃত্রিম বর্ণনা বিস্তার আড়ালে প্রচ্ছন্ন রাখতে। অবশ্য তাঁর মতলব ধরা পড়ে যেত। কিন্তু আপনি অনুভব করেছিলেন যে, একটি পুরনো কাহিনীকেও আপনি বলতে পারেন, কেননা আপনার ক্ষমতা ছিল উপস্থাপনার সত্যনিষ্ঠায় সেটিকে নোতুন করে তুলবার। আপনার মিঃ গ্র্যান্ট একটি অনবদ্য সৃষ্টি।
যদি আমাকে কোনও সমালোচনাই করতে হয় তা হলে কেবল বলব যে, কাহিনীটা ঠিক যথেষ্ট বাস্তববাদী নয়। আমার মতে, বাস্তবতা বলতে বোঝায়, খুঁটিনাটি ব্যাপারে সত্যতা ছাড়াও, নিদর্শন-মূলক (typical) অবস্থায় নিদর্শন-মূলক চরিত্রের সত্যনিষ্ঠ পুনরুৎপাদন। এখন আপনার চরিত্রগুলি যথেষ্ট নিদর্শনমূলক যতটা অবধি আপনি সেগুলিকে প্রতিরূপায়িত করেছেন। কিন্তু যে অবস্থাগুলি তাদের ঘিরে আছে, যা থেকে তাদের উদ্ভব ঘটেছে, সেগুলি সম্পর্কে এ কথা বলা চলে না। 'নগর-বালিকা'-য় শ্রমিক শ্রেণী দেখা দিয়েছে একটি নিষ্ক্রিয় জনতা হিসাবে যা নিজেকে সাহায্য করতে, এমনকি সাহায্যের চেষ্টা পর্যন্ত করতে অক্ষম। তাকে এই শোচনীয় দারিদ্র্য থেকে টেনে তুলবার সমস্ত চেষ্টা আসে বাইরে থেকে, উপর থেকে। ১৮০০ কি ১৮১০ সালে সেন্ট সাইমন এবং রবার্ট ওয়েন-এর সময়ে এটা হয়ত ছিল একটা সঠিক বর্ণনা, কিন্তু যে-ব্যক্তি বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবৎ সংগ্রামী সর্বহারা শ্রেণীর অধিকাংশ সংগ্রামে অংশ গ্রহণের সম্মান লাভ করেছে এবং সর্বদাই পরিচালিত হয়েছে এই নীতির দ্বারা যে, শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তিসাধন হতে হবে শ্রমিক শ্রেণীর নিজেরই সাধনা, তিনি এই ১৮৮৭ সালে এই বর্ণনাকে সঠিক বলে গ্রহণ করতে পারেন না। যে নিপীড়ন তাদের বেষ্টন করে আছে তার প্রতি শ্রমিক শ্রেণীর সদস্যদের বৈপ্লবিক সক্রিয়তা, মানুষ হিসাবে নিজেদের অধিকার অর্জনের জন্য তাদের বিবিধ আলোড়ন সমূহ-অর্থচেতন ও সচেতন - আজ ইতিহাসের অঙ্গীভূত, অতএব দাবি করতে পারে বাস্তবতার রাজ্যে নিজস্ব একটা স্থান।
আপনি একখানা বিশুদ্ধ সমাজতান্ত্রিক উপন্যাস লেখেননি বলে, গ্রন্থকারের নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক মতামতকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে আমরা জার্মানরা যাকে বলি Tenden-Zroman-তা রচনা করেননি বলে, আপনার দোষ ধরা থেকে আমি কিন্তু অনেক দূরে। আমার বক্তব্য আদৌ সেরকম নয়: রচনা-কর্তার মতামত যত বেশি প্রচ্ছন্ন থাকে, শিল্পকৃতির পক্ষে ততই ভালো। আমি যে বাস্তবতার কথা বলছি তা এমনকি রচনা-কর্তার মতামত সত্ত্বেও, বেরিয়ে আসতে পারে। একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক।
বালজাক, যাঁকে আমি মান্য করি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের সমস্ত জোলা-র চেয়ে বাস্তবতাবাদের ঢের মহত্তর প্রবক্তা বলে, তিনি তাঁর Comedie Hnmaine-এ আমাদের দিয়েছেন ফরাসী সমাজের এক অতি আশ্চর্যজনক বাস্তববাদী ইতিহাস, যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন, কালানুক্রম অনুসারে, ১৮১৬ থেকে ১৮৪৮ অবধি প্রায় বৎসরের পর বৎসর ধরে অভিজাতবর্গের সমাজের উপরে বুর্জোয়া শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান চাপ -যে সমাজ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিল ১৮১৫ সালের পরে, এবং যত দূর তা পেরেছিল, আবার তুলে ধরেছিল পুরনো ফরাসী আদবকায়দার মান। তিনি সেখানে বর্ণনা করেছেন কেমন করে এই আদর্শ (তাঁর কাছে) সমাজের অবশেষগুলি ক্রমে ক্রমে লুপ্ত হয়ে গেল ইতর, টাকাওলা হঠাৎ-বড়লোকের প্রাদুর্ভাবের ফলে কিংবা হলো তার দ্বারা দুর্নীতি দুষ্ট। কেমন করে grand dame, যার দাম্পত্য-অবিশ্বস্ততা ছিল কেবল তার আত্ম-প্রতিষ্ঠার একটা ধরন-যে ভাবে তাকে বিয়ে দেওয়া হতো তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে আত্মসমর্পণ করত বুর্জোয়া শ্রেণীর কাছে, যে-শ্রেণী তার স্বামীকে কিনে নিতো 'ক্যাশ' (নগদ টাকা) বা 'কাশ্মিরি' দিয়ে। আর এই কেন্দ্রীয় চিত্রটিকে ঘিরে তিনি বিন্যস্ত করেছেন ফরাসী সমাজের একটি সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত, যা থেকে এমনকি অর্থনীতির বিস্তারিত ক্ষেত্রেও (যেমন, ফরাসী বিপ্লবের পরে অস্থাবর ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির পুনর্বণ্টন) আমি যা শিখেছি তা সে কালের সমস্ত পেশাদার ঐতিহাসিক, অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যান-বিদদের কাছ থেকে মোট যা শিখেছি-তার চেয়েও বেশি।
আচ্ছা, বালজাক ছিলেন রাজতন্ত্রের সমর্থক; তাঁর মহান গ্রন্থটি হচ্ছে পুরনো মঙ্গলময় সমাজের অপ্রতিবিধেয় অবক্ষয়ের একটি নিরবচ্ছিন্ন অন্ত্যেষ্ঠি সঙ্গীত; তাঁর সহানুভূতি হচ্ছে সেই শ্রেণীর প্রতি, যার অবসান অবধারিত। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, যখন তিনি বর্ণনা করেন ঠিক সেই সব নর-নারীকেই, অভিজাতবর্গকেই, যাদের প্রতি তিনি গভীর সহানুভূতি সম্পন্ন, তখনকার চেয়ে আর কখনও তাঁর ব্যঙ্গ হয়না এত তীক্ষ্ণ, তাঁর শ্লেষ এত তীব্র। আর কেবল যে-মানুষগুলি সম্পর্কে তিনি বলেন অপ্রচ্ছন্ন প্রশংসা সহকারে, তাঁরা হলেন তাঁর তিক্ততম রাজনৈতিক শত্রু-Cloitre Saint Mery- প্রজাতন্ত্রি বীরেরা, যে ব্যক্তিরা তখন (১৮৩০-৩৬) সত্যি সত্যিই ছিলেন জনগণের প্রতিনিধি।
বালজাক যে এই ভাবে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর শ্রেণীগত সহানুভূতি ও রাজনৈতিক সংস্কারের বিরুদ্ধে যেতে, তিনি যে দেখতে পেয়েছিলেন তাঁর প্রীতিভাজন অভিজাতবর্গের পতনের আবশ্যিকতা এবং তাদের বর্ণনা করেছিলেন এমন লোক হিসাবে যারা এর চেয়ে ভালো কোনও ভবিতব্যের উপযুক্ত নয়; তিনি যে দেখতে পেয়েছিলেন ভবিষ্যতের আসল মানুষদের যখন, তৎকালীন সময়ের জন্য, কেবলমাত্র তাদেরই দেখা যাবে-একেই আমি বিবেচনা করি বালজাকের বাস্তবতার মহত্তম বিজয়সমূহের মধ্যে অন্যতম, এবং বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে অন্যতম বলে।
আপনার সমর্থনে আমি অবশ্যই স্বীকার করব যে, সভ্য জগতের আর কোথাও শ্রমিক জনগণ এত কম সক্রিয়-প্রতিরোধী, এত বেশি অদৃষ্টের কাছে নিষ্ক্রিয় বশ্যতাকারী নয়, যেমন তারা লণ্ডনের ইস্ট এণ্ড-এ। এবং আমি কেমন করে জানব শ্রমিক শ্রেণীর জীবনের সক্রিয় দিকটি আরেকটি বইয়ের জন্য তুলে রেখে এই বইখানাতে কেবল তার নিষ্ক্রিয় মহত্তম দিকটির ছবি আঁকা নিয়েই তুষ্ট থাকার মত যুক্তি আপনার আছে কিনা?* (F. Engels, Letter to Margaret Harkness, April, 1888. Original in Marx. Engels. Lenin Institute, Moscow.)
[খ] সাহিত্য উদ্দেশ্যপরতা এবং ব্যক্তি-চরিত্র
আপনার 'পুরনো এবং নতুন' (Old and New) আমি পড়েছি। বইখানার জন্য আপনাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। যেমন 'স্টেফান'-এ কৃষকদের জীবন বর্ণনা কবার বেলায় তেমন এখানে লবণ-খনির শ্রমিকদের জীবন বর্ণনার বেলাতেও আপনি দেখিয়েছেন সমান মুন্সিয়ানা! ভিয়েনিজ 'সমাজের' দৃশ্যগুলির বেশির ভাগই খুব সুন্দর। বাস্তবিক পক্ষে ভিয়েনাই হচ্ছে একমাত্র জার্মান নগরী যেখানে কোনও সমাজ আছে। বার্লিনে আছে কেবল 'কয়েকটি নির্দিষ্ট চক্র', তার চেয়েও বেশি আছে অনির্দিষ্ট চক্র, এবং এই কারণেই সেখানে মেলে কেবল সাহিত্যিক চক্র, আমলা বা অভিনেতাদের জীবন নিয়ে উপন্যাস রচনার ক্ষেত্র।
আপনার উপন্যাসের এই অংশে ঘটনাক্রমের নিহিত প্রেরণ একটু বেশি ত্বরিত গতিতে বিকাশ লাভ করেছে কিনা, তা বিচার করা আমার চেয়ে আপনার পক্ষেই বেশি সহজ। আমাদের মতো একজনের মনে যা এমন একটা ধারণা সৃষ্টি করে, তার অনেকটাই হয়ত ভিয়েনায় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, যার আছে নিজস্ব একটা বিশেষ আন্ত-র্জাতিক চরিত্র-দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপের বিবিধ উপাদান নিয়ে গঠিত। উভয় সামাজিক পরিবেশেই চরিত্রগুলিকে আপনি এঁকেছেন আপনার ব্যক্তিকীকরণের স্বভাব-সুলভ পারদর্শিতা সহকারে। প্রত্যেক ব্যক্তিই এক-একটা প্রতিভূ-চরিত্র কিন্তু একই সঙ্গে আবার একটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিভাত ব্যক্তিত্বও-"এই একজন”, যেমন বৃদ্ধ হেগেল বলতেন। এবং ঠিক এটাই হওয়া উচিত।
কেবল অপক্ষপাত মতামতের খাতিরেই আমাকে কিছু নেতিবাচক দিকের কথা বলতে হবে, এবং এই প্রসঙ্গে আমার মনে আসে আর্নল্ড-এর কথা। সত্য বলতে কি, সে অবাস্তব রকমের ত্রুটিমুক্ত, এবং যদি পরিশেষে তার মৃত্যু ঘটে পাহাড় থেকে পতনের ফলে, তা হলে তাকে কাব্য-সুলভ ন্যায়বিচার বলে মেনে নেওয়া যায় কেবল এই ভেবে যে, সে ছিল এত ভালো যে এই জগৎ ছিল তার পক্ষে অনুপযুক্ত। নিজের নায়কের প্রতি সম্মোহিত হয়ে পড়া লেখকের পক্ষে ক্ষতিকর, এবং আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে আপনি এই দুর্বলতাকে বেশ কিছুটা প্রশ্রয় দিয়েছেন। এলসার তবু এখনও কিছু ব্যক্তিত্বের রেশ আছে, যদিও তাকেও অনেকটা আদর্শায়িত করা হয়েছে; কিন্তু আর্নল্ড-এর বেলায় ব্যক্তিত্বকে তো একেবারে লয় করে দেওয়া হয়েছে নীতির মধ্যে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই ত্রুটির মূল কোথায় তা উপন্যাসটিতেই নির্দেশ করা হয়েছে। স্পষ্টতই আপনি আপনার প্রত্যয়গুলিকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করার, গোটা জগতের সামনে তার স্বপক্ষে সাক্ষ্য উপস্থিত করার, প্রয়োজন বোধ করেছেন। এ তো আপনি আগেই করেছেন, এ তো আগে থেকেই আপনার পিছনে রয়েছে; অতএব এবংবিধ আকারে তার পুনরাবৃত্তির কোনও প্রয়োজন নেই।
আমি আদৌ উদ্ধেশ্যর (Tendenz-এর) সৃষ্টির বিরোধী নই। 'ট্র্যাজেডি'-র জনক ঈস্কাইলাস এবং 'কমিডি'-র জনক অ্যারিস্টোফেনস-দুজনেই ছিলেন নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্যপর কবি, যেমন ছিলেন দান্তে এবং সের্ভান্টিস; এবং শিলার-এর 'ক্র্যাফট্ অ্যাণ্ড লাভস' (Craft and Loves)-এর প্রধান গুণই এই যে, এটাই হচ্ছে জার্মান ভাষায় প্রথম রাজনৈতিক প্রচারমূলক নাটক। আধুনিক রুশ ও নরওয়েজীয়রা, যাঁরা লিখছেন চমৎকার চমৎকার উপন্যাস, তাঁরা সকলেই উদ্দেশ্যপ্রেরিত।
কিন্তু আমি মনে করিযে, বিশেষ কোনও নীতি-নির্দেশ ছাড়াই পক্ষপাতটা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই উদগত হওয়া উচিত পরিস্থিতি ও ঘটনাক্রম থেকে; লেখায় বর্ণিত সামাজিক সংঘাতের ভবিষ্যৎ ঐতিহাসিক সমাধান পাঠকের উপরে চাপিয়ে দিতে লেখক বাধিত নন। এবং বিশেষ করে আমাদের অবস্থায় উপন্যাসের আবেদন প্রধানত বুর্জোয়া মহলের পাঠকদের কাছে; তা প্রত্যক্ষ ভাবে আমাদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; অতএব, আমার মতে একটি সমাজবাদী পক্ষপাত সম্পন্ন উপন্যাস তবেই তার উদ্দেশ্য পুরোপুরি সাধন করতে পারে, যদি তা পারে বিবেকনিষ্ঠ ভাবে পারস্পরিক বাস্তব সম্পর্কসমূহকে বর্ণনা রতে, সেগুলি সম্বন্ধে প্রথাগত মোহ-বিভ্রম ভেঙে দিয়ে বুর্জোয়া জগতের আশা-বাদকে চুরমার করে দিতে এবং উপস্থিত ব্যবস্থার চিরন্তন চরিত্র সম্বন্ধে সংশয় সঞ্চার করে দিতে-যদিও লেখক দিচ্ছেন না কোনও নির্দিষ্ট সমাধান, এমনকি প্রকাশ্যে দাঁড়াচ্ছেন না বিশেষ কোনও পক্ষে।
অস্ট্রিয়ার কৃষক এবং ভিয়েনার 'সমাজ'-উভয় সম্পর্কেই আপনার সর্বাঙ্গীন জ্ঞান আর সেই সঙ্গে তা চিত্রায়ণে আশ্চর্য সজীবতা এখানে পাবে অফুরান মালমশলা। এবং 'স্টেফান'-এ আপনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, আপনি আপনার নায়কদের দেখতে পারেন এমন এক সূক্ষ্ম কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে, যা প্রতিপন্ন করে নিজের সৃষ্টির উপরে লেখকের কর্তৃত্ব।* (F. Engels, Letter to Minna Kautsky, Nov. 26, 1885: K. Marx and F. Engels. Briefe an A. Bebel, W. Liebknecht K. Kautsky and Andere. pp. 413-16.)
[গ] ঐতিহাসিক ঘটনার বাস্তববাদী চিত্রায়ণ [১]
আমি এখন আসছি 'Franz von Sickingen' প্রসঙ্গে। প্রথমে আমি অবশ্যই প্রশংসা করব তার গঠন ও ঘটনাক্রম (composition and action); এ ব্যাপারে আর কোনও আধুনিক জার্মান নাটকের প্রশংসায় যা বলা যায়, এর প্রশংসায় বলা যায় তার চেয়ে ঢের বেশি। দ্বিতীয়ত, এই বইটির প্রতি বিশুদ্ধ সমালোচনামূলক মনোভাব এক পাশে রেখে, আমি বলব, প্রথম বার এটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি দারুণ ভাবে উত্তেজিত বোধ করছিলাম, সুতরাং যেসব পাঠকেরা আরও বেশিভাবে অনুভূতির দ্বারা শাসিত হন, তাদের উপরে এই প্রতিক্রিয়া যে আরও বেশি করে ঘটবে, এটা অনুমান করা যায়। এবং এটা হচ্ছে বইখানার দ্বিতীয় ও অধিকতর গুরূত্বপূর্ণ দিক।
এবারে মুদ্রাটির অন্য পিঠ সম্পর্কে: এটা একেবারে আঙ্গিকগত (formal) ব্যাপারে -যেহেতু আপনি পদ্যে লিখেছেন, আপনি আপনার ছন্দকে আরেকটু শৈল্পিক সুষমায় মণ্ডিত করতে পারতেন। কিন্তু এই যত্নহীনতার কারণে পেশাদার কবিরা যতই আহত হোন না কেন, আমি একে মোটের উপর একটা ভালোর দিক বলেই মনে করি, কেননা আমাদের নকলনবিশ কবিকুলের তো কেবল আঙ্গিকগত জৌলুসই আছে, আর কিছু নেই।
দ্বিতীয়ত, অভিপ্রেত সংঘাতটি যে শুধুমাত্র করুণ (tragic) তা-ই নয়, বস্তুত পক্ষে, এই করুণ সংঘাতটিই শেষ পর্যন্ত ১৮৪৮-৪৯-এর বিপ্লবের সর্বনাশ ঘটালো, এবং সঠিক ভাবেই ঘটালো। সুতরাং একটি আধুনিক বিয়োগান্ত ঘটনাক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে এটাকে ব্যবহার করার ধারণাটিকে আমি আন্তরিক ভাবে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু তার পরে আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, আপনি যে বিষরবস্তুটি (theme) নিয়েছেন, সেটি এই সংঘাতটাকে উপস্থিত করার পক্ষে কতটা উপযোগী? বালখাসার (Balthasar) সত্যি সত্যিই ভাবতে পারেন যে, সিকিদেন যদি সম্রাটের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পতাকা উড্ডীন করতেন এবং 'নাইট'-সুলভ বিরোধের আড়ালে তাঁর বিদ্রোহে প্রচ্ছন্ন না রেখে রাজ-রাজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতেন, তাহলে তিনি জয়লাভ করতেন। কিন্তু আমরা কি এই বিভ্রমের অংশীদার হতে পারি? সিকিম্পেন-এর (এবং তাঁর সঙ্গে কিছু মাত্রায় হাটেন-এর) পতন ঘটেনি তাঁর চতুরতার কারণে। তাঁর পতন ঘটেছিল এই কারণে যে একজন 'নাইট' হিসাবে এবং একটি মুমূর্ষু শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসাবে তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন তার বিরুদ্ধে যা বিদ্যমান ছিল, কিংবা বরং, যা বিদ্যমান ছিল তার নোতুন রূপের বিরুদ্ধে। সিকিম্পেন-কে তাঁর খেয়াল-খুশি, বিশেষ ধরনের শিক্ষা, স্বাভাবিক প্রবণতা ইত্যাদিগুলি থেকে মুক্ত করুন, দেখবেন, যা থাকবে, তা হলো Gotz von Berlichingen। এই শেষোক্ত শোচনীয় ব্যক্তিটির মধ্যে যথোচিত রূপে স্মৃতিমান হয়ে আছে একটি করুণ প্রতিতুলনা-এক দিকে 'নাইটহুড' এবং অন্য দিকে কাইজার ও রাজা-রাজড়াদের মধ্যে; এবং ঠিক এই কারণেই গ্যেটে তাকে সঠিক ভাবেই এক নায়ক হিসাবে রূপ দিয়েছিলেন। যখন সিকিঙ্গেন লড়াই করেন রাজা-রাজড়াদের বিরুদ্ধে (অবশ্য, তিনি কাইজারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন কেবল এই কারণে যে তিনি নিজেকে রূপান্তরিত করেছিলেন নাইটদের কাইজার থেকে রাজা-রাজড়াদের কাইজারে), তখন বাস্তবিক পক্ষে শুধু একজন ডন কুইক্সোট, যদিও ঐতিহাসিক দিক থেকে সমর্থনপুষ্ট-এবং এ কথাটা কিছু মাত্রায় খাটে এমনকি স্বয়ং হাটেন-এরও সম্পর্কে, যদিও তাঁর ক্ষেত্রে যেমন একটা শ্রেণীর সমস্ত তত্ত্বকারদের ক্ষেত্রে, এই ধরনের উক্তি কিছুটা রদবদল-সাপেক্ষ। নাইট-সুলভ বিরোধের আড়ালে বিদ্রোহ শুরু করার মানে আর কিছুই না-নাইটসুলভ কায়দায় বিদ্রোহ শুরু করা ছাড়া। যদি তিনি অন্য ভাবে তা শুরু করতেন, তা হলে তাঁকে সরাসরি এবং গোড়া থেকেই আবেদন জানাতে হতো শহরগুলির কাছে এবং কৃষকদের কাছে, অর্থাৎ ঠিক সেই শ্রেণী-গুলিরই কাছে যাদের বিকাশের মানে দাঁড়াতো নাইটহুডের নিরাকরণের তুল্য।
অতএব আপনারা যদি না চাইতেন এই সংঘাতটিকে Gotz von Berlichingen-এ উপস্থাপিত সংঘাতটিতে পর্যবসিত করতে-এবং সেটা অ্যপনার পরিকল্পনা ছিল না, তা হলে সিকিঙ্গেন ও হাটেনকে হার মানতে হতো, কারণ তাঁরা ভাবতেন যে তাঁরা বিপ্লবী (যে কথাটা গৎস্ সম্পর্কে বলা যায় না), এবং ঠিক ১৮৩০ সালের শিক্ষিত পোলিশ অভিজাতবর্গের মতই, এক দিকে নিজেদের করে তুলতেন আধুনিক ভাবধারার প্রবক্তা, অন্য দিকে বাস্তবে প্রতিনিধিত্ব করতেন একটি প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীর স্বার্থের। সে ক্ষেত্রে বিপ্লবের অভিজাততন্ত্রী প্রতিনিধিদের পক্ষে-খাঁর ঐক্য ও মুক্তির ধ্বনির পিছনে তখনও উঁকি দিতো পুরনো সাম্রাজ্য ও মুগুর-আইনের স্বপ্ন, তাঁর পক্ষে-উচিত হতো না সমস্ত স্বার্থকে আত্মীকৃত করা, যেমন তাঁরা করেন আপনার নাটকে, কিন্তু কৃষকদের (বিশেষ করে এদের) এবং শহরগুলি থেকে বিপ্লবী শক্তিগুলির পক্ষে উচিত হতো বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা পশ্চাৎপট রচনা করা। সে ক্ষেত্রে আপনি ধ্বনিত করাতে পারতেন সবচেয়ে আধুনিক ভাবধারাগুলি সবচেয়ে সহজ-সরল রূপে এবং অনেক বেশি মাত্রায়, যেখানে এখন, ধর্মীয় স্বাধীনতা ছাড়া, রাষ্ট্রীয় ঐক্যই কার্যত থেকে গিয়েছে প্রধান ভাবে। সেক্ষেত্রে আপনাকে নিজের গরজেই আরও 'শেক্সপিয়ারাইত' ('Shakes-pearizing') করতে হতো, যেখানে আপনার বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ এই যে আপনার 'শিলারাইড' ('Schillerizing') করার চেষ্টাটাই ব্যক্তিদেরকে কেবল সমকালের ভাবাত্মার বাক্যন্ত্রে রূপান্তরিত করার চেষ্টাটাই হচ্ছে আপনার সবচেয়ে গুরুতর ত্রুটি।
আপনি নিজেও কি প্লিবীয় মুনসার সুলভ বিরোধিতার উপরে লুথারীয় নাইটসুলভ বিরোধিতাকে স্থান দেবার কূটনৈতিক ভুলটি করেন নি, যেমন করেছিলেন আপনার ফ্রানৎস্ ভন সিকিঙ্গেন?* (Letter to Lassalle, April 19, 1859 Marx and Engels, Selected Correspondence.)
ঐতিহাসিক ঘটনার বাস্তববাদী চিত্রায়ণ [২]
আপনি নিশ্চয়ই কিছুটা আশ্চর্য হয়েছেন যে, এত দীর্ঘ কাল ধরে আমি আপনাকে কোনও চিঠি লিখিনি, বিশেষ করে যখন আপনার Sickingen সম্পর্কে আমার মতামত দিতে আমি দায়বদ্ধ। কিন্তু ঠিক এই কারণেই আমার এত দেরি। belle letters-এর আজকাল এমন আকাল যেএখন কচিৎ-কদাচিৎ এই ধরনের বই পড়ি, এবং অনেক দিন হলো এমন একখানাও বই এমন ভাবে পড়িনি যে একটা বিস্তারিত সমালোচনা, একটা নির্দিষ্ট মতামত, দিতে পারি। এমনকি যে অতি অল্পসংখ্যক মোটামুটি ভালো ইংরেজি উপন্যাস আমি এখনও মাঝে-মধ্যে পড়ি, যেমন থ্যাকারে-র, যদিও তাদের নিঃসন্দেহে আছে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক তাৎপর্য, তবু তারা একবারও আমাকে এত বেশি মাত্রায় আগ্রহী করে তুলতে পারে নি। কিন্তু দীর্ঘকাল যাবৎ অনুশীলনের এই অভাবে আমায় সমালোচক বৃত্তিগুলি ভোতা হয়ে গিয়েছে এবং সেই জন্য নির্দিষ্ট মতা-মত দেবার আগে আমাকে বেশ কিছুটা সময় নিতে হয়। অবশ্য এই জাতীয় সাহ্যিতিক রচনাগুলি থেকে আপনার সিকিঙ্গেন ভিন্নতর মনোভাবের দাবি রাখে, এবং তাই এর জন্য সময় দিতে আমার কোনও আফশোস নেই। আপনার জাতীয় জার্মান নাটকখানার প্রথম ও দ্বিতায় পাঠ, সর্ব অর্থে, বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলী উভয়ত, আমার মনে এমন প্রবল আলোড়ণ সৃষ্টি করে যে কিছু কালের জন্য সেখানাকে আমি এক পাশে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হই; বাধ্য হই আরও এই কারণে যে, সাহিত্যিক দৈন্যের এই কালটা আমার রুচিকে এমন স্থূল করে দিয়েছে, আমাকে এমন এক অবস্থায় এনে ফেলেছে (লজ্জার সঙ্গে এটা স্বীকার করছি) যে, যৎসমান্য মূল্যের জিনিসগুলিও প্রথম পাঠেই আমার মনে রেখাপাত করে। অতএব, যাতে একটা নিখুঁৎভাবে পক্ষপাতশূন্য, নিখুঁৎভাবে "সমালোচনামূলক”, মনোভাব অর্জন করতে পারি, আমি সিকিঙ্গেনকে সরিয়ে রেখেছিলাম অর্থাৎ কয়েকজন পরিচিতকে (এখনও এখানে কয়েকজন মোটামুটি সাহিত্য-রুচিসম্পন্ন জার্মান আছেন) ধার দিয়েছিলাম। Habent sua fata libelli (বইয়ের একটা ভবিতব্য আছে) - যদি ধার দেওয়া হয়, আর ফিরে আসে না, সুতরাং, আমার Sickingen-খানা ফিরে পাবার জন্য আমাকে জোর খাটাতে হয়েছিল। আমি আপনাকে বলতে পারি, তৃতীয় ও চতুর্থ বার পাঠের পরেও আমার ধারণা অপরি-বর্তিত থেকে গিয়েছে এবং আপনার সিকিঙ্গেন যে সমালোচনার মুখে দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আমি এখন আপনাকে আমার সমালোচনামূলক মতামত জানাচ্ছি।
আমি জানি, এটা খুব প্রশংসাসূচক হবে না যদি বলি যে, আজকের জার্মানির সরকারি কবিদের মধ্যে একজনও এমন কিছু লিখতে সক্ষম নন যা এই নাটকটির এমন কি কাছাকাছিও আসতে পারে। প্রথমত আঙ্গিকগত (formal) দিক সম্পর্কে আমি উল্লেখ করতে চাই যে, পালাটির (play) সুকৌশল আখ্যান-বিন্যাস (plot) এবং আদ্যন্ত নাটকীয় চরিত্র আমাকে বিস্ময় ও আনন্দে আপ্লুত করেছে। সত্য বটে, ছন্দবন্ধ-নের ক্ষেত্রে আপনি কিছু স্বাধীনতা নিয়েছেন, যা মঞ্চে যতটা অসুবিধা সৃষ্টি করবে, তার চেয়ে বেশি করবে পাঠের বেলায়। আমি খুশি হতাম মঞ্চ-সংস্করণটি পড়তে পেলে; সম্ভবত বর্তমান আকারে একে মঞ্চস্থ করা যাবে না। একজন তরুণ জার্মান কবি (Karl Siebel) আমার সঙ্গে দেখা করেছিল। আপনার নাটক সম্বন্ধে সে অতি উচ্চ ধারণা পোষণ করে, কিন্তু মনে করে যে দীর্ঘ স্বগতোক্তিগুলির কারণে এটা মঞ্চস্থ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব, কেননা এগুলি চলাকালে কেবল একজনই অভিনয় করে এবং বাকিরা, যাতে ঠুটো জগন্নাথ হয়ে দাঁড়িয়ে না থাকতে হয়, সে জন্য দু তিন বার করে একই নকল ভাব-ভঙ্গির পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। শেষের দুটি অঙ্ক প্রমাণ করে যে আপনি অনায়াসে আপনার সংলাপকে প্রাণবন্ত ও বেগবান করে তুলতে পারতেন, এবং যেহেতু কয়েকটি (যা সব পালাতেই থেকে থাকে) প্রথম তিনটি অঙ্কেও তা করতে পারতেন, সেই হেতু আমার সন্দেহ নেই যে মঞ্চে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করার সমও আপনি এ দিকটা বিবেচনা করে দেখবেন। অবশ্য এর ফলে 'বৌদ্ধিক আধেয় (intellectual content) কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটা অপরিহার্য। একদিকে বিপুল বৌদ্ধিক গভীরতা, ও সচেতন ঐতিহাসিক আধেয়, যে-গুণটি আপনি সঙ্গত ভাবেই আরোপ করেন জার্মান নাটকের উপরে, আর অন্য দিকে শেক্সপিয়রীয় প্রাণবন্ততা ও ঘটনার ঐশ্বর্য-এই দুয়ের নিখুঁৎ মিলন সম্ভবত সাধিত হবে কেবল ভবিষ্যতে, এবং বোধহয় জার্মানদের দ্বারা নয়। বস্তুত পক্ষে, এই মিলনের মধ্যেই আমি দেখতে পাই নাটকের ভবিষ্যৎ।
আপনার সিকিঙ্গেন সমগ্র ভাবে সঠিক লাইনেই রয়েছে। প্রধান প্রধান চরিত্র-গুলি বস্তুত বিভিন্ন নির্দিষ্ট শ্রেণী ও প্রবণতার, অতএব তাদের কালের ধ্যান-ধারণার, প্রতিনিধি। এবং আচরণের অনুপ্রেরক উদ্দেশ্যগুলির সন্ধান পাওয়া যাবে না তুচ্ছ ব্যক্তি-গত কামনা-বাসনায়, পাওয়া যাবে সেই ঐতিহাসিক স্রোতধরায় যা তাদের বয়ে নিয়ে চলেছে। যাই হোক, যে-উৎকর্ষ এখনও সাধন করতে হবে তা হলো এই উদ্দেশ্য-গুলিকে আরও জীবন্ত, সক্রিয় করে তোলার ব্যাপারে, যাতে করে, বলা যায়, খোদ ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়েই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সেগুলি চলে আসে সকলের সামনে এবং বিতর্ক-মূলক বাগবিতণ্ডা (যে ব্যাপারে আমি স্বীকার করি আপনার দীর্ঘ কালের বাগ্মী-প্রতিভা-বিচারালয়ে ও জনসমাবেশে দীপ্যমান) হয়ে পড়ে আরও বেশি বেশি করে অনাবশ্যক। মনে হয়, আপনি নিজেই একে স্বীকার করেন মঞ্চ-নাটক এবং সাহিত্য-নাটকের মধ্যে একটি পার্থক্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ লক্ষ্য হিসাবে। এতে প্রয়োজন হয় বিভিন্ন ব্যক্তির চরিত্রচিত্রণ। আপনি খুব সঙ্গত ভাবেই আপত্তি করেছেন নিম্নমানের ব্যক্তিকীকরণ সম্বন্ধে, যা বর্তমান প্রচলিত হয়েছে এবং পর্যবসিত হয়েছে তুচ্ছ চাতু-রিতে; এটা প্রথাগত সাহিত্যের অবক্ষয়েরই অনিবার্য নিদর্শন। যাই হোক, আমার কাছে বোধ হয় যে, একজন ব্যক্তির চরিত্র নিরূপিত হয় সে কি করে, কেবল তা দিয়েই নয়, সে কেমন করে তা করে, তা দিয়েও, এবং এই দৃষ্টিকোণ থেকে, আমি মনে করি যে, আপনার নাটকের বৌদ্ধিক আধেয় ক্ষতিগ্রস্ত হতো না যদি ব্যক্তিচরিত্রগুলিকে আরও তীক্ষ্ণ ভাবে পার্থক্যযোগ্য ও প্রতিতুলনীয় করা হতো। আমাদের যুগে প্রাচীন-দের চরিত্র-লক্ষণগুলি পর্যাপ্ত নয়, এবং এ দিক থেকে, আমার মনে হয়, কোন ক্ষতি ছাড়াই আপনি নাটকের বিকাশের ইতিহাসে শেক্সপিয়ারের তাৎপর্যের উপরে অধিকতর মনোযোগ দিতে পারতেন। কিন্তু এগুলি গৌণ ব্যাপার, এবং আমি এগুলির উল্লেখ করছি কেবল এই কারণে যে যাতে আপনি দেখতে পারেন যে আপনার নাটকের আঙ্গিকগত দিকগুলি সম্বন্ধেও আমি কিছু চিন্তা করেছি।
ঐতিহাসিক আধেয় প্রসঙ্গে-আপনি খুবই জীবন্তভাবে ও পরবর্তী ঘটনা-বিকাশের যতটা আভাস দেওয়া মাত্রাসঙ্গত ততটা আভাস দিয়ে, সেই আন্দোলনের দুটি দিকই উপস্থিত করেছেন-যে-দুটি দিক আমাদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণঃ অভিজাতবর্গের জাতীয় আন্দোলন, যার প্রতিনিধিত্ব করছে সিকিঙ্গেন, এবং ঈশ্বরতত্ত ও গীর্জার ক্ষেত্রে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সহ মানবতাবাদী-তাত্ত্বিক আন্দোলন-'রিফর্মেশন'। এখানে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লোগছে সিকিঙ্গেন এবং সম্রাটের, পোপের প্রতিনিধি এবং টিয়ার-এর আর্চবিশপের মধ্যে দৃশ্যগুলি (এখানে, আপনি সফল হয়েছেন এক দিকে একজন চিরায়ত গ্রন্থাবলী ও নন্দনতত্ত্বে সুশিক্ষিত, রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক ভাবে দূরদর্শী পার্থিব প্রতিনিধি এবং অন্য দিকে একজন গণ্ডীবদ্ধ জার্মান পুরোহিত-নরপতি (priest-duke)-এই দুয়ের মধেকার বৈপরীত্যে, একটি চমৎকার ব্যক্তিগত চরিত্র-চিত্রণে, যা তবু স্পষ্টভাবে অনুসৃত হয় উভয় ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র থেকে; সিকিঙ্গেন এবং কার্ল-এর চরিত্রায়ণও তাদের দুজনের মধ্যে দৃশ্যটিতে খুব পরিচ্ছন্ন ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। হাটেন-এর আত্মজীবনী, যার অন্তর্বস্তুকে আপনি সঙ্গত কারণেই আবশ্যিক বলে মনে করেন, এই নাটকে তার প্রবেশ ঘটিয়ে আপনি স্বেচ্ছায়ই একটা বড় রকমের ঝুঁকি নিয়েছেন। পঞ্চম অঙ্কে ফ্রানংস্ (Franz) এবং বালথাসার (Balthasar) এর মধ্যে সংলাপ, যেখানে বালথাসার মনিবকে বলে তার সতিকারের বৈপ্লবিক নীতির কথা যা তার অনুসরণ করা কর্তব্য, সেটাও বিরাট গুরুত্বপূর্ণ। তারপরেই আসে সত্যিকারের করুণ মুহূর্তটি; এবং ঠিক এই গুরুত্বের কারণেই, আমার মনে হয়, তৃতীয় অঙ্কে থাকা উচিত ছিল এর আরও শক্তিশালী আভাস, যেখানে তার অনেক সুযোগ ছিল। কিন্তু আবার আমি গৌণ ব্যাপারগুলির মধ্যে গিয়ে পড়েছি।
সে কালের শহরগুলির এবং রাজন্যদের পরিস্থিতিও অনেক জায়গায় খুব পরিষ্কার ভাবে উপস্থিত করা হয়েছে আর তাতে সেই আন্দোলনের তথাকথিত সরকারি উপাদানগুলি নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছে। যাই হোক, আমার মনে হয় যে আপনি বেসরকারি প্লিবীয় (Plebian) ও কৃষক উপাদানগুলির উপরে এবং তাদের আনুষঙ্গিক তত্ত্বমূলক অভিব্যক্তির উপরে যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেন নি। কৃষক আন্দোলন যতটা ছিল জাতীয়, ততটাই ছিল রাজ-রাজড়াদের বিরুদ্ধে এবং অভিজাতবর্গের আন্দোলনের বিরুদ্ধে পরিচালিত, এবং যে-সংগ্রামে তা পরাস্ত হলো, তার বিশাল আয়তন তীক্ষ্ণ ভাবে প্রকট হয়ে ওঠে যখন লক্ষ্য করা যায় কত অনায়াসে অভিজাতবর্গ সিকিঙ্গেন-কে তাঁর অদৃষ্টের উপরে ছেড়ে দিয়ে, আবার গ্রহণ করলো তাদের হীন রাজসেবার ঐতিহাসিক ভূমিকা। সুতরাং আমার মনে হয়, নাটকটি সম্বন্ধে এমনকি আপনার নিজের ধারণা নিয়েও যাকে, আপনি দেখে থাকবেন, আমি মনে করি, অতি অমূর্ত, যথেষ্ট বাস্তব নয়-এমন ধারণা নিয়েও, কৃষক আন্দোলনের প্রতি দেওয়া উচিত ছিল আরও অধিক মনোযোগ। সত্য বটে, 'জোস্ট, ফ্রিৎস্কে নিয়ে কৃষক দৃশ্যটি চরিত্রানুগ হয়েছে এবং এই "বিদ্রোহী”-টির ব্যক্তিত্ব খুব সঠিক ভাবেই রূপায়িত হয়েছে, কিন্তু তা এই অভিজাত বর্গের আন্দো-লনের বিরুদ্ধে যে-কৃষক আন্দোলন তখন পৌঁছেছিল তার তুঙ্গে, তাকে পর্যাপ্ত ভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
আমার মতে, বৌদ্ধিক উপাদানের কারণে বাস্তব উপাদানকে তুচ্ছ করা উচিত নয়, শিলার-এর জন্য শেক্সপিয়ারকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়; সে কালের বহুবর্ণ প্লিবীয় সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করলে এমন সব সম্পূর্ণ নোতুন মালমশলা পাওয়া যেত যা নাটকটিকে করে তুলতো উদ্দীপিত, অভিজাতবর্গের জাতীয় আন্দোলনের রঙ্গমঞ্চের ঘটনাক্রমের জন্য রচনা করে দিত এক অমূল্য পশ্চাৎপট, ঠিক এই আন্দালনটির উপরেই এই প্রথম নিক্ষেপ করত সঠিক আলোক-সম্পাত। সামন্ততান্ত্রিক বন্ধনগুলির এই ভাঙনের কালে কত বিচিত্র রকমের অদ্ভুত সব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চরিত্র-চিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় কপর্দকহীন রাজ-রাজার দারিদ্র্যপীড়িত মুক্ত বুদ্ধিজীবী ও সব রকমের ভাগ্যান্বেষীদের মধ্যে-একটা ফলস্টাফসুলভ পটভূমি, যা শেক্সপিয়র-এর নাটকের চেয়ে এই ধরনের একটি ঐতিহাসিক নাটকে বেশি সার্থক হতো।
কিন্তু এ ছাড়াও, আমার মনে হয়, কৃষক-আন্দোলনের প্রতি এই যে উপেক্ষা, এটাই হচ্ছে কারণ যার জন্য অভিজাতবর্গের জাতীয় আন্দোলনকে আপনি একদিক থেকে ভুল ভাবে অঙ্কিত করেছেন এবং তাই ব্যর্থ হয়েছেন সিকিঙ্গেন-এর অদৃষ্টে সত্যিকারের বিয়োগান্ত উপাদানটি ফুটিয়ে তুলতে। আমার বিশ্বাস, তখনকার সম্রাটতন্ত্রী অভিজাত-বর্গের দল কৃষক সমাজের সঙ্গে মৈত্রী গঠনের কথা ভাবেনি; নিপীড়িত কৃষকসমাজ থেকে আয়ের উপরে তাদের যে-নির্ভরতা, তাতে এটা সম্ভব ছিল না। শহরগুলির সঙ্গে মৈত্রী ছিল বেশি সম্ভাব্য; কিন্তু সেটাও গড়ে তোলা হয়নি, কিংবা হলেও আংশিক ভাবে। কিন্তু অভিজাতবর্গের জাতীয় বিপ্লবের সাফল্য সম্ভব ছিল কেবল যদি শহর ও কৃষক সমাজের সঙ্গে, বিশেষ করে কৃষক সমাজের সঙ্গে, মৈত্রী গড়ে তোলা যেত। আর, আমার মতে, এটাই ছিল সবচেয়ে বিয়োগান্ত ঘটনা-এই ঘটনা যে কৃষক সমাজের সঙ্গে মৈত্রী গঠনের এই মূল শর্তটি ছিল অসম্ভব; সুতরাং অভিজাত সম্প্রদায়ের নীতি আবশ্যিক ভাবেই হয়েছিল মূল্যহীন; ঠিক যে-মুহূর্তে তার জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবার কথা, তখনই জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তথা কৃষক সমাজ এই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে উত্থাপন করল প্রতিবাদ; সুতরাং তার পতন হলো অনিবার্য।
সিকিম্পেন কোনও এক ভাবে কৃষক নমাজের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল-আপনার এটা ধরে নেওয়া ইতিহাসের দিক থেকে কতটা নির্ভুল, তা বিচার করবার কোনও উপায় আমার নেই, আর এটা বাস্তবিক পক্ষে প্রশ্নও নয়। প্রসঙ্গত, আমার যতদূর মনে আছে, হাটেন তাঁর লেখায় যেখানে কৃষক সমাজের কাছে আবেদন জানান, তখন তিনি অভিজাত-বর্গের এই বিড়ম্বনাদায়ক প্রশ্নটি সযত্নে এড়িয়ে যান, এবং কৃষকদের সমস্ত আক্রোশ পরিচালনা করেন পুরোহিতদের বিরুদ্ধে! কিন্তু সে ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ আপনি দেখতে পারেন এই করুণ স্ববিরোধ যে তাদের উভয়েরই অবস্থান ছিল একদিকে অভিজাত সম্প্রদায় যা ছিল নিশ্চিত ভাবেই এর বিরোধী, এবং অন্যদিকে, কৃষক সমাজ-এই দুয়ের মধ্যবতী। আমার মতে, এটাই ছিল করুণ সংঘাত-ইতিহাসের আবশ্যিক দাবি এবং তা পরিপূরণে বাস্তব অসম্ভাব্যতা, এই দুয়ের মধ্যে সংঘাত। এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করে আপনি এই করুণ সংঘাতটিকে পর্যবসিত করেছেন সংকীর্ণতর মাত্রায়, যেখানে সম্রাট ও সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধের পরিবর্তে সিকিম্পেন যুদ্ধ করছেন কেবল একজন ডিউক-এর বিরুদ্ধে (যদিও সঠিক অনুভূতির কল্যাণে আপনি এখানে কৃষকদের সামিল করেছেন), এবং তিনি ধ্বংস হয়ে যান, আপনার মতে, কেবল অভিজাতবর্গের উদাসীনতা ও কাপুরুষতার কারণে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে প্রণোদিত হতো যদি আপনি, কৃষক সমাজের ক্রমবর্ধমান ক্রোধ এবং পূর্ববর্তী 'বুশুশু' ও 'দুর্ভাগা কন্ট্রাড' কৃষক বিদ্রোহগুলির জের হিসেবে আরও সংরক্ষণশীল মানসিকতার দিকে অভিজাত বর্গের নিশ্চিত পরিবর্তন-এই দুটির উপরে আগেকার অঙ্কে গুরুত্ব আরোপ করে রাখতেন। যে-সমস্ত উপায়ে কৃষক ও প্লিবিয়ানদের আন্দোলনকে আপনার নাটকটিতে প্রবেশ করানো যেত, এটা সেগুলির মধ্যে মাত্র একটি; আরও অন্তত দশটি উপায় আছে যেগুলি সমান উপযোগী, কিংবা সম্ভবত আরও বেশি উপযোগী।
আপনি দেখতে পাচ্ছেন, আমি আপনার নাটকটিকে আলোচনা করেছি উচ্চতম মানদণ্ডের পরিমাপে-বস্তুত পক্ষে, নান্দনিক ও ঐতিহাসিক উভয় মানদণ্ডেরই, এবং কেবল এই ভাবেই যে আমি কিছু আপত্তির কথা তুলতে সক্ষম হয়েছি, এটাই আপনার রচনাটির প্রতি আমার প্রভূত শ্রদ্ধার সর্বোত্তম প্রমাণ। পারস্পরিক সমালোচনা দীর্ঘকাল ধরে আবশ্যিক ভাবেই-পার্টির স্বার্থে-হয়ে এসেছে, মোটের উপর, যথাসম্ভব খোলামেলা; যাই হোক, যে-ক্ষেত্রেই পার্টি প্রবেশ করে, সে ক্ষেত্রেই যে সে সর্বদা তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করে-এমন প্রত্যেকটি প্রমাণে আমরা সবাই খুব খুশি। এবং এ ক্ষেত্রেও আপনার নাটকটি এটা প্রমাণ করলো।* (F. Engels, Letter to Ferdinand Lassalle, May 18, 1859: Ferdinand Lassalle. Nachgelassene Briefs und Schriften, edited by Gustav Mayer. Vol 3 pp. 178-84.)
[ঘ] সাহিত্যে অভ্যুত্থান: সামাজিক-ঐতিহাসিক পৃষ্ঠপট
যাকে আপনি বলেন স্ক্যান্ডিনেভীয় নারী-আন্দোলন, তার সঙ্গে আমি আদৌ পরিচিত নই। আমি জানি কেবল ইবসেন-এর কয়েকটি নাটক, তবে বুর্জোয়া ও পেটিবুর্জোয়া নারী 'কেরিয়ার'-বাদী (Careerist)-দের কম-বেশি মৃগীরোগী-সুলভ উচ্ছ্বাস ইত্যাদির জন্য ইবসেনকে আদৌ দায়ী করা যায় কিনা কিংবা করা গেলেও কতটা করা যায়, সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই।
তা ছাড়া, যাকে সচরাচর বলা হয় 'নারী সমস্যা' তার সমগ্র জটিল আয়তনটি এমন একটি বিরাট ব্যাপার যে একটা চিঠির সীমিত পরিসরে তার সম্পূর্ণ কেন, কিছুটা সন্তোষ-জনক আলোচনাও অসম্ভব। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, মিঃ বার মার্কস-এর উপরে যে দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করেছেন মার্কস নিশ্চয়ই সেই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করতে পারেন না। তা করতে হলে তাঁকে পাগল হতে হতো।
সমস্যাটিকে বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের যে চেষ্টা আপনি করেছেন, সেই প্রসঙ্গে আমি প্রথমেই বলবো, ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের পথ-প্রদর্শক হিসাবে ব্যবহৃত না হয়ে বস্তুবাদী পদ্ধতি যখন ব্যবহৃত হয় একটি তৈরি নক্সা হিসাবে যে নক্সা অনুযায়ী ঐতিহাসিক তথ্যসমূহকে ছাটকাট করতে হবে, তা হলে সেটা পর্যবসিত হয় তার বিপরীতে। এবং মিঃ বার যদি ভেবে থাকেন যে এই ভাবে তিনি আপনাকে ফাঁদে ফেলতে পারবেন, তা হলে, আমার মনে হয়, তাঁর ভাবনাটার পক্ষে কিছু যুক্তি আছে।
গোটা নরওয়েকে এবং যা কিছু সেখানে ঘটে তার সব কিছুকেই আপনি অন্তর্ভুক্ত করেছেন 'ফিলিস্তিনিজম'-এর একটি মাত্র অভিন্ন অভিধার মধ্যে, এবং তারপরে নিজের অগোচরেই এই নরওয়েজীয় 'ফিলিস্তিনিজম'-এর উপরে আরোপ করেছেন জার্মান 'ফিলিস্তিনিজম'-এর প্রসঙ্গে আপনার নিজস্ব ধারণাটিকে। কিন্তু দুটি ঘটনা এখানে বাদ সেধেছে: প্রথমত, যখন গোটা ইউরোপ জুড়ে নেপোলিয়নের উপরে জয়লাভ প্রতিভাত হয়েছিল বিপ্লবের উপরে প্রতিক্রিয়ার জয়লাভ বলে, এবং একমাত্র তার ফরাসী পিতৃ-ভূমিতেই বিপ্লব এমন প্রবল উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছিল যে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্র বাধ্য হয়েছিল একটা বুর্জোয়া উদারনৈতিক সংবিধান মঞ্জুর করতে, তখন নরওয়ে সুযোগ করে নিয়েছিল এমন একটি সংবিধান অর্জন করে নিতে যা ছিল ইউরোপে সমকালের সমস্ত সংবিধানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক। এবং দ্বিতীয়ত, বিগত কুড়ি বছর ধরে নরওয়ে প্রত্যক্ষ করেছে এমন একটি সাহিত্যিক অভ্যুত্থান যা, রাশিয়া ছাড়া, আর কোনও দেশ সে সময়ে প্রত্যক্ষ করেনি। ফিলিস্তিন হোক বা না হোক, এই লোকগুলি বাকিদের তুলনায় সাধন করেছিল ঢের বেশি এবং তাদের সাহিত্যের উপরে ফেলেছিল নিজেদের ছাপ-জার্মান সাহিত্যের উপরেও কম কিছু নয়।
আমার মতে, এই ঘটনাগুলির কারণে নরওয়েজীয় ফিলিস্তিনিজম-এর নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে কিছুটা অনুসন্ধান আবশ্যক হয়ে ওঠে। এবং যখন আপনি অনুসন্ধান করবেন, আপনি সম্ভবত দেখতে পাবেন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। জার্মানিতে ফিলিস্তিনিজ ম্ হচ্ছে একটি অসফল বিপ্লবের ব্যাহত ও গতিরুদ্ধ বিকাশের ফল। তা অর্জন করেছিল তার সবিশেষ ও অস্বাভাবিক ভাবে বিকশিত বৈশিষ্ট্যগুলিকে কাপুরুষতা, সংকীর্ণতা, ক্লীবতা, এবং ত্রিংশ বর্ষব্যাপী যুদ্ধ ও তার উত্তর কালের ফলশ্রুতি হিসাবে কোনও রকমের উদ্যোগ-গ্রহণে ও অক্ষমতাকে, অথচ তখনই বাকি সমস্ত বড় বড় জাতিগুলি অগ্রগতির পথে এগিয়ে গিয়েছিল ঝড়ের বেগে। জার্মান ফিলিস্তিনিজম অব্যাহত ছিল তার পরবর্তী কালেও, যখন জার্মানি আবার ভেসে গিয়েছিল ঐতিহাসিক বিকাশের স্রোতে। এই প্রভাব এমন প্রবল ছিল যে তার ছাপ পড়েছিল, কমবেশি একটা জার্মান বিশেষত্ব হিসাবে, জার্মান সমাজের বাকি সমস্ত শ্রেণীর উপরে, যে পর্যন্ত না আমাদের শ্রমিকেরা হলো সুনিশ্চিত ভাবে "দেশচ্যুত”-এই অর্থে যে তারা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলে দিলো জার্মান ফিলিস্তিন সংকীর্ণ-মনস্কতা।
সুতরাং জার্মান ফিলিস্তিনিজমকে একটি স্বাভাবিক ঐতিহাসিক পর্যায় হিসাবে গণ্য না করে, গণ্য করা উচিত অধঃপতনের একটি চরম অতিরঞ্জিত ব্যঙ্গরূপ ও দৃষ্টান্ত হিসাবে। এটা 'ক্লাসিক' আকার ধারণ করে কেবল চরম গণ্ডীবদ্ধ ও অতিরঞ্জিত পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যে। ইংরেজ, ফরাসী ইত্যাদি পেটি-বুর্জোয়া আদৌ জার্মান পেটি-বুর্জোয়ার মত একই মানে অবস্থিত নয়।
নরওয়েতে উল্টো, ক্ষুদ্র কৃষক এবং পেটি-বুর্জোয়া, মাঝারি বুর্জোয়ার কিছুটা মিশ্রণ সমেত-যেমন, নমুনা হিসাবে ছিল সপ্তদশ শতাব্দিতে ইংল্যাণ্ডে ও ফ্রান্সে প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে কয়েক শতাব্দি ধরে সমাজের স্বাভাবিক অবস্থার। এখানে কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না কোনও এক অসফল মহান আন্দোলন এবং একটি ত্রিংশ বর্ষব্যাপী যুদ্ধের কারণে সেকেলে অবস্থায় বাধ্যতামূলক প্রত্যাবর্তনের। তার বিচ্ছিন্নতা ও প্রাকৃতিক অবস্থার দরুন দেশটি পিছিয়ে ছিল, কিন্তু তার পরিস্থিতি ছিল সব সময়েই তার উৎপাদন-অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এই কারণেই স্বাভাবিক। কেবল অতি সম্প্রতি উদ্ভব ঘটেছে বৃহদায়তন উৎপাদনের বিক্ষিপ্ত সূচনার; কিন্তু এখানে অবকাশ নেই মূলধন কেন্দ্রী-করণের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেষক-যন্ত্রের, তথা স্টক এক্সচেঞ্জ-এর; এবং সাগর পারের বিরাট বাণিজ্যও বিস্তার করে একটা সংরক্ষণশীল প্রভাব। যেখানে অন্যান্য সব দেশে, বাষ্প-পোত স্থান নিয়েছে পাল-তোলা নৌকার, সেখানে নরওয়ে বিপুলভাবে বাড়িয়ে চলেছে তার পাল-তোলা নৌবাহিনী এবং আজ সে এই ক্ষেত্রে বৃহত্তম না হলেও দ্বিতীয় বৃহত্তম মালিক-যে-নৌকাগুলির বেশির ভাগেরই স্বত্বাধিকারী হচ্ছে ছোট ও মাঝারি নৌ-মালিকেরা, যেমন ছিল ইংল্যাণ্ডে, ধরুন, ১৭২০ সালে। কোনও না কোনও ভাবে, পুরনো নিশ্চল অবস্থার পরিবর্তে তা সঞ্চার করে প্রাণোচ্ছলতা এবং এই প্রাণোচ্ছলতা প্রতিবিম্বিত হয় পুষ্প পল্লবায়িত সাহিত্যে।
নরওয়েজীয় চাষী কখনও ভূমিদাস ছিল না, এবং এই ঘটনা যেমন ক্যাস্টাইল-এ -তেমন এই দেশটিতেও সমগ্র বিকাশধারাকে দিয়েছিল সম্পূর্ণভাবে এক ভিন্নতর পটভূমি। নরওয়েজীয় পেটি-বুর্জোয়া ছিল স্বাধীন কৃষকের সন্তান। ফলে সে দুর্ভাগা জার্মান ফিলিস্তিন-এর মত না হয়ে, হয়েছে একজন সাঁচ্চা মানুষ। একই ভাবে পেটি-বুর্জোয়া পরিবেশের একজন নরওয়েজীয় নারীর অবস্থান একজন জার্মান ফিলিস্তিনের পত্নীর তুলনায় অপরিমেয় ভাবে উচ্চতর। এবং ইবসেন-এর নাটকগুলির যাই দোষ-ত্রুটি থাক না কেন, তৎসত্ত্বেও সেগুলি প্রতিরূপায়িত করে এমন এক জগৎ, যা পেটি-বুর্জোয়া ও মাঝারি-বুর্জোয়া হলেও, অনুরূপ জার্মান জগৎ থেকে বিপুল ভাবে ভিন্নতর; সেগুলি প্রতিরূপায়িত করে এমন এক জগৎ যেখানে নর-নারীর এখনও আছে চরিত্র, তারা উদ্যোগ গ্রহণে সক্ষম, এবং কাজ করে স্বাধীন ভাবে-যদিও তাদের আচরণ কখনও কখনও একজন বিদেশী পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে বোধ হতে পারে বিসদৃশ বলে। তাই আমি কোনও মতামত দেবার আগে এই সমস্ত কিছু নিয়ে পুরোপুরি অনুশীলন করে নিতে চাই।* (F. Engels, Letter to Paul Ernst, June 5, 1899. Original in the Marx-Engels-Lenin Institute, Moscow.)
[৬] সমাজতান্ত্রিক মানবিকতা
মানুষ তার সর্বতোমুখী সত্তাকে অভিযোজিত করে সর্বতোমুখী ভাবে, অর্থাৎ একটি গোটা মানুষ হিসাবে। জগতের সঙ্গে তার বিবিধ মানবিক সম্পর্কের প্রত্যেকটিই দর্শন, শ্রবণ, আঘ্রাণ, আস্বাদন, অনুভব, চিন্তন, মনন, মনঃস্থকরণ, সম্পাদন, ভালোবাসা, সংক্ষেপে তার ব্যক্তিসত্তার সব কয়টি ইন্দ্রিয় এবং যে-ইন্দ্রিয়গুলি তাদের তাৎক্ষণিক রূপে সকলের ক্ষেত্রেই অভিন্ন, সেগুলি তাদের বিষয়গত আচরণে বা বিষয়ের প্রতি আচরণে প্রথমটিরই (জগতেরই) গ্রহণ। মানবিক বাস্তবতার গ্রহণ এবং বিষয়ের প্রতি তার আচরণ হচ্ছে মানবিক বাস্তবতার অভিব্যক্তি: মানবিক ক্রিয়াকলাপ এবং মানবিক দুঃখভোগের অভিব্যক্তি, কেননা মানবিক ভাবে দেখলে, মানবিক দুঃখ-ভোগ হচ্ছে মানুষের আত্ম-সম্ভোগ।
ব্যক্তিগত সম্পত্তি আমাদের এত বোকা ও একপেশে করে দিয়েছে যে, একটি বিষয় আমাদের নিজেদের হয় কেবল তবেই যদি আমরা সেটি পেয়ে থাকি, অর্থাৎ আমাদের কাছে মূলধন হিসাবে থাকে কিংবা ব্যবহৃত হয় আমাদের দ্বারা: সরাসরি সেটার অধিকার পাই, সেটাকে খাই, পান করি, গায়ে পরি বা সেটায় বাস করি। যদিও ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিকারের এই মূর্তরূপগুলিকে দেখে কেবল জীবন-ধারণের উপায় হিসাবে, তা সত্ত্বেও যে-জীবন সেগুলি কাটায়, তা হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, কাজ ও মূলধনের জীবন।
সুতরাং এই সমস্ত বোধনমূহের ঘটে গিয়েছে এক সহজ পরকীকরণ; এবং একমাত্র 'অধিকারের বোধ' স্থান গ্রহণ করেছে সমস্ত দৈহিক ও আত্মিক বোধগুলির। মানবিক অস্তিত্বকে পর্যবসিত করতে হয়েছিল এই চরম দারিদ্র্যে, যাতে করে জন্ম নিতে পারে অভ্যন্তরীণ ঐশ্বর্য।..
সুতরাং ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলুপ্তি সাধনের মানে হচ্ছে সমস্ত মানবিক বোধ ও প্রবণতাসমূহের সম্পূর্ণ মুক্তিসাধন; কিন্তু এর মানে হচ্ছে মুক্তিসাধন ঠিক সেই কারণেই যে, এই বোধ ও প্রবণতাগুলি হয়ে উঠেছে মানবিক-বিষয়ীগত ও বিষয়গত উভয় ভাবেই।
বিলুপ্তিসাধন হলো একটি বিষয়গত গতিপ্রক্রিয়া; যা পরকীকৃত হয়ে গিয়েছে, তাকে নিজের মধ্যে ফিরিয়ে আনা-পরকীকরণের অভ্যন্তরে অভিব্যক্ত এই অন্তর্দৃষ্টিই হচ্ছে বিষয়গত মর্মবস্তুর গ্রহণ, যার উচ্ছেদ ঘটিয়ে তা এর পরকীকরণ ঘটায়; মানুষের বাস্তব বিষয়গত-রূপায়ণের গভীরে এই পরকীকৃত অন্তর্দৃষ্টি বিষয়গত জগতের পরকী-করণী সংজ্ঞাটিকে ধ্বংস করে দিয়ে, তার পরকীকৃত মর্মবস্তুতে তার অপসারণ ঘটিয়ে দিয়ে, তার বিষয়গত মর্মবস্তুর প্রকৃত গ্রহণে-ঠিক যেমন ঈশ্বরের নিরাকরণ হিসাবে নিরীশ্বরবাদ হচ্ছে তত্ত্বগত মানবিকতা এবং বাক্তিগত সম্পত্তির অবসান হিসাবে কমিউ-নিজম হচ্ছে প্রকৃত মানব-জীবনের এবং সেই সঙ্গে তার গুণের প্রতিষ্ঠালাভ। এটাই হচ্ছে ব্যবহারিক মানবিকতার বিকাশ-প্রক্রিয়া-কিংবা নিরীশ্বরবাদ হচ্ছে মানবতাবাদ যার প্রতিষ্ঠা ঘটে ধর্মের বিলুপ্তিসাধনে, কমিউনিজম হচ্ছে মানবতাবাদ যার প্রতিষ্ঠা ঘটে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলুপ্তিসাধনে। কেবল তার বকলমধারী উৎপাদনটিকে-সেটি যদিও একটি আবশ্যিক পূর্বশর্ত, সেটিকে-প্রথমে অপসারণ করিয়েই আবির্ভূত হয় সদর্থক, স্বয়ং-সৃষ্ট মানবতাবাদ।
কিন্তু নিরীশ্বরবাদ এবং কমিউনিজম পলায়ন নয়; তারা মানুষ এবং তার শক্তি-সমূহের দ্বারা যে শক্তিসমূহ বিষয়গত রূপে পরিণত হয়ে উঠেছে, তাদের দ্বারা-উৎপাদিত বিষয়গত জগৎটিকে হারিয়ে ফেলা নয়, তারা অস্বাভাবিক ও অবিকশিত সরলতায় প্রত্যাবর্তিত দারিদ্র্য নয়। বরং তারাই হচ্ছে মানুষের পক্ষে তার অস্তিত্বে প্রথম প্রকৃত বিকাশ, প্রকৃত বাস্তবায়ন।* (K. Marx: "Oekonomisch-philosophische Manuskripte aus dem jahre 1844. Pt, I. Vol. 3, pp. 118-19, 166-67)
[ ] লেখক এবং তার শ্রেণী
কেবল কেউ যেন এই সংকীর্ণমনা ধারণাটা পোষণ না করেন যে, পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী, নীতিগত ভাবেই চান একটা আত্মসর্বস্ব শ্রেণীস্বার্থ বলবৎ করতে। বরং, এই শ্রেণী বিশ্বাস করে যে, তার মুক্তি অর্জনের বিশেষ অবস্থাগুলি হচ্ছে সেই নির্বিশেষ অবস্থা-গুলিই যার অধীনেই কেবল আধুনিক সমাজকে রক্ষা করা যায় এবং শ্রেণীসংগ্রামকে পরিহার করা যায়। ঠিক যেমন কারো ভেবে নেওয়া উচিত হবে না যে, গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিরা সকলেই হচ্ছেন দোকানদার কিংবা দোকানদারদের উৎসাহী প্রবক্তা। তাঁদের শিক্ষা এবং তাঁদের ব্যক্তিগত অবস্থান অনুযায়ী তাঁদেরকে আলাদা করা যায় দোকানদের থেকে তেমনই বিপুল ভাবে, যেমন পৃথিবী থেকে স্বর্গ। যে ঘটনাটি তাঁদেরকে পেটি-বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিত্ব দান করে, সেটি এই যে, মনে মনে তাঁরা কখনও যান না সেই গণ্ডিরটির বাইরে, পেটি-বুর্জোয়ারা জীবনে যার বাইরে যায় না; কাজে কাজেই তাঁরা তত্ত্বগত ভাবে তাড়িত হন সেই একই সব সমস্যায় ও সমাধানে, যেসব সমস্যায় ও সমাধানে বৈষয়িক স্বার্থ ও সামাজিক অবস্থান পেটি-বুর্জোয়াদের বাস্তবে তাড়িত করে।
একটি শ্রেণীর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক প্রতিনিধিরা যে-শ্রেণীটির প্রতিনিধিত্ব করেন সেটির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক সাধারণ ভাবে এই রকম।* (K. Marx, The Eighteenth Brumaire of Louis Bonaparte, p. 43.)
[ছ] লেখক এবং তাঁর জীবন
বেঁচে থাকা এবং লেখার জন্য লেখককে অবশ্যই একটা জীবিকা অর্জন করতে হবে, কিন্তু জীবিকা অর্জনের জন্য তাঁকে বেঁচে থাকতে এবং লিখতে হলে চলবে না। লেখক কোনও ভাবেই তাঁর লেখাকে একটা উপায় স্বরূপ দেখেন না। লেখাগুলি নিজেরাই উদ্দেশ্যস্বরূপ; সেগুলি তাঁর কাছে ও অন্যান্যদের কাছে উপায় হিসেেব এত নগণ্য যে, তাঁর নিজের অস্তিত্বকে তিনি বলি দেন সেগুলির অস্তিত্বের স্বার্থে, এবং ধর্ম-প্রচারকের মত, তিনি তাঁর নাতি হিসাবে গ্রহণ করেন: “মানুষদের চেয়ে ঈশ্বরকে বেশি মান্য করো”-যে-মানুষদের মধ্যে তিনি নিজেও তাঁর সমস্ত চাহিদা ও অভিলাষ সহ অন্তর্ভুক্ত। অন্য দিকে, ভাবুন একজন দর্জির কথা, যাকে আমি বানাতে দিয়েছি একটা প্যারিসীয় ফ্রক কোট কিন্তু সে আমার জন্য বানিয়ে এনেছে একটা রোমান টোগা, কেননা টোগাটা সুন্দরের বাহ্যিক নিয়মের সঙ্গে বেশি সঙ্গতিপূর্ণ! প্রকাশনের (press-এর) প্রথম স্বাধীনতা মানে তার পক্ষে একটা ব্যবসায়ে পরিণত না হওয়া। যে-লেখক একে অধঃপাতিত করেন একটি বৈষয়িক উপায়ে তিনি তাঁর এই অন্তরের স্বাধীনতার অভাবের শাস্তি হিসাবে দাবি করেন বাইরের স্বাধী-নতার অভাব, অর্থাৎ 'নিয়ন্ত্রণ' (censorship', অথবা এটা হয়ত আগে থেকেই রয়েছে তাঁর শাস্তি হিসাবে। *(K. Marx, "Debaten ueber Pressfreiheit," MEGA Part I. Vol. 1, pp. 222-23)