পাঠ্যক্রমে নৃত্য : রবীন্দ্রনাথের নতুন সংযোজন

রবীন্দ্রনাথ তাকেই শ্রেষ্ঠ শিক্ষা বলেছেন যা কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, যা বিশ্ব সত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীর জীবনকে সঠিকভাবে গড়ে তোলে। তিনি তাঁর শান্তিনিকেতনের শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের মুক্ত ও স্বাধীন পরিবেশে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন, শিক্ষার্থীর স্বাধীন মনোভাব যাতে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারে আর প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতে পারে তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপন করার পর তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন,
“আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল যে, এখানে এই প্রভাতের আলো, শ্যামল প্রান্তর যেন শিশুদের চিত্ত স্পর্শ করতে পারে।“
বিষয় নির্বাচনেও তিনি বৈপ্লবিক চিন্তাধারার পরিচয় দিয়েছেন। 1901 সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁর শান্তিনিকেতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শন, সমাজ- উন্নয়ন মূলক কাজকেও রেখেছিলেন। তিনি মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানকে বেশি পছন্দ করলেও অন্যান্য ভাষাকে সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন, দেশ বিদেশের ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থাও করেছিলেন। তবে ছাত্র- ছাত্রীদের সার্বিক বিকাশের কথা ভেবে মানসিক শান্তি ও আধ্যাত্মিক চেতনা জাগানো আর সৃষ্টিশীল কাজে নিয়োগের বিষয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীতশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে নৃত্য শিক্ষারও ব্যবস্থা করলেন।
 
 
সেই সময় বাংলা তথা ভারতের সমাজ থেকে লোকনৃত্য চরম অবহেলায় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। শাস্ত্রীয় নৃত্য ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য শাস্ত্রীয়নৃত্য হয় পবিত্র মন্দির থেকে সরে গিয়ে পতিতালয়ের অন্ধকারে ধুকছিল নাহয় রাজভোগে পরিনত হয়েছিল। তখন সমাজে তার সম্মানের জায়গা ফিরিয়ে দিতে কয়েকজন নৃত্যশিল্পী, নৃত্যগুরু এবং সমাজসেবী আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। ঠিক তখনই নৃত্যকলা নিয়ে বৈপ্লবিক চিন্তাধারার পরিচয় দিলেন সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সুরকার, গীতিকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
 
তৎকালীন সমাজের সঙ্গীত শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে স্থান’ নামক প্রবন্ধে বলেছেন,
 
“তখন যুবকদের এমন একটি শুচিবায়ুতে পেয়ে বসল, যাতে দুর্গতিগ্রস্থ গানব্যবসায়ীর চরিত্রের সঙ্গে জড়িত করে গান বিদ্যাটিরই পবিত্র রূপকে বীভৎস বলে কল্পনা করতে লাগল। তাই, সংগীতে রুচি অধিকার ও অভিজ্ঞতা না থাকাটাকে অশিক্ষার পরিচয় বলে কোনো লজ্জা বোধ করার কারণ তখনকার শিক্ষিতমণ্ডলীর মনে রইল না। বরঞ্চ সেদিন যে সব ছেলে, হিতৈষীদের ভয়ে, চাপা গলায় গান গেয়েছে তাদের চরিত্রে হয়েছে সন্দেহ।“
 
-এমন প্রতিকূলতায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর শান্তিনিকেতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সঙ্গীত ও নৃত্যকলাকে শিক্ষার বিষয় হিসাবে যোগ করলেন। প্র্রথমে সঙ্গীত শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। শুরুর দিকে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অজিত চক্রবর্তী, ভীমরাও হাসুরকর শাস্ত্রী গান শেখালেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর গানের সুর পরিবর্তন করেছন কঠিন তালকে ভেঙে সরল করেছেন বারবার। তাঁর গানের ভাবনার সঙ্গে সুর ও তালকে মেলাতে নিজেই নতুন তাল তৈরি করে গানকে নতুন সুরে বেঁধেছেন।
 
 
তবে নৃত্যকলাকে পাঠ্যক্রমে স্থান দেওয়ার কাজটা খুব সহজ ছিলনা। সমাজে তখন বালিকা বধুর ভিড়। বিদ্যাসাগরের স্বপ্নকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে থিক থিক করছে বিধবারা। ব্রাহ্ম সমাজের দাক্ষিণ্যে গুটিকতক বালিকা বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়েছিল। শান্তিনিকেতনের আঙ্গিনায় এসেছিল তেমনই কিছু বালিকা। তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই অনেক শিক্ষক এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। কারণ তখনও সুশীল সমাজের শিক্ষিত পরিবারের মেয়েদের জন্য নৃত্যশিক্ষা গ্রহণযোগ্য ছিল না। রবীন্দ্র -শিষ্য শান্তিদেব ঘোষ তাঁর ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’ গ্রন্থে লিখেছেন -
 
“বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বিশ্বভারতীর অধ্যাপকদের অনেকেরই মন তখন নৃত্যকলাকে সম্মানজনক বিদ্যা হিসাবে গ্রহণের জন্য তৈরি ছিল না”।
 
প্রথমে দ্বিধা বোধ করলেও পরে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে, শৃঙ্খলাবোধ জাগিয়ে তুলতে, মানসিক ও আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ঘটাতে নৃত্যকলার অনস্বীকার্য ভূমিকার কথা ভেবে তাকে শিক্ষার অঙ্গরূপে গ্রহণ করলেন। তিনি দেশ বিদেশ থেকে নৃত্যশিল্পী এনে শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও করলেন। ছাত্রীদের সঙ্গে ছাত্রদেরও শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করলেন। তিনি নিজে তাঁর গানে লিখলেন,
 
 
"নৃত্যের তালে তালে, নটরাজ, ঘুচাও ঘুচাও ঘুচাও সকল বন্ধ হে।
সুপ্তি ভাঙাও, চিত্তে জাগাও মুক্ত সুরের ছন্দ হে।।
তোমার চরণপবনপরশে সরস্বতীর মানসসরসে
যুগে যুগে কালে কালে সুরে সুরে তালে তালে
ঢেউ তুলে দাও, মাতিয়ে জাগাও অমলকমলগন্ধে হে।।
নমো নমো নমো–
তোমার নৃত্য অমিত বিত্ত ভরুক চিত্ত মম।।
নৃত্যে তোমার মুক্তির রূপ, নৃত্যে তোমার মায়া,
বিশ্বতনুতে অণুতে অণুতে কাঁপে নৃত্যের ছায়া।
তোমার বিশ্ব-নাচের দোলায় দোলায় বাঁধন পরায় বাঁধন খোলায়
যুগে যুগে কালে কালে সুরে সুরে তালে তালে,
অন্ত কে তার সন্ধান পায় ভাবিতে লাগায় ধন্দ হে।।
নমো নমো নমো–
তোমার নৃত্য অমিত বিত্ত ভরুক চিত্ত মম।।
নৃত্যের বশে সুন্দর হল বিদ্রোহী পরমাণু,
পদযুগ ঘিরে জ্যোতিমঞ্জীরে বাজিল চন্দ্র ভানু।
তব নৃত্যের প্রাণবেদনায় বিবশ বিশ্ব জাগে চেতনায়
যুগে যুগে কালে কালে সুরে সুরে তালে তালে,
সুখে দুখে হয় তরঙ্গময় তোমার পরমানন্দ হে।।
নমো নমো নমো–
তোমার নৃত্য অমিত বিত্ত ভরুক চিত্ত মম।।"
 
 
প্রায় একশো বছর আগে পাঠ্যক্রমে নৃত্যকলাকে সংযোজিত করে যে বীজ বপন করেছিলেন তা আজ পল্লবিত। নারীকে স্বাধীনতার যে ভেলায় বসিয়েছিলেন, সেই ভেলায় চড়ে একশো বছর পর বাংলার মেয়েরা আজ যেন সাগর পাল তুলেছে। তাঁর দেখানো রাস্তায় মেয়েরা রবীন্দ্রজয়ন্তীতে নৃত্য পরিবেশন করছে, কেউ নৃত্যকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। আজ ঘরে ঘরে নৃত্য চর্চার যে অভ্যাস তৈরি হয়েছে তার ভিত্তিপ্রস্তর তিনি সেদিন স্থাপন করেছিলেন। নারী স্বাধীনতা আন্দোলনকে একধাপ এগিয়ে রেখেছিলেন তখনই। তাঁর নৃত্যশিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন,
 
"নাচিয়ে তৈরি করা গুরুদেবের উদ্দেশ্যে ছিল না, নাচের একটা মান নির্ধারণ করাই ছিল তাঁর প্রকৃত ইচ্ছা, যা হবে আজকালকার শিক্ষিত ও মার্জিত রুচিসম্মত নরনারীর মনের খোরাক"(রবীন্দ্রসঙ্গীত, পৃষ্ঠা ২৩৩-২৩৪)।
 
সেবার কবি শ্রীহট্টের রাসলীলায় মনিপুরী নৃত্য দেখতে গিয়েছিলেন। সেই নৃত্যের কোমল সুললিত আঙ্গিক ও বৈষ্ণব রসসিক্ত আধ্যাত্মিকতার আবেগ দেখে তিনি তাঁর গানের ভাবের সঙ্গে মিল খুঁজে পেলেন। এরপরই শান্তিনিকেতনের ছাত্র- ছাত্রীদের মনিপুরী নৃত্যশিক্ষা দেবার জন্য উৎসাহী হয়ে শিক্ষক নিয়োগ করলেন। আর একবার জাভা ও মালদ্বীপের কান্ডিনৃত্য দেখে এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে শান্তিদেব ঘোষকে নৃত্যশিক্ষার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। এই নৃত্যধারাকে পরে তাঁর নিজস্ব নৃত্যধারায় স্থান দিয়েছিলেন। এই শান্তিদেব ঘোষকে আবার কেরলে পাঠিয়েছিলেন তাঁর আর এক প্রিয় শাস্ত্রীয়নৃত্য কথাকলি শেখার উদ্দেশ্যে।
 
প্রথম দিকে শান্তিনিকেতনে নৃত্য পরিবেশিত হত এককভাবে বা দ্বৈতভাবে। ‘অরূপরতন’ থেকে ‘শেষবর্ষণ’ পর্যন্ত (1924-26) নৃত্যাভিনয়ের চর্চা এভাবেই চলেছিল।পরে যখন দলবদ্ধনৃত্যের প্রচলন হল তখন মেয়েরাই বেশি অংশ নিয়েছিল। ‘অরূপরতন’ এর সময় থেকেই মেয়েদের নৃত্য চর্চা শুরু হয়েছিল।
 
নবকুমার, বুদ্ধিমন্ত সিংহ শান্তিনিকেতন এলে মনিপুরী নৃত্যচর্চা শুরু হল। মনিপুরী নৃত্য অনেকটা জাভা, বালি বা থাইল্যান্ডের নৃত্যের মত- দেহভঙ্গিমা সেখানে প্রধান, মুখভঙ্গিমা নেই বললেই চলে। শান্তশ্রী সুললিত মনিপুরী নৃত্য শেখার পর ‘নটীর পূজা’ ও ‘নটরাজ’ গীতিকাব্য মনিপুরী নৃত্যধারার পরিবেশিত হয়েছিল। এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে 1932 সালে এই ‘নটীরপূজা’ নৃত্যনাট্যটি রবীন্দ্রনাথ নিজে চলচ্চিত্রায়িত করলেন।
 
 
তাঁর মত মুক্ত-মনা মানুষ লোকনৃত্যের প্রতি আকৃষ্ট হবেন সেটাই স্বাভাবিক। লোকনৃত্য সংহত সমাজের প্রকাশিত রূপ। এখানে নরনারী সকলে দলবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করে। এই সংহতির আবেগ আর শৃঙ্খলা তাঁর শিক্ষায়তনে আনতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি দেশ বিদেশের লোকনৃত্যকে স্থান দিয়েছিলেন এই শান্তিনিকেতনে। একেবারে শুরুতে গুজরাটের 'গরবা' নৃত্যচর্চার প্রচলন করেছিলেন। এ ছাড়া ‘কাথিয়াবাড়’, রায়বেশ, বাউল, হাঙ্গেরির লোকনৃত্য শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়েছিল সহযোগিতা, সহমর্মিতা শেখানোর কথা ভেবে। বাউলের আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে উপনিষদের আধ্যাত্মিকতার মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। বাউল গান আর নৃত্যকে টেনে আনলেন তাঁর আঙ্গিনায়। 1928 সালে বাউল গান ও বাউল নৃত্যের সঙ্গে ‘ফাল্গুনী’ নাটক মঞ্চস্থ হলে ছাত্রীদের নৃত্য পরিবেশন সাড়া ফেলে দিয়েছিল। আর বাউল, রায়বেঁশে ও হাঙ্গেরি লোকনৃত্য ‘নবীন’ এ জায়গা করে নিয়েছিল।
 
 
এই সময় থেকেই নৃত্যনাট্যের সঠিক রূপটি সাধারণের সামনে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনৃত্যনাট্য নাটকের আকারে রচিত হলেও তা ছিল সম্পূর্ণ নৃত্যনির্ভর। এখানে নৃত্য ও গীত পরস্পরের উপর নির্ভরশীল ছিল। নৃত্যনাট্যে তিনি নৃত্য নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করলেন। ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্য রচনার পর শান্তিনিকেতনের ছাত্রী, ভরতনাট্যম শিল্পী মৃণালিনী সারাভাইকে দিয়ে ভরতনাট্যমের আঙ্গিকে তা উপস্থাপন করেছিলেন। পরে মোহিনীআট্যম শিল্পী কল্যাণী কুট্টি আম্মা শান্তিনিকেতনে এলে দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্য চর্চা বহুল অংশে বেড়ে গিয়েছিল । তবে তাঁর নৃত্যনাট্যে কথক নৃত্যের অভিনয় কয়েকবার দেখা গেলেও খুববেশি প্রয়োগ দেখা যায় না। বরং ভরতনাট্যম নৃত্যের প্রয়োগ তুলনায় বেশি। ‘শাপমোচন’এ উর্ব্বশীর দৃশ্যে ভরতনাট্যম নৃত্যের আঙ্গিক ব্যবহার করলেন। 
পরবর্তীতে তাঁর 'চণ্ডালিকা'কে নতুন ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন তাঁর স্নেহধন্য নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'চণ্ডালিকা' হল উদয় শঙ্করের 'প্রকৃতি আনন্দ'। তাঁর 'সামান্য ক্ষতি' কবিতাটি অবলম্বনে বৃন্দসঙ্গীতের সহযোগে পরিবেশন করলেন এক নতুন ধরনের নৃত্যনাট্য।
 
'শ্যামা' নৃত্যনাট্যে তাঁর নৃত্যভাবনা ও প্রয়োগ ভারতের সংস্কৃতি জগতকে চমকে দিয়েছিল। ভারতের পুর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণের সংস্কৃতিকে মিলিয়ে দিলেন তিনি। মনিপুরী, ভরতনাট্যম, কথাকলি ও কথক এই চারটি প্রধান শাস্ত্রীয়নৃত্যের সহায়তায় তৈরি করলেন 'শ্যামা'। অথচ কোনোটারই সম্পূর্ণ আঙ্গিক গ্রহণ করেননি। এখানে শ্যামা চরিত্রটিকে মনিপুরী ভঙ্গিতে প্রকাশ করলেও তার নৃত্যচর্চার দৃশ্যে ভরতনাট্যমের আঙ্গিক রাখলেন। প্রহরীর নৃত্য কথাকলি নৃত্যের আঙ্গিকে তৈরি করলেন, উত্তীয় কথক নৃত্য এবং বজ্রসেন চরিত্র কথাকলি ও ভরতনাট্যম নৃত্যধারায় আঙ্গিকে গড়ে তুললেন। 1939সালে ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতায় শ্রী রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়েছিল 'শ্যামা'র তিনটি দৃশ্য। তাতেই চমকৃত হল দর্শক। এ প্রসঙ্গে শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন,
"মনিপুরী, কথাকলি ও কত্থক নৃত্য পদ্ধতি নিজ নিজ পদ্ধতিতে নাটকের গানের সঙ্গে চমৎকার অভিনীত হয়েছিল। 'বজ্রসেনের' চরিত্র অভিনীত হয়েছিল ভারতনাট্যম ও কথাকলি পদ্ধতিতে, 'উত্তীয় ' হয়েছিল নিখুঁত কথকের আদর্শে, 'শ্যামা' অভিনয় হয়েছিল শান্তিনিকেতনে প্রচলিত মনিপুরী ভঙ্গিতে, আর 'প্রহরী' নাচ খাঁটি কথাকলির আঙ্গিকে "(রবীন্দ্রসঙ্গীত, পৃষ্ঠা ২৫১)।
 
তবে তাঁর নৃত্যভাবনার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এখানে অভিনয় দিয়েই নৃত্যের সূত্রপাত হয়। শান্তিদেব ঘোষ যথার্থই বলেছেন,
 
“নাচ দিয়ে আরম্ভ করে তারপরে অভিনয়ের উৎকর্ষের কথা ভাবা হয়নি। এই হল তাঁর নৃত্যান্দোলনের মূল কথা। তাঁর কাছে লিখিত নাটকটিই হল আসল। এক্ষেত্রে সর্বত্রই তাঁর নাটকের ভাবকে নাচে প্রকাশ করাই হল মূল লক্ষ্য।.... তাঁর রচনা চেয়েছে সমগ্র কালের মানসলোকের চিরন্তন সমস্যাকে সুন্দরভাবে দর্শকের সামনে ফুটিয়ে তুলে তাঁদের চিত্তকে উন্নততর রসলোকে উত্তীর্ণ করতে, যা কোনোদিনই কারো কাছে অবান্তর মনে হবে না।“(রবীন্দ্রসঙ্গীত, পৃষ্ঠা 253/255)
 
তিনি শাস্ত্রীয় নৃত্যধারার অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে ভাবময়, সুললিত, কোমল আঙ্গিক গ্রহণ করে নতুন নৃত্যধারা গড়ে তুলেছেন। আবার সেখানে কখনও কখনও পাশ্চাত্য নৃত্যের ছায়াও ফেললেন। বিশেষ করে 'ব্যালে' নৃত্য তাকে প্রভাবিত করেছিল। আধুনিক সভ্য সমাজ 'ব্যালে' নৃত্য সৃষ্টি করলেও এর মূল নিহিত আছে আদিম জনজীবনের গভীরে। লোকজীবনের সহজ,স্বতঃস্ফূর্ত নৃত্যের আঙ্গিকে সংস্কৃত মনের চিন্তাভাবনা থেকেই ব্যালের জন্ম হয়েছে। এই সহজ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবটি কবিকে আকৃষ্ট করেছিল।
 
 
শান্তিনিকেতনের গুরুদেব বিদেশি শিক্ষার্থীদের নৃত্য দেখে আকৃষ্ট হলে সেই নৃত্যের আঙ্গিক গ্রহণ করতেও দ্বিধা বোধ করতেন না। ভারতের চার প্রকার শাস্ত্রীয় নৃত্য, একাধিক লোকনৃত্য আর পাশ্চাত্য নৃত্য ধারার সমন্বয় প্রথাগত ব্যাকরণ ভেঙে এক নতুন নৃত্যধারা তৈরি করলেন যার নাম 'রবীন্দ্রনৃত্য'। অনেকে ‘রবীন্দ্রনৃত্য’ বলতে রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্গে যে কোনো নৃত্য পরিবেশন করাকে বোঝায়। আসলে তা নয়। নতুন আঙ্গিকে, নতুন ভাবধারায় গড়ে ওঠা নৃত্যধারাটির নির্দিষ্ট ব্যাকরণ রয়েছে। এটি প্রথাগত নৃত্যের ব্যাকরণ ভেঙে নতুন ব্যকরণে তৈরি করা এক অপূর্ব নৃত্যশৈলী। এই কারণেই রবীন্দ্রনৃত্য ভারতীয় সংস্কৃতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। মণিপুরী নৃত্যের অনুকরণে রবীন্দ্রনৃত্যে ঘুঙুর ব্যবহার করা হয় না। আবার মনিপুরী নৃত্যের পোশাক বাদ দিয়েছেন অনায়াসে। তবে মনিপুরী নৃত্যের মত তাঁর নৃত্যে মুখের ভঙ্গিমা নয়, শারীরিক ভঙ্গিমার প্রধান ভূমিকা রয়েছে । আবার কথাকলি নৃত্যের কঠিণ মুদ্রা বাদ দিয়ে অভিনয় টুকু নিয়েছেন তাঁর গানের ভাবের সরলতা বজায় রাখতে। নাটক বা গানের ভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, মাত্রার পরিমিতি বজায় রেখে, নৃত্যের আঙ্গিক ও অভিনয় গ্রহণ করেছেন। তিনি সচেতন থেকেছেন যাতে নৃত্যের কারণে গানের ভাব ক্ষুন্ন না হয়, তাই তালে মিললেই যে কোনো নৃত্যের আডাউ বা মূদ্রা গ্রহণ করেননি। তাঁর এই পরিমিতিবোধ নৃত্যের পোশাক পরিচ্ছদ ও মঞ্চ সজ্জাতেও লক্ষ করা গেছে। যার ফলে রবীন্দ্রনৃত্যের সুললিত রূপটি বজায় থেকেছে। শান্তিনিকেতনের এই নতুন নৃত্যধারা সম্পর্কে কবি শিষ্য শান্তিদেব ঘোষ বলেছেন-
“চিত্রাঙ্গদা 1936 থেকে 1938 সাল পর্যন্ত মনিপুরী পদ্ধতির উপরেই বিশেষ করে গড়ে উঠেছিল, আর ছিল মালাবার প্রদেশ এবং বাঙলা ও অন্যান্য দেশের লোকনৃত্য, কিছুটা কথাকলি ও শান্তিনিকেতনের পূর্বোক্ত নানা প্রকার মিশ্রিত নাচ।“(রবীন্দ্রসঙ্গীত,পৃষ্ঠা 250)
তাঁর শিক্ষা ভাবনার মত নৃত্যভাবনাতেও সমন্বয়ের সুর ধ্বনিত হয়েছে।
 
শিক্ষাঙ্গণকে তিনি মানব সংস্কৃতির অনুশীলন কেন্দ্র বলে মন করতেন। তাই তাঁর শিক্ষায়তন সকল দেশের, সকল ধর্মের, সকল বর্ণের শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত ছিল। তাঁর শিক্ষাভাবনায় নতুনের সঙ্গে পুরাতনের, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের, তত্ত্বের সঙ্গে কর্মের যেমন সার্থক সমন্বয় ঘটেছিল তেমনি তাঁর প্রবর্তিত নৃত্যধারায় শাস্ত্রীয় নৃত্যের সঙ্গে লোকনৃত্যের, প্রাচ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্য- সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটেছিল। তাঁর চিন্তাধারার পূর্ণাঙ্গ রূপ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন সংক্ষিপ্ত ভারতবর্ষ হয়ে বিশ্ব- মানবের, বিশ্ব- সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র পরিনত হয়েছে- বিশ্বের দরবারে ভারতের বাণী পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।
 
তথ্যসূত্র :
1) রবীন্দ্রনৃত্যের রূপরেখা-শম্ভুনাথ ঘোষ ও অনিন্দিতা ঘোষ।
2) রবিরশ্মিতে আলোয় শান্তিনিকেতন-শর্মিষ্ঠা ঘোষ
3) কথ্থক নৃত্যের রূপরেখা- শম্ভুনাথ ঘোষ ও অনিন্দিতা ঘোষ
4) প্রশ্নোত্তরে ভরতনাট্যম- আদিত্য মিত্র
5) ভরতনাট্যম ও ওড়িষী নৃত্যের প্রবেশিকা- ড: মালা মৈত্র।

4 Comments
  • avatar
    পদাতিক পদাতিক

    10 May, 2021

    নৃত্য শিক্ষার একাল ও সেকালে কবিগুরুর প্রত্যক্ষ উদ্যোগের সুচিন্তিত ব্যবস্থাপনার সুদীর্ঘ আলোচনার জন্য লেখিকাকে অজস্র ধন্যবাদ। চমৎকার ভাবে উঠে এসেছে নাচের ক্ষুদ্রগন্ডি থেকে আজ বৃহৎ পরিসরে সমাজে সম্মাননা শিক্ষা,পেশা এমনকি বিনোদন হিসেবেও বাঙালি সমাজে উচ্চাসনে স্থান করে নেওয়ার প্রসঙ্গও। কবিগুরুর জন্মজয়ন্তীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। নিরন্তর শুভেচ্ছা লেখিকাকে।

  • avatar
    শিবানন্দ পাল

    12 May, 2021

    খুবই সুখপাঠ্য। অনেক কিছু জানা গেল।

  • avatar
    Sibananda Pal

    12 May, 2021

    খুবই সুখপাঠ্য। অনেক কিছু জানা গেল।

  • avatar
    লিপিকা ঘোষ

    08 June, 2021

    ধন্যবাদ নেবেন।

Leave a reply