সাম্প্রতিক ছাত্র যুব আন্দোলন প্রসঙ্গে
- 07 August, 2026
- লেখক: অনিন্দ্য সেন
“আন্দোলনই শেষ কথা, লক্ষ্য কিছুই নয়” — লেলিনীয় কাঠামোর অধীনে একেই একসময় ‘সংশোধনবাদ’ বলা হতো। লেলিন কিংবা তাঁর ‘বাদ’ বা মতবাদের দিন এখন অতীত। রাজনীতির বিশ্লেষণের ওই পদ্ধতিগুলো নিষ্ফল না হলেও, সম্পূর্ণ সেকেলে মনে করে তাকে তুচ্ছ করতে আমাদের মতো ভিন্ন ধারার কমিউনিস্ট বা বামপন্থীদের কোনো দ্বিধাবোধ নেই। তা সত্ত্বেও, কিছু শিক্ষা থাকে সর্বজনীন; গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মোড়ে যেগুলো বারবার আমাদের নতুন করে চিন্তা করায়।
গত এক মাস ধরে দেশজুড়ে যে তরুণ ছাত্র আন্দোলন ঝড় তুলেছে, তার গতিপ্রকৃতি প্রথমবার বিশ্লেষণ করলেই কয়েকটি অনন্য অর্জন আমাদের চোখে পড়ে:
১. বিচারবিভাগ যেভাবে সরকারের কাছে সম্পূর্ণ নতিস্বীকার বা দাসত্ব প্রকাশ করছিল, এই আন্দোলন ছিল তার বিরুদ্ধে এক মোক্ষম জবাব। বেকার যুবসমাজকে রূপক অর্থে ‘তেলাপোকা’ অ্যাখ্যা দিয়ে বিচারপতি সূর্যকান্ত যেভাবে গালাগাল করেছিলেন, তাতে আদালতের এই দাসত্বই প্রকাশ পেয়েছিল। এখন যেহেতু তাঁর প্রভূরা এই বিদ্রোহী তেলাপোকাদের সামনে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে, এটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ওই অহংকারী বিচারকের জন্য একটি ভালো শিক্ষা হওয়া উচিত!
২. এটি ছিল উগ্র ও নির্মম শাসনব্যবস্থা এবং ‘ভোট চুরি’ নামক জঘন্যতম নির্বাচনী জালিয়াতিতে অতিষ্ঠ জনতার ঐক্যের এক অসাধারণ প্রদর্শন। এই জমায়েতে ধর্মীয়, সামাজিক ও আঞ্চলিক ঐক্য ফুটে উঠেছিল, যার ফলে আন্দোলন কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
৩. রাজনৈতিক দলগুলো—বিশেষ করে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বামপন্থী দলগুলো—তাদের নিজেদের ভেদাভেদ ও তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের চিন্তা ভুলে যেভাবে একসাথে কাজ করেছে, তা ছিল এক দারুণ দৃষ্টান্ত।
৪. অংশ নেওয়া বহু সংগঠনের নানা ধরনের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ও প্রতিকূলতার মুখেও বামপন্থীরা কী করতে পারে এবং কীভাবে করতে পারে, এটি ছিল তার এক চমৎকার উদাহরণ। তারা একচুল জমিও না ছেড়ে পুরো সময় জুড়ে অবিচল, সৎ ও পরিশ্রমী ছিল।
৫. কৃষক আন্দোলনের মতো এটিও এমন একটি উদাহরণ তৈরি করল, যেখানে নিজেদের দাবি আদায় হওয়ার আগে আন্দোলন থামেনি।
৬. কেন্দ্রের বর্বর ক্ষমতার এই পরাজয় বর্তমান সরকারের ভয়ের রাজত্বকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছে। মানুষ আবারও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, ভয়ের উত্তর নিজেকে সঁপে দেওয়া নয়, বরং বিদ্রোহ করা। জনগণের এই অপরিসীম শক্তি তখনই আত্মপ্রকাশ করে, যখন নেতৃত্ব সাহসের সাথে রুখে দাঁড়াতে পারে এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে নেতা হয়ে ওঠার ক্ষমতা তৈরি হয়—এখানে আসল বিষয়টি হলো ইচ্ছাশক্তির ইতিবাচকতা।
তবে, সাফল্যের এই সমস্ত জাঁকজমকের নিচে কিছু মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন ঢাকা পড়ে যেতে পারে না:
এই আন্দোলন কি স্রেফ একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে সরিয়ে অন্য কাউকে বসানোর জন্য ছিল?
নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস আসলে কীসের ইঙ্গিত দেয়? এটি কি কিছু ব্যক্তির ভুল, নাকি পুরো ব্যবস্থারই ত্রুটিপূর্ণ রূপ?
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা কি সবসময় এমনই ছিল—যা কেবল সরকারি কিংবা বেসরকারি কোচিং ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ওপর ভর করে চলে?
উত্তর যদি ‘না’ হয় (যা নিশ্চিতভাবেই না), তবে কোনটা ভালো ছিল তা ঠিক করার সময় কি এখনো আসেনি?
শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া কি বাধ্যতামূলক?
এই প্রশ্নগুলো যদি খতিয়ে দেখা হয় এবং এনটিএ (NTA) ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার সাথে বেসরকারি কোচিং সেন্টারগুলোর অশুভ আঁতাত ফাঁস হয়, তবে মূল অপরাধী হিসেবে কী সামনে আসে?
এর স্পষ্ট উত্তর হলো: “শিক্ষার বেসরকারীকরণ”।
সোনম ওয়াংচুকের মতো পণ্ডিত মানুষের নজর এড়িয়ে এত স্পষ্ট একটি বিষয় কীভাবে চলে গেল?
“শিক্ষায় বেসরকারীকরণ বন্ধ করো”—এই স্লোগান জন্তর মন্তরের মূল মঞ্চে বা তার আশপাশে কোথাও দেখা গেল না কেন?
আমি নিশ্চিত যে এটি সমস্ত বামপন্থী সংগঠনের একটি অত্যন্ত মৌলিক স্লোগান; তবে কেন তারা এই উর্বর জমিতে সেই চেতনার বীজ বোনার চেষ্টা করা উপযুক্ত মনে করল না? এটা কি কোনো ভুল ছিল, নাকি আন্দোলনে সম্ভাব্য কোনো ফাটল এড়ানোর কৌশল ছিল?
কারণ যাই হোক না কেন, আন্দোলনকারীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঘরে ফেরার আগেই এই দাবিটিকে সামনে নিয়ে আসার এখনই উপযুক্ত সময়। কারণ, শিক্ষার এই বেসরকারি পরিকাঠামো ভেঙে ফেলা না হলে এই অশুভ আঁতাত রয়েই যাবে এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে।
আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে যে, কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু না হলে স্রেফ প্রহরী বা মন্ত্রী বদলে কোনো লাভ হবে না।
আমরা নিশ্চিতভাবেই এই মুহূর্তটিকে উদ্যাপন করতে পারি, তবে এটি মনে রেখে যে এটি বড়জোর একটি যুদ্ধে জয় মাত্র — যে মূল যুদ্ধ, তা আমাদের সবদিক থেকেই চালিয়ে যেতে হবে।