আখ্যানপাঠ : দেবী চৌধুরাণী
- 07 September, 2026
- লেখক: সৌভিক ঘোষাল
১
রংপুরের স্থানীয় ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বঙ্কিম ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসটি লেখেন। বঙ্কিম নিজেও একে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলতে চান নি, বঙ্কিম বিশ্লেষকেরাও একে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলার পক্ষপাতী নন। তবে এই উপন্যাসের সঙ্গে সমকালীন ঘটনাবলীর যে সংযোগ আছে, তা প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ প্রকাশিত বঙ্কিম শতবার্ষিকী সংস্করণের ভূমিকায় তুলে ধরেছেন। আচার্য যদুনাথ দেখিয়েছেন যে, সেই সময়কার রংপুরের ঘটনাবলী সম্পর্কে সরকারী কাগজপত্রে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরাণী সম্পর্কে কিছু স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। সেই সরকারী নথি আমাদের জানায় যে, ১৭৮৭ সালের জুন মাসে, লেফটেন্যান্ট ব্রেনান ভবানী পাঠক নামের এক কুখ্যাত ডাকাত সর্দারের বিরুদ্ধে অভিযানে নিযুক্ত হন। তিনি ২৪ জন সিপাহি সহ একজন দেশীয় অফিসারকে পাঠান, যারা পাঠক এবং তার ৬০ জন অনুসারীকে নৌকায় থাকা অবস্থায় অতর্কিতে ঘিরে ফেলে। সেখানে একটি সংঘর্ষ ঘটে যাতে পাঠক নিজে এবং তার তিনজন লেফটেন্যান্ট নিহত হন এবং আটজন আহত হন; এছাড়া ৪২ জনকে বন্দি করা হয়। লেফটেন্যান্টের রিপোর্ট থেকে আমরা দেবী চৌধুরাণী নামের একজন নারী ডাকাতের কিছুটা আভাস পাই, যিনি পাঠকের সাথে জোটবদ্ধ ছিলেন। তিনি নৌকায় বসবাস করতেন, তার অধীনে এক বিশাল বরকন্দাজ বাহিনী বেতনভুক্ত ছিল এবং তিনি পাঠকের পাওয়া লুটের মালের অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগেও ডাকাতি পরিচালনা করতেন। তার চৌধুরাণী উপাধিটি নির্দেশ করে যে তিনি একজন জমিদার ছিলেন — সম্ভবত একজন ছোট জমিদার, তা না হলে বন্দি হওয়ার ভয়ে তাকে নৌকায় বাস করতে হতো না।
লেফটেন্যান্ট ব্রেনানের রিপোর্ট পাওয়ার পর, ১৭৮৭ সালের ১২ই জুলাই রংপুরের কালেক্টর তাকে লেখেন, ... "আপনার চিঠিতে উল্লেখিত নারী ডাকাতটির বিষয়ে আমি বর্তমানে আপনাকে কোনো আদেশ দিতে পারছি না। আপনার পাঠানো কাগজপত্র পরীক্ষা করার পর যদি মনে হয় যে তাকে গ্রেপ্তার করার পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে, ... তবে আমি আপনাকে প্রয়োজনীয় আদেশ পাঠাব।" (যদুনাথ সরকার উল্লিখিত ইংরাজি নথির বাংলা অনুবাদ।)
শুধু এই নির্দিষ্ট সরকারী নথিই নয়, সেকালের সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিবেশকেও বঙ্কিম যথাযথভাবে এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আচার্য যদুনাথ এই যুগের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উক্ত গ্রন্থভূমিকায় আমাদের জানান যে, ওই সময়ে বাংলায় খাজনা আদায়ের ব্যবস্থায় এক চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। রাজা টোডরমল জমি মেপে প্রজার কাছ থেকে নির্দিষ্ট খাজনা ঠিক করার যে পদ্ধতি চালু করেছিলেন, তা বাংলার অধিকাংশ জায়গায় পৌঁছানোর সুযোগই পায়নি। বাংলার সুবাদার বা দিল্লির সম্রাট সাধারণত স্থানীয় জমিদারদের কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট থোক টাকা পেলেই সন্তুষ্ট থাকতেন। তা-ও আবার সব জেলায় এমনটা হতো না।
মানসিংহ বাংলা জয় করার পর কেবল রাঢ় অঞ্চল থেকেই নিয়মিত ও নির্দিষ্ট খাজনা পাওয়া যেত। পরে ইসলাম খাঁর সময়ে পুরো রাজশাহী অঞ্চল বশে আসে, এবং তারও পরে ঘোড়াঘাট অঞ্চল (বর্তমান বগুড়া, দিনাজপুর ও রংপুরের সংযোগস্থল) সরকারি খাজনা দিতে শুরু করে। আর ময়মনসিংহ জেলা তো এরও প্রায় একশো বছর পর, মুর্শিদকুলী খাঁর কঠোর শাসনের অধীনে এসে নিয়মিত রাজস্ব দিতে শুরু করে। এর পেছনে তাঁর তৈরি করা নতুন বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদারদের বেশ বড় অবদান ছিল।
এভাবে দেশে ধীরে ধীরে শান্তি ও সুশাসন বাড়ার সাথে সাথে পুরো বাংলা থেকে আদায় হওয়া মোট রাজস্বের পরিমাণও বাড়তে থাকে। মুর্শিদকুলী খাঁ প্রথম আকবরের আমলের রাজস্বের হারকে ছাড়িয়ে যান। আলিবর্দী খাঁ তা আরও কয়েক লাখ টাকা বাড়িয়ে দেন। আর শেষে ভাগ্যের বলি মীর কাশিম, ইংরেজদের চরম শোষণে টিকতে না পেরে, প্রজার ওপর খাজনার হার অসম্ভব রকম বাড়িয়ে তোলেন।
কিন্তু পলাশী ও পরবর্তী কিছু যুদ্ধে নবাবের শক্তি যখন ভেঙে পড়ল, তখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হলো। ইংরেজরা তখনো কেবল ব্যবসাই করতে চাইছিল, দেশের শাসনের দায় নিতে তখনো তাঁদের দ্বিধা ছিল। তাদের একটাই লক্ষ্য ছিল — যেমন করেই হোক খাজনার টাকা আদায় করা। ঠিক এই সময়ে সীমান্ত জেলাগুলোতে শান্তি হারিয়ে গেল, অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ল আর প্রজারা দিন দিন গরিব হতে থাকল। সমস্যা বাড়ল ইংরেজদেরও। প্রজার হাতে টাকা না থাকলে খাজনা আসবে কোথা থেকে?
মীরকাশিমের বসানো বাড়তি খাজনা মেটানো মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেল। তখন সরকারি তহসিলদাররা প্রজাদের ওপর মারধর শুরু করল এবং নিজের পকেট ভরতে দেশজুড়ে লুটপাট চালালো। ঠিক যেমনটা অযোগ্য নবাবদের আমলে অযোধ্যায় হতো — খাজনা আদায় করতে সৈন্য বা কামান পাঠাতে হতো — এখানেও ঠিক তা-ই শুরু হলো।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসের যুগে ইংরেজরা অস্থায়ী ভিত্তিতে জমি ইজারা দিত। নিলামে যে সবচেয়ে বেশি দাম হাঁকত, তাকে এক বছরের জন্য (পরে একবার পাঁচ বছরের জন্য) জমিদারি দিয়ে দেওয়া হতো। ইতিহাসের যেকোনো দেশেই দেখা গেছে, এই কুপ্রথার পরিণতি চরম প্রজাপীড়ন, চাষবাসের ক্ষতি, জমিদারের দেউলিয়া হওয়া এবং রাজার রাজস্ব কমে যাওয়া। দেশের এই চরম দুর্দিনের ছবি বঙ্কিমচন্দ্র একদম হুবহু এঁকেছেন, এতে কোনো বানিয়ে বলা বা বাড়িয়ে বলা কথা নেই।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে মফস্বলে শান্তি আনেন, প্রজাদের মুখে হাসি ফোটান এবং সরকারের নির্দিষ্ট আয়ের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু যখন এই শান্তি এলো, ততদিনে “দেবী চৌধুরাণী মারা গেছে”। অর্থাৎ, প্রফুল্ল এখন একপাল গোলগোল চোখের নাতি-নাতনি মানুষ করতে ব্যস্ত, আর ডাকাত-রাণীর বজরাও ভেঙে ফেলা হয়েছে। দেশে সুসংগঠিত আইন, আদালত ও বিচার ব্যবস্থা চালু হওয়ায় দেবী চৌধুরাণীর মতো ডাকাত-রাণীর প্রয়োজনও তখন কমে এসেছিল বলে আচার্য যদুনাথ মনে করেছেন।
২
দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসে সমাজসত্তার আকার বা গঠনটিকে আমরা বেশ স্পষ্টভাবেই দেখতে পাই। প্রফুল্লর মা কীভাবে মেয়ের ভাগ্য সুরক্ষিত করার তাগিদে বিবাহভোজে নিজের সাধ্যাতীত আয়োজন করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত তাল রাখতে পারেন নি। এর মধ্যে দিয়ে তিনি প্রতিবেশীদের চটিয়ে দিলেন আর তারাও অপমানিত হয়ে তাদের বিষ নখ দাঁত বের করে একযোগে অপবাদ ছড়ালো। মায়ের কুলটা প্রবৃত্তির বানানো গল্প পল্লবিত আকারে প্রফুল্লের শ্বশুরের কানে পৌঁছে দেওয়া হল। গ্রাম সমাজের মুরুব্বীদের এই নীচতা কীভাবে একটি মেয়ের জীবন ধ্বংস করল তা ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে বেশ স্পষ্ট করেই দেখিয়েছেন বঙ্কিম। ক্ষমাযোগ্য এক সাধারণ ত্রুটিকে উপেক্ষা না করে কতটা প্রতিশোধ পরায়ণ হতে পারে বাংলার গ্রামসমাজ, পরবর্তীকালে শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাসে তা আমরা বারবার পেয়েছি, দেখেছি সমাজের নির্দয় আচরণের বলি হওয়া ভাগ্য বিড়ম্বিতাদের অনেক ছবি। বঙ্কিমের হাতে তার অন্তত একটি এখানে বেশ স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছে।
গ্রামসমাজের নীচতা যদি সমাজমনের একদিককে ফুটিয়ে তুলে থাকে, তাহলে অন্য একটি দিককে ফুটিয়ে তুলেছে হরবল্লভের আচার আচরণ। সামন্তী জমিদারদের দাপট ও নীচ মনোবৃত্তির যাবতীয় উপাদান হরবল্লভ আখ্যানের মধ্যে বঙ্কিম নিয়ে এসেছেন। প্রফুল্ল গরীব ঘরের মেয়ে বলেই অমন অন্যায় দাপট তিনি প্রফুল্ল ও তার মায়ের ওপর দেখাতে পারলেন, যা সাগরের ধনী বাবার ক্ষেত্রে দেখানোর সাহস ও সুযোগ তার হয় নি। শুধু তলার দিককার মানুষকেই যে সামন্তী মানসিকতা নিষ্পেষণ করে তাই না, নিজের পুত্র পরিবারকেও সে সম্পত্তি হিসেবেও দেখে। ব্রজেশ্বর কিছু মৃদু কাকুতি মিনতি কেবল করতে পারে বাবার কাছে, তাও অনেক সময়েই মায়ের মাধ্যমে। তবে স্ত্রী পুত্রের মন মানসিকতা ইচ্ছে অনিচ্ছেকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিতে হরবল্লভের সামন্তী জমিদার মানসিকতা প্রস্তুত নয়। এই ধরনের চরিত্রের মধ্যে নৈতিকতার যে বিশেষ কোনও বালাই থাকে না, বরং প্রবল অর্থলোভ সমস্ত ধরনের নীতি নৈতিকতাকে বলি দিতে প্রস্তুত থাকে তার প্রমাণ বঙ্কিম রেখেছেন অসময়ে সহায়তাকারী দেবী চৌধুরাণীকেই ধরিয়ে দেওয়ার জন্য হরবল্লভের গোপন ষড়যন্ত্রের ঘটনাটির মধ্যে।
ব্রজেশ্বরের মতো চরিত্র কখনোই এই পিতৃতান্ত্রিকতার বাইরে বেরোতে পারে না। এর পেছনে একদিকে যেমন থাকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার হারানোর ভয়, অন্যদিকে থাকে পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম ধরনের শুকনো কিছু আপ্তবাক্য। কেন ব্রজেশ্বরের মতো যুবক বাবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে না, এই ভেবে আজকের পাঠক ক্ষুব্ধ হতে পারেন, কিন্তু বঙ্কিম তার নায়ককে একটি গণ্ডির মধ্যে রাখাই সমীচীন ও বাস্তব বলে মনে করেছেন।
এই বাস্তবতার আদলেই বঙ্কিম প্রফুল্ল চরিত্রকেও গড়েছেন। প্রফুল্লকে পরবর্তীকালে ভবানী পাঠকের চোখ দিয়ে ঔপন্যাসিক যতই মহিমান্বিত করে দেখান না কেন, প্রফুল্ল চরিত্রের মধ্যে প্রথম পর্বে সেই জ্যোতি ছিল না। প্রফুল্ল কায়ক্লেশের কষ্টকর জীবন আর সইতে না পেরে স্বামী শ্বশুরের ঘরে যখন গেছে, তখন নিজের বিবাহ সম্পর্কের জোরে সে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হবার চেষ্টা করে নি, ঘরের এক কোণে আশ্রয়প্রাপ্তির মধ্যেই খুশি থাকতে চেয়েছে। সেইটুকু আশ্রয়ও তার জোটে নি। শ্বশুর হরবল্লভের নীচতা ও সামন্তী মানসিকতার প্রকাশ এই উপন্যাসে আগাগোড়া ছড়িয়ে আছে। সেই সামন্তী দাপট পেরিয়ে প্রফুল্লর পক্ষে দৃঢ় আত্মপ্রকাশ বাস্তবোচিত হত না। বঙ্কিম প্রফুল্লকে লার্জার দ্যান লাইফ করে বাস্তবতাকে ভাঙতেও চান নি। প্রফুল্ল সমাজের স্বাভাবিক মাপে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই থেকে গেছে। এ কারণেই সে কীভাবে দেবী চৌধুরাণী হয়ে উঠতে পারল, ভবানী পাঠক তার মধ্যে কী বৈশিষ্ট্য দেখে তাকে এই কাজের জন্য বেছে নিলেন - তা আমাদের কাছে বেশ খানিকটা কুয়াশাচ্ছন্নই থেকে যায়। তবে দেবী চৌধুরাণী হয়ে থাকার পর্বেও তার মধ্যে যে ফেরার টান, স্বামীসোহাগ আর সংসারের প্রতি আকুতি আমরা দেখেছি, তা বুঝিয়ে দিয়েছে প্রফুল্ল থেকে দেবীরাণীতে রূপান্তর কোনও রাসায়নিক পরিবর্তন হয়ে ওঠে নি, কেবলই এক ধরনের বাইরের ভৌত পরিবর্তন হয়ে থেকেছে, যা সহজেই পূর্বরূপে ফিরতে পারে।
ইতিহাস অংশের চেয়ে ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসের পারিবারিক অংশটির নান্দনিক আবেদন খানিকটা বেশি বলেই মনে হয়। এই উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল নায়িকা চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব৷ প্রফুল্ল না দেবী চৌধুরাণী - কোন ভূমিকাটি তার জন্য যথাযথ, এই প্রশ্ন উপন্যাসের নায়িকাকে দীর্ঘ সময়পর্ব জুড়ে তাড়িত করেছে।
নিয়তি নির্বন্ধে স্বামী সংসারের সুখ প্রফুল্ল পায়নি। ধনী জমিদার পরিবারের পুত্রবধূ হয়েও বিধবা মায়ের সঙ্গে পিতৃগৃহে কায়ক্লেশে তাঁকে দিন কাটাতে হয়েছে। স্বামী ব্রজেশ্বর প্রফুল্লকে সংসারে বরণে আগ্রহী হলেও প্রবল প্রতাপান্বিত জমিদার পিতা হরবল্লভের সামন্তী মেজাজ ও নির্দেশের বাইরে গিয়ে সে কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব হয় নি৷ এরপর উপন্যাসের ঘটনাগতি তীব্র নাটকীয় গতিতে একের পর এক বিরাট বিরাট মোড় নিয়েছে। একমাত্র আশ্রয় মায়ের মৃত্যুর পরে প্রফুল্লকে কুচরিত্রের পুরুষেরা তাদের লোভের শিকার বানাতে চেয়েছিল। অপহৃতা প্রফুল্ল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাবার সময়ে কোনও রকমে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপর শুরু হয় তার জীবনের দ্বিতীয় পর্ব৷ এক বৈষ্ণব তাকে মৃত্যুমুহূর্তে বিপুল ঐশ্বর্যের খোঁজ দিয়ে যান। সেই ঐশ্বর্যের সূত্র ধরেই তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় ডাকাত দলের প্রধান ভবানী পাঠকের। ভবানী পাঠক প্রফুল্লকে গড়ে তুললেন দেবী চৌধুরাণী হিসেবে আর দিলেন এক বিরাট ডাকাত দলের সর্বোচ্চ প্রেরণা দাত্রী ও নেত্রীর স্থান। একদিকে শস্ত্র ও অন্যদিকে শাস্ত্রে দশ বছরের নানাবিধ শিক্ষাক্রমের পর প্রফুল্ল দেবী চৌধুরাণীতে রূপান্তরিত হল। কালক্রমে আশেপাশে সর্বত্র ডাকাতরাণী হিসেবে সুনাম ও দুর্নাম বিঘোষিত হল। একদিকে জমিদার থেকে ইংরেজ শাসক সকলেই সেই নামে তখন ত্রস্ত ও বিব্রত৷ অন্যদিকে গরীব মানুষের কাছে দেবী চৌধুরাণী আবার অনেকটাই যেন দেবী অন্নপূর্ণা। তারা দেবীর কাছ থেকে অভাব অনটনে বিপুল সাহায্য সহযোগিতা পেত। দেবীর প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতা, আনুগত্য ও ভালোবাসার অন্ত ছিল না।
ব্রজেশ্বর ও তাঁর বাবা যখন দেবী সিং এর অত্যাচারে ও অনাচারে ঋণগ্রস্থ হয়ে জেলে যেতে বসেছেন সেই সময় দেবী চৌধুরাণী বিপুল অর্থমূল্য দিয়ে ব্রজেশ্বর পরিবারকে রক্ষা করে। গরীবদের দান ধ্যানের রেওয়াজ থাকলেও অন্য কোনও জমিদারকে দেবী চৌধুরাণীর অর্থসাহায্য প্রদানের দ্বিতীয় কোনও নিদর্শন নেই৷ এই দানের পরিমাণও ছিল বিরাট। সেকালের পঞ্চাশ হাজার টাকার বর্তমান অর্থমূল্য পাঁচ কোটি টাকার বেশি বই কম হবে না। এই বিপুল অর্থ যে আসলে দেবী চৌধুরাণীর খোলসের ভেতরে জেগে ওঠা প্রফুল্লর নারীসত্তার দান - সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। সজল চোখে ব্রজেশ্বরের হাতে আংটি পরানো আর তারপর নৌকোর পাটাতনে শুয়ে ডুগরে কান্নার দৃশ্যটি আমাদের বলে দেয় দেবী চৌধুরাণীর নির্মোক খসিয়ে প্রফুল্ল এবার গৃহ প্রত্যাবর্তনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দশ বছর আগের এক রাতের স্বামীসঙ্গ সুখের আতপ্ত স্মৃতি প্রফুল্ল কখনোই ভুলতে পারে নি। দ্বিতীয় দর্শনে ব্রজেশ্বরের একটি উত্তপ্ত চুম্বন তার চেপে রাখা কামনা বাসনার সমস্ত বাঁধ ভেঙে দেয়। দেবী চৌধুরাণী ঠিক করে নেন যেন তেন প্রকারেণ পুনরায় প্রফুল্ল হয়ে তাঁকে স্বামী সংসারে প্রবেশ করতেই হবে। ঘটনার নানা ঘনঘটা পেরিয়ে শেষমেষ সংসারে পুন:প্রতিষ্ঠ হয়ে প্রফুল্ল বুঝতে পারে এটাই তার প্রকৃত ধর্মপালন।
৩
অনুশীলন ধর্মের বিশেষ তত্ত্বভাবনা বঙ্কিমের শেষপর্বের উপন্যাসগুলিতে আছে বলে মনে করা হয়। এর আগে সেই অনুশীলন ধর্ম পালনের একটি ছবি আনন্দমঠে পাঠক পেয়েছিলেন। পরে আবার পাবেন সীতারামে। এই দুয়ের মাঝে লিখিত দেবী চৌধুরানীতেও তা আছে। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে ‘সমাজদৃষ্টি : বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ’ বইতে যে মূল্যবান আলোচনাটি করেছেন, তা দেখা যাক।
বঙ্কিম অনুশীলনধর্মের মধ্য দিয়ে মানুষ গড়ার Formula দিয়েছেন। কিন্তু কি জন্য? সমকালীন লোকধর্মের মান কি এতই নীচু ছিল যে আদর্শের দ্বারা তার উন্নয়নের কথা ভাবা হয়েছিল? অথবা অনুসরণযোগ্য ব্যক্তিত্বের দিক থেকে সমাজ অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়েছিল? যে সময়ে অনুশীলন তত্ত্বের পরিকল্পনা, সে-সময়ে ক্রমবর্ধমান জাতীয়তার কাছে লোকসাধারণ আত্মস্বার্থত্যাগের প্রেরণা পাচ্ছিল। আত্মস্বার্থমুখিতা উনিশ শতকের শেষ দিকে জাতীয় স্বভাবের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এমনটা মনে হয় না। আর সংস্কৃতিতে, ধর্মে, সামাজিক আন্দোলনে, রাজনৈতিক চেতনায় বঙ্কিমের আশেপাশে বড়ো মাপের ব্যক্তিত্ব একেবারে ভরেছিল বলতে হবে। তাহলে সামাজিক প্রয়োজনবোধের অপরিহার্যতা থেকে এরকম তত্ত্বাদর্শ নিশ্চয়ই জন্ম নেয়নি।
অনুশীলন ধর্মের কেন্দ্রভূমে ছিল গীতার নিষ্কাম কর্মযোগের সূত্র। তার পরিধি বা বেড় তৈরী হয়েছিল প্রভূত মানুষের সামাজিক হিতসাধনের পরিকল্পনা নিয়ে। হিতবাদ ও ধ্রুববাদে মন্ত্রদীক্ষা নিয়েছিল উনিশ শতকের শিক্ষিত বাঙালী। অধিক সংখ্যক মানুষের বাহ্য উন্নতি সাধনের আকাঙ্ক্ষা সমাজ সচেতন মানুষের অন্তরকে ভিতর থেকে ধাক্কা দিয়ে ক্রমেই বিচলিত করে তুলেছিল। বঙ্কিম পাশ্চাত্য যুক্তিধর্মের সঙ্গে হিন্দু আদর্শের মিশ্রণে তৈরী করতে চাইলেন এমনই এক ফর্মুলা, যাতে তাঁর চিন্তা স্বাতন্ত্রিকতার ছাপ থাকে, আবার সংস্কারমুক্ত বিচারপ্রবণ হিন্দুত্বের একটা নব্য standard পাওয়া যায়।
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালীর মধ্যে এমনিতেই কাজ করতো এক ধরনের literary ego, তদুপরি বঙ্কিমের Formal শিক্ষার প্রামাণিক ছাপটি থাকায় এক শ্রেণীগত শ্রেয়োবোধ তাঁর অবচেতনের গভীরে প্রায়শই কাজ করতো। সুতরাং পাশ্চাত্য যুক্তিধর্মের সাহায্যে সাবেক শাস্ত্রনীতির নতুন ব্যাখ্যা দিলে গঠনমূলক প্রস্তাবের প্রবর্তনার আনন্দও থাকে, বিজাতীয় শিক্ষার স্বীকারণের মাত্রাটাকেও চেনা যায়। পৌত্তলিক বিশ্বাসের ধারায় দাঁড়িয়ে দেবপুজাকেই ধর্মজ্ঞান না করে বঙ্কিম ধর্মাচিন্তার একটা নতুন মান তৈরী করতে চেয়েছিলেন। মনুষ্যধর্মের সম্যক বিকাশ সাধনই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এতে সংস্কারভুক্তির বদনামটাও রইলো না, আবার সমকালীন মানবতাবাদের সঙ্গে জোরালোভাবে তাল রক্ষাও করা গেল।
অনুশীলন তত্ত্বের প্রচারমূল্য যতটা, তার তৎকালীন সামাজিক ফলপ্রসূতা নিশ্চয়ই ততটা ছিল না। অন্ততঃ সেকালে এই মতবাদের সুফলপ্রাপ্তির হিসাব নেবার চেষ্টাও কেউ করেননি। বঙ্কিম উপন্যাসত্রয়ীতে অনুশীলন ধর্মের সাফল্যের একটাও জবরদস্ত দৃষ্টান্ত তৈরী করতে পারলে ব্যাখ্যাটা অন্যভাবে সাজানো চলতো। কিন্তু কেবলই বিফলতার দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে একটা প্রবর্তিত ফর্মুলার hardship সম্বন্ধে সচেতন করিয়ে তার দ্বারা কিই বা সামাজিক লাভ পাওয়া যায়? কাজেই মনে হতে পারে, অনুশীলনধর্মের সঙ্গে বঙ্কিমের আত্মপ্রসাদের একটা গভীর যোগাযোগ ছিল।
হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের এক প্রধান স্তম্ভ ছিলেন বঙ্কিম। উনিশ শতকের উত্তরার্ধে পুনরুজ্জীবনবাদীরা শুধুই ধর্মমুখী আন্দোলনে না নেমে রাজনৈতিক অনুভব্যের একটি সামান্তরালগামী স্রোতকে রক্ষা করে চলেছিলেন। ছয়, সাত ও আটের দশকে এঁদেরই নানান আনুষ্ঠানিকতায় জাতীয়তার বোধকে লালন করতে দেখা যায়। ১৮৮৫তে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবন ধারার সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিধারার আনুষ্ঠানিক সংমিশ্রণেরই ফল। ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরাই কর্তৃত্ব করে এসেছেন, একথা বিংশ শতকের প্রারম্ভ থেকেই উঠতে শুরু করে।
রাজনৈতিক আন্দোলন শুধুই রাজনৈতিক চেতনার উপর সংগঠিত হলে তার এক চেহারা হয়, আর কেন্দ্রগত ধর্মভাবনা তার গভীরে ক্রিয়া করতে থাকলে তার গঠন অন্য প্রকারের হয়। ভারতীয় রাজনীতির জন্মলগ্নে ধর্মস্থিতি তার প্রধান ভিত্তি ছিল বলেই রাজনীতিতে কর্মসূচীভিত্তিক আন্দোলন পরিচালনার পাশাপাশি চিত্তশুদ্ধির কথা উঠেছিল অঙ্গাঅঙ্গিভাবেই। রাজনীতিক কর্মযোগীদের নৈতিক চিত্তশুদ্ধি আগে প্রয়োজন, একথা বহুদিন পর্যন্ত সরবে বলার চেষ্টা করেছেন রাজনীতিবিদেরা। গান্ধীজির প্রধান স্লোগানই ছিল তাই। কাজেই অনুশীলনধর্মকে উনিশ শতকের ধর্ম ও রাজনীতির মিশ্র অনুভবের মাপকাঠিতে দেখলে, বঙ্কিমের এই তত্ত্বপ্রচারের আর একটা পটভূমি পাওয়া যায়। অনুসৃত হোক অথবা না হোক, লোকমনে দাগ কাটুক অথবা না কাটুক, চেতনার কোন এক শুভক্ষণের প্রত্যাশায় তা বারে বারে প্রচারিত হতেই থাকবে। যে সময়ে ব্রিটিশ শত্রু নিধনের জন্য শক্তি উপাসনার মধ্যে মন্ত্রদীক্ষার ব্যবস্থা ছিল, সে সময়ের কর্মযোগীদের রাজনৈতিক প্রত্যয়ের মর্মমূলে বসে ছিল ধর্মভাবনা। সুতরাং এ জাতীয় প্রচারধর্মে মানুষের মনে দাগ কাটবেই, এ প্রত্যাশা প্রচারবিদের পক্ষে একেবারেই অমূলক ছিল না।
সনাতন ধর্মপন্থীরা গুপ্ত সংগঠনের অনুশীলনমুখী ক্রিয়াকলাপে সব সময়েই খুশী হন, আজও সমানভাবে তা দেখা যায়। কারণ নৈতিক শৃঙ্খলাকে চোখের মণির মতোই গুপ্ত সংগঠনে রক্ষা করা হয় বলেই তাঁরা ভাবেন। বঙ্কিম আনন্দমঠের ক্রিয়ামূলক অনুষ্ঠানে, প্রফুল্লের পাঁচ বৎসর ব্যাপী শিক্ষায় ধ্রুব লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রস্তুতির একটা খসড়া পেশ করেছেন। ঐ সব ক্রিয়াকে অনুশীলনধর্মের অন্তর্গত করে বঙ্কিম গুপ্ত সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সহমর্মিতার কথা বোঝাতে চেয়েছেন। সনাতন ধর্মের পক্ষে থেকে প্রাতিষ্ঠানিকতাকে অক্ষত রাখতে চেয়ে এই জাতীয় কর্মকাণ্ডের প্রতি জোরালো affection জানানো বঙ্কিমের মতো সাহিত্যিকের পক্ষে খুবই সম্ভব।
ইতিহাসের পক্ষপুটে আশ্রয় নেওয়া বঙ্কিমই যে কিভাবে সমকালীন রাজনৈতিক অনুভবের কাছাকাছি এসে পড়েছিলেন, তারই সাক্ষ্য দৃষ্টান্ত হিসাবে বিষয়টিকে দাঁড় করানো যেতে পারে। বঙ্কিমের ত্রয়ী উপন্যাসের তত্ত্বাদর্শগত উপযোগিতা থাকুক আর না থাকুক, সমকালের রাজনৈতিক সংস্পর্শে বঙ্কিমের মন এখানে এসে সত্যিই দাঁড়াতে চেয়েছিল। মৃণালিনী, চন্দ্রশেখর ইত্যাদি উপন্যাস থেকে পরিবর্ধিত হয়ে আসা জাতীয় অভীপ্সা ত্রয়ী উপন্যাসের ক্রিয়ানুষ্ঠানে নিজেকে মেলে ধরতে চাইছিল। এদিক থেকে অনুশীলনধর্মকে শুধুই ধর্মীয় ফর্মুলা বলে মনে হবে না, বরং রাজনৈতিক অভিলাষের একটি অসংগঠিত অস্বচ্ছ দলিল হিসাবেও একে গণ্য করা চলবে। আনন্দমঠ সম্বন্ধে একথা তো অবশ্যই খাটবে।
কংগ্রেসের গণভিত্তি সম্বন্ধে সংশয় নিয়েই বঙ্কিম তার লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিগত সামর্থ্য সম্বন্ধে অনাস্থাই প্রকাশ করেছিলেন। বঙ্কিম তাঁর জীবৎকালে বাংলা দেশে কৃষক আন্দোলনের ঘটনা সম্বন্ধে পরিচিত হওয়ার অবকাশ পেয়েছিলেন। বিচার বিভাগের সঙ্গে কর্মসূত্রে যুক্ত হওয়ার এ সুযোগ তাঁর পক্ষে অনায়াস ছিল। ইংরাজি প্রশাসন সম্পর্কে মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও আন্দোলন দমন প্রসঙ্গে কৃষিজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলনের পক্ষে বঙ্কিম দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেস পন্থার বিকল্প উদ্যোগ হিসাবে সাংগঠনিক সামর্থ্যের অন্য কোন প্রত্যয়ে স্থিত হ'তে চাইছিল তাঁর মন। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে দেবী চৌধুরাণীর কথা। ঐ উপন্যাসে ৩য় খণ্ডের ১মে পরিচ্ছেদে দেবীরানীর বরকন্দাজ সেনাদের পরিচয় দিতে গিয়ে সোৎসাহে লাঠির মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন বঙ্কিম।
'হায় লাঠি! তোমার দিন গিয়াছে।...........লাঠি! তুমি বাঙ্গালায় আরু পর্দা রাখিতে, মান রাখিতে, ধান রাখিতে, ধন রাখিতে, জন রাখিতে, সবা মন রাখিতে। মুসলমান তোমার ভয়ে ত্রস্ত ছিল, ডাকাইত তোমার জ্বালায় ব্যস্ত ছিল, নীলকর তোমার ভয়ে নিরস্ত ছিল। তুমি তখনকার পীনালকোড ছিলে—তুমি পীনালকোডের মতো দুষ্টের দমন করিতে, পীনালকোডের মতো শিষ্টেরও দমন করিতে,.........হায়! এখন তোমার সে মহিমা গিয়াছে।'
লাঠি, সড়কী, বর্শা, তীর-ধুকই ছিল সেকালে কৃষক প্রতিরোধ সংগ্রামের হাতিয়ার। ঐ সব হাতিয়ারের সামর্থ্য সম্বন্ধে এরূপ সপ্রশংস Certificate দেওয়ার অর্থই হলো হাতিয়ার-চালনাকারীদের প্রতি পরোক্ষ সহমর্মিতা পোষণ করা। সন্ত্রাসবাদী স্বদেশীদের কাছে আনন্দমঠ এমনিতেই বেদ হয়ে ওঠেনি। ১৮৮৩ খ্রীঃ ভারত সভার সভ্য হ'ন বঙ্কিম। আইনানুগ পন্থায় রাষ্ট্রীয় আন্দোলন পরিচালনাই ছিল ঐ সভার লক্ষ্য। ঐ সভার সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে বঙ্কিমের মনে প্রশ্ন যে ছিলই, এই সব দৃষ্টান্তগুলি তা প্রমাণ করে। সুতরাং ত্রয়ী উপন্যাসের তত্ত্ব ভিত্তি সেকালের মানুষের মনে দাগ না কাটলেও তার প্রতিরোধ ও সংগ্রামের পদ্ধতিগুলি মানুষকে প্রবলভাবেই উৎসাহিত করেছিল।
৪
বাংলা উপন্যাসের প্রথম ইতিহাসকার আচার্য শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, ‘আনন্দমঠ’-এর মতো ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসেও ধর্ম ও আদর্শের ছাপ থাকলেও, এর মূল ভিত্তিটা কিন্তু সাধারণ ও বাস্তব সামাজিক জীবনের। সামাজিক অন্যায়, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং গৃহধর্মের জয়ই এখানে মূল প্রাধান্য পেয়েছে। প্রফুল্লকে নিষ্কামধর্মে দীক্ষিত করে দস্যুদলের নেতা বানিয়ে আবার ঘরের বউ বানিয়ে ফিরিয়ে আনাটা অনেক সমালোচকের কাছেই কিছুটা অসঙ্গতিপূর্ণ ও অতিরিক্ত মনে হয়েছে। গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, ধর্মতত্ত্ব বা কঠোর দীক্ষা প্রফুল্লের ভেতরের কোমল নারীহৃদয়, স্বামীপ্রেম এবং গৃহলক্ষ্মীর রূপকে মুছে ফেলতে পারেনি।
ব্রজেশ্বরের চরিত্র বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে শ্রীকুমারবাবু স্কটের নিষ্প্রাণ নায়ক চরিত্রদের তুলনায় এই বঙ্কিমী নায়কের বহুস্তরিক বিশিষ্টতার কথা বলেছেন। তাঁর মতে স্কটের রূপকথার মতো নিখুঁত বা প্রাণহীন নায়কদের থেকে ব্রজেশ্বর আলাদা। তার চরিত্র সজীব এবং বাস্তব। বহুবিবাহের টানাপোড়েন, পরিহাসপ্রিয়তা, বৈষয়িক ঝামেলা এবং গভীর পিতৃভক্তির মাঝেও প্রফুল্লের প্রতি তার সংযত প্রেম তাকে মাটির কাছাকাছি মানুষের রূপ দিয়েছে।
শ্রীকুমারবাবুর মতো বঙ্কিম সাহিত্যের আর এক বিশিষ্ট আলোচক আচার্য সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত মহাশয়ও এই উপন্যাসের আলোচনা করতে গিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন ধর্মতত্ত্ব বা ইতিহাস প্রসঙ্গ নয়, এই উপন্যাসের মূল আকর্ষণের জায়গা ‘হিন্দুর পারিবারিক ও সামাজিক জীবন’। কীভাবে প্রতিবেশিরা দল পাকিয়ে নিরপরাধ বিধবাকে বিপন্ন করতে পারে সেই ছবি বঙ্কিম এখানে আমাদের দেখিয়েছেন, আবার দেখিয়েছেন সেই প্রতিবেশিরাই ভিন্ন পরিস্থিতিতে নত মস্তকে কীভাবে নিজেদের অতীত অন্যায়কে স্বীকার করে নিচ্ছে। দুর্লভ চক্রবর্তী, ফুলমণি, সাগর বৌ, নয়ান বৌ, তাদের শাশুড়ি, ব্রহ্মঠাকুরাণী – এইসব গৌণ চরিত্ররা কীভাবে সামাজিক পারিবারিক বাস্তবতাকে এখানে ফুটিয়ে তুলেছে, তার দিকে সুবোধবাবু নজর দেওয়ার কথা বলেন। হরবল্লভ কীভাবে প্রায় এক খল চরিত্র হয়ে উঠল এবং তার মধ্যে দিয়ে ছোট জমিদারদের তেজ ও অন্যায় লোভ কীভাবে প্রকাশিত হল – তা সুবোধবাবু তাঁর আলোচনায় বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন।
এই উপন্যাসের যোগ ও নিষ্কাম ধর্মর তাত্ত্বিক দিক ও তার উপস্থাপণ নিয়ে সুবোধবাবু বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। এগুলির ছবি সুবোধবাবুর মতে ‘অতিশয় অস্পষ্ট ও সম্পূর্ণ’। বঙ্কিম লিখেছিলেন, “প্রফুল্লের অন্য শিক্ষা হইয়াছে। কর্ম্মশিক্ষা হয় নাই। এই পাঁচবৎসর ধরিয়া কর্ম্মশিক্ষা হৌক”। সুবোধচন্দ্র সঙ্গত আপত্তি তুলেছেন এই বলে যে, “প্রফুল্ল কি কর্ম্ম করিল তাহার কোন প্রত্যক্ষ বর্ণনা নাই। সে বলিয়াছে যে সে ডাকাতি করে নাই, শুধু দান করিয়াছে ; যদি ইহাই সত্য হয়, তাহা হইলে মানিতে হইবে ভবানী ঠাকুরের কাজে সে একটা অনাবশ্যক অলংকার মাত্র। ভবানী পাঠক একাধিকবার দোকান-দারীর কথা বলিয়াছে ; সেই সূক্ষ্মবুদ্ধি রাজনীতিবিশারদ দেবীচৌধুরাণীকেও দোকান-দারীর অংশ বলিয়াই মনে করিয়াই থাকিবে। শুধু একটি দৃশ্যে দেবীর দরবারের পরিচয় পাই—কিন্তু তাহার রাজদরবার দাতা ও আশ্রিতের সম্মেলন ছাড়া আর কিছুই নহে। রাজা হরিশ্চন্দ্রের আমল হইতে আরম্ভ করিয়া আধুনিক কাল পর্য্যন্ত বহু বিত্তশালী লোক অর্থ দান করিয়াছেন, কিন্তু তাহারা কেহই নিষ্কামধর্ম্মের সুবিস্তীর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই। উপন্যাসের উপসংহারে বঙ্কিমচন্দ্র প্রফুল্লকে অবতাররূপে কল্পনা করিয়া বলিয়াছেন :
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায়চ দুষ্কৃতাম।
ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥
উপন্যাসমধ্যে উল্লিখিত তিনকর্ম্মের একটিরও পরিচয় নাই।
প্রফুল্ল যে অর্থদান করিয়াছে তাহার মধ্যেও নিষ্কাম ধর্ম্মের লক্ষণ সুস্পষ্ট নহে। প্রফুল্ল অর্থ চাহে নাই, ব্রজেশ্বরকে চাহিয়াছিল। যে কামনা তাহার কোনদিন মনে হয় নাই* তাহা নিরোধ করিতে কোন বিশেষ শিক্ষার দরকার হয় নাই। কিন্তু যেখানে তাহার কামনা ছিল ভবানীপাঠকের শিক্ষা সেইখানে পৌঁছাইতে পারে নাই। ব্রহ্মচর্য্য শিক্ষার সময় সে একাদশীতে মাছ খাইত এবং ব্রজেশ্বরের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের পর সে ভবানীকে বলিয়াছে, “আমাকে অব্যাহতি দিন—আমার এ রাণীগিরিতে আর চিত্ত নাই।” অনাবশ্যক আবরণের মত এই রাণীগিরি ফেলিয়া দিয়া সে স্বামীর ঘর করিতে চলিয়া গেল। সুতরাং প্রফুল্লের জীবনচরিত নিষ্কাম ধর্ম্মসাধনার বিফলতাই প্রমাণ করে। এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের সৌন্দর্য্যবোধ, ইতিহাসপ্রিয়তা ও ধর্ম্মতত্ত্বের সম্মিলন হইয়াছে, কিন্তু সামঞ্জস্য হয় নাই।” এজন্যই সুবোধবাবুর সিদ্ধান্ত -“দেবী চৌধুরাণীকে উচ্চ শ্রেণির উপন্যাস বলিয়া গ্রহণ করা যায় না।”
অধ্যাপক প্রমথনাথ বিশী এত নেতিবাচকভাবে ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসকে দেখতে চান নি। তাঁর ‘বঙ্কিম সরণী’ বইতে আচার্য বিশী জোর দিয়েছেন এই উপন্যাসের গঠনকৌশলের অনন্যতার ওপর। যে নাটকীয় দ্রুতগতি এই উপন্যাসে আছে সেটা এমনকী যোগশাস্ত্র আলোচনার আপাত নীরস ও ধীর অংশগুলিকেও - যেমন তৃতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – একটা আকর্ষণীয় সুতোর টানে ধরে রেখেছে। ইতি টানার আগে আচার্য বিশী মহাশয়ের লেখার প্রাসঙ্গিক অংশটি পড়ে নেওয়া যাক।
“নাটকের একটি প্রধান লক্ষণ দ্রুতগতি, আর সে গতি শরবৎ ঋজুভাবে লক্ষ্যাভিমুখী। বঙ্কিমচন্দ্রের সমস্ত উপন্যাসে এ লক্ষণ প্রকট, বলা বাহুল্য দেবীচৌধুরানীতেও। গতি যে কত দ্রুত, একবার পরিচ্ছেদগুলোর দিকে তাকিয়ে হিসাব করলেই বুঝতে পারা যাবে। প্রথম খণ্ডে ষোলটি পরিচ্ছেদ; ষোলটি পরিচ্ছেদে দশ বছরের ইতিহাস বর্ণিত। প্রফুল্ল ও তার মার দুর্দশা, হরবল্লভ কর্তৃক প্রফুল্লকে প্রত্যাখ্যান, প্রফুল্লর মার মৃত্যু ও প্রফুল্ল হরণ, প্রফুল্লর ধনরত্ন লাভ, এ সামান্য কয়দিনের কথা, এক মাস হয়তো যথেষ্ট। অষ্টম, নবম, দশম পরিচ্ছেদে প্রফুল্ল হরণ ও তার পরের ঘটনা, এবং নির্জন পরিত্যক্ত অট্টালিকায় তার ধনরত্ন লাভ; একাদশ থেকে ষোড়শ পরিচ্ছেদে পাঁচ পাঁচ দশ বৎসরের কাহিনী। ঐ দশ বৎসর ধর্মশিক্ষা ও কর্মশিক্ষার বিবরণ এবং অনুশীলন তত্ত্বের ব্যাখ্যা। নীরস হওয়ার আশঙ্কা ছিল, তবে বঙ্কিমচন্দ্রের কলমের গুণে হয়নি। দ্বিতীয় খণ্ডে বারোটি এবং তৃতীয় খণ্ডে চৌদ্দটি পরিচ্ছেদ—তিন খণ্ডে সবশুদ্ধ বিয়াল্লিশটি পরিচ্ছেদ।
দ্বিতীয় খণ্ডে অর্থ সংগ্রহার্থ ব্রজেশ্বরের সাগরের পিত্রালয়ে গমন; সেখানে ব্যর্থকাম হয়ে ফিরবার পথে বজরায় দেবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণ লাভ। তৃতীয় খণ্ডে দেবীকে ধরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হরবল্লভ ও কালেকটারের চেষ্টা, ব্রজেশ্বর ও দেবীর সাক্ষাৎ; সর্বশেষে দেবিগিরি পরিত্যাগ করে পতিগৃহে প্রফুল্লর আগমন। প্রথম খণ্ডে দশ বছর; আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডে মিলিয়ে খুব বেশি হবে তো দশ মাস, বর্ষাকাল থেকে বৈশাখ মাসের শুক্লা সপ্তমী পর্যন্ত। গ্রন্থারম্ভে প্রফুল্ল আঠারো, গ্রন্থশেষে কিঞ্চিদধিক আটাশ। দ্রুতগামী মেলে ট্রেন দশ বৎসর পথ অতিক্রম করতে বিয়াল্লিশটি মাত্র স্টেশনে থেমেছে, কোথাও দু-চার মিনিটের বেশি নয়—অথচ তার মধ্যেই যে-সব বিবরণ ও কথা অত্যাবশ্যক তাদের তুলে নিয়েছে, কেউ বাদ পড়েনি, অন্য দিকে আবার বিনা টিকিটের অনধিকারীদের কাউকে প্রশ্রয় দেয়নি, গাড়ি পূর্ণ অথচ অতিভারাক্রান্ত নয়। শেষ দুটি খণ্ডে ঘটনা এত অধিক ও বিচিত্র যে, পাঠকের মনে ব্যাপকতর কালবোধ জন্মায় দেয়, কিন্তু হিসাব করলে দেখা যায় পুরো একটা বছরও নয়। এ অনেকটা স্বপ্নের সুদীর্ঘ ঘটনামালা ও স্বপ্নদর্শনকালের স্বল্পতার অনুরূপ। প্রথম খণ্ডের দশ বছর, শেষ দুই খণ্ডের দশ মাস পাশাপাশি থেকে কালবোধের ব্যাপ্তি সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা জন্মাতে সাহায্য করে। কাল সম্বন্ধে এই দ্বিত্ববোধের ধারণা সৃষ্টি বঙ্কিমচন্দ্রের শিল্পকলার একটি প্রধান গুণ। সবশুদ্ধ মিলে কাহিনীটা চারখানা পালে কালবৈশাখীর প্রচণ্ড ঝড় লাগিয়ে দেবী রানীর বজরার মতো নক্ষত্রবেগে ছুটেছে, অথচ হাল ভাঙেনি, পাল ছেঁড়েনি, নৌকা এ-কাত ও-কাত হলেও একচুল এদিক-ওদিক হয়নি, যথাসময়ে যাত্রার শেষে লক্ষ্যস্থানে গিয়েছে—কর্ণধারের এমনি হাতের গুণ। একেই বলি নাটকীয় গতি, উপন্যাসে নাটকের গুণ।”