হিন্দুত্ব, ফ্যাসিবাদ ও নয়াউদারীকরণের অর্থনীতি

হিন্দুত্ববাদীদের অর্থনীতি

হিন্দুত্ববাদি আরএসএস ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টি দেশকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার আন্তরিক ও সামগ্রিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে একথা পাঠকদের সকলেরই মোটামুটি জানা আছে। । কিন্তু সেই হিন্দু রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক নীতি কী হবে তা নিয়ে খোলাখুলি কোন তত্ব অবশ্য পাওযা যায় না। একটা বিষয় অবশ্য গত ৭ বছরের মোদি সরকারের অর্থনৈতিক চলনবলন থেকে পরিস্কার যে, “হিন্দু রাষ্ট্র” হিন্দুদের স্বার্থ উর্ধে তুলে ধরার কোন রাষ্ট্র নয়। সেটি এমন একটি  কর্তৃত্ববাদি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র যা কেবল মুসলিমদের অবদমিত করবে তাই নয়, একইসাথে দমন করবে শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদ্র উৎপাদক, দলিত জাতি বর্গ, শিল্পী বুদ্ধিজীবী, আদিবাসীদের যাদের বেশিরভাগই হিন্দু। অন্যদিকে এই রাষ্ট্র রক্ষা করবে কর্পোরেট পুঁজি-লগ্নী পুঁজির মালিক মুষ্টিমেয় ধনীর স্বার্থ। কেবল নির্বাচনে জেতার জন্য প্রয়োজন হিন্দুত্বের। তবে হিন্দুত্ব কারুর পেটে দানাপানি জোটায় না, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ (আর এসএস), তাদের বিবিধ সংগঠন তথা ভারতীয় জনতা পার্টির নেতাদের ছাড়া। ফলে, দেশের যেটুকু প্রজাতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল বা এখনো কিয়দংশে অবশিষ্ট আছে তা ভয়ানকভাবে এক খাদের কিনারে অবস্থান করছে, যার একদিকে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র, আর অন্য পাড়ে আছে কর্তৃত্ববাদি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র। প্রথমোক্তটিতে নাগরিকেরা একগুচ্ছ রাজনৈতিক অধিকার নির্ভয়ে উপভোগ করতে পারবে, যেসব অধিকার একটি নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা দ্বারা রক্ষিত হবে, অন্যটিতে সর্বক্ষেত্রে ভীতির আবহাওয়ায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে নতজানু হয়ে থাকবে।

হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদ বনাম উপনিবেশ বিরোধী জাতীয়তাবাদ

হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদ ও উপনিবেশ বিরোধী জাতীয়তাবাদের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য হল এই যে, দ্বিতীয়টির একটি অর্থনৈতিক নীতি ছিল, যা প্রথমোক্তটির ক্ষেত্রে যথাযথভাবে অনুপস্থিত। উপনিবেশবিরোধীরা ঔপনিবেশিক শোষণ বিষয়টি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসকরা দেশে সম্পদকে নিজ দেশে লুন্ঠন করে নিয়ে যেত, যার ফলে দেশের মানুষ ক্রমাগত দরিদ্র হয়েছিল। তাই তাঁরা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের সঙ্গে তার পূর্বেকার শাসকদের এক করে দেখেননি। আগের শাসকরা যে ধর্মেরই হোক না কেন, দেশের সম্পদ তাঁরা দেশেই রেখেছিলেন, বিদেশে নিয়ে যান নি। উপনিবেশ পূর্ববর্তী শাসকরা দেশের কৃষকদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত আহরণ করে তা দেশের অভ্যন্তরেই ব্যয় করত ফলে এদেশের মানুষের কর্মসংস্থান হত; কিন্তু ব্রিটিশ শাসকরা চাষীর কাছ থেকে আদায় করা উদ্বৃত্ত এদেশ থেকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ায় কর্মসংস্থৃান ব্যাহত হয়েছিল। হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদীরা মুসলিমবিরোধী হিন্দুত্বকে প্রচার করার স্বার্থে এই অর্থনৈতিক সত্যকে অস্বীকার করে মুসলিম শাসক ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের কেবল এক পংক্তিতে ফেলে তাই নয়, বরং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের মুসলিম শাসকদের থেকে উত্তম বলে প্রচার করে থাকে।

নয়াউদারনৈতিক অর্থনীতি ও হিন্দুত্বের অর্থনীতি

নয়াউদারনৈতিক বা নিওলিবারাল অর্থনীতি বলতে সাধারণ অর্থে অর্থনীতির সমস্ত কাজ ব্যক্তি মালিকানার কাছে ন্যস্ত করা, বেসরকারীকরণ ও মুক্ত বাজারের হাতে অর্থনীতির উৎপাদন বন্টন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও অধিকার অর্পণ করাকে বোঝায়। তার মানে কিন্তু এমনটা নয় যে রাষ্ট্র অর্থনীতি থেকে হাত গুটিয়ে নেবে বা অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা কমে যাবে; বরং ভূমিকার পরিবর্তন ঘটিয়ে বৃহৎ পুঁজির সুবিধের জন্য রাষ্ট্র কাজ করবে। উন্মুক্ত বাজারের কথা বলা হলেও যখনই বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করার প্রয়োজন পড়বে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধা বোধ করবে না।

খুঁটিয়ে দেখলে হিন্দুত্বের সঙ্গে নিওলিবারেল অর্থনীতির কোন ভাবভালোবাসা থাকার কথা নয়, কারণ হিন্দুত্ব বাজার বা পুঁজির নিয়মকে   সামাজিক নিয়মের ( বা ধর্মের নিয়মের) থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারে না। কিন্তু মোদি সরকারের আচরণ এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। যদিও মোদি সরকার অনেক কট্টর  হিন্দুত্ববাদী ও হিন্দু ‘জাতীয়তাবাদে’র ‘একনিষ্ঠ’ পূজারি, কিন্তু একইসাথে নিওলিবারাল, একচেটিয়া বৃহৎ পুঁজি ও বিশ্বায়িত  পুঁজির সমর্থক।

হিন্দুত্ববাদীদের ধোঁয়াশার ও ডিগবাজির অর্থনীতি

ফলে, হিন্দুত্ববাদিদের অর্থনীতিটা কেমন তা বেশ ধোঁয়াশার। প্রশ্ন করা যেতে পারে আদতেই তাদের কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক প্রকল্প বা নীতি ছিল বা আছে কি?  হিন্দুত্ববাদের প্রবর্তক ‘বীর’ (দামাোদর বিনায়ক) সাভারকারের লেখায় তেমন কিছু পাওযা যায় না। আরএসএস-এর হেগড়েওয়ার বা গোলওয়ালকর-ও অর্থনীতির মত ‘ছোটখাটো’ বিষয়ে তেমন কোন বাক্য ব্যয় করেছেন বলে জানা যায় নি। তবে আরএসএস-এর অন্যতম সংগঠন স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ অর্থনীতির বিষয়ে নির্দিষ্ট অবস্থান রেখেছে। ওই মঞ্চ খোলামেলা ভাবে ‘জাতীয়তাবাদী’, এতটাই যে “ঘরে বাইরে’র সন্দীপও লজ্জা পেত। বর্তমানে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আংশিক সময়ের ডিরেক্টর এস গুরুমুর্তি স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন যিনি আরএসএস-এর অর্থনৈতিক চিন্তাবিদ হিসেবে প্রদর্শিত হন, তিনি ২০১২ সালে দেশে বিদেশী বিনিয়োগের বিরুদ্ধে ছিলেন, বিশেষত খুচরো ব্যবসায় বিদেশী বিনিয়োগের বিরুদ্ধে। সুসমঞ্জস অর্থনৈতিক প্রকল্প না থাকলেও  আরএসএস তার অধিকাংশ সময়ই বিশ্বায়নের বিরোধিতা করেছে। ১৯৯৮ সালে আরএসএস-এর অখিল ভারতীয় কার্যকারিনী মন্ডল ঘোষণা করেছিল, আরএসএস সমস্ত সময়েই স্বদেশীর পক্ষে যার অর্থ স্বনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক  স্বাধীনতা। সঙ্ঘ মনে করত যে, বিদেশীবিনিয়োগ জাতির অভ্যন্তরে ভোগবাদী বিদেশী সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করবে  ও বিশ্বায়নের সঙ্গে আসবে বিদেশী সাংস্কৃতিক প্রভাব যা ভারতীয় সমাজে বিজাতীয় সংস্কৃতির সৃষ্টি করবে।  ১৯৯১ সালে স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ তৈরি হয় অর্থনৈতিক স্বয়ং-সম্পূর্ণতার লক্ষে। সেই বছরেই ভারতীয় অর্থনীতিকে বিদেশী পুঁজির জন্য উন্মুক্ত করা হয়, আমদানি শুল্ক কমানো হয়।  স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ ২০১০ সালেও তাদের জাতীয় সম্মেলনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের উপর  বিদেশী বিনিয়োগ ও উদার বানিজ্যের প্রভাব সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করে।  ২০১৮ সালেও স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের যুগ্ম আহ্বায়ক অশ্বিনী মহাজন একটি সাক্ষাতকারে বলেন যে, বিদেশী বিনিয়োগের ফলে বহুজাতিকদের কাছে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব খর্বিত হয় ও গরিবদের দারিদ্র বৃদ্ধি পায়।    ওদিকে ভারতীয় মজদুর সভা (বিএমএস) বিশ্বায়নের কট্টর বিরোধী হিসেবে ও শ্রমিক দরদী শ্রমনীতির প্রবক্তা হিসেবে নিজেদের পরিচিত করে। ২০০১ সালে বিএমএস সুপারিশ করে যে ভারত সরকার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলির সহযোগিতায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি বিকল্প তৈরিতে উদ্যোগী হোক। বিএমএস ধারাবাহিক ভাবে বিজেপি সরকারগুলির সহজে শ্রমিক ছাটাইএর জন্য সুপারিশের বিরোধিতা করে এসেছিল।  

সঙ্ঘ পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদ উভয়কেই বিদেশী সংস্কৃতি ও ভারতীয় জীবনের জন্য অযোগ্য বলে মনে করেছিল। রাষ্ট্রের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও সমাজকে গড়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত ভূমিকাকে সঙ্ঘ সন্দেহের চোখেই দেখেছে। এমনকি ২০১৫ সালের সঙ্ঘের বার্ষিক প্রতিবেদনও নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিকে ভারতীয় মূল্যবোধের নিরিখে গড়ে তুলতে বলেছে। বলেছে ভারতের উন্নয়ন কাঠামোটি যেন ধর্মের (কর্তব্য) আধারে গড়ে ওঠে। মোহন ভাগবতের ২০১৭ সালের বক্তৃতায় ছোট উদ্যোগের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ওই বক্তৃতায় ভাগবত বিকেন্দ্রীকৃত অর্থনৈতিক উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছে। অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বজরাংলাল গুপ্ত বলে একজন আরএসএস প্রচারক ও অর্থনীতির অধ্যাপক বলেছেন যে অর্থনীতিকে ১০ থেকে ১৫ টি গ্রামের স্বয়ংসম্পূর্ণ  কৃষিভিত্তিক শিল্পের গুচ্ছে বিভক্ত করে উন্নয়ন করা হোক যেখানে কৃষি ও দেশজ উদ্যোগকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।পারিবারিক উদ্যোগের সম্পর্কে সঙ্ঘের অতিরিক্ত উৎসাহ ছিল, কারণ মনে করা হত ওই ধরণের পারিবারিক উদ্যোগ কর্মচারীদের বর্ধিত পরিবারের অংশ হিসেবে মনে করে আর্থিক লাভের সাথে কর্মীদের কল্যাণের কথাও বিবেচনা করে। সঙ্ঘ মনে করে যে, বৃহৎ পুঁজি দেশজ হলেও তা বিলাসবহুল ভোগবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির বিপ্রতীপে দাঁড়ায়।

আরএসএস  বহুদিন ধরেই অর্থনৈতিক সমতা ও অধিক কল্যাণকামী ব্যয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আরএসএস-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চিন্তক, স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ ও ভারতীয় মজদুর সভার প্রতিষ্ঠাতা দত্তপন্থ থেঙ্গাড়ি  বলতেন যে, সমাজের সব থেকে ধনীর ও সব থেকে গরিবের আয়ের অনুপাত ১০:১ এর বেশী হওয়া উচিৎ নয়। ভাগবতের মতে হিন্দু ধর্ম কোন সর্বত্যাগী সন্যাসের ধর্ম নয় যে তা সম্পদ সৃষ্টিকে খারাপ মনে করে, কিন্তু একজন ব্যক্তির অর্থনৈতিক আচরণ ধর্মানুসারী হতে হবে। ব্যক্তিকে সমাজ গঠনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য করার  আরএসএস-এর বিশ্বাস সংগঠনটির অর্থনৈতিক জনমোহিনীবাদকে একটি বিশেষ ভারতীয় বৈশিষ্ট্য প্রদান করে, ভোগকে নৈতিকতার রসে সিক্ত করে। ভাগবতের যুক্তিতে একজন ব্যক্তির উদ্দেশ্য সম্পদের ভাণ্ডার তৈরি করা বা বিলাসবহুল জীবন যাপন করা নয়। একজন ধনীর উচিৎ দরিদ্রের সঙ্গে তার সম্পদ ভাগ করে নেওয়া। ভাগবতের কথার অনুরণন পাওয়া যায় আরএসএসএর মুখপত্র অরগানাইজারে, যেখানে   বলা হয় যে, ব্যক্তির ধর্ম হচ্ছে সমাজের অন্যদের সঙ্গে সম্পদ উদারভাবে ভাগ করে নেওয়া। সে অর্থে সামাজিক ন্যায় ব্যক্তি নাগরিক ও সরকার উভয়েরই দায়িত্ব। ভাগবতের মতে দেশীয় উদ্যোগকে উৎসাহিত করা ব্যক্তি ও সরকার উভয়েরই দায়িত্ব। ব্যক্তি ভোক্তার উচিৎ দেশের স্বার্থে দেশে উৎপাদিত পণ্যকে, খরচ বেশী হলেও, কিনে উৎসাহ প্রদান করা।

উদারনীতিকরণের পরবর্তী সময়ে বেশ কিছুকাল ধরে বিজেপির স্বদেশী শাখা প্রাধান্য পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালের বিজেপির নির্বাচনি ইশতেহার উচ্চতর প্রযুক্তি নির্ভর ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগের পক্ষে দাঁড়ালেসাথে সাথে এও বলে যে, যেসব ক্ষেত্রে দেশজ সঞ্চয় অপর্যাপ্ত সেসব ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগ অর্থনীতিকে সহায়তা করতে ব্যবহৃত হবে- এক্ষেত্রে দেশের দীর্ঘকালিন স্বার্থের জন্য সমঝোতা করতে হবে, কিন্তু সামগ্রিকে বিকেন্দ্রীকৃত উৎপাদন ও অর্থনৈতিক নীতিকেই বিজেপি সমর্থন করে যা পরিবারের মালিকানাধীন ছোট ব্যবসায়ের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। এরপরে ১৯৯৯ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে লেখা হয়, যে বিদেশী বিনিয়োগ স্বাগত। বিজেপি তার অর্থনৈতিক নীতিতে বদল এনে ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্তের স্বার্থ অনুযায়ী চলতে শুরু করে। বাজপেয়ী সরকার বীমা ও মিডিয়াকে বিদেশী বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়, ও রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রগুলিকে বেসরকারি হাতে তুলে দিতে শুরু করে। থেঙ্গাড়ি তৎকালিন অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহাকে ‘ক্রিমিন্যাল” ও তার নীতিকে ‘এ্যান্টি ন্যাশনাল’ বলে অভিহিত করে। বিরোধী পক্ষে থাকাকলিন বিজেপি আবার ভোল পাল্টায় ও কংগ্রসের খুচরো ব্যবসায় বিদেশী বিনিয়োগের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। শিল্পপতিদের বন্ধু মোদিকে বিজেপি প্রধানমন্ত্রীর মুখ হিসেবে চিহ্নিত করার পর থেকে সঙ্ঘ ও তার রাজনৈতিক মুখ ভারতীয় জনতা পার্টি পুরোপুরি ভাবে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। একদিকে সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্র নির্বিচারে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছে অপরদিকে অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রকে বিদেশী বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে।  ফলে, আরএসএস-এর অর্থনৈতিক রক্ষণশীলতা সম্পূর্ণভাবে পিছু হটেছে। ফলে প্রশ্ন করা যেতে পারে যে, সঙ্ঘের সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে নয়া উদারনীতিবাদের কি কোন বিরোধ আদতেই ছিল, নাকি ক্ষমতার শীর্ষে চড়ার জন্য অন্য অনেক ছলচাতুরির মত অর্থনৈতিক রক্ষণশীলতা বা বৃহৎ পুঁজির বিরোধিতা আদতে একটি কৌশল ছিল?

সঙ্ঘ পরিবারের রাজনৈতিক অভিযান

খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে সঙ্ঘ পরিবার কেবল উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটি বাহন নয়, এটি বর্তমান ভারতের সবথেকে সফল রাজনৈতিক সংগঠন। এর বিস্তার ও বৃদ্ধি সচেতন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ফল। সঙ্ঘ পরিবার নিশ্চিতভাবে “টোটালিটারিযান” (পরমত-অসহিষ্ণু সর্বগ্রাসী) পার্টির একটি চমকপ্রদ উদাহরণ। তদর্থে সঙ্ঘকে একটি পার্টি হিসেবে বিশ্লেষণ করা দরকার। দেখা দরকার কীভাবে প্রাধান্য বিস্তারকারী শ্রেণিস্বার্থকে সঙ্ঘ পরিবার অন্যান্য সামাজিক বর্গের সামগ্রিক স্বার্থ হিসেবে প্রতিফলিত করতে সক্ষম হয়েছে।

জনসঙ্ঘের সময় থেকে ১৯৮০র দশকে গোড়ার দিক পর্যন্ত সঙ্ঘ পরিবারের নির্দিষ্ট গণ ভিত্তি ছিল। প্রথমে জনসঙ্ঘ ও পরে বিজেপি ব্রাহ্মণ-বানিয়া পার্টি হিসেবে চিহ্নিত ছিল। যাদের গ্রামীণ ভারতে ভিত্তি ছিল খুবই কম, এবং শহুরে অভিজাত ও শ্রমিক শ্রেণির সমর্থনও তেমন ছিল না। ফলে এদের অর্থনৈতিক নীতি ছিল এদের সমর্থকদের শ্রেনিস্বার্থের ফসল- বহির্বাণিজ্যে রক্ষণশীলতা ও আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের উদারীকরণ, যাতে সদস্য সমর্থরার আভ্যন্তরীণ বাজারে অবাধ চলাচলের সুবিধে পায় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে থাকে। ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিকশ্রেণির লড়াই সংগ্রামের বিরোধিতা করত তারা। অন্যদিকে জঙ্গী ও প্রতিক্রিযাশীল জাতীয়তাবাদী ছিল। সে অর্থে সত্যিই পেটি বুর্জোযা পার্টি ছিল।

সঙ্ঘ পরিবার স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম বিস্তারের ঢেউ তোলে জেপি আন্দোলনের সময়ে, জরুরি অবস্থা বিরোধী জনপ্রিয় আবেগের উপর ভর করে, সদস্য সংখ্যা ও ভাবমূর্তিতে। কিন্তু কেবল ১৯৮০র দ্বিতীয় ভাগেই দেশের অভিজাত ও বৃহৎ পুঁজির কাছে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হসেবে পরিগণিত হয়। অপরদিকে একইসাথে অযোধ্যা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এটি একটি বিপুল গণ শক্তিতে বিস্তার লাভ করে।

এই সময়ে পুঁজির কাছে হিন্দুত্ব শক্তির ব্যাপ্তির পক্ষে দাঁড়ানো সুবিধেজনক ছিল। মতাদর্শগতভাবে হিন্দুত্ব ছিল মন্ডলের নিম্নবর্গীয় শক্তিবিস্তারের এ্যান্টিডোট। হিন্দুত্ব শ্রেণি ও বর্গের সংগ্রামকে অন্যায্য করে তুলে ‘ঐক্যের’ ধারণাকে উর্ধে তুলে ধরে। ফলে হিন্দুত্ব অন্যান্য সমস্ত বর্গের শক্তিসমাবেশের  বিরুদ্ধে এক অভিজাত বিদ্রোহ।

বৃ্হৎ পুঁজি বনাম ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদক

ওই সময়ে রাষ্ট্রের সম্পদের জন্য ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রনের  জন্য ‘গোষ্ঠি বা বর্গের’’ রাজনীতি অন্যান্য আন্দোলনগুলিতেপ্রতিফলিত হচ্ছিল। তা জাতীয় স্তরে ভারতীয় রাজনীতিতে ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকরণ (ইনডিভিজুয়ালাইজেশন)’ কে প্রতিদ্বন্দিতার মুখে ফেলছিল। ওই রাজনীতির ভিত্তি প্রোথিত ছিল এই ধারণায় যে দেশের রাজনীতি একটি বিভাজিত বিষয় তা  কোন একমেবাদ্বিতীয়ম সত্বা নয় যা ঐক্যের রূপ নেবে রাষ্ট্রে, বরং তা রূপ পাবে প্রতিদ্বন্দী ও বহুক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ ভাবে বিভক্ত গোষ্ঠিতে। এই ভাবে এটি অবশ্যই একটি শ্রেণি বিবাদ, যদিও আংশিক, ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদকের নির্দিষ্ট অবস্থানে প্রোথিত। তবে এটা ভারতীয় পুঁজির কাছে বিপদ ছিল না। ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রকরণ ভারতীয় সাম্প্রতিক  ইতিহাসের সময়কাল জুড়ে একটি বিবাদিত প্রক্রিয়া  হিসেবে রয়েছে। তাছাড়া ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদন এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত মতাদর্শগত ব্যবস্থা ভারতীয় পুঁজিবাদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তা সত্বেও তা একটি বিপদ বলে বৃহৎ পুঁজির কাছে পরিগণিত হল। কেননা, ওই সময়ে, ১৯৮০র দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের বৃহত পুঁজি নতুন নতুন বাজারে ঢোকার প্রক্রিযা শুরু করেছিল। ১৯৮০র দশকে মাঝে যে সংস্কার শুরু হযেছিল তা ওই বিস্তৃতির অবকাশ তৈরি করছিল। অন্য সব আন্দোলগুলিতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকরণের সঙ্গে যে বিবাদ উপ্ত ছিল তা জাতীয় রাষ্ট্রের সংলগ্নতাকে বিপন্ন করে তুলছিল, যে জাতীয় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ওই সংস্কারের জন্য জরুরি ছিল। বাস্তবিক, ওই সমস্ত আন্দোলন যে ধরণের রাষ্ট্র গড়তে চাইছিল তা পুঁজির কাছে যন্ত্রণা- বাজারের অধিক বিভাজন, গণতান্ত্রিক রাজনীতির দ্বারা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের নির্ধারণ, এবং ব্যক্তি পুঁজিপতিদের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ। এছাড়া, ওই সময়ে পুঁজির বিস্তারের জন্য প্রয়োজন হযে পড়েছিল সাংস্কৃতিক-মতাদর্শগত বিষয় যেমন, ঐক্যবদ্ধ বাজার ও গ্রামীণ ভারতে পণ্য বিনিময়ের সাধারণ বোঝাপড়া। যে বোঝাপড়া সেই সময়ে ছিল না, এবং তৎকালিন গোষ্ঠি সত্বার উদ্বর তাকে সরাসরি বিপদের মুখে ফেলছিল।

হিন্দুত্বের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য

১. হিন্দুত্ব মনে করে যে, সামাজিক প্রক্রিযাটি আসলে ব্যক্তির পছন্দ। অন্য কথায়, সামাজিক প্রক্রিয়াগুলিকে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত বা পছন্দের স্তরে নামিয়ে নিয়ে আসে।  ফলে সামাজিক উন্নয়নগুলিও ব্যক্তির পছন্দের প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়। সঙ্ঘ পরিবার হিন্দু সমাজের সমস্যার সমাধানকে উচ্চবর্ণের পুরুষের মধ্যে সঠিক মূল্যবোধ সঞ্চারের মাধ্যমে সমাধান করতে চায়। গোলওযালকার তাই বলেন যে, আমাদের দেশে সংস্কৃতিতে সঙ্কট রয়েছে, বা ব্যক্তির দানবিক আচরণের জন্যই সামাজিক সমস্যার উদ্ধব ঘটে। সঙ্ঘ পরিবারের কর্তাদের এমন অনেক উক্তি আছে। সঙ্ঘ পরিবার মনে করে, সমাজের পুনর্গঠন কেবল প্রত্যেক ব্যক্তিকে ভাল হিন্দুতে পরিবর্তিত করেই করা সম্ভব। আর সেই ভাল হিন্দু কী তা সঙ্ঘ পরিবারই নির্ধারণ করবে।

২. সঙ্ঘের মতে রাষ্ট্রের কাজ হল একটি মহত্তর নীতির ভিত্তিতে সৃষ্ট সঙ্ঘবদ্ধতার প্রকাশ ও তাকে নিশ্চিত করা। ভারতের ক্ষেত্রে আদর্শ রাষ্ট্র হিন্দু রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা প্রদানকারী। সেই রাষ্ট্র যা হিন্দুদের জীবন্ত ও সুসমঞ্জস ঐক্যের ভিত্তিতে বিরাজ করবে। হিন্দু ধারনাটি একদিকে উপরে বর্ণিত ভাল হিন্দু ও অন্যদিকে সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মতে, রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে জাতিকে রক্ষা করার জন্য, এবং সেইসব বন্দোবস্ত বজায় রাখতে যার মাধ্যমে  জাতির আদর্শকে বাস্তবে পরিণত করা যায়। ওইসব আদর্শগুলি হল জাতির আত্মা, আর ওই আত্মার প্রকাশের জন্য বিধিগুলির নাম ‘ধর্ম’। একটি রাষ্ট্র ধর্ম ব্যতিরেকে থাকতে পারে না, এবং তা ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন থাকতেও পারে না।

৩. উপোরক্ত সঙ্ঘবদ্ধতার মধ্যে বিভাজন অপ্রয়োজনীয় ও রোগ-বিকারগ্রস্ত। যে বিভাজনটি গুরুত্বপূর্ণ তা “সমাজ” ও ‘অপর’এর মধ্যের বিভাজন। সেই অপর হল “বিদেশী”। সমাজের মধ্যেকার সমস্ত বিভাজন সমাজে বহিরাগত ধ্বংসাত্মক বিদেশীদের কাজ, হিন্দু জাতির ঐক্য ও সুসামঞ্জস্য ভাঙার লক্ষ্যে ধাবিত।

৪. জাতির বাইরের সেই সব মানুষদের মধ্যে কিয়দংশের প্রয়োজন শিক্ষার। গোলওয়ালকর বলেন, আরএসএস মানুষকে দানবিক আচরণ থেকে বিরত ও তাদের দিব্য আচরণকে বিকশিত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু যদি, শিক্ষার মাধ্যমে কাজ না হয়, তাহলে গোলওযালকরের মতে বল প্রয়োগ করতে হতে পারে। অর্থাৎ বহিরাগতরা হিন্দুত্বের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে “সমাজে” যোগ দিতে পারে বা তাদের বিশ্বাস বজায় রেখে বলপ্রয়োগের ফলে ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে থাকতে পারে।

৫. সঙ্ঘই হিন্দু জাতির গঠনের উপাদান ও প্রতিনিধি। সঙ্ঘ কেবল হিন্দুদের সংগঠন নয়, এটি নিজেই হিন্দু জাতি। একল বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য লেখা একটি মারাঠি পুস্তকের মতে, “ প্রথমে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুরু করলেও সঙ্ঘের লক্ষ্য হল এমনভাবে বিস্তার লাভ করা যাতে পরিবার, বর্ণ, পেশা, শিক্ষা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মত প্রথাগত সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সমস্ত ব্যক্তি সঙ্ঘের ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্ত হয়।“ ‎

সঙ্ঘের মতবাদ ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্র

সঙ্ঘের এই সমস্ত মতবাদের সঙ্গে একটি পুঁজিবাদি রাষ্ট্রের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকরণ প্রক্রিয়ার দারুণ সাদৃশ্য আছে। হিন্দুত্ব সমস্ত কর্তৃত্ববাদি মতাদর্শের মত একদিকে এক অতিপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্রতার বিকাশ ও অপরদিকে একটি পরমত-অসহিষ্ণু   সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের ধারণার উপরে গড়ে উঠেছে। হিন্দুত্বের দর্শনে ব্যক্তিরা হল এক ‘ভাল হিন্দু’ নামক মানুষজনের সমষ্টি, যাদের একে অপরের মধ্যে তফাৎ করার মত বা জুড়বার মত কিছু নেই; কেবল একটি বৈধ্ সমষ্টি আছে একত্রিত হবার- সঙ্ঘ। অনুরূপ একটি সমাজের দিকে অগ্রসর হওযাই সঙ্ঘের লক্ষ্য।

এদিক থেকে হিন্দুত্ববাদিদের আদর্শ সমাজ তদর্থে পুঁজিবাদি  রাষ্ট্রের দৃষ্টভঙ্গীর সঙ্গে সমার্থক। এর ভিত্তিতেই হিন্দুত্বের প্রকল্প ১৯৮০র দশকের অপর সব আন্দোলনের মতাদর্শগত বিরোধী। ভারতীয় পুঁজি ১৯৮০র দশক থেকে হিন্দুত্বের প্রকল্পকে সমর্থন করতে শুরু করে কারণ তা বুঝতে পারিছল যে মন্ডলের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অন্য সব আন্দোলনগুলি যে বিভিন্ন সমষ্টি সৃষ্টি করছিল তা ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছিল, যা পুঁজির জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বাধা হয়ে উঠচিল।  সঙ্ঘ পরিবারের মতাদর্শগত আধিপত্য ওইসব গোষ্ঠিভিত্তিক আন্দোলনগুলিকে ভাঙতে সচেষ্ট হয়েছিল।

সঙ্ঘের মতাদর্শ ও নয়াউদারনীতি

সঙ্ঘ পরিবারের উপরোক্ত মতাদর্শগত ভিত্তিই সঙ্ঘকে ‘জাতীয়তাবাদী’ সংগঠন হিসেবে  ‘বর্গীকৃত’ ও ‘কায়েমি’ স্বার্থের বিরোধী সংগঠন হিসেবে অভিজাত বর্গের সমর্থন পেতে সাহায্য করেছিল। সেই সময়েই ‘ভোট ব্যাঙ্ক’ রাজনীতি নামক অভিজাত শব্দবন্ধ নিম্নবর্গের নির্বাচনি ঐক্যের পাল্টা হিসেবে উচ্চারিত হতে শুরু করে।

ভারতীয় নয়া-উদারনীতিবাদ একদিকে, ১৯৯১ সালের পরে, সমস্ত বড় রাজনৈতিক সংগঠন কর্তৃক গ্রাহ্য হয়ে উঠেছে। ফলে নয়া-উদানীতিবাদি অর্থনীতির জোরকে বোঝা যায়। কিন্তু ওই নয়া-উদারনীতিবাদের কিছু অদ্ভুত দূর্বলতাও আছে। নয়া-উদারনীতির প্রথম দশকে ওই নীতির প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল নিয়ন্রণের উদারীকরণ, বাণিজ্যের উদারীকরণ, মূলধনী হিসেবের উদারীকরণ, এবং রাষ্ট্রের ভূমিকার পশ্চাদপসরণ। কিন্তু লগ্নিপুঁজিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গৃহীত ওইসব সংস্কার ক্রমবর্ধমান বাধার সম্মুখীন হয়। যে সমস্ত সংস্কার মূলত: রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ সম্পদের বন্টনে গৃহীত হচ্ছিল, যেমন বাজেট ছাটাই, বা মূলধনী হিসেবের উদারনীতিকরণের মত যে সমস্ত সংস্কার লগ্নি পুঁজি ও শিল্প ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল সেগুলি মোটামুটি বাধাহীন ভাবে চলেছিল। কিন্তু যেগুলি ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদনকে বা কৃষিতে বিদ্যমান অল্প সংখ্যক পুঁজিপতি কৃষককে প্রভাবিত করবে বলে মনে হচ্ছিল, যেমন খাদ্য ভর্তুকি, গণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও বণ্টন বা সম্পূর্ণ আমদানি উদারীকরণ প্রভৃতি, সেগুলি আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল।

নয়া উদারনীতির এই প্রতিবন্ধকতা ভারতীয় পুঁজির বৈশিষ্ট্যের ও ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদনে সঙ্গে ভারতীয় পুঁজির দ্বান্দিক সম্পর্কের প্রতিফলন- ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদন ভারতীয় পুঁজির জন্য একদিকে আবশ্যিকতা অন্যদিকে প্রতিবন্ধকতা, যা একদিকে গণতান্ত্রিক রাজনীতি অপরদিকে পুঁজির সঙ্গে বাস্তব সম্পর্কের ফল। ভারতের সংগঠিত ক্ষেত্রের উৎপাদনে ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদনের কিছু না কিছু অংশ প্রায় সমস্ত বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রেই রয়েছে।

নযা উদারনীতিবাদের তাই কিছু সংশোধন দরকার পড়ছিল। গত দু দশকে এই সংশোধনের ছাপ পড়েছে ভারতীয় অর্থনীতিতে। ঘটেছে “উচ্ছিন্ন করার মধ্য দিয়ে পুঁজি পুঞ্জীকরণে”র বা  “দখল করার মধ্য দিয়ে পুঞ্জীকরণে”র। এর মধ্যে রয়েছে খনির উদারীকরণ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন,  বনবাসীদের উচ্ছিন্ন করা, হকার উচ্ছেদ, শহুরে শ্রমিক, এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের উচ্ছেদ। এই সমস্ত উচ্ছেদ ও দখলের ফলে পুঁজির পক্ষে চরম উদ্বৃত্ত আহরণ সম্ভব হয়। তবে এর ফলে ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদনকে আংশিকভাবে উৎখাত করা হয়, সম্পূর্ণ উৎপাটন সম্ভবও ছিল না, অভিপ্রেতও ছিল না। ওই অংশটিকে আরো নিবিড়ভাবে অধীনস্থ করা ও প্রগাঢ়ভাবে উদ্বৃত্ত নিস্কাশনের জন্য বাধ্য করা গিয়েছিল।  নয়াউদারনীতিতে ভারতীয় পুঁজি ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদকদের জন্য বরাদ্দ পরিসরটিকে সঙ্কুচিত করল ও ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদকদের উপরে অনেক বেশী আধিপত্য বিস্তার করল।  এই নিবিড় শোষণ বা নিষ্কাশন বৃহৎ পুঁজির জন্য পুঁজির পুঞ্জীভবনের বৃহত্তর অবকাশ তৈরি করল।

নয়াউদারনীতিবাদী সংস্কারকে সামগ্রিকভাবে  রূপায়িত যেমন করা যায়নি, তেমনি ভারতে নয়াউদারনীতিকে গণ রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবেও চালু করা যায়নি। কোন রাজনৈতিক দল নয়াউদারনীতিকে তাদের মতাদর্শের অন্তর্ভুক্ত করেনি, অন্তত ২০১৪ সাল পর্যন্ত। এমনকি বাজপেয়ী সরকারের সময়েও বহু সংস্কার ঘটলেও তা সার্বিকভাবে ইশতেহারে উপস্থিত হতে পারেনি। গুজরাট ব্যতিরেকে অন্য কোনো রাজ্যে কোন রাজনৈতিক দল নয়াউদারনীতির পক্ষে সালিশি করেনি। এমনকি ভোগের ও ভোগ নির্ভর আকাঙ্খার ব্যাপ্তির প্রচার ছাড়া মাতৃভাষা ভিত্তিক প্রচার মাধ্যগুলিও এই সেদিন পর্যন্ত য়া উাদারনীতিবাদের মতাদর্শগত নীতির পক্ষে দাঁড়ায়নি।

ভারতীয় নয়াউদারনীতিবাদ সে অর্থে আধিপত্য বিস্তারকারী প্রকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। ভারতীয় নয়াউদারনীতিবাদের কোন পরমত-অসহিষ্ণু সর্বগ্রাসী পার্টি ছিল না, এটি ছিল সংগঠনবিহীন একটি মতাদর্শ। এই রাজনৈতিক অবস্থা ক্ষুদ্র উৎপাদকদের অধীনস্থ করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আগেই দেখা গেছে যে, ভারতীয় পুঁজি ১৯৮০র দশকের আন্দোলনগুলিকে তাদের বিস্তারের পক্ষে বিঘ্নস্বরূপ দেখেছিল, নয়াউদারনীতিবাদ তা আরো গভীরভাবে অনুদাবন করেছে। ওই ১৯৮০র দশকের বর্গ-বর্ণের শ্রেণি ও গোষ্ঠির রাজনীতি ঢালাও উদারীকরণ, নিয়ন্ত্রণের  বিলোপ, এবং ফাটকার স্বাধীনতার মত উদারনীতির মূল কেন্দ্রীয় বিষয়গুলির বিরোধী। তাছাড়া, ভারতীয় প্রেক্ষিতে ওই ধরণের রাজনীতি ক্ষুদ্র উৎপাদকদের পাইকারি হারে অধীনস্থ করাকে বাধা দেয় যার ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে পুঁজির নিজের ইচ্ছেকে আরোপ করার ক্ষমতা কমে যায়। তাই ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতিকে নিজেদের ইচ্ছে অনুযায়ী পুনর্গঠিত করার জন্য রাজনৈতিকভাবে সফল হতে গেলে নয়াউদারনীতির একটি জোরালো ভিত্তি দরকার ছিল ওই সকল আন্দোলনের রাজনীতিকে আক্রমণ করার জন্য।

নয়াউদারনীতি ও হিন্দুত্বের বৈশিষ্ট্যের মিল

এদিক থেকেই নয়াউদারনীতি ও হিন্দুত্বের প্রকল্পের মধ্যে একটি শক্তিশালী সাধারণ কর্মসূচি ছিল। দুটি প্রকল্পের মধ্যে পার্থক্য ও টানাপোড়েন আছে, বিশেষত স্বাধীনতার ধারণার প্রেক্ষিতে। দুটি সমঝোতা অবশ্যম্ভাবী বা অবিচ্ছেদ্যও নয়। তা সত্বেও উভয়ের সামাজিক ভিত্তির উপর ভর করে থাকা দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই উভয়ের সাধারণ লক্ষ্য একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে যা ব্যবহার করা যায়। এই প্রেক্ষিতেই হিন্দুত্বের সঙ্গে নয়াউদারনীতিবাদের বোঝাপড়াকে দেখা যেতে পারে।

১. সামাজিক প্রক্রিযাসমূহকে ব্যক্তির পছন্দের স্তরে নামিয়ে আনা। ব্যক্তির সমস্ত সিদ্ধান্তকে উপযোগিতা সর্বোচ্চকরণের ভিত্তিতে দেখতে হবে। ব্যক্তির যুক্তিসঙ্গত উপযোগিতা সর্বোচ্চকারী হিসেবে আচরণ না  করাকে রাষ্ট্র বা সমাজ কর্তৃক প্রদত্ত উৎকট সুবিধে প্রদানের ফল হিসেবে দেখানো হয়। ওই উপযোগিতা সর্বোচ্চকারী ব্যক্তিটি হিন্দুত্বের ‘ভাল হিন্দু’র সমার্থক হয়ে ওঠে। উভয়েই সামাজিক নিয়মের কেন্দ্রে থাকে এবং সেই নিয়ম যা আদর্শ হিসেবে তুলে ধরতে চায়  তার কেন্দ্রে অবস্থান করে।

২. কোন ব্যক্তি বা সমষ্টির অধিকার নয়, একটি সর্বোচ্চনীতিকে প্রকাশ ও তাকে কার্যকরী করার নিশ্চয়তা প্রদানই রাস্ট্রের দায়িত্ব। হিন্দুত্বের জায়গা এখানে বাজার দখল করে নিয়েছে। আদর্শ রাষ্ট্র হচ্ছে চৌকিদার, বাজারের রক্ষাকর্তা আর বাজার হচ্ছে একমাত্র ন্যায্য সমষ্টিগত ক্রিয়া।

৩. নয়া উদারনীতিবাদে ‘সুশীল সমাজ’ বাজারের একমাত্র সামাজিক পরিপূরক। নয়া উদারনীতিবাদে রাষ্ট্র নিজেই “অপর”, “বহিরাগত”। বাজারে তার কোন ভূমিকা নেই। জনকল্যাণকারী প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক দল এসবই সমাজের বাইরের বিষয়, এবং সমাজের রোগ-বিকারগ্রস্ত বিভাজনের জন্য দায়ী। হিন্দুত্ব ও নয়াউদারনীতিবাদের কাছে সামাজিক বিষয়কে রাজনীতিকরণের মত অপরাধ আর কিছুই নয়।

৪. ভারতীয় নয়াউদারনীতিবাদে ধারাবাহিক ও বিশেষ  জোর দেওয়া হয় জাতীয় আত্মবিশ্বাসের উপর, যা নয়াউদারনীতিবাদের মতাদর্শের ক্ষেত্রে বাহ্যিক। বরং এটি হিন্দুত্বের জাতীয়-নিজস্বতার ধারণার প্রচারের সঙ্গেই মেলে।

৫. সঙ্ঘ পরিবার পশ্চাতপদ জাতির ভিত্তিতে সংরক্ষণকে বিরোধিতা করে, কুশলী ভাবে, এবং তার ফলে  মেধা খর্বিত হবার কথা বলে। কিন্তু অর্থনৈতিক ভিত্তিতে সংরক্ষণকে উৎসাহিত করে, সেখানে মেধার প্রশ্ন তোলে না। নয়াউদারনীতিবাদীরাও একই অবস্থান গ্রহণ করে।

৬. অনাবাসী ভারতীয়দের হিন্দুত্ববাদী ও নয়া উদারনীতিবাদীরা উভয়েই অগ্রণী হিসেবে তুলে ধরে। অনাবাসী ভারতীয়রা  তাদের দ্বারা প্রচারিত আদর্শ ভারতীয়, যারা দেখিয়ে দেয় যে ভাল ভারতীয়রা কতটা সফল হতে পারে।

ভারতে নয়াউদারনৈতিক অর্থনীতির প্রয়োগে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ভূমিকা

নয়াউদারনীতিবাদের সঙ্গে হিন্দুত্বের সখ্যতা কতটা গভীর ও সর্বব্যাপী হতে পারে তা বাজপেয়ীর আমলে কিছুটা দূর অবধি বোঝা গিয়েছিল। দ্রুত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বেসরকারীকরণ, সামাজিক আন্দোলনগুলির উপরে নিষ্পেষণ, অনাবাসী ভারতীয়দের উপরে নির্ভরশীল বিদেশী বিনিয়োগের জন্য ভারতীয় অর্থনীতির উন্মুক্তি। হিন্দুত্ব ও নয়া উদারনীতিবাদ উভয় প্রকল্পই ‘সন্ত্রাসবাদ-বিরোধিতা’কে ভারতীয় রাষ্ট্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে মনে করে। ২০০৪ এর নির্বাচনের সময়ে উজ্বল ভারত প্রচার সেই সমঝোতার প্রকাশ ঘটিয়েছিল। ভারত উজ্বল হচ্ছিল কারণ দেশে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ও হিন্দু জাতি হিসেবে আত্মবিশ্বাস দুই-ই বাড়ছিল।

নয়া উদারনীতিবাদ বর্তমানে শাসক দলের সহায়তায় পুঁজিপতি শ্রেণির অর্থনৈতিক স্বার্থ সাধনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি হয়ে উঠেছে। ওই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে জনসাধারণের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধার্মিক জীবনচর্চা। ১৯৮০র পরবর্তীতে নয়াউদারনৈতিক অর্থনীতি বিশ্ব, জাতীয় ও স্থানীয় পুজিপতিদের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সাহায্যকারী কৌশল হিসেবে চালু করা হয়। ওই কৌশল বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণিকে আরো ধনী  হতে সাহায্য করে ও ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদক ও শ্রমিকদের অধিক প্রান্তিকীকরণ ঘটায়। প্রথমদিকে হিন্দুত্ববাদীরা তাদের জনমোহিনী ও তথাকথিত জাতীয়তাবাদী  রাজনীতি দিয়ে মানুষকে বোকা বানাতে নয়া উাদারনীতির বিরোধিতা করলেও ক্ষমতায় গেড়ে বসার পরে নয়াউদানীতির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ও বৃহৎ ও বিদেশী পুঁজির তাঁবেদারি করছে। ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদকদের স্বার্থকে সম্পূর্ণ ভাবে জলাঞ্জলি দিয়েছে। ২০১৬ সালের বিমুদ্রাকরণের মাধ্যমে অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপর চরম আঘাত নামিয়ে এনেছিল যার ফলে ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদকরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরে পরেই পণ্য ও সেবা কর (জিএসটি) চালু করে ওই ক্ষেত্রটিকে পুনরায বিপর্যস্ত করে। ১৯৯০এর পর থেকেই নয়া উদারনীতিবাদ ভারতের মাটিতে তাদের ভিত্তি শক্তিশালী করে তোলে। জাতীয় ও আঞ্চলিক মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি পুঁজিপতি শ্রেণির অর্থনৈতিক স্বার্থকে পরিপুষ্ট করার জন্য নয়াউদারনীতিকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রকল্প হিসেবে দেখাতে থাকে।

 

কংগ্রেসের নয়াউদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতি সমূহ হিন্দুত্ব ফ্যাসিস্টদের বৃদ্ধির ও সংহত করার শর্ত তৈরিতে সাহায্য করেছে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী শক্তি কংগ্রেসের সমস্ত নয়াউদারনৈতিক অর্থনীতিকে অনুকরণ করেছে এবং নয়াউদারনীতির রাজত্বকে বীমা, ব্যাঙ্কিং, রেলওয়ে, প্রতিরক্ষা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সর্বত্র বিস্তৃত করেছে। বিজেপির সাঙাত পুঁজির ঝোঁক ভারতীয় বৃহৎ পুঁজিপতির মধ্যেকার বিজেপি সমর্থকদের দ্বারা শক্তিশালী হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টরা পুঁজিপতি শ্রেণিকে তাদের ভিত্তি বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।

অবিতর্কিত উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ছাঁদ ভারতের রাজনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র ও নাগরিক হিসেবে ব্যক্তির আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের বৈশিষ্ট্যতে পরিবর্তন সাধন করছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের পরিত্যাগ করে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার্থে পুলিশ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হচ্ছে। নাগরিকরা ক্ষুধা, গৃ্হহীনতা, বেকারি, রোগ এবং নিরাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক অবিশ্বাস তৈরি করছে ও হিন্দুত্ব রাজনীতির বাড় বাড়ন্ত হওয়ার জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। নয়াউদারনীতি সৃষ্ট শোচনীয় অবস্থা ভারতে হিন্দুত্ববাদী শক্তির দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উর্বর জমি তৈরি করেছে।   

হিন্দুত্ব রাজনীতি অর্থনীতির মুখ ও মুখোশ

হিন্দুত্ব রাজনীতি ভারতে দুটি ভূমিকা গ্রহণ করে। মোদি সরকার দেশজ, বিদেশী, আঞ্চলিক পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী সমস্ত অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে হিন্দুত্ব রাজনীতিকে নয়াউদানৈতিক প্রকল্পের অত্যাবশ্যক অংশ করে  তোলে। অন্যদিকে হিন্দুত্ব নযাউদারনীতিবাদের ও তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। আগেই দেখা গেছে মোদি এবং তার মতাদর্শগত উপদেষ্টা বিদেশী বিনিয়োগের বিরোধিতা করেছিল, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরেই উল্টো পথে হেঁটেছে। যদিও আপাতভাবে নয়াউদারনীতির সঙ্গে হিন্দুত্ব রাজনীতির দ্বন্দ্ব আছে বলে মনে হয়, বাস্তবে প্রথম ভূমিকাটি হল হিন্দুত্ব রাজনীতির সঙ্গে নয়াউদারনীতির একটি ঐক্যবদ্ধ ও জীবন্ত সম্পর্ক। হিন্দুত্বের দ্বিতীয় ভূমিকাটি আদতে প্রথম ভূমিকাটি পালন করার জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে ছদ্মবেশ। ফলে হিন্দুত্ব নয়াউদারনীতিকে সংহত করতে সাহায্য করে ও দ্বিতীয়টি পরবর্তীতে প্রথমটিকে লালনপালন করে শক্তিশালী করে।

হিন্দুত্বের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি কুসংস্কার ও ঘৃণা সৃষ্টি করে। তা জীবন ও জীবিকার বাস্তব সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ফলে তা নয়াঅর্থনীতির সুবিধেভোগী শ্রেণি অর্থাৎ বৃহৎ পুঁজির শোষণকে চাপা দিতে সাহায্য করে। নয়াউদারনীতিবাদ ও মোদি নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট হিন্দুত্ববাদী সরকারের মধ্যে অন্যতম সাধারণ বিষয় হল শ্রম আইন ও শ্রমিক আন্দোলনের উপরে সার্বিক আঘাত। কৃষিক্ষেত্রকে উন্মুক্ত করে বৃহৎ পুঁজির জন্য বিচরণক্ষেত্র খুলে দেওয়া। গণবণ্টন ব্যবস্থাকে ক্রমাগত খর্বিত করা।

নয়া উদারনীতিবাদ ও হিন্দুত্ব উভয়েই ভয় ও নিরাপত্তহীনতার যমজ ভাবনার উপরে প্রোথিত। যা সমাজে ধার্মিক ও আঞ্চলিক বিভাজনের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া পুনরুদ্ভবে সাহায্য করে। হিন্দুত্ব ফ্যাসিস্টরা অর্থনৈতিক রণনীতি হিসেবে নয়াউদারনীতিবাদী মতাদর্শের প্রতি দায়বদ্ধও বটে। নয়াউদারনীতিবাদ ও হিন্দুত্ব উভয়েই গণতন্ত্র সম্পর্কে সন্দিহান। তাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, ব্যক্তির মর্যাদা, মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রভৃতির জন্য সমর্থন ক্রমাগত মতে দেখা যাচ্ছে।  এই ধরণের পরিণতি নয়াউদারনীতিবাদী রাজনীতি, এবং অর্থনৈতিক সংস্কৃতির অঙ্গাঙ্গী বিষয় ও হিন্দুত্ব ফ্যাসিস্ট শক্তির স্বার্থের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ফলে ভারতে নয়াউদারনীতি ও হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদ একে অপরকে পুষ্ট করে চলেছে, একে অপরের সঙ্গে সম্পূর্ন গাঁটছড়া বেঁধে রয়েছে। একটিকে পরাস্ত করতে গেলে অপরটিকেও বর্জন ও বিসর্জন দিতে হবে।

 

 

 

অকাতর সাহায্য নেওয়া হয়েছে নিম্নলিখিত পুস্তক, প্রবন্ধ ও সূত্র থেকে:

  1. Bajrang Lal Gupta, “Sumangalam: A New Development Paradigm,” Organizer, August 14, 2018, http://www.organiser.org//Encyc/2018/8/14/Sumangalam-A-New-Development-Paradigm.html.

 

  1. Bharatiya Janata Party, Vision Document 2004, November 7, 2016, http://library.bjp.org/jspui/bitstream/123456789/244/1/BJP%20VISION%20DOCUMENT%202004.pdf
  2. Bharatiya Mazdoor Sangh, “Draft Resolution-1,” July 16, 2012, http://bms.org.in/encyc/2012/7/16/DRAFT-RESOLUTION--1.aspx
  3. Gopalakrshnan Shankar: Neoliberlaism and Hindutva: Fascism, Fascism, Free Markets and te Restructuring of Indian Capitalism (Radical Notes 2) AAKAR, 2009
  4. Ghosh Jayati: Hindutva, Ecomomic Liberalism and Abuse of Economic Statistics in India; South Asia Multidisciplinary Academic Journal, 24/25/2020
  5. Mehta Gautam: Hindu Nationalism and the BJP’s Economic Record, in Milan Vaishnav Edited “The BJP In Power: Indian democracy and Religious Nationalism” (Date of Publication April 04, 2019)
  6. Mehta Gautam’s interview with Ashwani Mahajan, New Delhi, January 13, 2018
  7. Nayak Bhabani Shankar: Disasters of Neoliberalism and Hindutva Fascism in India; Oxford Political review’ June 10, 2020
  8. PatnaikPrabhat: Hindutva Politics and Indian Economy, in an Interview with Subho Ranjan Dasgupta; Published in The Telegraph, September 03, 2020.
  9. Rashtriya Swayamsevak Sangh (RSS), “Summary of the Vijayadashami 2017 Address of Sarsanghchalak Dr. Mohan Ji Bhagwat,” September 30, 2017, http://rss.org/Encyc/2017/9/30/mohan-bhagwat-vijayadashami-speech-2017.html.
  10. RSS Affiliate Objects Against FDI Easing,” Press Trust of India, November 16,2015, https://www.livemint.com/Politics/zWpT0o9im7fhcDL5zlO7pI/RSS-affiliate-objects-against-FDI-easing.html
  11. “RSS Annual Report Submitted by Sarakaryavah Bhaiyyaji Joshi at ABPS Meet Nagpur,” Samvada.org, March 13, 2015, https://samvada.org/2015/news/rss-annual-report-abps-2015/.
  12. Siddiqui Kalim: Hiondutva, Neoliberalism and Reinventing of India; Journal of Ecomomic Social Thought, Volume 4, Issue 2, June 2017
  13. The SJM has argued that the opening up of retail trade to foreign investment in many developing countries has hurt small shopkeepers. See Swadeshi Jagran Manch, “Resolution-2: Ban Entry of Multinational Companies in Retail,” Tenth National Convention (Jalandhar-Punjab), October 2–4, 2010, https://www.swadeshionline.in/resolution-2

 

 

 

.

.

 

 

 

0 Comments
Leave a reply