ইন্ডিয়া জোট : আইডিয়া থেকে হয়ে উঠতে হবে আইডেনটিটি
- 07 July, 2026
- লেখক: সৌমিত্র বসু
“আইডিয়া” হচ্ছে অবধারনা অর্থাৎ কিছু সম্পূর্ণ গঠিত ধারণা এখনও হয়ে ওঠে নি। বহু ঘষা মাজা তর্ক বিতর্কের পরে যা একটা সুসংগঠিত সুপক্ক ধারণায় রূপ নেয়। ইঞ্জিরি ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মান ও মান্য ভাষায় দুটো ভিন্ন শব্দ আছে। বক্তার উদ্দেশ্য তার আইডিয়াতে প্রাথমিক রূপ পায়। দৈনন্দিন জীবনের চর্যা এবং অনুশীলনে একটা “মত” তৈরি হয় যখন তা এক ব্যক্তি থেকে বহু ব্যক্তির সমর্থন তৈরি আদায় করে নেয় এবং তাঁরাও একে নিজেদেরই মত হিসাবে গ্রহণ করে। এঁরা তখন একটা সমূহিক পরিচয় গ্রহণ করেন, আমরা কথ্য ভাষায় বলি “দল “ গড়েছেন, এই সম্মিলনকে একটা বিশেষ্য আরোপ করা হয়, আমরা যাকে বলি একটা পরিচিতি বা “আইডেন্টিটি”. অন্য মতামত কে অন্যান্য পরিচিতি দেওয়া হয়। শুরু হয় দলবদ্ধ বিতর্ক । এটা যখন দীর্ঘকালীন চলে আমরা চিহ্নিত করি মতবাদ হিসেবে। মতবাদ থেকে জন্ম নেয় মতাদর্শ অর্থাৎ যার একটা নির্যাসিত রূপ বা বিমূর্ত রূপ যা অন্যান্য ইস্যুতে প্রক্ষিপ্ত হয়, তাই মতাদর্শের প্রায়োগিক রূপ। কোনও চিন্তা abstraction বা সাধারণ বিমূর্তায়ন না হলে ভিন্ন প্রেক্ষিতে ভিন্ন ইস্যু তে প্রযুক্ত হতে পারে না ।মতবাদ সবসময়েই রাজনৈতিক (তা সে ধর্মীয় বিভাজনের ক্ষেত্রেও বাস্তব)! ফারাক গুলোকে নিয়েই চর্চা ও চর্যা চলে। এই শুরু হয়ে গেলো আইডেন্টিটি বা পরিচিতির সংগ্রাম।
চিন্তার জগতে শেষতম বিভাজন কর্মের ভিত্তিতে বা ব্যক্তিবিশেষের চর্যায় ও জীবিকায় । কথ্য ভাষায় বলি খেটে খাওয়া আর মেরে খাওয়ার্ দুটো দল। শেষাবধি “মাঝখানে নেই তো কিছু”। এর বাইরে আর সব বিভাজনই কর্ম নির্ভর উপার্জন ভিত্তিক নয়। অন্য সব “পরিচিতি” গুলোই জন্মের দাগ ভিত্তিক অর্থাৎ প্রাণীজগতের প্রথম এক্সিডেন্ট দ্বারা নির্ধারিত, যার ওপর প্রাণীর কোনও অধিকার নেই। কিন্তু কোনো জন্ম ভিত্তিক সমূহ যখন শুধুই জন্মের কারনে অপর একটি সমূহ কে নিপীড়িত করে বা ব্রাত্য করে রাখে তখন সেই প্রক্রিয়া একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই হয়ে ওঠে, আর তার চরিত্র “খেটে খাওয়া আর মেরে খাওয়া দের” মধ্যেকার দ্বন্দ্বে রূপান্তরিত হয় অর্থাৎ পরিচিতির সংগ্রাম শেষ বিচারে শ্রেণী সংগ্রামে ঘনীভূত হয়। পরিচিতির সংগ্রাম বা আইডেনটিটির সংগ্রাম শ্রেণী সংগ্রামেরির আগের রূপ। এই রূপ পরিগ্রহ দীর্ঘ জীবন জীবিকার লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই ক্ষুরধার হতে থাকে।
বিভিন্ন ধরনের সংগ্রাম ঘনীভূত হয় এক বৃহত্তর বিভাজনে যেখানে ব্যাপক জনগণের সঙ্গে খুবই কম সংখ্যক অথচ খুবই শক্তিশালী প্রায় সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত করা অংশটি খুব দ্রুত প্রবৃদ্ধি হারে ধনী হতে থাকে আর ব্যাপক মানুষ নিরন্ন, নিঃসহায় হতে থাকে। উদাহোরো স্বরূপ ভারতের নামকরা দুটি ক্রোনি পুঁজিপতি দশ বছরে বিশ্বের ধনী ক্রমে ৯৭২ স্থান থেকে এখন বিশ্ব বাজারে দ্বিতীয় স্থানে। আর মানুষের মাথা পিছু আয়ের নিরিখে সবচেয়ে নিচের ও
অবস্থানে চলে গেছে। একে নাকি”প্রবৃদ্ধি” আর “বিকাশ”বলে চালানো হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে কার বিকাশ , কার প্রবৃদ্ধি? মতবাদ এর পার্থক্য এখানেই সব লড়াইয়ের শেষ লড়াইয়ে এসে ঠেকছে। পরিচিতির সংগ্রামগুলো এখন সেই মূল শ্রেণী সংগ্রামের বিভিন্ন প্রেক্ষিত ভিত্তিক আলাদা আলাদা প্রায়োগিক রূপ।
মেরে খাওয়া লোকেদের শাসন ব্যবস্থা কে আমরা ইদানীং “বুর্জোয়া” ব্যবস্থা বলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এই বুর্জোয়া ব্যবস্থা বিভিন্ন কায়দায় বিভিন্ন রূপে শোষণ ও পরের পর্যায়ে নিপীড়ন চালিয়ে থাকে,প্রত্যেকটি বিষয়ের একেবারে বিশিষ্ট প্রতিরোধ পদ্ধতি আছে, তার জন্য পথের লড়াই আছে, আইনি লড়াই আছে, কায়দার লড়াই আছে কিন্তু প্রতিরোধ বস্তুটি সাধারন বা কমন , প্রতিরোধের মতাদর্শ বা অভীপ্সা ও সেখানে বিভিন্ন রূপের ও বিভিন্ন পথে হয়তো করতে পারে কিন্তু প্রতিরোধ বিষয় টা তে হাত পাকাতে হয় , প্রত্যেকটি লড়াইয়ে মানুষের সংগে পথ হেঁটে ও লড়াইয়ের মধ্যে অংশগ্রহণ করে, তবেই সাধারণ না কমন প্রতিরোধের মতাদর্শ তৈরি হয়।
উদাহরণ স্বরূপ ভারতে এইমুহূর্তে সব চেয়ে বড় বিরোধি দল কংগ্রেস এই “ প্রতিরোধের” মঞ্চ থেকে সরকারি দল হয়ে একনায়কতন্ত্রের দলে পরিণত হয়েছিল, আজ সে সব জায়গায় ধাক্কা খেয়ে আবার সেই প্রতিরোধের রণনীতি নেওয়ার কথা অন্ততঃ মুখে বলছে । তবে এখনও তার দেমাগ কমে নি, সে চায় দেশ ব্যাপী “প্রতিরোধের” গুরুঠাকুর হতে। সবরকম প্রতিরোধই নাকি তাদের সম্মতি প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রতিরোধ যদি একটা কমন বা সাধারণ পরিচিতির মানক হয় তবে তার “অনুমতি স্বাক্ষর” কংগ্রেসের থেকেই নিতে হবে। এইমুহূর্তে বাংলায় ও দেশে যে কটা বড় আন্দোলন চলছে তার একটাতেও কংগ্রেস প্রধান ভূমিকায় নেই, কিন্তু তাদের নেতৃত্বেই নাকি সব প্রতিরোধ আন্দোলন গুলোকেই সংঘবদ্ধ হতে হবে, তাদের নেতৃত্বর পরামর্শ ও অনুমতি নিয়ে। গ্রামস্চি এই মানসিকতাকে সাংস্কৃতিক আধিপত্য আখ্যা দিয়েছিলেন। প্রতিরোধ কে কেন্দ্রে অক্ষ দণ্ড রেখেই সমস্ত ধরনের পরিচিতি সংগ্রাম কেই অঙ্গীভূত হতে হবে জীবনজীবিকার শ্রেণীসংগ্রাম এর বলয়ে। আজকের বড় বড় আন্দোলনগুলো কিন্তু সেই পথটাকেই দেখা। জাজ্জ্বল্য উদাহরণ বাংলায় হকার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন। আইডেন্টিটি এখন কে হকারদের পক্ষে আর কারা নন। লড়াইএর মধ্যে দিয়ে নতুন বিশেষ পরিচিতি সামনে আসে। আইডিয়া আসে গনসংগ্রামের মধ্যে আর সেই আইডিয়া যেমন লড়াইয়ের প্রক্রিয়ায় ও ময়দানে আইডেনটিটির জন্ম দেয় তেমন আবার আইডেনটিটির সংগ্রাম ঐক্যবদ্ধ মতাদর্শ বা নতুন আইডিয়ার জন্ম দেয়, যেমন ভারতের যুব বিদ্রোহ যা সোজাসুজি শাসক বিরোধি গণসংগ্রানের দৃষ্টিভঙ্গি।