আখ্যানপাঠ : বঙ্কিমচন্দ্রের 'আনন্দমঠ'

বঙ্কিমের আনন্দমঠ বাংলা উপন্যাসের এমন এক নির্মাণ যার প্রভাব সাহিত্যের পরিসরকে ছাড়িয়ে সমাজরাজনীতি ইতিহাসকে বিরাট পরিমাণে প্রভাবিত করেছে। ইতিহাসের এক অধ্যায় – সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে এর কিছু উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন বঙ্কিম। কিন্তু সেই উপাদানকে তিনি ইচ্ছেমতো বদলেছেন। সেই বদল এতটাই যে ‘আনন্দমঠ’ আর ঐতিহাসিক উপন্যাস থাকে নি। ‘রাজসিংহ’ লিখে বঙ্কিম দেখিয়েছিলেন নিখুঁত ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখায় তাঁর দক্ষতা কত। তারও আগে ইতিহাসের পটটিকে ব্যবহার করে রোমান্স লিখে পাঠককে মাতানোর ক্ষমতা তার কতটা ছিল, সে প্রমাণ মিলবে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বা ‘কপালকুণ্ডলা’তে। আবার সমাজ পরিবারের নৈতিক সঙ্কটকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সাজিয়ে নিতে বঙ্কিমী মুন্সিয়ানা ধরা রয়েছে তাঁর ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে। ইতিহাসের পটকে কতভাবে ব্যবহার করা যায় বঙ্কিম তা দেখিয়েছেন বারবার। ‘আনন্দমঠে’ এই পটকে তিনি ব্যবহার করলেন কিছু রাজনৈতিক কথা বলার জন্য।

‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গোষ্ঠী, যাঁদের আমরা চিনেছি সন্তান দল বলে। এই দলের যিনি আসল কাণ্ডারী ও মন্ত্রণাদাতা তিনি মূলত থাকেন আড়ালে। একেবারে শেষে এসে সেই অনামা চিকিৎসকের কিছু দর্শন ইতিহাস রাজনীতি ভাবনার কথা আমরা শুনি, কিন্তু তার আগে তিনি নিজে প্রায় অনুপস্থিত। গোটা উপন্যাসে যিনি সন্তান দলের নেতৃত্ব দেন তিনি হলেন সত্যানন্দ। তাঁর প্রধান সহায়ক ভবানন্দ, জীবানন্দ, ধীরানন্দ প্রমুখ সন্ন্যাসীরা, যারা সংসার পরিত্যাগ করে মায়ের ব্রত অবলম্বন করেছে। সত্যানন্দ, ভবানন্দ, জীবানন্দ প্রমুখদের নেতৃত্বে সন্তানদলের ক্রম শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকে। তাঁদের লড়াই শাসকের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তখন বাংলার দেওয়ানী বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা লাভ করেছে, কিন্তু রাজনৈতিক শাসন আনুষ্ঠানিকভাবে তখনো নবাবের হাতে। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতনের পর, বক্সারের যুদ্ধে মীরকাসিমের পতনের পর বাংলার নবাবরা তখন কার্যত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতের পুতুল। মীরজাফর ও তাঁর বংশধরেরা কেবল নামে মাত্র সিংহাসনে বসে আছেন তখন। দ্বৈত শাসন ব্যবস্থারএই অরাজক দিনগুলিই সন্ন্যাসীদের আক্রমণের লক্ষ্য। উপন্যাসে আমরা সন্তান সম্প্রদায়ের নেতাদের থেকে বারবার শুনি যে শাসক প্রজাকে রক্ষা করে না, সেই শাসককে তারা স্বীকৃতি দিতে রাজী নয়।

“যতদেশ আছে, — মগধ, মিথিলা, কাশী, কাঞ্চী, দিল্লী, কাশ্মীর, কোন্ দেশের এমন দুর্দশা, কোন্দেশে মানুষ খেতে না পেয়ে ঘাস খায়? কাঁটা খায়? উইমাটি খায়? বনের লতা খায়? কোন্ দেশেমানুষ শিয়াল-কুক্কুর খায়, মড়া খায়? কোন্ দেশের মানুষের সিন্দুকে টাকা রাখিয়া সোয়াস্তিনাই, সিংহাসনে শালগ্রাম রাখিয়া সোয়াস্তি নাই, ঘরে ঝি-বউ রাখিয়া সোয়াস্তি নাই, ঝি-বউয়েরপেটে ছেলে রেখে সোয়াস্তি নাই? পেট চিরে ছেলে বার করে। সকল দেশের রাজার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের সম্বন্ধ; আমাদের মুসলমান রাজা রক্ষা করে কই? ধর্ম গেল, জাতি গেল, মান গেল, কুল গেল, এখন ত প্রাণ পর্যন্তও যায়। এ নেশাখোর নেড়েদের না তাড়াইলে আর কি হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে?”

কিন্তু এও বোঝা যায় শুধু অরাজক পরিস্থিতিই তাঁদের চাঁদমারি নয়, মুসলিম শাসনকে উচ্ছেদ করে তারা হিন্দুরাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মুসলিম বিদ্বেষের কারণ হিসেবে সন্তান নেতারা বারবার জানায় মুসলিমরা হিন্দুদের ধর্মপালনের পথে বিঘ্নস্বরূপ, তাই যেন তেন প্রকারেণ মুসলিমদের হীনবল করতে হবে। তাঁদের কথাবার্তা ও ভাবনাচিন্তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত এরকম -

১। ভবানন্দ মঠের ভিতর বসিয়া হরিগুণ গান করিতেছিলেন। এমত সময়ে বিষণ্ণমুখে জ্ঞানানন্দনামাএকজন অতি তেজস্বী সন্তান তাঁহার কাছে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ভবানন্দ বলিলেন, “গোঁসাই, মুখ অত ভারি কেন?” জ্ঞানানন্দ বলিলেন, “কিছু গোলযোগ বোধ হইতেছে। কালিকার কাণ্ডটার জন্য নেড়েরা গেরুয়া কাপড় দেখিতেছে, আর ধরিতেছে। অপরাপর সন্তানগণ আজ সকলেই গৈরিক বসন ত্যাগ করিয়াছে। কেবল সত্যানন্দ প্রভুগেরুয়া পরিয়া একা নগরাভিমুখে গিয়াছেন। কি জানি, যদি তিনি মুসলমানের হাতে পড়েন |”ভবানন্দ বলিলেন, “তাঁহাকে আটক রাখে, এমন মুসলমান বাঙ্গালায় নাই। ধীরানন্দ তাঁহার পশ্চাদ্গামী হইয়াছেন জানি। তথাপি আমি একবার নগর বেড়াইয়া আসি। তুমি মঠ রক্ষা করিও।”

২। ম। বুঝিলাম। সন্তানেরা তবে উপাসকসম্প্রদায় মাত্র?

স। তাই। আমরা রাজ্য চাহি না – কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলিয়া তাহাদের সবংশে নিপাত করিতে চাই।  

সন্তানদলের একদিকে রয়েছে কয়েক হাজার মানুষের এক সুগঠিত সেনাবাহিনী ও অন্যদিকে রয়েছে মতাদর্শে দৃঢ় অল্প কিছু মানুষের এক নেতৃত্বকারী অংশ। যে সেনাবাহিনী সেখানে আছে ধর্মে অদীক্ষিত লোকেরাও। তারা কাঞ্চনমূল্যে সন্তুষ্ট। কিন্তু সংগঠনের নেতৃত্ব রয়েছে মতাদর্শে দীক্ষিতদের হাতেই। সত্যানন্দ বলেন - “সন্তান দ্বিবিধ, দীক্ষিত আর অদীক্ষিত। যাহারা অদীক্ষিত, তাহারা সংসারী বা ভিখারী। তাহারা কেবল যুদ্ধের সময় আসিয়া উপস্থিত হয়, লুঠের ভাগ বা অন্য পুরস্কার পাইয়া চলিয়াযায়। যাহারা দীক্ষিত, তাহারা সর্বত্যাগী। তাহারাই সম্প্রদায়ের কর্তা। তোমাকে অদীক্ষিতসন্তান হইতে অনুরোধ করি না, যুদ্ধের জন্য লাঠি - সড়কিওয়লা অনেক আছে। দীক্ষিত না হইলে তুমি সম্প্রদায়ের কোন গুরুতর কার্যে অধিকারী হইবে না।” আনন্দমঠ উপন্যাসে সন্ন্যাসীরা কেবল যে তাত্ত্বিক কথাবার্তা বলেছে তাই নয়, তাঁদের যুদ্ধ আয়োজনের বাস্তব প্রস্তুতিটিও বিরাট। প্রচুর স্বেচ্ছাসেনা তাঁরা সংগ্রহ করেছে, তাঁদের মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত করে জীবনদানের জন্য উজ্জীবিত করেছে। শত্রুর সঙ্গে লড়াই করার জন্য অস্ত্র কারখানা বানিয়েছে, দুর্গ নির্মাণ করেছে, তার চারিদিকে পরিখাও খনন করেছে। এ কাজে প্রতাপশালী জমিদার মহেন্দ্র তাঁদের বিশেষ সহায়ক হয়েছেন।

সত্যানন্দ বলিলেন, “দেবতা অপ্রসন্ন নহেন। যুদ্ধে জয় পরাজয় উভয়ই আছে। সে দিন আমরা জয়ী হইয়াছিলাম, আজ পরাভূত হইয়াছি, শেষ জয়ই জয়। আমার নিশ্চিত ভরসা আছে যে, যিনি এত দিন আমাদিগকে দয়া করিয়াছেন, সেই শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী বনমালী পুনর্বার দয়াকরিবেন। তাঁহার পাদস্পর্শ করিয়া যে মহাব্রতে আমরা ব্রতী হইয়াছি, অবশ্য সে ব্রত আমাদিগকে সাধন করিতে হইবে। বিমুখ হইলে আমরা অনন্ত নরক ভোগ করিব। আমাদের ভাবী মঙ্গলের বিষয়ে আমার সন্দেহ নাই। কিন্তু যেমন দৈবানুগ্রহ ভিন্ন কোন কার্য সিদ্ধ হইতে পারে না, তেমনি পুরুষকারও চাই। আমরা যে পরাভূত হইলাম, তাহার কারণ এই যে, আমরা নিরস্ত্র। গোলা গুলিবন্দুক কামানের কাছে লাঠিসোটা বল্লমে কি হইবে? অতএব আমাদিগের পুরুষকারের লাঘব ছিল বলিয়াইএই পরাভব হইয়াছে। এক্ষণে আমাদের কর্তব্য, আমাদিগেরও ঐরূপ অস্ত্রের অপ্রতুল না হয়।”২।দীক্ষা সমাপনান্তে সত্যানন্দ, মহেন্দ্রকে অতি নিভৃত স্থানে লইয়া গেলেন। উভয়ে উপবেশনকরিলে সত্যানন্দ বলিতে লাগিলেন, “দেখ বৎস! তুমি যে এই মহাব্রত গ্রহণ করিলে, ইহাতে ভগবানআমাদের প্রতি অনুকূল বিবেচনা করি। তোমার দ্বারা মার সুমহৎ কার্য অনুষ্ঠিত হইবে। তুমিযত্নে আমার আদেশ শ্রবণ কর। তোমাকে জীবানন্দ, ভবানন্দের সঙ্গে বনে বনে ফিরিয়া যুদ্ধকরিতে বলি না। তুমি পদচিহ্নে ফিরিয়া যাও। স্বধামে থাকিয়াই তোমাকে সন্ন্যাসধর্ম পালনকরিতে হইবে ।” মহেন্দ্রশুনিয়া বিস্মিত ও বিমর্ষ হইলেন। কিছু বলিলেন না। ব্রহ্মচারী বলিতে লাগিলেন, “এক্ষণেআমাদিগের আশ্রয় নাই ; এমন স্থান নাই যে, প্রবল সেনা আসিয়া আমাদিগকে অবরোধ করিলে আমরাখাদ্য সংগ্রহ করিয়া, দ্বার রুদ্ধ করিয়া দশ দিন নির্বিঘ্নে থাকিব। আমাদিগের গড় নাই।তোমার অট্টালিকা আছে, তোমার গ্রাম তোমার অধিকারে। আমার ইচ্ছা, সেইখানে একটি গড় প্রস্তুত করি। পরিখা প্রাচীরের দ্বারা পদচিহ্ন বেষ্টিত করিয়া মাঝে মাঝে তাহাতে ঘাঁটি বসাইয়াদিলে, আর বাঁধের উপর কামান বসাইয়া দিলে উত্তম গড় প্রস্তুত হইতে পারিবে। তুমি গৃহেগিয়া বাস কর, ক্রমে ক্রমে দুই হাজার সন্তান সেখানে গিয়া উপস্থিত হইবে। তাহাদিগেরদ্বারা গড়, ঘাঁটির বাঁধ, এই সকল তৈয়ার করিতে থাকিবে। তুমি সেখানে উত্তম লৌহনির্মিতএক ঘর প্রস্তুত করাইবে। সেখানে সন্তানদিগের অর্থের ভাণ্ডার হইবে। সুবর্ণে পূর্ণ সিন্দুকসকলতোমার কাছে একে একে প্রেরণ করিব। তুমি সেই সকল অর্থের দ্বারা এই সকল কার্য নির্বাহকরিবে। আর আমি নানা স্থান হইতে কৃতকর্মা শিল্পিসকল আনাইতেছি। শিল্পীসকল আসিলে তুমি পদচিহ্নে কারখানা স্থাপন করিবে। সেখানে কামান, গোলা, বারুদ, বন্দুক প্রস্তুত করাইবে।এই জন্য তোমাকে গৃহে যাইতে বলিতেছি।” মহেন্দ্র স্বীকৃত হইলেন। আনন্দমঠের রাজনীতি রাষ্ট্র ও সমাজ কেন্দ্রিক। একদিকে আছে সুশাসনের প্রসঙ্গ, অন্যদিকে আছে ধর্মপালনেরপ্রসঙ্গ। সত্যানন্দ সন্তানদের ধর্মকে বৈষ্ণব ধর্ম বলে চিহ্নিত করেন, কিন্তু সেই বৈষ্ণবধর্ম যে চৈতন্য প্রচারিত বৈষ্ণবধর্ম থেকে আলাদা, তাও স্পষ্ট করে দেন।

স। সন্তানেরা বৈষ্ণব।

ম। ইহা বুঝিতে পারি না। সন্তানেরা বৈষ্ণব কেন? বৈষ্ণবের অহিংসাই পরম ধর্ম।

স। সে চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব। নাস্তিক বৌদ্ধধর্মের অনুকরণে যে অপ্রকৃত বৈষ্ণবতা উৎপন্ন হইয়াছিল, এ তাহারই লক্ষণ। প্রকৃত বৈষ্ণবধর্মের লক্ষণ দুষ্টের দমন, ধরিত্রীর উদ্ধার। কেন না, বিষ্ণুই সংসারের পালনকর্তা। দশ বার শরীর ধারণ করিয়া পৃথিবী উদ্ধার করিয়াছেন। কেশী, হিরণ্যকশিপু, মধুকৈটভ, মুর, নরক প্রভৃতি দৈত্যগণকে, রাবণাদি রাক্ষসগণকে, কংস, শিশুপালপ্রভৃতি রাজগণকে তিনিই যুদ্ধে ধ্বংস করিয়াছিলেন। তিনিই জেতা, জয়দাতা, পৃথিবীর উদ্ধারকর্তা,আর সন্তানের ইষ্টদেবতা। চৈতন্যদেবের বৈষ্ণবধর্ম প্রকৃত বৈষ্ণবধর্ম নহে – উহা অর্ধেকধর্ম মাত্র। চৈতন্যদেবের বিষ্ণু প্রেমময় – কিন্তু ভগবান কেবল প্রেমময় নহেন – তিনিঅনন্তশক্তিময়। চৈতন্যদেবের বিষ্ণু শুধু প্রেমময় – সন্তানের বিষ্ণু শুধু শক্তিময়।আমরা উভয়েই বৈষ্ণব – কিন্তু উভয়েই অর্ধেক বৈষ্ণব।

নয়াশাসক হিসেবে ক্রমশই সামনে আসতে থাকা ইংরেজদের আক্রমণ করার পথেও সত্যানন্দ প্রমুখ সন্তানেরা এগোতে চান। কিন্তু তাঁদের নেপথ্য নেতা অনামা চিকিৎসক সে পথ পরিহার করার কথা বলেন। ইংরেজশাসন যে শান্তি শৃঙ্খলা, কল্যাণ নিয়ে আসবে, মুসলিমদের অরাজক শাসনের অবসান ঘটাবে, সেকথা এই উপন্যাসের শেষ খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়, কিন্তু তারও অনেক আগেই এমন কথা আভাসে ইঙ্গিতে বেশ কয়েকবার এসেছে। যেমন – ‘কোতয়াল রাজসরকারে এতালা পাঠাইয়া দিয়া ব্রহ্মচারী ও মহেন্দ্রকে সম্প্রতি ফাটকে রাখিলেন। সে কারাগার অতি ভয়ঙ্কর, যে যাইত, সে প্রায় বাহির হইত না; কেন না, বিচার করিবার লোকছিল না। ইংরেজের জেল নয় – তখন ইংরেজের বিচার ছিল না। আজ নিয়মের দিন – তখন অনিয়মের দিন। নিয়মের দিনে আর অনিয়মের দিনে তুলনা কর।’

আনন্দমঠের একেবারে শেষ পরিচ্ছেদ, চতুর্থ খণ্ডের অষ্টম পরিচ্ছেদে সমস্ত আড়াল আবডাল ভেঙে উপন্যাসের নেপথ্য নায়ক সামনে আসেন ও তাঁর রাজনীতিটা স্পষ্ট করে দেন। সত্যানন্দ ও অন্যান্যসন্তানেরা যেখানে হিন্দুরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য পুরনো মুসলিম শাসন ও সামনে আসতে থাকা ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে যুগপৎ লড়তে চান, সেখানে নেপথ্য নায়ক চিকিৎসক চরিত্রটি সামনে এসে জানিয়েছেন – ‘ইংরেজ শত্রু নয়, মিত্রশক্তি’। এই দৃষ্টিকোণ ও তার পেছনে থাকা চিন্তাটি লক্ষ করা যাক – সত্যানন্দ ঠাকুর রণক্ষেত্র হইতে কাহাকে কিছু না বলিয়া আনন্দমঠে চলিয়া আসিলেন। সেখানে গভীর রাত্রে, বিষ্ণুমণ্ডপে বসিয়া ধ্যানে প্রবৃত্ত। এমত সময়ে সেই চিকিৎসক সেখানে আসিয়া দেখা দিলেন। দেখিয়া সত্যানন্দ উঠিয়া প্রণাম করিলেন।

চিকিৎসক বলিলেন, “সত্যানন্দ, আজ মাঘী পূর্ণিমা।”

স। চলুন – আমি প্রস্তুত। কিন্তু হে মহাত্মন্! – আমার এক সন্দেহ ভঞ্জন করুন। আমি যে মুহূর্তে যুদ্ধজয় করিয়া সনাতনধর্ম নিষ্কণ্টক করিলাম – সেই সময়েই আমার প্রতি এ প্রত্যাখ্যানের আদেশ কেন হইল?

যিনি আসিয়াছিলেন, তিনি বলিলেন,“তোমার কার্য সিদ্ধ হইয়াছে, মুসলমানরাজ্য ধ্বংস হইয়াছে। আর তোমার এখন কোন কার্য নাই। অনর্থক প্রাণিহত্যার প্রয়োজন নাই।”

স। মুসলমানরাজ্য ধ্বংস হইয়াছে, কিন্তু হিন্দুরাজ্য স্থাপিত হয় নাই – এখনও কলিকাতায় ইংরেজ প্রবল।

তিনি। হিন্দুরাজ্য এখন স্থাপিত হইবে না – তুমি থাকিলে এখন অনর্থক নরহত্যা হইবে। অতএব চল।

শুনিয়া সত্যানন্দ তীব্র মর্মপীড়ায় কাতর হইলেন। বলিলেন, “হে প্রভু! যদি হিন্দুরাজ্য স্থাপিত হইবে না, তবে কে রাজা হইবে? আবার কি মুসলমান রাজা হইবে?”

তিনি বলিলেন, “না, এখন ইংরেজ রাজা হইবে।”

সত্যানন্দের দুই চক্ষে জলধারা বহিতে লাগিল। তিনি উপরিস্থিতা, মাতৃরূপা জন্মভূমি প্রতিমার দিকে ফিরিয়া জোড়হাতে বাষ্পনিরুদ্ধস্বরে বলিতে লাগিলেন, “হায় মা! তোমার উদ্ধার করিতে পারিলাম না – আবার তুমি ম্লেচ্ছের হাতে পড়িবে। সন্তানের অপরাধ লইও না। হায় মা! কেন আজ রণক্ষেত্রে আমার মৃত্যু হইল না।”

চিকিৎসক বলিলেন, “সত্যানন্দ, কাতর হইও না। তুমি বুদ্ধির ভ্রমক্রমে দস্যুবৃত্তির দ্বারা ধন সংগ্রহ করিয়া রণজয় করিয়াছ। পাপের কখন পবিত্র ফল হয় না। অতএব তোমরা দেশের উদ্ধার করিতে পারিবে না। আর যাহা হইবে, তাহা ভালই হইবে। ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতনধর্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই। মহাপুরুষেরা যেরূপ বুঝিয়াছেন, এ কথা আমি তোমাকে সেইরূপ বুঝাই। মনোযোগ দিয়া শুন। তেত্রিশ কোটি দেবতার পূজা সনাতনধর্ম নহে, সে একটা লৌকিক অপকৃষ্টধর্ম; তাহার প্রভাবে প্রকৃত সনাতনধর্ম – ম্লেচ্ছেরা যাহাকে হিন্দুধর্ম বলে – তাহা লোপ পাইয়াছে। প্রকৃত হিন্দুধর্ম জ্ঞানাত্মক, কর্মাত্মক নহে। সেই জ্ঞান দুই প্রকার, বহির্বিষয়ক ও অন্তর্বিষয়ক। অন্তর্বিষয়ক যে জ্ঞান, সে-ই সনাতনধর্মের প্রধান ভাগ। কিন্তু বহির্বিষয়ক জ্ঞান আগে না জন্মিলে অন্তর্বিষয়ক জ্ঞান জন্মিবার সম্ভাবনা নাই। স্থূল কি, তাহা না জানিলে, সূক্ষ্ম কি, তাহা জানা যায় না। এখন এ দেশে অনেকদিন হইতে বহির্বিষয়ক জ্ঞান বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে – কাজেই প্রকৃত সনাতনধর্মও লোপ পাইয়াছে। সনাতনধর্মের পুনরুদ্ধার করিতে গেলে, আগে বহির্বিষয়ক জ্ঞানের প্রচার করা আবশ্যক। এখন এদেশে বহির্বিষয়ক জ্ঞান নাই – শিখায় এমন লোক নাই; আমরা লোকশিক্ষায় পটু নহি। অতএব ভিন্ন দেশ হইতে বহির্বিষয়ক জ্ঞান আনিতে হইবে। ইংরেজ বহির্বিষয়ক জ্ঞানে অতি সুপণ্ডিত, লোকশিক্ষায় বড় সুপটু। সুতরাং ইংরেজকে রাজা করিব। ইংরেজী শিক্ষায় এদেশীয় লোক বহিস্তত্ত্বে সুশিক্ষিত হইয়া অন্তস্তত্ত্ব বুঝিতে সক্ষম হইবে। তখন সনাতনধর্ম প্রচারের আর বিঘ্ন থাকিবে না। তখন প্রকৃত ধর্মআপনা আপনি পুনরুদ্দীপ্ত হইবে। যত দিন না তা হয়, যত দিন না হিন্দু আবার জ্ঞানবান গুণবান আর বলবান হয়, তত দিন ইংরেজরাজ্য অক্ষয় থাকিবে। ইংরেজ রাজ্যে প্রজা সুখী হইবে – নিষ্কণ্টকে ধর্মাচরণ করিবে। অতএব হে বুদ্ধিমান – ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে নিরস্ত হইয়া আমার অনুসরণ কর।” সত্যানন্দ বলিলেন, “হে মহাত্মন্! যদি ইংরেজকে রাজা করাই আপনাদের অভিপ্রায়, যদি এ সময়ে ইংরেজের রাজ্যই দেশের পক্ষে মঙ্গলকর, তবে আমাদিগকে এই নৃশংস যুদ্ধকার্যে কেন নিযুক্ত করিয়াছিলেন?” মহাপুরুষ বলিলেন, “ইংরেজ এক্ষণে বণিক – অর্থসংগ্রহেই মন, রাজ্যশাসনের ভার লইতে চাহে না। এই সন্তানবিদ্রোহের কারণে, তাহারা রাজ্যশাসনের ভার লইতে বাধ্য হইবে; কেন না, রাজ্যশাসন ব্যতীত অর্থসংগ্রহ হইবে না। ইংরেজ রাজ্যে অভিষিক্ত হইবে বলিয়াই সন্তানবিদ্রোহ উপস্থিত হইয়াছে। এক্ষণে আইস – জ্ঞানলাভ করিয়া তুমি স্বয়ং সকলকথা বুঝিতে পারিবে।”

স। হে মহাত্মন্! আমি জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা রাখি না – জ্ঞানে আমার কাজ নাই – আমি যে ব্রতে ব্রতী হইয়াছি, ইহাই পালনকরিব। আশীর্বাদ করুন, আমার মাতৃভক্তি অচলা হউক।

মহাপুরুষ। ব্রত সফল হইয়াছে – মারমঙ্গল সাধন করিয়াছ – ইংরেজরাজ্য স্থাপন করিয়াছ। যুদ্ধবিগ্রহ পরিত্যাগ কর, লোকে কৃষিকার্যে নিযুক্ত হউক, পৃথিবী শস্যশালিনী হউন, লোকের শ্রীবৃদ্ধি হউক।

সত্যানন্দের চক্ষু হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইল। তিনি বলিলেন, “শত্রুশোণিতে সিক্ত করিয়া মাতাকে শস্যশালিনী করিব।” মহাপুরুষ। শত্রু কে? শত্রু আর নাই।ইংরেজ মিত্ররাজা। আর ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে শেষ জয়ী হয়, এমন শক্তিও কাহারও নাই। স। না থাকে, এইখানে মাতৃপ্রতিমা সম্মুখে দেহত্যাগ করিব। মহাপুরুষ। অজ্ঞানে? চল, জ্ঞানলাভ করিবে চল। হিমালয় শিখরে মাতৃমন্দির আছে, সেইখান হইতে মাতৃমূর্তি দেখাইব। এই বলিয়া মহাপুরুষ সত্যানন্দেরহাত ধরিলেন। কি অপূর্ব শোভা! সেই গম্ভীর বিষ্ণুমন্দিরে প্রকাণ্ড চতুর্ভুজ মূর্তিরসম্মুখে, ক্ষীণালোকে সেই মহাপ্রতিভাপূর্ণ দুই পুরুষ মূর্তি শোভিত – একে অন্যের হাত ধরিয়াছেন। কে কাহাকে ধরিয়াছে? জ্ঞান আসিয়া ভক্তিকে ধরিয়াছে – ধর্ম আসিয়া কর্মকে ধরিয়াছে ; বিসর্জন আসিয়া প্রতিষ্ঠাকে ধরিয়াছে ; কল্যাণী আসিয়া শান্তিকে ধরিয়াছে। এই সত্যানন্দ শান্তি ; এই মহাপুরুষ কল্যাণী। সত্যানন্দ প্রতিষ্ঠা, মহাপুরুষ বিসর্জন।

আনন্দমঠে বঙ্কিম অনেক ইতিহাসকে মেলাতে পারেন নি। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ছায়ায় এই উপন্যাস লিখলেও এই বিদ্রোহের অনেককিছু তাই তাঁকে বদলে নিতে হয়েছিল। ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত দফায় দফায় চলেছিল সন্ন্যাসী বিদ্রোহ। এর অনেকটা সময় জুড়েই দ্বৈত শাসনের বদলে ছিল ইংরেজদের একচেটিয়া শাসন। সন্ন্যাসী বিদ্রোহও কোনওভাবেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল না। এই কৃষকবিদ্রোহ ছিল হিন্দু মুসলিমের যৌথ লড়াই। মজনু শাহ ছিলেন এই লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান নেতা। অন্যতম নেতা ছিলেন নুরুল মহম্মদ। অথচ বঙ্কিম নিজের ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণকে সামনে এনে দেখান সন্ন্যাসী বিদ্রোহ পরিচালিত হচ্ছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে। ইতিহাস আর নিজের গোপন বাসনাকে বঙ্কিম যে আনন্দমঠে মেলাতে পারছিলেন না। সন্তানদের সঙ্গে প্রকাশ্য সব কটা লড়াইয়ে এই উপন্যাসে কেবল ইংরেজ লেফটেন্যান্টদের নামই পাওয়া যায়, যেমন টমাস ও এডওয়ার্ড। কোনও মুসলিম সেনানায়কের নাম বঙ্কিমও লেখেন নি। অথচ এই লড়াইয়ে রণধ্বনি হিসেবে বারবার আসছে  ‘মার নেড়ে’ কথাটি। উনিশ শতকের শেষে আর বিশ শতকের শুরুর দিকে যে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটল বাংলায়, তা অনেকদিন পর্যন্ত অনেকটাই ছিল মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদ আর সেখানে বঙ্কিম ও তার আনন্দমঠের বিশেষ ভূমিকা ছিল। বঙ্কিম শক্তিশালী লেখক ও চিন্তক তাতে কোনও সন্দেহ নেই, এটাও ঠিক যে ইতিহাসকে আখ্যানের প্রয়োজনে ব্যবহারে তিনি ছিলেন বিশেষ পারঙ্গম, কিন্তু এটা অস্বীকার করা যাবে না আনন্দমঠে তাঁর জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ইতিহাসবোধ যে পথে এগিয়েছে, তাতে থেকে গেছে নানা প্রশ্ন তোলার অবকাশ।