হকার উচ্ছেদ বিরোধী গণ আন্দোলন প্রসঙ্গে
- 07 June, 2026
- লেখক: সৌমিত্র বসু
১
বাংলা জুড়ে হকার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন দাবানল এর মতো জ্বলছে। অনেক দিন বাদ আবার প্রায় সব বামপন্থীরা একসঙ্গে পথে নেমেছেন। এটা কম বড় প্রাপ্তি নয়। শ্রমজীবী মানুষের হক এর লড়াই রেলের হকারদের আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ফেটে পড়ল। একেবারে ধ্রুপদী বাম আন্দোলন! প্রচুর এলাকার মানুষজন যোগ দিচ্ছেন। সারা রাত জাগছেন। আরও ভালো লাগছে দেখে যে হকারদের হকের লড়াই ককরে যেন রেলে আসা যাওয়া মানুষ নিজেদের হকের লড়াই হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। মানুষ বুঝছেন এটা সবার লড়াই, মধ্যবিত্তরাও অনেকেই পাশে দাঁড়াচ্ছেন। বাম নেতারা একেবারে সাধারণ মানুষের পাশে হাঁটছেন, রাত জাগছেন, অবলীলায় প্ল্যাটফর্ম এ শুয়ে পড়ছেন, বুলডোজারের এর সামনে শুয়ে সেগুলোকে আটকাচ্ছেন। সিপিএম এর কমরেড সৃজন, সুজন, মীনাক্ষী, লিবারেশন এর বাসুদেব বসু, এবং প্রত্যেক জেলা আর এলাকার নেতৃত্ব, আরএসপির বয়স্ক যুবকরা, যাদবপুরের ছাত্র ছাত্রীরা আওয়াজ তুলছে ‘আয় বিজেপি দেখে যা, গরিব মানুষের ক্ষমতা’। মৌসুমী , অর্ক মুখার্জিরা মিছিলে হাঁটতে চলতে গান গাইছেন। সংস্কৃতিকে কে আনা হলো স্টেশন স্টেশনে। হ্যাঁ কবিতা গান এখন রাস্তা আর রাতের দখল নিয়েছে।
কোথাও কারোর জাত নেই, কেউ নাম শুধচ্ছে না। সবাই দল রং নির্বিশেষে কমরেড বলে সম্বোধন করছে। কেউ কেউ আবার মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে লাল সালাম জানাচ্ছে। বিদায়ের সময় বলছে পরের দিন জানাতে ভুলো না! আবার কলকাতা! পথে স্লোগানে স্লোগানই ইতিহাস রচনা।
২
এবার আসি অর্থনীতিতে। ইংরাজিতে বলে “economic underbelly” শহরের তলপেট যেন। শহর এর পেটি অর্থনৈতিক, সামাজিকন, সাংস্কৃতিক অর্থাৎ রাজনৈতিক তলপেট এই হকার সমাজ, যার ওপর বড় সরীসৃপের মতো শহরটা চলছে! শহরের সমাজের পিলশুজ বহন করে চলা এই অবতল অংশটি ধরে রেখেছে এই শহর। যত ক্ষুদ্র লেনদেন হবে ততই আর্থিক প্রবৃদ্ধির খরচগতি বাড়তে থাকে। এটা অর্থনীতির সূত্র। বেশি দামের ভোগ্য মানুষ কদাচিৎ কেনে তাই তার দোকানের আলনায় বেশি দিন থাকে, একটা বড় অংশের বস্তু সমগ্র আবার বেশি দিন আলনায় রাখা যায়না। তাই তাকে পুনর্বার আনাতে গিয়ে প্রচুর লোকসান হয়। পাঁচ টাকার চা বা দশ টাকার জলের বোতল নিমেষের মধ্যে শেষ হয়ে যায় । সপ্তাহে একাধিক বার অর্ডার দিতে হয়। এই চক্রাকারে ঘোবার গতিবেগ ( মানে সপ্তাহে কতবার অর্ডার দিতে হয়) কম দামি নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তুর ক্ষেত্রে অনেক বেশি। দেশের অর্থনীতিকে অনেক বেশি সঞ্চালন করে, অনেক চাঙ্গা রাখে হকার মির্ভর অর্থনীতির এটাই শক্তি যা সৌখীন পণ্যের থেকে অনেক বেশি। তাই হকার নির্ভর অর্থনীতি শহরের অর্থনীতিকে অনেক সুদৃঢ় করে ও তরতাজা রাখে, ঠিক এই কারণেই হকার অর্থনৈতিক ক্ষেত্র শহরের জীবনচর্যার underbelly। হকাররা যেমন অর্থনীতিকে সতেজ রাখে , ক্রেতারাও সস্তায় দ্রব্যসামগ্রী কিনতে পারে।
৩
বাংলার শহরগুলোতে দৈনিক বাজার করা বাঙালির এক দৈনন্দিন চর্যা। এটা একটা তাই সংস্কৃতিও বটে। সামাজিক সংস্কৃতি একটা শহরের প্রাণবায়ু। কলকাতা আর পুনে শহর তাই এতটাই দুই মেরুর শহর। কলকাতার পাড়াগুলো উত্তাল হয়ে ওঠে সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত। তাই হকার নির্ভর পাড়াগুলো সজীব ও কঠিন নজরদারিতে থাকে। পথে মানুষের সুরক্ষার দায়িত্ব হকাররা নিয়ে নেন। এটাই গণ নজরদারি। কোনও পথের ক্যামেরার দরকার লাগে না। তাই আবারও হকার জন সংযোগ শহরের underbelly. তৃতীয় বিষয়টি আরও প্রণিধানযোগ্য। হকাররা বিভিন্ন বস্তু সামগ্রী নিয়ে বসেন ছোট পরিসরে এত বৈচিত্র্য একটা বড় মল কে চ্যালেঞ্জ করে। তাই মানুষের পকেট মারীর বড়লোক দের ঈর্ষা হকার দের ওপরে।
না কোনো শপিং মল না থাকলে কোনো ক্ষতি হয় না। হকার সমাজ না থাকলে শহর চলে না। এই সসাগরা পৃথিবীতে কোনও হকার বিহীন শহর নেই। হকার থাকলেই পথচারী চলে, কথা কয়, আড্ডা দেয়। চা খায়, বসে, চর্চা করে, আড্ডা মারে, ভালোবাসে, প্রেম করে। সন্ধ্যে রাতে হাতে হাত রেখে গুণ গুম করে , গান গায়। শহরে প্রন আসে। সারাবিশ্বে হয়, কলকাতায় তো অবশ্যই হওয়ার কথা। হয়ও তাই। মানুষ সস্তায় জিনিস কেনে , বার বার কেনে , এটা ওটা কেনে, ক্রেতারা বিক্রেতার সঙ্গে হাসি ঠাট্টা বা দরদস্স্তুর করে। শহর মুখর থাকে। মুখর শহরই তো প্রাণের আতুর।
বিশ্বের শহরগুলো হকারদের আমন্ত্রণ করে বসায়। আমাদের এখন ট্রিপল ইঞ্জিন সরকার কারণ বিরোধী দলও এখন সরকারি সহচর। এরা হকার তাড়ায়, সংস্কৃতি তাড়ায়, স্বস্তি তাড়ায়, পথের থেকে ভরসা তাড়ায়। সরকার মহিলাদের পথ চলার রাত ভরসা কেড়ে নিতে উদ্যত, কারণ আধা নির্জন পথই ধর্ষকদের নিরাপত্তা। খুব পরিষ্কার করে বলতে হবে যে কোনো জনপদে হকার থাকলে পথচলতি মানুষ নিরাপদ, শহর প্রাণবন্ত, সুস্থিত। হকারদের নিরাপত্তার লড়াই তাই প্রতিটি মানুষের স্বার্থের লড়াই। আমরা তাই ওদের লড়াইয়ের শরিক। এটা একটা অর্থনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম ও রাজনৈতিক শ্রেণি সংগ্রাম।