বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণকান্তের উইল : একটি বিশ্লেষণ
- 07 June, 2026
- লেখক: সৌভিক ঘোষাল
‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ বঙ্কিম তথা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ট্রাজিক আখ্যান। ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসও ট্রাজিক, তবে সে ট্রাজেডি নিয়তি নিয়ন্ত্রিত, গ্রীক ট্রাজেডির সঙ্গেই তার মিল। অন্যদিকে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’এর ট্রাজেডি শেক্সপীয়রের ট্রাজেডির মতো। এখানে নিয়তির নির্বন্ধে নয়, চরিত্রদের সূত্রেই এসেছে ট্রাজেডির বিষাদঘন পরিণতি।
গোবিন্দলাল আর ভ্রমরের দাম্পত্যের প্রথম ন বছর ভালোই কেটেছিল। আট বছরের বালিকা ভ্রমর খেলার পুতুলের মতো স্বামী গোবিন্দলালের ঘরে এসেছিল। উপন্যাসের ঘটনাকাল শুরুর সময়ে তার বয়েস সতেরো, সে তখন সদ্য তরুণী হয়েছে। এক সন্তানের জন্মও সে দিয়েছিল, কিন্তু আতুরে মাত্র সাত দিনের মাথায় সেই সন্তান মারা যায়। পিতার মৃত্যুর পরেও জ্যাঠামশাই, মা, দিদির তত্ত্বাবধানের কল্যাণে গোবিন্দলালকে বৈষয়িক বা সাংসারিক দায় দায়িত্বের ঝক্কি সামলাতে হয় নি। তাকে বিষয়কর্ম দেখতে হত না, সে সবের দেখভাল তার জ্যাঠামশায় কৃষ্ণকান্তই করতেন। নভেল পড়ে, স্ত্রীর সঙ্গে গল্পে খুনসুটিতে মধুর সময় কাটিয়ে, আরামে বিরামে গোবিন্দলালের দিন ভালোভাবেই চলছিল। ভ্রমরকেও শাশুড়ি, ননদ, দাসদাসী আদরযত্নে ঘেরা সংসারে তাস খেলা, উল বোনা, স্বামীর সঙ্গে সময় কাটানো ছাড়া অন্য কোনও কাজ করতে হত না। সে ধনী পিতৃগৃহ থেকে এসেছিল হরিদ্রাগ্রামের ধনী শ্বশুরবাড়িতে। অভাব অনটন বা কায়িক শ্রম – কোনও কিছুর সঙ্গেই ভ্রমর গোবিন্দলালের আবাল্য পরিচয় হয় নি। গোবিন্দলাল ভ্রমরের এই মধুর জীবন ও দাম্পত্যে প্রথম কাঁটা এসে পড়ল কৃষ্ণকান্তের করা উইলের সূত্রে। সেই উইলে গোবিন্দলাল তার প্রয়াত পিতা রামকান্ত রায়ের ভাগের সমুদয় অংশ অর্থাৎ রায়দের মোট সম্পত্তির আট আনা লাভ করল। বাকী আট আনার তিন আনা করে ভাগ হল কৃষ্ণকান্তের দুই ছেলে হরলাল, বিনোদলাল এর মধ্যে, এক মেয়ে শৈলবতী ও কৃষ্ণকান্তের স্ত্রীর ভাগে পড়ল এক আনা করে সম্পত্তি। কৃষ্ণকান্তের জ্যেষ্ঠ সন্তান হরলাল উইলের এই ভাগ বিন্যাস মানতে পারল না। সে প্রথমে বাবার ওপর তর্জন করল, তারপর ভয় দেখাল বিধবা বিবাহ করে কুলত্যাগী হবার। কৃষ্ণকান্ত পুত্রের এই জবরদস্তির কাছে মাথা তো নোয়ালেন-ই না, বরং দুর্বৃত্ত আচরণের শাস্তি দিয়ে হরলালের তিন আনা ভাগের দুই আনা কেটে নিয়ে তা অপর পুত্র বিনোদলালকে দিয়ে দিলেন। পরে তাকে সম্পত্তি অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করে তার পুত্রের কেবলমাত্র গ্রাসাচ্ছনের উপযোগী এক পাই বরাদ্দ করেন কৃষ্ণকান্ত। উপায়ন্তর না দেখে তখন খল চরিত্র হরলাল উইল জাল করার পরিকল্পনা করে। প্রথমে সে যায় উইল লেখক ব্রহ্মানন্দ ঘোষের কাছে। তাকে টাকা দিয়ে উইল জাল করার ব্যবস্থা করে। তাতে পুরোপুরি সফল না হওয়ায় সে ব্রহ্মানন্দর ভ্রাতৃকন্যা রোহিণীকে বশ করে কার্যোদ্ধার করতে চায়। এই সূত্রেই রোহিণী এসে পড়ে গোবিন্দলালের চৌহদ্দিতে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গোবিন্দলাল কতটা রোহিণীর কামনার আগুনে পুড়তেন, আর কতটা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতেন, তা বলা কঠিন। কিন্তু এক অলীক রটনা যেভাবে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল আর সে রটনাই যেভাবে এরপর থেকে ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল, ভ্রমরকে সন্দেহপ্রবণ ও পিতৃগৃহগমনের দিকে ঠেলে দিল, তাতে পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নিল। ভ্রমর ও গোবিন্দলালের মনে পরস্পরের প্রতি অনুযোগ ও শীতলতা তৈরি হল। কেউ কাউকে মন খুলে অভিযোগ জানিয়ে বিবাদ মীমাংসায় না গিয়ে তাকে পুষে রাখল এবং পরিস্থিতিকে জটিলতর করল। ঘটনা ও রটনার ফারাক বুঝতে ভুল করে শেষ শয্যায় কৃষ্ণকান্ত তার উইল বদলে যেভাবে সমস্ত সম্পত্তি গোবিন্দলালের বদলে তার স্ত্রী ভ্রমরকে দিয়ে দিলেন, তা ভ্রমর গোবিন্দলালের ভুল বোঝাবুঝির দূরত্ব মেটানো দূরে থাক, পরিস্থিতিকে আরো হিমশীতল ও জটিলতর করে তুলল। গোবিন্দলালের মা-ও পুত্র ও পুত্রবধূর মধ্যেকার দূরত্ব মেটানোর সাংসারিক দায় গ্রহণ না করে অভিমানহত মনটি নিয়ে কাশীবাসী হলেন। যে ধৈর্য ও বিচক্ষণতা গোবিন্দলাল, ভ্রমর বা তাদের ঘনিষ্ট অভিভাবকদের থেকে সঙ্কট মুহূর্তে প্রত্যাশিত ছিল, তাদের কারো কাছ থেকেই তা পাওয়া গেল না। ফলে খানসামাকুলের অলীক রটনা ও রোহিণীর কামনার আগুন বাইরে থেকে পরিবারের স্থিতিকে দ্রুত নষ্ট করে দিল।
রোহিণী চরিত্রের মধ্যে যে অপূরিত কামনা বাসনা থাকা সম্ভব এবং বৈধ পথে জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে না পারলে অবৈধ সমাজনিষিদ্ধ পথ ধরেই যে তার মতো ভাগ্যহীনারা এগোতে বাধ্য, এটা নীতি নৈতিকতার চশমা খুলে রাখলে বোঝা কঠিন নয়। রোহিণী দহনকার্যের আগে নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, নিজের কামনা বাসনার আগুনকে প্রশমিত করতে চেয়েছে, এমনকী আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছে। আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টার পর যখন গোবিন্দলাল তার প্রতি প্রশ্রয় মেশানো নজর দিতে শুরু করলেন আর দোষ না করেও কুলটার রটনা তার গায়ে এসে লাগল, কেবল তখনই সে স্থির করে ফেলল জীবন যৌবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবার জন্য যতদূর যাবার দরকার হয়, সে যাবে। হরিদ্রাগ্রাম ছেড়ে প্রসাদপুরে গোবিন্দলালের সঙ্গে সহবাস পর্বর জীবনকে তার দিক থেকে বুঝে নেওয়া কঠিন নয়। কিন্তু প্রসাদপুরে আসা নিশাকরকে পলকের দেখায় কেন সে পছন্দ করবে এবং তার সঙ্গে একাকী দেখা করতে গঙ্গধারে সন্ধ্যা অন্ধকারে চলে আসবে, তা বোঝা কিছুতেই সম্ভব নয়। প্রসাদপুরে গোবিন্দলালের সঙ্গে সহবাসপর্ব সমাজনীতির বিচারে গর্হিত হতে পারে, কিন্তু জীবন আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে অস্বাভাবিক নয়। নিশাকরের প্রতি অদ্ভুত প্রশ্রয় কিন্তু জীবনধর্ম বা স্বাভাবিকতা – কোনওকিছুর সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই এক দৃশ্যেই বঙ্কিম রোহিণীর জীবনাসক্তিকে সর্বার্থে স্বৈরিণীর পাপচারিতায় নামিয়ে আনলেন। গোবিন্দলালের গুলিতে রোহিণী হত্যার মধ্যে দিয়ে তার শাস্তিও নেমে এল দ্রুত। রোহিণী হত্যার পরে শুরু হয় গোবিন্দলালের জীবনব্যাপী শাস্তির অধ্যায়টি। রোহিণী হত্যার দায় থেকে আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় সে ভ্রমরের ইচ্ছায় ও তার বাবা মাধবীনাথের সক্রিয়তার মুক্তিলাভ করল ঠিকই কিন্তু তার নৈতিক মুক্তি এল না। আজন্ম ধনীর দুলাল, কায়িক পরিশ্রমে অনভ্যস্ত গোবিন্দলালকে মাসের পর মাস সহায় সম্বলহীন ভবঘুরে জীবনের দীর্ঘ কষ্টকর পর্ব পেরোতে হল। এই কষ্টের দিনকালে ভ্রমরের কাছে ফিরে আসার ইঙ্গিৎময় অনুরোধও যখন শীতল ভাষায় প্রত্যাখ্যাত হল, তখন সাংসারিক জীবনে সসম্মানে প্রত্যাবর্তনের আর কোনও দরজাই গোবিন্দলালের কাছে খোলা রইলো না। ভ্রমরের দান করে দেওয়া সম্পত্তি গ্রহণ করে সংসারে ফেরার আইনী রাস্তা গোবিন্দলালের কাছে ছিল অবশ্য, কিন্ত সেই দান গ্রহণ করে আরো নিচে নামতে সে প্রস্তুত হয় নি। বরং ভ্রমরের মৃত্যুর পর প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ সন্ন্যাসজীবন বেছে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে পথে পথে। বঙ্কিম গ্রন্থসমাপ্তিতে বলেন সংসারে যে পাপকর্ম গোবিন্দলাল করেছে, সংসারে থেকে তার কোনও প্রায়শ্চিত্ত হয় না। ভগবৎ আশ্রয় করেই কেবল তার শান্তি আসতে পারে।
ট্রাজিক কাহিনী হিসেবে কৃষ্ণকান্তের উইল বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। রোহিণী শেষদৃশ্যে যখন কাতর হয়ে গোবিন্দলালের কাছে ব্যর্থ প্রাণভিক্ষা করে তখন তা পাঠককে বেদনাহত করে, বেদনাহত করে গোবিন্দলালের শূন্য জীবনের যন্ত্রণাও। কিন্তু পাঠক সবচেয়ে অশ্রুসজল হয়ে ওঠেন ভ্রমরের অকাল প্রয়াণের মুহূর্তটিতে। সতেরো বছরের ভরা যৌবনে স্বামী তাকে ছেড়ে অন্য নারীর সঙ্গে চলে গেল, বাকী গোটা যঊবন তাকে সব রকমের যন্ত্রণা নিয়ে একাকী কাটাতে হল। ভ্রমরের যৌবন শুধু যে অকালে জ্বরাগ্রস্থ হয়ে মৃত্যু কবলিত হল তা নয়, সেই যঊবন সবসময় যন্ত্রণার শলাকায় বিদ্ধ হয়ে রইলো। তার মৃত্যুদৃশ্য বলে দেয় স্বামীকে শেষদিন অবধি সে ভালোবেসেছিল, কিন্তু তার অপরাধকে ক্ষমা করতে পারে নি বলে হিমশীতল অভিমানে কাছে আসতেও পারে নি। ভালোবেসেও মানসিকভাবে দূরে সরে থাকার এই যন্ত্রণা প্রবলভাবে বিদ্ধ করে বলেই ভ্রমরের পরিণতি দৃশ্য পড়তে পড়তে পাঠক এত কাতর হন। বঙ্কিম নির্মোহ শিল্পী। পাঠককে আবেগে ভাসানোর বদলে ভাবানোই তার শিল্পকীর্তির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ভ্রমরের মৃত্যুদৃশ্যে বঙ্কিম সেই নির্মোহ রচনার খোলশকে যেন ইচ্ছে করেই ভেঙে দেন। পাঠক চোখের জলে ভ্রমরের সমব্যথী হতে শুরু করে।
বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে কৃষ্ণকান্তের উইল বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচকদের দ্বারা নানাসময়ে নানাভাবে আলোচিত হয়েছে। বাংলা উপন্যাসের প্রথম বিশিষ্ট ইতিহাসকার অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ নামক বিখ্যাত বইতে বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কিত দীর্ঘ আলোচনার উপসংহার টেনেছেন এই উপন্যাসটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে। সেই আলোচনায় অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ কোথায় কোথায় বঙ্কিমের আরেকটি শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘বিষবৃক্ষ’কে ছাপিয়ে শিল্পোৎকর্ষে আরো অনেকদূর এগিয়ে গেছে। অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন যে বিষবৃক্ষের তুলনায় কৃষ্ণকান্তের উইলের চরিত্ররা অনেক সুবিকশিত। সূর্যমুখীর তুলনায় ভ্রমরের যন্ত্রণা এখানে বঙ্কিম অনেক বেশি মেলে ধরতে পেরেছেন, কুন্দনন্দিনীর কামনা, বাসনা, আকাঙ্ক্ষার চেয়ে রোহিণীর তাপিত হৃদয়চরিত্রটিও অনেক বিস্তারে উপন্যাসে এসেছে। বিষবৃক্ষে আকর্ষণের অধ্যায়টি অপেক্ষাকৃত ছোট আর অনুশোচনার অধ্যায়টি সুবিস্তৃত। কৃষ্ণকান্তের উইলে বিপরীত রীতি বঙ্কিম অনুসরণ করেছেন। এখানে আকর্ষণের নানা ওঠাপড়ার বিস্তারিত ছবি রয়েছে, অনুশোচনার অংশটি সংক্ষিপ্ত। এই বদল ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’কে শুধু ভিন্ন স্বাদই দেয় নি, আকর্ষণীয়ও করেছে। অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও দেখিয়েছেন এই দুই উপন্যাসের। ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের ঘটনা বা চরিত্রপাত্রদের ওপর বাইরের প্রভাব কম, কিন্তু বাঙালি পারিবারিক জীবনের সঙ্গে তা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’এ কিন্তু পরিবারের চারপাশের মানুষজন নায়ক নায়িকা ও ঘটনাগতিকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। সে দাসদাসীদের রটনা হোক বা গোবিন্দলালের মায়ের কার্যকলাপ, ব্রহ্মানন্দ ঘোষের লোভ হোক বা কৃষ্ণকান্তের বারবার উইল পরিবর্তন – বাইরের ঘটনার তীব্র প্রভাব থেকে এই উপন্যাসের মূল চরিত্রবর্গ বা ঘটনাপ্রবাহ মুক্ত থাকেনি। অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাস সম্পর্কে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তোলা এক অভিযোগ নিয়েও তাঁর লেখায় গুরুত্বসহ আলোচনা করেছেন। শরৎচন্দ্র মনে করেছিলেন রোহিণীর মৃত্যু শিল্পের ন্যায়কে রক্ষা করে নি, তার মৃত্যু অকিত এক অপরাধে হয়েছে। সে অপরাধ রোহিণী চরিত্রের ন্যায়সূত্রকে অনুসরণ করে আসে নি। অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দেখানোর চেষ্টা করেছেন বঙ্কিম পাপচিত্র বিস্তারিতভাবে দেখাতে চান না, সংক্ষেপে ইঙ্গিতে বলতে চান বলেই এমন মনে হচ্ছে আমাদের। রোহিণীর হঠাৎ এক অন্যায়ের পরিমাণে গোবিন্দলাল তাকে গুলি করেন নি, তাদের মধ্যে আকর্ষণের সূত্রটি আগেই স্খলিত হয়ে গিয়ে থাকবে। উপন্যাসে তার ইঙ্গিৎ আছে বলে শ্রীকুমারবাবু মনে করেছেন, তবে তিনিও মেনে নিয়েছেন বিস্তারে সেই চিত্রটি বঙ্কিম উপস্থাপিত করেন নি বলে পাঠকের কাছে রোহিণীর পরিণতি অকস্মাৎ ধাক্কা বলে মনে হতে পারে।
বাংলা উপন্যাসের আর এক বিশিষ্ট ইতিহাসকার অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর ‘বাংলা উপন্যাসের কালান্তর’ নামের বিখ্যাত বইতে এবং ‘উপন্যাসে মৃত্যু’ নামক এক নিবন্ধে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ সংক্রান্ত আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে বিচার করেছেন। অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে রোহিণীর দিক থেকে গোবিন্দলালকে চাওয়া শুধু যৌনতৃষ্ণা ছিল, তা সামগ্রিক জীবনতৃষ্ণা, জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবার আকাঙ্ক্ষাই ছিল। কিন্তু গোবিন্দলাল কেন ভ্রমরকে ছেড়ে রোহিণীর প্রতি ধাবিত হলেন ও সংসার ছেড়ে প্রসাদপুরে রোহিণীর সঙ্গে সহবাসে লিপ্ত হলেন তার যৌক্তিকতা গোবিন্দলাল নিজের মনেও খুঁজে পান নি। গুণ ও রূপের দুই প্রকোষ্ঠে এই বিভাজনকে তার নিজেরই কৃত্রিম মনে হতে শুরু হয়েছে হয়ত। অধ্যাপক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের মত একসময়ে মেনে নিয়ে অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘উপন্যাসের মৃত্যু’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন প্রসাদপুর বাসপর্বে রোহিণীর প্রতি আকর্ষণ হারানোর পরিণতিতেই এসেছে অতর্কিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি। সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত তাঁর ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ নামের সুপরিচিত সমালোচনা গ্রন্থে লিখেছিলেন, “রোহিণী ও গোবিন্দলাল গভীর প্রণয়ের সম্পূর্ণতা ও বিশ্বস্ততা লাভ করিতে পারে নাই। লালসার পরিতৃপ্তির সঙ্গে সঙ্গে আসিয়াছে শ্রান্তি, আকর্ষণের পশ্চাতে আসিয়াছে বিতৃষ্ণা।” সুবোধচন্দ্র মনে করেন এই শ্রান্তি বিতৃষ্ণা এসেছিল বলেই গোবিন্দলাল রোহিনীকে গুলি করতে পেরেছিল। ‘বাংলা উপন্যাসের কালান্তর’ লেখার সময় উপন্যাসের নিবিড়তর পাঠের প্রেক্ষিতে নিজের পূর্বমত ও অধ্যাপক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের ভাষ্যের চেয়ে অন্যরকমভাবে ভাবার প্রয়োজন অনুভব করেছেন অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মনে হয়েছে প্রসাদপুর পর্বে রোহিনী হত্যার ঠিক আগেই যে গানের রেওয়াজের দৃশ্যটি ছিল সেখানেও দেখা যাচ্ছে গোবিন্দলালের রোহিণীর প্রতি রূপমোহ জাগ্রত। ফলে গোবিন্দলাল সহবাসপর্বে রোহিণীর প্রতি বিগতস্পৃহ হয়েছিলেন, এই অনুমান সঙ্গত নয়। গোবিন্দলালের রোহিনী কেন্দ্রিক দ্বিধা সংশয় সহবাস পর্বে আসে নি, এসেছিল রোহিণী সংসর্গের একেবারে প্রথম দিকেই। তার নানা টুকরো প্রমাণও উপন্যাসে রয়েছে বলে অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেছেন।
‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ এর গঠনগত শিল্পসুষমার কথা বঙ্কিম সাহিত্যের অনেক আলোচকই বিশ্লেষণ করেছেন। প্রমথনাথ বিশী তাঁর বঙ্কিম সরণী’ বইতে এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন উপন্যাসের ঘটনাগত ঐক্য সৃষ্টিতে বারুণী পুষ্করুণীর ভূমিকার কথা। অধ্যাপক বিশী দেখিয়েছেন এই উপন্যাসের সঙ্কটের সূত্রপাত ও বিস্তার বারুনীর ধারে, উপন্যাসের পরিণতি দৃশ্যও সেই বারুণীর পাশেই। তবে এই উপন্যাসের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের শিল্পসুষমাগত পার্থক্যের কথাও সমালোচকেরা কেউ কেউ মনে করিয়ে দিয়েছেন। অধ্যাপক জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর “উপন্যাসে সমাজদৃষ্টি : বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ” বইতে এই প্রসঙ্গে বলেছেন যে কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের প্রথম খণ্ডে বিস্তার ও সংহতির যে সার্থক মেলবন্ধন রয়েছে, তা দ্বিতীয় খণ্ডে অনুপস্থিত। দ্বিতীয় খণ্ডের সংক্ষিপ্ত বর্ণনারীতির ক্ষেত্রে পাপচিত্র অঙ্কনে বঙ্কিমের আপত্তিই এর কারণ। তবে ঔপন্যাসিকের এই দৃষ্টিভঙ্গীর কারণেই রোহিণীর পরিণতি দৃশ্য সম্পর্কে বিতর্ক ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। অনেকে মনে করেছেন এখানে শিল্পের ন্যায় লঙ্ঘিত হয়েছে, শিল্পী বঙ্কিম নীতিবাদী বঙ্কিমের কাছে পরাভূত হয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন রোহিণী হত্যাকাণ্ডকে নেহাৎ নৈতিক হত্যা বা পূর্বাপর সম্পর্ক রহিত বলা যায় না। বীতস্পৃহা এবং মানসিক দ্বন্দ্ব থেকেই যে গোবিন্দলাল রোহিণীকে গুলি করে হত্যা করেছে তার ইঙ্গিৎ তাঁরা অনেকে এর আগেও উপন্যাসের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে বলে জানিয়েছেন। কারো মতে সেই মানসিকতা সদ্যজাত, কারো মতে তা দীর্ঘকালীন, রোহিণী সংসর্গের প্রথম থেকেই তা জাগ্রত ছিল। এই সংক্রান্ত বিতর্ক যতই থাক, সকলেই একমত যে যথেষ্ট বর্ণনা ও দৃশ্যায়নের মাধ্যমে রোহিণীর পরিণতি পর্বকে উপন্যাসে আনা হয় নি বলেই, তা সাধারণভাবে পাঠককে অপ্রস্তুত ও হতচকিত করে দেয়।
কৃষ্ণকান্তের উইল এর গঠনগত শিল্পসুষমার মতোই প্রশংসিত হয়েছে এর চরিত্রায়ন ও চরিত্র পাত্রদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনীর সঙ্গে কৃষ্ণকান্তের উইল এর ভ্রমর চরিত্রের প্রতিতুলনা দিয়ে শুরু করলেই বোঝা যাবে নায়িকার চরিত্রায়নে বঙ্কিম কত বেশি সাফল্য পেয়েছেন। সূর্যমুখী চরিত্রের মধ্যে মূলত ছিল অভিমানের একমাত্রিকতা। ভ্রমর চরিত্রে কিন্তু আছে নানা স্তর। বাল্যকালে আট বছর বয়েসে সে স্বামীগৃহে এসেছিল, উপন্যাসের ঘটনাকাল শুরুর সময় তার বয়েস সতেরো। মাঝের এই নয় বছর সে কাটিয়েছে শাশুড়ি, ননদ আর দাসদাসীদের নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপ। তার পরিশ্রমহীন চিন্তাহীন আরামের জীবনে দাম্পত্য সম্পর্কিত ধারনাবলী কিছু আপ্তবাক্য নির্ভর বিশ্বাসের ওপর গড়ে উঠেছিল। সে বিশ্বাস করত স্বামী ও স্ত্রীর কর্তব্য শুধু পরস্পরকে ভাবা, পরস্পরকেই কেবল ভালোবাসা। বাস্তবের রূঢ় আঘাত যখন সেই আপ্তবাক্য নির্ভর বিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দিল তখন সে হয়ে উঠল অভিমানিনী। সেই অভিমানের প্রথম পর্যায়ে সে কিছু অতিরিক্ত কঠোরতাও দেখিয়ে ফেলেছিল হঠাৎ বাপের বাড়ি চলে গিয়ে। তবে সেই সামান্য অভিমানকে অছিলা করে গোবিন্দলাল যখন তাকে ত্যাগ করল এবং দেশত্যাগী ও সংসারত্যাগী হল, অন্য নারীর সঙ্গে পাকাপাকি সহবাসপর্ব শুরু করল, তখন ভ্রমনের অভিমান বদলে গেল প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তায়। কোমল ভ্রমর আঘাতের ঘাত প্রতিঘাতে এত কঠিন ইস্পাতদৃঢ় অয়ে উঠল যে অন্তরে আকুল হয়েও বাইরে কঠিন থাকতে পারল। রোহিণী হত্যা ও আদালত থেকে শাস্তিমুক্তির পর পথের ভিখিরি হয়ে পড়া গোবিন্দলালের সংসারে প্রত্যাবর্তন ইচ্ছাকে সে শুধু শীতল ভাষার চিঠিতে প্রত্যাখ্যানই করল না, মাসে অল্প কিছু মাসোহারার বেশি গোবিন্দলালকে দিলে যে অপব্যয়ের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে, তাও জানিয়ে দিল। ভ্রমরের মনের অন্তর্লীন বাসনা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বামী সম্মেলনই থেকেছে, সেখানে কোনও বদল হয় নি। মনের দিক থেকে আবেগানুভূতি অটুট থাকলেও আচরণে ব্যবহারে হিমশীতল কাঠিন্য আনতে পারার কথাটি মনে রাখলে ভ্রমর চরিত্রকল্পনাকে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বলে মনে করতেই হয়।
গোবিন্দলাল জমিদার পরিবারের সন্তান হিসেবে সারাজীবন বিত্তের নিশ্চিন্ততায় বড় হয়েছে, পিতৃহীন হয়েও আরামের নিশ্চিন্ত জীবন উপভোগ করে গেছে জ্যেঠামশাইয়ের স্নেহছায়া ও অভিভাবকত্বে। জমিদারী সংক্রান্ত কাজকর্মের জটিলতা কিছুই তাকে জানতে বা সামলাতে হয় নি। তার স্বেচ্ছাচারী মনটি ভ্রমর থেকে রোহিণীর দিকে হেলে পড়ার সূত্র ধরেই এই উপন্যাসের কাঠামোটি গড়ে উঠেছে। কিন্তু কেন এই হেলে পড়ার ঘটনাটি ঘটল তা সহজে বোধগম্য হয় না। ভ্রমরের অভিমান ও সেই জনিত সাময়িক শীতল ব্যবহারকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে গুণ থেকে রূপের দিকে, ভ্রমর থেকে রোহিণীর দিকে সে যাত্রা করেছে, এমন একটা বয়ান সে নিজে হাজির করলেও তার যৌক্তিকতাকে সে অন্য কারো কাছে দূরে থাক, নিজের কাছেও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। প্রসাদপুর পর্বের যে সংক্ষিপ্ত ছবি আমরা দেখেছি সেখানেও দেখা যায় রোহিণীর প্রতি গোবিন্দলালের আকর্ষণের তীব্রতা কমে নি। তাহলে তার সবসময়ে বন্দুকে গুলি ভরে রাখার তাৎপর্যটি কী? সামান্য সন্দেহের বশে রোহিণীকে গুলি করে হত্যা করার কারণটিই বা কী? কোনও আত্মগ্লানি বা শ্রান্তি ছাড়া গোবিন্দলালের বন্দুকে গুলি ভরে হত্যা বা আত্মহত্যার জন্য প্রস্তুত থাকাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? কেন গোবিন্দলাল স্ত্রীকে ছেড়ে রোহিণীর সঙ্গে সহবাস করতে গেল আর কেনই বা রূপমুগ্ধতা বজায় থাকলেও সে বিরক্ত, ক্লান্ত ও এই সম্পর্ক থেকে পলায়নপর হয়ে উঠল, তার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা উপন্যাসে নেই। রোহিণীকে গুলি করে হত্যার পরে গোবিন্দলালের যে দীর্ঘ প্রায়শ্চিত্ত পর্ব ও ভগবৎ আশ্রয় লাভের মধ্যে শান্তি খোঁজার চেষ্টা এই উপন্যাসে রয়েছে সেই প্রসঙ্গে অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের নায়কদের কথা বলেছেন। কোনও নির্দিষ্ট উপন্যাসের বা চরিত্রের নাম না করলেও আমরা বুঝতে পারি দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসের নায়ক রাসকলনিকভের দিকে অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় ইঙ্গিৎ করছেন। দস্তয়েভস্কির এই বিখ্যাত চরিত্র তীব্র মানসিক অস্থিরতা পর্বে কপর্দক শূন্য অবস্থায় এক সুদখোর বুড়ি ও তার বোনকে হত্যা করেছিল । তারপর থেকে শুরু হয় তার দীর্ঘ অনুশোচনা ও আত্মগ্লানির পর্ব। সাইবেরিয়ায় কারাবাসের দীর্ঘ পর্বে আত্মমোক্ষণের মধ্যে দিয়ে সে অবশেষে শান্তি ফিরে পেতে সমর্থ হয়। গোবিন্দলালও বোঝে বাইরের আদালতের শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারলেও আত্মমোক্ষণ ছাড়া তার জীবনে শান্তি ফিরবে না। যে দুই নারী – ভ্রমর ও রোহিণীর মৃত্যুর জন্য সে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, তাঁদের স্মৃতি তাঁকে নিয়ত দগ্ধ করতে থাকবে। গোবিন্দলাল তাই ভ্রাতুষ্পুত্রের সম্পত্তি গ্রহণের আবেদন অস্বীকার করে মানসিক শান্তির অন্বেষণে আত্মমোক্ষণ ও ভগবৎ স্মরণের পর্বে লিপ্ত হয়।
উপন্যাসের প্রথম প্রকাশের বঙ্গদর্শন পত্রিকাপাঠ থেকে গ্রন্থপাঠের বিভিন্ন সংস্করণে যে চরিত্রটি সবচেয়ে বদলেছে সে হল রোহিণী। বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশের পাঠকে গ্রন্থ হিসেবে কৃষ্ণকান্তের উইলের মুদ্রণের সময়ে বঙ্কিম অনেকাংশে বদলে ফেলেছিলেন। পত্রিকাপাঠে রোহিণী হরলালের উইল জাল করেছিল টাকার লোভে। গ্রন্থপাঠে টাকার লোভের প্রসঙ্গ তো নেই-ই, বরং তার প্রতি স্পষ্ট উপেক্ষা আছে। সেখানে এসেছে বিধবা বিবাহের মাধ্যমে জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। পত্রিকাপাঠে দেখা যায় বিধবা হয়েও রোহিণী অনেকটাই আমুদে জীবন কাটাত, নির্জলা একাদশী পালন করত না, মাছ খেত। বিধবা বিবাহের প্রসঙ্গে জানিয়েছিল পাত্র পেলে সে সেই মুহূর্তে বিধবা বিবাহে প্রস্তুত। পাড়ার মেয়েরা গোপনে গানের মজলিস বসাত, তার মধ্যমণি ছিল রোহিণী। সে সেখানে টপ্পা, পাঁচালি, কীর্তন, কবিগান করত। উপন্যাসে রোহিণী সম্পর্কিত এইসব কথাবার্তাকে বঙ্কিম পুরোপুরি অবলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডে পত্রিকাপাঠ থেকে গ্রন্থপাঠে যে রূপান্তরিত রোহিণীকে আমরা দেখি, দ্বিতীয় খণ্ডে নিশাকরকে চকিত দেখার পরই মদনজালে আকৃষ্ট করতে ছোটা রোহিণীকে তার সঙ্গে মেলানো যায় না। পত্রিকা পাঠের লোভী অমার্জিত রোহিনীর সঙ্গে এই রোহিনীর সম্পর্ক স্থাপণ সম্ভব হলেও গ্রন্থপাঠের রূপান্তরিত রোহিণীর সঙ্গে এই রোহিণীকে মেলানো অসম্ভব।
বঙ্কিমের চোখে রোহিণী পাপিষ্ঠা। তাও পত্রিকাপাঠের অমার্জিত রোহিণীকে গ্রন্থপাঠে বঙ্কিম এতটা বদলে নিলেন কেন? অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাস সম্পর্কিত আলোচনাতে দেখিয়েছেন তলস্তয় তাঁর ‘আনা কারেনিনা’ উপন্যাসের নায়িকা আনাকে পাণ্ডুলিপি বদলের নানা স্তরে যেভাবে বদলে নিয়েছিলেন, যেভাবে আনাকে অমার্জিত থেকে মার্জিত ও সম্ভ্রান্ত নারীতে রূপান্তরিত করেছিলেন সেই কাজ কৃষ্ণকান্তের উইলে রোহিণীর ক্ষেত্রে করেছেন বঙ্কিম। অধ্যাপক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেছেন উপন্যাসের চরিত্রদের নিজস্ব ন্যায়সূত্রই মহৎ নিরীক্ষাশীল শিল্পীকে বাধ্য করে এভাবে পাঠ থেকে পাঠান্তরে বদলের মধ্যে দিয়ে যেতে। কিন্তু সেই বদলের পরেও দেখা গেছে আনার চা খাবার ছবিটি ভ্রনস্কি সহ্য করতে পারছে না এবং এটাই দেখিয়ে দিচ্ছে তাদের সম্পর্কের ফাটলকে। এই ফাটলই এগিয়ে যাচ্ছে আনার আত্মহত্যার দিকে। রোহিণী সম্পর্কে গোবিন্দলালের অস্বস্তিই বন্দুকের গুলি হিসেবে নির্গত হয়েছে, এটাই অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায় বলতে চান। কিন্তু গোবিন্দলালের রোহিণী সম্পর্কিত বীতস্পৃহা রোহিণীর আচরণগত কোনও কারণে হয়েছে – এমন ইঙ্গিৎ উপন্যাসে নেই। গোবিন্দলালের পাপবোধ ও মানসিক দ্বন্দ্বেই তার বীজ থাকা সম্ভব।
রোহিণী নিতান্ত অল্পবয়সে বিধবা হয়ে জীবনের রূপ রস হারিয়েছিল। তার পক্ষে জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত স্বাভাবিক। বিধবা বিবাহের আইনী পথ ধরেই সে প্রথমে এগোতে চেয়েছিল, গোবিন্দলালের ঘর ভাঙার বাসনা তার ছিল না। রোহিনী যে হরলালের উইল জালের কাজে সঙ্গী হয়েছিল, সেখানে ছিল বিধবা বিবাহের মাধ্যমে জীবন যৌবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবার দুর্মর বাসনা। বঙ্গদর্শনে এই উপন্যাস প্রথম প্রকাশের সময় উইল জাল করায় রোহিণীর অর্থলোভের কথা থাকলেও গ্রন্থাকারে উপন্যাসটি প্রকাশের সময় বঙ্কিম তা বদলে দিয়েছিলেন। রূপান্তরিত পাঠে বঙ্কিম দেখান রোহিণীর উইল জালের সঙ্গে অর্থলোভের কোনও সম্পর্কই ছিল না, বিধবা বিবাহের মাধ্যমে জীবন যৌবনের স্বাদ ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই সেখানে প্রবল। উইল জালের অনতি পরেই হরলাল অবশ্য জানিয়ে দেয় সে বিধবা বিবাহে প্রস্তুত নয়, এ ছিল তার ছলনামাত্র। হরলালের বিধবা বিবাহের প্রতিশ্রুতিতে রোহিণীর মনে আশা ও কামনার আগুন জ্বলে উঠেছিল। প্রবঞ্চিতা রোহিণীর সেই কামনা বাসনার আগুন এবার আশ্রয় করতে চাইলো গোবিন্দলালকে। রোহিণীর যৌনতাকাতর যুবতী মনটির আকাঙ্ক্ষাকে বঙ্কিম পাপ মনে করলেও অস্বীকার করতে পারেন নি, বরং বেশ স্পষ্টভাবেই তা সামনে এনেছেন। তার সেই আকাঙ্ক্ষাকে উনিশ শতকের নীতিবাদী বঙ্কিম পাপ বলে মনে করলেও, পরবর্তীকালের পাঠক ও লেখকেরা তাকে সেভাবে দেখতে প্রস্তুত হন নি। তারা রোহিণীর মতো ভাগ্য বিড়ম্বিত নারীদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠার সমস্ত দাবিকে যথাযোগ্য বলে মনে করেছেন। সেই মনোভাবের প্রতিফলন রয়েছে বঙ্কিম পরবর্তী যুগের দুই বিশিষ্ট আখ্যানকার রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের রচনায়। বঙ্কিমের কৃষ্ণকান্তের উইল এর রোহিণীর যন্ত্রণাকে মাথায় না রেখে রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’র বিনোদিনীর দিকে এগনো যায় না।