দলিত কমিউনিস্ট নেতা আর বি মোরে

ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম দলিত সদস্য (১৯৩০) হলেন মহারাষ্ট্রের কমরেড আর বি মোরে (রামচন্দ্র বাবাজি মোরে)। দলিত মাহার সমাজের সামাজিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠিত নেতা, তথা আম্বেদকরের স্নেহভাজন ও  ঘনিষ্ঠ  আর বি মোরে সিপিআই সদস্য হয়ে নেতৃত্বের অবস্থানে থেকেই দলিত আন্দোলনের সাথে সারা জীবন ধরেই নিবিড়  সম্পর্ক রাখতেন। বহু সাধারণ ও বিশিষ্ট দলিত ব্যক্তিত্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দেয় তাঁর মাধ্যমেই। কমিউনিস্ট আন্দোলনে দলিত প্রশ্ন গুরুত্ব পায় তাঁর আন্তঃপার্টি সংগ্রামের প্রচেষ্টায়। আদর্শবাদী সংগঠক, তাত্ত্বিক, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সমাজ সংস্কারক, স্বাধীনতা সংগ্রামী ইত্যাদি নানা গুণের আধার  কমরেড মোরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। জাতপাতের শোষণ ও শ্রম-শোষণ, এই দুইয়ের অবসানের প্রতি একই প্রাবল্যসহ সম্মিলিতভাবে  নিবেদিতপ্রাণ এই  মানুষটির নিজস্ব এক বাচন ছিল তাঁর সারা জীবনের বিশেষত্ব, যা কমিউনিস্ট ও দলিতবাদী উভয় আন্দোলনের কাছেই গর্ব করার মতো এক বড় রসদ এবং একই সাথে কিছু সমস্যা বা চ্যালেঞ্জও। এভাবেও বলা যায়, মস্তিষ্কে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান  মার্ক্সবাদী আর হৃদয়ের গভীরে তিনি ছিলেন আম্বেদকরের আদর্শে উদ্বুদ্ধ।

          ১৯০৩ সালের পয়লা মার্চ মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মাহাড় তফশীলের দসগাঁও নিকটস্থ  লাডাওলি গ্রামে এক দলিত মাহার খেতমজুর পরিবারে মোরের জন্ম হয়। দলিত পরিবারে জন্ম হবার কারণে কঠিন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার  শিকার হন তিনি। তাঁর ঠাকুরমা ছিলেন জোশি পরিবার থেকে আগত। বাবার মামাতো ভাইদের অনেকেই ছিলেন পেশায় শিক্ষক ও জ্যোতিষী। ঠাকুরমার কাছে মোরে শৈশবেই অনেক গল্প ও পৌরাণিক কাহিনী শুনে বড় হন। প্রাইমারি স্কুলে প্রথম স্থানাধিকার করা এবং বৃত্তি পাওয়া সত্ত্বেও পারিবারিক  অস্পৃশ্য জাতভুক্তির  কারণে হাই স্কুলে ভর্তি হতে বাধা আসে। তখন মাত্র এগারো বছর বয়সে ব্রিটিশকে অভিযোগ জানিয়ে নিজেই চিঠি লিখে স্কুলে পড়ার অনুমতি আদায় করে তার সংগ্রামী জীবন শুরু হয়। এক কোণে আলাদা  বসে ক্লাস করা, পরীক্ষার খাতা দূর থেকে জমা দেওয়া ইত্যাদি চলে। ১৯১৫ সালে পিতৃ বিয়োগ ঘটলে মাহাড়এ মামাবাড়ি চলে আসে গোটা পরিবারটি। স্কুল জীবন শেষ করবার আগেই দারিদ্রের কারণে নানা রকম  ছোটোখাটো কাজে যোগ দিতে বাধ্য হন মোরে। ইংরেজি ও মারাঠি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের কারণে তাঁর কাজ পেতে সুবিধা হয়েছিল। দাসগাঁও নামক ওই জায়গাটি ছিল অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের  সংস্কার ও উন্নয়ন করার ক্ষেত্র।

          অল্প বয়সে বিবাহের কারণে কাজে যোগদান করতে বাধ্য হন। ১৯২০ সালে আম্বেদকরের সঙ্গে পরিচয় হয়। ইতিমধ্যেই মহাত্মা জোতিবা ফুলের লেখা ও তাঁর নির্মিত সত্যশোধক সমাজের প্রচারিত চিন্তা ভাবনার সঙ্গে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন। আম্বেদকরের জনসভায় জনসমাগমের মূল দায়িত্বে মোরে থাকায় তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। দলিতদের জলপানের অসুবিধা দূর করতে জনসমাগমের এক প্রধান জনবহুল এলাকায় তিনি একটা চায়ের দোকান দেন।  ১৯২৩ সালে মুম্বাই লেজিসলেটিভ কাউন্সিল জনগণের সাধারণ সম্পত্তির ব্যবহারের জন্য সমানাধিকারের আইন পাস করে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা ছিল। ১৯২৬ সালে ক্রফোর্ড সরোবরে দলিতদের জলপানের অধিকার আন্দোলনে  মোরে সফল নেতৃত্ব দেন। সেটাই ১৯২৭ সালে আম্বেদকরের নেতৃত্বে চভদার সরোবরের জল দলিতদের জন্য ব্যবহার করার আন্দোলনের প্রেরণা যোগায় এবং আন্দোলনটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি পায়। চভদার সরোবরের জল দলিতদের জন্য ব্যবহার করার আন্দোলনেও প্রচারক ও সংগঠক হিসাবে মোরে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন। এই সব আন্দোলনের কারণে অনেক দলিত নেতা ও মানুষের ওপর উচ্চ বর্ণের মানুষজন ভয়ঙ্কর রকমের শারীরিক আক্রমণ নামিয়ে আনে। তার থেকে শিক্ষা নিয়ে  প্রতিরোধের অঙ্গ হিসাবে এক প্রতিরোধ বাহিনী তৈরী হয়, যাঁর নাম হয়  ডাঃ আম্বেদকর সেবাদল, এবং পরে আম্বেদকরের পরামর্শে নাম বদলে তাঁর নাম দাঁড়ায় "সমতা সৈনিক দল"। ওই সময়ে মাহার জাতির মানুষেরা লাঠি হাতে চলতো। মাহার জাতির চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল লাঠি।  বাস্তবে মোরেই ছিলেন এই রীতির প্রতিষ্ঠাতা। আরও একটি সংস্থা তৈরী করাতে  মোরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তা হল "সমাজ সমতা সংঘ"। পুজো পার্বনে দলিতদের অংশ নেওয়া, বিবাহ ইত্যাদিতে দলিত পুরোহিত রাখা, আন্ত-বর্ণে বিবাহ ইত্যাদি কর্মসূচি ছিল এই সংগঠনের।

           ১৯২৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর মনুস্মৃতি পোড়ানো হয়। এর প্রস্তাবক ছিলেন গঙ্গাধর নীলকণ্ঠ সহস্রবুদ্ধে নামক একজন ব্রাহ্মণ, যিনি জাতপাত বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই আন্দোলনেও মোরে অন্যতম নেতা হিসাবে উঠে আসেন। আম্বেদকরকে "বাবাসাহেব" আখ্যা দেওয়ার ও সেই নামের প্রচারের অন্যতম মাধ্যম ছিলেন তিনি। আম্বেদকরের "বহিঃস্কৃত ভারত" পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মী ছিলেন মোরে। শুরুতে ছয় মাস আম্বেদকরের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে  থেকে, লেখা প্রুফ দেখা, প্রচারে সহযোগিতা করা ইত্যাদি অনেক কাজই করতেন। এই সময় মোরে রত্নাগিরি জেলায় কৃষক কনভেনশন সংগঠিত করেন (১৯২৯)। সামন্ততান্ত্রিক "খতি ব্যবস্থা"র বিরুদ্ধে কৃষক  আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। কোলাবা জেলা কৃষক সমিতির সম্পাদক হন (১৯৩০)। কিছু উচ্চ বর্ণের নেতাও এই আন্দোলনের পক্ষে যুক্ত ছিলেন।

             পারেল ও পয়বাওয়ারি এলাকা বোম্বের শ্রমিক এলাকা, যেখানে কমিউনিস্টদের কাজ ছিল, তা একই সাথে দলিত সমাবেশেরও জায়গা। ১৯২৮ সালে ঐতিহাসিক ছয় মাসের স্ট্রাইক চলে। কামগর ময়দানে শ্রমিকদের ভাষণ শুনতেন তিনি। কমিউনিস্টদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতে থাকেন। তাদের দাবিপত্রে ১৮ দফার মধ্যে কাপড়বয়ন বিভাগে দলিতদের চাকরিতে গ্রহণের দাবিও ছিল (সেখানে জিভের লালায় ভিজিয়ে সুতো পরাতে হতো)। সামাজিক সমস্যা নিয়েও যে কমিউনিস্টরা ভাবিত ছিল তা মোরে উপলব্ধি করেন। পরের বছর আবার স্ট্রাইক হয়। ২৩ এপ্রিল ১৯২৯ পরশুরাম যাদব নামে এক যুবক শ্রমিক পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। তার প্রতিক্রিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানা স্থানে শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হয়ে যায়, প্রায় ৭০/৮০ টি কারখানায়। জ্যোতি মিলের শ্রমিক নেতা পাপা মিঞা গুলিতে আহত হলে শ্রমিকরা রেগে গিয়ে এক ইংরেজ ম্যানেজারকে আক্রমণ করে হত্যা করে। এতে  যুক্তপ্রদেশের ওই পাপা মিঞা ও মহারাষ্ট্রের বাবু মারুতি দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁদের ফাঁসির আদেশ হয়।  ১৮ই মার্চ ১৯২৯ তারিখে ফাঁসি হয়। তাঁদের দুজনের কাছে প্রস্তাব এসেছিলো যে কমিউনিস্ট নেতা ডাঙ্গের প্ররোচনায় তাঁরা এই কাজ করেছেন, এই মর্মে বয়ান দিলে তাঁদের ফাঁসি রদ করা যাবে। কিন্তু তাঁরা তা করেননি বরং ফাঁসিকেই বরণ করে নিয়েছিলেন। এর ফলে শ্রমিকদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়। এদিকে দুদিন পরেই মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় ৩২ জন্য কমিউনিস্ট নেতার জেল হয়। এই সমস্ত ঘটনায় এবং কমিউনিস্টদের দলিত-অদলিত বা হিন্দু-মুসলমান ঐক্য দেখে, তাদের ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ঘোষণা, যেখানে জাতভেদ থাকবেনা - মোরে কমিউনিস্টদের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই ধরনের আদর্শবাদী শক্তিকেই দেশের শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্বর ভূমিকায় তিনি দেখতে চান। ৮ই এপ্রিল ভগৎ সিং কর্তৃক বোমা ছোঁড়ার ঘটনা ঘটে। এটাও মোরের কমিউনিজমের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায়। দলিত আন্দোলনের কর্মী অনন্তরাও আকা ভাই তাঁকে আগেই শ্রেণীর সংগ্রামের বিষয়ে অবহিত করেছিলেন। দলিতমুক্তির আন্দোলন সমান্তরালভাবে চালিয়ে গিয়েও কীভাবে এই বৃহত্তর সংগ্রামের সাথে যুক্ত হওয়া যায়, তা নিয়ে  ভাবতে থাকেন মোর। চিন্তা করেন কীভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও দলিত আন্দোলনকে এক সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়। বি টি রণদিভে, এম ভি দেশপান্ডে, জগন্নাথ অধিকারী, আর বি জাম্বেকর প্রভৃতি সিপিআই নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে  মার্ক্সবাদের বই পড়া শুরু করেন তিনি। মোরে ছিলেন "মাহার সমাজ সেবা সংঘ"র সাধারণ সম্পাদক, যার মাধ্যমে তিনি সমাজের নিচুতলার মানুষের মধ্যে কমিউনিস্ট নেতাদের বক্তব্য রাখার জন্য অনেক বড় প্ল্যাটফর্ম-এর ব্যবস্থা করে দেন। ১৯৩০ সালে মোরে সিপিআই-এর সদস্যপদ পান।

                     মার্কসীয় বইপত্র পড়াশোনা করে মোরে উপলব্ধি করেন যে তিনি শুধুমাত্র দলিত মুক্তির চিন্তাকে অতিক্রম করে এখন সমগ্র মানব সমাজের মুক্তির এক উপযুক্ত দর্শনের সন্ধান পেয়েছেন। আম্বেদকরকে সেই কথা জানালে তিনি কোনোরকম রাগারাগি তো করেনইনি, বরং তাতে সায় দিয়েছিলেন। আম্বেদকর পরে অবশ্য বলেন, মোরের মতো ত্যাগী মানুষের সফলতার জন্য  শুভেচ্ছা রইলো, তবে ব্রাহ্মণ প্রধান কমিউনিস্ট পার্টি মোরের ভূমিকার উপযুক্ত মূল্য দেবে কীনা সন্দেহ আছে। কিন্তু ব্যক্তির স্বাধীনতায় ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হিসাবে তিনি মোরের কমিউনিস্ট পার্টিতে যাওয়াকে স্বাগত জানাতে তাঁর জন্য এক বিদায় সম্বর্ধনা অনুষ্ঠিত করেন। অন্য দলে গেলেও আগের মতোই পত্রিকায় লেখা স্বেচ্ছায় চালু রাখার জন্য মোরের কাছে প্রস্তাবও দিয়ে রাখেন আম্বেদকর।

           মোরে তাঁর এই অগ্রগতি সারা জীবন ধরে বজায় রেখেছিলেন। দলিত সমাজে তাঁর স্বপ্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের গুণগত অবস্থান ছিল আম্বেদকরের ঠিক পরেই। ব্যক্তি জীবনে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যাবার প্রলোভন তিনি ত্যাগ করতে পেরেছিলেন। অন্য দিকে সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে পরিবারের সঙ্গে কঠোর জীবন সংগ্রামে থেকেই তাঁকে টিকে থাকতে হয়েছে শুধুমাত্র  আদর্শ ও সংগঠনকে অবলম্বন করেই। পরবর্তীতে অনেক দলিত মানুষের ও দলিতদের মধ্যে কাজ করা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছেন, যাঁদের কাছে মোরে ছিলেন একজন আদৰ্শস্থানীয়।          ১৯৩১ সালে মোরের তত্ত্বাবধানে "ফ্রেন্ডস ক্লাব" তৈরী হয়, যারা শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে নাটক, গান, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি করতো। সিপিআইএর যুব শ্রমিক সমিতি এবং দলিতদের সমতা সৈনিক দল এদের মঞ্চ ব্যবহার করে একসাথে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালাতো, যেখানে অন্যান্য  বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গও  সামিল হতেন। আইপিটিএ-র পূর্বসুরি ছিল এই ফ্রেন্ডস ক্লাব। এর মাধ্যমেই মোরে ১৯৩৩ সালে আম্বেদকরের জন্মজয়ন্তী পালন করেন আম্বেদকরের উপস্থিতিতে, যেখানে সিপিআইএর কিছু অন্যান্য সদস্যও সামিল হন। কমিউনিস্ট ও দলিত সমাজের মধ্যে এক ঐক্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয় মোরের কারণে।

           মোরে নানা অংশের শ্রমিকের, যেমন নির্মাণ, লিফ্ট অপারেটর, প্রেস, স্বর্ণকার, সাফাই ইত্যাদি ক্ষেত্রের ইউনিয়ন তৈরী করা শুরু করেন। বিভিন্ন বৃহৎ সংগঠিত ক্ষেত্রে ফ্র্যাকশানাল কাজও চলে। সাব-আরবান ইউথ কনফারেন্স-এ ভূমিকা নেন। ওই সময়ে সিপিআইয়ের উদ্যোগে  রেড ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস তৈরী হলে তাঁর অধীনে মিল ট্রেড ইউনিয়ণের ওয়ার্কিং কমিটিতে মোরে থাকেন। শ্রমিকদের বাড়ি বাড়ি যেতেন তিনি। রেলওয়ে শ্রমিকদের নেতা হয়ে ওঠেন। বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে রেলের সংগঠনের মাধ্যমে পার্টির মধ্যে নিয়ে আসেন। বোম্বে ফিল্ম ইনডাস্ট্রির বিখ্যাত সঙ্গীত রচয়িতা শৈলেন্দ্র, যিনি জাতিতে চামার ছিলেন, এবং প্রথম জীবনে অল্প বয়সে বোম্বেতে রেলের  চাকরিতে ঢুকেছিলেন, তিনি পরে এক সময় আইপিটিএ তে আসেন মোরের মাধ্যমেই।

     মিল ওয়ারকার্স ইউনিয়নের অফিসে জাতভেদ করে দুই জায়গায় আলাদা জলের পাত্রের ব্যবস্থা ভেঙে এক পাত্রে জলপানের ব্যবস্থা মোরের উদ্যোগেই সম্পন্ন হয়। ১৯৩৩ সালে কারখানার শ্রমিক ছাঁটাই করে নতুন মেশিন আনার প্রতিরোধ আন্দোলনে মোরে আহত ও গ্রেফতার হন। জেল থেকে বের হবার পর অল ইন্ডিয়া মিল ওয়ারকার্স ইউনিয়নের সম্মেলনে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত হলে তা সরকারের দ্বারা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রচাররত অবস্থায় পুলিশের হাতে আঘাত খেয়ে লুটিয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে পাঠিয়ে গার্ডে রেখে জানানো হয় তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। একটু সুস্থ হয়ে সেখান থেকে লুকিয়ে পালিয়ে গোপনে থেকে ধর্মঘটের প্রচার চালান। ন্যূনতম মজুরীর দাবিতে ঐ ধর্মঘট অনেকাংশে সফল হয়।

১৯৩৪ সালে সিপিআই নিষিদ্ধ হলে মোরে আন্ডার গ্রাউন্ডে যেতে বাধ্য হন। তাঁর পরিবার বহুদিন খুব অসুবিধার মধ্যে থাকে সেই সময়ে। পার্টি তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু  যথাসম্ভব সহযোগিতা করলেও তা অবশ্য যথেষ্ট ছিল না।

               আম্বেদকর ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি তৈরী করে মোরেকে যোগদান করতে বললে মোরে রাজি হন নি। ১৯৩৭ সালে ওই দলের পক্ষে নিশ্চিত জেতার আসনে মোরেকে দাঁড় করাতে চাইলেও মোরে সায় দেন নি। তাতে মোরের প্রতি আম্বেদকরের শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন (১৯৪৫) আইএলও র আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে মোরে এআইটিইউসির প্রতিনিধি না থাকলেও তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী আম্বেদকর নিজের প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে দেশের অন্যতম শ্রমিক প্রতিনিধি করলে তিনি প্যারিসে গিয়ে বক্তব্য রাখেন। এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক শ্রমিক মঞ্চে দলিতের বিষয়ে আলোচনা ওঠে। ১৯৪৬ সালে স্বাধীনতার প্রাক্কালে আম্বেদকর একবার পুণা চুক্তিকে অস্বীকার করে ভাবী স্বাধীনতা ভারতে দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর দাবিতে সত্যগ্রহ শুরু করেছিলেন। এই সময় কমিউনিস্টরা তাঁকে সমর্থন করেন। সেটা দলের ভেতরে  মোরের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।  অবশ্য কিছুদিনের মধ্যে সংবিধান রচনা শুরু হলে আম্বেদকর নিজেই সরে এসেছিলেন সেই দাবী থেকে। কেন্দ্রিকতার স্বার্থে শুধু দলিতই নয়,  দেশের কোনো সংখ্যালঘু অংশের জন্যই যে কোনও  পৃথক নির্বাচকমন্ডলী রাখারই বিরুদ্ধে তিনি  চলে যান।

               মোরে দলিত আন্দোলনের সাথে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সেতু হিসাবে কাজ করাতে বহু মূল্যবান নেতৃত্ব দলিত সমাজ থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে আসেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টির সাধারণ সম্পাদক সামারাও পারুলকর যিনি পরে কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য ও কৃষক সমিতির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হন। নাসিকের কলারাম মন্দির সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রধান নেতা কে এম সালভির কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেবার যোগসূত্র ছিলেন মোরে। ভাস্কর যাদব, যিনি পরে মহারাষ্ট্রের লাল নিশান পার্টির সম্পাদক হন, তিনিও মোরে কর্তৃক আকৃষ্ট হয়েছিলেন। শিডিউল্ড কাস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এস বি যাদব পার্টিতে আসেন তাঁরই  মাধ্যমে। দলিতদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ হিসাবে মোরের  সম্পাদিত বিশেষ পত্রিকা ছিল "আহ্বান"। এছাড়া "ইয়ং ওয়ারকার্স আ্যসোসিয়েশন" এবং "আনএমপ্লয়েড লেবারার্স ফোরাম" এই দুই সংগঠনেরই তিনি ছিলেন সম্পাদক, যার মাধ্যমে নানা ধরনের  শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার সুযোগ আসতো। আরও তিনি গঠন করেছিলেন "মতুঙ্গা লেবার ক্যাম্প" শ্রমিকদের যোগাযোগ ও জমায়েত কেন্দ্র হিসাবে। বোম্বে টেক্সটাইল শ্রমিকদের গিরনি কামগড় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন মোরে।

        ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়ে সিপিআই(এম) দল তৈরী হলে মোরে তাতে যোগ দেন। তিনি দলের  মহারাষ্ট্র রাজ্য কমিটির সদস্য হন। তখন তাঁর নিজের সম্পাদিত পত্রিকা হয় "জীবন মার্গ"। ১৯৭২ সালে ১১ই মে তিনি গোরেগাঁও-তে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মারাঠি ভাষায় লেখা আত্মজীবনী  বের হয় ২০০৩ সালে, যা ১৯২৭ সালের ঘটনা পর্যন্ত লেখা, অর্থাৎ অসমাপ্ত। তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখেন তাঁর ছেলে সত্যেন্দ্র মোরে, যিনি সিপিআই(এম) নেতা ছিলেন। কিন্তু প্রকাশ করে যেতে পারেন নি। শেষ পর্যন্ত সেই জীবনীগ্রন্থ বের করেন মোরের নাতি সুবোধ মোরে, ২০১৯ সালে। বইটির নাম হল " দ্য মেমোয়ার্স অব এ দলিত কমিউনিস্ট : দ্য মেনি ওয়ারল্ডস অফ আর বি মোরে।" মোরের জীবনাদৰ্শ প্রচারের গুরুত্ব বর্তমানে ক্রমবর্ধমান। কমিউনিস্ট আন্দোলন ও দলিত আন্দোলনকে, শ্রেণির আন্দোলন ও জাতপাতের আন্দোলনকে মেলানোর ক্ষেত্রে এই দুই ধারার মধ্যেই যে সব সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা আছে, মোরের মতো নেতারাই তা দূর করতে সক্ষম।