সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রে ‘নারী, জীবন ও স্বাধীনতা’

আজহার নাফিসি নামে এক লেখিকার একটা বই পড়ছিলাম,  ‘রিডিং ললিতা ইন তেহরান’১৯৯৫ সালে লেখিকা সিদ্ধান্ত  নেন যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা থেকে অব্যাহতি নেবেন এবং তাঁর নিজের বাছাই করা সেরা সাতজন ছাত্রীকে বাড়িতে  সাহিত্য পড়াবেন। পড়াশোনার থিম হবে ফিকশন ও রিয়েলিটির  মধ্যেকার আন্তঃসম্পর্ক। এর জন্য তাঁরা ‘আ থাউজেন্ড এন্ড ওয়ান নাইটস’এ তাঁদের দেশীয় নায়িকা শেহেরজাদে সম্পর্কে পড়েছেন এবং একই সাথে ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’, ‘প্রাইড এন্ড প্রিজিউডিস’, ‘ললিতা’ ইত্যাদি পড়েছেন, এমন সব সাহিত্য যা  বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, রাষ্ট্রের রক্তচক্ষুর কারণে নিষিদ্ধ তকমা  পেয়েছে, কিংবা বাজার থেকে গায়েব করা হয়েছে। ইসলামিক  রিপাবলিকে পড়াশোনা শেখানোর অনেক হ্যাপা — কী পড়ান হচ্ছে তাঁর থেকে নৈতিকতার ধ্বজাধারীদের মূল লক্ষ্য থাকে কার  ঠোঁটে কী ধরনের রঙ, কার বোরখা যথেষ্ট অবগুন্ঠনকারী নয়,  কিংবা কার চুলের স্টাইলে অন্তর্ঘাতের ছায়া দেখা যাচ্ছে। তাঁরা  সব সময়ই হেমিঙ্ওয়ের গল্প থেকে ‘ওয়াইন’ ছেঁটে দেওয়ায় ব্যস্ত নয়তো ব্রন্টের লেখায় পরকীয়ার উল্লেখ থাকার জন্য তাঁকে কী  ভাবে পাঠ্যক্রম থেকে বাতিল করা যায় সেটা নিয়ে উদগ্রীব। 

নাফিসি লিখছেন আমরা এমন একটা দেশে থাকি যেখানে সাহিত্যের কোন মূল্য নেই যদি না তা এক বিশেষ মতাদর্শর  অনুগামী হয়। এখানে সমস্ত আচার আচরণ, অঙ্গভঙ্গি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যাচাই করা হয়। আমার মাথার স্কার্ফ কিংবা আমার বাবার টাইয়ের রঙকে পাশ্চাত্যের অবক্ষয় বা  সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতা হিসাবে গণ্য করা হয়। দাড়ি না রাখা,  বিপরীত লিঙ্গের কারোর সাথে হাত মেলানো, প্রকাশ্য সভায়  শিস কিংবা হাততালি দেওয়া একই ভাবে অবক্ষয়ের রূপ এবং  সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বহিঃপ্রকাশ। বইটি থেকে জানা যায়  ১৯৭৯ সালে পেহেল্ভি রাজবংশের শাসন উৎখাত হওয়ার  কয়েক বছরের মধ্যে ইরানে নতুন সংবিধান রচিত হয় যা ব্যাপক  ভাবে নারী স্বাধীনতা খর্ব করে। ‘পরিবার রক্ষা আইন’ যা ঘরে ও  কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অধিকারকে মান্যতা দিতো, তা প্রথমেই  

খারিজ করে দেওয়া হয়। বিবাহের বয়স নয় করে দেওয়া হয়;  ব্যাভিচার ও পতিতাবৃত্তির শাস্তি হয় ‘স্টোনিং টু ডেথ’; এবং  আইনের চোখে নারীর মূল্য পুরুষের অর্ধেক করে দেওয়া হয়।  

স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় অপরাধ হল সেটা বলপ্রয়োগের  দ্বারা তামাম নাগরিককে এই অপশাসন মেনে নিতে বাধ্য করে,  যার ফলে নাগরিক নিজেই এই সীমাহীন কুকর্মের সাকরেদ হয়ে পড়ে। এই ‘ভিড়ে’র মধ্যে নিজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বজায় রাখাটাই  চ্যালেঞ্জ, অসম্ভব হলেও মানুষ হিসাবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে 

রাখার সেটাই একমাত্র উপায়। এর জন্যই সাত ছাত্রীকে নিয়ে প্রফেসরের ওই ক্লাস যা ধর্মীয় মতাদর্শের ওই প্লাবনের মধ্যেও  তাঁদের বিচক্ষণ ও মানসিক ভাবে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।  

‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ বা Jin Jiyan Azadi, ছিল স্বাধীনতাকামী কুর্দিশ নারীদের শ্লোগান। ২০২২’র সেপ্টেম্বরে বাইশ বছরের এক কুর্দমেয়ে মাহসা আমিনিকে পুলিশ তেহেরানে ‘অশোভন’ পোশাক পরার জন্য গ্রেপ্তার করে। কয়েকদিন পরে মাহসা পুলিশ হেফাজতে মারা যান। ইরানে মহিলারা এর  বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। সারা বিশ্বের মহিলারা সোচ্চার  হন। এই শ্লোগানের স্পিরিট বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপে ছড়িয়ে পড়ে। মাঠে-ময়দানে, পথঘাটে প্রতিবাদ সংগঠিত হয় এবং  সময়ের সাথে সাথে তা শিল্প, সাহিত্য, সিনেমায় প্রতিধ্বনিত হয়। সাম্প্রতিক কিছু সিনেমায় প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, আন্দোলন,  রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন এসব তো আছেই পাশাপাশি বন্ধুত্ব, সংহতির  নানা রূপও ফুটে উঠেছে। আসন্ন মৃত্যুর কিনারে এসেও সহমর্মী বান্ধবীর সাহচর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠা, প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও  পরস্পরকে আঁকড়ে টিকে থাকা, অনমনীয় দৃঢ়তার সাথে রাষ্ট্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করা, এসবই এই সিনেমাগুলিতে  প্রতিফলিত হয়েছে। সেরকম কয়েকটি ছবি নিয়েই এখানে আলোচনা করা হবে।  

 

 ‘দ্য উইটনেস’; পরিচালকঃ নাদের সায়ভার;  চিত্রপরিচালক ও সম্পাদকঃ জাফর  পানাহি।

 

তেহেরানের একটি স্কুলের ভিতরের একটি ঘরে মেয়েরা নৃত্য অনুশীলন করছেন। তাঁদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৈভব  দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। একটু তফাতে বসে তাঁদের অবসরপ্রাপ্ত  শিক্ষিকা। তাঁর ঘন ভুরু, কোমর অবধি পাট পাট করা পাকা  চুল, বলিরেখাময় মুখ। তাঁর মুখে স্মিত হাসি, তৃপ্তি। তাঁর নাম তারলান। তিনি রাজতন্ত্রের দিনগুলি দেখেছেন। অন্য দুই  নারী জারা এবং তাঁর কন্যা গজল্। জারা ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময়ে বড় হয়েছেন, তাঁর কন্যা ‘নারী,  জীবন, স্বাধীনতা’ সম্পর্কে অবহিত। জারার সংসারে এই নাচ  নিয়ে অশান্তি। তাঁর স্বামী সোলাত, ধর্মান্ধ, দুর্নীতিগ্রস্ত, রাষ্ট্রের  ধামাধরা উচ্চপদস্থ আমলা। তাঁর অভিযোগ নাচের প্রতি তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের অনুরাগের কারণে তাঁর দুর্নাম হচ্ছে, তাঁর পদমর্যাদা  ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। প্রতিনিয়ত সোলাত বাড়ির পর্দা টেনে দেন যেন মহিলাদের মতো তিনি পুরো বাড়িটাকেই বোরখা পড়িয়ে রাখতে  চায়। জারা প্রতিদিন স্বামীর হাতে নিগৃহীতা হন, তাঁর ক্ষতবিক্ষত মুখ দেখে তারলান চমকে ওঠে। রাস্তায় খোলা চুলে যখন তিনি  গাড়ি চালান, মহিলা নীতি পুলিশ তাঁকে হুমকি দেয়, “আল্লা ওই  খোলা চুল শুধু তোমার স্বামীর আনন্দর জন্য সৃষ্টি করেছেন”  

তারপর একদিন জারার মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।  তারলানের সন্দেহ হয়। সোলাত তাঁকে বোঝান যে জারা  অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে খুন হয়েছেন। তড়িঘড়ি তাঁর কবর  দেওয়া হয়। তারলান নিশ্চিত যে সোলাত খুনি। সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধা বিচারের দাবীতে সর্বত্র ঘুরে বেড়ান, পুলিশ, প্রশাসনের  প্রতিটি জায়গায় গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন। কেউ তোমার  অভিযোগ শুনবে না, তাঁকে শাসানো হয়। খাদের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে সোলাত তাঁকে হুমকি দেন, তুমি কিন্তু সাবধানে থেকো। তোমার মতো অনেকেই ওখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরতে  বাধ্য হয়েছে। প্রতি মুহূর্তেতারলানের পিছনে টিকটিকি, বাড়ির  সামনে নীতি পুলিশের গাড়ি, ঘরের ইঁদুরগুলির মতো তাঁরা  তাঁকে সর্বত্র অনুসরণ করে। সরকারের হুমকির কারণে তাঁর  প্রিয় স্কুলের শিক্ষিকারা তাঁকে এড়িয়ে চলেন, গোপনে তাঁর  সাথে দেখা করে সহানুভূতি জানান। তার পুত্র দেনার দায়ে যে জেলে ছিল, সোলাত প্রভাব খাটিয়ে তাকে বার করে আনে।  সে মা’কে বোঝায় সোলাতের বিরুদ্ধে না যেতে, তাঁর সাথে সমঝোতা করতে।  

বৃদ্ধা নাছোড়বান্দা। ছেলেকে তিনি বলেন আল্লার কাছে তাহলে তুমি কী জবাব দেবে? তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন।  এর মধ্যে রটিয়ে দেওয়া হয়েছে জারার বিবাহ-বহির্ভুত সম্পর্ক ছিল। এক সরকারি কর্তাব্যক্তি তারলানকে জানান, আপনি তো আমাদের আইনের ধারা ৬৩০ জানেন — বিপথগামী স্ত্রীকে হত্যা করলে স্বামীর কোন সাজা হয় না। হতাশ, নিরুপায়,  বিধ্বস্ত তারলানের কাছে যখন বিচারের সব দরজাই প্রায় বন্ধ 

তখন সহসা একদিন গজল্ বাড়িতে পুরানো দিনের মতো আবার  নাচ শুরু করে। পুরো ঘর যেন ঝলমল করে ওঠে। শিক্ষিকাদের  গোপন সমর্থন, গজলে্র বেপরোয়া নাচ, সিস্টেমকে অন্তর্ঘাত করে বেঁচে থাকার রসদ যোগায়।  

 

মহম্মদ রাসলফের ‘দ্য সিড অফ দ্য সেক্রেড ফিগ’

 

মহম্মদ রাসলফের ‘দ্য সিড অফ দ্য সেক্রেড ফিগ’ ‘দ্য  উইটনেস’এর মতো অত উঁচুদরের ছবি নয়। বিশেষ করে ছবির  শেষের দিকটা তো রীতিমত অতিনাটকীয়। কিন্তু রাজনৈতিক  কারণে ছবিটি ইউরোপের বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে সমাদৃত হয়েছে।  এখানেও পরিবারকে ঘিরে কাহিনী আবর্তিত হয়। সময়টা  গুরুত্বপূর্ণ — মাহসা আমিনির মৃত্যুর কারণে সারা ইরান তখন উত্তাল। দলে দলে নারী পুরুষ রোজ রাস্তায় বিক্ষোভ দেখাচ্ছে,  ‘রিভোলিউশনারি গার্ড’এর সাথে সঙ্ঘর্ষ হচ্ছে, অনেকে মারা  যাচ্ছেন। সেই আন্দোলনের ঢেউ ওই পরিবারের এতদিনের  সমীকরণকেও ওলটপালট করে দিচ্ছে। বাড়ির কর্তা ইমান,  আইনজীবী, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের কারণে বিচারক হিসাবে নির্বাচিত হন। তাঁর বিবেক দংশন হচ্ছে — রোজ তাঁকে প্রায়  বিনা সবুদে মৃত্যুদন্ডে সই করতে হয়। কিন্তু তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রবল হওয়ার কারণে অচিরেই বিবেকের জ্বালা প্রশমিত হয়।  যেহেতু কাজটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং তাঁর আন্দোলনকারীদের টার্গেট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাই তাঁকে খুব সতর্ক থাকতে হয়।  তাঁর নিরাপত্তার জন্য তাঁকে একটা রিভলভারও দেওয়া হয়।  

তাঁর স্ত্রী নাজমেহ, দুই কন্যা রেজভান এবং সানা। নাজমেহ  স্বামীর উচ্চাকাঙ্ক্ষার শরিক, তাঁর সাফল্যে গর্বিত। তিনি  মেয়েদের নির্দেশ দেন, তোমাদের বাবা এখন বিচারক, সব  সময় পা মেপে চলবে। কিন্তু দেশজুড়ে প্রতিবাদে আলোকিত কন্যাদের তেজের কারণে, তিনি অনেকটাই দোদুল্যমান। কর্তা কিন্তু কঠোর হাতে মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করেন, সোশ্যাল মিডিয়া  থেকে তাঁদের দূরে থাকার কড়া হুকুম জারি করেন। কিন্তু  কে আটকাবে তাঁদের! অল্পবয়সি দুই মেয়ে গোপনে তাঁদের  মোবাইলে প্রতিবাদের ভিডিও দেখেন এবং মানসিকভাবে সেই  আন্দোলনে শামিল হয়ে পড়েন। তাঁদের বন্ধুসেই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী। তাঁদের মায়ের প্রাথমিক অমত সত্ত্বেও তাঁরা  বাবাকে না জানিয়ে সেই বন্ধুকে বাড়িতে আশ্রয় দেন। ছররার  গুলিতে ক্ষতবিক্ষত বন্ধুকে বাড়িতে এনে সেবাশুশ্রূষা করেন।  মেয়েরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে, বাবার সাথে নিজেদের স্বাধীনতা  নিয়ে তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। মা উভয় দিক সামাল দেওয়ার  বৃথা চেষ্টা করে।  

এরই মধ্যে ইমানের রিভলভার বাড়ি থেকে হারিয়ে যায়।  রাষ্ট্রের চোখে এটা গর্হিত অপরাধ। তাঁর সহকর্মী তাঁকে হুমকি দেয় এর ফলে তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে। তিনি দিশেহারা  হয়ে পড়েন। ভয় ও অবিশ্বাসে নিমজ্জিত হয়ে তিনি নিজের পরিবারকে সন্দেহ করতে শুরু করেন। জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য  তিনি তাঁদেরকে সহকর্মীর কাছে নিয়ে যান। এতসব সত্ত্বেও  যখন তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ফিরে পেতে ব্যর্থ হন, তখন শেষ একটা  চেষ্টা করার জন্য তিনি পুরো পরিবারকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে  নিয়ে যান। সেখানেই কাহিনীর অন্তিম পরিণতি ঘটে।  

দুটি সিনেমাতেই দেখা যায় নতুন প্রজন্ম মুক্তির পথ দেখায়।  ‘দ্য সিড অফ দ্য সেক্রেড ফিগ’ ছবিতে দুই কন্যা তাঁদের  আত্মবিশ্বাসের জোরে মা’কেও নিজেদের সাথে শামিল করতে  সমর্থ হন। ছবিটি গোপনে শ্যুট করা হয়েছিল এবং সেটি শেষ  করার পর রাসলফ জার্মানিতে পলায়ন করেন।  

 

‘দ্য রুম নেক্সট ডোর’। পরিচালকঃ পেড্রো আল্মাডোভার

 

দেয়াল জুড়ে ঝকঝকে এক কাঁচের জানলার সামনে দুই  মধ্যবয়স্কা মহিলা বসে আছেন — মার্থা এবং ইনগ্রিড। বাইরে ছবির মতো নিউইয়র্কের স্কাইলাইন, ঝিরঝির করে বরফ পড়ছে।  আমি দরজা খোলা রাখব, যে দিন দেখবে ওটা বন্ধ, বুঝবে সব  শেষ, মার্থা বান্ধবীকে বলেন। তাঁদের শেষ দেখা হয়েছিল প্রায়  দু’দশক আগে, দু’জনেই তখন দুঁদে সাংবাদিক, মার্থা জীবনের  ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রিপোর্টিং করেন।  

ইনগ্রিড এখন নামকরা লেখিকা, সম্প্রতি মৃত্যুর ওপর  তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। হঠাৎ একটি ক্লিনিকে তিনি  মার্থাকে আবিষ্কার করেন। কিছু দিনের মধ্যে তিনি বাড়ি ফিরে যান এবং দুই বান্ধবীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে ওঠে।  সেই পুরনো দিনের সব গল্প, হাসি ঠাট্টা, একই পুরুষকে ডেট করা নিয়ে খুনসুটি। মার্থা বিবাহ-বিচ্ছিন্না, তাঁর কন্যাও তাঁর  সাথে সম্পর্ক রাখে না, কারণ তাঁর বিশ্বাস ওই বিচ্ছেদের জন্য  তাঁর মা’ই দায়ী।  

গল্পের মধ্যেই মার্থা জানান তিনি প্রাণনাশী ক্যানসারে আক্রান্ত, নিরাময়ের সম্ভাবনা কম। মাই ডেজ আর নাম্বার্ড, তিনি  জানান। চিকিৎসার এই দাপটে আমি ক্লান্ত, তাঁর কন্ঠে বিতৃষ্ণা ঝরে পড়ে। একটা ব্যাধিকে ওরা যুদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে, যেন এটা গুড আর ইভিলের মধ্যে একটা মরণপণ লড়াই। যে এই  লড়াইয়ে জিততে পারে সে হিরো, অন্যরা স্রেফ গিনিপিগ যাদের  ওপর নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চলে।  

এরপর তাঁর পরিকল্পনা শুনে ইনগ্রিড চমকে ওঠেন। মার্থা শহরতলির কোন শান্ত এলাকায় চলে যেতে চান যেখানে তিনি  নিভৃতে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাবেন এবং একটি বিশেষ  ওষুধের মাধ্যমে নিজের জীবনে ইতি টানবেন। এর জন্য তিনি  এক সঙ্গী খুঁজছেন যে তাঁর সাথে এই দিনগুলি কাটাবেন। তিনি  দু’তিনজনকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা রাজি হননি।  ইনগ্রিড কি… 

ইনগ্রিড প্রথমে ভয় পেয়ে যান, সময় চান, অবশেষে রাজি হন। তারপর মনোরম পরিবেশে, অনিন্দ্যসুন্দর এক বাংলোয়  তাঁদের একান্তে দিনযাপন। ভোরবেলায় তাঁরা পাখির ডাক  শোনেন, বেলা গড়ালে বাগানে রৌদ্যস্নান করেন, আশেপাশে  পায়ে হেঁটে ঘুরতে যান, কখনো শহরে কোন রেস্টুরেন্টে পানভোজন করতে চলে যান। তাঁরা পরস্পরকে উৎসাহ  দেন, একে অন্যের থেকে শক্তি সঞ্চয় করেন। মার্থা নিজেই  পায়চারি করতে বেরিয়ে যান। সেই সুযোগে ইনগ্রিড শহরে বন্ধুর  সাথে দেখা করতে যান। তাঁরা রাজনৈতিক আলোচনায় মেতে  ওঠে। বন্ধু বলেন, নব্য উদারতাবাদ অতি দক্ষিণ রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনছে, দেখ এই আমেরিকাতেই তো তার পদধ্বনি  (তখন সেখানে নির্বাচনী প্রচার চলছে)। আমরা একটা  apocalypse’এর সম্মুখিন, এক মহা বিপর্যয়। ইনগ্রিড  গম্ভীর, তিনি নিজেই তো বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন! ইতিমধ্যে মার্থার চেহারায় ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়, তাঁর মুখ আরও বিবর্ণ।  একটা আসন্ন ট্র্যাজেডির মধ্যে থেকেও, সেটির মুখোমুখি হয়েও, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, সহমর্মিতার ছোঁয়ায় তাঁদের  সম্পর্কচিরকালীন হয়ে ওঠে।  

একটি সাক্ষাৎকারে পরিচালক বলেন, একটা  মানবিক সম্পর্কের গল্প এই চূড়ান্ত ঘৃণার আবহে সহমর্মিতার  বার্তা দেয়, একটা রাজনৈতিক গল্প হয়ে ওঠে। মার্থার চরিত্রে অভিনয় করা প্রখ্যাত অভিনেত্রী টিল্ডা সুইন্টন বলেন ‘দ্য  রুম নেক্সট ডোর’ শুধু আমার আর ইনগ্রিডের কথা বলে না;  আমাদের পাশের ঘরে সিরিয়া আছে, লেবানন আছে, গাজা,  জেরুজালেম আছে, আমাদের তাদের কথাও বলতে হবে।  

 

পায়েল কাপাডিয়ার ‘অল উই ইমাজিন এজ লাইট’

 

চতুর্থ ও শেষ যে ছবিটি আলোচনা করবো সেটি পায়েল কাপাডিয়ার বহু বন্দিত ‘অল উই ইমাজিন এজ লাইট’মুম্বাই  শহরে তিন নারীর জীবনকে কেন্দ্র করে এই ছবির কাহিনী রচিত হয়। দুই নার্স প্রভা ও অনু একই ফ্ল্যাটে থাকেন। প্রভার স্বামী  বিয়ের পর জার্মানি চলে যান। দু’জনের সম্পর্কক্ষীণ, তাঁর  শেষ চিঠি এসেছিল প্রায় এক বছর আগে। হাসপাতালের এক  ডাক্তার প্রভার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রায়  যৌবন উত্তীর্ণা নারীর সংস্কারগ্রস্ত মন এই আহবানে সাড়া দেয়  না। তাঁর শয়নে স্বপনে তাঁর স্বামী যে নাকি বিদেশের কারখানায়  কঠোর পরিশ্রমে বিধ্বস্ত। অনু বয়সে অনেক ছোট, ছটফটে,  চঞ্চল। শিয়াজ নামে এক মুসলিম ছেলের সাথে তিনি প্রেম করেন। ঘনিষ্ঠ হবার জন্য তাঁরা যত্রতত্র ডেরা খুঁজে বেড়ায়।  একদিন শিয়াজ জানায় তাঁর বাড়ি ফাঁকা। সেখানে তারা যেতে  পারে কিন্তু অনুকে বোরখা পরে আসতে হবে নাহলে মহল্লার  লোক হামলা করবে। অপর দিকে অনুও জানায় তাঁর পরিবার  কখনো তাঁদের শাদি মেনে নেবে না। ‘লাভ জিহাদ’! তাঁরা সব  সময় ভয়ে থাকে, সময়, বিষাক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ তাঁদের ভালোবাসাকে অনিশ্চিত করে দিয়েছে। 

কাহিনীর তৃতীয় চরিত্র পার্বতী যাঁর স্বামী কাপড়ের মিলে  কাজ করতেন। কিন্তু এক সময় শহরের সব মিল বন্ধ হয়ে যায়। আশেপাশের অঞ্চল থেকে শ্রমিকদের যে আসা যাওয়ার  নিরন্তর স্রোত ছিল তা শুকিয়ে যায়। শহরের চরিত্র পাল্টে যায়।  শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ানের শহর থেকে মুম্বাই হয়ে ওঠে মাল্টিপ্লেক্স, মল ইত্যাদির শহর, দেশের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র।  ইতিমধ্যে পার্বতীর স্বামীর মৃত্যু হয়। স্থানীয় প্রমোটার তাঁকে ঘর  ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করে। পার্বতী বেপরোয়া,  বলেন বিশ বছর ধরে আমি এখানে আছি, সমস্ত পড়শি আমাকে চেনে, কে আমাকে ঘরছাড়া করবে। 

কিন্তু পার্বতীর কাছে কোন কাগজ নেই। আইনজীবী তাঁকে বলেন কাগজ না থাকলে প্রমাণ কী করে করবেন, ওই ঘর  আপনার? এই ভাবে তিন নারীর জীবনে তাঁদের অজান্তে জনবিরোধী রাজনীতি থাবা বসায়। আর এসবই হচ্ছে কঠোর,  

কঠিন মুম্বাই শহরে, যেখানে পথেঘাটে শ্রমজীবী মানুষের ভিড়,  যাঁদের প্রাদেশিক বুলি শহরকে সব সময় কোলাহলপূর্ণ করে রাখে। শহর জুড়ে লোকাল ট্রেনের আনাগোনা, আকাশচুম্বী ফ্ল্যাটবাড়ি, একের পর এক ফ্লাইওভার দিয়ে নিরন্তর ওঠানামা,  অনর্গল বৃষ্টি এবং সর্বত্র বিরাজমান গণপতি বাপ্পা। শহরটা  নিজেই গল্পের চরিত্র হয়ে ওঠে।  

অবশেষে পার্বতী ঘরছাড়া হন। তিনি যখন শহর ছেড়ে গ্রামের  বাড়িতে যান তখন প্রভা ও অনু তাঁকে সঙ্গ দেয়। সেখানে শিয়াজ  গিয়ে হাজির হয়। প্রান্তিক অঞ্চলে তাঁরা ঘনিষ্ঠতার সুযোগ পান,  অনু শিয়াজের শরীর অন্বেষণ করেন; প্রভা সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে আসা এক পুরুষের মধ্যে আচমকা যেন নিজের স্বামীকে খুঁজে পান।  

প্রতিটি ছবিতেই মুখ্য বিষয় প্রতিবাদ, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা,  পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার তীব্র প্রচেষ্টা। প্রতিটি ছবিই নারীকেন্দ্রিক যাতে একটি সর্বজনীন ‘সিস্টারহুড’ ফুটে উঠেছে। বিগত বছরে এটি একটি বড় পাওনা।