না-শরীরী কাহন - নিকোলাই গোগোলের ‘ডেড সোলস' এর নাট্যরূপ - ১১
- 07 February, 2026
- লেখক: বিপ্লব বিশ্বাস
দ্বিতীয় অঙ্ক : চতুর্থ দৃশ্য
----------------------------------------------------
( সরাইখানার একটা ঘর। চিচিকভ একা। দলিল আর সম্পত্তির তালিকায় শেষবারের মতো চোখ বোলাচ্ছে আর একে একে সেগুলোকে ট্রাস্টি লোহা-বাক্সে ভরে দিচ্ছে। পেত্রুশকা সতর্কভাবে খাড়িয়ে আছে)
চিচিকভ : কী চাই?
পেত্রুশকা : মনে হয় আমাদের চলে যাওয়া উচিত।
চিচিকভ : যাব, কোথায়?
পেত্রুশকা : রাস্তায়… হুট…হুট…হাই…
চিচিকভ : তুমি কী করেছ?
পেত্রুশকা : কথা হয়েছে স্যার, এটা খুব ভালো শহর স্যার ; এখনই চলে যাওয়া উচিত।
চিচিকভ : কাদের সঙ্গে কথা বলেছ?
পেত্রুশকা : পুলিশের সঙ্গে। সেনাদের সঙ্গে ; এবং আরও কেউ কেউ।
চিচিকভ : তারা তোমাতে আগ্রহী হল কেন? তুমি কী করেছ?
পেত্রুশকা : আমাতে নয় স্যার, ওরা আপনার বিষয়ে আগ্রহী। খুবই। আপনার সম্পর্কে সব জানতে চায়। আপনার ঘোড়াদের নাম, তাদের কিনতে আপনি কত খরচ করেছেন, কোথায় তাদের পেয়েছেন… এইসব। খুবই ব্যক্তিগত প্রশ্ন স্যার।
চিচিকভ : ( চোখ কুঁচকে ওকে দেখতে থাকে) হয়তো তুমি ঠিক। ঠিকাছে, তাহলে চলো… তাড়াতাড়ি করো।
পেত্রুশকা : পারব না স্যার।
চিচিকভ : কী পারবে না?
পেত্রুশকা : পারব না স্যার।
চিচিকভ : কেন?
পেত্রুশকা : কুবারির খুরে নাল নেই। চ্যাম্পিয়নেরও।
চিচিকভ : এইমাত্র যে বললে, আমাদের কেটে পড়া উচিত?
পেত্রুশকা : হ্যাঁ তা বলেছি স্যার।
চিচিকভ : ইডিয়ট কোথাকার। ব্যাঙের গু। এক হপ্তা এখানে বসে আছ, জানো, ঘোড়াদের নাল লাগবে, তো করিয়ে নেওনি কেন?
পেত্রুশকা : তা ঠিক স্যার, জেনেও করানো হয়নি। এক হপ্তা বসে আছি তাও এ কাজটি করানো হয়নি।
চিচিকভ : আর এখন আমাকে বলতে এলে, আমাদের এখনই কেটে পড়া উচিত, হ্যাঁ? এখন কী যে করি!
পেত্রুশকা : নিজেকেই এখন চাবকাতে হবে স্যার। এ ছাড়া গতি নেই।
চিচিকভ : যাও, কোনও কামার- টামার খুঁজে দেখো। দু ঘন্টা সময় দিলাম। এরমধ্যে যদি ঘোড়াদের খুরে নাল লাগানো না হয়, তার তোমাকে গাড়িতে জুতে চাবকাতে চাবকাতে নিয়ে যাব।
পেত্রুশকা : তাই করবেন স্যার। আমাকেই চাবকাতে চাবকাতে নিয়ে যাবেন… যদিও…
( পেত্রুশকা চলে যায় চিচিকভ আবার তাড়াহুড়ো করে কাগজপত্র নিয়ে বসে। তারপর দৌড়ে দরজার দিকে গিয়ে জোর হাঁক পাড়ে। সেই সময় নজদ্রেভ আর মিঝুয়েভ ঢুকছিল। ওদের সঙ্গে ওর ধাক্কা লেগে যায়)
নজদ্রেভ : ওই যে প্রবাদ আছে না, বন্ধুর জন্য এক মাইল হেঁটে যাওয়া যায়… এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম আর কী…তোমার জানলা দিয়ে আলো জ্বলতে দেখলাম… ভাবলাম, পুরনো বন্ধু চিচিকে একটু দেখেই যাই না। তোমার ওই লোকটাকে ডাকো তো, পাইপটা ভরে দিক। ডাকবে? গেল কোথায় সে?
চিচিকভ : আমি জীবনে পাইপ খাইনি।
নজদ্রেভ : এই হচ্ছে পাকা খেলুড়ের কথা। তুমি যে ধূমপান করো, আমি জানি, আর আমি যে জানি তাও তুমি জানো। ওহে…ভাকরামে…
চিচিকভ : ওর নাম ভাকরামে নয়, পেত্রুশকা।
নজদ্রেভ : তাহলে ওকে ভাকরামে বলে ডাকলে কেন?
চিচিকভ : কখখনো না। ভাকরামে নামে আমার কোনও লোকই নেই।
নজদ্রেভ : তুমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত? সে অন্য কেউ? শোনো শুয়োরমুখো, তুমি আমার সঙ্গে খুবই খারাপ ব্যবহার করেছ। এটা তোমার জানা উচিত। সেই চেকার খেলা মনে আছে? ঠিক যখন আমি জিতছিলাম, তুমি বোর্ডটা আমার মুখের ওপর উলটে দিলে। তোমাকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসি, কিন্তু… আঃ… ভুলেই গেলাম, তোমাকে কিছু বলার ছিল। গোটা শহরটা এখন তোমার বিরুদ্ধে। সবাই ভাবছে, তুমি একটা ঠগ, জোচ্চোর। তুমি টাকা জাল করতে জানো? ওরা তো আমাকেও পাকড়ে ফেলেছিল প্রায় ; কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে আছি, সব সময়। আনুগত্যের প্রশ্নে আমি পাথরের মতো। ওরা দাবি করার চেষ্টা করছে যে আমরা এক সঙ্গে স্কুলে পড়েছি… এইরকম আরও কত কী…
চিচিকভ : আমি, চিচিকভ, নোট জাল করি!?
নজদ্রেভ : এভাবে ওদের নাড়িয়ে দিলে কেমন করে? কোনও সমালোচনা নয়, কিন্তু এইসব ছোটো শহরের লোকজন এরা… তুমি তো ওদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছ? তোমাকে ওরা ডাকাতির দায়ে দায়ী করছে, টিকটিকি ভাবছে… আবার গভর্নর সাহেব তো এ সব দেখেশুনে ভিরমি খেয়ে উলটে পড়েই মরে গেল। আগামীকাল ওঁর শেষ কাজ। আর ওহে চিচি, চিচি… অনেকদিন তুমি এমন বেড়ে খেলোনি!
চিচিকভ : কী? কোন খেলা?!
নজদ্রেভ : ওই যে, গভর্নরের মেয়েকে নিয়ে ভেগে পড়ার খেলা? এ সব শুনেই তো মরে গেল লোকটা। আমিও জানতাম। নাচের সময়েই তোমাদের দুজনকে যা জড়াজড়ি করতে দেখলাম! তখনই মনে মনে বলেছিলাম, চিচিকভের ওপর নজর রাখতে হবে। কুমারীদের ওপর ওর নজর পড়েছে।
চিচিকভ : কী, কী বলছ? কী ছাতার মাথা বকছ? পাগল হলে নাকি? গভর্নরের মেয়ে? আর আমি এখন তাঁর মৃত্যুর কারণ! ( চিৎকার করে ওঠে)
( পেত্রুশকা ঢোকে। ভীত। বুটের খটখট শব্দ ভেসে আসে কাছ থেকে। নজদ্রেভ জানলা গলে পালিয়ে যায়। মিঝুয়েভ তাকে অনুসরণ করে। পুলিশকর্তা প্রবেশ করে। সঙ্গে পুলিশকর্মী। দরজায় আর একজন দাঁড়িয়ে)
পুলিশকর্তা: প্যাভেল ইভানোভিচ চিচিকভ, আপনাকে গ্রেপ্তার করা হল।
চিচিকভ : অ্যালেক্সি ইভানোভিচ, এটা কী? কেন? কোনও সতর্কবার্তা ছাড়াই? জেলখানা! আমি একজন মহান মানুষ!...
পুলিশকর্তা: ভিরমি খাবেন না। এটি আদালতের হুকুম।
পুলিশকর্মী : শান্ত হোন।
পুলিশকর্তা: বসুন।
চিচিকভ : অ্যালেক্সি ইভানোভিচ, জগৎটা কী? এই কি তুমি? আচ্ছা শুনুন - আমার শত্রুরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে… আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলতে পারি, এ সবই সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স… কাকতালীয় ব্যাপার… আর…
পুলিশকর্তা : ওর জিনিসপত্র সব সিজ করো।
( পুলিশকর্মী চিচিকভের ট্রাঙ্ক টেনে নেয়)
চিচিকভ : না। থামো। আমার জিনিস… আমার দলিল…!
পুলিশকর্তা: এগুলোই তো আমরা খুঁজছিলাম।
চিচিকভ : এ সবই আমার জগৎ। আমার সম্পত্তি।