জন্মশতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য : ফিরে দেখা
- 07 February, 2026
- লেখক: দীপক মিত্র
এক
যেকোন ভাবনা জীবনের বাইরে ঘটে না। এটি জীবনের মধ্যেই জাত হয়। আর এই ধরণের চিন্তাভাবনাই পৃথিবীকে পরিবর্তনের পথ দেখায়। সৃজনশীল সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলিকে চলমান রাখে। কখনো তা হয় মূক কখনো মুখর। একে চিনতে পারাটাই প্রকৃত শিল্প। কবি সুকান্ত যে সময় লেখা শুরু করেছিলেন তখন এদেশের কমিউনিস্ট পার্টির বয়স কুড়ি বছর পার করেনি। রুশ বিপ্লবের বয়স বড়জোর আড়াই দশক হবে। এদেশে একদিকে চলমান স্বাধীনতা আন্দোলন। আবার বাংলায় চূড়ান্ত মন্বন্তর। পৃথিবীব্যাপী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামার অনুরণন। জাতীয় কংগ্রেস পঞ্চাশ অতিক্রম করেছে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর মুসলিম লীগেরও জন্ম হয়েছে। ধর্মীয় দাঙ্গা নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এই যুগসন্ধিক্ষণে সুকান্ত কবি হিসেবে লিখতে শুরু করেছিলেন। তখন রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত। নজরুল স্মৃতিভ্রষ্ট, বাকরোহিত।
সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে তৎকালীন সময়ের কমিউনিস্ট পার্টিকে বাদ দিয়ে তাদের রণনীতি, রণকৌশল সর্বোপরি কর্মসূচিকে বাদ দিয়ে করা সম্ভব নয়। কারণ কবি হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সুকান্তর সম্পৃক্ততা অনস্বীকার্য। এইসময় অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পি.সি. যোশী। যিনি মার্কসীয় নন্দনতাত্ত্বিকদের পুরোধা সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডি পি মুখার্জির প্রেরণায় ভারতীয় সমাজশাস্ত্রের উচ্চ মার্গের অধ্যয়নে ও ভাবধারায় বিশেষত্ব অর্জন করেছিলেন। সেকারণে কমিউনিস্ট আন্দোলনের তত্ত্ব ও অনুশীলনে তার অসামান্য অবদান ছিল। তার নেতৃত্বেই কমিউনিস্ট পার্টিতেই এসেছিল মতাদর্শগত রাজনৈতিক আধিপত্য এবং সেই সঙ্গে সূচিত হয়েছিল সাংস্কৃতিক জাগরণ। সেই সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতা ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জোশীর নেতৃত্বে 'ন্যাশনাল ফ্রন্ট'-এর আহ্বান ছিল সমকালীন শিক্ষিত জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সকলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ না দিলেও, ছাত্র, যুবক, শিক্ষক, পেশাজীবী, শিল্পী, বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বুর্জোয়া মানুষ আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং তাদের অনেকেই মার্কসবাদের দিকগুলো ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করেছিলেন। এবং তাদের সৃষ্টিগুলো সর্বহারা শ্রেণির লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিলো।
মনে রাখা দরকার বাংলা কবিতায় চল্লিশের দশকে এক ঝাঁক কবি সমাজ বাস্তবতা ও মার্কসীয় চেতনায় সম্পন্ন হয়ে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। বাংলা কবিতা এবং সামগ্রিকভাবে সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পাথেয় করে লিখতে শুরু করেছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, বিমলচন্দ্র ঘোষ, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, দিনেশ দাস, সমর সেন, সুকান্ত ভট্টাচার্য, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সরোজ দত্ত, ফররুখ আহমেদ, গোলাম কুদ্দুস, রাম বসু, বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায়, কিরণশংকর সেনগুপ্ত, মণীন্দ্র রায়, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশংকর রায় প্রমুখ। আরও অজস্র কবির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল এই সময়ে। এদের অনেকেই হয়তো লিখতে শুরু করেছিলেন বিশ-তিরিশের দশকে। কিন্তু এদের কবি প্রতিভার বিস্ফোরণ ঘটতে লক্ষ্য করা যায় এই সময়েই সবচেয়ে প্রবলভাবে। কয়েকটি মাত্র নাম উল্লেখ করা হল এই কারণে যে বাংলা কবিতার সৃজনভূমিতে এরা দীর্ঘ সময় কবিতা চর্চা করেছেন এবং নানাভাবে বাংলা কবিতা তাদের সৃজনে সমৃদ্ধ হয়েছে। অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন কবিদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে নিজেদের পথ বদল করেছিলেন, কেউবা অল্প দিনের মধ্যেই কলম থামিয়ে দিয়ে সাহিত্যের অন্য মাঠে পদচারণা করেছেন। চল্লিশের দশকে আত্মপ্রকাশ করে চল্লিশের দশকেই আকস্মিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন অথচ যার আজও উজ্জ্বল উপস্থিতি প্রতিমুহূর্তে অনুভব করা যায় একজন মাত্র কবির কবিতাতেই, তিনি অকাল প্রয়াত সুকান্ত ভট্টাচার্য। বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের আক্ষেপ হয়ে থাকবেন কবি সুকান্ত। মাত্র ২০ বছর ৮ মাস কয়েকটা দিন বেঁচেছিলেন তিনি। কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে যখন তাঁর বয়স ১৪/১৫ বছর। হয়তো তার আগেও হাত মকসো করেছেন বালক বয়সে, বিশেষত বাড়ির দেওয়ালে, সাধারণ সাদা কাগজে সুযোগ পেলেই দু-চারটে পংক্তি লিখে ফেলতেন তিনি। যে অভ্যাস কতদিনের ছিল তা এখন আর জানার উপায় নেই। তবে তাঁর স্মৃতিচারণে বন্ধু অরুণাচল বসুর মা সরলা দেবী বলে লিখেছেন, দু'বছর বয়স থেকেই সুকান্ত নাকি গানের ছন্দে দোল খেতেন আপন মনে। অর্থাৎ ছন্দবোধ ছিল তার সহজাত। বাংলার মর্মান্তিক মন্বন্তর সম্ভবত তার কবি মানসেই সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অল্পসময়ের সাহিত্য জীবনে তিনি বোধনের মতো অসামান্য দীর্ঘ কবিতা, রানার, অভিমান গীতি-আলেখ্য, 'রবীন্দ্রনাথের প্রতি'র মতো প্রত্যয় দৃপ্ত কবিতা শুধু লিখেছিলেন না, নিজেকে সরাসরি আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তার নানা কবিতায় মন্বন্তরের কথা এসেছে, এসেছে প্রতিরোধ করার দৃঢ় প্রত্যয়ও। আর তার সাহিত্য জীবনের অন্যতম স্মরণীয় কাজটিও তিনি করেছিলেন বাংলার মন্বন্তরকে কেন্দ্র করে। আমাদের গভীর বেদনা ও দুঃখের কথা, মাত্র কয়েকটি দিনের জন্য কবি সুকান্ত তার নিজের প্রথম কবিতার সংকলন ছাড়পত্র নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাননি। সেই সময়ের মারণরোগ যক্ষ্মা তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল কয়েক দিন আগে। সেই সময় এখনকার মত আধুনিক মুদ্রণ ব্যবস্থা ছিল না, তাই দ্রুত ছাপার কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বাংলার আর এক অসামান্য প্রতিভা সাহিত্যিক সুকুমার রায়ও নিজের বই নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাননি।
সেদিক থেকে সুকান্তর সান্ত্বনা ছিল তিনি তাঁর সম্পাদিত একটি কবিতা সংকলন নিজের চোখে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। '৪৬-এর মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে লেখা তৎকালীন কবিদের কবিতা নিয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর সম্পাদনায় 'আকাল' কবিতা সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম ১৩৫১ বঙ্গাব্দে (১৯৪৪)। প্রথম সংস্করণেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, সংকলিত সমস্ত কবিতাই ১৩৫০ সালে রচিত এবং নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। সংকলক সুকান্ত সম্ভবত বয়সে সবচেয়ে তরুণ ছিলেন। সংকলিত কবিদের মধ্যে ছিলেন অরুণ মিত্র, বিষ্ণু দে, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব বসু, বিমলচন্দ্র ঘোষ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নবেন্দু রায়, মণীন্দ্র রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অমিয় চক্রবর্তী, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সমর সেন, অবন্তীকুমার সান্যাল, গোলাম কুদ্দুস এবং কিরণশংকর সেনগুপ্ত। কথা-মুখ বা প্রাসঙ্গিক ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং সংকলক কবি সুকান্ত। অনুমান করা যায় শিল্পী চিত্তপ্রসাদই এঁকেছিলেন অসামান্য দ্যুতিময় প্রচ্ছদটি। নির্মম ভয়ঙ্কর সেই ছবি, ভাতের হাঁড়ি ফেলে ভীত সন্ত্রস্ত পায়ে শিশু কোলে মা ছুটে চলেছেন। কবি সুকান্তর কবি প্রতিভার নানাদিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এখনও পত্রপত্রিকায় নতুন আলোচনা উঠে আসে কিন্তু তুলনামুলকভাবে তার সম্পাদনা দক্ষতার অন্যতম স্বাক্ষর বহনকারী 'আকাল' কবিতা সংকলন নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না কেন তা বলা মুশকিল। কিন্তু সম্পাদক হিসাবে মাত্র তিন ফর্মারও কম একটি কবিতা সংকলনেই সুকান্ত দেখিয়ে দিয়েছিলেন তার প্রতিভার অন্য আর একটি দিক। কৈশোর পার করার সমসময়ে কবি সুকান্তকে কমিউনিস্ট পার্টি তৎকালীন 'স্বাধীনতা' দৈনিক পত্রিকার কিশোর বিভাগ সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিল কেন তা তার সংকলন সম্পাদনার দিকে একটু নজর দিলেই অনুমান করা যায়। কবি সুকান্ত তার সংকলন সাজিয়ে ছিলেন প্রচলিত সব সাধারণ রীতি খারিজ করে পত্রিকায় প্রকাশের সময়কে মান্যতা দিয়ে। সুকান্ত সম্পাদিত আকাল বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ। শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখা অগণিত মানুষ ফিরে ফিরে দেখবেন অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তাদের জীবন সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
দুই
"কিশোর বাহিনী" এই নামটি সুকান্ত জীবনীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই সময়ে বাংলার বেশকিছু দৈনিক ও সাপ্তাহিক সংবাদ পত্রে কিশোর বিভাগ হিসেবে একটা বিভাগ থাকতো। যেখানে শিশু কিশোরদের জীবন গড়ার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক চিন্তার জগতের প্রতি আকর্ষিত করা হতো। সমাজ ও রাজনীতি থেকে দূরে থেকে আত্মচিন্তা পথে হাঁটার কৌশলী পরামর্শ থাকতো। কমিউনিস্ট পার্টি এটা লক্ষ্য করে এবং বাংলাদেশে ১৯৪৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে গঠিত হয় "কিশোর বাহিনী"।
৩১শে মার্চ, ১৯৪৩, জনযুদ্ধ পত্রিকার সম্পাদক বললেন, "ছোটদের জন্য লেখা চাই ও খবর চাই, ছেলেমেয়েদের অবদান কম নয়। তাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনাকে সংগঠনের রূপ দিতে হবে। ১৪ এপ্রিল ১০৪৩, অর্থাৎ বাংলা নববর্ষের দিন, কিশোর বাহিনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় কলকাতার Indian Association Hall-এ। এ'র বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় ২১ এপ্রিলের জনযুদ্ধ পত্রিকায়। সমাবেশে উপস্থিত ৩০০ জনের অধিকাংশই ছিল কিশোর। তারাই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করে। খ্যাতনামা সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ও কম্যুনিস্ট নেতা সোমনাথ লাহিড়ী উৎসাহদায়ক ভাষণ দেন। ছাত্র নেতা অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য প্রথমে কিশোর বাহিনীর দায়িত্বে থাকলেও, তিনি ছাত্র ফ্রন্টের দায়িত্ব নেওয়াতে কিশোর বাহিনী নেতা হিসেবে তার স্থান নিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকায় ছোটদের জন্য একটি আলাদা বিভাগ খোলা হয়- 'কিশোর সভা' নামে। চালাতেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। এপ্রিল ২৮, '৪৬-এর স্বাধীনতার শেষ পাতার প্রায় অর্ধেক জুড়ে এই বিভাগের সূচনা। এখানে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলির বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলেও কিশোর বাহিনী ছড়িয়ে পড়েছিল, সবচেয়ে লক্ষণীয়ভাবে উত্তর কলকাতায়। শাখাগুলির মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় ছিল শ্যামবাজার শাখা, যার ঠিকানা ১৩/১ বলরাম ঘোষ স্ট্রীট, কমল বসুর বাড়ি। খেলাধুলো, সংস্কৃতি ও সেবামূলক কাজে এই শাখা ছিল সবার সেরা। দেখাশোনা করতেন সুকান্ত স্বয়ং। তাকে সাহায্য করতেন আরতি পাকরাশী। জনযুদ্ধ পত্রিকায় সুকান্ত অনেক গল্প লিখেছিলেন কিশোর বাহিনীর আদর্শে ছোটদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য। যেমন 'কিশোরের স্বপ্ন' (৬ই অক্টোবর '৪৩)- দেশমাতা বাংলাদেশ স্বপ্নে দেখা দেন কিশোর জয়দ্রথকে এবং তার কাছে নিজের দুঃখকাহিনী বিবৃত করেন। আগস্ট আন্দোলন ও জাপানী আক্রমণে তার দেহ রক্তাক্ত ও বস্ত্র শতছিন্ন, পঞ্চাশের মন্বন্তরে তার শরীর কৃশ। তার বড় ছেলেরা তো মন্ত্রী হবার স্বপ্নেই মশগুল। তাই তিনি চান, ছোটরাই কিষাণ-মজুর ভাইদের সহায়তায় তাঁর দুঃখ দূর করুক। কিশোরদের জন্য সুকান্তর 'হরতাল' বইয়ের গল্পগুলি সরস ভঙ্গিতে ও জমাট গল্পরসে চমৎকার। 'হরতাল' গল্পে রেলের ইঞ্জিন, লাইন, ঘণ্টা, সিগনালরা মানুষের দেখাদেখি শোষণের প্রতিকারে হরতাল করতে চায়। 'যাঁড়-গাধা-ছাগলের কথায়' এই তিনটি প্রাণী তাদের মনিবের অত্যাচার থেকে বাঁচার পথ খোঁজে। 'দেবতাদের ভয়' মানুষ নাকি অ্যাটম বোমা ফেলে স্বর্গ অধিকার করতে ঘ। ইন্দ্রের বজ্রও সে মারণাস্ত্রের কাছে এ'টে উঠবে না। বিশ্বকর্মা বলেই দিয়েছেন, তার সেকেলে অস্ত্রশস্ত্র আর কম মাইনের খাটুনি দিয়ে ওরকম অস্ত্র তৈরী করতে পারবেন না। আর দেবতাদের যখন নিতান্ত অসহায় অবস্থা তখন মানুষ ওদিকে নিজেদের একটা স্বর্গ বানিয়ে ফেলেছে- সোভিয়েট রাশিয়া। শেষ পর্যন্ত মানুষকে দাবিয়ে রাখার একটাই উপায় পাওয়া গেল। ইন্দ্রের নির্দেশে নারদ পৃথিবীতে গেলেন মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের বীজ ঢোকাতে চায়। (গল্পটি স্বাধীনতার কিশোর সভায় বের হয় ১৩ই আগস্ট '৪৬-এ) যদিও সুকান্তর মৃত্যুর পর ও কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষণা ইত্যাদি কারণে কিশোর বাহিনী উঠে যায়।
তিন)
সুকান্ত কবিতা আলোচনার পরিসর এখানে নেই। তাকে অনেকেই কিশোর কবি বা তার কবিতাকে স্লোগানধর্মী বলে উদ্দেশ্যমূলক ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সুকান্তর কবিতা পড়লে দেখা যায় তার শব্দ চয়ন, ছন্দ, গঠনশৈলী যেমন পরিণত তেমনি নান্দনিক।
কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত একটি লেখায় বলেছেন যে "তার কোনো শৈশব ছিল না, চারপাশে ঘটে চলা জাতীয়-আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি তাকে অতি দ্রুত পরিণত করে তুলেছিল। সুকান্তর কবিতা তাই বিশ্ববোধ ও জীবনবোধে জারিত। তার শেষদিকের কবিতার সরাসরি অভিঘাত সেইসময়ের যুবমানসে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন তুলেছিল। আজও তোলে।
তাই হয়তো রবীন্দ্রনাথ তার ঐকতান কবিতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছিলেন সুকান্ত।
"জীবনে জীবন যোগ করা
না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।
তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা
আমার সুরের অপূর্ণতা।
আমার কবিতা, জানি আমি,
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।
কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,
কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,
যে আছে মাটির কাছাকাছি,
সে কবির-বাণী-লাগি কান পেতে আছি।"
প্রসঙ্গত যে তিনজন কবি বাংলার মানুষের জীবন সংগ্রামের সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত তারা হলেন— রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্ত। কিন্তু কবি সুকান্তের কবিতার মর্মবস্তুতে ছিলো শ্রেণি-চেতনা ও গণবিপ্লবের সুর। সংগ্রামী মানুষ ও যুবসমাজের প্রতি সচেতন আহ্বান তথা প্রেরণা। এদের কবিতা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পংক্তি লক্ষ্য করলে সহজে বোঝা যাবে।
রবীন্দ্রনাথকে মানবতাবাদী কবি রূপেই পৃথিবী জানে, তিনি বলেন—
"আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে,
আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।
কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে,
বাঁশি সংগীতহারা, অমাবস্যার কারা
লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে,
তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে-
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ,
তুমি কি বেসেছ ভালো।"
মানবিক অনুভবন থেকে কবি অসহায়তার কথা ব্যক্ত করেছেন। এখানে সমাজ পরিবর্তনের কোন সুর নেই। আর মানবতা (Humanity) হলো মানুষের এমন একটি মহৎ গুণ যা ভালোবাসা, সহানুভূতি, করুণা, দয়া এবং পরোপকারের মতো মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে বোঝায়, যা মানুষকে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও কল্যাণকামী হতে শেখায় এবং নিষ্ঠুরতা বা পশুত্বের বিপরীত। এটি শুধু মানুষের বৈশিষ্ট্যই নয়, বরং এটি মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভিত্তি, যা মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে অন্যের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের শেষ কথাতো শ্রেণিসংগ্রাম। বিপ্লব। রবীন্দ্রনাথ এখানে যেতে চাননি।
আর বিদ্রোহী কবি নজরুল, তার কবিতাও একটা পর্যায় পর্যন্ত এগিয়েছে। যেমন তিনি তার বিদ্রোহী কবিতা বলেছেন—
"মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত,
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা
খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর -
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!"
এখানে বিদ্রোহী সত্তার জাগরণে আহ্বান আছে কিন্তু আমূল-পরিবর্তন বা বিপ্লবের ঝঙ্কার নেই। আর বিদ্রোহের একটা সীমাবদ্ধতা থাকে। 'বিদ্রোহ' (Revolt) অর্থ হলো— কোনো প্রতিষ্ঠিত শাসন, সামাজিক ব্যবস্থা, বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা সশস্ত্র অভ্যুত্থান, যা প্রতিরোধ, বিরোধিতা, বা প্রচলিত নিয়ম অগ্রাহ্য করার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যেমন ভারতের সিপাহী বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, বা সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিবাদ। এটি সাধারণত প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ থেকে জন্ম নেয় এবং প্রায়শই স্বাধীনতা বা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বহন করে। যে আকাঙ্ক্ষা নজরুলের কবিতায়।
এখানেই সুকান্তে স্বাতন্ত্র্যতা। সুকান্ত লিখলেন—
"শোন্ রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার!
তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়—
হিসাব কি দিবি তার?
প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা,
ভেঙেছিস ঘরবাড়ি,
সে কথা কি আমি জীবনে মরণে
কখনো ভুলতে পারি?
আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবই।
শোন্ রে মজুতদার,
ফসল ফলানো মাটিতে রোপণ
করব তোকে এবার।
…………..............
আজ আর বিমূঢ় আস্ফালন নয়,
দিগন্তে প্রত্যাসন্ন সর্বনাশের ঝড়;
আজকের নৈঃশব্দ হোক যুদ্ধারম্ভের স্বীকৃতি।
দু হাতে বাজাও প্রতিশোধের উন্মত্ত দামামা,
প্রার্থনা করো:
হে জীবন, হে যুগ-সন্ধিকালের চেতনা—
আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি,
প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের
তুষার-গলানো উত্তাপ।
টুকরো টুকরো ক'রে ছেঁড়ো তোমার
অন্যায় আর ভীরুতার কলঙ্কিত কাহিনি।
শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে
একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।"
এখানে উচ্চারিত হয়েছে শ্রেণি সংগ্রাম (Class Struggle) শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণির মধ্যেকার সংঘাত। যা মার্কসীয় তত্ত্বের কেন্দ্রীয় ধারণা, যেখানে বুর্জোয়া (পুঁজির মালিক) ও সর্বহারা (শ্রমিক) শ্রেণির স্বার্থের সংঘাতের মাধ্যমে সমাজের বিকাশ ঘটে এবং এটিই ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি। এই সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণি তাদের ন্যায্য অধিকার, মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশের জন্য লড়াই করে, যা শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমাজ আমূল পরিবর্তনে এক নিরন্তর সংগ্রাম ও বিপ্লব সংঘটিত করে।
সুকান্তর কবিতায় কোনো অস্পষ্টতা নেই, প্রত্যক্ষ ও তীক্ষ্ণ এই ঘোষণা। নতুন সময় তো নতুন ধারার জন্ম দেবেই। তার কবিতার ভাষায়—
"ভারতবর্ষের ’পরে গলিত সূর্য ঝরে আজ—
দিগ্বিদিকে উঠেছে আওয়াজ,
রক্তে আনাে লাল,
রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনাে ফুটন্ত সকাল।”