তপন সিংহের চলচ্চিত্রে দেশ কাল রাজনীতি
- 07 November, 2026
- লেখক: লিপিকা ঘোষ
১
আর্ট ফিল্ম আর বাণিজ্যিক ছবিকে আলাদা দুই গোত্রে ফেলে সিনেমার আলোচনার প্রচলিত কাঠামোটা অনেক পরিচালকের ক্ষেত্রে এসে বেশ খানিকটা ধূসর হয়ে যায়। কোনও কোনও পরিচালক সিনেমার নান্দনিকতার শীর্ষবিন্দু আর বক্স অফিসের সাফল্যকে একইসঙ্গে স্পর্শ করতে পারেন। তবে এইরকম পরিচালকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। বাঙালি দর্শকের সৌভাগ্য পরিচালক তপন সিংহের মধ্যে সে এই দুই দিকের এক বিরল সমন্বয় প্রত্যক্ষ করেছে।
তপন সিংহের ছোটবেলা কেটেছে ভাগলপুরে। পরাধীন ভারতের সেই দিনগুলিতে আরো হাজার হাজার শিশু কিশোরের মতো তিনিও তাঁর কাঁচা মনটি নিয়ে স্বাদেশিকতার মন্ত্রে প্রবলভাবে উজ্জীবিত হয়েছিলেন। ক্লাস সিক্সে পড়াকালীন গান্ধিজিকে দেখতে গিয়ে পাঁজরের হাড় ভেঙেছিলেন বালক তপন। তখন কলকাতায় এসে তিন মাস চিকিত্সা করাতে হয়। পাকাপাকিভাবে কলকাতায় এলেন অবশ্য আরো পরে। ১৯৪৩ সালে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হবার পর। ১৯৪৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর পাশ করার পরেই নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে তপন সিংহ সহকারী শব্দ গ্রাহক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই বিষয়ে তাঁর দক্ষতা আরো বাড়ে ১৯৫০ সালে দু’ বছরের জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে পাইনউড স্টুডিওতে শব্দ গ্রাহকের কাজ করার সময়ে। ইংলণ্ডে থাকাকালীন সময়ে তিনি বহু বিদেশী ছবি দেখেন ও সেখানকার চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে পরিচিত হন। ছেলেবেলায় স্কুলের ছাত্র থাকার সময়ে এক শিক্ষকের কথা শুনে ডিকেন্সের বিখ্যাত উপন্যাস ‘এ টেল অফ টু সিটিজ’ অবলম্বনে নির্মিত একটি ছবি দেখতে গিয়েছিলেন তপন সিংহ। হয়ত সেই ছবি দেখেই তাঁর প্রথম মনে হয় ভালো ছবি বানাতে গেলে ভালো গল্প চাই। সিনেমা বানাতে হবে মহৎ সাহিত্যকে অবলম্বন করে। এই ভাবনাই প্রসারিত হল ইংলণ্ডে পেশাদার চলচ্চিত্রকুশলী হিসেবে কাজ করতে করতে ও নানা ধরনের ছবি দেখতে দেখতে।
তপন সিংহ বিখ্যাত সাহিত্যিকদের গল্পকে তাঁর ছবির বিষয়বস্তু করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, সমরেশ বসু, তারাপদ রায়চৌধুরী, শঙ্কর, শীর্ষেন্দু মুখ্যোপাধ্যায় প্রমুখদের গল্প নিয়ে তিনি ছবি করেছেন। তবে তপন সিংহ মানেই শুধু সাহিত্য নির্ভর সিনেমা নয়। সমকালীন আলোড়নতোলা ঘটনাবলী, যা সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসছে, তাও তাঁর ছবির অবলম্বন হয়েছে। খবরের কাগজ থেকে খবর সংগ্রহ করে তা নিয়ে করেছেন আদালত ও একটি মেয়ে, এক ডক্টর কি মউত, অন্তর্ধান, হুইলচেয়ারের মত অনেক ছবি। দেশ কিংবা সমাজকে যেভাবে দেখেছেন সেভাবেই ছবিতে তুলে ধরে সমালোচনা করেছেন। হাল্কা মেজাজের সামাজিক ছবি বা শিশু- কিশোরের ছবির পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে এমন ছবি করেছেন যা দুর্নীতির গালে সপাটে চড় বসিয়েছে। এর জন্য তাঁকে ভুগতেও হয়েছে বারবার। শুটিংয়ের মাঝখানে ছবি বন্ধ করার হুমকিও পেয়েছেন, বিরাগভাজন হয়েছেন তথাকথিত বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। একাধিকবার অসুবিধায় পড়েছেন তবু দমে যাননি বাংলা চলচ্চিত্রের এই সিংহপুরুষ। তিনি ছবির মধ্য দিয়ে দেখাতে চেয়েছিলেন সমাজের জমে থাকা জঞ্জালকে, দেখাতে চেয়েছিলেন দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে, যুব সমাজের অবক্ষয়কে, মেয়েদের অসহায়তাকে।
২
পরিচালক তপন সিংহের কাহিনিচিত্রের বিষয়বৈচিত্র লক্ষ্য করার মত। এ ক্ষেত্রে তিনি তাঁর প্রিয় পরিচালক হলিউডের বিলি ওয়াইলার ও জন ফোর্ডের সিনেমা দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। ওয়াইলারের ছবিতেও বিষয় বৈচিত্র লক্ষ্য করার মত, তিনি একবার বাইবেল নিয়ে ‘বেন হার’ ছবি করেছেন তো পরেরবার রোমান্টিক ছবি ‘রোমান হলিডে’ করেছেন, মার্কিন কথা সাহিত্য নিয়ে ছবি করার পাশাপাশি করেছেন যুদ্ধফেরত সৈনিকের জীবনী নিয়ে ‘দ্য বেস্ট ইয়ারস অফ আওয়ার লাইভস’। আর মার্কিন পরিচালক জন ফোর্ডও কখনো অফবিট মিলেটারি কমেডি করেছেন তো কখনো রোমান্স এডভেঞ্চার। ফোর্ড, ওয়াইলারের মত তপন সিংহও অভিনেতাদের কাছ থেকে অভিনয় টেনে বার করতেন আর দৃশ্যকে আকর্ষণীয় করতে নিখুঁত দৃশ্যগ্রহণে মনোনিবেশ করতেন। সে কারণে তাঁর ছবিতে কাজ করতে আসার আগে রীতিমত প্রস্তুতি নিয়ে আসতেন উত্তমকুমার, অশোককুমার, দিলীপকুমার, মনোজ মিত্রের মত বিশিষ্ট অভিনেতারাও। তাঁর ছবিতে বিষয়ের ভিন্নতা থাকলেও তাঁর মূল বক্তব্য থেকে তিনি কখনো সরে যাননি। তিনি ছবির মধ্য দিয়ে এক বৃহত্তর জীবনদর্শনে পৌঁছাতে চেয়েছেন। সেকারণেই তৈরি করেন হাটে বাজারে, আপনজন, রাজা, সাগিনা মাহাতো, আঁধার পেরিয়ে, আতঙ্ক, অন্তর্ধান, হুইলচায়ারের মত ছবি।
তাঁর ছবিতে দৃশ্যগ্রহণ ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে তিনি প্রযুক্তিবিদ্যার সঙ্গে নান্দনিকতাকেও বেঁধেছিলেন। তিনি সব সময় ছবির প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি বিদ্যার প্রয়োগ করেছেন। গল্প হলেও সত্যি ছবির শেষ দৃশ্য, যেখানে হঠাৎ উদয় হওয়া চাকর ধনঞ্জয় ভোরের আলো আধারে মিলিয়ে যায় সেখানে দর্শক মনে এক রহস্যময় অনুপম আবেগ সঞ্চারিত হয়। ছবির দশ্যগ্রহণে প্রযুক্তি ও নান্দনিকতার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি ফেদেরিকো ফেলিনি, ইঙ্গমার বার্গম্যান, আন্তোনিওনি প্রমুখ জগৎবিখ্যাত পরিচালকদের কাজের ধারাকে বিশেষ পছন্দ করতেন। তাঁর ছবির দৃশ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে সাদা কালো ছবিগুলি ছিল অনন্য। হাঁসুলিবাঁকের উপকথা, ঝিন্দের বন্দী, সাগিনা মাহাতো, হাটে বাজারে, বৈদুর্যের রহস্য ছবির আলোর কাজ, লম্বা দৃশ্য গ্রহণ, ক্যামেরার কাজ ছিল অনন্য। পরের দিকের আতঙ্ক, অন্তর্ধান ছবিগুলিতে পাওয়া যায় না। এর জন্য অবশ্যই ক্যামেরাম্যানের দক্ষতার প্রয়োজন হয়। তাঁর প্রথম দিকের ক্যামেরাম্যান বিমল মুখোপাধ্যায় ছিলেন এ বিষয়ে দক্ষ, পরের দিকে তিনি যাঁর অভাব বোধ করেছেন।
তপন সিংহের সিনেমার প্রযুক্তিগত অসামান্যতা নিয়ে কথা বলতে গেলে বিশেষভাবে বলতেই হয় ১৯৬২ সালে নির্মিত হাঁসুলি বাঁকের উপকথা সিনেমার পাল্কীর গানের দৃশ্যটির কথা।
https://www.youtube.com/watch?v=rDFtWqHGAFA
এই গানের দৃশ্যে এক মিনিট সতেরো সেকেণ্ডের একটি অবিচ্ছিন্ন শট আছে। সেই সময়ের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এটি তুলতে কতখানি সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তি জ্ঞানের দরকার, তা যে কোনও সিনেমাবোদ্ধাই বুঝবেন।
৩
এবার আসা যাক তপন সিংহ নির্মিত কিছু বিখ্যাত ছবির আলোচনায়।
বনফুলের গল্প নিয়ে তৈরি হাটে বাজারে ছবিতে দেখিয়েছেন সীমিত ক্ষমতা নিয়ে মানুষের মঙ্গল করতে চাওয়া এক ডাক্তার অসুস্থ সমাজের চিকিত্সা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। যেন সমাজের লাম্পট্যের কাছে মাথা নিচু করেছে এক প্রতিবাদ। রমাপদ চৌধুরীর গল্প নিয়ে ‘এখনই’ ছবিতেও দেশের যুব সমাজের দুরাবস্থা, বলা ভালো বেকারত্বের সমুদ্রে অনির্দিষ্টের দিকে ভেসে চলা যুব সমাজকে দেখিয়েছেন। আবার ‘রাজা’ ছবিতে মূল কাহিনির সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার খবর থেকে উপকাহিনি জুড়ে দিয়ে কৌশলে দেখালেন সমাজের রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষের মূল্যবোধ কমছে, সমাজের তরুণীরা লালসার শিকার হচ্ছে, দেশে যৌনপল্লীতে মেয়েদের সংখ্যা বাড়ছে। আবার এক যে ছিল দেশে নতুন আবিষ্কৃত ওষুধের দ্বারা সত্যকে সামনে এনে মেকি সভ্যতার আসল চেহারা তুলে ধরতে চেয়েছেন।
ডাক্তার সুভাষ মুখার্জির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর রমাপদ চৌধুরীর গল্প অভিমন্যু নিয়ে ছবি করলেন এক ডক্টর কি মউত। এই সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের প্রথম বিজ্ঞানী, যাঁর গবেষণার ফলে ১৯৭৮ সালের ৩ অক্টোবর নলজাতক শিশুর জন্ম হয়। শুধু তাইই নয় বিশ্বের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বিজ্ঞানী যিনি এই বিষয়ে সফল হয়েছিলেন। ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক পেত্রিক স্টেপটো, রবার্ট জিওফ্রি এডওয়ারসের গবেষণায় বিশ্বের প্রথম নলজাতক শিশুর জন্ম হয়। এর ঠিক ৬৭ দিন পরেই ভারতে তাঁর গবেষণায় নলজাতক শিশু দুর্গার জন্ম হয়। তিনি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে তাঁর গবেষণা সম্পর্কে বক্তৃতা দিতে চাইলে তত্কালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাধা দেয়। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গঠিত সাস্থ্য দপ্তর তাঁর গবেষণা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে এক তদন্ত কমিটি গঠণ করে, যে কমিটি তার সমস্ত গবেষণাকে মিথ্যে বলে রায় দেয়। শাস্তি স্বরূপ তাঁকে অন্যত্র চক্ষুবিভাগে পাঠিয়ে দেয় যাতে প্রজননবিদ্যা নিয়ে তিনি কাজ করতে না পারেন। এখানেই শেষ হয়নি। তাকে তার কাজের জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ ও অপমান করা হয়েছে যা সহ্য করতে না পেরে ১৯৮১ সালে ১৯ জুন তিনি আত্মহত্যা করেন। পরিচালক দেখালেন উদ্ধত ক্ষমতা কীভাবে এক গবেষককে মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। তপন সিংহ ডক্টর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর প্রতিবাদ করেছিলেন এই ছবির মধ্য দিয়ে। আঙুল তুলে দেখালেন আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে ইতালির ক্ষমতাশালীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর যে পরিণতি করেছিল সেই একই অপরাধ আজও আমাদের দেশ করে চলেছে।
ষাটের দশকে একদিকে যেমন ভিয়েতনামের যুদ্ধ, ফ্রান্সের ছাত্র- আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল কলকাতার যুব সমাজে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাককাল, পশ্চিম বাংলায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের সূচনাকাল যুবসমাজকে উদ্ভ্রান্ত করে রেখেছিল। দেশের খাদ্য সংকট, ছাত্র- আন্দোলন, বেকারত্বের প্রাবল্য, যুব সমাজের অবক্ষয় পরিচালককে বিচলিত করেছিল। তারই প্রভাব পড়েছে তাঁর ছবিতে। ‘আপনজন’এর মূল কাহিনির সঙ্গে যোগ করেছেন নিজের চোখে দেখা যুবসমাজের অবক্ষয়ের কথা। খুঁজেছেন এর কারণ। ছবিতে দেখালেন রবি ও ছেনোর দলের মধ্যে বিরোধ বাধিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক নেতারা তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করেছে। বেকার যুবকরা যাতে নিজেদের কর্মের অধিকারের দাবি ভুলে থাকে, গঠনমূলক কাজে যুক্ত না হয় তার জন্য তাদেরকে কৌশলে সমাজবিরোধী কাজে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন কি তপন সিংহকে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলকে দোষারোপ করতে চেয়েছেন কি না। এর দু’ দশক পরে তিনি তৈরি করেছেন আতঙ্ক ছবি, তাতে এরই সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে শিক্ষিত সমাজের অসহায়তা। সেখানে একটি খুনের সাক্ষী শিক্ষককে তার ছাত্র অন্যায় দেখেও নীরব থাকতে বলেছে, ‘মাস্টার মশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি’। যখন আপসোস করে মাস্টার মশাই বলেন, “আমি তখন মেট্রোপলিটনে পড়াই, তোমার মা আমার কাছে তোমায় নিয়ে এলেন কত আশা নিয়ে”। পরক্ষণেই অসহায় মাস্টার মশাই বলেছেন, “আমি নিজেই জানিনা আমি কী করব!” মাস্টার মশাইয়ের মেয়ের মুখে দুষ্কৃতিরা অ্যাসিড ঢেলে দিলেও শিক্ষক তার কর্তব্য করে যায়- “বৃ্দ্ধ মাস্টারমশাই ক্ষত বিক্ষত দেহ মন নিয়ে আজও শুভেন্দুকে পড়াচ্ছে”।
আমাদের দেশে ভবিষ্যতে মেয়েদের কী পরিণতি হতে পারে তা অনুমান করেছিলেন সমাজবিরোধীদের দাপট দেখে, তাই-ই দেখিয়েছিলেন ‘আতঙ্ক’ ছবিতে। তিনি বুঝিয়েছিলেন ‘শিকারী কীট সোনার ধানে’ কামড় বসিয়েছে। যে পরিণতির কথা ছবিতে দেখিয়েছেন তা পশ্চিমবঙ্গের তত্কালীন রাজনীতিবিদরা মেনে নিতে না চাইলেও পরবর্তীতে তা ঘটেছে, প্রমাণ হয়েছে পরিচালকের দূরদর্শিতা। এ ছবি দুটি করার কারণেও তিনি কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরাগ ভাজন হয়ে উঠেছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে গৌরকিশোর ঘোষের ‘সাগিনা মাহাতো’ গল্প নিয়ে ষাটের দশকে ছবি করলেন। ১৯৪২-৪৩ সালের শ্রমিক আন্দোলন ও শিলিগুড়ির একটি কারখানার শ্রমিক আন্দোলনের নেতা নেতা সাগিনা মাহাতোর সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্প লেখেন গৌরকিশোর ঘোষ। সাগিনা শ্রমিকের অধিকার নিয়ে লড়াই করতে চেয়েছে। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এক পার্টির নেতা অনুপম দত্ত তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল। শ্রমিকদের জন্য কাজ করতে উদ্যোগী হয়। সাগিনাকে দলের শ্রমিক সংগঠনের সর্বভারতীয় নেতা করতে চাইলে ক্ষমতালোভী, একরোখা, চক্রান্তকারী অনিরুদ্ধ আপত্তি করে। পরে অনিরুদ্ধ সাগিনাকে ব্যবহার করে এগিয়ে যেতে চায়। সে সাগিনাকে ওয়েলফেয়ার অফিসার বানিয়ে নিজে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হতে চায়। কিন্তু ধীরে ধীরে অনিরুদ্ধর মত জনদরদীর মুখোশ পরা কুচক্রী নেতার পাল্লায় পরে সাগিনা শ্রমিকদের জন্য কাজ করতে গিয়ে নিজের সমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অথচ অনিরুদ্ধের মুখে কয়েকশো মানুষের মুখের আহার জোগানো কারখানাকে ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেবার কথা শুনে প্রতিবাদ করে সাগিনা। গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী, জনগণের মঙ্গলকামীর মুখোশ পরা নেতার পাকচক্রে ডুবে যায় সাগিনার মত আরো অনেক সাধারণ মানুষের সহজ জীবন। এ ছবিতে অনুরুদ্ধর মত রাজনৈতিক নেতাদের তুলে ধরা হয়েছে যারা ক্ষমতার লোভে দলে এসে তত্ত্বকথাসম আদর্শের কথা বলে দলকে অগ্রাহ্য করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করে। ক্ষমতায় এসে একনায়কতন্ত্র চালায়, মানুষের কথা ভুলে যায়। ছবি বলছে এই অনিরুদ্ধ শুধু কমিউনিস্ট পার্টিতে নয়, যে কোনো রাজনৈতিক দলেই থাকতে পারে, যারা মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বললেও কাজে সাম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠে। সে অর্থে সাগিনা মাহাতো ছবি গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী সমাজবাদী দলগুলিকে সতর্ক করে যেখানে এখনো লুকিয়ে আছে ক্ষমতালোভী স্বার্থান্বেষীর দল। তাদের হাতে ক্ষমতা এলে যে বিপদজনক হতে পারে দেশ এমন কি বিশ্বও সে বিষয়ে সতর্ক করে। তাই ছবির শেষে আর এক নেতা অমল অনিরুদ্ধকে ‘ডিক্টেটর’ বলে সম্বোধন করেছে। বলেছে ‘আজ বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধ তা শুধু তোমারই মত ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে’। পরিচালক তপন সিংহের রাজনীতি নিয়ে ছবি করায় অনীহা থাকলেও ষাটের দশকের শেষে এই ছবিটি করতে রাজি হয়ে যান। ছবির কাজ শেষ না হতেই রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে হুমকি এসেছে। কমিউনিষ্ট পার্টির অনেকের কাছে অপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সেসব উপেক্ষা করে পরিচালক ছবি শেষ করেছেন। বহু বাধা পেরিয়ে ছবি মুক্তি পেয়েছে। ছবি মুক্তির পর অনেকে সিনেমা হলে দেখানোর বিরোধিতা করলেও বহু দর্শক বলেছেন- ‘তপন সিংহ ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্টের ভন্ডামির মুখোশটা খুলে দিয়েছেন’। দেখিয়েছেন কীভাবে “রাত্রির দূষিত রক্তে বিকলাঙ্গ দিনের প্রসবে আমাদের তন্দ্রা ভাঙ্গে”।
‘আদালত ও একটি মেয়ে’ ছবিতে দেখিয়েছেন শুধু দুর্বৃত্তের দ্বারাই মেয়েরা ধর্ষিত হয়না, সুবিচার চাইতে গিয়েও আমাদের সমাজ ও বিচারব্যবস্থার কাছে মেয়েরা বারবার ধর্ষিত হয়। যখন ভরা আদালতে ধর্ষণের বিচার হয় তখন মেয়েদের অনেক বেশি অপমান সহ্য করতে হয়। সেখানে তার সম্মান আরো বেশি বেয়াব্রু হয়, দীর্ঘমেয়াদী অপমানের যন্ত্রণা দেওয়া হয়।
তপন সিংহ ‘অন্তর্ধান’ ছবিটি করেন একটি মেয়ের নিরুদ্দেশ হওয়ার খবরকে ভিত্তি করে যে দুষ্টের পেতে রাখা ফাঁদে পা দিয়ে মেয়েটি হারিয়ে যায়। সমগ্র নারী সমাজের নিরাপত্তাহীনতা ধরা পড়েছে এই ছবিতে। নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া মেয়েকে খুঁজে পেতে বাবার লড়াই এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে। আবার তাঁর হুইলচেয়ার ছবিতে একটি ধর্ষণ ও তার ভয়াবহ পরিণতি দেখান হয়- ধর্ষিতার শরীরের নিম্নাঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে অত্যাচারে। সেই সঙ্গে এই ছবিতে অসীম মনোবলের অধিকারী এক প্রতিবন্ধী ডাক্তার লড়াই করেছে। হুইলচেয়ারে আশ্রয় নেওয়া সেই মেয়েটিকে সারিয়ে তোলার জন্য দুঃসাহসিক যুদ্ধ করেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী এই ডাক্তার।
বিশ্ববিখ্যাত কলম্বিয়ান সাহিত্যিক গার্সিয়া মার্কেসের ম্যাজিক রিয়ালিস্ট গল্পের ঢঙে নির্মিত ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবিতে তপন সিংহ বলতে চেয়েছেন, অন্তর্কলহ নয় মিলেমিশে কাজ করলেই সাফল্য আসে। এ ছবি একই সঙ্গে পারিবারিক এবং ভীষণভাবে রাজনৈতিক। যেন একই সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক সামাজিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ ও দিক নির্দেশ। এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, “আমার এ ছবি আধা বাস্তব আধা ফ্যান্টাসি। কস্টিউম, পরিবেশ, চরিত্রের মুখে সংলাপ এসব দেখে নিশচয় বুঝতে পারছ আমি হাল্কা চালে সিরিয়াস কিছু কথা বলতে চাইছি। বলতে চাইছি কমিউনিটি ড্রাইভের কথা, যেটা সারা পৃথিবীতে আছে, ভারতবর্ষে নেই। বলতে চাইছি মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ হলে কী না পারে অশুভ শক্তির মোকাবিলা তো তখন সঙ্ঘবদ্ধ মানুষের কাছে তুচ্ছ কাজ!”
পরিচালক তপন সিংহের বেশিরভাগ ছবিতে রয়েছে সমাজের একজোট হওয়া দুর্নীতিগ্রস্থ মানুষের বিরুদ্ধে একজন সৎ প্রতিবাদী ব্যক্তির একার লড়াইয়ের কথা। সে ডাক্তার হোক বা অধ্যাপক, পুলিশ অফিসার হোক বা শিক্ষক। তপন সিংহের ছোটবেলা থেকে বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহনের জীবনচর্চা যে তাঁর মধ্যে এই সাহস সঞ্চার করেছে তা বলাই বাহুল্য। এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, “আমি মানুষকে ভালোবাসি, মানবতায় বিশ্বাসী। তাই মানুষই আমার কাছে বড়ো। মানুষের মুল্যবোধকেই আমি অগ্রাধিকার দিতে পছন্দ করি সব থেকে বেশি। কাজেই পটভূমি সেখানে বড়ো নয়। আসল কথা আদর্শ, সৎ বা সুন্দর আদর্শ গ্রাম এবং শহর উভয়বিধ পরিবেশেই থাকতে পারে বা থাকা সম্ভব।” সেকারণেই হয়ত ‘এক ডক্টর কি মউত’ ছবিতে দীপঙ্কর ডাক্তারকে দিয়ে বলিয়েছেন, “ম্যায় দেশ বিদেশ নেহি মানতা সীমা, ম্যায় ইন্সান কো মানতাহু”।
৪
তপন সিংহ নির্মিত সিনেমার তালিকাটি এরকম – অঙ্কুশ (১৯৫৪), উপহার (১৯৫৫), টনসিল (১৯৫৬), কাবুলিয়ালা (১৯৫৭), লৌহকপাট (১৯৫৮), কালামাটি (১৯৫৮), ক্ষণিকের অতিথি (১৯৫৯), ক্ষুধিত পাষাণ (১৯৬০), ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১), হাঁসুলীবাঁকের উপকথা (১৯৬২), নির্জন সৈকতে (১৯৬৩), জতুগৃহ (১৯৬৪), আরোহী (১৯৬৪), অতিথি (১৯৬৫), গল্প হলেও সত্যি (১৯৬৬), হাটে বাজারে (১৯৬৭), আপনজন (১৯৬৮), সাগিনা মাহাতো (১৯৭০), এখনই (১৯৭১), জিন্দেগি জিন্দেগি (১৯৭২), সাগিনা, আঁধার পেরিয়ে (১৯৭৩), রাজা (১৯৭৫), হারমোনিয়াম (১৯৭৬), এক যে ছিল দেশ (১৯৭৭), সফেদ হাতি (১৯৭৮), সবুজ দ্বীপের রাজা (১৯৭৯), বাঞ্ছারামের বাগান (১৯৮০), আদালত ও একটি মেয়ে (১৯৮২), অভিমন্যু (১৯৮৩), আদমি ওউর অউরত (১৯৮৪), মানুষ, বৈদুর্য রহস্য (১৯৮৫), আতঙ্ক (১৯৮৬), আজ কা রবিন হুড (১৯৮৭), এক ডক্টর কি মউত (১৯৯১), অন্তর্ধান (১৯৯২), হুইলচেয়ার (১৯৯৪), শতাব্দীর কন্যা (১৯৯৬), আজব গাঁয়ের আজব কথা (১৯৯৮), আনোখা মোতি (২০০০)
এই বরেণ্য পরিচালক অসামান্য কাজের জন্য নানা পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে ১৯টি জাতীয় পুরস্কার, পদ্মশ্রী (১৯৯২), দেশিকোত্তম (১৯৯৯), দাদা সাহেব ফালকে (২০০৬)। তবে সবচেয়ে বড় পুরস্কার তিনি পেয়েছেন তাঁর দর্শকদের কাছ থেকে। তাঁরা দশকের পর দশক ধরে গ্রাম মফস্বল শহর সর্বত্র দলে দলে সিনেমাহলে ভিড় করেছে তাঁর ছবিগুলি দেখার জন্য। সাধারণ দর্শকের আনুকূল্য আর সিনেমা বোদ্ধাদের প্রশংসা একইসঙ্গে পাওয়া সহজ কথা নয়। তপন সিংহ বারবার তা পেয়েছেন এবং এর মধ্যে দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে সিনেমা নির্মাতা হিসেবে তাঁর অনন্যতা।