কাদম্বিনী বসু : প্রথম আলো

সে দেড়'শ বছরেরও বেশি পুরনোদিনের কথা। উনিশ শতকের অর্ধেক অতিক্রান্ত হয়েছে। একদিকে দেশে ব্রিটিশ শাসন একশ বছর পেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে দীর্ঘসময় ধরে বাংলার বুকে বয়ে চলেছে নবজাগরণের স্রোত। যে স্রোতের অন্যতম ধারাটি ছিল মেয়েদের শিক্ষার প্রসার। বিদ্যাসাগর মহাশয় ততদিনে জেলায় জেলায় মেয়েদের স্কুল তৈরি করেছেন। কিন্তু শতাব্দীর শেষ অর্ধে কিছু গোঁড়া হিন্দু প্রভাবশালী মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে সেই ধারার গতি রোধ করতে উঠে পড়ে লাগলেন। দীর্ঘদিন বেথুন স্কুল প্রাথমিক স্তরেই থেকে গেল। বড় মেয়েদের বাড়ির বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করা সামাজিকভাবে নিন্দনীয়। জেলার স্কুলগুলি ছাত্রী এবং অর্থের অভাবে একে একে বন্ধ হতে শুরু করল। অন্যদিকে আট বছর বয়সে মেয়ের বিয়েকে গৌরীদান, নয় বছরে পৃথ্বীদান এবং দশ বছরে মেয়ের বিয়ে দিলে অক্ষয় স্বর্গবাস বলে মহিমান্বিত করা হতো। এমন অবস্থায় 'মেয়েদের উচ্চশিক্ষা' ব্যাপারটা যে অকল্পনীয় তা বলাই বাহুল্য। ধর্মীয় কুসংস্কার ও সামাজিক বাধা নিষেধ কাঁটার মতো ছড়িয়ে রইল মেয়েদের চলার পথে।

ঠিক এমন একটা সময়ে বাংলার আকাশে যেন একটি একটি করে তারা ফুটে উঠল। বছরটা ছিল ১৮৬১ সাল। সে বছর জন্ম নিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। জন্ম নিলেন নীলরতন সরকার। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে হল রবির উদয়। রবীন্দ্রনাথের জন্মের ঠিক দুমাস পর কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে ভাগলপুরে আরও একটি তারা ফুটে উঠল। ভাগলপুর স্কুলের হেড মাস্টারমশায় ব্রজকিশোর বসুর কন্যা কাদম্বিনীর জন্ম হল। ব্রাহ্মধর্মে অনুরাগী এবং নারীশিক্ষায় উৎসাহী ব্রজকিশোর কন্যা কাদম্বিনীকে লেখাপড়া শেখাতে শুরু করলেন। প্রাথমিক শিক্ষার শেষে তেরো বছরের কাদম্বিনীকে কলকাতায় নিয়ে এলেন উচ্চশিক্ষার জন্য।

সে বছরই একদল তরুণ ব্রাহ্মনেতা মনমোহন ঘোষ, দুর্গামোহন দাশ, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী প্রমুখের উদ্যোগে বেনিয়াপুকুর লেনে গড়ে উঠেছিল 'হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়'। এই স্কুলটিই ছিল দেশে প্রথম মেয়েদের জন্য বোর্ডিং স্কুল। স্কুলটি নির্মাণ করার সময় তার পঠনপাঠন, সিলেবাস ইত্যাদি নিয়ে উক্ত দলটির সংঘাত হয়েছিল কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে। কেশব সেন নিজেও নারীশিক্ষার প্রসারে অগ্রগামী ভূমিকা নিয়েছিলেন কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন মেয়েদের মস্তিস্ক বিজ্ঞান বা গণিত পড়ার মত উপযুক্ত নয়। অতঃপর একটা নতুন মডেল স্কুল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল 'হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়'। ছাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন কাদম্বিনী বসু, দুর্গামোহন দাশের দুই কন্যা সরলা ও অবলা, ডঃ অন্নদাচরণ খাস্তগীরের কন্যা কুমুদিনী এবং দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর কন্যা বিধুমুখী। পঠনপাঠনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী। মেয়েদের দেখাশোনার দায়িত্বে মিস অ্যানেট অ্যাক্রয়েড নামের একজন ব্রিটিশ মহিলা। বছর তিনেক পর অ্যানেট ছেড়ে দিলে স্কুল বন্ধ হবার জোগাড় হয়। তবে এই শিক্ষাব্রতী মানুষগুলির চেষ্টায় বালিগঞ্জে স্কুলটিকে 'বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়' নামে পুনর্জীবন দেওয়া সম্ভব হয়। তবে সেও বেশিদিন চালানো যাচ্ছিল না অর্থের অভাবে। অন্যদিকে বেথুন স্কুলে তখন ছাত্রীর অভাব। ফলে স্কুলটিকে মিশিয়ে দেওয়া হয় বেথুন স্কুলের সঙ্গে। 'বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়' এর মেয়েরা ততদিনে তৈরি হয়েছে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষার জন্য। ছাত্রবৃত্তি পাশ করলে ইউনিভার্সিটি এনট্রান্স পরীক্ষা দেওয়ার ছাড়পত্র পাওয়া যায়। মেয়েরা বেথুন স্কুল থেকে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় বসল। সেবার পরীক্ষায় প্রথম হল কাদম্বিনী বসু এবং দ্বিতীয় সরলা দাশ।

এনট্রান্স পরীক্ষা দিতে গোল বাধল। কারণ ততদিন পর্যন্ত ছেলেরাই এনট্রান্স পরীক্ষা দিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার পেয়েছে। মেয়েদের তখন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার নেই। মাঠে নামলেন মাস্টারমশায় দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী। অনেক আবেদন নিবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যের সাহায্যে মেয়েদের এনট্রান্স পরীক্ষায় বসার অনুমতি আদায় করে ছাড়লেন। এরই মধ্যে সরলার বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ায় তার আর এন্ট্রান্সে বসা হল না। কাদম্বিনী একাই এনট্রান্স পরীক্ষায় বসলেন এবং দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হলেন। মাত্র এক নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগে স্থান পেলেন না।

কাদম্বিনী ভরতি হবেন এফ এ (ফার্স্ট আর্টস) ক্লাসে। কিন্তু মেয়েদের জন্য তো কলেজ নেই। একা কাদম্বিনীকে নিয়েই বেথুন স্কুলে কলেজের পাঠক্রম শুরু হল। দুবছর পর কাদম্বিনী এফ এ পরীক্ষায় পাশ করলেন। নিজেকে বিজ্ঞান শিক্ষার উপযুক্ত প্রমাণ করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারী পড়ার জন্য আবেদন করলেন। কলকাতা মেডিক্যাল কাউন্সিল তাতে সম্মতি দিল না।

কাদম্বিনী বেথুন কলেজে গ্রাজুয়েশন কোর্সে ভরতি হলেন। এবার অবশ্য ছাত্রী দুজন কাদম্বিনী এবং চন্দ্রমুখী বসু। কাদম্বিনীর সঙ্গে একই বছরে তিনি ফ্রি চার্চ ইন্সটিটিউট থেকে এফ এ পাশ করেছিলেন। এই ফ্রি চার্চ ইন্সটিটিউট পরবর্তী দিনে স্কটিশ চার্চ কলেজ নামে পরিচিত হয়। তিন বছর পর কাদম্বিনী বসু ও চন্দ্রমুখী বসু কৃতিত্বের সঙ্গে বি এ ডিগ্রী লাভ করে ইতিহাস রচনা করলেন। কাদম্বিনী অঙ্কে ও চন্দ্রমুখী রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হন। তাঁরা দুজন শুধু ভারতবর্ষে নয়, সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট। কারণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন স্নাতক স্তরে পড়ার অনুমতি ছিল না মেয়েদের। ব্রিটিশ মহিলারা বিলেতের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ছাড়পত্র পেয়েছিলেন কাদম্বিনীর একবছর পরে। কাজেই শুধু কাদম্বিনী বা চন্দ্রমুখী নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের পড়ার অনুমতি দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি ইতিহাস রচনা করে। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইতিহাস সৃষ্টি করে বেথুন স্কুলও।

স্নাতক হওয়ার পরও কাদম্বিনী ডাক্তারী পড়ার সংকল্পে অনড়। ১৮৮৩ সালে তিনি আবার মেডিক্যাল কলেজের দ্বারস্থ হলেন। কিন্তু কলকাতা মেডিক্যাল কাউন্সিল তখনও পর্যন্ত কোনও নারীকে ডাক্তারি পড়ার অনুমতি দেয় নি। একদিকে ছাত্রীর যেমন অদম্য জেদ তেমনই মাস্টারমশায় দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী। কাউন্সিলের কাছে নিরাশ হয়ে তিনি সরকারের কাছে ছুটলেন। তখন কলেজের নিয়ম ছিল বি এ পাশ করলেই যে কেউ বিনা খরচে ডাক্তারি পড়তে পারে। সেই যুক্তিতেই দ্বারকানাথ অসাধ্যসাধন করলেন। কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত বাতিল করে কাদম্বিনীকে মেডিকেল কলেজে ভরতির অনুমতি দিল সরকার। বিনা খরচেই শুধু নয় মাসিক কুড়িটাকা বৃত্তিসহ কাদম্বিনী মেডিক্যাল কলেজে ভরতি হলেন। সমাজে একটা রীতিমতো আলোড়ন তুলে কাদম্বিনী পা রাখলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে।

কলেজে রেজিস্ট্রেশনের ঠিক এগারো দিন আগে স্বইচ্ছায় বিয়ে করলেন মাস্টারমশায় দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে। বিপত্নীক দ্বারকানাথ দুই সন্তানের পিতা। তাঁর কন্যা বিধুমুখী প্রায় কাদম্বিনীর সমবয়সী এবং পুত্র সতীশ চিররুগ্ন। সেই সময়ের অসবর্ণ বিয়ে তার উপর মাস্টারমশায়- ছাত্রী সম্পর্ক। উপরন্তু পাত্র বয়সে ১৭-১৮ বছরের বড়। খবরের কাগজে সে বিয়ে নিয়ে অনেক লেখালেখি হল। হিন্দুসমাজ শুধু নয়, ব্রাহ্মসমাজেও সে বিয়ে অনেকেই মেনে নিতে পারলেন না। তার মধ্যে দ্বারকানাথের অনুরাগী শিবনাথ শাস্ত্রী বা আনন্দমোহন বসুর মতো লোকও ছিলেন। তাঁরা মনে করলেন কাদম্বিনীর মতো সম্ভবনাময়ী মেয়ের এগিয়ে যাওয়া বোধ হয় এখানেই শেষ হল।

মেডিক্যাল কলেজের দরজা কাদম্বিনীর জন্য খুলল ঠিকই কিন্তু পড়াশোনা করা সহজ হল না। পদে পদে বাধা। ডাক্তার অধ্যাপকদের মধ্যেও কাদম্বিনীর প্রতি তীব্র বিরোধী শিবির গড়ে উঠল। সে পথ কতখানি কণ্টকময় ছিল তা বোঝা যায় পরীক্ষার ফলাফলে। তিন বছরের শেষে ফার্স্ট এমবি পরীক্ষায় মেডিসিনে মাত্র এক নম্বরের জন্য কাদম্বিনী ফেল করলেন। এমবি অর্থাৎ ব্যাচিলার অফ মেডিসিন পড়া হল না তাঁর তবে এলএমএস অর্থাৎ লাইসেন্সিয়েট অফ মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি পড়ার অনুমতি দিল কলেজ। দুবছর পর ফাইনাল পরীক্ষায় আবার একই অধ্যাপকের হাতে কাদম্বিনী মেডিসিনে ফেল করলেন। অথচ ছাত্রী হিসেবে কাদম্বিনীর কী পরিমাণ নিষ্ঠা ছিল তা জানা যায় আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত 'দ্য লেডি উইথ দি ল্যাম্প' ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের একটি চিঠি থেকে। তিনি তাঁর এক ভারতীয় বন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, 'কে এই মিসেস গাঙ্গুলী, আমায় কিছু জানাতে পারো? সে নাকি এর মধ্যেই ফার্স্ট লাইসেন্সিয়েট ইন মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি পাশ করে ফেলেছে আর আগামী মার্চ মাসে ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। এই তরুণী বিয়ে করে ফেলেছে ডাক্তার হবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে। তারপর অন্তত একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছে, যদি না দুটি জন্মে থাকে। কিন্তু ছুটি নিয়েছিল মাত্র তেরোদিন, আর শুনছি নাকি একটিও লেকচার মিস করে নি।'

এই ফেল করা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। রিভিউ এর আবেদন করলেও তেমন ফল হল না। কারণ মেয়েমানুষ হয়ে ডাক্তারি করবে একথা যে অধ্যাপকরা মানতেন না তাঁরা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিলেন। তবে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ডঃ কোটস বুঝতে পেরেছিলেন কাদম্বিনীর উপর অবিচার হয়েছে। তিনি তাঁর বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে কাদম্বিনীকে 'গ্রাজুয়েট অফ দি মেডিক্যাল কলেজ অফ বেঙ্গল' ডিপ্লোমা প্রদান করলেন। কাদম্বিনী প্র্যাকটিস করার পূর্ণ অধিকার পেলেন এবং তিনি হলেন ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার পাশ্চাত্য শিক্ষাপ্রাপ্ত প্রথম দুজন মহিলা চিকিৎসকের একজন।

ডাক্তারি করার ছাড়পত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাদম্বিনী কেবলমাত্র মহিলা রোগীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ডাফরিন হাসপাতালে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে চাকরি পেলেন। সেই সময়ের তিনশ টাকা আজকের মুল্যে প্রায় পাঁচলক্ষের কাছাকাছি। এই চাকরি পেতে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গিলের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তবুও সেখানে কাজ করার অভিজ্ঞতা সুখকর হল না। ইউরোপিয়ান সহকর্মীরা কাদম্বিনীকে ডাক্তার বলে মানতেন না। তাঁকে রোগ নির্ণয় বা সার্জারি করতে দেওয়া হত না। তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেওয়া হত। তিনি বুঝতে পারলেন এভাবে চলতে থাকলে তিনি ডাক্তার হিসেবে কোনদিনই সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন না যাতে তিনি একদিন বড় ডাক্তার হয়ে উঠতে পারেন। স্বামীর পরামর্শে তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করলেন। ব্যাক্তিগত চেম্বারে রুগি দেখা ছাড়াও রাতবিরেতে কলে যেতেন। ঘোড়ার গাড়ি চেপে শহরের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে ছুটে যাওয়া মেয়েমানুষ ডাক্তারের এই দাপট সমাজের মাথাদের সহ্য হল না। কাজেই শুরু হল তাঁর চরিত্র হনন। খবরের কাগজে তাঁর পেশা নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিকর আর্টিকেল ও কার্টুন ছাপা হল। কাদম্বিনীও ছেড়ে দেবার পাত্রী নন। বঙ্গনিবাসী নামে তৎকালীন এক পত্রিকার সম্পাদকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে জয়লাভ করলেন তিনি। সেই সম্পাদকের ছয় মাসের জেল ও একশত টাকা জরিমানা হল।

সম্পাদকের শাস্তি হল বটে কিন্তু কাদম্বিনী বুঝতে পারলেন বিলেতের ডিগ্রি না থাকলে তাকে ডাক্তার হিসেবে সে সম্মান কেউ দেবে না। অতএব স্বামী দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর উদ্যোগে তিনি ইউরোপে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

১৮৯৩ সাল। বছরটা ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে। কারণ এক উজ্জ্বল বঙ্গসন্তান স্বামী বিবেকানন্দ সে বছর শিকাগোয় বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে ঝড় তুলবেন। সে বছরের গোড়াতেই কাদম্বিনী ইউরোপ পাড়ি দিলেন। বাড়িতে তাঁর পাঁচপাঁচটি শিশু সন্তান। সবচেয়ে যে ছোট তার বয়স মাত্র দেড় বছর। স্বামী দ্বারকানাথ ও স্বামীর প্রথম স্ত্রীর কন্যা বিধুমুখীর তত্ত্বাবধানে তাদের রেখে তিনি পথে নেমেছেন। যাত্রাপথেও তিনি একক। চারসপ্তাহের জাহাজযাত্রায় মাত্র দুজন মহিলাযাত্রী। একজন ইউরোপিয়ান আর অন্যজন কাদম্বিনী। লন্ডনে পৌঁছে অতি দ্রুত তিনি একটি ট্রিপল ডিপ্লমা কোর্সে ভরতি হলেন। অনেকটা 'গেলাম-দেখলাম-জয় করলাম' স্টাইলে তিন মাসের মধ্যে তিনি তিনখানি উপাধি অর্জন করলেন। Licentiate of the College of Physicians, Edinburg (LRCP), Licentiate of College of Surgeon Glasgow (LRCS) and Licentiate the Faculty of Physicians and Surgeons, Dublin (LFPS) |

এবার তিনি হলেন বিলিতি ডিগ্রীধারী প্রথম ভারতীয় পেশাদার মহিলা ডাক্তার। ডাফরিন হাসপাতাল তাঁকে সিনিয়ার ডাক্তারের পদে নিয়োগ করল। একবছরের মধ্যে ইডেন ফিমেল হাসপাতালে তিনি পেলেন ডক্টর ইন চার্জের পদ। এরপরই নিয়ম পরিবর্তন করে তাঁকে দেওয়া হল ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলে Professor of Gyneocology and Obstetrics (midwifery) এর পদ। ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলই পরবর্তী কালে পরিচিত হবে নীলরতন সরকার মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতাল নামে। আবার কাদম্বিনী প্রথম হলেন। চিকিৎসাবিদ্যায় প্রথম ভারতীয় মহিলা অধ্যাপিকা। অল্পদিনের মধ্যে তাঁর প্রাইভেট প্র্যাক্টিস এত জমে উঠল যে তিনি হাসপাতালের চাকরি ছেড়ে দিলেন।

মহিলা চিকিৎসক হিসেবে তাঁর প্রয়োজন উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল। ডঃ নীলরতন সরকার প্রমুখ সুবিখ্যাত চিকিৎসকদের সঙ্গে একসারিতে তাঁর নাম উচ্চারিত হল। তাঁর চিকিৎসক জীবনের দুটি উজ্জ্বল কীর্তির মধ্যে একটি নেপালের রাজমাতার চিকিৎসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করা। প্রসঙ্গত বলা যায় নেপালের রাজমাতার রোগমুক্তির পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন ২০০ কেজি রুপোর বাসন বর্তমানে যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা, হিরে বসানো সোনার মুকুট, একটি টাট্‌টু ঘোড়া এবং তার ছোটছেলের জন্য রাজপোশাক। অন্য কীর্তিটি হল, তাঁর বিশিষ্ট স্নেহভাজন নাতি সুকুমার রায়ের পুত্র সত্যজিৎ রায়কে পৃথিবীর আলো দেখানো। সত্যজিতের জন্ম হয় কাদম্বিনীর তত্ত্বাবধানে। তবে সে অনেক পরের কথা।

ডাক্তারির পাশাপাশি কাদম্বিনী ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক এবং সমাজসেবী। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় কংগ্রেসে নারী প্রতিনিধিত্বের দাবী তোলেন কাদম্বিনীর স্বামী দ্বারকানাথ। কাদম্বিনীর নেতৃত্বে ছয়জন মহিলা প্রতিনিধি কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। পরের বছর কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনে কাদম্বিনী ইংরাজীতে ভোট অফ থ্যাঙ্কস দেওয়ার দায়িত্ব পান। সে হিসেবে কাদম্বিনীই সমগ্র দেশে কংগ্রেস অধিবেশনের প্রথম নারী বক্তা। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীজির 'ট্রান্সভাল' সত্যাগ্রহের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে দেন। বঙ্গভঙ্গের সময় মহিলা সংগঠন গড়ে ওঠে তাঁরই নেতৃত্বে। পরবর্তীকালে বিহার ও উড়িষ্যার খনি অঞ্চলে মহিলা শ্রমিকদের অবস্থা সরেজমিনে তদন্ত করে এসে সরকারকে রিপোর্ট দেন। তারও আগে 'এজ অফ কন্সেন্ট বিল' পাশ করাতে তাঁর রিপোর্টের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে কাদম্বিনী বুঝেছিলেন কর্মরতা মায়েদের সমস্যা। তাই কলকাতা কর্পোরেশনের কাছে আবেদন করেছিলেন কর্পোরেশনে যে সব মহিলারা কাজ করে তাঁদের শিশুদের দেখভালের জন্যে বিশেষ কুটির নির্মাণ করতে। যে কুটিরকে আজকের দিনে বলা হয় 'ডে কেয়ার'।

এই কাদম্বিনী ব্যক্তিগত পরিসরে কেমন মানুষ ছিলেন? স্বামীর মৃত্যুর সময় কাদম্বিনীর বয়স ছিল ৩৭ বছর। তখন তার বড়মেয়ের বয়স চোদ্দ এবং সবচেয়ে ছোটটির বয়স এগারো মাস। তাঁর উপর ছিল সাতটি সন্তানেকে মানুষ করার দায়িত্ব। তাঁদের প্রত্যেককে তিনি সুশিক্ষিত কৃতি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। সুকুমার রায়ের দিদি পুণ্যলতা চক্রবর্তীর লেখায় পাওয়া যায়, 'রান্না, সেলাই প্রভৃতি ঘরের কাজও তিনি খুব ভাল রকম জানতেন। একটুও সময় তিনি নষ্ট করতেন না। তখন তো মোটরগাড়ি ছিল না। শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে রোগী দেখে বেড়াতে ঘোড়ার গাড়িতে অনেক সময় লাগত। সে সময়টা তিনি লেশ বুনে কাজে লাগাতেন।'

১৯২৩ সালে ৩ অক্টোবর তিনি একটি জটিল অপারেশন সেরে খুশি মনে বাড়ি ফেরেন। সেদিনের অপারেশন করে এত খুশি ছিলেন যে বলেছিলেন আমার উড়তে ইচ্ছে করছে। এরপর স্নান করতে গিয়ে সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। ডাক্তার আসার পূর্বেই তিনি মারা যান। তাঁর হাত ব্যাগে পাওয়া গিয়েছিল পঞ্চাশ টাকা। সেদিনের চিকিৎসার পারিশ্রমিক।

জীবনের এতগুলি ক্ষেত্রে যিনি প্রথম আলো দেখিয়েছিলেন সামাজিক হেনস্তা তাঁর পিছু ছাড়ে নি কোনোদিন। তাঁর অর্জন বেশি না সংগ্রাম, তাঁর সম্মান বেসি নাকি লাঞ্ছনা তার তুল্যমূল্য বিচার করা কঠিন। এত স্বীকৃতি, বিলিতি ডিগ্রি থাকা সত্বেও সমাজের চোখে 'মেয়েছেলে' ডাক্তারকে অনেকেই ধাইমা বলেই মনে করত। কাদম্বিনী সেসব কখনও গায়ে মাখতেন না। জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে একটি সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে একটি জটিল প্রসব করানোর জন্য বাচ্চাটির অন্নপ্রাশনে তাকে নিমন্ত্রণ করা হয়। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন পুত্রবধুকে। কিন্তু খাবার ডাক আর পড়ে না। অবশেষে বাড়ির কাজের লোকেদের সঙ্গে খেতে দেওয়ার ব্যবস্থা হল। পুত্রবধূ রাগে দুঃখে না খেয়ে চলে আসতে চাইলেন। কিন্তু কাদম্বিনী? শান্তভাবে 'খাব তো কজন গরীব মানুষের সঙ্গে। ওদের অপমান করব?" বলে নির্বিকার মুখে খেয়ে নিলেন।

অকুতোভয় এই নারী তাঁর অদম্য জেদ আর প্রবল কর্মক্ষমতা ও দক্ষতার জোরে নিজে যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন তা কেবল উনবিংশ শতাব্দী কেন বিংশ ছাড়িয়ে একবিংশ শতাব্দীর মেয়েদের কাছে স্বপ্ন।

পরিশিষ্টঃ

সেই যে কলকাতায় এসে কাদম্বিনীর পড়াশোনা শুরু হয়েছিল হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে সেখানে যারা তাঁর সহপাঠী ছিলেন তাঁদের আরও একবার স্মরণ করা যাক। সরলা ও অবলা ছিলেন দুর্গামোহন দাশের দুই কন্যা। দুর্গামোহন দাশ ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কাকা। সরলার ছাত্রবৃত্তি পাশ করার পর বিবাহের কারণে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসা হয় নি। তাঁর বিয়ে হয়েছিল প্রসন্ন কুমার রায়ের সঙ্গে। যিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতে প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম ভারতীয় প্রিন্সিপ্যাল। সরলা আজীবন মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে কাজ করে গিয়েছিলেন তাঁর কাজের মধ্যে অন্যতম কলকাতায় গোখেল মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের প্রতিষ্ঠা। দুর্গামোহন দাশের ছোটকন্যা অবলা কাদম্বিনীরও আগে ১৮৮২ সালে মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়তে গিয়েছিলেন। তখন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে মেয়েদের ডাক্তারি পড়ার অনুমতি না থাকলেও মাদ্রাজে ছিল। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি পড়া ছাড়তে বাধ্য হন। তিনিও আমরণ নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন। পরবর্তীদিনে তিনিই হয়েছিলেন আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর সুযোগ্য সহধর্মিণী লেডি অবলা বোস। ডাক্তারির পাঠক্রম শেষ করতে পারলে হয়তো তিনিই হতেন দেশের প্রথম মহিলা ডাক্তার।

ডঃ অন্নদাচরণ খাস্তগীরের কন্যা কুমুদিনী ছিলেন চট্টগ্রামের প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট।

দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর কন্যা বিধুমুখীর বিয়ে হয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর। দ্বারকানাথ যে বাড়িতে থাকতেন সে বাড়ির দোতলায় থাকতেন উপেন্দ্রকিশোর। তাঁর স্বনামধন্য পুত্র সুকুমার রায় সহ অন্যান্য ছেলেমেয়েরা কাদম্বিনীর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে একসঙ্গে বড় হয়।

প্রথম ভারতীয় মহিলা গ্রাজুয়েটের অন্যজন চন্দ্রমুখী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজীতে স্নাতকোত্তর পাশ করে বেথুন কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হন। তিনিই প্রথম ভারতীয় মহিলা প্রিন্সিপ্যাল।

কাদম্বিনী গাঙ্গুলীই ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা ডাক্তার কিনা সে নিয়ে বিতর্ক আছে। তার কারণ ১৮৮৬ সালে আমেরিকায় উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ অফ পেন্সিলিল্ল্ভনিয়া থেকে ডাক্তারি পাশ করেন মহারাষ্ট্রের মেয়ে আনন্দিবাই যোশি। পাশ করার পর কোলাপুরে অ্যালবার্ট এডওয়ার্ড হাসপাতালে চাকরি পান। দেশে ফেরার সময় দুর্বল শরীরে দীর্ঘ জাহাজ যাত্রার ধকলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মাত্র একুশ বছর বয়সে টিউবারকিউলসিসে তিনি মারা যান। চিকিৎসক হিসেবে কোন কীর্তি রেখে যাবার সুযোগ তিনি পান নি। আর এই কারণেই কাদম্বিনী গাঙ্গুলীকেই ভারতবর্ষের প্রথম প্রাক্টিসিং মহিলা ডাক্তার হিসেবে গণ্য করা হয়।