এবারের গান্ধী জয়ন্তী কেন হয়ে উঠল প্রতিবাদের নজির বিহীন দিবস ?

স্বাধীন ভারতে এর আগে কখনোই গান্ধী জয়ন্তীকে জনগণ এমন ব্যাপক পরিসরে এবং এমন ভঙ্গিমায় প্রতিবাদের দিন হিসেবে পালন করেনি। গোটা বিশ্ব গান্ধীকে এমন এক অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যিনি সাধারণ নিরস্ত্র মানুষের শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের শক্তির প্রতীক ছিলেন। এ বছর গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর সেই উত্তরাধিকার ভারতের আনাচে-কানাচে সত্যিই জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। দিল্লির এক সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত হওয়া যন্তর মন্তরে মোতায়েন বিপুল ও ভীতিকর নিরাপত্তা বাহিনীকে অগ্রাহ্য করে শত শত ছাত্রকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের প্রতিবাদ জানানো, বারবার নৃশংসভাবে গ্রেফতার হওয়া এবং পুনরায় প্রতিবাদে শামিল হতে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে আসার মতো দৃশ্য; কিংবা মুম্বাইয়ে সমবেত জনতার কণ্ঠে একসাথে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার দৃশ্য আগামী বহু বছর ধরে আমাদের স্মৃতিতে অমলিন থাকবে। প্রতিবাদী মানুষ যখন গান্ধীর অহিংস প্রতিবাদের উত্তরাধিকারকে স্মরণ করছিলেন, তখন বর্তমান সরকার নির্লজ্জ পাশবিক শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে ঔপনিবেশিক ধাঁচের শাসনতন্ত্রকেই ফিরিয়ে আনছিল।

জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ, এসআইআর (SIR) বাতিল এবং অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া প্রতিটি ভোটারের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের দাবি এখন সমগ্র ভারতের নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের সেই আইনটি বাতিল করাও সমান জরুরি, যা বর্তমান সরকারকে নিজেদের পছন্দমতো নির্বাচন কমিশন বেছে নেওয়ার অবাধ সুযোগ করে দিয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনারদের আইনের আওতার বাইরে রেখে আজীবন সুরক্ষা (immunity) প্রদান করেছে। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত বিস্ফোরক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী ‘সংকট মোকাবিলার কৌশল’ ও ‘ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার’ ব্যর্থ চেষ্টা জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কেবল আরও জোরালোই করেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের (CEC) স্বেচ্ছাচারী ও একতরফা কাজকর্ম, কমিশনের অন্দরে অন্য নির্বাচন কমিশনারদের কোণঠাসা করে রাখা এবং এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নিয়ন্ত্রণের চরম কেন্দ্রীভবন ও সফটওয়্যারের কারচুপি। নির্বাচন কমিশন এখন যেসব নির্দেশিকা জারি করছে, তার প্রতিটিই প্রমাণ করে যে অসাংবিধানিক এসআইআর অভিযানের মাধ্যমে ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্র এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের মৌলিক নীতির ওপর এক বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এখন যখন সমগ্র দেশ ১৩ কোটিরও বেশি ভোটারের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার, তখন নির্বাচন কমিশন সব সিইও-কে (Chief Electoral Officers) নির্দেশ দিয়েছে এক মাসের মধ্যে সমস্ত ‘বাদ পড়ে যাওয়া’ (left-out) ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য! ভোটারদের এমন গণবর্জনের এই নির্মম বাস্তবতার কথা নির্বাচন কমিশনের এখন মনে পড়ল কেন? নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ব্যবহৃত ‘বাদ পড়ে যাওয়া’ শব্দটি আসলে নির্বিচার ও সুনির্দিষ্টভাবে নাম বাদ দেওয়ার এক মোড়ক মাত্র, যা বিজেপি এবং তাদের সহযোগীদের অনুকূলে নির্বাচনী ভারসাম্য ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। এমনকী ১ অক্টোবর যখন নির্বাচন কমিশন এই নতুন নির্দেশিকা জারি করছিল, তখন পাটনায় সিপিআই(এমএল)-এর কর্মীরা নাম বাদ পড়া ভোটারদের নিয়ে একটি গণশুনানির আয়োজন করছিলেন। ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এমন কুড়িটি আসনের মধ্যে দশটি আসনে জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পঞ্চাশটি নির্বাচিত বুথে দলীয় কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে একটি সমীক্ষা চালান। তারা ঠিক সেটাই করেছিলেন যা নির্বাচন কমিশন এখন বিএলও-দের (BLO) করতে বলেছে—অর্থাৎ এসআইআর-পরবর্তী ভোটার তালিকার সাথে এসআইআর-পূর্ব জুন ২০২৫-এর তালিকা মিলিয়ে দেখে বাদ পড়া ভোটারদের চিহ্নিত করা। সেই সমীক্ষায় অন্যায়ভাবে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চমকে দেওয়ার মতো ১৭ শতাংশ হার প্রকাশ্যে আসে।

ভোটার তালিকা থেকে নির্বিচারে নাম বাদ দেওয়া এবং বেছে বেছে নাম তোলার হাতিয়ার হিসেবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন দুটি ফর্ম—ফর্ম ৬ এবং ফর্ম ৭—কে অস্ত্র বানিয়েছে। এখন যেহেতু ফাঁস হয়ে গেছে যে ফর্ম ৬-এ আনা পরিবর্তনগুলো ছিল সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী, অননুমোদিত এবং বেআইনি—কারণ ফর্মের যে কোনো ধারায় পরিবর্তন আনা সংসদের একচ্ছত্র অধিকার—তাই নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই বিতর্কিত ধারাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ফর্ম ৬-এ আনা পরিবর্তনগুলোতে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন রয়েছে বলে কমিশন যে দাবি করার চেষ্টা করেছিল, তা প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত নিজেই খারিজ করে দিয়েছেন। স্পষ্টতই জেন-জি (Gen Z) বা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তিতে বাধা দিতেই এই পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন ফর্ম ৬-এর অপব্যবহারও করছে; যা মূলত আইনত যাচাইযোগ্য ঘোষণার মাধ্যমে প্রথমবার ভোট দেওয়া ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির একটি পথ, সেখানে বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য জোর করে সেই ফর্ম পূরণ করানো হচ্ছে। এটি পরিষ্কারভাবে বেআইনি, এবং প্রথম দিন থেকেই আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কমিশন এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো যোগ্য ভোটারদের বাদ দিতে ফর্ম ৭-এর ব্যাপক অপব্যবহার। মূলত মুসলিম ভোটার এবং যারা বিজেপি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন এমন ভোটারদের নিশানা করে আগে থেকেই পূরণ করে রাখা ফর্ম ৭-এর বান্ডিল বাজেয়াপ্ত করার একাধিক খবর এসেছে। ফর্ম ৭-এর ভিত্তিতে দায়ের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভোটারদের বাদ দেওয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের যথাযথ নোটিশ এবং জবাব দেওয়ার সুযোগ পাওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু গণহারে নাম বাদ দেওয়ার শিকার হওয়া ভোটারদের অভিজ্ঞতা একেবারেই তা নয়। সবচেয়ে ভয়াবহ এই হেনস্থা ও নিশানা করার চিত্রটি দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গে। আপিল ট্রাইব্যুনাল ১১-এর পদত্যাগী চেয়ারম্যান, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় প্রকাশ করেছেন যে, তাঁর ট্রাইব্যুনালে পশ্চিমবঙ্গের অতিরিক্ত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নিজেই প্রায় ২.৫৪ লক্ষ ফর্ম ৭-এর আবেদন জমা দিয়েছিলেন এমন ভোটারদের নাম বাদ দিতে, যাদের স্বয়ং বিচার বিভাগীয় আধিকারিকরাও যোগ্য বলে বিবেচনা করেছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু অভিযোগ করেছিলেন যে, পশ্চিমবঙ্গের ১৯টি ট্রাইব্যুনালের সামনে আসা ১৬,১০,৩১১টি নাম বাদ দেওয়ার আবেদনের উৎস বা অনুমোদনের বিষয়ে তাঁর, তাঁর সহযোগী নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশীর কিংবা পশ্চিমবঙ্গের সিইও-র কারও কোনো ধারণাই ছিল না।

ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো, ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি এবং পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের (checks and balances) ব্যবস্থা—যা উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে গণতন্ত্রের টিকে থাকার মূল ভিত্তি ছিল—আজ তাদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। সুপ্রিম কোর্ট, যার উচিত ছিল নির্বাচন কমিশনকে সংযত করা, তারা কার্যত এই ঐতিহাসিক নির্বাচনী কারচুপি চালানোর সম্পূর্ণ ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছে। যা আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যকার সীমারেখা মুছে ফেলার এক স্তম্ভিত করার মতো দৃষ্টান্ত হতে পারত—‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ বিল পর্যালোচনা সংক্রান্ত যৌথ সংসদীয় কমিটি এবং সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে ৬ অক্টোবরের প্রস্তাবিত সেই বৈঠকটি শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন প্রায় না থাকার কারণে ভারতে গণতন্ত্রের টিকে থাকা এখন প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ভারতের জনগণের পরিপক্কতা ও সতর্কতার ওপর; এবং এই সংকটময় মুহূর্তে তারা যাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেন—সেই অ-বিজেপি রাজনৈতিক শক্তি, নাগরিক সমাজ এবং বিকল্প মিডিয়ার ওপর। ৩০ সেপ্টেম্বরের ইন্ডিয়া (INDIA) ব্লকের বিলম্বিত বৈঠক এবং বামপন্থী ছাত্রকর্মী, অন্যান্য জেন-জি প্রতিবাদী, প্রগতিশীল নাগরিক, বিকল্প গণমাধ্যমের কর্মী ও অ-এনডিএ বিরোধী দলগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদী অবস্থান এই ফ্যাসিবাদী শৃঙ্খল ভেঙে এক দৃঢ় গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের আশার বার্তা দিচ্ছে।