উৎসবের খাওয়া দাওয়া
- 07 October, 2026
- লেখক: শ্রাবন্তী ঘোষাল
এ বছর বর্ষা শেষ হয়েও হচ্ছে না। স্কুলে যেতে অনাগ্রহী ক্ষুদে পড়ুয়ার মতো বারবার মায়ের কাছে ফিরে আসছে। এসবের মাঝে জঙ্গলের মাটিতে সাদা বিন্দুগুলো দিব্যি বেড়ে উঠছে। মনে পড়ছে নিকোলাই রাদলভের “ছবিতে ছবিতে গল্প” থেকে একটি কাহিনী। পুঁটলি নিয়ে এক সজারু বাড়ি চলেছে। হাতের বেজায় ভারি বোঝা একটা ব্যাঙের ছাতার উপরে রেখে সে ঘুমিয়ে পড়ল।আরামে নাক ডেকে সজারু ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে উঠে তার চক্ষু ছানাবড়া!
পুঁটলি রাখা “ বেয়াক্কেলে ব্যাঙের ছাতা” এক রাতে এত লম্বা হয়েছে যে তার নাগাল পাওয়া ভার।
গল্পের এই মাশরুম খাওয়ার উপযোগী ছিল কিনা কে জানে..তবে রাঢ়বঙ্গের বাঁকুড়া,বীরভূমে ঠিক বর্ষার শেষে যে মাশরুম পাওয়া যায় তার নাম দুর্গাছাতু। নদীর পাড়ে যখন কাশফুল, উঠোন ছেয়ে শিউলি,তখন জঙ্গলের শক্ত মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে ফুলের মতো ছত্রাক। এ যেন জঙ্গলে দেবীর আগমনী। বনবাদাড়ের আশেপাশে যাদের বাস,তারা জঙ্গল থেকে তুলে আনা এই মাশরুম বাজারে বিক্রি করে।সারা বছরে মাত্র পনেরোর জন্য বিক্রি হওয়া এই দেবদুর্লভ, মহার্ঘ্য জিনিসটিকে অনেকে কারান ছাতু বা অষ্টমী ছাতু বা শিকছাতু নামেও চেনেন। এই ছাতু ভালো করে ধুয়ে মাংসের মতো মশলায় কষিয়ে ঝোল রান্না করা হয়। আর সর্ষে ,আদা, পেঁয়াজ,রসুন দিয়ে জমিয়ে রান্না করা গড়্গড়ে ঝাল এই ছাতুর সর্ষে ঝাল যে খেয়েছে তার টাকরার মেমরি কার্ডে আজীবনের মতো সেই ফাইল রয়ে যাবে।
দুর্গা চচ্চড়ির নামে দুর্গা কেন তার রহস্য লুকিয়ে আছে প্রকৃতিতে। প্রকৃতি তখনো এত ক্রুদ্ধ,বেখেয়ালি হয়নি। বর্ষাকাল মানে তখন আপন মনে পাগলপারা নদীর উথাল পাথাল জল বুকে নিয়ে বয়ে চলা।
এ হেন ধারাপাতের পর ওপার বাংলায় জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীতে প্রায়ই জল উপচে বন্যা হত। ফসলের জমিও জলের তলায়। সাধারণ মানুষের সে বড় কষ্টের সময়।সম্বল বলতে শুধু পড়ে থাকা গোলার ধানটুকুই।বর্ষাশেষে শরতে সবজি বলতে থাকত শুধু চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া আর ওল। হিমঘরের সবজি রাখা তখন কল্পবিজ্ঞানের কল্পনাতেও হয়ত ছিল না। ঘোর বর্ষার পর সব্জির আকালের দিনে দুর্গাপূজার গণভোজের আয়োজনে এই তিন সব্জিই তখন ঘুরে ফিরে নানা ভূমিকায় অবতীর্ণ হত। দুর্গাচচ্চড়ি যে বাড়ির গল্প তাদের বাড়ি ছিল পদ্মার পাড়ে। প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ জনপদ বিক্রমপুরে কবে থেকে পারিবারিক দুর্গোৎসব শুরু হয়েছিল সেই ইতিহাস যুক্তবেণীর জলধারায় মিশে গেছে। আড়ম্বর ও বাহুল্যবর্জিত এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ ছিল গণভোজ। পুজোর তিনদিনে একেকটি গ্রামের একেকটি পাড়ার লোক নিমন্ত্রিত হতেন। মাথা গুনতি করে কেটারিং সার্ভিস নয়; হাটবার দেখে সবজি কিনে এনে রান্নার ঠাকুরের খন্তা,হাতায় কাঠের জ্বালের নানা পদের মাঝে থাকত এই চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া আর মাছের মাথার কাঁটা দিয়ে রান্না করা উৎসব স্পেশাল দুর্গাচচ্চড়ি। ওল,আলু দিয়ে মাছের মাথার যে ব্যঞ্জন তার নামে দুর্গা নেই।ওল সারাবছর নিজের গুণে ডালনা,সেদ্ধ ইত্যাদি বেশে মনোরঞ্জন করে। কিন্তু চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়ার এই হাত ধরাধরি জোট নিতান্তই আপৎকালীন। অনেকটা আপদুদ্ধারকল্পে অকালবোধন বা ভোটের আগে জোটের মতো ব্যাপার আর কী!
পরের রেসিপির নাম।” ঢাকীর তরকারি”...
বানাতে ঢাক লাগে না, ঢাকী হলেই যথেষ্ট। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে শহর কলকাতার অনতিদূরে উত্তর চব্বিশ পরগনার একটি গ্রামে নতুন পাড়া গড়ে উঠছে।এখন যেটা কল্যাণী হাইওয়ে তার লাগোয়া অঞ্চল।জমির দাম গেরস্তপোষ্য হওয়ায় মধ্যবিত্ত মানুষজন জমি কিনে বাড়ি করছেন। এমনি এক পাড়ার নাম ধরে নিলাম অমুক পার্ক বা তমুক পল্লী। সে বছর পাড়ার কয়েকঘর মিলে প্রথমবার দুর্গাপূজা হচ্ছে। শিয়ালদহ থেকে চুক্তিভিত্তিক ঢাকীও এসেছে। পুজো তখনো শুরু হয় নি। ঢাকীর থাকা খাওয়া নিয়ে এবার সমস্যা তৈরি হলো। ক্লাবঘর নেই,প্যান্ডেলে জায়গা কম। পাড়ার এক বাড়িতে তার থাকার ব্যবস্থা হলো। কিন্তু খাবে কোথায়? স্থির করা হলো পুজোর চারদিন ছাড়া সবার বাড়ি থেকে সিধে (চাল,ডাল,সবজি) নিয়ে তার পেট ভরবে। ওই পাড়ার পুজোয় যিনি সবচেয়ে বেশি ঝামেলা মাথায় নিয়ে ঘুরতেন তাদের বাড়িতে অবশেষে আগুন মিলল। ঢাকী তার সারা দিনের সিধে নিয়ে ওই বাড়িতে দিয়ে আসবেন আর গৃহকর্ত্রী তা দিয়ে খাবার তৈরি করে দেবেন। ভাত,পুজোর দিনে আত্মীয়ার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে অফার পেয়েছিলাম,” ঢাকীর তরকারি খাবি?”
অভিনবত্বের প্রলোভন হাতছাড়া না করে বাটিতে তরকারি দেখে চমকে গেছিলাম। একি! এতো নিরামিষ পাঁচ তরকারি যেটা অপছন্দের তালিকায় একদম উপরে। খেয়ে বুঝলাম ব্যাপারটা জম্পেশ। ঢাকীর এনে দেয়া সব্জির সাথে ঘরে থাকা নানা সবজি আর ভাজা মশলা দিয়ে যুত করে রাঁধা হয়েছে সুস্বাদু লাবড়া যার একমাত্র জুড়িদার হতে পারে ঘিয়ে ভুরভুর করা ভুনি খিচুড়ি।
বাঙালির পুজোর সাথে আমিষের সম্পর্ক সুপ্রাচীন ও সুদৃঢ়। তন্ত্রাচার প্রধান অঞ্চলের পূজায় দেবীকে মৎস্যভোগ থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ে হুক করা ইলেকট্রিক লাইনে ইনডাকশন কুকারে ভাজা ফিস ফিঙ্গার অব্দি তার বিস্তৃতি। পঞ্চ ম-কারের অন্যতম হলো মাছ। চক্রার্চনে পাঁচ রকম মাছের কথা বলা আছে। দুর্গাপূজায় দেবীর ভোগে অঞ্চলভেদে বিভিন্নরকম মাছ দেয়া হয়। রুই,কাতলা,ইলিশ, বোয়াল,কই,পুঁটি,সরপুঁটি, শোল ইত্যাদি মাছের পেঁয়াজ,রসুন বর্জিত পদ গেরস্ত বাড়ির পুজোয় মৎস্যামিষ হিসেবে নিবেদিত হয়। শাস্ত্রাচার ও বৈষ্ণব ধারার প্রভাব মুক্ত সাম্বৎসরিক দুর্গাপূজার অন্যতম অঙ্গ পশুবলি। পুজোয় পাত পেড়ে গণভোজের আসরে
পাঁঠা বলির মাংস ছিল পুজোর খাওন দাওনের অন্যতম আকর্ষণ। বেশ কিছু বছর আগেও গ্রামাঞ্চলে পাঁঠা বা খাসির মাংস কেটে বিক্রি হত না। তাই বলির পশুর মাংস খাওয়াই ছিল বচ্ছরকার দিনে একমাত্র মাংস খাওয়ার উপায়। এই মাংসের ঝোল ভাত খেতে বিকেল গড়িয়ে যেত। ঢাকিরা ছিলেন বলি হওয়া পশুর চামড়ার দাবিদার। ঢাকের মেরামতি ও অন্যান্য কাজে এর ব্যবহার ছিল।
দুর্গাপূজা কলকাতাকেন্দ্রিক হওয়ার পর তার সাথে যোগ হয়েছে মিষ্টির অনুষঙ্গ। ব্রাক্ষ্মণ ছাড়া অন্য কোন জাতের যজমান দেবতাকে অন্নভোগ দেয়ার অধিকারী নন।শাস্ত্রের এ হেন বিধানের কারণে কলকাতার ‘'বনেদী” বাড়ির পুজোতে লবণ ছাড়া ভাজা সবজি,লুচি আর মিষ্টির জয়জয়কার অব্যাহত আছে। পলাশীর যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে দেশীয় চিনি তৈরির পদ্ধতি এক বড় প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। বিলিতি কলের চকচকে চিনি অপেক্ষাকৃত কম দামে বাজারে সহজলভ্য হয়। ওদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের শুরুতে ইংরেজ প্রভুর পায়ে সমর্পিত বেনে ও ভূস্বামী সম্প্রদায় নিজেদের আর্থিক ও সামাজিক সামর্থ্য প্রতিপন্ন করতে দুর্গাপূজাকেই বেছে নেন। এমন প্রায় সব সম্পন্ন বাড়িতে সুবিশাল ও চমকপ্রদ মিষ্টি তৈরির ভিয়েন বসে। সেসব ছিল শুধু চোখে দেখার জিনিস, সাধারণ মানুষ তার ছিটেফোঁটা প্রসাদেও বঞ্চিত থেকেছে। ঘরোয়া আয়োজনে দেবীর মিষ্টি ভোগের নাম শীতলভোগ। সন্ধ্যারতির পর দেবীকে চাল ছাড়া রান্না করা মিষ্টি খাবার নিবেদন করার রীতি আছে। এই ‘বৈকালিক’ ভোগের অন্যতম পদ সুজি-ময়দার পাটিসাপটা, নারকোল দিয়ে সাদা মালপোয়া, ক্ষীর-ছানা, আটার পুলিপিঠা ইত্যাদি। বছরে একবার মেয়ে দুর্গা তার মায়ের কাছে এসেছে, তাই তার মন জোগাতে সাধ্যমত আয়োজনে কোন ত্রুটি রাখা যাবে না। এছাড়াও সকালের বাল্যভোগে ফলের সাথে দেওয়া হত কাটা নারকোলের লাড়ু (নাড়ু), নারকোলের তক্তি (ছাঁচে ফেলা নারকোল চিনি / গুড়ের সন্দেশ), মোদক (গুড় চিনির পাকে তৈরি নৈবেদ্যের চূড়ায় বসানো মিষ্টি), তিলের নাড়ু, খইয়ের উপড়া (মুড়কি) ইত্যাদি। এসবের নেপথ্যে ছিলেন বাড়ির মেয়েরা। তাঁরা পুজোর আগের কয়েক মাসে এসবের যোগাড়যন্ত্র করে রাখতেন।
নবমীর নিশি প্রভাত হয়ে বিজয়া দশমীতে কন্যারূপা দেবীর ঘরে যাওয়ার পালা। চালচুলোহীন, স্বভাব ভিখারি স্বামীর ঘরে সন্তানসমেত তিনি ফিরে যাবেন। অনেক দূরের সে পথ বেয়ে আবার মায়ের কাছে ফিরে আসবেন এক বছর পর আরেক শরতে। চোখের জলে তাঁকে বিদায় জানাবেন মা, আর পাতে দেবেন ‘গরীবের খাবার’, যা খেয়ে সাধারণ গ্রামবাসী আকালের দিনে কোনক্রমে বেঁচে থাকে।
বর্ষার শেষে পুকুর মাঠঘাটে ফুটে থাকা শাপলা, শালুকের দৃশ্য দেখে নাগরিক চোখ অবধারিতভাবে আবেগসূচক অব্যয়ের ব্যবহার করে। ‘এথনিক ফ্রিক’ শহুরে খাদ্যরসিকের কাছে এই ফুলের ডাঁটাও চিংড়ি সহযোগে দারুণ উপাদেয় ‘ডিশ’। কিন্তু এর বীজের দানা দিয়ে চাল, খইয়ের কথা কোনো রেসিপি বইতে লেখা নেই। বন্যায় ভেসে যাওয়া গ্রামে ঘরে চাল যখন বাড়ন্ত, ওই বীজের দানা রোদে শুকিয়ে, খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে ফুটিয়ে মূল খাবার হিসাবে খাওয়ার প্রচলন ছিল। ভাতের মত দেখতে বলে এর নাম ঢ্যাপের ভাত। একই দানা বালিতে ভেজে খইয়ের মত করে এখনো অনেক গ্রামে খাওয়া হয়। দুর্গাপুজোর শেষ দিনে দশমীতে দেবীর ভোগে এই ঢ্যাপের ভাত আর পাকা কলার বড়া ভোগে নিবেদন করা হত। ঘরে পড়ে থাকা বেশি পেকে যাওয়া কলা, আখের গুড় আর আটা-ময়দা দিয়ে এই বড়া ভেজে নেওয়া হত। না ছিল তখন উপকরণের বাহুল্য, না আর্থিক স্বাচ্ছল্যের বহিঃপ্রকাশ। আরাধ্য দেবীকে সমাবস্থানে দেখার সারল্যে নিতান্তই ঘরের জিনিস দিয়ে পুজো সাঙ্গ হত।
ঋগবেদের দশম মন্ডলের অনুবাকের ১২৫তম সুক্তে বিশ্বজননী, বিশ্বনিয়ন্ত্রী রূপিনী দেবীর কথা জানা যায়। অথর্ববেদের পৃথিবী সুক্তে জল, খাদ্য,শস্যের উৎস দেবীশক্তি। মার্কন্ডেয় পুরাণের শাকম্ভরী, শস্যদুর্গার রূপকে তিনি খাদ্যের অধিষ্ঠাত্রী। অতিপ্রাচীন কাল থেকে শক্তিরূপে এই দেবী আরাধনার নান প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মেলে।বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্যের সময় থেকেই মনসা ও চণ্ডীর পূজা পৌরাণিক নয়, লৌকিক দেবী হিসাবে বাংলায় শুরু হয়েছিল। সাহিত্যকে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গণ্য করলে দেখা যায়, ষোড়শ শতকের শেষ থেকেই চণ্ডীর পুজোর ব্যাপক প্রচলন হয়। সেই চণ্ডীর নাম অভয়া, অন্নপূর্ণা ইত্যাদি। শ্রীশ্রী চন্ডীর পঞ্চম অধ্যায়ে শুম্ভ নিশুম্ভের অত্যাচারে বিপর্যস্ত দেবতারা দুর্গাকে চেতনা, বুদ্ধি,নিদ্রা,ক্ষুধা,তৃষ্ণা ইত্যাদি নানা রূপে সংস্থিত শক্তি হিসেবে বন্দনা করেছেন। মানুষের চেতনার উন্মেষে বুদ্ধি, মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের বিশ্রামের জন্য নিদ্রা, আর বেঁচে থাকার জন্য খাবার এই মৌলিক শর্তের পূরণ না হলে মানুষ হিসেবে টিকে থাকা অসম্ভব। দেবী দুর্গাকে মাতৃশক্তি হিসেবে কল্পনা করলে তার সাথে সন্তানের জৈবিক যোগসূত্র খাদ্য৷ প্রকৃতির সন্তান জীবকুলের প্রত্যেকেই একাধারে খাদ্য ও খাদক। তাই আমিষ-নিরামিষ, সহিংস-অহিংস, শুদ্ধ-অশুদ্ধ এসব বিতর্কের উর্ধ্বে শারদোৎসব অন্নময়তার পথ ধরে প্রাণময় ঐতিহ্যের ধারক হয়ে উঠেছে।