গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের নতুন দিনকাল

তৃতীয় পর্যায়ে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী শুরু হওয়ার পরে, দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে। সমাজকর্মী থেকে ছাত্র, বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে অন্যান্য সমস্ত বিজেপি বিরোধী দলগুলো একযোগে আওয়াজ তোলা শুরু করেছে, এই প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। শুধু তাই নয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং শাস্তি দিতে হবে এই দাবীও উঠেছে। আন্দোলন ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং ককরোচরা অবধি রাস্তায় নেমে গেছে। 
অনেকে বলতে পারেন, এই প্রক্রিয়া তো বিহারে হয়েছে, বাংলায় এই প্রক্রিয়ায় অসংখ্য মানুষের নাম বাদ গেছে, এখনো বহু মানুষের নাম বিচারাধীন, তখন তো এত শোরগোল পড়েনি। আসলে সমস্যাটা এখানেই, বিহার, বাংলা, তামিলনাডু কিংবা কেরলে বহু মানুষের বাদ যাওয়া নিয়ে জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যমগুলো এই নিয়ে কথা বলেনি। কয়েকদিন আগে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রের ঋতিকা চোপড়া যে তদন্তমূলক সংবাদটি ঐ পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন, সেটা দেখে অনেকেই চমকে উঠেছেন। অথচ, চমকানোর মত কিন্তু কোন বিষয় নেই ঐ খবরে। এই কথা আমরা গত প্রায় এক বছর ধরে বলে আসছি। বিহারের সময়ও বলেছি বাংলার সময়ও বলেছি। বারবার করে বলেছি যে এই এস আই আরের ডিজাইনটাই এমন যে এখানে মানুষকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। ওদিকে ভারত নাকি ডিজিটাল হচ্ছে এদিকে কাগজ নিয়ে মানুষকে দেখাতে হবে। ঋতিকা চোপড়া, যে কাজটি করেছেন সেটাকে সাংবাদিকতা বলে। আসলে গত ১২ বছর ধরে আমরা সাংবাদিকতা শব্দটাকে আস্তে আস্তে ভুলতে বসে ছিলাম। আমরা সাংবাদিকতার মানে ভেবেছিলাম কোন একটি দলের হয়ে প্রোপাগান্ডা করা কোন একটি মানুষকে মহামানব বানিয়ে তার প্রচার করা। সেই জন্য হয়তো আমাদের অস্বস্তি লাগছে অসুবিধা হচ্ছে এই খবরটি দেখে। সাংবাদিকতা তো এরকমটাই হওয়ার কথা। 
সেই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরে, অন্যান্য বহু মিডিয়া গা ছাড়া দিয়ে উঠে প্রশ্ন করা শুরু করে নির্বাচন কমিশনকে। যদিও গোদী মিডিয়ারা একই জায়গায় অবিচল, তাঁদের বক্তব্য আর বিজেপির বক্তব্য এক। বাংলায় বহুদিন পরে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে, একজন মানুষও মারা যাননি, অতএব জ্ঞানেশকুমার সফলভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেছেন, তাঁকে ভারতরত্ন দেওয়া উচিৎ। আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোর মুশকিল হচ্ছে, তাঁরা উল্টে প্রশ্ন করে না। তাঁরা যদি প্রশ্ন করতেন, এই যে এত লক্ষ মানুষ বেঁচে থেকেও মৃত তাঁদের কী হবে, তখন জ্ঞানেশকুমারকে ভারতরত্ন দেওয়ার প্রস্তাবকেরা কী উত্তর দিতেন, তা জানার ইচ্ছে থাকল। তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ঐ খবরের পরে ছাত্র, যুব, কৃষক, শ্রমিক যাঁরা অনেকদিন ধরেই এই নির্বাচন কমিশনকে বিশ্বাস করছিলেন না, তাঁরা রাস্তায় নেমে পড়েছে। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে ঐ বিক্ষোভ। ঠেলায় না পড়লে বিড়াল গাছে ওঠে না। নির্বাচন কমিশন মিটিং ডেকে বলে দিয়েছে, যাদের নাম ভোটার তালিকায় ওঠেনি, তাদের বাড়িতে বিএলও'রা যাবে, নাম তোলার বন্দোবস্ত করা হবে। তার মানে ট্রাইবুনালের শুনানি আর হবে না? বিহার এবং বাংলার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে? পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল বিচারাধীন থাকা প্রায় ২৭ লক্ষ অসহায় নাগরিক, যারা প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ভাসছেন, তাদের কী হবে, তা কাউকে স্পষ্ট করতে হবে। যৌক্তিক অসঙ্গতি ও গত বছরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির মারাত্মক মিশ্রণ এবং একটি জবাবদিহিহীন ও দিশেহারা প্রশাসনের সাথে এই পুরো এসআইআর কাহিনীটি একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। এর জন্য দায়ীদের পদত্যাগ করতেই হবে। শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তি যথেষ্ট নয়। তবে যাই হোক এই নতুন নিয়ম চালু হোক বা না হোক, উত্তর দিতে হবে কেন এত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হলো, সেই উত্তর কিন্তু মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকুমারকে দিতে হবে, বলতে হবে, কে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল? এত লোক যে মারা গেল, তার জন্য দায়ী কে? পদত্যাগ করতেই হবে। না হলে লড়াই আরো তীব্র হবে। 
দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের মিটিং হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্ডিয়া জোটের প্রেস কনফারেন্সে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলেছেন তিনি এই লড়াই লড়তে রাজি এবং তিনি আস্থা রাখছেন এই ইন্ডিয়া জোট এই লড়াইটাকে এগোতে পারবে। জ্ঞানেশকুমারকে যথেষ্ট আক্রমণ তিনি করেছেন তবে এই মিটিং এ মল্লিকার্জুন খারগে কিন্তু বলে দিয়েছেন যে অনেকে আগে এই ভরসাটা রাখতে পারছিলেন না যে ইন্ডিয়া জোট এই লড়াইটা করতে পারবে কিন্তু এখন অনেকেই ভরসা করছেন, তিনি নাম করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বলেছেন। বামেরা প্রস্তাব দিয়েছে কংগ্রেস যেন ডি এম কের সঙ্গে কথা শুরু করে। অত্যন্ত জরুরী প্রস্তাব। এখনো অব্দি অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল এই ইন্ডিয়া জোটকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। তাই এই মিটিংয়ে আসেননি। আগামী দিনে তাকেও এই মিটিংয়ে এই জোটে রাখাটা খুব জরুরী। সব মিলে মিটিং যথেষ্টই ফলপ্রসু তবে একটা কথা বলাই যায় এই লড়াইটা সবে শুরু হলো আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের লড়াইটাও মোটামুটি কংগ্রেস বনাম বনাম বিজেপি হবে এবং বড় করে বললে ইন্ডিয়া জোট বনাম বিজেপি হতে চলেছে। এই ইঙ্গিত কিন্তু পাওয়া গেছে। সারা দেশে ২রা অক্টোবর থেকে এই নিয়ে কর্মসূচী নেওয়া হবে, এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিছুদিন আগে আইসার নেহা বোরা একটা বক্তব্য রাখছিলেন যে ‘এই সংবিধানটা এই দেশটাকে বাঁচানোর দায় হচ্ছে আমাদের এবং সেটাই আমাদের কাজ। যে দেশে আমরা বড় হয়েছি, সেই দেশটা বদলে গেছে, সেই পুরনো দেশ যেখানে দ্বেষ নেই, সেই জায়গায় পৌঁছতে হবে’। 

মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনের দিন মূলত দেশের দুটি শহরে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়, নেহা বোরা, মনোজ ঝা, মহুয়া মৈত্র এবং প্রশান্ত ভূষণ সহ অন্যান্য নাগরিকদের পক্ষ থেকে আর মুম্বাইতে শিবাজী পার্কে ডাক দেওয়া হয় আরশোলা অর্থাৎ ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে। মুম্বাইয়ের জমায়েত যেমন একদিকে ছিল দলীয় পতাকাবিহীন একটি সমাবেশ, দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনও তেমনটাই ছিল, কিন্তু দুটো লড়াইয়ের দৃশ্যের মধ্যে অনেকেই ফারাক করার চেষ্টা করছেন এবং বলছেন, দিল্লি পুলিশ যেভাবে আইসা নেত্রী নেহা বোরা সহ অন্যান্যদের ওপর আক্রমণ নামিয়েছে তেমনটা মুম্বাইয়ের সমাবেশের ওপর হয়নি। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এই আরশোলারা আরএসএসের গর্ভ থেকেই জন্ম নেওয়া একটি লড়াইয়ের ছায়া মাত্র, এটা বিজেপির বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ সারা দেশে আছে, তা প্রশমন করার জন্যেই ব্যবহার করা হবে। এই বিতর্ক চললেও, দেখা যাচ্ছে আন্দোলনের মুখেরা কিন্তু নিজেদের মধ্যে এই বিতর্ক করতে নারাজ। তাঁরা চাইছেন, প্রতিটি আন্দোলন হোক গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্য, প্রতিটি লড়াইয়ের সূচিমুখ থাক বিজেপির বিরুদ্ধে। যাঁরা জ্ঞানেশকুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর বাতিলের দাবীতে আন্দোলন করছেন, তাঁরা কিন্তু বিভক্ত হতে চাননা, তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে চান। 

একদিনে কিন্তু যন্তরমন্তরের আন্দোলন থেমে যায়নি, কিংবা মুম্বাইয়ের আন্দোলনও একদিনে থেমে যায়নি। দিল্লিতে প্রতিদিন হচ্ছে, কিছু না কিছু প্রতিবাদ। দিল্লি পুলিশের নির্যাতন যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনই মুম্বাই পুলিশও ৩ টি এফআইআর করেছে। সবকিছু হলেও, সব চেয়ে বেশী নিরাশ করছে বাংলা, এটা বলতেই হচ্ছে। যে বাংলায় সব চেয়ে বেশী মানুষ বাদ গেছে, যে বাংলার সবচেয়ে বেশী ক্ষোভে ফেটে পড়ার কথা ছিল, সেই বাংলা তুলনামূলকভাবে এত নিস্প্রভ, নিস্পৃহ কেন পথে নামতে? এখনো কি বাংলার বামপন্থী মানুষজন বুঝতে পারছেন না, যে বিজেপির তৃনমূলীকরণ হয়েছে বলেই আক্রমণ নামছে না বাংলায়, বিজেপি একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দল, যাদের মতাদর্শ হল, বামপন্থীদের আক্রমণ করা। পৃথিবীর ইতিহাস সেই শিক্ষাই দেয়। এই সময়টা হচ্ছে, সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে বিজেপির বিরোধিতা করার, এই সময়টা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বিজেপিকে পরাজিত করার, এই সময়টা পথ চলার। যে গান্ধী, যে আম্বেদকর নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই ভারতকে ফিরিয়ে আনার লড়াই করার এটাই উপযুক্ত সময়। আজ না হলে আর কবে হবে এই লড়াই?