আখ্যানপাঠ : বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারাম

১

সপ্তদশ শতকের শেষ ও অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে কয়েক বছরের জন্য খুলনার ভূষণা অঞ্চলে সীতারাম রায়ের এক নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার ঐতিহাসিক তথ্যটিকে বঙ্কিম তাঁর ‘সীতারাম’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট তথ্য ধরে তিনি উপন্যাস ও তাঁর নায়ককে এগিয়ে নিয়ে যান নি। সেজন্য সতীশচন্দ্র মিত্রের মতো খুলনার ইতিহাসকারেরা তাঁদের অসন্তোষ প্রকাশও করেছেন। ইতিহাস ও উপন্যাসের এই দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে বঙ্কিম এখানে ইতিহাসের পটটি ব্যবহার করেছিলেন ‘আনন্দমঠ’ ও ‘দেবী চৌধুরাণী’র পর অনুশীলন ধর্মের প্রেক্ষিতে আরো কিছু কথা বলার জন্য। সীতারাম বৃত্তান্ত নিয়ে যথার্থ কোনও ঐতিহাসিক উপন্যাস তিনি লিখতে চান নি।

‘সীতারাম’ আখ্যানের মধ্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার উপাদান অবশ্যই ছিল। অষ্টাদশ শতকের সূচনাকালের সেই সময়টায় একদিকে দিল্লির প্রবল প্রতাপান্বিত মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব ও অন্যদিকে তাঁর প্রেরিত বাংলা শাসক মুর্শিদকুল্লি খাঁ – দুজনের সঙ্গেই বোঝাপড়া সম্পন্ন করে সীতারাম তাঁর সায়ত্তশাসিত রাজ্য গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। রাজা উপাধিও আদায় করে নিয়েছিলেন স্বয়ং দিল্লির বাদশাহের কাছ থেকে। ভূষণায় নিজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধির দিকেও তিনি মন দিয়েছিলেন। হিন্দু রাজার রাজ্যের নাম মহম্মদপুর রাখার মধ্যে দিয়ে সীতারামের কৌশলী বুদ্ধিমত্তাও প্রকাশিত হয়েছিল।

সীতারামের রাজত্ব অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। কয়েক বছর পরে মুর্শিদকুল্লির সঙ্গে তার বোঝাপড়া ভেঙে যায় এবং বাংলার প্রতাপশালী নবাবের রোষে পড়ে তাঁকে রাজ্য ও জীবন হারাতে হয়। ইতিহাস বলে এর পেছনে দায়ী ছিল রাজনৈতিক জটিলতা। সীতারামের জীবন বৃত্তান্তকার আমাদের জানাচ্ছেন, “একদিন সীতারাম নিজের স্বদেশীয় ও বিদেশীয় প্রজা ও পারিষদদের নিয়ে নিজের জমিদারীর কাজ করছেন, এমন সময় আবু তারাপের লোক এসে তাঁকে অত্যন্ত কঠোরভাবে রাজস্বের জন্য তাগাদা দিতে শুরু করল। তারা বলল যে, এক সপ্তাহের মধ্যে রাজস্ব না দিলে জমিদারী বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং আপনাকে বিশেষভাবে অপমানিত ও কারারুদ্ধ হতে হবে, ইত্যাদি। বহু লোকের সামনে রাজদরবারে ফৌজদারের লোকের মুখে এমন অপমানজনক কথা শুনে সীতারাম ক্রোধে অধীর হয়ে পড়লেন, কিন্তু ধৈর্যের বশে তখন কিছু না বলে কোনোমতে ফৌজদারের পাঠানো লোককে বিদায় করলেন।

এরপর তিনি ক্রোধে ও অপমানে উন্মত্ত হয়ে উচ্চৈঃস্বরে বললেন যে, “যে আবু তারাপের শিরশ্ছেদন করে আমার কাছে আনবে, সে দশ হাজার টাকা পুরস্কার পাবে”। আদেশ পেয়ে অনুগত সেনাপতি বীরবর মেনাহাতি (মৃণ্ময়) সঙ্গে সঙ্গে ৪ হাজার অশ্বারোহী ও রূপচাঁদ ৬ হাজার পদাতিক সৈন্যসহ ফৌজদারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলেন এবং সরাসরি ভূষণার দুর্গ আক্রমণ করলেন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত যুদ্ধ চলল। সূর্যাস্তের সময় মেনাহাতি, আবুতারাপের ছিন্ন মস্তকসহ সীতারামের কাছে উপস্থিত হলেন।

মুর্শিদাবাদের নবাব দরবারে এই খবর পৌঁছালে মুর্শিদকুলি খাঁও খুব ভয় পেয়েছিলেন এবং অবিলম্বে বক্সআলি খাঁ নামক একজনকে উপযুক্ত সৈন্যসহ ফৌজদার আবুতারাপের পদে পাঠালেন এবং সীতারাম রায় ও তাঁর দলবলকে জোর করে ধরে আনার আদেশ দিলেন। তিনি ভূষণার পার্শ্ববর্তী জমিদারদেরও নির্দেশ দিলেন যে, তাঁরাও যেন সীতারামকে ধরার জন্য ফৌজদারকে সাহায্য করেন। যদি কেউ সীতারামকে আশ্রয় দেন, তবে তিনিও দণ্ডিত এবং আবাসচ্যুত হবেন।

বক্সআলি খাঁ যখন ভূষণার দুর্গে পৌঁছালেন, তখন সেই কেল্লা সীতারামের অধীনে ছিল। সীতারাম নিজে ভূষণার এবং মেনাহাতি মহম্মদপুরের নগর রক্ষা করছিলেন। বক্সআলির আগমনের খবর শুনে কেল্লা ও নগর রক্ষার ভার অন্যান্য যুদ্ধনিপুণ ব্যক্তির হাতে দিয়ে সীতারাম, মেনাহাতি এবং বক্তার, এই তিনজনই বক্সআলির আগমনের পথ আটকাতে এগিয়ে গেলেন। নবাবের বহু সৈন্য পদ্মার জলে ডুবে মারা গেল। কিছু সৈন্য লুকিয়ে স্থল ও জলপথে ভূষণার উত্তরে পৌঁছাল। ঐ স্থানে সীতারামের সঙ্গে মুসলমান সৈন্যদের একটি যুদ্ধ হয়। তাতে সীতারামই জয়ী হন। বক্সআলি ব্যর্থ হয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে গেলেন। সীতারামের বীরত্বের খবর শুনে মুর্শিদাবাদ শহর কাঁপতে লাগল।

এরপর নবাব মুর্শিদাবাদ থেকে বহুসংখ্যক সুবাদারী সৈন্যসহ সিংহরামকে এবং জমিদারী সৈন্যসহ দয়ারামকে সীতারামের বিরুদ্ধে পাঠালেন। সীতারামের শত্রুপক্ষদের সহায়তায়, এবার নবাব সৈন্যরা সুবিধা পেয়ে মেনাহাতিকে গুপ্তহত্যা করে। মেনাহাতির হত্যার খবর শুনে সীতারাম একই সঙ্গে শোকে ও দুঃখে কাতর হয়ে পড়লেন।

সীতারাম ভূষণা ছেড়ে মহম্মদপুর আসার পথে এক মাইল অতিক্রম করার পরই নবাব সৈন্য দিয়ে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়লেন এবং অবশেষে সব সৈন্য নদীর পশ্চিম তীরে চলে গেল। বক্তার ও আমীর বেগ, তিন জায়গায় নবাব সৈন্যকে আক্রমণ করলেন। ক্ষত্রিয় বীর সিংহরামের সঙ্গে সীতারামের অনেক বাক-যুদ্ধ হওয়ার পর অসি-যুদ্ধ শুরু হলো এবং মুসলমান সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে গেলে সেবারেও সীতারাম জয়ী হয়ে নির্দিষ্ট সময়ে মহম্মদপুরে পৌঁছালেন।

এই যুদ্ধে সীতারামের বহু সৈন্য ও শক্তি ক্ষয় হয় এবং যুদ্ধোপকরণও খোয়া যায়। তার উপর সেই সময় সীতারাম চারদিক থেকে শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত, বন্ধু বলতে তাঁর কেউ ছিল না; অন্যান্য রাজা ও জমিদার সকলেই তাঁর শত্রু এবং নবাব সৈন্যদের পক্ষে ছিল। সীতারাম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চিন্তা করছেন, এমন সময় হঠাৎ মুসলমান সৈন্য এসে মহম্মদপুরের চারদিক ঘিরে ফেলল। অবশেষে সীতারাম নবাব সৈন্যের হাতে ধরা পড়ে বন্দী হয়ে মুর্শিদাবাদে প্রেরিত হলেন। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।” (রাজা সীতারাম রায় ও তাঁর হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস – সুমন কুমার মিত্র।)

বঙ্কিম যদি এই রাজনৈতিক জটিলতা ও ক্ষমতার অসম বিন্যাসকে ধরে তাঁর আখ্যানকে এগিয়ে নিয়ে যেতেন, তাহলে সীতারাম যথার্থ ঐতিহাসিক উপন্যাস হয়ে উঠতে পারত। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের নবম পরিচ্ছেদটি পড়লে আমরা বুঝতে পারি ‘সীতারাম’ এর মধ্যে সমাজ রাজনীতির ঘনঘটাপূর্ণ ঐতিহাসিক উপন্যাস হয়ে ওঠার কতটা সম্ভাবনা ছিল।

“মধুমতী নদীর তীরে শ্যামপুর নামক গ্রাম, সীতারামের পৈতৃক সম্পত্তি। সীতারাম সেইখানে আসিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। ভূষণায় যে হাঙ্গামা উপস্থিত হইয়াছিল, ইহা যে সীতারামের কার্য, তাহা বলা বাহুল্য। ভূষণা নগরে সীতারামের অনুগত, বাধ্য প্রজা বা খাদক বিস্তর লোক ছিল। সীতারাম তাহাদের সঙ্গে রাত্রিতে সাক্ষাৎ করিয়া এই হাঙ্গামার বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন। তবে সীতারামের এমন ইচ্ছা ছিল যে, যদি বিনা বিবাদে গঙ্গারামের উদ্ধার হয়, তবে আর তাহার প্রয়োজন নাই। তবে বিবাদ হয়, মন্দ নয়,--মুসলমানের দৌরাত্ম্য বড় বেশী হইয়া উঠিয়াছে, কিছু দমন হওয়া ভাল। চন্দ্রচূড় ঠাকুরের মনটা সে বিষয়ে আরও পরিষ্কার — মুসলমানের অত্যাচার এত বেশী হইয়াছে যে, গোটাকতক নেড়া মাথা লাঠির ঘায়ে না ভাঙ্গিলেই নয়। তাই সীতারামের অভিপ্রায়ের অপেক্ষা না করিয়াই চন্দ্রচূড় তর্কালঙ্কার দাঙ্গা আরম্ভ করিয়াছিলেন। কিন্তু শ্রাদ্ধটা বেশী গড়াইয়াছিল—ফকিরের প্রাণবধ এমন গুরুতর ব্যাপার যে, সীতারাম ভীত হইয়া কিছুকালের জণ্য ভূষণা ত্যাগ করাই স্হির করিলেন। যাহারা সে দিনের হাঙ্গামায় লিপ্ত ছিল, তাহারা সকলেও আপনাদিগকে অপরাধী জানিয়া, এবং কোন দিন না কোন দিন ফৌজদার কর্তৃক দণ্ডিত হইবার আশঙ্কায় বাস ত্যাগ করিয়া, শ্যামপুরে সীতারামের আশ্রয়ে ঘর দ্বার বাঁধিতে লাগিল। সীতারামের প্রজা, অনুচরবর্গ এবং খাদক, যে যেখানে ছিল, তাহারাও সীতারাম কর্তৃক আহূত হইয়া আসিয়া শ্যামপুরে বাস করিল। এইরূপে ক্ষুদ্র গ্রাম শ্যামপুর সহসা বহুজনাকীর্ণ হইয়া বৃহৎ নগরে পরিণত হইল।

তখন সীতারাম নগরনির্মাণে মনোযোগ দিলেন। যেখানে বহুজন-সমাগম, সেইখানেই ব্যবসায়ীরা আসিয়া উপস্থিত হয়; এই জন্য ভূষণা এবং অন্যান্য নগর হইতে দোকানদার, শিল্পী, আড়দ্দার, মহাজন এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীরা আসিয়া শ্যামপুরে অধিষ্ঠান করিল। সীতারামও তাহাদিগকে যত্ন করিয়া বসাইতে লাগিলেন। এইরূপে সেই নূতন নগর, হাট, বাজার, গঞ্জ, গোলা, বন্দরে পরিপূর্ণ হইল। সীতারামের পূর্বপুরুষের সংগৃহীত অর্থ ছিল, ইহা পূর্বে কথিত হইয়াছে। তাহা ব্যয় করিয়া তিনি নূতন নগর সুশোভিত করিতে লাগিলেন। বিশেষ এখন প্রজাবাহুল্য ঘটাতে, তাঁহার বিশেষ আয়বৃদ্ধি হইয়াছিল। আবার এক্ষণে জনরব উঠিল যে, সীতারাম হিন্দুরাজধানী স্থাপন করিতেছেন; ইহা শুনিয়া দেশে বিদেশে যেখানে মুসলমানপীড়িত, রাজভয়ে ভীত বা ধর্মরক্ষার্থে হিন্দুরাজ্যে বাসের ইচ্ছুক, তাহারা সকলে দলে দলে আসিয়া সীতারামের অধিকারে বাস করিতে লাগিল। অতএব সীতারামের ধনাগম সম্যক প্রকারে বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। তিনি রাজপ্রাসাদতুল্য আপন বাসভবন, উচ্চ দেবমন্দির, স্থানে স্থানে সোপানাবলীশোভিত সরোবর, এবং রাজবর্ত্ম সকল নির্ম্মাণ করিয়া নূতন নগরী অত্যন্ত সুশোভিতা ও সমৃদ্ধিশালিনী করিলেন। প্রজাগণও হিন্দুরাজ্যের সংস্থাপন জন্য ইচ্ছাপূর্বক তাঁহাকে ধন দান করিতে লাগিল। যাহার ধন নাই, সে শারীরিক পরিশ্রমের দ্বারা নগরনির্মাণ ও রাজ্যরক্ষার সহায়তা করিতে লাগিল।

সীতারামের কর্মঠতা, এবং প্রজাবর্গের হিন্দুরাজ্য স্থাপনের উৎসাহে অতি অল্পদিনেই এই সকল ব্যাপার সুসম্পন্ন হইয়া উঠিল। কিন্তু তিনি রাজা নাম গ্রহণ করিলেন না; কেন না, দিল্লীর বাদশাহ তাঁহাকে রাজা না করিলে, তিনি যদি রাজোপাধি গ্রহণ করেন, তবে মুসলমানেরা তাঁহাকে বিদ্রোহী বিবেচনা করিয়া তাঁহার উচ্ছেদের চেষ্টা করিবে, ইহা তিনি জানিতেন। এ পর্যন্ত তিনি বিদ্রোহিতার কোনকার্যকরেন নাই। গঙ্গারামের উদ্ধারের জন্য যে হাঙ্গামা হইয়াছিল, তাহাতে তিনি প্রকাশ্যে অস্ত্রধারী বা উৎসাহী ছিলেন বলিয়া ফৌজদারের জানিবার কোন কারণ উপস্থিত হয় নাই। কাজেই তাঁহাকে বিদ্রোহী বিবেচনা করার কোন কারণ ছিল না। যখন তিনি রাজা নাম এখনও গ্রহণ করেন নাই; বরং দিল্লীশ্বরকে সম্রাট স্বীকার করিয়া জমিদারীর খাজনা পূর্বমত রাজ-কোষাগারে পৌঁছিয়া দিতে লাগিলেন, এবং সর্বপ্রকারে মুসলমানের সঙ্গে সদ্ভাব রাখিতে লাগিলেন; আর নূতন নগরীর নাম “মহম্মদপুর” রাখিয়া, হিন্দু ও মুসলমান প্রজার প্রতি তুল্য ব্যবহার করিতে লাগিলেন, তখন মুসলমানের অপ্রীতিভাজন হইবার আর কোন কারণই রহিল না।”

কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার এই সম্ভাবনার পথ ধরে বঙ্কিম এগোলেন না। সীতারাম লেখার সময়ে বাঙালির বাহুবলের ইতিহাসের যে অভাব তাঁকে পীড়িত করছিল, সীতারাম ও তাঁর সঙ্গীদের ইতিহাসকে সামনে এনে সেই অভাবের কিছুটা পরিপূরণের যে সুযোগ তাঁর সামনে ছিল, সেই সুযোগও তিনি গ্রহণ করলেন না। বঙ্গদর্শন পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাবার পর স্বনামে না হলেও স্ব উদ্যোগে বঙ্কিম প্রকাশ করতে শুরু করেন ‘প্রচার’  নামের এক নতুন সাময়িক পত্রিকা। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই সীতারাম উপন্যাসের প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল। ঐ একই সংখ্যাতে প্রকাশিত হয়েছিল বঙ্কিমের প্রবন্ধ “বাঙ্গালার কলঙ্ক”। সেই প্রবন্ধে বঙ্কিম লিখেছেন - “কদাচিৎ অন্যান্য ভারতবাসীর বাহুবলের প্রশংসা শুনা যায়, কিন্তু বাঙ্গালীর বাহুবলের প্রশংসা কেহ কখন শুনে নাই। সকলেরই বিশ্বাস, বাঙ্গালী চিরকাল দুর্ব্বল, চিরকাল ভীরু, চিরকাল স্ত্রীস্বভাব, চিরকাল ঘুসি দেখিলেই পলাইয়া যায়। মেকলে বাঙ্গালীর চরিত্রসম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন, এরূপ জাতীয় নিন্দা কখন কোন লেখক কোন জাতি সম্বন্ধে কলমবন্দ করে নাই। ভিন্নদেশীয় মাত্রেরই বিশ্বাস যে, সে সকল কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। ভিন্নজাতীয়ের কথা দূরে থাকুক, অধিকাংশ বাঙ্গালীরও এইরূপ বিশ্বাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙ্গালীর চরিত্র সমালোচনা করিলে, কথাটা কতকটা যদি সত্য বোধ হয়, তবে বলা যাইতে পারে, বাঙ্গালীর এখন এ দুর্দশা হইবার অনেক কারণ আছে। মানুষকে মারিয়া ফেলিয়া তাহাকে মরা বলিলে মিথ্যা কথা বলা হয় না। কিন্তু যে বলে যে, বাঙ্গালীর চিরকাল এই চরিত্র, চিরকাল দুর্ব্বল, চিরকাল ভীরু, স্ত্রীস্বভাব, তাহার মাথায় বজ্রাঘাত হউক, তাহার কথা মিথ্যা। ...   বাঙ্গালীর চিরদুর্ব্বলতা এবং চিরভীরুতার আমরা কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাই নাই। কিন্তু বাঙ্গালী যে পূর্ব্বকালে বাহুবলশালী, তেজস্বী, বিজয়ী ছিল, তাহার অনেক প্রমাণ পাই। ...”   —“বাঙ্গালার কলঙ্ক”—‘প্রচার’, শ্রাবণ ১২৯১, পৃ. ৬-৮

বঙ্কিমের সামনে সুযোগ ছিল, সীতারামের মাধ্যমে, তার প্রধান সেনাপতি মেনাহাতির মাধ্যমে বাঙালি হিন্দুর বাহুবলের দৃষ্টান্তকে সামনে আনা। সীতারাম রায়ের ইতিহাসকারেরা আমাদের জানিয়েছেন, “বাল্যকালে সীতারাম প্রথমে মহিপতিপুরের পাঠশালায় গুরুমশাইয়ের কাছে বাংলা ভাষা শেখেন। সেখানে তিনি কমবেশি সংস্কৃত ভাষাও শিখেছিলেন। এরপর ঢাকায় নবাব সরকারের কর্মচারী তাঁর মাতামহকুলের এক আত্মীয়ের কাছে থেকে সীতারাম কিছুটা আরবি ও পারসি ভাষা শেখেন। ছোটবেলা থেকেই বীরত্বের গল্প শুনে তিনি শৌর্যবীর্যের কাজে অত্যন্ত অনুরাগী হন এবং সামরিক কাজকেই জগতের শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মনে করতেন।

ঢাকায় থাকার সময় আরবি ও ফারসি পড়ার পাশাপাশি সীতারাম সৈন্য বিভাগে যোগ দিয়ে অস্ত্রবিদ্যাও শেখেন। ঢাকার তৎকালীন বিখ্যাত নবাব শায়েস্তা খাঁ একবার সীতারামের অস্ত্র চালনার ক্ষমতা দেখে খুব সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এর ফলস্বরূপ নবাব তাঁকে করিম খাঁ নামক এক দুর্ধর্ষ পাঠান বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে ৭ হাজার পদাতিক ঢালী সৈন্য ও ৩ হাজার অশ্বারোহী সৈন্যসহ পাঠান। এর আগে একবার নবাবের সৈন্যরা ওই বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছিল। সেই কঠিন কাজটিই নবীন যোদ্ধা সীতারামের ওপর দেওয়া হলো। বলা বাহুল্য, অমিতবিক্রমশালী সীতারামের হাতেই করিম খাঁ পরাজিত ও নিহত হন। সীতারামের বীরত্ব ও রণকৌশলে নবাব শায়েস্তা খাঁ অত্যন্ত খুশি হয়ে তাঁকে ভূষণার অধীন নলদি পরগনা জায়গীর হিসেবে দান করেন।

এই নলদীতেই সেই সময় রঘো, শ্যামা প্রভৃতি বারো জন ডাকাতের ভয়ে দেশ কাঁপত। জায়গীর লাভ করে সীতারাম পিতার সঙ্গে দেখা করার জন্য ভূষণার কাছে গোপালপুরে আসেন। পুত্রের যুদ্ধে জয়লাভ ও তার ফলে জায়গীর পাওয়ার সংবাদ শুনে সীতারামের বাবা-মা খুব আনন্দিত হন। …

জায়গীর দখল ও শাসনকার্য পরিচালনার জন্য পিতা পুত্রকে ভালো পরামর্শ দেন। পিতার পরামর্শ এবং নিজের প্রতিভাবলে সীতারাম বিশাল সম্পত্তির অধিকারী হন এবং হরিহরনগর নামে একটি নতুন নগর স্থাপন করেন। সেখানে তিনি বড় বড় দিঘি ও জলাশয় খনন করান। দেবালয় ও দেবসেবা প্রতিষ্ঠিত হলো। সুন্দর প্রাসাদ আর অট্টালিকা দিয়ে সীতারামের নতুন ভবনটি অত্যন্ত মনোরম হয়ে ওঠে। বাইরের লোকের ক্রমাগত আগমনে শহরের শ্রীবৃদ্ধি হতে লাগল। সূর্য্যকুণ্ডে তাঁর নলদি পরগনার কাছারি বাড়ি তৈরি হয়।

সেই সময় নলদি পরগনার রঘো, শ্যামা, রামা, শস্তো, বিশে, হরে, নিমে, কালা, দিনে, ভুলো, জগা এবং যেদো—এই বারো জন কুখ্যাত ডাকাতের ভয়ে দেশ সব সময় কম্পিত হতো। এরা চিঠি লিখে ডাকাতি করত। “অমুক মাসের অমুক দিনের রাত এতটার সময় তোমার সঙ্গে দেখা করব, প্রস্তুত থাকবে”—এইভাবে চিঠি দিয়ে তারা প্রকাশ্যেই গৃহস্থের বাড়িতে ডাকাতি করত।

সীতারাম নানা কৌশলে এই বারো ডাকাতকে দমন করার প্রতিজ্ঞা করেন। দীর্ঘকাল পর তিনি বক্তার খাঁ-এর সাহায্যে ও নিজের চেষ্টায় সেই দস্যুদের দমন করে দেশে শান্তির বাতাস বইয়ে দেন। এই কঠিন কাজ করে তিনি নির্মল খ্যাতি অর্জন করতে সমর্থ হন। এই দস্যুদমনের সময়েই সীতারামের বাবা-মা মারা যান।

এরপর সীতারাম নিম্নবঙ্গের দ্বিতীয় শত্রু আসামী, আরাকানি ও পর্তুগিজদের অত্যাচার নিবারণে সচেষ্ট হন। এই কাজ সফল করার জন্য তিনি ভূষণার তৎকালীন ফৌজদার আবু তারাপের কাছে তীর্থযাত্রার অনুমতি নিয়ে সন্ন্যাসীর বেশে বৈদ্যনাথ, গয়া, কাশী, প্রয়াগ, অযোধ্যা, বৃন্দাবন, মথুরা প্রভৃতি ঘুরে অবশেষে দিল্লীশ্বর আওরঙ্গজেবের দরবারে উপস্থিত হন। শায়েস্তা খাঁ আগে থেকেই সীতারামকে ভালোভাবে চিনতেন এবং স্নেহ করতেন। সীতারামের সহচর, ভালো বক্তা মুনীরাম, সম্রাটকে নিম্নবঙ্গের অত্যাচার ও তার প্রতিকারের কথা বিস্তারিতভাবে জানান। এই কথা শুনে সম্রাট সীতারামকে ‘রাজা’ উপাধি ও পাঞ্জাসহ ফরমান দিয়ে নিম্নবঙ্গের আবাদী সনন্দ প্রদান করেন।

এরপর সীতারাম মুর্শিদাবাদের দরবারে উপস্থিত হয়ে উপযুক্ত আদব-কায়দা দেখিয়ে মুর্শিদকুলি খাঁর সঙ্গে দেখা করেন। মুর্শিদের কাছ থেকেও সীতারাম দ্বিতীয় আবাদী সনন্দ, দশ বছরের রাজস্ব মকুব এবং গড়বেষ্টিত ভবন নির্মাণ ও দেশের অত্যাচার দূর করার জন্য সৈন্য রাখার অনুমতিপত্র পান। মুর্শিদাবাদ থেকে বাড়ি ফেরার পথে কপিলেশ্বরের কাছে কৃষ্ণপ্রসাদ গোস্বামীর সঙ্গে সীতারামের দেখা হয়। তিনি তখনই গণনা করে সীতারামের ভবিষ্যৎ উন্নতির কথা প্রকাশ করেছিলেন। (এই কৃষ্ণপ্রসাদকে বৈষ্ণব ইতিহাসে গৌরাঙ্গদেবের পার্শ্বচর হরিদাস ঠাকুরের পরবর্তী বংশধর বলা হয়েছে।)

১৬৯৭-৯৮ খ্রিস্টাব্দে সীতারামের নতুন রাজধানী মহম্মদপুর নামে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এই নতুন রাজধানী ধনসম্পদে ভরে ওঠে। এই রাজধানী লম্বায় প্রায় ১ মাইল ও চওড়ায় প্রায় আধ মাইল হবে। এটিকে খুব সুন্দরভাবে গড় দিয়ে ঘিরে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সব ঋতুতেই সুখে বসবাস করা যায়। রাজধানীতে বিরাট বাজার-হাটও বসেছিল।

সীতারাম ২২ পরগনার (কারও মতে ৪৪ পরগনার) রাজা ছিলেন। বর্তমানের প্রায় ৩/৪টি জেলার সমান ৭২ হাজার বর্গ পরিমিত স্থান সীতারামের দখলে ছিল। তাঁর রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৭৮ লক্ষ টাকা।

একজন আদর্শ রাজার সমস্ত গুণাবলী ছিল সীতারামের মধ্যে। প্রজাপালন, আইনের রক্ষা, দুষ্টের দমন, রাজ্যবিস্তার, বাণিজ্যের সম্বর্ধন সব দিকের সন্তুলিত সমন্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাঁর রাজ্য। রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশে বনাঞ্চল ও নদীর আধিক্য থাকায় সেখানে মগ ও পর্তুগিজদের উপদ্রব ছিল। তার উপর স্থানীয় ডাকাতদলগুলিও গৃহস্থের ত্রাসের কারণ হয়ে উঠেছিল। সীতারাম তাঁর বলিষ্ঠ নৌবাহিনীর সাহায্যে মগ আর পর্তুগিজদের নিজের রাজ্যসীমা থেকে দূর করলেন। লুঠতরাজ চালাতে থাকা বিক্ষিপ্ত পাঠান ও স্থানীয় ডাকাতদের নিজের সেনাদলে নিয়োগ করে, একদিকে তাদের উপার্জনের ব্যবস্থা করলেন, অন্যদিকে রাজ্যের আইন শৃঙ্খলায় স্থিতাবস্থা আনলেন। সেই সময়ে তাঁর রাজত্বে লোকমুখে ফিরত এই ছড়া, যা আজও মাগুরা, যশোর অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে–

“ধন্য রাজা সীতারাম বাংলা বাহাদুর,

যার বলেতে চুরি ডাকাতি হয়ে গেল দূর

এখন বাঘ মানুষে একই ঘাটে সুখে জল খাবে

রামী শ্যামী পোটলা বেধে গঙ্গাস্নানে যাবে।”

সীতারামের সেনাবাহিনীর দক্ষতা ও পরাক্রম তৎকালীন বাংলার এক গৌরবের বিষয়। তাঁর সামরিক সাফল্যের মূল কারিগর ছিলেন তাঁর বন্ধু ও সেনাপতি রামরূপ (মৃণ্ময়) ঘোষ। প্রবল শক্তি আর শৌর্যের মিশেল এই সেনায়াকের কিংবদন্তী আজও ফরিদপুর, যশোর, খুলনার লোকসমাজে বেঁচে আছে। খালি হাতে, একটি কাঠের পিঁড়ি দিয়ে একটি উন্মত্ত হাতীকে মেরে তিনি লোকমুখে বিখ্যাত হয়েছিলেন ‘মেনাহাতী’ নামে। সীতারামের সেনাদল সমৃদ্ধ ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লড়াকু সেনায়। রূপচাঁদ ঢালি, ফকির মাছকাটা, বখতিয়ার খান, আমল বেগ, গোবর দলন প্রমুখ তাঁর সেনার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত ছিল। সীতারাম নিপুণ অস্ত্র নির্মাণকারীদের এনে দুর্গের ভিতর অস্ত্র, কামান ও গোলা তৈরীর কারখানা স্থাপন করেন। তাঁর গোলন্দাজ বাহিনীর কামানগুলির মধ্যে ‘ঝুমঝুম’ ও ‘কালে’ নির্ভুল নিশানায় আঘাত হেনে শত্রুশিবির ধ্বংস করে বিখ্যাত হয়েছিল।” (রাজা সীতারাম রায় ও তাঁর হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস – সুমন কুমার মিত্র।) উপন্যাসের প্রথম দিকে সীতারাম ও তাঁর সহযোগীদের বীরত্বের প্রসঙ্গ এসেওছিল, বঙ্কিম সে সময় বাঙালির বীরত্বের ইতিহাসের সন্ধানেও ছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও সীতারাম আখ্যান কেন বিপরীত দিকে মোড় নিল, কেন সীতারামের যুদ্ধ ও সংগ্রামের চেয়ে দূরে চলে যাওয়া স্ত্রীকে কাছে পাওয়ার আকুলতা এবং সেই আকুলতা থেকে রাজপাট ধ্বংস হতে দেওয়ার কাল্পনিক অনৈতিহাসিক আখ্যান লিখতে বঙ্কিম ব্রতী হলেন - স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রশ্ন পাঠকের মনে ওঠে।

২

বঙ্কিম সীতারামকে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে নির্মাণ করতে চান নি বলেই বোধহয় এর আখ্যানকে তিনি অন্য খাতে বইয়ে দিয়েছেন। সীতারামের যে মান্য ইতিহাস, তার থেকে সচেতনভাবেই সীতারাম কাহিনীকে তিনি সরিয়ে আনেন। বইয়ের বিজ্ঞাপনে বঙ্কিম স্পষ্টই জানিয়ে দেন, “সীতারাম ঐতিহাসিক ব্যক্তি। এই গ্রন্থে সীতারামের ঐতিহাসিকতা কিছুই রক্ষা করা যায় নাই। গ্রন্থের উদ্দেশ্য ঐতিহাসিকতা নহে। যাঁহারা সীতারামের প্রকৃত ইতিহাস জানিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহারা Westland সাহেবের কৃত যশোহরের বৃত্তান্ত, এবং Stewart সাহেবের কৃত বাঙ্গালার ইতিহাস পাঠ করিবেন।”

এই বদলের ফলে বঙ্কিমের থেকে বাংলার নিজস্ব প্রেক্ষাপটে লেখা কোনও ঐতিহাসিক উপন্যাস পাওয়ার সুযোগ আমাদের হল না, রাজসিংহের মতো রাজপুতনার কাহিনী ভিত্তিক দূর ভূখণ্ডের এক আখ্যানই থেকে গেল বঙ্কিমের একমাত্র যথার্থ ঐতিহাসিক উপন্যাস।

কেন সীতারামকে বঙ্কিম অন্যভাবে গড়লেন?  এর উত্তর সন্ধান করতে গিয়ে আমাদের মনে হয় জাতির মুক্তির জন্য বাহুবল ও বহির্জগতের সক্রিয় কর্মকাণ্ডর প্রয়োজনিয়তা স্বীকার করলেও বঙ্কিমের কাছে সে সময়ে আরো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ধর্মনৈতিকতার আদর্শে এক নতুন ধরনের সমাজ গড়ে তোলা। বাহুবলের চেয়ে নৈতিক চরিত্রবলকে তিনি বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন। বঙ্কিম অনুশীলন ধর্মের তত্ত্ব ও প্রয়োগের যে সব পরীক্ষা নিরীক্ষায় সে সময় আগ্রহী ছিলেন, আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরাণীর মতো উপন্যাসে যার প্রতিফলন প্রবলভাবে ছিল, আমরা দেখি সেই ধারাতেই এরপর তিনি যুক্ত করে দিয়েছেন ‘সীতারাম’কেও। বঙ্কিম দেখাতে চেয়েছেন সীতারামের মতো কেউ যদি বাহুবলের ভিত্তিতে কিছুদিনের জন্য হিন্দুরাজ প্রতিষ্ঠা করেও ফেলেন, নৈতিক চরিত্রে বলশালী না হলে সেই রাজ্য তিনি ধরে রাখতে পারবেন না। নৈতিক চরিত্রে উন্নীত হওয়া কঠিন, কিন্তু সেখানে দীর্ঘদিন স্থিত থাকা যে আরো অনেক কঠিন, সেটাই বঙ্কিম বারবার বলতে চান তাঁর বিখ্যাত ত্রয়ী – ‘আনন্দমঠ’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ ও ‘সীতারাম’ এর আখ্যানগুলিতে। তিনটি উপন্যাসেই সংসার ত্যাগী সন্ন্যাস ব্রত কিছুদিন সাফল্যের সঙ্গে পালনের পর চরিত্রদের তা থেকে স্খলন হয়। মূলত ইন্দ্রিয়ের মোহমায়া তাঁরা কাটাতে পারেন না বলেই যে এমন স্খলন হচ্ছে তা বঙ্কিম দেখাতে থাকেন তাঁর আখ্যানগুলিতে।

আনন্দমঠ উপন্যাসে ভবানন্দের স্খলন এবং জীবানন্দের প্রায়শ্চিত্ত কাহিনী আমাদের দেখায় অনুশীলনে ইন্দ্রিয়জ কাম বা ব্যক্তিগত আসক্তি এলে কীভাবে নিষ্কাম আদর্শ বিঘ্নিত হয় এবং তার সংশোধনের জন্য কেমন কঠোর আত্মত্যাগের প্রয়োজন পড়ে। দেবী চৌধুরাণী ডাকাত সর্দার ভবানী পাঠকের অনুশীলন ধর্মতত্ত্বের শিক্ষা ও প্রয়োগের মধ্যে দশ বছর ছিল। কিন্তু আখ্যান দেখায় দীর্ঘ দশ বছরেও তাঁর সাংসারিক মোহমায়া কাটেনি। স্বামী ব্রজেশ্বরকে সে শরীর মনের কামনা বাসনা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয় নি।  শেষমেষ তাকে বধূ হিসেবে ঘরে ফিরতে হয়েছে।

সীতারাম উপন্যাসেই এই সমস্যা সঙ্কট সবচেয়ে গভীর ও ব্যাপ্ত। শ্রী ভাগ্যবৈগুণ্যে স্বামী পরিত্যক্তা হয়েছিল বিবাহের অনতি পরেই। কিন্তু কেন স্বামী তাঁকে ত্যাগ করেছেন, তা তার তখন জানা ছিল না। ভাই গঙ্গাধরের জীবন রক্ষার তাগিদে সীতারামের সাহায্যপ্রার্থী হবার সময়ে সে জানতে পারে গণৎকারের গণনা অনুযায়ী শ্রী প্রিয়হন্তারক হবে একথা জেনে সীতারাম পরিবারের নির্দেশে শ্রীকে ত্যাগ করেন। বিড়ম্বিত ভাগ্যকথা জানার পরে শ্রী নিজেই সীতারামের থেকে দূরে চলে যায়। এই সময়েই তার সাথে সাক্ষাৎ হয় সন্ন্যাসিনী জয়ন্তীর। জয়ন্তী শ্রীকে ভগবৎপথে চালিত করেন, সংসার থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে সন্ন্যাসধর্মে আশ্রয় দেন। কিন্তু বাস্তবে শ্রী কখনোই স্বামী সংসারের মোহমায়া থেকে মুক্ত হতে পারে নি। স্বামী সীতারামের আরো দুই স্ত্রী রমা ও নন্দা থাকা সত্ত্বেও শ্রীর রূপলাবণ্য সীতারামের কাছে তাকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তোলে। শ্রী সীতারামের সহধর্মিণী হিসেবে থাকতে অস্বীকার করলেও এক কুটীরে সীতারামের পাশাপাশি থেকে সময় অতিবাহিত করতে থাকে। সীতারাম যেমন শ্রীর কামনার আগুনে পুড়তে থাকেন,  শ্রীর শরীর মনও সন্ন্যাসিনীর আবরণ ভেদ করে তাতে সাড়া দেবার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ে। বোঝা যায় দেবী চৌধুরাণীর মতো তারও সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসী জীবন প্রতাবর্তন উন্মুখ হয়ে আছে।

স্বাভাবিক জীবনযাপন পদ্ধতি, যা শৈশব থেকে চরিত্রের মধ্যে দৃঢ়প্রোথিত হয়ে যায়, তাকে জোর করে পাল্টানো কতটা সম্ভব সে প্রশ্ন বরাবরই বঙ্কিমের মনে ছিল। উপন্যাস লেখার আদিপর্বে কপালকুণ্ডলাতে তিনি বলার চেষ্টা করেছিলেন আজন্ম বনমধ্যে বেড়ে ওঠা, কাপালিক সংসর্গে থাকা একটি মেয়ে বিয়ের মাধ্যমে সংসার জীবনে প্রবেশ করলেও তার অন্তরটান অরণ্যপ্রকৃতির দিকে এমনভাবে থেকে যাবে যে স্বাভাবিক সংসারযাত্রা তার পক্ষে কঠিন হবে। শেষপর্বের উপন্যাসগুলিতে, বিশেষত দেবী চৌধুরাণী ও সীতারামে যথাক্রমে প্রফুল্ল ও শ্রীর চরিত্র চিত্রণের মধ্যে দিয়ে বঙ্কিম দেখান পারিবারিক সম্পর্কসূত্রের পরিসরে বেড়ে ওঠা নারীদের মধ্যে স্বামী সংসার জীবন যৌবনের প্রতি টান এমনভাবে রক্তের মধ্যে খেলা করে যে জোর করে তাকে সংসারের বাইরে টেনে এনে সন্ন্যাসী বেশ পরালেই তার রূপান্তর হয়ে যায় না। সন্ন্যাস বাহ্য আবরণ হিসেবে থেকে যায় এবং উপযুক্ত পরিসর পেলে সেই নির্মোক ত্যাগ করে জীবন যৌবনের আকাঙ্ক্ষায় সাড়া দিতে সে উন্মুখ হয়ে থাকে।

বস্তুতপক্ষে ইউরোপীয় মিল বেন্থাম প্রমুখদের ইউটিলিটি দর্শন এবং গীতার ফলের আশা না করে মহৎ উদ্দেশ্যে কাজ করে যাবার নিষ্কাম ধর্মের আদর্শকে মিশিয়ে বঙ্কিম যে অনুশীলন ধর্মের তত্ত্বকে তাঁর শেষদিককার উপন্যাসগুলোতে সামনে এনেছেন, সেই অনুশীলনধর্ম সংসার ত্যাগ করে মুক্তিসন্ধানের কথা বলে না। বঙ্কিমের অনুশীলন ধর্ম সংসারে স্থিত থেকেই ব্যক্তিস্বার্থ পেরিয়ে মহৎ স্বার্থে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করে যাবার বার্তা দেয়।