মেঘনাদবধকাব্য ও পশ্চিম ইউরোপের সাহিত্য সংস্কৃতি
- 07 January, 2026
- লেখক: সৌভিক ঘোষাল
প্রাচীন বা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের থেকে আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যের মেজাজ-মর্জি বা রূপরীতি কতটা আলাদা তা বোঝা যায় মধ্যযুগের শেষ উল্লেখযোগ্য কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর ও আধুনিক যুগের প্রথম পর্বের শ্রেষ্ঠ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা পাশাপাশি রেখে পড়লে। ভারতচন্দ্র ও মধুসূদন উভয়েই ছিলেন বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত। ভারতচন্দ্র সংস্কৃত, আরবী, ফারসী ও হিন্দি খুব ভালো জানতেন এবং এই সমস্ত ভাষার সাহিত্য ও ছন্দের নানা বৈশিষ্ট্যকে তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা অন্নদামঙ্গলে নিয়ে এসেছিলেন। অন্যদিকে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি মেঘনাদবধকাব্য সংস্কৃতের পাশাপাশি গ্রীক, লাতিন, ইতালিয়ন ও ইংরাজী সাহিত্যের বহু উপাদানকে আত্মস্থ করেছে। আরবী বা ফারসির মতো পশ্চিম এশিয়ার ভাষা সাহিত্যের প্রভাব যদি ভারতচন্দ্রের বাংলা লেখাকে বেশি মাত্রায় প্রভাবিত করে থাকে, তবে মধুসূদনের ক্ষেত্রে সেই প্রভাব এসেছে পশ্চিম ইউরোপ থেকে। এর কারণটা আমাদের সমাজ রাজনীতির ইতিহাসে নিমগ্ন। ভারতচন্দ্র যখন ১৭৫২ সাল নাগাদ তাঁর অন্নদামঙ্গল লিখছেন তখন বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ আর দিল্লির তখতে আসীন মুঘল বাদশাহ আহমদ শাহ। নানা ইউরোপীয় শক্তি, বিশেষত ইংরাজ আর ফরাসী বণিকদের কারবার সে সময়েই বাংলার নানা অঞ্চলে ছড়িয়েছে আর মারাঠা বর্গীদের আক্রমণ নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতচন্দ্রের সময়কালের প্রায় একশো বছর পরে ১৮৬১ সালে মধুসূদন যখন তাঁর মেঘনাদবধকাব্য লিখছেন, তখন ইংরেজরা বাংলা তথা ভারতে তাঁদের রাজনৈতিক আধিপত্য পুরোপুরি কায়েম করে ফেলেছে। বস্তুতপক্ষে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনার এক দশকের মধ্যেই প্রথমে পলাশীর যুদ্ধ এবং তারপর বক্সারের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ইংরেজদের বাংলা তথা ভারত বিজয়ের সূচনা হয়েছিল।
উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকেই ইউরোপীয় ধাঁচের স্কুল কলেজ ও শিক্ষাপ্রণালী বাংলায় জাঁকিয়ে বসতে থাকে এবং সমাজের ওপরতলার অংশটি সেই শিক্ষা সংস্কৃতির আবহ দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হয়। অবশ্য সমাজের মধ্যস্তরেও সেই প্রভাব উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অনেকটাই বিস্তৃত হয়েছিল, না হলে মধুসূদন বা বঙ্কিমের সাহিত্য প্রকাশকালেই অমন তুমুল জনপ্রিয়তা পেত না।
ভারতচন্দ্র থেকে মধুসূদনের মাঝের সময়টায় যাঁরা বাংলা কবিতা লিখেছিলেন - সেই কবিওয়ালা বা আখড়াই রচয়িতাগণ অথবা ঈশ্বর গুপ্ত - রূপান্তরকালীন সময়ের নানা বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে আছেন। আখ্যানের দুনিয়ায় মঙ্গলকাব্যর কাহিনি বর্ণনা থেকে বঙ্কিমের পশ্চিমী ধারার উপন্যাস রচনার মাঝের সময়ের রূপান্তরকালীন নানা চেহারা ধরা আছে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নববাবুবিলাস’ ‘নববিবিবিলাস’, কবিতা কমলালয় থেকে কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ পর্যন্ত অসংখ্য নকশা জাতীয় রচনায়। এমনকী প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’, যাকে আমরা সাধারণভাবে প্রথম বাংলা উপন্যাসের স্বীকৃতি দিয়ে থাকি, সেখানেও এই রূপান্তরের নিজস্ব রীতিটি স্পষ্ট। রূপান্তরপর্বের পরীক্ষা নিরীক্ষার শেষে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের আধুনিকতার শুরু একদিকে কবিতায় মধুসূদনের হাতে, অন্যদিকে আখ্যানে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে। এই দুই নতুন সূচনাবিন্দু সময়ের দিক থেকেও কাছাকাছি। ১৮৬১ তে মেঘনাদবধ্য কাব্যের প্রথম প্রকাশ আর বঙ্কিমের প্রথম বাংলা উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনীর প্রকাশকাল ১৮৬৫। পশ্চিমী সাহিত্যের প্রভাব যে এই আধুনিকতার জন্ম দিয়েছিল, সে নিয়ে সংশয়ের কোনও জায়গা নেই।
মধুসূদনের সামগ্রিক সাহিত্যকীর্তিতে পশ্চিমী প্রভাব কোথায় কতটা তার সামগ্রিক বিশ্লেষণ আমাদের এই লেখার বিষয় নয়। আমরা এখানে কেবল বেছে নিয়েছি তাঁর শ্রেষ্ঠ লেখা ‘মেঘনাদবধকাব্য’কে এবং দেখতে চেয়েছি তার শরীরে পশ্চিমী প্রভাবের চিহ্নগুলি কতটা কোথায় কীভাবে আছে।
বিশ্বনাথ বর্ণিত সংস্কৃত আদর্শের মহাকাব্য নয় অ্যারিস্টটল কথিত epic রচনাতেই ছিল মধুসূদনের উৎসাহ। অ্যারিস্টটল তাঁর পোয়েতিকস এ বলেছিলেন, epic-কে হতে হবে "με τη μορφή αφηγηματικού στίχου· Είναι σαφές ότι η πλοκή του πρέπει να είναι δραματικά κατασκευασμένη, όπως αυτές των τραγωδιών" [“in the form of narrative verse; clearly its plot should be dramatically constructed, like those of tragedies”] মেঘনাদবধ কাব্য স্পষ্টতই বর্ণনামূলকরীতির কাব্য এবং এর কাহিনি বৃত্তে রয়েছে নাটকীয়তা। যার পরিণতি শেষ পর্যন্ত বিয়োগান্তক। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যাদর্শে ট্রাজেডির কোনো স্থান ছিল না— সমস্ত কিছুর পরিণতি ছিল আবশ্যিকভাবে মিলনান্তক। এই বৈশিষ্ট্য মধুসূদন পূর্ববর্তী বাংলা সাহিত্যেও ছিল— কিন্তু মধুসূদনই সর্বপ্রথম বাংলা সাহিত্যে নিয়ে এলেন ট্রাজেডির বেদনাবহ পরিণতি। এছাড়া অ্যারিস্টটল কথিত ‘single metre’-কে অনুসরণ করেই সমস্ত মেঘনাদবধ কাব্য রচিত হয়েছে কেবলমাত্র ‘অমিত্রাক্ষর’ ছন্দে। মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর ছন্দও পাশ্চাত্য সাহিত্যের অনুসরণে সৃষ্ট। অমিত্রাক্ষর ছন্দে মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ এর ব্ল্যাঙ্ক ভার্স ছন্দের সার্থক বঙ্গীকরণ ঘটিয়েছেন মধুসূদন। তবে এই প্রসঙ্গে এটাও মাথায় রাখার বাংলা পয়ার ছন্দের চিরাচরিত আধারের কাঠামোর ওপরেই মধুসূদন তাঁর নতুন ছন্দ নির্মাণ করেন। পয়ারের আট ছয় ছকটি তিনি আগাগোড়া বজায় রাখলেন, কিন্তু অন্ত্যমিলের জায়গাটা ছেড়ে দিলেন। এক চরণে বাক্যযতি না রেখে চরণকে একাধিক পংক্তিতে করে দিলেন বিন্যস্ত। যে গতি ও মুক্তি আকাঙ্ক্ষা নবযুগের অন্যতম অভিজ্ঞান, মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবাহের মধ্যে রয়েছে সেই গতি ও মুক্তির দ্যোতনা।
মধুসূদন তাঁর বিভিন্ন চিঠিপত্রে মেঘনাদবধ কাব্যে গ্রিক প্রভাবের কথা বলেছেন; গ্রিক পুরাণ এবং গ্রিক গল্পের অনুসৃতির কথা স্বীকার করেছেন। “It is my ambition to engraft the exquisite graces of the Greek mythology on our own; in the present poem, I mean to give free scope to my inventing powers and to borrow as little as I can from Valmiki. . . . I shall not borrow Greek stories but write, rather try to write, as a Greek would have done.” [রাজনারায়ণ বসুকে লেখা ১৪ জুলাই ১৮৬০ এর চিঠি।]
মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গের যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা প্রসঙ্গে হোমারের ইলিয়ড কাব্যের প্রভাব রয়েছে। মধুসূদন লিখেছেন “পড়িয়াছে যন্ত্রীদল যন্ত্রদল মাঝে/ হৈমধ্বজ দণ্ড হাতে, যম-দণ্ডাঘাতে/ পড়িয়াছে ধ্বজবহ।”— বিশেষভাবে স্মরণীয় ইলিয়ড কাব্যের যে অনুবাদ মাইকেল করেছিলেন সেই ‘হেকটরবধে’ও অনুরূপ ভাষাবিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। প্রথম সর্গে মধুসূদন গ্রিক পুরাণের প্রভাবে সিন্ধু ও জামুর চিরন্তন সংঘর্ষের কথা উপমা হিসাবে ব্যবহার করেছেন। “চৌদিকে এবে সমরতরঙ্গ/ উথলিল, সিন্ধু যথা দ্বন্দ্বি বায়ু সহ/ নির্ঘোষে।” আবার বারুণী এবং মুরলা প্রসঙ্গের উপস্থাপনে এসেছে মিলটনের comus-এর অন্তর্গত Severn নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী Salerina এবং Nymph ligea-এর প্রত্যক্ষ প্রভাব। ভার্জিলের ইনিড কাব্যের Book-I এর একস্থানের প্রভাবে লিখেছেন “সাধিনু সেদিন আমি বাঁধিতে শৃঙ্খলে/ বায়ু-বৃন্দে, কারাগারে রোধিতে সবারে।” বীরবাহুর মৃত্যু সংবাদ শোনার পর মেঘনাদের আচরণের বর্ণনা করেছেন কবি, “ছিঁড়িলা কুসুমদাম রোষে মহাবলী/ মেঘনাদ, ফেলাইলা কনক-বলয়/ দূরে পদতলে পড়ি শোভিল কুণ্ডল।” এক্ষেত্রে তাসোর জেরুজালেম ডেলিভার্ড কাব্যের Book XIV-এর Rinaldo-র আচরণের প্রভাব পড়েছে।
মেঘনাদবধ কাব্যের দ্বিতীয় সর্গে রাবণকে যুদ্ধে পর্যুদস্ত করার জন্য দেবতাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এই কাহিনি বাল্মীকি বা কৃত্তিবাসে নেই। মধুসূদন হোমারের ইলিয়ড কাব্যের প্রভাবে এই সর্গটি রচনা করেন। বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে মেঘনাদবধ কাব্যের দ্বিতীয় সর্গ পাঠিয়ে কবি লিখেছিলেন— “As a reader of the Homeric epics, you will no doubt, be reminded of the fourteenth Iliad and I am not ashamed to say, that I have, intentionally imitated it— Juno’s visit to Jupiter on Mount Ida.” শুধুমাত্র কাহিনি সংগঠনে নয়, চরিত্র পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও মধুসূদন স্পষ্টতই হোমারকে অনুসরণ করেছেন। ইলিয়ডের কাহিনিতে আছে জিউসের সদা জাগ্রত দৃষ্টির ছায়াতলে ট্রয় বিরোধী দেববৃন্দ গ্রিক সেনাপতিদের সাহায্য করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। অনুরূপে মধুসূদনের কাব্যেও দেখি পরম শৈব রাবণের উপর সর্বক্ষণ কৃপাদৃষ্টি বর্ষণ করে তাকে নিরাপদে রেখেছিলেন স্বয়ং দেবাদিদেব। কিন্তু হীরী যেমন জিউসকে বশীভূত করে ট্রয়ের সর্বনাশের পথ পরিষ্কার করেন তেমনই পার্বতীও মহাদেবকে বশীভূত করে রাবণ বিনাশের পথ সুপ্রশস্ত করেন। তবে মহাদেবের নিদ্রাভঙ্গের জন্য কামদেব মদনের যে প্রসঙ্গ এসেছে তাতে কালিদাসের কুমারসম্ভব কাব্যের প্রভাব আছে। অবশ্য একথাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মধুসূদনের কল্পনায় কালিদাসের মদন কোনো কোনো আচরণে গ্রিক পুরাণের কিউপিড-এর বালক মূর্তি পরিগ্রহ করেছে। যেমন— “ভয়াকুল ফুল-ধনুঃ পশিলা অমনি ভবানী বক্ষস্থলে” ইত্যাদি।
মেঘনাথবধ কাব্যের তৃতীয় সর্গে মধুসূদন এ কাব্যের নায়িকা প্রমীলার যে মূর্তি অঙ্কন করেছেন তাতে দেশী-বিদেশি একাধিক কবির প্রভাব রয়েছে। ভার্জিলের ‘ইনিড’ মহাকাব্যের নায়িকা ক্যামিলা, তাসোর ‘জেরুজালেম ডেলিভার্ড’ মহাকাব্যের Clorinda, কুইন্টাস অফ স্মার্না রচিত ‘Where Homer Ends’ কাব্যের আমাজন রমণীদের ছাপ গভীরভাবে প্রমীলার চরিত্রে দেখা যায়।
মেঘনাদবধ কাব্যের চতুর্থ সর্গে ভারতীয় আদর্শ অনুসারেই মধুসূদন রাম সীতার দাম্পত্য চিত্রণ করেছেন। কিন্তু কাব্যের কোথাও কোথাও পাশ্চাত্য প্রভাব এই মহাকাব্যের স্বাভাবিক চিত্র হিসেবেই এসেছে। সীতা মারীচের মায়াকণ্ঠস্বর শুনে লক্ষ্মণকে ভর্ৎসনার যে কথা স্মরণ করেছেন তাতে তাসোর জেরুজালেম ডেলিভার্ড কাব্যের প্রভাব এসেছে। মাইকেল লিখেছেন, “ঘোর বনে নির্দয় বাঘিনী/ জন্ম দিয়া পালে তোরে বুঝিনু দুর্ম্মতি,” তাসো লিখেছিলেন, "e lupi salvatici che rugghiano sui freddi dirupi di qualche ruvida Alpina Allattavano la sua giovinezza." [and wild wolves roaring on the cold crags of some rugged Alpine mountain Suckled her youth]
সীতা সরমাকে তার স্বপ্নে মা বসুন্ধরার কাছে ভবিষ্যৎ শ্রবণের যে কথা বলেছেন, “দেখিনু স্বপনে আমি বসুন্ধরা সতী/ মা আমার দাসী-পাশে আসি দয়াময়ী/ কহিলা, লইয়া কোলে সুমধুর বাণী/ . . . ভবিতব্য দ্বার খুলে দেখি; দেখ চেয়ে” তাতে ভার্জিলের ‘ইনিড’ কাব্যের প্রভাব এসেছে। এই কাব্যে নায়ক ঈনিসের পিতা অ্যাঙ্কাইসিস পুত্রকে ভবিষ্যৎ দর্শন করিয়েছিলেন।
মেঘনাদবধ কাব্যের পঞ্চম সর্গের প্রথমেই দেখি মন্দিরের নিদ্রারত দেবতাদের ছবি। “সুবর্ণ মন্দিরে সুপ্ত আর দেব যত।” সেই সঙ্গেই মধুসূদন এঁকেছেন চিন্তাশীল দেবাদিদেবের বিনিদ্র নিশি যাপনের চিত্র। বস্তুতপক্ষে হোমারের ইলিয়ড কাব্যের দ্বিতীয় সর্গে নিদ্রিত দেবতামণ্ডলীর মধ্যে জাগ্রত দেবরাজ জিউসের যে বর্ণনা আছে তার দ্বারা সম্ভবত মধুসূদন এখানে প্রভাবিত হয়েছেন। মায়াদেবী স্বপ্নদেবীকে যে আদেশ করেছেন, “যাও তুমি লঙ্কাধামে, যেথায় বিরাজে/ শিবিরে সৌমিত্রি শূর। সুমিত্রার বেশে/ বসি শিরোদেশে তার, কহিও . . .” তাও হোমারীয় রীতি অনুসরণের ফল। এরকম ছদ্মবেশে স্বপ্ন বা বাস্তবে কোন দেবদেবীর দেখা দেওয়া হোমারীয় মহাকাব্যের বিশিষ্ট রীতি। ‘উত্থান দুয়ারে’ উপস্থিত লক্ষ্মণের সম্মুখে অবতীর্ণ যে মায়াসিংহের কথা কবি বলেছেন তার কল্পনায় তাসোর ‘জেরুজালেম ডেলিভার্ড’ কাব্যের প্রভাব রয়েছে। পঞ্চম সর্গে ইন্দ্রজিতের সঙ্গে প্রমীলার প্রেমময় সাক্ষাৎকারের আবেগদীপ্ত ছবি এঁকেছেন মধুসূদন। এর সঙ্গে মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট কাব্যের নিদ্রিত ইভের প্রতি অ্যাডামের উক্তির প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ।
“He, on his side
Leaning half raised, with looks of cordial love
Hung over her enamoured, and beheld
Beauty, which, whether waking or asleep,
Shot forth peculiar graces; then with voice
Mild, as when Zephyrus on Flora breathes,
Her hand soft touching, whispered thus. Awake,
My fairest, my espoused, my latest found,
Heaven's last best gift, my ever new delight!”
মিলটনের রচনার এই অংশের প্রভাবে, অনেক সময়েই যেন অনুবাদ করে মধুসূদন লেখেন –
কুসুম-শয়নে যথা সুবর্ণ-মন্দিরে
বিরাজে বীরেন্দ্র বলী ইন্দ্রজিৎ, তথা
পশিল কূজন-ধ্বনি সে সুখ-সদনে।
জাগিলা বীর-কুঞ্জর কুঞ্জবন-গীতে।
প্রমীলার করপদ্ম করপদ্মে ধরি
রথীন্দ্র, মধুর স্বরে, হায় রে যেমতি
নলিনীর কাণে অলি কহে গুঞ্জরিয়া
প্রেমের রহস্য-কথা, কহিলা (আদরে
চুম্বি নিমীলিত আঁখি)—“ডাকিছে কূজনে,
হৈমবতী ঊষা তুমি, রূপসি, তোমারে
পাখিকুল। মিল, প্রিয়ে, কমললোচন।
উঠ, চিরানন্দ মোর! সূর্য্যকান্তমণি-
সম এ পরাণ, কান্তে; তুমি রবিচ্ছবি;—
তোজোহীন আমি, তুমি মুদিলে নয়ন।
ভাগ্য-বৃক্ষে ফলোত্তম তুমি হে জগতে
আমার! নয়ন-তারা! মহার্হ রতন।
উঠি দেখ, শশিমুখি, কেমনে ফুটিছে,
চুরি করি কান্তি তব মঞ্জু-কুঞ্জবনে
কুসুম!” চমকি রামা উঠিলা সত্বরে,
গোপিনী-কামিনী যথা বেণুর সুরবে।
মেঘনাদবধ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গে রামচন্দ্রের প্রতি ‘আকাশসম্ভবা সরস্বতী’ যে দৃশ্যের ইঙ্গিতে লক্ষ্মণের সুনিশ্চিত জয়ের ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন তাতে এসেছে হোমারীয় প্রভাব। হোমারের ইলিয়ড মহাকাব্যে ”Omen” দ্বারা ভবিষ্যৎ ফলাফলের ইঙ্গিত দেবার প্রচলিত রীতিই এখানে মধুসূদন অনুসরণ করেছেন। রাম লক্ষ্মণকে কবি বারবার ‘দেবকুলপ্রিয়’ অভিধায় অভিহিত করেছেন।” ‘favoured by the gods”— এই জাতীয় বিশেষণ হোমারের কাব্যে বহুব্যবহৃত; মধুসূদন এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। লক্ষ্মণ এবং বিভীষণের অদৃশ্যভাবে লঙ্কা মুখে যাত্রার যে ছবি এঁকেছেন কবি তাতে ইলিয়ড কাব্যের ২৪ তম সর্গে বর্ণিত Priam এবং দেবদূত Hermes এর অদৃশ্যভাবে গ্রিক শিবিরে যাত্রার প্রভাব এসেছে। নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের সঙ্গে যুদ্ধে অসহায় নিরস্ত্র মেঘনাদ যখন একে একে শঙ্খ, ঘন্টা, উপহার পাত্র নিক্ষেপ করছিলেন শত্রুর উদ্দেশে তখন “মায়াময়ী মায়া, বাহু প্রসারণে/ ফেলাইলা দূরে সবে, জননী যেমতি/ খেদান মশকবৃন্দে সুপ্ত সুত হতে/ করপদ্ম সঞ্চালনে।” হোমারের ইলিয়ড মহাকাব্যে দেবী আথেনী পন্ডর্শ কর্তৃক ম্যানিলুসের প্রতি নিক্ষিপ্ত তীর সরিয়ে দিয়েছেন। সেখানে হোমারও মশকাদি তাড়নের উপমা ব্যবহার করেছেন।
কাব্যের সপ্তম সর্গে দেখি মেঘনাদের মৃত্যুতে কাতর ‘কৈলাশ সদনে গিরিশ।’ পার্বতীর অনুরোধে তিনি ইন্দ্রজিৎ বধে লক্ষ্মণকে সাহায্য করেছেন, রামচন্দ্রকে তুষ্ট করেছেন। আবার রাবণের মর্মযন্ত্রণার কথা স্মরণ করে তাকেও তুষ্ট করার কথা ভেবেছেন— ‘তুষিনু বাসবে, সাধ্বি কর অনুরোধে/ দেহ অনুমতি এবে তুষি দশাননে।” শিবের এই আচরণ হোমারের ইলিয়ড কাব্যের দেবরাজ জিউস এর আচরণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। একদিন হীরী আথেনীর অনুরোধে তিনি গ্রিকদের বিজয় দান করেছেন, অন্যদিন আফ্রোদিতি প্রমুখের অনুরোধে বা স্বেচ্ছায় ট্রয় বাসীদের তুষ্ট করেছেন। পার্বতীপুত্র কার্তিক রামচন্দ্রের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে রাবণের হাতে তীব্রভাবে আহত হন। “সরোষে তেজস্বী আজই মহারুদ্রতেজে/ হুংকারী হানিল অস্ত্র রক্ষকুলনিধি/ অগ্নিসম শরজালে কাতরিয়া রণে/ শক্তিধরে।” রণদেবতা কার্তিকের এই আঘাত প্রসঙ্গে মনে আসে হোমারের ইলিয়ডে গ্রিকবীর দ্যোমিদ কর্তৃক রণদেবতা আরেস-এর আহত হবার কথা। রাবণের শরাঘাতে লক্ষ্মণ ভূপতিত হতেই ‘দেখি রথত্যাজি রক্ষরাজ বলী ধাইল ধরিতে শবে।’ তা দেখেই ‘হাহাকারে দেবনররথী বেড়িলা সৌমিত্রী শূরে’ আর পার্বতী শিবকে সকাতরে মিনতি করলেন, “রক্ষ নাথ লক্ষ্মণের দেহ।” কিন্তু দুঃশাসনের রক্তপান প্রসঙ্গ ব্যতীত ভারতীয় মহাকাব্যে যুদ্ধে হত শত্রুর দিকে দৃকপাত করার রীতি প্রচলিত নেই। হোমারের মহাকাব্যে হত শত্রুর দেহ অধিকার এবং মৃতদেহের লাঞ্ছনা রণগৌরব রূপে স্বীকৃত হয়েছে। মধুসূদন এখানে হোমারের দ্বারা প্রভাবিত।
মেঘনাথবধ কাব্যের অষ্টম সর্গের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্রেতপুরীর বর্ণনা; রামের নরক দর্শন প্রসঙ্গ, সেখানে রাম স্বর্গীয় দশরথের সঙ্গে মিলিত হয়ে লক্ষ্মণকে বাঁচিয়ে তোলার কৌশল জানতে পেরেছিলেন। মধুসূদন নিজেই বলেছেন রামের নরক দর্শন ভার্জিলের ‘ইনিড’ কাব্যের আদর্শে পরিকল্পিত। একটি পত্রে তিনি লিখেছেন, “I have finished the sixth seventh books of Meghnad and am working away at the eight. Mr Ram is to be conducted through hell to his father, Dasaratha, like another Aeneas.” ভার্জিল ছাড়াও ইতালিয় কবি দান্তের ডিভাইন কমেডির ইনফার্নো অংশ দ্বারাও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। নরক দ্বারে আগ্নেয় অক্ষরে লিখিত যে বাণী মধুসূদনের রামচন্দ্র দেখেছিলেন “এই পথ দিয়া/ যায় পাপী দুঃখ দেশে চির দুঃখ ভোগে/ হে প্রবেশি ত্যাজি স্পৃহা, প্রবেশ এ দেশে।” সেই অংশটি স্পষ্টতই দান্তের ইনফার্নোর তৃতীয় অধ্যায়ের অনুসরণে লিখিত।
Per me si va ne la città dolente,
per me si va ne l’etterno dolore,
per me si va tra la perduta gente.
Giustizia mosse il mio alto fattore:
fecemi la divina podestate,
la somma sapienza e ‘l primo amore.
Dinanzi a me non fuor cose create
se non etterne, e io etterno duro.
Lasciate ogne speranza, voi ch’intrate.
[THROUGH ME THE WAY TO THE CITY OF WOE,
THROUGH ME THE WAY TO ETERNAL PAIN,
THROUGH ME THE WAY AMONG THE LOST.
JUSTICE MOVED MY MAKER ON HIGH.
DIVINE POWER MADE ME,
WISDOM SUPREME, AND PRIMAL LOVE.
BEFORE ME NOTHING WAS BUT THINGS ETERNAL,
AND I ENDURE ETERNALLY.
ABANDON ALL HOPE, YE WHO ENTER HERE.]
মেঘনাদ বধ কাব্যের নবম সর্গে রাবণকে দেখি মেঘনাদের অন্ত্যেষ্টির জন্য রামের কাছে সাতদিন যুদ্ধ বিরতি প্রার্থনা করতে, ‘তিষ্ঠ তুমি সসৈন্যে এ দেশে/ সপ্ত দিন, বৈরিভাব পরিহরি রাম’। উল্লেখযোগ্য যে হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যে পুত্র হেক্টরের অন্ত্যেষ্টির জন্য অ্যাকিলিসের কাছে ১১ দিন যুদ্ধবিরতি প্রার্থনা করেছিলেন। সীতা নিজ অদৃষ্টকে সব অনাচারের জন্য দোষারোপ করে যে কথা বলেছেন, “সুখের প্রদীপ সখি নিবাইলো সদ্য/ প্রবেশি যে গৃহে, হায় অমঙ্গলারূপী/ আমি।” তার মধ্যে হেলেনের উক্তির ছাপ স্পষ্ট— “The wretched source of all this misery.”
মেঘনাদবধ কাব্যের অন্তিম পংক্তিগুলিও যে হোমার প্রভাবিত, মধুসূদন আর হোমার পাশাপাশি রেখে পড়লে সেটা স্পষ্ট হয়। ইলিয়াডে হোমার লিখেছিলেন
Καί ὑψηλὰ ἐν αἰθέρι σύλβαν ἀνύψωσαν.
Ἀλλὰ ὅτε δέκατον καλὸν ἦμαρ ἤρξατο φαίνεσθαι,
Πρὸς τὸν σωρὸν ἤλυθε ὁ θεῖος ἀνήρ,
Καὶ ἀνακεκλινμένος ὑψηλὰ: πάντες δὲ, μετὰ δακρύων ὀφθαλμοῖς,
Ἐθεάσαντο τὰς φλόγας καὶ τοὺς κυλιόμενους καπνούς.
Ὥς δὲ ἠώς, θυγάτηρ Ἠοῦς ῥοδοδάκτυλος,
Με ῥοδακῇ λαμπρότητι ἐζωγράφισεν τὸ δρόσον χλόην,
Καί πάλιν τὰ θρηνικὰ πλήθη περιήγον τὴν πυράν,
Καί ὄινῳ ἔσβησαν τὸ ἐναπολειπόμενον πῦρ.
Τὰ χιονισμένα ὀστέα θείους καὶ ἀδελφοὺς τοποθέτησαν,
Μετὰ δακρύων συναθροισθέντα, ἐν χρυσέῳ ἀγγεῖῳ.
Τὸ χρυσέον ἀγγεῖον ἐν πορφυρῷ πέπλῳ περιέπτυξαν,
Τῇ μαλακωτάτῃ ἁφῇ καὶ χρυσῷ ἐντεθειμένα.
Τελευταῖον, ὑπὲρ τοῦ ἀγγείου τὴν ἱερὰν γῆν ἐστρωσαν,
Καί ἀνέστησαν τὸν τύμβον, μνήμα τῶν νεκρῶν.
Ἰσχυροί φρουροὶ καὶ κατάσκοποι, ἕως πάντα τὰ ἱερὰ ἐπληρώθη,
Παρετήρουν ἀπὸ τῆς ἀνατολῆς μέχρι τῆς δυσμῆς ἡλίου.
Πάσα Τροία δὲ πάλιν ἦλθεν εἰς τὸν Πριάμου οἶκον.
[And high In air a sylvan structure raise.
But when the tenth fair morn began to shine,
Forth to the pile was borne the man divine,
And placed aloft : while all, with streaming eyes,
Beheld the flames and rolling smokes arise.
Soon as Aurora, daughter of the dawn,
With rosy lustre streaked the dewy lawn,
Again the mournful crowds surround the pyre,
And quench with wine the yet remaining fire.
The snowy bones his friends and brothers place,
With tears collected, in a golden vase;
The golden vase in purple palls they rolled,
Of softest texture, and inwrought with gold.
Last, o'er the urn the sacred earth they spread,
And raised the tomb, memorial of the dead.
Strong guards and spies, till all the rites were done,
Watched from the rising to the setting sun.
All Troy then moves to Priam's court again]
ইলিয়ড দ্বারা প্রভাবিত মধুসূদন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ শেষ করলেন হোমারের অনুসরণেই –
দুগ্ধধারে নিবাইল উজ্জ্বল পাবকে
রাক্ষস। পরম যত্নে কুড়াইয়া সবে
ভস্ম, অম্বুরাশিতলে বিসর্জ্জিলা তাহে।
ধৌত করি দাহস্থল জাহ্নবীর জলে
লক্ষ রক্ষঃশিল্পী আশু নির্ম্মিল মিলিয়া
স্বর্ণ-পাটিকেলে মঠ চিতার উপরে;—
ভেদি অভ্র, মঠচূড়া উঠিল আকাশে।
করি স্নান সিন্ধুনীরে, রক্ষোদল এবে
ফিরিলা লঙ্কার পানে, আর্দ্র অশ্রুনীরে—
বিসর্জ্জি প্রতিমা যেন দশমী-দিবসে!
সপ্ত দিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে।
মধুসূদন বহুপাঠী ছিলেন। মন দিয়ে হোমর, ভার্জিল, দান্তে, তাসো বা মিলটন পড়েছিলেন। গ্রীক, লাতিন, খুব ভালো করে শিখেছিলেন এইসব কবিদের লেখা মূল ভাষায় পড়বেন বলে। ইতালিয়ান সাহিত্য তিনি ইংরাজী অনুবাদেই সম্ভবত পড়েছিলেন, বিশেষ করে দান্তে ও তাসো। দান্তে বা পেত্রার্ক এর সনেট পড়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি জন্ম দিয়েছিলেন বাংলা ভাষার প্রথম চতুর্দশপদী কবিতাবলীও। পদ্মাবতী নাটক লেখার ক্ষেত্রে তিনি গ্রীক পুরাণকে কত নিবিড়ভাবে ব্যবহার করেছিলেন সেকথাও আমাদের জানা।
এই নতুন আধুনিকতা পশ্চিমের সাহিত্যরসে জারিত হলেও শুধুই তার অন্ধ অনুসরণ ছিল না। সেরকম হলে তা শিকড় বিচ্ছিন্ন বলে পরিগণিত হত এবং আতসবাজির চমক সৃষ্টি করে কিছুদিনের মধ্যেই মিলিয়ে যেত। কিন্তু প্রথম প্রকাশের শ দেড়েক বছর পরেও যে এগুলি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অভিজ্ঞান হয়ে আছে, পঠিত ও চর্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণে - তা বুঝিয়ে দেয় পশ্চিমী রূপরীতি নিয়েও তা আমাদের নিজস্বতার অঙ্গনকে পরিত্যাগ করে নি। মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্যের কাহিনিটিই শুধু রামায়ণ থেকে নেওয়া নয়, তাঁর বীরাঙ্গনা বা ব্রজঙ্গনার উপাদানও সংগৃহীত হয়েছে ভারতের মহাকাব্য পুরাণ থেকে। যেমন মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গেই মধুসূদন এনেছেন বাল্মীকির কবিত্বলাভ, চোর রত্নাকরের কাব্য রত্নাকর কবি হয়ে ওঠার প্রসঙ্গটি। এই সর্গেই মহাভারত থেকে এসেছে ময়ের পাণ্ডবদের জন্য প্রাসাদ নির্মাণ বা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলাকালীন শিবের পাণ্ডব শিবির পাহারা দেবার প্রসঙ্গ। পুরাণ কাহিনি থেকে মধুসূদন নিয়েছেন বাসুকীর পৃথিবীর ভার বহনের আখ্যানটি। ‘ফুলদল দিয়া কাটিলা কী বিধাতা শাল্বলী তরুবরে’র মতো পংক্তি আবার কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলমের নীলোৎপল দিয়ে শমীলতা ছেদনের অসম্ভবতা সংক্রান্ত শ্লোকের সাদৃশ্যে লেখা। ‘মুরলা’ নদীর নামটি মধুসূদন সম্ভবত নিয়েছেন ভবভূতির উত্তর রামচরিত থেকে। মেঘনাদবধকাব্যের দ্বিতীয় সর্গে মহাদেবের ধ্যানভঙ্গ বা মদনভষ্মের মতো প্রসঙ্গগুলি এসেছে কালিদাসের ‘কুমারসম্ভবম’ থেকে। তৃতীয় সর্গে যে প্রমীলাকে আমরা দেখি তাতে নানা বিদেশী প্রভাবের পাশাপাশি ব্যাসদেবের মহাভারতের দ্রৌপদী আর কাশীদাসী মহাভারতের প্রভাবও রয়েছে। মেঘনাদবধকাব্যের চতুর্থ সর্গে মধুসূদন সরাসরি বন্দনা করেন রামকথার বিভিন্ন ভারতীয় লেখককে। বাল্মীকি ছাড়াও ভট্টিকাব্যের রচয়িতা ভর্তৃহরি, রামায়ণ ব্যাখ্যাতা পণ্ডিত সূরী, উত্তর রামচরিত ও বীরচরিত রচয়িতা ভবভূতি, ‘ভারতীর বরপুত্র’ কালিদাস, বাঙালি রামায়ণকার কৃত্তিবাসকে মধুসূদন এখানে প্রণাম জানিয়েছেন, দেশজ ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন। মেঘনাদবধ কাব্যের পঞ্চম সর্গে এসেছে ব্রজলীলার উল্লেখ। ষষ্ঠ সর্গে মেঘনাদের মৃত্যুদৃশ্যে ব্যাসদেবের মহাভারত থেকে এসেছে নিরস্ত্র অবস্থায় অভিমন্যুকে হত্যা করা ও অশ্বত্থামা কর্তৃক দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্রকে নিদ্রিত অবস্থায় মেরে ফেলার প্রসঙ্গগুলি। সপ্তম সর্গে রয়েছে মার্কন্ডেয় পুরাণের ব্যবহার। রাবণের বিভিন্ন সেনাপতির নাম – চামর, উদগ্র, বাস্কল, অসিলোমা, বিড়ালাক্ষ প্রভৃতি এখান থেকে নিয়েছেন মধুসূদন। অষ্টম সর্গে বৈতরণী নদীর বর্ণনায় শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের প্রভাব রয়েছে। নবম সর্গের শেষে হোমারের পাশাপাশি মধুসূদন নিয়ে এসেছেন বাঙালির দুর্গাপুজোর প্রসঙ্গটি, ‘বিসর্জ্জি প্রতিমা যেন দশমী-দিবসে’র মতো পংক্তি নিমেষে একে আমাদের আত্মার আত্মীয় করে তুলেছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যর মেলবন্ধন, নিজস্ব ঐতিহ্যকে ফিরে দেখার পাশাপাশি সপ্তসিন্ধু দশদিগন্তকে বরণ করার যে আকাঙ্ক্ষা উনিশ শতকী নবজাগরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্যে রয়েছে তার পূর্ণ প্রকাশ। এ কাব্য তাই শুধু এক চিরায়ত সাহিত্যকীর্তি নয়, একটি বিশেষ যুগের যুগোত্তীর্ণ সংস্কৃতিচিহ্ন।