কমিউনিস্ট আন্দোলনের একশো বছর এবং আজকের বামপন্থা

২০২৫ সাল শেষের দিকে এগোতে এগোতে ভারতের সংগঠিত কমিউনিস্ট আন্দোলন তার শতবর্ষ পূর্ণ করছে। আদর্শগত বর্ণালির অন্য প্রান্তে, অতি-ডানপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-ও ১২ অক্টোবর ২০২৫-এ তাদের শতবর্ষ উদ্‌যাপন করবে। এই কাকতালীয় মিল স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে আনে—কেন কমিউনিস্টরা আজ নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রান্তিক হয়ে পড়েছে, অথচ আরএসএস ক্ষমতার শিখরে পৌঁছে গেছে? কিন্তু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, গত একশো বছরের বড় অংশে—বিশেষ করে প্রথম পাঁচ দশকে—চিত্রটি ছিল উল্টো। তখন আরএসএস তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল, আর কমিউনিস্টদের একটি যথেষ্ট লক্ষণীয় নির্বাচনী উপস্থিতি ছিল।
এই দুই ধারার গতিপথ ভিন্নও হতে পারত। এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে যখন কমিউনিস্ট আন্দোলন সুযোগ হারিয়েছে বা পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে, আর গত কয়েক দশকে একের পর এক ঘটনায় আরএসএস বিপুলভাবে লাভবান হয়েছে। যতদিন কংগ্রেস রাজনীতির ময়দান দখল করে রেখেছিল, ততদিন একসময় এমন এক পর্ব এসেছিল যখন বাম ও ডান—দুই বিরোধী শক্তিই একসঙ্গে বেড়ে উঠছিল, যদিও দেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু প্রায় গোটা নীতিগত পরিসর জুড়ে ডানদিকে ঝুঁকে পড়া এবং সংঘ পরিবারের আগ্রাসনের কাছে কংগ্রেসের নতি স্বীকারের ফলে, ২০১৪ সালের পর থেকে ভারত কার্যত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র দখলে চলে যেতে দেখছে, আর কমিউনিস্টরা গতি হারিয়েছে।
ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বহু শিক্ষা দিতে পারে। কিন্তু আজ কমিউনিস্টদের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হলো—সেই শিক্ষাগুলিকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সময়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া। বহু প্রাক্তন উপনিবেশের মতো ভারতেও কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী স্রোত হিসেবে। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির বৃহত্তর কর্মসূচির ভেতরে থেকেই কমিউনিস্টরা নিজেদের আলাদা করে চিনিয়েছিল প্রজাতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চরিত্রের প্রতি তাদের অটল দায়বদ্ধতা, জমিদারি ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিলোপ, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং সামাজিক অগ্রগতির লক্ষ্যে।
স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা ভারতের সংবিধান সামগ্রিকভাবে এই দিশাকেই স্বীকৃতি দিয়েছিল। স্বাধীনতা ও সংবিধান গ্রহণের সময় আরএসএস আধুনিক ভারতের এই নতুন সাংবিধানিক কাঠামোর স্পষ্ট বিরোধিতা করেছিল। হিন্দুত্ববাদী এক সন্ত্রাসীর হাতে গান্ধীজির হত্যার পর ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার প্যাটেলের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না—দেশের স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে তাঁকে আরএসএস নিষিদ্ধ করতে হয়। প্যাটেলের সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে গান্ধী হত্যার জন্য আরএসএস-প্রচারিত ঘৃণা ও হিংসার পরিবেশকে দায়ী করা হয় এবং সংগঠনটিকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে আরএসএস লিখিতভাবে সংবিধান ও তেরঙা জাতীয় পতাকা মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করার পরই কেবল তাদের ‘সাংস্কৃতিক সংগঠন’ হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
আজ ভারতীয় রাষ্ট্র আরএসএস-কে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও বলে অভিহিত করে এবং স্মারক ডাকটিকিট ও মুদ্রা প্রকাশ করে তাদের শতবর্ষ উদ্‌যাপন করছে। বাস্তবে বিজেপি সরকার ও সাম্প্রদায়িক প্রভাববলয় ‘নিউ ইন্ডিয়া’র আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে আরএসএস-কে প্রতিষ্ঠা করছে, আর শিক্ষা, গবেষণা, নীতি নির্ধারণ ও প্রশাসনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্রমশ আরএসএস-নিযুক্তদের দখলে চলে যাচ্ছে। এর ফলে ভারত এখন এক পরিকল্পিত আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এবং আধুনিক ভারতের সাংবিধানিক ভিত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর এই সর্বগ্রাসী ক্ষয়কে ‘ঔপনিবেশিকতার অবসান’ নামে মহিমান্বিত করা হচ্ছে।
ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী ভারতের উত্তরাধিকার যখন ‘ডিকোলোনাইজেশন’-এর নামে উল্টে দেওয়া হয়, তখন দেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু সংবিধান ও সংসদীয় গণতন্ত্র রক্ষা করার নয়, স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনা পুনরুদ্ধারেরও। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী কেন্দ্রীয় সত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সংবিধানের প্রস্তাবনায় ব্যক্ত আধুনিক ভারতের স্বপ্নকে আবার প্রাণবন্ত করা—এই দুটিই কমিউনিস্টদের সামনে প্রধান আদর্শিক চ্যালেঞ্জ, যখন তারা তাদের দীর্ঘ যাত্রার দ্বিতীয় শতকে পা রাখছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতকে কার্যত দ্বিতীয় এক স্বাধীনতা সংগ্রাম লড়তে হবে, এবং আগামী দিনে এটি হবে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে জরুরি কর্মসূচি।
এই লড়াই বহু স্তরে লড়তে হবে। কর্পোরেট ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’-এর জঙ্গলে, কম মজুরিতে আরও বেশি কাজ করতে বাধ্য লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের কাছে এটি নিছক বেঁচে থাকার লড়াই। যে কৃষকরা কর্পোরেট দখলের তিনটি ভয়াবহ আইন বাতিল করাতে সফল হয়েছিল, তারাও আজও ভীষণভাবে অসুরক্ষিত। শিক্ষা যখন ক্রমশ ব্যয়বহুল পণ্য হয়ে উঠছে এবং চাকরির নিরাপত্তা অধরা হয়ে যাচ্ছে, তখন তরুণ প্রজন্ম স্থায়ী উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার ফাঁদে আটকে পড়ছে। ইউএপিএ-র মতো কঠোর আইন এবং এনআরসি ও স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মসূচি ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিক ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর কাছে স্বাধীনতা ও অধিকারকে বিলাসবস্তুতে পরিণত করছে।
উপনিবেশিক শাসনের দুই শতক শেষে দেশভাগ ছিল আধুনিক ভারতের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। এটি ভারতীয়দের মনে স্থায়ী ক্ষতের স্মৃতি রেখে গেছে এবং এক অখণ্ড ভারতের স্বপ্নকে জন্ম দিয়েছে, যা পরে আরএসএস-এর আক্রমণাত্মক মতাদর্শে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, বিভক্ত ভারতও মহাদেশীয় বিস্তৃতির একটি দেশ—তার সমস্ত জটিলতা, বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তি নিয়ে। এই বৈচিত্র্যকে গুঁড়িয়ে এক অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত একরূপতার দিকে ঠেলে দেওয়ার আরএসএস-এর চেষ্টা দেশকে ভিতর থেকে আরও বেশি খণ্ডিত করছে। সংবিধানের ৪২তম সংশোধনী শুধু প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ দুটি যোগ করেনি, ‘জাতির ঐক্য ও অখণ্ডতা’ কথাটিও যুক্ত করেছিল। সংঘ–বিজেপি শিবির ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের সব উল্লেখ মুছে ফেলতে চায়, কিন্তু তারা বোঝে না যে আমাদের মতো বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক কল্যাণনীতি ছাড়া এক জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে না।
১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কমিউনিস্টদের অজানা ভূখণ্ডে পথ চলতে হয়েছে এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে কিছু বিষয় সবসময়ই স্থির থেকেছে—সামাজিক রূপান্তরের চালিকাশক্তি হিসেবে শ্রেণিসংগ্রাম, পুঁজির সামাজিকীকরণ, শ্রমজীবী শ্রেণির নেতৃত্বে উঠে আসা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন, এবং সব ধরনের শোষণ থেকে মানুষের মুক্তি। সীমাহীন বৃদ্ধির নেশায় পুঁজি শুধু বিশ্বকে যুদ্ধ ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়নি, পরিবেশের অবক্ষয় ও জলবায়ু সংকটের মাধ্যমে আজ গোটা গ্রহের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করেছে।
উদীয়মান ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই সব প্রশ্নের মোকাবিলা কমিউনিস্টরা কীভাবে করবেন? শ্রেণিসংগ্রামের ধারণা ও প্রয়োগকে কেবল অর্থনৈতিক লড়াইয়ের সীমানায় বা বিমূর্ত তাত্ত্বিক পরিসরে বন্দি রাখা যায় না। শ্রেণি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের বাস্তব সামাজিক অস্তিত্ব ও পরিচয়কে ধারণ করতে পারে এবং পুঁজির ক্ষমতা থেকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা পর্যন্ত ক্ষমতার প্রশ্নের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। সংগঠিত আন্দোলনের প্রথম একশো বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে, ভারতের কমিউনিস্টরা কি এমন এক শ্রেণিসংগ্রামের রূপরেখা গড়ে তুলতে পারবেন, যা বর্ণব্যবস্থার নিপীড়নের বিরুদ্ধে আপসহীন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে উদ্‌যাপন করে, লিঙ্গ-ন্যায়ের চেতনায় স্পন্দিত এবং নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও সংবেদনশীলতাকে প্রতিফলিত করে? কঠিন সময় বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দাবি করে।