বাখতিনের দস্তয়েভস্কি

 

উপক্রম

 

বিশ শতকের অন্যতম জীবনতাত্ত্বিক ও আখ্যান-ভাবুক মিখায়েল মিখায়েলোভিচ বাখতিন (১৬ নভেম্বর ১৮৯৫- ৭মার্চ ১৯৭৫) উপন্যাস প্রতীতিকে আমূল পালটে দিয়েছেন দ্বিবাচনিকতার তত্ত্ব দিয়ে। আর এই তত্ত্বের উপযোগিতা তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন ফিয়োডোর মিখায়েলোভিচ ডস্তয়েভস্কি (১১ নভেম্বর ১৮২১- ৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৮১) রচিত অসামান্য কথাকৃতিগুলির ভিত্তিতে। এই আলোচনাকে প্রসারিত করার প্রাক-মুহূর্তে ভাবছি, এ বছর (২০২১) ১১ই নভেম্বর তারিখে ডস্তয়েভস্কির দ্বিশতবর্ষ পূর্তি উদযাপিত হবে। আর এর পাঁচদিন পরে ১৬ নভেম্বর, মিখাইল বাখতিনের ১২৬তম জন্মদিন স্মরণে-মননে তাৎপর্যবহ করে তুলবেন অনুরাগীজনেরা।

 

রুশ ও বিশ্ব কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রসিদ্ধ স্রষ্টা ফিয়োডোর ডস্তয়েভস্কি আরও পুনঃপঠিত ও পুনর্বিশ্লেষিত হতে থাকবেন মূলত এইসব বইয়ের জন্যে - Notes from Underground (১৮৬৪), Crime and Punishment (১৮৬৬), The Idiot (১৮৬৮-১৮৬৯), Demons (১৮৭১-১৮৭২), The Brothers Karmazov (১৮৭৯-১৮৮০)।

এছাড়াও তিনি লিখেছেন Poor Folk (১৮৪৫), The Double (১৮৪৬),The Landlady (১৮৪৭), অসম্পূর্ণ উপন্যাস Netochka Nezvanova (১৮৪৯), Uncle's Dream (১৮৫৯), The Village of Stepanchikovo (১৮৫৯), Humiliated and Insulted (১৮৬১), The House of the Dead(১৮৬২), The Gambler (১৮৬৭), The Eternal Husband (১৮৭০), The Adolescent (১৮৭৫)। এই তালিকায় উপন্যাস ও নভেলা দুইই আছে। সেই সঙ্গে রয়েছে এইসব ছোট গল্পঃ Mr. Prokharchin (১৮৪৬), Novel in Nine Letters (১৮৪৭), Another Man's Wife and a Husband under the Bed (১৮৪৮), A Weak Heart (১৮৪৮), Polzunkov (১৮৪৮), An Honest Thief (১৮৮), A Christmas Tree and a Wedding (১৮৪৮), White Nights (১৮৪৮), A Little hero (১৮৪৯), A Nasty Story (১৮৬২), The Crocodile (১৮৬৫), Bobok (১৮৭৩), The Heavenly Chirstmas Tree (১৮৭৬), A Gentle Creature (১৮৭৬), The Peasant Marey (১৮৭৬), The Dream of a Ridiculous Man (১৮৭৭), সেই সঙ্গে তাঁর দুটি নিবন্ধ সংকলনও মনে রাখতে হবে; Winter Notes on Summer Impressions (১৮৬৩), A Winter's Diary (১৮৭৩-১৮৮১)।

 

নিঃসন্দেহে ‘Crime and Punishment’ই ডস্তয়েভস্কির ম্যাগনামওপাস। সুতরাং কথাকারের বিশ্বাস-চিন্তা উপলব্ধির ভুবন সম্পর্কে যে নির্যাস আহরণ করেছেন বাখতিন, তার প্রধান ভিত্তি এই মহাগ্রন্থ। অবশ্য সেই সঙ্গে ‘The Idiot’ ও ‘The Brothers Karmazov’ তাঁর ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। রুশ ইতিহাসের প্রকট ও অন্তর্লীন বিক্ষোভ মথিত পর্যায়ে ডস্তয়েভস্কি যেভাবে ব্যক্তি-সত্তাকে, চিহ্নিত করেছিলেন, নান্দনিক প্রতীতি তারই সুর-তাল-লয়ে গ্রথিত। মিখায়েল বাখতিন যে নিজস্ব জীবনতত্ত্ব নির্মাণ করেছেন, সেই নিরিখে ডস্তয়েভস্কির আখ্যানবিশ্ব কীভাবে তাঁর কাছে সর্বাধিক তাৎপর্যবহ প্রতিভাত হয়েছিল এইটেই এই প্রতিবেদনে বিবেচনা করতে চাইছি। এইজন্যে প্রধানত তাঁর 'Art and Answerability' 'The Dialogic Imagination', 'Problems of Dostoevsky's Poetics' 'Speech Genres and Other Late Essays’ বইগুলির উপর নির্ভর করব।

 

-১-

 

ডস্তয়েভস্কি যখন মাত্র সতেরো বছরের তরুণ, সে সময় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবেই শিল্পকলার মহত্ব সম্পর্কে তাঁর অটুট আস্থা ছিল। তাই নিকোলাইকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন (প্রথম খণ্ড; ৫০), কবিতার মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকে দর্শনের মহত্তম উপলব্ধি। পরবর্তীকালে বাখতিন যে নিগূঢ় দ্বিবাচনিক সম্পর্কের উদ্ভাস, নন্দন ও দর্শন এবং নন্দন ও সামাজিক ইতিহাসের মধ্যে লক্ষ করেছিলেন, এই উচ্চারণে তার চিহ্ন খুঁজে পাই যেন। শুধু তাই নয়, ডস্তয়েভস্কি স্বৈরতন্ত্রী শাসকের দ্বারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পরে নিতান্ত অতিনাটকীয় ভাবে যখন সেই চরম শাস্তিকে সাইবেরিয়ায় সশ্রম কারাদণ্ডে পরিবর্তিত করা হল, তাঁর ভাইকে চিঠিতে (১ম খণ্ড; ১২ নং) জানিয়েছিলেন তিনি, 'Life exists everywhere and it is within us ourselves, not without us.' এখানেও বাখতিনীয় জীবনতত্ত্বের পূর্বাভাস পাচ্ছি। ডস্তয়েভস্কির চিন্তাভুবনে দ্বিবাচনিকতাই যে আধারশীলা এই নিয়ামক সত্য বাখতিনের বিশ্লেষণে প্রকট। বহু বিশিষ্ট সাহিত্যতাত্ত্বিক নিজস্ব চিন্তাপ্রস্থানের নিরিখে বিশ্বসাহিত্যের স্মরণীয় স্রষ্টাদের পুনরাবিষ্কার করেছেন। গিয়র্গ লুকাচের চোখে যখন টমাস মানকে দেখি, ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’, ‘দ্য হোলি সিনার’, ‘ডক্টর ফস্টাস’ এর মতো আখ্যানের অন্তঃশায়ী তাৎপর্য নতুনভাবে বুঝে নিই। তবে বাখতিনের ডস্তয়েভস্কি যে ভিন্নপথগামী নয় কেবল, তা বহুমাত্রিক জীবনের নান্দনিক উপস্থাপনার আস্তিত্বিক ও দার্শনিক পুনঃসৃষ্টি - এই উপলব্ধিতে পৌঁছাই। তাই এই প্রতিবেদন যুগপৎ বাখতিন ও ডস্তয়েভস্কির পুনর্বিবেচনা। অবশ্য ‘ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট’ এবং ‘দ্য ইডিয়ট’এর স্রষ্টাকে দেখব বাখতিনের দ্রষ্টাচক্ষু যথাসম্ভব অনুসরণ করে। তবে এই কেন্দ্রীয় সত্যের বিচ্ছুরণ সম্পর্কে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই যে বাখতিন বিশ্বাস করতেন - 'Any true understanding is dialogic in nature' (1929: 102)। তাই মানব অস্তিত্বের কোনও পর্যায়ে, বিশেষ পরিস্থিতিতে উদ্ভূত কোনও ঘটনা কিংবা চারিত্রিক প্রবণতার কোনও নির্দিষ্ট অভিব্যক্তির প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে দ্বিবাচনিকতার মর্মসত্য অনুধাবন করা আবশ্যিক। জীবন ব্যাপ্ত বিচিত্র উচ্চাবচতার অভিজ্ঞতা মন্থন করে মানব-অস্তিত্বের যে নির্যাস আহরণ করেছিলেন বাখতিন, তা তাঁর বিভিন্ন বইতে বহুমাত্রিক উপলব্ধির আকর; আর তাঁর ডস্তয়েভস্কি-পাঠ এই সবকিছুর অন্তর্ভেদী আলোয় উদ্ভাসিত। বাখতিনের বিভিন্ন তত্ত্ববীজ কত যথার্থ, ডস্তয়েভস্কি পর্যালোচনার প্রায়োগিক নিরিখে তা প্রমাণিত। বাখতিন বুঝিয়েছেন, সৃজনের ভাষা সৃষ্টিকর্মের অন্তর্নিহিত সীমানা পরিসরে সার্থকভাবে ব্যক্ত হয়, কেননা সেখানে মানবচৈতন্য সেখানে নিরন্তর সত্তা ও অপরতার মধ্যে বিবিধ সম্পর্কের গ্রন্থনা নির্মাণ করে। এই যে গ্রন্থনা, তাতে নিহিত থাকে প্রতিবেদনার বিভিন্ন কুশীলবদের নিরবিচ্ছিন্ন মিথস্ক্রিয়া এবং প্রবহমান জীবন সম্পর্কে তাদের প্রত্যুত্তর-যোগ্যতা। জীবন সম্পর্কে নিরবিছিন্নভাবে দায়বোধের প্রমাণ যে দিতে পারে না, তার পক্ষে ঐ যোগ্যতা অর্জন অসম্ভব।

 

-২-

 

বাখতিন এ ব্যাপারে বিশেষ অবহিত যে কোনও সার্থক আখ্যানের পাঠকৃতি প্রকৃতপক্ষে লক্ষ্যভেদী উচ্চারণের সমবায়ী অভিব্যক্তি। সেই উচ্চারণই সার্থক যা গ্রহীতার মধ্যে সম্ভাব্য প্রত্যুত্তরের আকাঙ্ক্ষা সঞ্চারিত করতে সমর্থ। গ্রহীতা যদি আপন প্রত্যুত্তর প্রকটভাবে ব্যক্ত নাও করে, তবু উচ্চারণ সার্থক হতে পারে সম্বোধ্যমানতার প্রক্রিয়া যদি পাঠককেও বিদ্ধ করে। অব্যক্ত উচ্চারণেও নিহিত থাকে প্রাগুক্ত দায়বোধ। এবং বিকাশমান সম্বন্ধ বিষয়ে সচেতনতা। এই সার্থক মিথস্ক্রিয়ায় দ্বিবাচনিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় বলে অনবরত নতুন সম্ভবনা জেগে ওঠে। ডস্তয়েভস্কির আখ্যান বিশ্বেও এই প্রক্রিয়া প্রবলভাবে উপস্থিত। সেই জন্যে সার্থক পাঠকৃতিগুলিতে লক্ষ করি সময় ও পরিসরের দ্বিবাচনিক তাৎপর্য উন্মোচনের প্রক্রিয়ায় দুই শতাব্দী পরবর্তী পাঠকেরাও নবায়মান আগ্রহে যোগ দিতে পারছেন। ‘Crime and Punishment’ এ উপস্থাপিত রাসকেলনিকভের নাগরিক অন্ধকার ভরা জগৎ অথবা সোনিয়ার ক্লিষ্ট অপর পরিসর আপাতভাবে আমাদের পক্ষে প্রাসঙ্গিক নয়। তবে বাখতিনের চোখে সার্থক পাঠকৃতি যেহেতু বিবিধ উচ্চারণপুঞ্জের অভিঘাতে নির্মীয়মাণ 'communication event', ডস্তয়েভস্কির আখ্যানগুলিকে মনে হয় আপাত-সম্পূর্ণ মাত্র। কেননা এদের নিরবিছিন্নভাবে নতুন নতুন পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়ার দায়ভার বহন করেন প্রত্যুত্তর-যোগ্যতা সম্পন্ন পরবর্তী প্রজন্মগুলির পাঠকেরা। সুতরাং বাখতিনের পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করে সার্থক পাঠকৃতিকে বিবেচনা করব নিরবিছিন্ন সংযোগের উৎসভূমি হিসেবে। সেই সঙ্গে মনে রাখব, তাৎপর্য প্রতীতির প্রক্রিয়া আসলে অন্তঃশায়ী ভাবাদর্শগত বিচ্ছুরণের মূল্যায়ন। সেই জন্যে ডস্তয়েভস্কির আখ্যান বিশ্বের পর্যালোচনা মানে তাদের ঘটনা প্রবাহ ও কুশীলবদের নিয়ামক ভাবাদর্শের সুলুকসন্ধান এবং তাৎপর্য বিচার।

 

মূল রুশ ভাষা যদিও এই প্রতিবেদকের অনধিগত , ইংরাজি ভাষান্তরে তাদের উপস্থাপনায় যদি মৌলিক দ্বিবাচনিক বীক্ষা এবং ভাবনার স্পন্দনে জীবন্ত উচ্চারণপুঞ্জের মুখোমুখি হই, তার উপর নির্ভর না করার কোনও কারণ নেই। শুধু এ কথা মনে রাখতেই হয় যে প্রতিটি সার্থক পাঠকৃতি সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে উদ্ভূত ও পরিশীলিত হয়ে থাকে। মূল্যায়ন প্রকৃতপক্ষে সামগ্রিক নান্দনিক প্রক্রিয়ার যোগফল। তাতে লেখকের সামাজিক বীক্ষা ও নান্দনিক প্রতীতির দ্বিবাচনিকতায় গড়ে ওঠে সুনির্দিষ্ট তাৎপর্য। সেই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হয় যে ঐ নির্দিষ্টতা পাঠকের জীবনবোধ ও নান্দনিক উপলব্ধি অনুযায়ী একেক প্রজন্মে একেক রকম ভাবে প্রতিভাত হতে পারে। অর্থাৎ প্রাগুক্ত নির্দিষ্টতাও আপেক্ষিক কেননা নতুন প্রজন্মের সামূহিক ভাবে অর্জিত চিন্তা-চেতনা ও ঈপ্সিত সম্ভবনার অন্তবৃত সামর্থ্যের ওপর সংযোগের সার্থকতা নির্ভরশীল। এই জন্যে একটু আগে বাখতিন কথিত 'creative border zone or boundary between human consciousness’s' এবং প্রত্যুত্তর বোধ সম্পন্ন মিথস্ক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছি। এই শক্তি প্রকৃতপক্ষে উচ্চারণে নিহিত দ্বিবাচনিকতার শক্তি। এরই সাহায্যে উদ্ভূত হয় বাচনের নবায়মান তাৎপর্য অর্থাৎ নিরবিছিন্ন প্রত্যুত্তর সন্ধানের গ্রন্থনা। আর এরই ওপর গড়ে ওঠে বহুস্বরিকতা ও অনেকার্থ দ্যোতনার সৌধ। তাই ডস্তয়েভস্কির দ্বিশতবর্ষ পূর্তির বছরে আমরা খুঁজে নিচ্ছি ‘Crime and Punishment’ এর গভীরে নিহিত আস্তিত্বিক-সামাজিক-নান্দনিক তাৎপর্য কিংবা ‘The Idiot’ এর শ্লিষ্ট নামকরণে প্রছন্ন জীবনবোধের তাৎপর্য। এবং একই সঙ্গে ‘‘The Brothers Karmazov'' এর মোহনায় পৌঁছে যখন 'Notes from Underground' কিংবা 'Poor folk'এর সূচনাবিন্দুতে ফিরে তাকাই, ডস্টয়েভস্কির আখ্যানে আমরা সমকালীন রুশ সমাজের সার্বিক প্রেক্ষিতে অন্তর্নিহিত দ্বিবাচনিকতার গ্রন্থনা সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধির গভীরতা সম্পর্কে অবহিত হই। রুশ সমাজের বিভিন্ন অনুপুঙ্খ সম্পর্কে তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণ যেহেতু আখ্যানে প্রতিফলিত বাস্তবের ভিত্তি, নন্দনের সামাজিক মাত্রা সম্পর্কে তাঁর অবস্থানও একই সঙ্গে সুস্পষ্ট হয়ে পড়ে। তথাকথিত অভিজাত সামন্ত শ্রেণীর মানুষ-মানুষীকে উপস্থিত করেই তিনি ক্ষান্ত হন নি, বরং ধূসর প্রান্তিক পরিসরে বহু দ্বন্দ্বে বিক্ষত দরিদ্র-অবহেলিত-বিপর্যস্তজনদের প্রতি মনোযোগী হয়ে ডস্টয়েভস্কি ১৮৪৫ সালেই প্রথম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সাহিত্যের গণতন্ত্রীকরণ সমসাময়িক ও বাস্তব। আর, তাঁর চিরাভ্যস্ত রুশ সমাজের বাইরে গিয়ে শুধুমাত্র কল্পনা দিয়ে নির্মিত প্রকরণ গড়ে তুলতে তিনি অনিচ্ছুক। তাই ডস্টয়েভস্কি যখন নববিবাহিতা পত্নীকে নিয়ে কয়েক বছরের জন্যে স্বদেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন, সেই পর্যায়ে সৃষ্টিশীল কোনো রচনা-প্রয়াস তাঁর পক্ষে দুরূহ হয়ে উঠেছিল। স্বদেশের বাইরে অর্থাৎ রুশ বাক প্রবাহ এবং নিরবিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা ও চিন্তা বিচ্ছুরণের বলয় বহির্ভূত অবস্থানে কোনো বয়ান গড়ে তোলা কার্যত অসম্ভব; এই তাৎপর্যপূর্ণ উপলব্ধি তিনি একটি চিঠিতে এভাবে প্রকাশ করেছিলেনঃ চিরপরিচিত প্রেক্ষিতের বাইরে অবস্থান করে 'The impossibility of personally seeing and observing the most ordinary things' (দ্রষ্টব্যঃ চিঠিপত্রঃ ২য় পৃ ২৬৯ ) এর রূঢ় উপলব্ধি প্রকৃতপক্ষে নির্যাতন স্বরূপ।

 

 

-৩ -

 

ডস্টয়েভস্কির মতো প্রখর সংবেদন সম্পন্ন স্রষ্টার জীবনোপলব্ধিকে কী ভাবে বুঝে নিতে হয়, বাখতিন নানাভাবে তাই যেন উন্মোচিত করেছেন। পুনর্মূল্যায়নের পরম্পরাকে লক্ষ্যাভিমুখী করতে হলে লেখকের ভাবাদর্শগত অবস্থান ও নান্দনিক বীক্ষার নির্যাস অনুভব করা আবশ্যিক। সময় ও পরিসরের হৃদস্পন্দনে আধারিত উচ্চারণের গ্রন্থনা কীভাবে বিকশিত হয়েছে, এই প্রক্রিয়াকে যদি অনুধাবন করতে চাই। প্রাগুক্ত প্রত্যুত্তর-যোগ্যতা অর্জন করে নিতেই হয়। বাখতিনের ভাব-বিশ্বে পর্যটন করে বুঝে নিই, প্রকৃত লেখক কাকে বলে এবং কেন বয়ানের মধ্যে কর্তৃত্ব-প্রবণতা থেকে লেখক সত্তাকে মুক্ত থাকতে হয়, তার মীমাংসা বাখতিনই করে গেছেন। তাছাড়া লেখক সত্তা ও তার প্রধান কুশীলবের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ভাবে বহুস্বরিক হয়ে ওঠে, তাও বুঝে নিতে পারি 'Art and Answerability' এবং 'The dialogic Imagination' আর 'Problems of Dostoevsky's politics' প্রভৃতি বইয়ের ভাবনা বিচ্ছুরণে। প্রথমোক্ত বইতে বাখতিন লিখেছিলেনঃ 'An aesthetic event can take place only when there are two participants present; it presupposes two non-coinciding consciousness (1990:22)। সত্তা ও অপর পরিসরের নিরবিচ্ছিন্ন গ্রন্থনা ব্যক্ত না হলে ঔপন্যাসিকতার আধার তৈরি হতে পারে না। দৃষ্টান্ত হিসাবে ডস্টয়েভস্কির বিভিন্ন বয়ানের উল্লেখ করতে পারি। ঐ গ্রন্থনার মধ্যে যুগপৎ সময় ও পরিসরের তীক্ষ্ণ উপস্থিতি ও তাদের আন্তঃসম্পর্ক প্রকাশিত হয় বলেই একটি অণুপৃথিবী নান্দনিক ও সামাজিকভাবে আমাদের কাছে লক্ষ্যগোচর হয়ে ওঠে। বাখতিন যে দ্বিবাচনিক জীবনে ও সাহিত্যের পাঠকৃতিকে অধ্যয়ন করতে চেয়েছেন তা নিরন্তর সঞ্চরণশীল উচ্চারণের প্রামাণিক প্রাসঙ্গিকতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। এই নিরিখে 'The Idiot', 'The Humiliated and Insulted', 'The Gambler’, ‘The Brothers Karmazov' নতুন তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। বাখতিনের চিন্তাসূত্র অনুযায়ী অস্তিত্বমূলক সংগঠন এবং সামাজিক সত্তা হিসাবে ঐ সংঠনের সূত্রধার নিরবিছিন্নভাবে অপর সামাজিক সত্তাদের সঙ্গে সেতু তৈরি করে। বস্তুত বিচিত্র অপরতার সঙ্গে সত্তার নিরন্তর জায়মান দ্বিবাচনিকতা অর্থাৎ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয় ভাষায় চেতনায়। এ কথা মনে রেখে যখন রাসকেলনিকভ ও মিশকিনের অণুবিশ্বে সক্রিয় পর্যবেক্ষকের (বাখতিন কথিত participant observer) ভূমিকা গ্রহণ করি, ছায়াতপোময় জীবনের অন্তহীন রহস্য সম্পর্কেই তো সচেতন হয়ে উঠি। প্রকৃতপক্ষে বাখতিনের উপন্যাস-ভাবনায় অস্তিত্ব-জিজ্ঞাসা ও জ্ঞানতাত্বিক জিজ্ঞাসা এক ও অভিন্ন। ডস্টয়েভস্কির প্রধান আখ্যানগুলিতে এই মূল সত্যই উদ্ভাসিত হতে দেখি। তাই বাখতিনের কাছে যে দ্বিবাচনিকতা অস্তিত্বের সারাৎসার, ডস্টয়েভস্কির আখ্যান বিশ্বেও তাঁর নিয়ামক উপস্থিতি লক্ষ করি। বাখতিন সেই দ্বিবাচনিক জগতের অধিকারী যেখানে সার্বিক জীবনধারা থেকে বিছিন্ন হয়ে পুরোপুরি নিজস্ব পথে কেউ কখনও বিকশিত হতে পারে না। তেমন ডস্টয়েভস্কিও তাঁর সার্থক পাঠকৃতিগুলিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন- প্রতিনিয়ত অজস্র অপর সত্তার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায়, দ্বন্দ্বে ও সংগ্রামে সম্পৃক্ত হতে হয়। এমনকী নিজেরই সঙ্গে নিজের ব্যবধান তৈরি হয় কখনও কখনও। যেমন হয়েছিল রাসকেলনিকভের, কার্মাজোভ ভাইদের, মিশকিনের। এমন মুহূর্তগুলিতে এই কুশীলবেরা নিজেদের মধ্যে অনুভব করেছে সত্তা ও অপরতার দ্বিবাচনিকতা এবং আপন ভুবনের নিয়ত নির্মীয়মাণ প্রক্রিয়া। বাখতিনের মনের গভীরেও চিরজাগ্রত ছিল মৌল এই বিশ্বাসের প্রেরণা যে সত্তা আসলে সমান্তরালতার বোধ এবং সমান্তরালতা মানে অপরতার উপলব্ধি। রাসকোলনিকোভ কিংবা মিশকিন- কেউই নিজে নিজে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাদের জগৎ ও জীবন সত্য হয়ে উঠেছে শুধুমাত্র সক্রিয় অপর সত্তার প্রতীতিতে।

 

ডস্টয়েভস্কির আখ্যান বিশ্বে বাখতিন তাঁর বহুবিদিত মহাবাক্যের অকুন্ঠ সমর্থন পেয়েছেনঃ এমন কোনো উচ্চারণ সম্ভব নয় যা বৃন্তহীন পুষ্পের মতো নিজের মধ্যে জাগে এবং নিজের মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়! যেহেতু প্রতিটি বাচন মর্মগতভাবে দ্বিবাচনিক, ডস্টয়েভস্কির সার্থক সন্দর্ভগুলি আদ্যন্ত দ্বিবাচনিক। 'Poor folk' থেকে ‘The Brothers Karmazov' অবধি বিস্তৃত যাত্রায় ডস্টয়েভস্কি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে জীবন প্রবহমান উপন্যাসত্বের আরেক নাম। বাখতিনও এই মহান কথাকারের মধ্যে তাঁর নিয়ামক চিন্তাবীজের সমর্থন পেয়েছেন যে সহযোগিতায় সত্তা পূর্ণ হয়ে ওঠে এবং সহযোগের অভাব তাকে কেবলই রিক্ত করে তোলে। 'The Humiliated and Insulted' কিংবা 'The Gambler’ এর পক্ষেও এই বক্তব্য সমানই সত্য। লক্ষনীয়ভাবে ডস্টয়েভস্কি সচেতনভাবেই তাঁর বিভিন্ন কুশীলবদের মধ্যে অন্যান্য সম্পর্কের গ্রন্থনা তৈরি করেছেন। যেমন 'The Idiot' উপন্যাসে মিশকিন যখন নাস্তাশিয়া ফিলিপ্পোভনাকে বিয়ে করে, কথাকার তাৎপর্যবহভাবে এই উক্তি করেনঃ 'The prince says, when he marries Nastasya Filipporna, that to resurrect just one fellow-human is a greater merit than all the exploits by Alexander the Great' (৯; ২৬৮) এখানেই উল্লেখযোগ্য যে আখ্যানের শুরুতে প্রিন্স মিশকিন অন্যদের কাছে হাসির পাত্র বিবেচিত হলেও শেষ পর্যন্ত আখ্যানে সে প্রত্যেকের শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছিল। এই যে স্খলন থেকে পরিত্রাণ ও পুনর্জাগরণের ভাববীজ, তা শুধু 'The Idiot' উপন্যাসেই নয় ডস্টয়েভস্কির বিভিন্ন আখ্যান জুড়েই কোথাও প্রকট কোথাও প্রছন্নভাবে উপস্থিত। তাই মনে হয় ডস্টয়েভস্কির প্রখ্যাত উত্তরসূরি টলস্টয় এই ভাববীজের বিচ্ছুরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর বহু প্রশংসিত ‘Resurrection’ আখ্যান রচনা করেছিলেন। এতে সংশয় নেই যে উপন্যাস-ভাবনার ক্ষেত্রে বাখতিন যে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন, তার প্রধান প্রেরণার উৎস ডস্টয়েভস্কির আখ্যান ভুবন। ডস্টয়েভস্কি এই পাঠ দিয়েছেন যে ঔপন্যাসিকতার অনতিক্রম্য ভিত্তিভূমিই নয় কেবল মানবজীবন, তা আসলে সত্তা-নির্মিতির অফুরান পাঠশালা। প্রকৃতপক্ষে উপন্যাসের অভিধা যাদের দেওয়া যায় না, সেই সব দীর্ঘবয়ান এবং ক্ষুদ্র কাহিনিগুলিতেও ডস্টয়েভস্কি নিছক নাট্যাবেগ ও কাহিনি সম্বলিত প্রতিবেদন নির্মাণ করতে চান নি।। কেননা উপন্যাস নামক শিল্প-মাধ্যমের অন্বিষ্ট অজস্র উচ্চাবচতাময় জীবন। এই বহুমাত্রিক অজস্র জীবনের স্বর ও স্বরান্তরের ক্রমিক উন্মোচনে গড়ে ওঠে উপন্যাসের আধেয় হিসেবে বেছে নেওয়া বিভিন্ন আস্তিত্বিক পরিসরের সমান্তরাল অবস্থান। ডস্টয়েভস্কির নান্দনিক পাঠশালা থেকেই বাখতিন আহরণ করেছেন বহুস্বরিকতা ও অনেকার্থ দ্যোতনার তত্ত্ববীজের সমর্থন।

 

-৪ -

 

মহান এই কথাকারই তত্ত্বগুরুকে বুঝিয়েছে, আপাতভাবে উপন্যাসের বয়ান যে সমাপ্তিবিন্দুতে পৌঁছায়, সেখানেই তার তাৎপর্য ফুরিয়ে যায় না। বরং নিষ্কর্ষ সন্ধানী পরবর্তী প্রজন্মগুলি ঐ বিন্দুতেই শুরু করে নিজেদের নান্দনিক অভিযাত্রা। অতএব জীবনের মতো সার্থক উপন্যাসও চিরমুক্ত অর্থাৎ সমস্ত সমাপ্তি আপেক্ষিক এবং প্রতীয়মান উপসংহার মাত্র। সত্তা ও অপরতার দ্বিবাচনিক গ্রন্থনা কেবলই নবায়মান প্রত্যুত্তর-যোগ্যতার প্রত্যাশা করে। ডস্টয়েভস্কি আখ্যান বিশ্ব পর্যটনে বাখতিনের তত্ত্বভাবনাকে এই জন্যে স্বতশ্চলভাবে সম্পৃক্ত হতে দেখি। বস্তুত ডস্টয়েভস্কির দ্বিশত জন্মবার্ষিকী এই পুনঃপাঠকেও চূড়ান্ত বলে ভাবা চলে না। ডস্টয়েভস্কির সমস্ত বয়ান হয়তো সমান মনোযোগ দিয়ে পাঠ করতে পারি না। সার্থকতার তারতম্যেরও অভাব নেই। তবু জীবনভাবনার পুনর্বয়ানের মধ্য দিয়ে এই সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয় যে কোনো এক অদূরবর্তী ভবিষ্যতে পুনর্জীবিত হবে সব পাঠকৃতি। আজকের মুহূর্তও প্রমাণিত হবে নতুন সূচনার আরেক মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে। বাখতিনের এই মন্তব্যে সায় দিতেই হয়ঃ 'To be means to communicate dialogically when the dialogue ends, everything ends.' (১৯৮৪-৮৬) অর্থাৎ ডস্টয়েভস্কির 'Crime and Punishment’ উপন্যাসে রাসকেলনিকভ কী করেছে, কী ভেবেছে, আত্মসৃষ্ট পরিস্থিতির পরিণামে সত্তার কোন পুর্গেটরিওতে পৌঁছে গেছে - এসব নিছক ঘটনা বা তথ্য নয়; এই সবই আস্তিত্বিক পরিসরের নিবিড়তম সত্য। পাঠকের সংযোগ ঘতে এই সত্যের সঙ্গে, দ্বিবাচনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ফলে তথ্য হয়ে ওঠে চিহ্ন। বস্তুবিশ্ব ও চিহ্নবিশ্ব অন্যোন্য-সম্পৃক্ত; বাচন থেকে পরাবাচনকে বিশ্লিষ্ট করা যায় না। অপরাধ ও শাস্তির বহুস্বরিক নিহিতার্থ যদি বুঝতে চাই, দ্বিবাচনিকতাকে ‘Communal engagement’ বলে বুঝে নিয়ে শিল্পকৃতির গ্রহীতা হিসেবে প্রত্যুত্তরযোগ্যতা অর্জন করতেই হবে। 'The Idiot' উপন্যাসে মিশকিন সম্পর্কে পাঠকের ধারণায় যে বিবর্তন ঘটে যায়, এর মর্মমূলে রয়েছে মানবিক সত্তার প্রকল্প নির্মাণের নিবিড় রহস্য। প্রমাণিত হয় এই সত্য যে মূল্য-নিরপেক্ষ জীবনযাপন করা কোন সচেতন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। একই কথা প্রযোজ্য ‘The Brothers Karmazov' এর বয়ানে উন্মোচিত আস্তিত্বিক সংগঠনের নৈতিক ও নান্দনিক দ্বিরালাপের গ্রন্থনা। সম্পর্কেও। সুতরাং বাখতিন যাকে বলেন 'Architectonics of consciousness' (1984-94),তা-ই ডস্টয়েভস্কির আখ্যানবিশ্বে বিচিত্রভাবে ব্যক্ত হয়। এ প্রসঙ্গে একথাও লেখা প্রয়োজন যে ডস্তয়েভস্কির পাঠকৃতিতে পরিস্ফুট প্রত্যুত্তর সম্ভাবনার সৃজনী প্রক্রিয়াকে বিবেচনা করতে হয় 'intaractive dialogue utterness’ সমবায়ী অভিব্যক্তি হিসেবে। সেইজন্যে তুলনামূলকভাবে বেশি অভিনিবেশ প্রাপ্ত পাঠকৃতিগুলি ছাড়াও ‘Notes from the underground’ বা ‘The Gambler’ এর মত উপন্যাসেও রয়েছে মিথষ্ক্রিয়াত্মক দ্বিবাচনিক উচ্চারণ সমূহের গ্রন্থনা। আর, বাখতিন মানব-পরিস্থিতির যে অসম্যতা ও অপরিবর্তনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন (দ্রষ্টব্য, ১৯৯০-২২-২৩), সেই নিরিখেও মনে হয়, বাচনের উদ্বৃত্ত সন্ধানই দ্রষ্টাচক্ষুর ঈপ্সিত। ডস্তয়েভস্কির বয়ানগুলিতে যাদের কেন্দ্রীয় কুশীলব বলে গণ্য করতে পারি, তাদের মধ্যে ফুটে ওঠে 'aesthetic consummation of an individual’ (১৯৮৪:১৩১)। এই নান্দনিক চূড়ান্ততার উপলব্ধি একই সঙ্গে সামাজিক- মনস্তাত্ত্বিক- নৈতিক ও আস্তিত্বিক নিষ্কর্ষসম্পন্ন। যদিও মানব স্বভাবের প্রতীতিতে কোনো অন্তিম উপসংহার থাকতে পারেনা, তবুও মুক্ত উপসংহার দ্যোতক চেতনার সঙ্গে বিভিন্ন পরিসরে সম্পৃক্ত কুশীলবদের অভিজ্ঞতার অন্তহীন দ্বিবাচনিকতার সম্ভাবনা নিঃশেষিত হয়না।

 

তাই 'Crime and Punishment’ লিখতে গিয়ে ডস্তয়েভস্কি যে রাসকেলনিকোভের স্বীকারোক্তির বিন্দুতে তাঁর আখ্যান শেষ না করে দুটি পরিচ্ছেদ বিশিষ্ট উত্তরকথন (epilogue) যুক্ত করে তাঁর পাঠকৃতিকে সমাপ্তি বিন্দুর দিকে সঞ্চালিত করেছেন, তাতেও ঐ চূড়ান্ততাহীন মুক্ত পরিসরের প্রতীতি ম্লান হয়ে যায়নি। দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদি রাসকোলনিকোভ সাইবেরিয়ার বন্দীশালায় আট বছরের জন্যে অন্তরীন হয়েছিল। ঐ উত্তরকথনে পাঠকের দৃষ্টি অবধারিত ভাবে সোনিয়ার প্রতি সঞ্চালিত হয়েছে। কিন্তু রাসকেলনিকোভের শারীরিক- মানসিক- আত্মিক দহনের কারণও খুব প্রকট। বয়ানের এই দ্বিবাচনিকতায় স্মৃতি - বিস্মৃতি আস্তিক্য - নাস্তিক্য সন্তাপ - সংবেদনা এমন ভাবে গ্রথিত যে কেন্দ্রীয় কুশীলবরা মানসিক যন্ত্রণা ও আত্মিক নির্বেদ পাঠকৃতিকে অনিবার্যভাবে ঘটনাতিযায়ী উপলব্ধির বহু মাত্রিকটায় পৌঁছে দেয়। 'Crime and Punishment’ এর মতো সুদীর্ঘ বয়ানেও কার্যত ইনফেরনো থেকে পুর্গেটোরিওয় বিক্ষত সত্তার ক্রমিক অভিযাত্রা যেন সম্পূর্ণ হয়না। অন্তত সংক্ষিপ্ত অন্তিম অনুচ্ছেদে ডস্তয়েভস্কি এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চেয়েছেন যে বহুমাত্রিক দ্বিবাচনিক উন্মোচনের মাধ্যমে সত্তার পুনর্জাগরনের সূচনাবিন্দু মাত্র ব্যক্ত হল। একে পূর্ণতা দেবে উত্তরপ্রজন্মের কথাকার – চিন্তাবিদ - সংবেদনশীল পড়ুয়ারা।

 

এইমাত্র আভাস দিয়েছেন ডস্তয়েভস্কি যে বিপুল যন্ত্রণার দহন - মূল্যে জীবনের কাছে রাসকোলনিকোভকে দেনা শোধ করে যেতে হচ্ছে। কথকসত্তা এই সঙ্কেত দিয়েছে যে রাসকোলনিকোভ 'didn’t know that the new life would not be given him for nothing, that he would have to pay dearly for it, that it would cost him great striving, great suffering. But that is the begining of a new story – the story of the gradual renewal of a man, the story of his gradual regenaration of his passing from one world into another, of his intiation into a new unknown life.’ (২০১৯:৫৬০)। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ডস্তয়েভস্কির নন্দন সংক্রান্ত পর্যালোচনায় বাখতিন লেভ টলস্তয়কে তাঁর লেখক-দৃষ্টির চূড়ান্ত অতিরেকের জন্যে সমালোচনা করেছেন। 'War and Peace’, ‘Resurrection’ ও ‘Anna Karenina’ এর স্রষ্টা যেহেতু নৈতিক অবচেতনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন, তাঁর পাঠকৃতিগুলি লেখকসত্তার আতিশয্যপ্রবণ নিয়ন্ত্রণের নিদর্শন। তাঁর বিভিন্ন বয়ানে যেসব কুশীলবদের মৃত্যু বিবৃত হয়েছে, তা স্পষ্টতই চূড়ান্ততার বার্তা বয়ে আনে। কিন্তু বাখতিন কোনো রকম একবাচনিক সমাপ্তিকে প্রাধান্য দিতে চাননি। তাঁর মতে ডস্তয়েভস্কির পাঠকৃতিতে আত্মচৈতন্যের মুক্ত সমাপ্তি মর্যাদা পেয়েছে। তাই 'Brothers karmazov’ এর মতো কুশীলব-কেন্দ্রিক অণুবিশ্বেও দ্বিবাচনিক কল্পনার সার্থক শিল্পিত অভিব্যক্তি দেখতে পাই। 

 

বাখতিন অসামান্য দ্যোতনাগর্ভ বাচনে জানিয়েছিলেন: ‘I always have a loophole’ (১৯৯০:৪০) কেননা 'আমি'-র তাৎপর্য সর্বদাই পূর্ণতার প্রতি ধাবমান অপূর্ণ অস্তিত্ব। বস্তুত ‘Art and Answeribility’ বইতে যে-প্রতীতির সূত্রপাত হয়েছিল তা-ই ডস্তয়েভস্কির নন্দন সম্পর্কিত গ্রন্থে (১৯৮৪:২৩২-২৩৬) পরিণততর হয়েছে। একবাচনিকতার প্রাধান্য যেসব লিখিয়েদের ভাববিশ্বে প্রকট, তাঁদের বয়ানে সানুপুঙ্খ গ্রন্থনার মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় কুশীলবের পরিপূর্ণ উপস্থিতি উত্থাপিত হয়। অন্বিষ্ট তাৎপর্যের চূড়ান্ত প্রতীতির সূত্রধার হিসেবে যে অস্তিত্ব প্রকট হয়ে ওঠে, তারমধ্যে কোথাও আবিষ্কারযোগ্য কোনও রহস্য থাকেনা আর। পাঠকৃতিতেই যেন সমস্ত তাৎপর্য নিঃশেষিত হয়ে যায়। একবাচনিকতায় প্রত্যয় সম্পন্ন লেখক এমনভাবে সবদিক জানার আগ্রহে কেন্দ্রীয় কুশীলবকে নিংড়ে নেন যে বাচনের উদ্বৃত্ত থাকেনা কোথাও। ফলে পাঠকের পক্ষে কিছুই করার থাকেনা। লেখকের সার্বিক কর্তৃত্ব মেনে নেওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় কুশীলব সহ অন্যান্যদের মধ্যে আবিষ্কার করার মতো কোনও পরিসরই অবশিষ্ট থাকেনা।

 

-৫-

জীবন ও প্রতিবেদন সম্পর্কে বাখতিনের দ্যোতনাময় ভাষ্য থেকে আমরা বুঝে নিয়েছি, প্রতীতি নির্মিতি মূলতঃ বিচ্ছুরণময় ভাবাদর্শের নির্মিতি এবং বাকশিল্প উদ্ভূত হয় এই মৌলিক সত্যের উপলব্ধিতেই। যেহেতু সৃষ্টি- প্রক্রিয়া মূলত অস্তিত্বের সংগঠন, এক মুহূর্তের জন্যেও ঐ প্রক্রিয়ায় জীবন্ত সামাজিক সংযোগ শিথিল হয়না। প্রতিটি মুহূর্ত মুখর থাকে উপস্থিত ও অনুপস্থিত সমাজ সংবিদের সোচ্চার ও নিরুচ্চার গুঞ্জনে। প্রতিটি ভাবাদর্শবাহিত প্রকরণের মতো বাচনিক শিল্পও 'intrinsically, immanently sociologizal.’ (১৯৮৭:৯৫)। আর, ডস্তয়েভস্কির আখ্যান-বিশ্বে এই প্রতীতির সর্বাধিক সমর্থন খুঁজে পেয়েছেন বাখতিন। ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক সত্তার মধ্যে কোনও অযৌক্তিক বৈরিতা নেই। রাসকোলনিকোভ, মিশকিন, কার্মাজোভ ভাইয়েরা এই সত্য বারবার প্রমাণ করেছে। বাখতিনের মতে দ্বিবাচনিক চেতনার সূত্রধার লেখক প্রকৃত পক্ষে 'The bearer and sustainer of the identity active unity of a consumated whole.’ (১৯৯০:১২)। তাঁর কেন্দ্রীয় কুশীলবেরা দৃষ্টির উদ্বৃত্ত ও বিবিধ ধারণার উদ্বৃত্ত সম্পর্কে অবহিত। সেইসঙ্গে বাখতিন একথাও জানিয়েছেন যে জীবনকে যদি পূর্ব-নিধারিত কোনও উপসংহারের ছাঁচে পরিচালিত করা হয়, সেই জীবন ক্রমাগত নিষ্পেষিত ও শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার তাৎপর্যারিক্ত হয়ে পড়ে। তাঁর এই বক্তব্য কত যথার্থ, ডস্তয়েভস্কির ‘The Gambler’, ‘The double’ বা ‘Note from the underground’ তার নিদর্শন।

 

 

ডস্তয়েভস্কির বয়ানে বাখতিন এই প্রতীতির সমর্থন পেয়েছেন যে 'in order to live, one needs to be uncosummated’ অর্থাৎ সত্তাকে  আপন অস্তিত্বে  মুক্ত পরিসর সর্বদা তৈরি করে নিতে হয়। আর, একথা নিয়ত মনে রাখতে হয় যে চলমান জীবনে কোনও নির্দিষ্ট বিন্দুকে চূড়ান্ত ভাবা চলেনা। সর্বদাই থাকে আরও কিছু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। সেইজন্যে পূর্ব-নির্দিষ্ট কোনও ব্যবস্থায় বা পরিস্থিতিতে সত্তাকে সমর্পণ করার কোনও প্রশ্ন নেই। চলমান মুহূর্ত সমবায় থেকে তাৎপর্য নিংড়ে নিতে নিতে চলিষ্ণুতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হয় কেননা পূর্বনির্দিষ্ট কোনও উপসংহারই গ্রাহ্য নয়। তা যদি না হত, রাসকোলনিকোভ বা মিশকিনের আস্তিত্তিক অভিযাত্রা রুদ্ধ হয়ে যেত। তা যে হয়নি এর কারণ এরা প্রত্যেকেই অন্তর্বৃত দ্বিবাচনিকতার সামর্থ্যে রিদ্ধ ও শক্তিমান। আখ্যানের এমন কুশীলবদের মধ্যেই বাখতিন কথিত 'সামাজিক বহুস্বরিকতা' (‘social multi-accentuality’ : ১৯৭৩:২৩) আপন অস্তিত্ব ব্যক্ত করে। কোনও সন্দেহ নেই যে ডস্তয়েভস্কির আখ্যান বুঝিয়ে দেয়, বহিঃপৃথিবীর অভিজ্ঞতা যখন অন্তর্জগতে আলোড়ন তোলে, ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ হয়ে ওঠে চিহ্নায়িত এবং তা থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে থাকে সামাজিক স্বরন্যাসের নানা বিভঙ্গ। একেই বাখতিন সামাজিক বহুস্বরিকতা বলেছেন যার আখ্যান প্রকরণে জেগে ওঠে যুগপৎ বহুস্বরিকতা ও অনেকার্থ-দ্যোতনা। বাখতিন বুঝিয়েছেন, ডস্তয়েভস্কি রচিত কুশীলবদের প্রতিটি অভিজ্ঞতা, প্রতিটি চিন্তা এবং প্রতিটি ক্রিয়া অন্তর্বৃত্ত ভাবে দ্বিবাচনিক। তাদের অস্তিত্ব সংঘর্ষে পূর্ণ বলে নানাধরণের বাচনে ও প্রতিবাচনে তারা অভ্যস্ত। মনে হয় যেন ডস্তয়েভস্কি উপন্যাস শিল্পের নিজস্ব ভাষায় চেতনার সমাজতত্ত্ব নির্মাণ করেছেন।

 

বাখতিন দেখিয়েছেন, মহান কথাকারের প্রতিটি শেকড় ভাবাদর্শে প্রোথিত; তাদের যাবতীয় অভিজ্ঞতা নিজস্ব বিশ্ব বীক্ষার ফসল। তাঁর মতে ডস্তয়েভস্কির আখ্যানবিশ্ব সবচেয়ে লক্ষণীয় চেতনার ভাবাদর্শাগত ভিত্তি ও দ্বিবাচনিক মুক্ত সমাপ্তির প্রতীতি। বিশেষত কথাবিশ্বের প্রধান কুশীলবেরা সমাপ্তিবিহীন দ্বিবাচনিক প্রক্রিয়ার সূত্রধার হয়ে বিধৃত বিষয় ও প্রকরণের অবিচ্ছেদ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর যখনই তার প্রতিষ্ঠা ঘটছে, পাঠকৃতির অনেকান্তিকতা এবং মুক্ত সমাপ্তির অনিবার্যতা সম্পর্কে কোনও সংশয় থাকছে না কোথাও। এই প্রেক্ষিতে যখন  ডস্তয়েভস্কির আখ্যানে অবগাহন করি, মনে হয়, কথাকার সময়পটে বিভিন্ন ভাবাদর্শবাহী উচ্চারণের আবেগতপ্ত সংঘর্ষ ব্যক্ত হতে দেখেছেন। আর, এই অভিব্যক্তির মধ্যে ব্যক্তি ও সমাজের যুগপৎ পার্থক্য ও সমান্তরলতা এবং তাদের মিথষ্ক্রিয়া লক্ষ্য করেছেন সযত্নে। বাখতিনের ভাষ্য অনুযায়ী ডস্তয়েভস্কি 'Heard both the loud, recognised reigning voices of the epoch, that is, the reigning dominant ideas (official and unofficial), as well as voices still weak, ideas not yet fully emerged, latent ideas heard as yet by no one but himself, and ideas which are just beginning to risen, embryos of future world views.’ (১৯৮৪:৯০)। এই যে 'সম্ভাব্য বিশ্ববীক্ষার ভ্রূণ' বাচনে ব্যক্ত হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে, সেই আভাস দিয়ে কথাকার পেয়ে যান প্রতি দার্শনিকের পদার্থ। ইউবি সেলের্ভানেভের মন্তব্য খুব প্রাসঙ্গিক 'As a thinker, Dostoyevsky belongs far more to our times than to his days and as we see it, to the future even more to the present.’ (দ্রষ্টব্য: ‘Afterword’: The karmazov Brothers: Progress Publishers: Moscow: 1980: Pibbli) ডস্তয়েভস্কি কেন কালাতিক্রমী, এ সম্পর্কে নানারকম ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। তবে বাখতিন যেমন উন্মুক্ততা বা নিয়ত প্রসারণশীলতাকে চিন্তন ও লিখন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে মান্যতা দিয়েছেন, তেমনই ডস্তয়েভস্কির ভাবনাও সময়াতিযায়ী সামর্থ্যে গরীয়ান। ফলে তাঁর আখ্যানবিশ্বে পূর্ণতা বা চূড়ান্ততার প্রতীতি নেই; কাঙ্খিত কোন পরমতার নির্মিতি নেই। অস্তিত্বের তাৎপর্য তাঁর কুশীলবেরা দ্বিবাচনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই খুঁজে নিয়েছে অনবরত।

 

উনিশ শতকের যে চারদশক ধরে ডস্তয়েভস্কি নিরন্তর রুশ প্রেক্ষিতকে খনন করে গেছেন, বাস্তবের অভিব্যক্তি ও নিষ্কর্ষ তখন অনবরত বদলে যাচ্ছিল। সামাজিক- সাংস্কৃতিক- রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিকের নিরবিচ্ছিন্ন ঐ রূপান্তর থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করতে করতে কথাকার ব্যক্তি সত্তার জিজ্ঞাসাকেও সংগঠিত করে নিয়েছেন। তাঁর বয়ানগুলি বাখতিনকে এই মহাকাব্য রচনায় প্রাণিত করেছে যে সমস্ত তাৎপর্যই সংগ্রাম ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে অর্জনীয়। জীবনের নির্মিতি- প্রকল্প কিছুতেই পরাভূত হয়না বলে ভিন্ন ভিন্ন কারণে ডিমিত্রি-ইভান আলেক্সা কার্মাজোভদের পাঠকেরা মনে রাখেন। বিচিত্র সব ঘটনার ঘনঘটা এবং ব্যক্তির জয়-পরাজয় উত্থান-পতনের মধ্যে জীবনের বিচিত্রতর সত্যের বিচ্ছুরণ পাঠকেরা খুঁজে পান। রুশ কথাসাহিত্যের প্রথিতযশা সমালোচক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান: ‘The lessons of the past and the practice of the times tought him penetration into the meaning and soul of the future as latent in the most actual and current reality’ (প্রাগুক্ত:৬৭০)  The Brothers karmazov কিম্বা The Idiot অথবা Crime and Punishment এর আখ্যানে ঘটনার বহিরঙ্গ যত চমকপ্রদই হোক, আমাদের লক্ষ করতে হয় মানবাত্মার ক্লিষ্টতা ও উত্তরণের নির্যাসটুকু। মিশকিন আখ্যানে ঠিক এই প্রশ্নটিই করেছে: দুরূহ পরীক্ষার মুহূর্তে মানুষের আত্মায় কী ঘটতে থাকে? প্রাগুক্ত এই সমালোচকের মতে সেই জিজ্ঞাসা ‘Fundamental for an insight into the workings of the writer’s creative minds, enabling us to see the innermost beyond the external shell, the spritual behind the social and the truth behid a fact. Whatever the situation his character finds himself in, Dostoyevsky is primarily concerned with what goes on in his soul.’(তদেব : ৬৭১)

 

সুতরাং যে-জীবনসত্য কথাকারের ঈপ্সিত তা যুগপৎ নৈতিক ও অধিবিদ্যাগত সত্যেরই অভিব্যক্তি। ডিমিত্রি কার্মাজোভ যখন আল্যোশাকে বলে: There are an aweful lot of mystries! There are too many riddles bearing down on man on earth. What is horrible is that beauty is not only as awesome but a mysterious thing. It is where the Devil and God ar locked in struggle, with man’s he art as the battlefield.’

 

উনিশশতকের বাস্তবে এই উচ্চারণ খুব স্বাভাবিক। তবে একুশ শতকের তৃতীয় দশকের সূচনাবর্ষে আমরা যখন ডস্তয়েভস্কির আখ্যান পুনঃপাঠ করি - ভাল ও মন্দ, মঙ্গল আর অমঙ্গল, সত্য ও অসত্যের ভীষণ সংঘর্ষকে নিঃসন্দেহে ভিন্নমাত্রায় পর্যবেক্ষণ করি। চেতনার গভীরে সাম্প্রতিক মানুষ যে কৃষ্ণ বিবরের অস্তিত্ব টের পায়, তাকে মোকাবিলা করার প্রেরণাও ডস্তয়েভস্কির আখ্যানবিশ্বে পেয়ে যায়। আর, এই পুনঃপাঠে মিখায়েল বাখতিন অনেক জরুরি সংকেত যোগান দিয়েছেন । যেমন: ‘The artist’s struggle to achieve a determinate and stable image of the hero is to a considerable extent a struggle with himself.’ (১৯৯৫:৬)। তাঁর চিন্তাসূত্র প্রসারিত করে আমরা বুঝে নিই, বিশ্বব্যাপ্ত নির্মাণকরণ প্রবণতার মধ্যে অজস্র স্ববিরোধিতায় লাঞ্ছিত পৌরসমাজ কীভাবে তার সত্তা-বিকাশের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে পারে, তার হদিস বাখতিন তাঁর ডস্তয়েভস্কি পাঠে বহুলাংশে যোগান দিয়ে গেছেন।

 

বাখতিনের চিন্তাবিশ্ব পরিক্রমা করতে করতে এই উপলব্ধিতে পৌঁছাই যে ডস্তয়েভস্কির আখ্যান থেকে তাৎপর্য প্রতীতি  সন্ধানের রূপরেখা স্বতশ্চল ভাবে তৈরি হয়ে যায়। পাঠক হিসেবে সৃষ্টিকুশল কথাকারের যেসব বাচন দ্বারা মুগ্ধ ও প্রাণিত হই, তাদের শাব্দিক অর্থের বদলে গভীর ও ব্যাপক প্রতীতি খুঁজি। এর আবেদন সর্বজনীন ও সর্বকালীন হবে কিনা তা লেখকের সমকালে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয় না। উত্তরপ্রজন্মের সম্বোধকেরা কীভাবে সম্বোধ্যমানতার প্রক্রিয়ায় নতুনভাবে শরিক এবং নতুনভাবে তাৎপর্যের বিস্তার ঘটাবে, তাতেই পরীক্ষিত হবে অন্তর্বৃত দ্বিবাচনিকতার সামর্থ্য। ডস্তয়েভস্কির আখ্যান স্থিরতা ও নিশ্চয়তার নামে অচলায়তনকে প্রশ্রয় দেয়নি বলেই তাদের মধ্যে গতিশীল সার্থক উচ্চারণের সমাবেশ দেখতে পাই। অস্তিত্বের বাচনিক অভিব্যক্তি যখন অপর পরিসরের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপিত হয়, সময় ও পরিসরে বিধৃত সামাজিক বীক্ষাই তাতে আত্মপ্রকাশ করে। দ্বিবাচনিকতার ভাববীজ যে প্রকৃতপক্ষে দ্বান্ধিক দর্শনের প্রসৃতি, এতে সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি। আখ্যান গড়ে ওঠে সম্বোধনের সঙ্গে সম্বোধিতের সম্পর্ক গ্রন্থনার নিরবধি প্রক্রিয়ায়। নইলে ডস্তয়েভস্কির দ্বিশতবার্ষিকী পুনঃপাঠেও কেন অনুভব করছি তাঁর সৃষ্টিপ্রতিভার দ্বারা উদ্ভাসিত মানবপ্রেক্ষিতের অন্তহীন উপস্থিতি? কেনই বা মনে পড়ছে বাখতিনের এই চমৎকার ভাষ্য: ‘The word is a two sided act. It is determined equally by whose word it is and for whom it is meant. As word it is precisely the product of the reciprocal relationship between speaker and listener, and addresser and addressee. Each act and every word expresses the one in relation to the other.’ (১৯৭৩:৮৫৮৬)। 

 

সার্থক উপন্যাসের স্রষ্টা হিসেবে ডস্তয়েভস্কি বিশেষভাবে গ্রাহ্য হয়ে ওঠেন এই ভাষ্যের নিরিখে। পাঠককে তিনি এই উপলব্ধিতে উদ্ভাসিত করে তোলেন যে বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মিথষ্ক্রিয়া কিম্বা ঘাতপ্রতিঘাত প্রতিটি উচ্চারণের অপরিহার্য আবহ। কোন বিশেষ মুহূর্তে উপন্যাসের কোন কুশীলব শুধুমাত্র নির্দিষ্ট বৃত্তের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও একবাচনিক উপলব্ধি প্রকাশ করে না। অজস্র সামাজিক শক্তির গতিময় প্রবাহে নিস্নাত হয় যারা (রাসকোলনিকোভ - মিশকিন - আল্যুশা কারমাজোভ) - তাদের উচ্চারণের প্রেক্ষাপট তাই বিপুল ও বিস্তৃত। সেই পরিসরে প্রত্যেকের একক বাচন সমান্তরাল অপর সত্তাদের বাচনের সঙ্গে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে নিবিড় সংঘর্ষে লিপ্ত। সম্বোধ্যমানতার নিয়ত নবায়মান প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত পাঠকই কেবল বয়ানের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেন। বাখতিনের দ্রষ্টাচক্ষুতে উদ্ভাসিত ডস্তয়েভস্কির আখ্যানবিশ্ব সম্পর্কে একথাই লিখতে পারি: দ্বিবাচনিক প্রেক্ষিতের বাইরে কোন উপলব্ধি অর্জন করা যায় না কখনও। প্রতিটি উচ্চারণ সম্ভাব্য আরও উচ্চারণমালার অনুষঙ্গে তাৎপর্যবহ হয়ে ওঠে। বাখতিনের ভাবনা-প্রকল্প অনুসরণ করেই ডস্তয়েভস্কির অণুবিশ্বে যথাযথ পর্যটনের সনদ লাভ করি। আর, প্রতিটি পুনঃপাঠ হয়ে ওঠে নান্দনিক প্রতীতির নীড়ে ফেরার উৎসব।

 

(অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের হাতের লেখা থেকে অন্যস্বর পত্রিকা এই ডিজিটাল ভার্সনটি তৈরি করেছেন। কোথাও হাতের লেখা বোঝার অসুবিধে থেকে বা টাইপ করার ক্ষেত্রে কোনও ভুলচুক থেকে গেলে তার দায় অন্যস্বর পত্রিকার। নজরে আসা মাত্র তা সংশোধনের চেষ্টা করা হবে।)

4 Comments
  • avatar
    Fazlul Haque

    26 December, 2021

    অসাধারণ একটি প্রবন্ধ । আমাদের কালের অনন্য বিদ্বান ও তাত্ত্বিক অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য তাঁর বিস্ময়কর প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য কিংবদন্তি। বাংলাভাষার নমস্য বাখতিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি সুবিদিত... আলোচ্য প্রবন্ধে বাখতিনের কর্ম ও দর্শনের মহা-পৃথিবী নিয়ে অসাধারণ আলোচনা আমাদের বাখতিন অধ্যয়ন ও চর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে বলে আমাদের সকলের বিশ্বাস । কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাই প্রিয় স্যার অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য ❤️

  • avatar
    KAJAL KUMAR MITRA

    26 December, 2021

    বাখেতিনের বিশ্লেষণে দস্তইয়েভস্কি - এমন সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ - ভিত্তিক রচনা বাংলায় বিরল। তপোধীর বাবুকে কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা। তবে মুদ্রণ প্রমাদ সংশোধনের পর্যাপ্ত অবকাশ রয়ে গেছে ।

  • avatar
    Tapodhir Bhattacharjee

    27 December, 2021

    আমরা যত বাখতিন ও ডসটয়েভসকির যুগলবন্দি নিয়ে ভাবি তত বেশি আলোকিত হয়ে উঠি

  • avatar
    শিহাব উদ্দিন আহমদ

    28 December, 2021

    আমি কবি, সাহিত্যের অন্দরমহলের কেউ না হলেও বাইরে থেকে একটুখানি নাড়াচাড়া করার কূঅভ্যাস আছে, এত বাস্তবধর্মী প্রবন্ধ পড়ার সুযোগ খুব কম পেয়েছি, কবির ভাষায়,"ভাষার অতীত তীরে," আরো দীর্ঘ পথ পরিক্রমার আশা রাখছি।

Leave a reply