ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রাম : কয়েকটি তাত্ত্বিক প্রশ্ন ও কিছু ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল সারা পৃথিবী বিশেষত ইওরোপের উপনিবেশকে ভাগ বাঁটোয়ারা করার সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ – এর একদিকে ছিল ফ্রান্স , ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, রুশ সাম্রাজ্য , অন্যদিকে জার্মানি, অস্ট্রিয়া- হাঙ্গারি- বুলগেরিয়া- ওট্টোমান সাম্রাজ্য – যাদের কেন্দ্রীয় শক্তি বলা হত। যুদ্ধ ছিল জনসাধারণের কাছে একটা বোঝা আর তার প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশে শ্রেণী সংগ্রামের ঢেউ তীব্র হয়ে উঠেছিল , যার সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি ছিল রুশ বিপ্লব। জার্মানিও শ্রমিক শ্রেণির ধর্মঘটে উত্তাল হয়ে উঠেছিল - জার্মানির সমাজ-গণতন্ত্রী দল, যা ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার পরেই শ্রমিক আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী,  তার গণভিত্তি শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে হলেও, তারা প্রতিনিধিত্ব করত মধ্যবিত্ত-পাতি বুর্জোয়া এবং শ্রমিক শ্রেণী র সুবিধাভোগী উচ্চ স্তরের। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই সমাজ-গণতন্ত্রী দল, তারা জার্মান সরকারের বিশ্বযুদ্ধে  অংশগ্রহণের পক্ষে সওয়াল করেছিল, কিন্তু সমাজ-গণতন্ত্রী দলের মধ্যে এক বিপ্লবী প্রবণতা দানা বাঁধছিল , যার নেতৃত্বে ছিলেন রোজা লুক্সেমবার্গ আর কার্ল লিবনেখট। যুদ্ধের প্রভাবে সাধারণ মানুষ ও সমাজ-গণতন্ত্রী দলেও যুদ্ধ বিরোধী প্রবণতা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, এবং সেই দল ভেঙ্গে নিরপেক্ষ সমাজ-গণতন্ত্রী দল তৈরি হয়।

১৯১৮ সালের সাধারণ ধর্মঘটে এক মিলিয়নের বেশী শ্রমিক জড়ো হয়েছিল- দাবী ছিল রুটি, শান্তির আর সাম্রাজ্যবাদী সরকারের পতন। বার্লিনে সোভিয়েত ধাঁচের বিপ্লবী কাউন্সিল তৈ্রী হয়েছিল, কিন্তু তা বার্লিনেই সীমাবদ্ধ ছিল , কারণ সমাজ গ্ণতন্ত্রের প্রভাবের দরুণ অধিকাংশ শ্রমিকের চেতনা বিপ্লবী স্তরে উন্নীত হয় নি। ধারাবাহিক আন্দোলনের দরুণ জার্মান রাজতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটে, আর নূতন সরকার- যাকে পরবর্তীকালে  উইলিয়াম রিপাব্লিক হিসাবে সম্বোধন করা হত- তারা আট ঘণ্টা সংস্কার , কৃষি শ্রম সংস্কার সহ, কিছুগুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করে। এই সব সংস্কার ছিল আন্দোলনের ফসল, এবং আন্দোলনের যাতে বিপ্লবী প্থে উত্তরণ না ঘটতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই সংস্কারগুলি করা হয়েছিল। সরকারে সমাজ-গণতন্ত্রী দলের থাকা এই সংস্কারকে প্রভাবিত করেছিল। তবে জার্মান প্রলেতারিয়েত এর বিপ্লবী চেতনা শেষ হয়ে গেছিল ভাবলে ভুল হবে। ১৯১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির (কে.পি.ডি) প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার নেতৃ্ত্বে ছিলেন রোজা লুক্সেমবার্গ আর কার্ল লিবনেখট। ডিসেম্বর - জানুয়ারী মাসে কে.পি.ডি অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে , যদিও রোজা এই অভ্যুত্থানকে সময়পোযোগী নয় বলেছিলেন।

সোস্যাল ডেমোক্রাট আর বুর্জোয়া দলের জোট সরকার এইঅভ্যুত্থানকে নির্মমভাবে দ্ম্ন করে ও  লুক্সেমবার্গ, লিবনেখট সহ বহু কমিউনিস্টকে হত্যা করা হয়। এইভাবে দ্বিতীয় জার্মান বিপ্লবের অবসান ঘটে।

এই ১৯১৯ সালের জুন মাসে ভার্সাই এর চুক্তি স্বাক্ষ্রর এর মধ্যে দয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। যুদ্ধে পরাজয়ের দরুণ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির বোঝা একতরফাভাবে জার্মানির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জনসাধারণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়- আগে যে সমস্ত সংস্কারগু করা হয়েছিল, তা আস্তে আস্তে প্রত্যাহার করা হতে থাকে।

জার্মান শ্রমিকশ্রেনীও চুপ করে বসে ছিল না, তারা জবাব দিতে থাকে ধারাবাহিক ধর্মঘটের মধ্যে দিয়ে।  নিরপেক্ষ সমাজ-গণতন্ত্রী দল যা পূর্বে সমাজ-গণতন্ত্রী দল ভেঙ্গে তৈরী হয়েছিল, তা কে.পি.ডি এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টির তৈ্রী হয়। তৃ্তীয় আন্তর্জাতিক ও এই বিপ্লবী প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়। বিভিন্ন কারণ বশতঃ ১৯২৩ সালে এই তৃতীয় জার্মান বিপ্লব ব্যর্থ হয়। যুদ্ধের দরুণ অর্থনৈ্তিক সংকট এর স্থায়ী সমাধান এই পার্লামেণ্টারী ব্যবস্থার মধ্যে না মাওয়া আর বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের বারংবার পরাজয়ের দরুণ হতাশা ফ্যাসিবাদের গ্ণভিত্তি তৈ্রী করে দিয়েছিল। ১৯২৫-২৮ এই সময় জার্মানির অর্থনীতির অগ্রগতি ঘটলেও , ১৯২৯ সালে সারা বিশ্ব জুড়ে যে অর্থনৈতিক মন্দা আসে , তার প্রভাবে জার্মান পুঁজি সাধারণ মানুষের উপর আরো আক্রমণ নামিয়ে আনে।

অ্যাডলফ হিটলার ১৯১৯ সালে জার্মান শ্রমিক দল বলে একটা দলে যোগদান করেন, যার নাম ১৯২০ সালে হয় জাতীয় সমাজবাদী জার্মান শ্রমিক দল। সমাজবাদের কথাটা ছিল দুরভিসন্ধিপূর্ণ- রুশ বিপ্লবের বিজয়ের পর স মাজতন্ত্র সম্পর্কে যে শ্রদ্ধা মানুষের মনে ছিল, তাকে প্রাথমিক ভাবে ব্যবহার করা, কিন্তু প্রকৃ্ত ভাবে সেই দল ছিল স মাজতন্ত্রের ধ্যান ধ্যারণার চুড়ান্ত বিরোধী এবং কমিউনিস্ট দল এবং এমন কি সংস্কারবাদী শ্রমিক দল কেও তারা জার্মানির সাধারণ মানুষের শত্রু বলে প্রচার করত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান মানুষদের দুরবস্থাদের জন্য হিটলার ওতাঁর দল দায়ী করেছিলো ওয়াইমার রিপাব্লিক কে যেহেতু তারা ভার্সাই চুক্তিতে সই করেছিল। আর স্যোসালিস্ট পার্টি যেহেতু ১৯২৮ সাল অবধি সরকারের শরীক ছিল, তাই তাদের ও অন্যান্য শ্রমিক দলের প্রতি ঘৃণা উদ্রেক করার কাজ সৃ্মভব হয়েছিল। ১৯২৫ সালে লেখা তার আত্মজীবনী ‘মাই ক্যাম্প’ এ হিটলার লিখেছেন -

“প্রতিটি জার্মানকে তার জার্মান জাতির আর্য গরিমার ভিত্তিতে সংগঠিত হতে হবে। 

“ইহুদীরা হছে নিকৃ্ষ্ট এবং পরগাছা জাতি এবং বুর্জোয়া উদারনীতিক,স্যোসালিস্ট এবং কমিউনিস্ট রা এই ইহুদী দের দালাল।

পুরাতন গ্ণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই জার্মান জাতীয়তাবাদকে অগ্রাহ্য করা হয়েছিল, যার দায়ভার জার্মান বুর্জোয়াদের উপর ও চাপে এবং সেই ব্যবস্থা যুদ্ধের সংকট সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়।

 …

পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আসলে মার্ক্সবাদের ই এক রূপ”

তার পরবর্তী গ্রন্থ ‘’জাতীয় সমাজবাদী আন্দোলন” যা নাজী আন্দোলন হিসাবে কুখ্যাত হয়, তাতে হিটলার এই ইহুদী বাহিনী এবং তাদের দালালদের নিকেশ ক রার মতাদর্শ লিপিবদ্ধ করেন।

এই মতাদর্শ বুঝিয়ে দেয় যে বুর্জোয়া গ্ণতান্ত্রিক ব্যবস্থা- উদাহরণ স্বরূপ ব্রিটেন, আমেরিকা- যারা আবার তাদের উপনিবেশগুলিতে নির্মম অত্যাচার করত – তাদের তুলনায় এবং অন্য ফ্যাসিস্ট শাসন গুলির ম ধ্যেও নাজী শাসন ছিল সবচেয়ে নির্মম। জার্মান পুজিপতিরা, যারা পার্লামেণ্টারী ব্যবস্থা- যা সাধারণভাবে তাদের কাছে কাম্য, সংকট নিরসনের জন্য নাজীদের অধিকতর নির্ভরযোগ্য মনে করতে শুরু করল। জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি নাজী দের দীর্ঘদিন অব্ধি ফ্যাসিস্ট হিসাবে চিহ্নিত করে নি, এবং তৎকালীন তৃ্তীয় আন্তর্জাতিক- যার নেতৃত্বে ছিলেন স্তালিন – বুখারিন তারা ও এই মারাত্মক ভুলের শিকার হন। সমাজগণতন্ত্রীদের ধারাবাহিক বেইমানি এবং অতীতের জার্মান বিপ্লব ধ্বংস করার জন্য তাদের ভুমিকার কথা মাথায় রেখে তাঁরা সমাজ গণতন্ত্রীদের সামাজিক ফ্যাসিবাদী আখ্যা দিয়ে তাদের সা থে কোনো রকম যুক্ত কার্য ক্রম নিতে অস্বীকার ক রেন। এই মতের বিপরীতে দঁাড়িয়েছিলেন একমাত্র  ট্রটস্কি। তিনি দৃঢ় ভাবে কমিউনিস্ট পার্টি এবং সমাজ গণতন্ত্রী দলের মধ্যে পার্লামেন্ট এর মধ্যে এবং পার্লামেন্ট এর বাইরে যুক্ত ফ্রন্ট এর পক্ষে সওয়াল করেন। মনে রাখতে হবে ১৯২৯ সালে সমাজ গণতন্ত্রীরা সরকার ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ১৯৩০ সালে কমিউনিস্ট পার্টি এবং সমাজ গণতন্ত্রী দলের ভোট যোগ করলে তা ৩৭.৬ শতাংশ, আর নাজী ভোট বেড়েছিল ৭০০ শতাংশ। ১৯৩১ সালে সমাজ গণতন্ত্রী রা একটা ঐক্যবদ্ধ ফ্রণ্ট গঠন ক রারা প্রচেষ্টা চালায়, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি তা উপেক্ষা করে। তারা এমনকি নাজী দের চরিত্র বুঝতে না পেরে, কিছু বিষয়ে নাজীদের সমর্থন করে - তাদের চোখে তখনো সমাজ গণতন্ত্রীদের সামাজিক ফ্যাসিবাদী। ১৯৩২ এর রাইখস্ত্যাগ নির্বাচনে নাজী ভোট ২ মিলিয়ন কম হলেও, কোনও দলই একক ভাবে সরকার গঠন করতে পারে নি, যদি কমিউনিস্ট পার্টি এবং সমাজ গণতন্ত্রী দল সমঝোতা হত, তাহলে তারা সরকার গঠন পারত। ১৯৩৩ সালে রাইখস্ট্যাগ পোড়ানোর মধ্যে দিয়ে ও কমিউনিস্টদের উপর দোষ চাপিয়ে হিটলার ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করে।  শুরু হয় নাজী সন্ত্রাসের পর্ব। সব বিরোধী দল কে বেআইনী  ঘোষণা করে, তাদের নেতৃ্ত্ব ও কর্মীদের গ্রেপ্তার ও হত্যা করার মধ্যে দিয়ে, তাদের কথা মতো ইহুদী নিধনের মাধ্যমে এক দলীয় সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় আর নাজী ক্যাডারদের সন্ত্রাস মারফত নির্মম শাসন প্রতিষ্ঠা করে।

কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিক আর জার্মান কমিউনিষ্ট পার্টির ভুল শুধু ভুল ছিল না, তা ছিল এক রাজনৈতিক অপরাধ এবং ট্রটস্কি দৃঢ় ভাবে শ্রমিক দল গুলির যুক্ত ফ্রণ্টের কথা ব লায় তাঁকে ‘স্রামাজ্যবাদের চর আখ্যা দেওয়া হয়েছিল কারণ সমাজ গণতন্ত্রীদের রাজনীতি ছিল আপোষকামী । বস্তুতঃ লেনিন পরবর্তী যুগে বলশেভিক দল এবং কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকে র মধ্যে গ্ণত ন্ত্রের গুরুত র অবমাননা হয়েছিল। তাত্বিক বিতর্কের অবসান ঘটানো হত সাংগঠনিক প্রভাব, শক্তি এবং কুৎসা মারফত, যে প্রসঙ্গে এখানে আলোচনার অবকাশ নেই।

নাজী সন্ত্রাসের  কথাও সবারই জানা- শুধু একটা প রিসংখ্যান দিই- ১৯৩৩- ১৯৪৫ অব ধি নাজী সন্ত্রাসের বলি ছিল ২ কোটিরও বেশী।

জার্মান একচেটিয়া পুঁজিও হিটলার কে স্বাগত জানিয়েছিল কারণ সমস্ত শ্রমিক গ্ণতন্ত্র কে ধ্বংস করে তা মুনাফার পথ প্রশস্ত করে দেবে। ১৯৩৩ সালের জুন মাসে তারা এটা পরিষ্কার করে যে সাম রিক উৎপাদন – অর্থাৎ যুদ্ধসামগ্রী উৎপাদন এবং বিক্রি করার মধ্যে দিয়ে মুনাফা অর্জন অর্থনীতির মুল স্তম্ভ হবে, এর পাশাপাশি মিলিটারী কে শক্তিশালী করাও ঘোষণা করা হয়েছিল। এটা ক্রমশঃ পরিষ্কার হচ্ছিল যে জার্মান পুঁজি এবং হিটলার শুধূ জার্মানির ক্ষমতা নিয়ে সন্তুষ্ট ন্য, বরং  ব্যাপকভাবে উপনিবেশ দখলের মত্ত সাম্রাজ্যবাদী চিন্তায় তারা মশগুল। ক্রমশই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে সারা বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছিল।

জার্মানির এই আক্রমণাত্মক মনোভাব যেমন অন্য সাম্যাজ্যবাদী দেশ গুলির বুর্জোয়াদের শংকিত করেছিল উপনিবেশ ভাগ বাটোয়ারার জায়গা থেকে, তেমনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সারা বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রিয় ও সংগ্রামী মানুষের কাছে তা ছিল অনেক ভীষণ ভয়ের । এই পরিস্থিতিতে ১৯৩৫ সালে জর্জি ডিমিট্রভ - বুলগারিয়ার কমিউনিস্ট এবং কমিন্টার্ন নেতা ‘ফ্যাসিস্ট আক্রমণের সামনে কমিউনিস্ট আন্তজার্তিকের কর্তব্য’ নামক নিবন্ধ পেশ করেন, যা পরবর্তীকালে ‘পপুলার ফ্রন্ট’ থিসিস নামে বিখ্যাত হয়। এই নিবন্ধে হিটলারের ক্ষমতায় আসার পিছনে মূলতঃ সমাজ গণতন্ত্রীদের বেইমানিকে দায়ী করা হয়, কিন্তু তৎকালীন জার্মান কমিউনিস্ট দল ও কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সংকীর্ণতাবাদী অতিবাম বিচ্যুতির সম্পর্কে বিশেষ কিছুই বলেনি। যাই হোক ফ্যাসিস্ট বিপদের মুখে এই থিসিস শ্রমিক দলগুলির ঐক্যবদ্ধ জোট ছাড়াও বিভিন্ন দেশে বুর্জোয়া উদারনৈতিক দলগুলির সাথে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ‘জনগণের ফ্রণ্ট’ গড়ে তোলার পক্ষে জোর দেয়, এমনকি তাদের সাথে মিলে সরকার গঠনের জন্য কমিউনিস্টদের পূর্ণ দায়িত্ব নিতে বলেন। স্তালিন সহ তৃ্তীয় আন্তর্জাতিকের নেতারা এই থিসিসকে সানন্দে গ্রহণ করেন। তাঁদের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়ন কে বাঁচানো ছিল একমাত্র কাজ। আন্তর্জাতিক বিপ্লবের গুরুত্ব তাঁদের কাছে হ্রাস পেয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু শুধুমাত্র বিষয়ীগত অধঃপতন দিয়ে বস্তুগত পরিস্থিতির বিশ্লেষণের  একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। এই পরিস্থিতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব, তার পরবর্তী সময় থেকে আলাদা ছিল। এমন কি মুসোলিনীর শাসনের প্রারম্ভিক পর্বের থেকে তা আলাদা এই অর্থে যে ফ্যাসিবাদ এক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের মাধ্যমে সরাসরি সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল আর শত বিকৃতি স্বত্তেও তার পতন, সারা বিশ্বের শ্রমিক , কৃষক, উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামের উপর প্রভাব ফেলত। এই বিষয় সোভিয়েত গণতন্ত্রর পুনরুত্থান এবং রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রকে উৎখাত করার তত্ত্বের প্রবক্তা ট্রটস্কিও মনে করতেন । ‘লেনিন পরবর্তী তৃতীয় আন্তর্জাতিক’ গ্রন্থে তিনি ব্রিটেন, আমেরিকার সাথে কূ্টনৈতিক ঐক্যর কথা বললেও, তিনি এবং তার সমর্থকরা ছিল পপুলার ফ্রন্ট এর-অর্থাৎ উদারনৈ্তিক দল গুলির সাথে জোট বেধে নির্বাচনে যাওয়া এবং এমন কি সরকারে যাওয়ার প্রক্রিয়ার ঘোরতর ছিলেন। তার যুক্তির সদর্থক দিক ছিল যে এর ফলে যে বিপ্লবী পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল তা শ্রেণী সংগ্রামকে  এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বিপ্লব সফল করার জন্য অনুকূল, আর কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের এই লাইন বুর্জোয়া গণতন্ত্র এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ । ভারতবর্ষ সহ বিভিন্ন দেশ যা মিত্র শক্তির উপনিবেশ ছিল, সেখানে তৃতীয় আন্তজার্তিকের দলগুলি প্রাথমিক ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীতা করেছিল, পরবর্তীকালে যদিও তারা ভুল সংশোধন করে এবং ভারতবর্ষে সি. পি. আই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করলেও সাহসিকতার সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে। চীনের ক্ষেত্রে জাপ বিরোধী যুক্তফ্রন্ট ছিল যাতে কুয়োমিন্তাং সামিল হয়েছিল, তা ছিল বিপ্লবের জন্য আবশ্যক, আর ট্রটস্কি তার পক্ষে ছিলেন উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জায়গা থেকে।

কিন্তু স্পেন ও ফ্রান্স উভয় জায়গাতেই তিনি ও তার অনুগামীরা, যেখানে ফ্যাসিস্ট শক্তি শক্তিশালী ছিল, সেখানেও তিনি ও তার অনুগামীরা এই ফ্রন্টের বিরোধী ছিলেন।

এটা ঠিকই স্পেনে বিপ্লবী অভ্যুথথান শুরু হয়েছিল ১৯৩৬ সালে বা তারও আগে - সে দিক থেকে তাকে ১৯১৯ এর ইতালি বা জার্মানির সঙ্গে তুলনা করা যেত। একটু ইতিহাস টা দেখা যাক।

১৯৩৩ সালে স্পেনে চরম দক্ষিণপন্থী সরকার নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং স্পেনের পুঁজিপতিরা মেহনতী মানুষের উপর ধারাবাহিক আক্রমণ নামিয়ে আনে। এর প্রতিবাদে সাধারণ ধর্মঘট এবং বিপ্লবী অভ্যুত্থানের চেষ্টা হলেও তা ছিল সীমিত কিছু জায়গায় সীমাবদ্ধ। তার বিশদ বিশ্লেষণ এখানে করছি না, তবে পুঁজিবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে জন সাধারণের ক্ষোভ বিক্ষোভই ১৯৩৬ সালে পপুলার ফ্রণ্ট সরকারকে ক্ষমতায় আনে, কিন্তু তারা জেতে খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে। এর অর্থ অর্থনৈ্তিক, সামাজিক শোষণে হতাশগ্রস্ত জনগ্ণের এক বড়ো অংশ উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত ছিলো। জন সাধারণের এই অংশ কে মতাদর্শ গত ভাবে প্রভাবিত করা যেত কেবলমাত্র বিপ্লবী কার্যক্রম শক্তিশালী করার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু স্পেনের বামপন্থীরা ছিল বিভক্ত – স্যোসালিস্ট পার্টির মধ্যে বিপ্লব সংগঠিত করা নিয়ে বিতর্ক শুরু হ লেও তার নেতৃ্ত্ব সংস্কারবাদের বাইরে বেরোতে চায়নি। কমিউনিস্ট পার্টি তৃ্তীয় আন্তর্জাতিকের শ্লোগান- ‘আগে ফ্যাসিবাদ পরাস্ত হোক , তার পর বিপ্লব ‘- এই তত্বে বিশ্বাসী ছিল, তাই সমাজতান্ত্রিক সমাজের লক্ষ্যে শ্রমিক, কৃ্ষকের বিপ্লবী অভ্যুথথানের বিরোধী ছিল তারা। স্পেনের নৈরাজ্যবাদী এবং পি.ও.উ.ম-এক বিপ্লবী বামপন্থী সংগঠন বার্সিলোনা, ক্যাটালোনিয়া অভ্যুথথানে অংশ নিলেও পরে তা পপুলার ফ্রণ্ট সরকারে অংশগ্রহণ করে।

১৯৩৬ সালে যখন জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে মিলিটারী অফিসার রা প্রতিবিপ্লবী অভ্যুত্থান শুরু করে এবং তাতে যোগ দেয় ইতালি ও মরক্কোর ফ্যাসিস্ট বাহিনী, তার জবাবে শ্রমিক, কৃষকরা সারা দেশ জুড়ে অভ্যুত্থান শুরূ করে ও কারখানার দখল নেয়, ব্যাপকভাবে জমি দখল ও শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবে তা স্প্যানিশ পুঁজি ও জমিদারদের আতংকগ্রস্ত করে এবং তারা ফ্যাঙ্কো বাহিনীকেই সমর্থন করতে শুরু করে। জার্মানি, ইতালি ও স্পেন এটা দেখিয়েছিল – যখন ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব হচ্ছে - তাকে দেশীয় সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণীই বড় মাত্রায় সমর্থন দেয় । তবে এর ব্যতিক্রম হতেই পারে। স্প্যানিশ উদারনৈতিক বুর্জোয়া দল ছিল খুব ই দুর্বল – স্যোসালিস্ট আর কমিউনিস্ট পার্টি মিলে  বুর্জোয়া কর্মসুচী রূপায়ন করেছিল- যুক্তি ছিল ফ্যাসিবাদ ছাড়াও যে পিছিয়ে পড়া স্পেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত নয়। স্পেনের ঘটনাবলীর ট্রটস্কির বিশ্লেষণকে অংশ্ত প্রমাণ করেছিল, কিন্ত তিনি ভেবেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়া এবং স্পেনের ক্ম্যুনিস্ট পার্টি ফ্যাসিবাদের বিরূদ্ধে আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু তা হয় নি। তারা বিপ্লবের বিরোধীতা করলেও তারা এবং আন্তর্জাতিক ব্রিগেড স্পেনে ফ্রাঙ্কো বাহিনীর বিরূদ্ধে মরণপণ সংগ্রাম চালায়, যদিও ১৯৩৯ সালে স্পেনে ফ্রাঙ্কো বাহিনী জয়লাভ করে। এই পর্বে স্তালিন নেতৃ্তবাধীন  সোভিয়েত রাশিয়া অস্ত্র ও সৈ্ন্যবাহিনী পাঠিয়ে স্পেন কে সহায়তা করে।

ফ্রান্সের ঘটনাবলী যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যাবে ফ্রান্সেও ১৯৩০ এর দশকে শ্রেণী সংগ্রামে উদ্দীপনা ছিল , যদি ও তা স্পেনের মতো বিপ্লবী জায়গায় যায় নি, তাই িনর্বাচনী কৌশলগুলি খুবই গুরুত্বপুর্ণ ছিল।  ১৯৩৬ এর নির্বাচনী ফল যদি দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে পপুলার ফ্রণ্ট পেয়েছে ৫৭.১৭ শতাংশ ভোট , আর চরম দক্ষিণ পন্থীরা পেয়েছে ৪২.৬৮ শতাংশ। পপুলার ফ্রণ্ট এর মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি পেয়েছে ১৫.২৬ শতাংশ ভোট। যদি এই নির্বাচনী জোট না হত, তাহলে চরম দক্ষিণ পন্থীরা ক্ষ মতায় এসে জেতে পারত। তারা হিটলারের সাথে হাত মেলালে সারা পৃ্থিবীর শক্তির ভারসাম্য হিটলারের অনুকুলে চলে যেতে পারত। এটা ঠিক ই পপু লার ফ্রণ্ট সরকার খুব সামান্য সংস্কার ছাড়া আর কিছু করে নি -   ফ্রান্সের পুঁজিপতিরা এই সরকার মারফত শ্রমিক শ্রেণীর উপর আক্রমণ বজায় রেখেছিল, কিন্তু তারা হেরে গেলে ফ্রান্সের অবস্থার তারতম্য হত পরিমাণ গত, আর সারা বিশ্বের  অবস্থার তারতম্য হতে পারত গুণগত।

একভাবে ১৯৩৬ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুচনা হয়, যার একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মিত্র শক্তি-ব্রিটেন, আমেরিকা ইত্যাদি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি, অন্যদিকে জার্মানি, ইতালি , জাপান ও অন্যান্য কিছু দেশ। আনুষ্ঠানিক ভাবে এর উদ্ধোধন হয় যখন ১৯৩৯ সালে হিটলার প্যোল্যান্ড আক্রমণ করে। তার আগে সোভিয়ের রাশিয়ার সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি হিটলারের জার্মানির সুবিধা ই করে দিয়েছিল বলে মনে করা হয়। স্তালিনের দিক থেকে একদিকে তিনি হয়ত শেষ মুহূর্ত অবধি  ভয়াবহ যুদ্ধ এড়াতে চাইছিলেন, অন্য দিকে সময় নিতে চাইছিলেন তার মিলিটারী বাহিনীকে আরো শক্তিশালী করার জন্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে ১৯৩৭ সালে সোভিয়েত রাশিয়ায় ‘মহান শুদ্ধিকরণ’ এর নামে স্তালিন ও তার অনুগত দের উদ্যোগে বলশেভিক দলের নেতৃত্বের অধিকাংশ, এবং মিলিটারী র নেতৃস্থানীয় অনেকেই - যেমন তুকাচেভস্কি তাদের হত্যা করা হয়। অভিযোগ ছিল তারা সবাই পঞ্চম বাহিনীর দালাল। এই ঘটনা মিলিটারী কেও দুর্বল করে দেয়। যাই হোক সোভিয়েত বাহিনী এবং জনগণের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর হিটলার ও ফ্যাসিস্ট বাহিনী পরাজয় স্বীকার করে।

উল্লেখ্য পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের পতন ঘটানো হয়। আজকের ভারতবর্ষের ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা কিছু পরিমাণে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে। সেই প্রসংগে যাবার আগে দু একটি বিষয় উত্থাপন করা প্রয়োজন।

সোভিয়েত রাশিয়া সহ গোটা পূর্ব ইওরোপের তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের বিশদ আলোচনা করার সুযোগ এখানে নেই। তবে একটা ধারাবাহিক পদ্ধতি মধ্যে দিয়ে সুবিধাবাদী স্তর- আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা দখল এবং তাদের শেষ অবধি পুঁজিবাদকে ডেকে আনা- এই প্রক্রিয়া সব দেশেই কম বেশী হয়েছিল। বিশ্ববিপ্লবের সম্প্রসারণের ব্যর্থতা এই প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করেছিল। বিপ্লবের কিছু সময় পরই যে একদলীয় শাসন - এই বিষয়কে অনেকেই গণতন্ত্রের পরিপন্থী বলেন। গণতন্ত্রের অবমাননা যে হয়েছিল, এ বিষয়ে উল্লেখ আগেই করেছি, যদিও তা ফ্যাসিস্ট শাসনের গণহত্যার ধারে কাছে আসে না। ব্রিটেন, আমেরিকা ইত্যাদি দেশে আভ্যন্তরীণ বুর্জোয়া গণতন্ত্রে বহু দলের অস্তিত্ব থাকলেও উপনিবেশগুলিতে তাদের গ্ণহত্যা আর লুটতরাজ তাদের গণতন্ত্রের ফাঁকা মুখ দেখিয়ে দেয়।