দেশভাগ : হিংসা, ক্ষত, মানব মনস্তত্ত্ব

আরেকটি স্বাধীনতা দিবস  |  আরেকটি দেশভাগ দিবস | স্বাধীনতা দিবস নিয়ে নানা উৎসবের ভেতর দেশভাগের কথা ভাবে এখনো কেউ ? আমি প্রত্যেক বছর ১৫ই আগস্ট বিলেতের এক প্রান্তে বসে স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে দেশভাগের কথাও ভাবি | ছেলেকে বলি দেশভাগের কথা | দেশভাগ এখনো খুবই প্রাসঙ্গিক বলেই চিন্তা ভাবনা গুলো মাথায় ভিড় করে আসে | কেন প্রাসঙ্গিক ? দেশভাগের দগদগে ক্ষত এখনো ভীষণভাবে বর্তমান | কাশ্মীর সমস্যার এখনো সমাধান তো হয়ই নি -- নানা ভাবে জটিল হয়ে উঠছে ক্রমশঃ | এখনো কে কোন দেশের নাগরিক -- তার নথিপত্র নিয়ে হিসেব নিকেশ শেষ তো হয়ইনি, বরং নতুন করে বাগ বিতন্ডা তৈরী হচ্ছে | নতুন বিল আসছে | তার ফলশ্রুতি কি হবে এখনো পরিষ্কার নয় | জাতি ধর্মের ফাটল নতুন করে দেখা দিচ্ছে | দেশভাগের ফলে সৃষ্ট তিনটি দেশের ভেতর স্বাভাবিক যাতায়াত দূরে থাকুক, দিনকে দিন রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে | চিকিৎসা - শিক্ষা - সামাজিক খাতে যেই অর্থ খরচ হতে পারতো, সেই খরচ হচ্ছে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে | ইউরোপীয় অনেক দেশের ভেতর এই বৈরীভাব ছিল বহুদিন পর্যন্ত | কমে এসেছে এখন | সহযোগিতার বাতাবরণ কমবেশি দেখা গেছে বেশ কিছু দশক ধরে | একটা কথা চালু আছে – Those who forget history find themselves condemned to repeat it. আমরা বোধহয় ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারিনি | বরং সোশ্যাল মিডিয়াতে ইতিহাস বিকৃতির মারাত্মক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে | বহুমাত্রিক জটিল সমস্যার অতিসরলীকরণ করা হচ্ছে অনেক সময় | মানুষ ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র না পড়ে, না জেনে বিশ্বাস করে নিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ার উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিকৃত তত্ত্ব ও তথ্য | আমার মনে হয় দেশভাগ নিয়ে জানতে গেলে একটা emotional distance গড়ে তোলা দরকার বিষয়টি সমন্ধে | কাজটি সোজা নয় | বিষয়টি স্পর্শকাতর | অনেক পরিবারে, অনেক সম্প্রদায়ে দেশভাগের বীভৎস অভিজ্ঞতা শুনে অনেকে বড়ো হয়েছেন | তার থেকে বেরিয়ে আসা সোজা নয় | তবে বেরিয়ে না আসতে পারলে একটা সম্যক ধারণা গড়ে তোলা মুশকিল এই ব্যাপারে | দেশভাগের বিভিন্ন দিক যদি আমরা প্রতিফলন করতে না পারি আজকেও, তাহলে সমস্যা চলতেই থাকবে |

ইতিহাসের কিছু আপেক্ষিকতা আছে -- যাকে রিলেটিভিটি অফ ফ্যাক্টস বলা যেতে পারে |

দেশভাগের ইতিহাস চার ভাগে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে:

১ | সরকারি স্তরে যে রাজনীতি হয়েছিল -- ব্রিটেনে এবং দিল্লিতে

২ | দেশভাগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব -- জিন্নাহ, গান্ধীজি, নেহেরু, প্যাটেল, মাউন্টব্যাটেন, মৌলানা আজাদ  প্রভৃতির ব্যক্তিত্ব, তাঁদের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত

৩ | দেশভাগ সংক্রান্ত হিংসা ও আগ্রাসন

৪ | দেশভাগের  সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

দেশভাগের মনস্তত্ব নিয়ে খুব একটা বেশি বই লেখা হয়েছে কি না আমার ঠিক জানা নেই | তবে সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে এই বিষয়টি নিয়ে অনেকটা চিন্তা ভাবনা করি আমি | আমার কাজ মানুষের অপরাধ আর হিংসামূলক ব্যবহার নিয়ে | দেশভাগের আগে ও পরে মানুষের হিংসা আমাকে খুব ভাবায় | হত্যা ধর্ষণের সীমাহীন সংখ্যা আমাকে ভাবায় | ভাবায় হত্যার বীভৎসতা | বাঙালি ৪৩ এর দুর্ভিক্ষে  মারা যায় লাখে লাখে | সেই সময়ের খুব একটা হিংসার কথা পড়া যায় না | কি হলো তার বছর তিনেকের ভেতর যাতে মানুষ বদলে গেল আমূল ? কি হয়েছিল ৪৩ আর ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্টের সেই দুপুরের ভেতর ? সেদিন দুপুরে যেই হিংসা শুরু হয়, বন্ধ হয়েছে কি তা এখনো ? Great Calcutta Killing এ পাঁচ দিনেই আনুমানিক ৪ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয় | তারপর ৪৬ এর অক্টোবরে নোয়াখালির দাঙ্গা | পাঞ্জাব - বিহারের দাঙ্গা | ৬৪, ৭১, ৯২ , ২০০২ এর দাঙ্গা | মৃত্যু মিছিল শেষ হয়নি | ব্রিটিশ ভেদনীতি আর বৃহত্তর রাজনীতির দাবার চাল দিয়ে কি এই হিংসার পুরোপুরি ব্যাখ্যা হয় ? নাকি মনের অন্ধকার কোণে উঁকি মেরে দেখার জন্য দরকার মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা ? এই বিষয়ের স্টাডি ডিসাইন করা সোজা নয় | সময়ের খাদে হারিয়ে গেছে অনেক স্মৃতি | অনেক জীবন | তবু প্রয়োজনীয়তা থেকেই যায় |

মানুষ যে হিংস্র প্রজাতি তা নিয়ে বোধহয় কোনো সংশয় নেই | কিছু ইঁদুরশ্রেণীর প্রজাতি ছাড়া, তেমন কোনো কারণ ছাড়াই নিজের প্রজাতিকে ধ্বংস করার উদাহরণ জীবজগতে খুব বেশি নেই | হিংস্র ব্যবহারকে জান্তব বলায় তাই আমার ঘোর আপত্তি | এই ধ্বংসাত্মক মানব ব্যবহার ইতিহাসের বিভিন্ন সময় ঘনীভূত হয়েছে | যেমন হয় দেশভাগকে কেন্দ্র করে |

হিংস্রতা কি জন্মগত ? Instinct না learned behaviour ? এই নিয়ে মনোবৈজ্ঞানিকদের ভেতর বিতর্ক আছে | অন্যান্য জন্তুদের মতো, বিভিন্ন অবস্থায় মানুষের physiology র রকমফেরে শরীরের ভেতর নানা জৈবরাসায়ণিক প্রকাশ হয় হিংস্রতার ভেতর দিয়ে | এই ব্যবহারকে instinctive ধরা যেতে পারে | দুটি ক্রুদ্ধ বেড়ালের ব্যবহারে খুব একটা তফাত দেখতে পাওয়া যায় না | দুটি ক্রোধান্বিত মানুষের physiological বিক্রিয়া এক হলেও, ব্যবহারের বহিঃপ্রকাশে কিন্তু তফাত থেকে যায় | তাই মানুষের হিংস্রতাকে পুরোপুরি instinctive বলে ধরে নেওয়া একটু মুশকিল |

ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত হিংস্রতার তফাত আছে | একটি সমষ্টি - দেশ, জাতি বা ধর্ম, অন্য একটি সমষ্টির আক্রমণের মুখে নিজেদের বিভেদ বা ব্যক্তিগত সত্তা ভুলে অনেকটাই এক হয়ে যায় | নিজের সমষ্টির রক্ষণার্থে | একটি সমষ্টির আপাত শান্তিপ্রিয় মানুষ যদি মনে করে তার গোষ্ঠী বা সমষ্টি আক্রান্ত, তার ব্যবহার পাল্টে যেতে সময় লাগে না | এমনি সময়ে হয়তো একটা মুরগিও যে কাটতে পারেনি, দেশভাগের সময় তার হাতেই খুন হয়েছে একাধিক মানুষ -- এরকম উদাহরণের অভাব নেই | নিজের সত্তাকে বিসর্জন দেওয়ার এই প্রবণতা দেখা যায় নিজের গোষ্ঠীর প্রতি real বা perceived threat অনুভব করলে | দেশভাগের সময় এই বোধ তুঙ্গে উঠেছিল |

প্রায় সব জন্তুর মতো, মানুষ নিজের territory বা অঞ্চল রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর | এই territory মানুষের নিজের বাড়ি, ধর্ম, রাজ্য বা দেশ হতে পারে | Territory র জটিলতার সঙ্গে তার রক্ষা করার প্রক্রিয়াও জটিলতর হয়ে ওঠে | একটি ছোট বাড়ির রক্ষা একটি তালা দেওয়া দরজা দিয়েই হতে পারে | একটি ধর্ম বা দেশের রক্ষার জন্য কিন্তু প্রয়োজন হয় নানা নিয়মের জটাজাল | সুসংবদ্ধ সৈন্যদল | Security বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাধারণত ত্রি-স্তরীয় -- physical , procedural ও relational | একটি বাড়ির সুরক্ষার জন্য একটি পাঁচিল লাগে, একটি দেশের সুরক্ষার জন্য লাগে কাঁটাতার, সীমান্তরক্ষী -- এটা physical security | একটি ধর্মের মানুষ অন্য একটি ধর্মের মানুষকে বিয়ে করতে পারবে না, ধর্মের স্বাতন্ত্র বজায় রাখার জন্য -- এটা procedural security | একটি পরিবার বা জাতি যদি নিজেদের সদস্যদের ভেতর ভালো সম্পর্ক আর বোঝাপড়া বজায় রাখে -- তাহলে এই সদস্য সমষ্টির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করবে না -- এটা relational security |

এই মনোবৈজ্ঞানিক চিন্তা দেশভাগের ক্ষেত্রে কিভাবে কার্যকর হয়েছিলো, তার দিকে একটু তাকানো যাক | মানসিক ক্ষত (trauma) মাপা সহজ নয়, তবে কিছু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ক্ষতের ব্যাপ্তি নিয়ে খানিক ধারণা করা যেতে পারে | দেশভাগের হিংসায় অনুমান করা হয় প্রায় এক লক্ষ মানুষ মারা যান | আশিস নন্দীর সাম্প্রতিক গবেষণায় মৃতের সংখ্যা ২ লক্ষ বলা হয়েছে | জয়ন্তী বসুর মতে এই সংখ্যা ৩.৫ লক্ষ | গৃহহীন হন ১ কোটি ৬০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ | পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম আর হয় নি | হিন্দু, মুসলিম , শিখরা মূলত ছিন্নমূল হন - বহু প্রজন্মের ভিটেমাটি থেকে | এর ওপর ছিল নারীদের ওপর বীভৎস যৌন উৎপীড়ণ | ১ লাখের বেশি নারী ধর্ষিতা হন | ৩০ হাজারের বেশি নারীকে অপহরণ করা হয় যৌন লিপ্সা পূরণের জন্য | এঁদের বেশির ভাগের কোনো হদিশ পাওয়া যায় নি |

এই ছোট লেখায় বিশদে যাওয়ার সুযোগ কম | তাই কিছু বুলেট পয়েন্ট দেওয়ার চেষ্টা করছি দেশভাগের নিয়ে :

১ | হিন্দু -মুসলিমের ভেতর বৈরীভাব বহু পুরোনো | ভারতে ইসলামের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই শুরু হয় হিংসা |

২ | ইংরেজরা থিতু হয়ে বসার আগেও বহু সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হয়েছে |

৩ | ব্রিটিশদের Divide and Rule policy মূলত দায়ী হিন্দু-মুসলিমদের বৈরীভাবের জন্য -- এটি অতিসরলীকরণ | ব্রিটিশরাজের অবসানের বহু বছর পরেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে | হয়ে চলেছে | ব্রিটিশরাজের নীতি অবশ্যই এই সমস্যায় আগুন যুগিয়েছে | তবে আগুন আগেও ছিল, পরেও আছে |

৪ | ব্রিটিশরাজের আগে দীর্ঘকাল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ছিল মুসলিম শাসকের অধীনে | কিন্তু হিন্দুদের সামাজিক ছুৎমার্গের নীতির ফলে দুই ধর্মের মানুষের দুস্তর দূরত্ব ছিল | এই ছুৎমার্গ মুসলিম সমাজের ভেতর দীর্ঘকালীন trauma জিইয়ে রেখেছে |

৫ | ব্রিটিশরাজের আমলে হিন্দুদের শিক্ষা - আর্থ - সামাজিক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া, মুসলিমদের পক্ষে যন্ত্রণাময় ছিল | দেশের শাসনভার থেকে ধীরে ধীরে পিছলে যাওয়া, মুসলিমদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় নি |

৬ | স্বাধীনতা, ২০০ বছরের ব্রিটিশরাজের ফলে বদলে যাওয়া ইতিহাসের point of restitution বা সামাজিক অবস্থানের পুনরুদ্ধারের সিযোগ নিয়ে আসে দুই সম্প্রদায়ের সামনে |

৭ | এই যুগসন্ধিক্ষণে বহু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া - রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জটিল জ্যামিতিতে উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে হয়ে ওঠে |

৮ | এই সব কিছুর প্রেক্ষাপটে আমাদের হিংসার মনোবিজ্ঞানকে বোঝার শক্ত কাজ করতে হবে | যদি এতে চলতে থাকা সাম্প্রদায়িক বিষাক্ত পরিবেশ খানিকটা তরল হয় | ইতিহাস যেন ফিরে না আসে আবার |

এই কাজ সহজ নয় | প্রাথমিক সমস্যা - ইতিহাসের সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের সম্পর্ক বেশ জটিল | ইতিহাস মূলত সংখ্যা, ঘটনাপ্রবাহের মতো বাহ্যিক দিক বোঝার চেষ্টা করে | মনোবিজ্ঞান মানুষের ভেতরের চিন্তাধারা বোঝার চেষ্টা করে | কিভাবে মনের ভেতরের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হয় বহির্জগতে -- সেই যোগসূত্র পাওয়া সহজ নয় | মনোবিজ্ঞানীদের সুযোগ হয় না ইতিহাসের প্রধান ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের | গান্ধী বা জিন্নার মতো মানুষদের মনের ভেতরে কি আছে, তা অধরাই থেকে যায় | Hypothesise করতে হয় তাঁদের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ দেখে | তাঁদের কার্য তাঁদের চিন্তার প্রতিফলন করবে সব সময় -- তার কোনো মানে নেই |

সাধারণ মানুষের চোখ বা স্মৃতি দিয়েও দেশভাগের ক্ষত বা হিংসা বোঝা সহজ নয় | যত দিন যায় -- স্মৃতির ওপর ততো প্রলেপ পড়ে | কখনো বা আরো দগদগে হয়ে ওঠে স্মৃতি | ঠিক সেই ঐতিহাসিক ক্ষণে মনের অবস্থা কেমন ছিল, তা বোঝা শক্ত হতে পারে তার জন্য | মূলত কেস history মূলক রিসার্চের ভিত্তিতে বোঝার চেষ্টা করেছেন জয়ন্তী বসের মতো কিছু মনোবৈজ্ঞানিক | ওঁর Reconstructing The Bengal Partition বইটি পড়া দরকার -- যাঁরা এই বিষয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে চান |

এই লেখার শুরুতে মানব ব্যবহারের মনোবৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা নিয়ে কিছু কথা বলেছিলাম | দেশভাগের পটভূমিতে এই psychological driving factors একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক |

স্বাধীনতার প্রাক্কালে স্বাধীনোত্তর ক্ষমতা কার হাতে থাকবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় | সমষ্টি বিপন্ন -- এরকম এক ধারণা মানুষের ভেতর ঢুকে যায় | ধার্মিক সমষ্টি যখন বিপন্ন বোধ করে, তার রক্ষার্থে মানুষ অনেকদূর যেতে পারে | ইতিহাসে বার বার দেখা গিয়েছে -- ক্যাথলিক - প্রোটেস্টান্টদের লড়াইতে, Crusade এর সময় | মানব ইতিহাস ধর্মযুদ্ধের নরমেধ যজ্ঞে দীর্ণ | এই বিপন্নতার সমাধান সূত্র হিসেবে গতি পায় দ্বি-জাতিতত্ব | এই ধারণার আভাস ছিল লালা লাজপতের ভাবনায় ১৯২৫ সালে | ১৯৩০ এ ইকবালের মননে দানা বাঁধে এই তত্ব | পরবর্তীকালে জিন্না এই তত্বকে এগিয়ে নিয়ে যান | নানা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত করেন | মুসলিম সাম্প্রদায়িক ভাবনা আর ব্রিটিশ ভেদনীতির সাথে উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক ভাবনার ভূমিকাও মনে রাখা দরকার | জয়া চ্যাটার্জি তাঁর Bengal Divided বইতে এই বিষয়ে তাঁর গবেষণালব্ধ দৃষ্টিভঙ্গি বিশদে লিখেছেন |

হিন্দু - মুসলিম ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশরাজের সময়কালে একটি unstable equilibrium এ থাকতো | এই অনিশ্চয়তার মুখে দুটি আলাদা দেশ এক নিরাপত্তার চিন্তা রোপণ করে | দেশ মানেই এক নিরাপত্তা -- physical , procedural ও relational | এই বোধ মানুষের ভেতর একবার ঢুকে গেলে, বেরোনো খুব মুশকিল | ইতিহাসে তাই দেখা যায় নতুন নতুন দেশের দাবি | রক্তক্ষয়ী দীর্ঘসংগ্রাম | মানচিত্রের পরিবর্তন | দেশ মানেই কিছু মানুষের নেতা থেকে দেশনেতা হয়ে ওঠা | নেতৃত্ব, শাসন, ক্ষমতাভোগ | ক্ষমতার অলিন্দে থাকার সুবিধে | দেশের সম্ভাব্য নেতৃত্ব, মানুষকে খেপিয়ে তুলে যদি নতুন দেশের ব্যবস্থা করে ফেলতে পারেন -- নেতাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাভোগের ব্যবস্থা পাকা হয় | দেশের আবেগের সঙ্গে যদি যোগ হয় ধর্মীয় আবেগ - এক নিদারুণ দ্বিমাত্রিক উন্মাদনার সৃষ্টি হয় | এই উন্মাদনার সব উপাদানই ভারতীয় উপমহাদেশে সেই সময়ে ছিল | এর ফলশ্রুতি তাই হয় ভয়ানক |

দেশভাগের দাঙ্গায় নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতন নিয়ে বিশদ আলোচনা প্রয়োজন | তৎকালীন কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতা কি এই যৌন উৎপীড়নের কথা বলেছেন ? তবু ভীষণভাবে হয়েছে ধর্ষণ | শিশুদের জ্বলন্ত তন্দুরে ফেলে হত্যা | যারা এই অপরাধ করেছে, তাদের বেশির ভাগ কিন্তু দাগি আসামী বা যৌন অপরাধী ছিল না | দেশভাগের আগে মোটামুটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেন এরা | পরেও হয়তো ফিরে গিয়েছেন স্বাভাবিক জীবনে | Psychoanalyst মনোবৈজ্ঞানিকরা যৌনতার সঙ্গে হিংস্রতার সম্পর্ক নিয়ে অনেক কাজ করেছেন | মোটামুটিভাবে বলা যায় , যৌন আবেগ মানুষ স্বাভাবিক সামাজিক ও ন্যায়ের বাঁধনের জন্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখে | দাঙ্গার ডামাডোলে যেখানে ন্যায়ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সেই সময় বহু মানুষ তাদের অবদমিত যৌন ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজন মনে করে না | লিপ্ত হয় যৌন উৎপীড়নে | ধর্ষণে |

দেশভাগের হিংসার গভীর মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে | এই লেখায় কিছু বিষয় ছুঁয়ে গেলাম মাত্র | এই গভীর সমস্যার সমাধান সম্ভব যুক্তিনির্ভর বোঝাপড়ার মাধ্যমে | দেশভাগের পর তৃতীয় প্রজন্ম এসে গেছে | এবার চলুন , আমরা একসাথে বাঁচি | পৃথিবী, নিজেদের দেখিয়ে দি -- আমরা একসাথে বাঁচতে পারি |

 

তথ্যসূত্র :

জয়া চ্যাটার্জি - Bengal Divided

Anthony Storr - Human Aggression

কল্যাণ মণ্ডল - ১৯৪৬ - ৪৭ এর ধর্ম -সাম্প্রদায়িক গণনাশন

শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় - দাঙ্গার ইতিহাস

 

10 Comments
  • avatar
    Dr. Haimanti Chakrabarti

    15 August, 2021

    অসাধারণ তৃপ্তি পেলাম,স্বাধীনতা দিবসের দুপুরে নিজে একটি ছোট বক্তৃতা দিয়ে এসে রোববারের মাংস ঝোল ভাত খেয়ে ভাত ঘুমের মায়া ত্যাগ করে তোমার কাছে কত অজানারে জানা হইল রে ভাই আমার! আমি মুগ্ধ,আমি রিদ্ধ,আমি আপ্লুতও বটে।

  • avatar
    Amitava Mutt

    15 August, 2021

    Factually it is almost right but in some points The writer may mislead us by quoting racial reason, In my openion it is not only racial but also economic and social reason our contry was independent after getting knife in her body and soul.it is painful and we still carrying out the burnt flesh of hatred till date even yesterday also when again some action fro plitical freternity points for mere political mileage ignoring the magnitude of crisis and forgetting the truth .

  • avatar
    Adhikram Banerjee

    15 August, 2021

    ভাল লাগল। বিশেষত এক জন মনস্তাত্ত্বকের দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে। তবে ইতিহাস পূনঃবিশ্লেষন করলে দেখা যাবে যে ইংরেজরা যেমন আমাদের অধিনস্ত করে শাষন করেছেন তেমনি আমাদের সামাজিক, ভাবে বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যয় বিচার, আইনি ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য ক্ষেত্রে উন্নত করার জন্য অনেক উৎসাহ দিয়েছেন এবং এই ব্যাপারে ওনাদের অবদান ওনাদের যোগদান না হলে আমরা উজবেক এবং মোঙ্গল লুটেরা শাসকদের ক্রিতদাশ কিংবা দুর্বিসহ, দম বন্ধ করা হারেমে ওদের নিষ্ঠুরতার ভোগ বস্তু হয়ে খুশি থাকতাম। The underground dungeons below their fortress meant to preserve captive indian women for their cruel and pleasurable pursuits raises doubts wheter these rulers were humans or beasts

  • avatar
    Rajdeep Chowdhury

    15 August, 2021

    Oshamanyo… just sumptuous ❤️

  • avatar
    DR.PRADIP KUMAR DAS

    15 August, 2021

    বাহ্ ভাল লাগল একদম নতুন দৃষ্টিকোন থেকে ভেবেছ ন লিখেছ।বিষয়টা নিয়ে আরো বিস্তারিত লেখা পড়ার আশায় রইলাম। যে বুলেট গুলো তুমি উল্লেখ করেছ সেই গুলো ধরে ধরে একটা একটা করে বিস্তারে লেখা চাই--প্রদীপদা

  • avatar
    DR.PRADIP KUMAR DAS

    15 August, 2021

    বাহ্ ভাল লাগল একদম নতুন দৃষ্টিকোন থেকে ভেবেছ ন লিখেছ।বিষয়টা নিয়ে আরো বিস্তারিত লেখা পড়ার আশায় রইলাম। যে বুলেট গুলো তুমি উল্লেখ করেছ সেই গুলো ধরে ধরে একটা একটা করে বিস্তারে লেখা চাই--প্রদীপদা

  • avatar
    Archana Burman

    15 August, 2021

    Ashadharan

  • avatar
    সমীরণ রায়

    15 August, 2021

    অসাধারণ পর্যালোচনা।

  • avatar
    সমীরণ রায়

    15 August, 2021

    অসাধারণ মনোজ্ঞ পর্যালোচনা।

  • avatar
    SWASTI SOBHAN CHAUDHURI

    16 August, 2021

    অনেক চিন্তা জাগিয়ে তোলা লেখা।

Leave a reply