সাদা সুতো রঙিন বল

ভাদ্রের মেঘের মতো জীবনের গল্পগুলো ভেসে ভেসে যায় কোন নিরুদ্দেশের পথে। চোখের আড়ালে চলে গেলেই ওরা রূপকথা হয়ে যায়, অথচ ওরাই একসময় ভীষণভাবে সত্য ছিল। তখন ওদের বর্ণ ছিল রঙিন, আমাদের আজকের নতুন জন্মানো গল্পগুলোর মতো অথবা আগামীর স্বপনগুলোর মতন। ‘আজ’ হল রঙিন বলের গায়ে চোখ রেখে দেখা। আর নিরুদ্দেশী গল্পগুলো অতীতের স্মৃতি, যা শুধু সাদা সুতোর সূক্ষ্ণ সেতুপথে জুড়ে আছে আমাদের বর্তমানের সাথে। অথচ এক কী ভীষণ মায়াবী টানে বারবার রঙিন বলের গা থেকে চোখ সরে যায়। দৃষ্টি হারায় ওই বিবর্ণ সেতুপথে। অতীতের মায়া-- কে কবেই বা ত্যাগ করতে পেরেছে! শিকড়কে ভুলে যাওয়া চলে না। শিকড়কে ভুলে যেতে চায়না কেউ-ই। অতীত মানেই এক বিশাল ম্যানগ্রোভ গাছের শিকড়। একজন মানুষ তার সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে ওই শিকড়ের খাঁজে খাঁজে।

যে একাকিত্ব মানুষকে ঘুণপোকার মতো খুঁড়েখুঁড়ে খায়, সেই একাকিত্বই কখনো কখনো অতি মূল্যবান হয়ে ওঠে। স্মৃতির পথে বিচরণও একধরনের বিলাসযাপন—হয় সে সুখবিলাস, অথবা হতে পারে দুঃখবিলাস। মন যখন আধুনিক বিলাসিতায় হাঁপিয়ে ওঠে, তখন সে ভিড় ঠেলে একাকী হতে চায় স্মৃতিবিলাসী হবে বলে। তখন সে নির্জন ছাদের একটি কোণ খোঁজে, অথবা খোলা ব্যালকনির একটি ফাঁকা চেয়ার, হতে পারে নদীর ঘাটের একটি নির্জন গাছতলা। বিষণ্ণ দুপুর অথবা তারাহীন একটি রাতের খোলা আকাশ! নিদেন একটা অন্ধকার গৃহকোণ, যেখানে কোনও এক আধখোলা জানালার ফাঁক গলে একবিন্দু আলোর রেখা ফিশফিশিয়ে বলে যাবে তুমি এখনও বেঁচে আছো আর বেঁচে আছে তোমার যাপিত জীবনের সেই সাদাকালো হয়ে যাওয়া গল্পগুলো। একা হও, না পেলে একাকিত্ব ছিনিয়ে নাও। স্মৃতির অ্যালবাম খোলো, জোনাকিরা সেখানে ঘুমিয়ে আছে। আলতো ফুঁ দিলেই আলোর মতো জ্বলে উঠবে তারা। তুমি বেছে নাও—কাকে চাও তুমি—সুখ,নাকি দুঃখ?

সেদিন বিষণ্ণ বিকেলে জানালার কাচের গা বেয়ে অবিরাম নেমে আসা বৃষ্টির জলের ধারার দিকে তাকিয়ে মনে হল—সে যেন বলছে— ‘বয়ে চলা-ই তো জীবন। থেমে আছো কেন? নদীও পারে না, বৃষ্টিও পারে না, কিন্তু মানুষ পারে’।

কী পারে?

একমাত্র মানুষই পারে দুই দিকে বইতে—সামনে অথবা পিছনে। পিছনের পথে বইতে হলে একা হতে হয়। এই নির্জন মুহূর্তে আমি কাকে চাই—সুখ না দুঃখকে? একবার মনে হল—সুখ… সুখ! সুখকে চাই। তবে দুঃখের কী হবে? সেও তো আমারই মননজাত। এই বিষণ্ণ বিকেলে একটু না-হয় ভিজে উঠবে দু-চোখের পাতা। কোনোকিছু ভাবার আগেই চোখের সামনে নেমে এল আস্ত এক কাপড়ের পুঁটুলি। যার ভিতরেও মা ভাদুরে রোদ ভরে রাখত। সারাবছর ওই পঁটুলির ভিতরে ভরা থাকে পুরোনো কাপড়জামা। পুরোনো হলে কী হবে? থরে থরে সাজানো। কোনো একদিন এক বাসনওয়ালী বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁকে হেঁকে যাবে— ‘বাসন লিবে, বাস…ন। কাপড় বদল থাল বাসন?’

গৃহস্থের গৃহিনী সেই ডাকের অপেক্ষায় যত্নে রেখে দেয়, পুরোনো কাপড়ের পুঁটুলি। আকাঙ্ক্ষিত সেই ডাক শুনলেই খাটের তলা থেকে বেরিয়ে আসে আর আসে এই ভাদ্রে। ঘরে যে শুধু মানুষ বাস করে, আর সেটা যে সত্য নয়, তা ভাদ্র না এলে সারাজীবন অজানাই থেকে যেত হয়তো। একটা মানুষের বাড়ি এক আজব জাদুঘর। জানতে-অজান্তে কত কী-ই যে আমরা জমিয়ে রাখি। আমাদের বাড়ির খাটেরতলাটা আমার কাছে তেমনই এক জাদুঘর ছিল। এক অজানা বিশ্ব লুকানো যেন ওইখানে। একটা কালো বড়ো ট্রাঙ্ক, ভিতরে কী না জানি গোপন সম্পদ। তা ওইসব সম্পদ ভাদ্র এলেই ট্রাঙ্ক থেকে বেরোতে চায় কেন? আষাঢ় আর শ্রাবণ জুড়ে প্রকৃতি যে কেঁদেছে, চোখের জলে জাদুঘরের আনাচেকানাচে গুমসানি গন্ধ। শুধু কি এই কারণ, নাকি ওরাও, ওই জাদুঘরের যত সামগ্রী প্রাণভরে সারা বছরের প্রাণবায়ু ভরে নিতে চায়! নাকি ওরাও আত্মীয়, বৎসরান্তে একবার মোলাকাত হলে, প্রাণের স্পন্দন মিলিয়ে নেওয়া যায়!  

মন বলে ওরাও আত্মীয়। ওই পুরোনো জামাকাপড়, ওই ট্রাঙ্ক ভরা বই, ভাঙা কিছু পিতলের বাসন। বই না হয় সংগ্রহের জিনিস, কিন্তু ভাঙা বাসন, পুরোনো জামা—ওগুলো কেন রাখা?  যেদিন বাড়ির সামনে সত্যিই এক বাসনওয়ালী এসে ডাক দিত, পুঁটুলি খুলে মা ওদেরই মধ্যে ভালো গুলো সরিয়ে রেখে একেবারে খারাপ গুলো নিয়ে বেরিয়ে আসত, যেন নতুন অতিথি আসবে জেনেও পুরোনোকে বিদায় জানাতে কত ব্যথা! এ যেন সেই রোগশয্যায় প্রিয় মানুষের জীর্ণ দেহকে শেষ পর্যন্ত আগলে রাখার চেষ্টা। একবার বিদায় জানালে আর তো ফিরে আসবে না। ওই পোশাকের সাথেও তো কত স্মৃতি! কবে? কোথায়? কত দামে তাকে কেনা হয়েছিল, ভুরভুর করে মনে পড়েনা বুঝি? সেসব কি এত সহজে ভোলা যায়? ওই পোশাকের সাথে যে সব গল্প জুড়ে আছে, সেই গল্পের কথা বলছি। সে আছে তাই গল্পটাও আছে। ভাঙা বাসনগুলো দেখলে পূর্বপুরুষের অস্তিত্বের অনুভব জেগে ওঠে। হয়তো ঠাকুমা ওই ভাঙা ঘটিকে মুখের সামনে উপুড় করে ঢকঢক করে জল খেতেন, ওই কানাভাঙা বগি থালাটা, ঠাকুরদাদার বড্ড প্রিয় ছিল হয়তো! বাবা রোজ রাতে যে কাঁসার বাটিতে রুটি খেতেন, ভেঙে গেলেও তার গল্পগুলো তো বিস্মৃত হওয়া যায় না। এভাবেই একটা ঘর, একটা সংসার জাদুঘর হয়ে ওঠে। আমাদের বাড়িটাও তার ব্যতিক্রম কিছু না। আসলে শরতের নীল আকাশে রোদ হাসলে, মানুষের হৃদয় হেসে ওঠে। ভাদ্র আগমনীর সুর শোনায়। গৃহস্থকে বলে, যা কিছু বৎসরের আবর্জনা, তাকে ওই হলুদ রৌদ্রে পুড়িয়ে তপ্ত লোহার মতো খাটি হয়ে ওঠো। জীবন সহজ হবে।

একবার ওই পুঁটুলি খুলতেই আজব কাণ্ড ঘটল। একটা সরু সাপ কিলবিল করে বেরিয়ে এল। সে এক ভয়ানক হুলস্থুল ব্যাপার। ঘর ঝাড়তে ঝাড়তে মা আর বাপি ঝাঁটা হাতেই বাইরে ছুটে এল। প্রশ্ন হল—সেই সাপটা কি সত্যিই ওই পুঁটুলির ভিতরে ছিল জন্মজন্মান্তর ধরে? ঘরে একটা ইঁদুর ঢুকলে আমাদের বাড়িতে অকাল ভাদ্র নেমে আসত। মানে সব জনিস বের করে একপ্রকার ঘর ঝেড়ে তাকে যমের বাড়ি পাঠানোর আয়োজন। ছোট্ট ছোট্ট ছানাগুলোর মৃত মুখ সেই ছোটো থেকেই আমাকে এক অদৃশ্য যন্ত্রণার যাত্রা করাত। কিন্তু জাদুঘরকে সুরক্ষিত করার বিকল্প আর কী পথ হতে পারে তা জানা ছিল না। আমরা কেউ জানতাম না।

 ঘর ঝাড়ার দিনটা আতঙ্কেরও ছিল। কোনো না কোনো কারণে বাপি আর মায়ের মধ্যে খিটিমিটি বেঁধে যেত। কেন যে এমন হত? তখন ভাবতাম, এই এত বিস্মৃত জিনিসের দেখা পাওয়ার আনন্দটা কেন যে এভাবে মাটি হয়ে যায়! এখন বুঝি, ওই একটি দিনে জাদুঘরের প্রতিটিই কোণ থেকে নোংরা বের করে আবার তাকে গোছানো কম পরিশ্রম নয়। এখন আরেকটি কারণও মনে হয়—যা কিছু জীর্ণ-দীর্ণ-মলিন, ঘরের মধ্যে সারাবছর ধরে যে বিপরীত শক্তি ছড়িয়েছিল, সেগুলো দু-হাতে পরিষ্কার করতে করতে হয়তো মনটা  সাময়িক অন্ধকার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে যেত তাঁদের। সামাজের পাঁক পরিষ্কার করতে হলে যেমন কাদা শরীরে মাখতে হয়, সংসারেরও তো জঞ্জাল জমে। সামান্য মোবাইল তার মেমরিতে যেভাবে জঞ্জাল জমিয়ে স্থবির হয়ে যায়, ঘরের জঞ্জাল মনে জমলেও কি মন ভালো থাকে? এখান থেকেই আবার মনে হয়, আশ্চর্য আমাদের ঋতু বিন্যাস! সারাবছরের অপ্রয়োজনীয় ডেটা ডিলিট করতে প্রকৃতি বুঝি ভাদ্রের সৃষ্টি করেছে। সফটওয়্যারটা বুঝি রৌদ্র।

একদিকে সাদা ভাসা ভাসা মেঘের চলনের মাঝে ঘননীল আকাশের আশ্বাস—আমি আছি তো! সব গ্লানি জীবন থেকে শুষে নেব। শরৎ আমাদের জীবনের সব বিষ শুষে নেয় বলেই কি নীল? কী জানি? মনে কত রকমেরই যে প্রশ্ন জাগে। যখন মাঠে কাশের দোলা লাগে, প্রকৃতির সফটওয়্যার ( রৌদ্র) ডেটা মুছতে মুছতে ক্লান্ত। তখন প্রতিটি বাড়ির লোহার আলমারির দরজা খুলে যায়। সেখানেও তো আজব এক চিড়িয়াখানা লুকানো থাকে মায়েদের। ক্ষয়ে যাওয়া ন্যাপথালিনের বাসি গন্ধ ছেড়ে, নতুন গন্ধের অপেক্ষা করতে করতে সেইসব জামাকাপড় একচক্কর ঘুরে নেয় উঠোনের রোদে। আমাদের ফরাক্কার কোয়ার্টারে সামনের বাঁধানো লম্বা অংশে পাতা হয় খাটিয়া। তার উপর একে একে ছড়িয়ে পড়তে থাকে রং বাহারি পোশাক। কোন কাপড়ে সরাসরি রোদ দেওয়া চলবে না, মাথায় রাখতে হয় মায়েদের। আমার মা এব্যাপারে একেবারে পরিপাটি। সেই সব পোশাকের ভাঁজে ভাঁজেও অনেক গল্প লেগে থাকে। সামান্য চাকরির পয়সায় কবে কোন শাড়িটা কেনা হয়েছিল, সেসব মায়ের একেবারে মুখস্থ। পুরোনো হলে কী হবে একবছর পর এইসব জামাকাপড় দেখে মনে হত, কত নতুন নতুন জামা! এই সুযোগে বেছে নিতাম সরস্বতী পুজোতে কোন শাড়িটা পরব। প্রতিবছর একটা সাদা বেনারসি টাইপের শাড়ি দেখতাম মা যত্ন করে রাখতেন। বাপি, বিয়েতে সাদা বেনারসি দিয়েছিল মাকে। বেনারসি আবার সাদা হয়? এই প্রশ্ন মাথায় নিয়েই কবে যেন বড়ো হয়ে গেলাম। একটা ভাঁজে ভাঁজে লাল হওয়া ধুতি, প্রতিবছর রোদ খেতে আসে উঠোনে। শুধু আমাদের বাড়ি নয়, প্রতিদিনই বাড়িতে বাড়িতে উঠোন জুড়ে রঙের মেলা বসতে থাকে পুজোর আগে পর্যন্ত। মায়েরাও কি আড়চোখে মেপে নিত কার ভাণ্ডার বেশি সমৃদ্ধ? কি জানি? এরই মাঝে একদিন ভাদ্রের বাড়ি ফেরার পালা শুরু হত। পাশের বাড়ির জেঠিমাদের দরজার সামনে আতাগাছটা ধীরে ধীরে ফল শূন্য হতে হতে বুঝিয়ে দিয়ে যেত বিদায় ভাদ্র! শরতও প্রস্তুত। ট্রাঙ্কে রাখা কাঁথাদের কানে ফিশফিশ করে বলে দিত—প্রস্তুত হও প্রিয়, হেমন্ত আসছে।

হেমন্ত আসছে… হেমন্ত আস…ছে! সাদা সুতোর সেতুপথ ক্রমশ দীর্ঘ এক ছায়া ফেলছে…! একটু জিরিয়ে নিই।