ফিওদর দস্তয়েভস্কির ‘নোটস ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’

ফিওদর দস্তয়েভস্কির ‘নোটস ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৮৬৪ সালে। এই উপন্যাসটিকে অস্তিত্ববাদী দর্শনচিন্তার একটি সুচনাবিন্দু হিসাবে ধরা হয়। এই বই প্রকাশিত হওয়ার ন'বছর আগে সোরেন কিয়ের্কেগার্দের মৃত্যু হয়। আর এই উপন্যাসটি নিৎসের হাতে আসে ১৮৮৭ সালে। উনিশ শতকের এই তিন যুগান্তকারী চিন্তানায়ক তাঁদের বিভিন্ন রচনায় এক দার্শনিক জীবনবোধের সূচনা করে যান। দস্তয়েভস্কির উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার ঠিক একবছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল নিকোলাই চের্নিশেভস্কির (১৮২৩-১৮৮৯) উপন্যাস ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান?’ দস্তয়েভস্কি এই বইটির প্রতিক্রিয়া হিসাবেই তাঁর উপন্যাসটি রচনা করেন।

  এই উপন্যাসের নায়ক একজন সরকারি কেরানি। গোগোলের ‘ওভারকোট’ থেকে শুরু করে চেকভের ‘কেরানির মৃত্যু' পর্যন্ত মধ্যশ্রেণির মানুষেরাই মূলত রুশ উপন্যাসে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। রুশ জনজীবনের এক সঙ্কটকালে এই চরিত্রগুলিকে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখা যায়। অর্থনীতি দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। বালজাক ও ডিকেন্সের মতোই সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসানে ও এক নতুন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সূচনায় অর্থাৎ এক যুগ সন্ধিক্ষণে সমাজে, রাষ্ট্রে ও জনজীবনে অর্থ ও পুঁজির নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকাকে বারবার তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু অর্থনীতির চেয়েও আরও গুরুতর বিষয় নিয়ে দস্তয়েভস্কি ভাবতে চেয়েছেন এই রচনায়। সেই পুশকিন থেকে গোগোল হয়ে ধারাবাহিকভাবে রুশ আখ্যানকাররা বারবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপে বিপর্যস্ত মানুষের নৈতিক সঙ্কটের বিষয়টি বুঝতে চেয়েছেন। মানুষের নৈতিক ক্ষয় ও উত্তরণ তাই ঘুরেফিরে এসেছে দস্তয়েভস্কির বিভিন্ন রচনায়।

  আলোচ্য উপন্যাসের শেষে কেন্দ্রীয় চরিত্রটি নিজেকে একজন অ্যান্টি হিরো হিসাবে দাবি করে। এর কারণ হিসাবে বলা যায় যে, লোকটির মধ্যে নায়কোচিত বা বীরোচিত বৈশিষ্ট্য প্রায় কিছুই নেই। এমনকী রচনার শুরুতেও সে জানিয়ে দেয় যে, সে একজন দুর্বল, ঘৃণ্য ও অনাকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। প্রথম লাইনটি থেকেই লোকটি অনায়কোচিত হিসাবে পাঠকের চোখে ধরা পড়তে শুরু করে। নিজের কর্মজীবনেও লোকটি মানুষের চোখে ঘৃণ্য হয়েই থেকে যায়। এমনকি সে এই দাবিও করে যে, সারাজীবন ধরেই সে কিছু একটা হয়ে উঠতে চেয়েছে অথচ একটা পতঙ্গ পর্যন্ত হয়ে ওঠা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

  অন্তত এই লোকটির কিন্তু কিছু একটা হয়ে ওঠারই কথা ছিল। কিন্তু সে যে কিছু হয়ে উঠতে পারল না, তার জন্য মূল দায়ী হচ্ছে সময়। লোকটি তার সমসময়কে নেতিবাচক যুগ বা নেগেটিভ এজ বলে বর্ণনা করেছে। এ এমন একটা সময় যেখানে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে সর্বপ্রকারে দমন করা হচ্ছে। মানুষের গতিবিধিকে অঙ্কের হিসাবে বেঁধে ফেলা হচ্ছে। এক দমন-পীড়ন-স্বৈরাচারে পরিপূর্ণ পরিবেশে সাধারণ মানুষ বিপন্ন ও প্রান্তিক জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের জীবনে নৈতিক ক্ষয় হয়ে উঠছে সর্বগ্রাসী।

 এরকম এক সময়ে এই লোকটি সর্বার্থেই ব্যতিক্রমী। অস্তিত্ববাদীরা ঈশ্বরকে প্রতিস্থাপিত করতে চায় স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে। এই লোকটিও কোনও আগ্রাসনের কাছেই নতিস্বীকার করে নিজের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে বিসর্জন দিতে রাজি নয়। এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির সাহায্যেই সে নিজের ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে রক্ষা করতে চায়। আর এই রক্ষা করার প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনে কোনও বিশৃঙ্খলা, ধ্বংসাত্মক ক্রিয়া, উন্মত্ততা, যুক্তিহীনতাকেও অনুসরণ করতে তার বিবেক দংশন হয় না। কারণ একমাত্র এভাবেই তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ ঘটে। লোকটির ইচ্ছাশক্তি শুধুমাত্র স্বাধীনই নয়, সচেতনও বটে। যুক্তি ও প্রকৃতির নিয়মকে সে অস্বীকার করতে চায় সচেতনভাবেই। তার এই সচেতনতার উৎসে রয়েছে গভীর পাণ্ডিত্য। সে প্রচুর বই পড়েছে। একটি পিয়ানোর চাবির মতো জীবন যেভাবে লোকটির কাছে আসে, সেভাবেই তাকে গ্রহণ করতে সে রাজি নয়। বরং জীবনের মধ্যে যেখানে যতটুকু সুন্দর ও মহৎ উপাদান সঙ্গোপনে ছড়িয়ে রয়েছে, তাকেই সে খুঁজে পেতে চায়। এই সচেতনতা যুগপৎ তার ইচ্ছাশক্তিকে স্বাধীনতা দেয় এবং হয়ে ওঠে তার যাবতীয় দুর্ভোগের উৎস।

  উপন্যাসের শুরু থেকেই দেখা যায় এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জন্য লোকটি সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে। এই নিঃসঙ্গ জীবনে সে তার আত্মার গভীরে একটি নিরাপদ-কক্ষ তৈরি করে নেয়, একমাত্র যে কক্ষে আশ্রয় নিলে সে স্বস্তি বোধ করে। আত্মার গভীরে লুকনো ভিতরের এই কক্ষটিকেই বারবার সে আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভূতলবাস বলে উল্লেখ করেছে। নিজের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সচেতনতা, এইসব নিয়ে এই গোপন কক্ষেই সে একমাত্র নিরাপদ ও স্বস্তি বোধ করে।

  কিন্তু সংঘাত বাধে তখনই, যখন সে এই গোপন কক্ষটি থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে বাইরের জগতে যায়। সেই জগতে সে সম্পূর্ণ একা, বিচ্ছিন্ন, মৌলিক এবং অপরের সঙ্গে যোগাযোগে অক্ষম। সে এতটাই স্বতন্ত্র্য যে সে কারও মতোই নয় এবং কেউ তার মতো নয়। এই মৌলিকতা ও স্বাতন্ত্র্যের জন্যই সমাজের সঙ্গে এই ব্যক্তির দূরত্ব বাড়তে থাকে। তাদের মধ্যে কোনও বোঝাপড়া হয় না। কেউ কারও সঙ্গে সমঝোতা করতে চায় না। সমাজ তার নিজস্ব নিয়মে চলে। ব্যক্তি তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে অনুসরণ করতে চায়। যেহেতু এই দুইয়ের মধ্যে কোনও যোগাযোগ গড়ে ওঠে না, ফলে বারবার বিভিন্ন অসঙ্গত, উদ্ভট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। লোকটি আশা করে যে, সে সামাজিক স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু স্বীকৃতির বদলে তার ভাগ্যে জুটতে থাকে তাচ্ছিল্য, ঘৃণা, উপেক্ষা, অবহেলা, বঞ্চনা, অপমান, অসম্মান, লাঞ্ছনা। সমাজের কাছে যতই সে নিজেকে দৃশ্যমান করে তুলতে চায়, সমাজ যেন ততোই তাকে অদৃশ্য করে রাখতে চায়।

  এই রচনায় লোকটির জীবনে প্রথম সঙ্কট তৈরি হয় যখন এক উচ্চপদস্থ অফিসার নিঃশব্দে তাকে তাচ্ছিল্য করে যায়। লোকটি এই অফিসারের চোখে সম্মানজনকভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠতে চায়। তার চোখে সামাজিকভাবে স্বীকৃত হতে চায়। এই স্বীকৃত হওয়ার প্রয়াসে লোকটি বারবার তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে প্রয়োগ করে। দস্তয়েভস্কি প্রকৃতপক্ষে লোকটির এই বিভিন্ন প্রয়াসের মধ্য দিয়ে তার ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকতাকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন। বলা বাহুল্য, এই স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকতা শেষপর্যন্ত কোনও কাজেই আসে না। অনড় শ্ৰেণিবৈষম্যকে সে একচুলও নাড়াতে পারে না। সামাজিক জীব হিসাবে উচ্চপদস্থ অফিসারটির কাছ থেকে কোনও স্বীকৃতিও সে আদায় করতে পারে না। লোকটির একমাত্র সান্ত্বনা হয়ে থাকে তার দীর্ঘদিনের বিচিত্র ও ব্যয়বহুল প্রয়াস, আর এই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে নিশ্চিতভাবেই উপলব্ধি করে, সে তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রাখতে পেরেছে।

  সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্মানের প্রত্যাশী লোকটি এরপরও কিন্তু হাল ছাড়ে না। মানুষের বিবর্ণ, একঘেয়ে জীবন ও মামুলি, গতানুগতিক কথাবার্তা তার কাছে পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই মানুষের চোখেই সে আবার নিজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে প্রতিষ্ঠা করে যেতে চায়। আমন্ত্রিত না হয়েও সে তাই অযাচিতভাবে একটি আমন্ত্রণ গ্রহণ করে। অপছন্দের লোকটিকে বিদায় অভ্যর্থনা জানাতে পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী যথাস্থানে গিয়ে হাজিরও হয়। সেখানে একদিকে উপস্থিত ব্যক্তিদের মামুলি, লঘু, চতুর কথাবার্তায় সে পীড়িত হয়, অন্যদিকে তাদের কাছে নিজের মৌলিকতা ও উৎকর্ষ প্রমাণ করার জন্য উদ্যোগী হয়ে ওঠে। তার এই উদ্যোগে জনতা মোটেই স্বস্তি বোধ করে না। নিঃশব্দে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে নিজেদের সমান্তরাল পরিসর তৈরি করে নেয়। সেই পরিসরে নিজেদের পক্ষে সুবিধেজনক কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডে ডুবে যায়। স্বীকৃতির পরিবর্তে লোকটির ভাগ্যে আবারও জোটে অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষা। চূড়ান্ত অপমানিত হয়েও শুধুমাত্র নিজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য দেখাবে বলেই লোকটি ভিক্ষে চাইতেও পর্যন্ত পিছপা হয় না। এইভাবে লাঞ্ছনার মধ্যে দিয়েও সে নিজের মৌলিকতা এবং ব্যক্তিত্বের প্রতিষ্ঠা করে যেতে চায়।

  এই কাহিনির মধ্যভাগে লোকটি অবশেষে এমন একটি মানুষকে খুঁজে পায় যে তার চেয়েও বেশি অসম্মানিত, লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। যৌনকর্মী লিজা নেহাতই এক বালিকা। এক ভয়াবহ সামাজিক পরিস্থিতির শিকার সে। অর্থের জন্য তার বাবা তাকে বিক্রি করে দেয় এবং অর্থের জন্যই সে এক কলঙ্কিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। কোথাও কোনও সামাজিক স্বীকৃতি না পেয়ে লোকটি এই বালিকাটির কাছ থেকেই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য মরীয়া হয়ে ওঠে। লিজাকে ভোগ করার পর তাকেই সে এক দীর্ঘ উপদেশ দেয়। নিকৃষ্ট, অসামাজিক জীবনযাপনে লিপ্ত লিজার কাছে সে এক আদর্শ, সামাজিক জীবনযাপনের ছবি তুলে ধরতে চায়। লিজার চোখে পরিত্রাতা হিসাবে স্বীকৃতি পেতে চায়। লোকটির এই প্রয়াসও শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এই শ্লেষাত্মক সাক্ষাতপর্বের শেষে লোকটি জানতে পারে, লিজাকে সে যতটা বিপন্ন ভেবেছিল, সে আদপেই তা নয়। লিজাকেও ভালোবাসার একজন আছে। লোকটি বুঝতে পারে, যাকে সে দয়া করতে চেয়েছিল, তারও জীবনে একটি প্রেম ও একজন প্রণয়প্রার্থী আছে। অথচ সে নিজেই প্রেমহীন, ভয়াবহ এক নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

  লিজাকে তার ঠিকানা দেওয়ার জন্য লোকটি গভীরভাবে অনুতপ্ত হয়। সে অনুভব করে, একমাত্র লিজার চোখেই সে নায়কোচিত কিছু কাজ করে দেখিয়েছে এবং তার দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গতা দেখলে লিজার মন থেকে সেই নায়কের ছবিটি মুছে যেতে বাধ্য। কিন্তু শুধুমাত্র দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গতাই নয়, পারিবারিক জীবনেও লোকটির নিত্য সঙ্গী উপেক্ষা ও তাচ্ছিল্য। আরও কৌতুকের বিষয় হলো, এই উপেক্ষা ও তাচ্ছিল্য জোটে কোনও উচ্চপদস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে নয়, বরং বাড়ির পরিচারক আপোল্লোর কাছ থেকে। এই আপোল্লো লোকটির সঙ্গে কোনওভাবে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতে আগ্রহী নয়। লোকটির সঙ্গে সে ভালোভাবে বাক্যালাপ পর্যন্ত করে না। (দস্তয়েভস্কির ‘দি ডাবল’ উপন্যাসে এরকমই এক পরিচারককে দেখা যায়, যার নাম ছিল পেসকা।) নীরবে হুকুম তামিল করে কিন্তু লোকটির উপস্থিতিকে যেন গ্রাহ্যই করে না। লোকটি এই আপোল্লোর কাছ থেকেও সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য মরীয়া হয়ে ওঠে। সে অনুভব করে, আপোল্লোর সঙ্গে কোনও সুসম্পর্ক তৈরি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে বরং আপোল্লোর সঙ্গে ঝগড়া করে, তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, তাকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করতে চায়। কিন্তু তার এত উদ্যোগকেও আপোল্লো যেন গ্রাহ্যই করে না। নিজে লাঞ্ছিত হয়ে যেমন, অপরকে লাঞ্ছনা করেও তেমন লোকটির ভাগ্যে স্বীকৃতি জোটে না।

  এরকম এক পরিস্থিতিতেই লিজা তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। লিজা আসে হৃদয় পরিপূর্ণ করে লোকটিকে প্রেম দিতে, সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে। কিন্তু অপমানিত হতে হতে সম্মান ও স্বীকৃতি পাওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনাও লোকটির কাছে সুদূরপরাহত বলে মনে হয়। লিজাকে সে বুঝতে পারে না। জীবনে প্রেম, সম্মান ও স্বীকৃতি পাওয়ার একমাত্র সুযোগ সে হারায়। লিজার সঙ্গে সে উৰ্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের মতোই ব্যবহার করতে চায়। সে অনুভব করে, এই একটি মানুষ যে তার চেয়েও নিকৃষ্ট জীবনযাপন করে। ফলে তার ওপর সবরকম আধিপত্য চালানোর অধিকার তার আছে। কিন্তু এবার তার ভূমিকাটা মোটেই নায়কোচিত হয় না, বরং বর্বরোচিত হয়ে ওঠে। লিজার সঙ্গে সে যৌনকর্মীর মতোই আচরণ করে। তাকে বারবণিতা হিসাবেই যেন প্রতিপন্ন করতে চায়। শেষপর্যন্ত যখন সে বুঝতে পারে, শুধুমাত্র ভালোবাসার দাবিতেই লিজা তার কাছে এসেছিল, ততোক্ষণে প্রেম, সম্মান, স্বীকৃতি পাওয়ার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগটি তার হাতছাড়া হয়ে গেছে।

  উপন্যাসের শেষে লোকটি অনুভব করে যে, অপমান ও লাঞ্ছনার মধ্যে দিয়েই মানুষ সচেতন ও পরিশুদ্ধ হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে, লিজার জীবনে পরবর্তীকালে যতো দুঃখ-যন্ত্রণাই আসুক না কেন, তারা সহনীয় হয়ে উঠবে তার কাছে। কারণ সেই আঘাতগুলো আসবে প্রেমহীনতা থেকে, যা এসে থাকে একজন যৌনকর্মীর জীবনে। ফলে সেই আঘাতগুলো এই 'চূড়ান্ত' আঘাতের তুলনায় গৌণ হয়ে যাবে। চূড়ান্ত, কারণ এই আঘাত এসেছে প্রেমের অভিজ্ঞতা থেকে। আর লোকটির জীবনকেও পরিশুদ্ধ করে তুলবে এই প্রেম, কারণ এই অভিজ্ঞতার আগে পর্যন্ত সে প্রেমহীন জীবন কাটিয়েছে আর এই অভিজ্ঞতার পরে নিঃসঙ্গ জীবনেও সে জেনে গেছে প্রেমের তাৎপর্য। আখ্যানের শেষে লোকটি এটাই বলতে চায় যে, মানুষ জীবনযাপন করতে ভুলে গেছে। সে ভুলে গেছে কাকে শ্রদ্ধা করবে, কাকে ভালোবাসবে, কাকে ঘৃণা করবে, কাকে অপছন্দ করবে। লাঞ্ছনা, যন্ত্রণা, বিশৃঙ্খলা, উন্মত্ততা-এগুলোকে মেনে নিয়েও মানুষের জীবনযাপন করা উচিত। জীবনযাপন থেকে পালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। এরপরও লোকটি থামে না। ফলে পাঠকেরাই তার কথা শুনতে অস্বীকার করে। হয়তো লোকটির স্বগতোক্তি এরপর প্রলাপে পর্যবসিত হয়। এমনকি কাহিনির বর্ণনার সময়ও লোকটি স্ববিরোধীতা করে। যুক্তিশৃঙ্খলা মানতে অস্বীকার করে। কিন্তু পাঠকেরা আর তার অনিঃশেষ প্রলাপের অংশীদার হতে রাজি হয় না...

1 Comments
Leave a reply