ম্যালথুসের জনসংখ্যাতত্ত্ব : বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক আশ্চর্য প্রহেলিকা

সমস্ত দেশেই প্রাপ্ত খাদ্য সংস্থানের তুলনায় মানুষের সংখ্যা হু-হু করে বাড়ছে। ফলে সীমিত খাবার নিয়ে তাদের মধ্যে কাড়াকাড়ির একটা ব্যাপার ঘটছে। তাহলে যে খাদ্যে সম্পত্তিবান লোকেরা আরও বেশি করে ভালো ভাবে খেয়েদেয়ে বাঁচতে পারত, তা গরিবদের মধ্যেকার বাড়তি লোকদের কেন দেওয়া হবে? এই চরম প্রতিক্রিয়াশীল তত্ত্বর ভুলগুলি নিয়ে আলোচনা রয়েছে প্রবন্ধটিতে।

১৯৮৬ সালের এক কুয়াশাবৃত শীতল সকালে দিল্লি জংশন থেকে কালকা হাওড়া মেলে ছাত্রদের একটি সভায় এলাহাবাদ যাওয়ার পথে ট্রেনে বসে ইংরেজিতে এই প্রবন্ধের প্রথম অসম্পূর্ণ খসড়াটালিখেছিলাম।মাত্র দু বছর আগে ভূপাল দুর্ঘটনা ঘটেছে। দিল্লির বিভিন্ন সংবাদপত্রে তখন মাঝে মাঝেই শিল্প দুর্ঘটনা নিয়ে কিছু না কিছু লেখা বেরচ্ছিল। আর সেই সঙ্গে এখানে ওখানে জনসংখ্যার বিপদ সংক্রান্ত আলোচনাও গুঞ্জরিত হচ্ছিল দিল্লি চণ্ডীগড় ইত্যাদি শহরগুলিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলিতে। দিল্লিতে ফিরে এসে আমি কিছু রেফারেন্স ও অঙ্ক সহলেখাটা শেষ করবার পর পুরোটা ধ্রুপদী যন্ত্রে টাইপ করে দেন আমার ঘনিষ্ঠ অনুজ কমরেড রাকেশ। টাইপ কপি Breakthrough-তে ছাপানোর জন্য কলকাতায়ডাকে পাঠিয়ে সৌমিত্র ব্যানার্জী আর শুভাশিস মাইতি (প্রয়াত)-কে লিখে দিলাম অঙ্কগুলো ভালো করে বাজিয়ে নিতে। পরের বছর জুলাইমাসে Breakthrough-তে এটা ছাপা হয়। তারপর ওই পত্রিকাতেই ২০০৩ সালে এবং আমাদের সেস্টাসের ইংরেজি মুখপত্র The Other Mind-এ ২০১৭ সালে এটা পুনর্মুদ্রিত হয়। এখানে স্বকৃত দুর্বল ছায়ানুবাদে লেখাটাকে আর একবার স্মরণ করলাম। এতে ব্যবহৃত তথ্যগুলি পুরনো হয়ে গেলেও মূল বিষয় বদলায়নি। তাই একটি ছাড়া নতুন তথ্যআর যোগ করিনি।

 

এক

টমাস রবার্ট ম্যালথুস (১৭৬৬-১৮৩৪) সত্যিই খুব ভাগ্যবান!

তিনি জনসংখ্যার ব্যাপারে একটি ভুল তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন, চার দশকের মধ্যেই যার বদলে একটি সঠিকতর তত্ত্ব প্রস্তাবনা করেন পিয়র-ফ্রাঁসোয়াফেরহালস্ত (১৮০৪-৪৯। কিন্তু লোকে আজও ম্যালথুসের নামই জানে, জনসংখ্যার কথা উঠলেই এই নামটি সকলের মনে পড়ে। ফেরহালস্তের নাম আর কজন জানে! কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েও তাঁকে কেউ স্মরণ করে না। আগে অন্তত রাশিবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে তাঁর নাম ও তত্ত্ব থাকত। আজকাল তত্ত্বটা পড়ানো হলেও নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। 

বিশ্বাস করতে পারছেন না?ঘাবড়ে যাচ্ছেন? ভাবছেন, ধুস্‌, এরকম আবার হয় নাকি! নিশ্চয়ই কোথাও কিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে?

হ্যাঁ, গোলমাল তো একটা হচ্ছেই।

বিজ্ঞানে কখনও কখনও একটা ভুল তত্ত্বও দীর্ঘ অসমাধিত সমস্যার জট ছাড়াতে সাহায্য করতে পারে, সঠিক দিশা প্রদর্শন করার দ্বারা। ভুল তত্ত্বটা বাতিল হলেও লোকে তার প্রস্তাবককে মনে রাখে সেই সঠিক রাস্তার দিকে ঠেলে দেবার জন্য। রসায়নশাস্ত্রের ইতিহাসে জোনস জ্যাকব বার্জেলিয়াস (১৭৭৯-১৮৪৮)-এর কথাই ধরুন। সমায়তনের সমস্ত গ্যাসে সমান সংখ্যক অণু থাকে বলতে গিয়ে তিনি পরমাণুর কথা বলেছিলেন। অণু প্রস্তাব তখনও আসেনি। সামান্য ভুল হয়ে গেল। কিন্তু সেই ভুল প্রস্তাবকেই সংশোধন করে যখন আমেদিও আভোগাদ্রো (১৭৭৬-১৮৫৬) অণুর কথা তুললেন, সেই তত্ত্বাভাস(hypothesis) বিজ্ঞানে স্থায়ী আসন পেয়ে গেল। কিংবা রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের জগতে প্রথমে অ্যাডাম স্মিথ (১৭২৩-৯০), পরে ডেভিড রিকার্ডো (১৭৭২-১৮২৩) যে মূল্যের শ্রমতত্ত্ব প্রস্তাবনা করেছিলেন, তাকে গ্রহণ করে এবং তার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-৮৩) সঠিকভাবে তাকে সামনে নিয়ে এলেন। আরও উদাহরণ দিতে পারি। কোথাও একটাও এমন ক্ষেত্র দেখাতে পারবেন না যেখানে ভুল বক্তব্যের প্রস্তাবককে মাথায় তুলে নাচা হচ্ছে আর সঠিক তত্ত্বের প্রবর্তকের নাম লোকে ভুলে গেছে। 

ম্যালথুস সেখানে একজন ব্যতিক্রম, এবং খুব সম্ভবত এখন অবধি একমাত্র ব্যতিক্রম। সুতরাং তাঁর সৌভাগ্যের প্রতি হিংসা তো হবেই।

দুই

খোলসা করে বলা যাক।

ম্যালথুস ছিলেন অষ্টাদশ শতকের শেষ এবং ঊনবিংশ শতাব্দের প্রথমার্ধের একজন রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রী, সমাজ সংস্কারক এবং পাদ্রি। সেই সময়টা ছিল সওদাগরি পুঁজি থেকে বৃহদায়তন উৎপাদন ও শিল্পবিপ্লবের দিকে পরিবর্তনের কাল, অবাধ প্রতিযোগিতার আওয়াজ তুলে ইউরোপে তখন তার দ্রুত বিকাশ ঘটছে। অবাধ প্রতিযোগিতার অর্থ হল, যারা যত সস্তায় ভালো জিনিস উৎপাদন করতে পারবে, তারা তত সহজে অন্যদের বাজার থেকে হঠিয়ে দিতে সক্ষম হবে। এই সব নিয়ে চর্চা করতে বসে ম্যালথুস ভাবলেন: সমস্ত দেশেই প্রাপ্ত খাদ্য সংস্থানের তুলনায় মানুষের সংখ্যা হু-হু করে বাড়ছে।ফলে সীমিত খাবার নিয়ে তাদের মধ্যে কাড়াকাড়ির একটা ব্যাপার ঘটছে। তাহলে যে খাদ্যে সম্পত্তিবান লোকেরা আরও বেশি করে ভালো ভাবে খেয়েদেয়ে বাঁচতে পারত, তা গরিবদের মধ্যেকার বাড়তি লোকদের কেন দেওয়া হবে? বস্তুত তিনি মুখেও বলে ফেলেছিলেন: “A man who is born into the world already possessed, if he cannot get his subsistence from his parents on whom he has a just demand, and if the society do not want his labour, has no claim of right to the smallest portion of food and in fact has no business to be where he is.” [Malthus 1803, 531-32]

ভদ্রলোক তাঁর কথাটা আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন। স্বদেশের লোককে তিনি বোঝালেন, যুদ্ধ, অনাহার, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, ইত্যাদি ঘটনা জনসংখ্যার অপ্রতিহত বৃদ্ধির উপর রাশ টেনে ধরার এক এক ধরনের দৈব ব্যবস্থা, এবং গরিবদের জন্মনিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য শাস্তি। এই অজুহাতে তিনি ইংল্যান্ডের “গরিব আইন”-এর মতো যে কোনো সামাজিক জনমুখী সংস্কারকে বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল: “Since population is constantly tending to overtake the means of subsistence, charity is a folly, a public encouragement of poverty. The state can therefore do nothing but leave the poor to their fate, at most making death easy for them.” [Quoted, Burret 1840, 152]

তারপর তিনি তাঁর বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিক চেহারা দেবার জন্য অঙ্কের সাহায্য নিলেন (গণিতের তিনি খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন), কয়েকটি দেশের লোকসংখ্যা এবং খাদ্য উৎপাদনের তথ্য সংগ্রহ করলেন, এবং তার ভিত্তিতে দাবি করলেন, লোকসংখ্যা বাড়ছে গুণোত্তর শ্রেণিতে (G. P.) আর খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে সমান্তর শ্রেণিতে (A. P.)।

চিত্র :ম্যালথুস প্রদর্শিত মাথা পিছু খাদ্য উৎপাদন ও লোকসংখ্যা বৃদ্ধির লেখচিত্র। এই চিত্রে দেখা যাচ্ছে, আপাতত খাদ্য উৎপাদন লোকসংখ্যার তুলনায় উদ্বৃত্ত হলেও একটা সময় আসবে যখন তা কম পড়ে যেতে থাকবে।

অঙ্কের ভাষায় এর অর্থ কী?

এর মানে হল, লোকসংখ্যা বৃদ্ধির চরিত্র এমন যে এর আপেক্ষিক বৃদ্ধির হারও সময়ের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান একটি অপেক্ষক। যস্যার্থ, অচিরেই জনসংখ্যা অসীম হয়ে যাবে। [চিত্র ১ দেখুন; পরবর্তী অনুভাগে আগ্রহীদের জন্য বাক্সবন্দি গনিতলিপিগুলিও দ্রষ্টব্য]

ধুস্‌, এ আবার হয় নাকি?

সহজ বুদ্ধিতেই বোঝা যায় এরকম হওয়া সম্ভব নয়। কোনো জায়গার (বা দেশের) জনসংখ্যা কখনই এমন ভাবে বাড়তে পারে না যে তা অল্প সময়ের মধ্যে অসীম হয়ে যাবে। উপরের ধরে নেওয়া চিন্তার মধ্যে এই জিনিসটা অতএব ঠিক হতে পারে না। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা বৃদ্ধির চিত্রও এই ম্যালথুসীয় বীজগণিতের পক্ষে ছিল না। দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞানে তখন প্রাণী ও উদ্ভিদের (প্রজাতিগুলির) বংশবৃদ্ধি পাঠের জন্যও একটা গাণিতিক মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টাচলছিল। ম্যালথুসের প্রস্তাব সঠিক হলে তাকে সেই কাজেও ব্যবহার করা যেত। তাও করা যাচ্ছিল না।

সুতরাং অন্য রকম গাণিতিক মডেলের সন্ধান শুরু হল।

 মোটামুটি এই রকম সময়েই বেলজিয়ামের ফরাসি ভাষী একজন অপরিচিত বিজ্ঞানী গণিতবিদ ও জীবসংখ্যাতত্ত্ববিদ ফেরহালস্তগণিতের হাতিয়ার নিয়ে এই কাজে নেমে পড়লেন। তাঁর হাতের সামনে যতটুকু তথ্য ছিল, তার ভিত্তিতে তিনি দেখলেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় থাকলে জীবসংখ্যা বৃদ্ধির আপেক্ষিক হার সময়ের সঙ্গে কমতে থাকে। কেন না, অন্য সব কিছু একই থাকলে জীবসংখ্যার পরম বৃদ্ধির ফলে মাথা পিছু খাদ্য রসদের পরিমাণ কমে যায় এবং তখন নতুন যুক্ত জীবিত জীবের সংখ্যাও কমে যায়। এর ভিত্তিতে তিনি ধরে নিলেন যে আপেক্ষিক বৃদ্ধির হার সময়ের সাপেক্ষে মূল জীবসংখ্যার একটি ক্রমহ্রাসমান অপেক্ষক। [চিত্র ২ দেখুন]

 এইভাবে জীবসংখ্যা বৃদ্ধির একটি অপেক্ষক বের করে তা তিনি ১৮৩৮ সালে এক বিজ্ঞান পত্রের আকারে প্রকাশ করেন একটি সাদামাটা পত্রিকায়, যা দুচারটে গ্রন্থাগারে ধুলো ময়লা ঝুল সংগ্রহ করে অচিরেই বিজ্ঞান চর্চার রাজপথ থেকে হারিয়ে যায়। [Verhulst 1838, 113–121] ফেরহালস্ত নিজেও কিছু দিন পরেই মারা যান। ফলে তাঁর সেই সমীকরণ নিয়ে কাজ করার মতো কেউ আর রইল না।

চিত্র : দুই অসীম রেখার মাঝে জনসংখ্যার লজিস্টিক লেখচিত্র। M বিন্দুটিতে এই অপেক্ষক বৃদ্ধির ধনাত্মক হার থেকে ঋণাত্মক হারে পরিবর্তিত হয়।

তিন

একেবারে সেই ১৯২০-এর দশকে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে রেমন্ড পার্ল এবং লাওয়েল রিড জীবসংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে করতে কোনো পুরনো এক লাইব্রেরিতে ফেরহালস্তের কীটদষ্ট পত্রটির সন্ধান পান। [Pearl and Reed 1920, 275-288; Pearl 1976] তাঁরা দেখলেন, তাঁর সেই সমীকরণের দ্বারা আমেরিকার তিন দশকের জনসংখ্যার হিসাব মেলাতে সুবিধা হচ্ছে, অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যত জনসংখ্যার হিসাব সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

তাই যদি হয়, আগে যাই হয়ে থাক, এখনও কেন ফেরহালস্তের নাম বিস্মরণের তালিকায়?এখন তো সত্যটা সকলের জানার এবং জানানোর কথা। ম্যালথুস একটা ভুল তত্ত্বের প্রস্তাব করেও কেন আজও বহুচর্চিত এবং সম্মানিত?

সেটা বলছি একটু পরে। ধৈর্য শক্ত করে ধরে রাখুন!

চার

অনেকেই জানেন না, ম্যালথুসের জনসংখ্যার তত্ত্বের আর একটা তাৎপর্যও ষাট বছরের মধ্যেই ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। সেই প্রমাণ আসে চার্লস ডারউইন (১৮০৯-৮২)-এর হাত ধরে। ডারউইন তা সম্ভবত টেরও পাননি।

ম্যালথুস কেবল যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটা নিরাশাজনক ছবি দেখিয়েছিলেন, তাই নয়, তিনি বলেছিলেন, মানুষের খাদ্য সম্ভার খুব ধীরে ধীরে বাড়ে, (এক ঘাত সমীকরণের আকারে)। এর ফলে, কোনো একটা দেশের যদি এই মুহূর্তে খাদ্যের যোগান বেশিও হয়, জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে শিগ্‌গিরই এমন জায়গায় চলে যাবে যে খাদ্য উৎপাদন একই সময়ে কিঞ্চিত বাড়লেও মাথা পিছু চাহিদার তুলনায় কমে যাবে। তথ্য এবং অঙ্ক যাই বলুক, অধিকাংশ দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, নীতিনির্ধারক এবং অ্যাকাডেমিশিয়ানরাও এমনকি আজও এরকম ধারণায় বিশ্বাস করেন এবং জোর গলায় বলে থাকেন।

 ডারউইন ম্যালথুসের জনসংখ্যা তত্ত্বের সঠিকতা নিয়ে বা মানব জাতির ভবিষ্যতের পক্ষে তার গুরুত্ব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি (একটা ছোট বিরূপ বাক্যাংশ উচ্চারণ ছাড়া)। তিনি ম্যালথুসের থেকে নিয়েছেন একটাই জিনিস—একটা নির্দিষ্ট জায়গায় সীমিত খাদ্য সম্ভারের দ্বারা পুষ্ট হয়ে যত সংখ্যক প্রাণী বা উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারে, তাদের শাবকের সংখ্যা তার চাইতে অনেক বেশি হয় কেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই প্রাণী বা উদ্ভিদের সদস্য সংখ্যা মোটামুটি একই থেকে যায় কীভাবে, এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। একেই তিনি জীবজগতের আন্তঃপ্রজাতিক অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম বলে আখ্যায়িত করেছেন। ও হ্যাঁ, জানিয়ে রাখি, আলফ্রেড ওয়ালেসও এই প্রসঙ্গে ঠিক এই ধারণাই ধার করেছিলেন ম্যালথুস থেকে।

ডারউইন তো নয়ই, অন্য আর কেউও খেয়াল করেননি, একজন বাদে—যে ম্যালথুসের প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং তাকে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের উপর সমগ্রভাবে প্রয়োগ করে তিনি আসলে ম্যালথুসীয় মতবাদের দুটি মৌল সিদ্ধান্তকে সরাসরি খারিজ করে দিলেন। সেই একজন ছিলেন কার্ল মার্ক্স, যাঁর অভ্যাস ছিল বিজ্ঞানের প্রতিটি সমকালিক আবিষ্কারকে খুব খুঁটিয়ে এবং সামূহিক দৃষ্টিতে বোঝার চেষ্টা করা। তিনি তাঁর “উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব” সংক্রান্ত কয়েক হাজার পাতা কাগজে খসড়া করতে গিয়ে এক জায়গায় এটা উল্লেখ করে বসেন। [Marx 1978, 121]

 প্রথমত, মানুষও প্রাকৃতিক পরিবেশে যদি জীববিজ্ঞানের লৌহদৃঢ় নিয়মের বেড়াজালে প্রচুর বাচ্চার জন্ম দিতে থাকে, তা সত্ত্বেও সেই জৈব নিয়মই তাদেরকে বাধ্য করবে অন্য প্রজাতির মতো জনসংখ্যায় একটা সীমার মধ্যে বাঁধা থাকতে। লাগাতার গুণোত্তর প্রগতিতে বৃদ্ধি তার পক্ষে সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, উদ্ভিদ আর প্রাণীদের মধ্য থেকেই তো মানুষের খাদ্যের সংস্থান হয়; তাদের উপরও যদি (ডারউইনের মতে) ম্যালথুসীয় নিয়ম বলবৎ হয়, আর মানুষ যদি তাদের সেইভাবে রক্ষা করতে পারে, তাহলে সেই নৃবান্ধব জীবজগতেরও বৃদ্ধি সমান্তর প্রগতির চাইতে কিঞ্চিত বেশিই হতে পারে। ফলত, মার্ক্সের মতে, দুদিক থেকেই ডারউইন নিজের অজান্তে মানুষের ক্ষেত্রে ম্যালথুসের বক্তব্যকে অকার্যকর প্রমাণ করে ফেলেন।

পাঁচ

সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়, মুচকি হাসিয়া যায় মাঝে! ম্যালথুস সবে মাত্র বাষ্পীয় ইঞ্জিনের দৌলতে শিল্প বিপ্লবের শুরুর দৃশ্যটুকু দেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে বিশ শতকে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে বিরাট বিকাশ হয় তা ম্যালথুসের পক্ষে দুঃস্বপ্নেও ভাবা সম্ভব হয়নি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার স্বার্থে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, স্কুল কলেজ, হাসপাতাল, কলকারখানা, বাজার, সিনেমাহল, ইত্যাদি শহুরে জীবন যাপনের নানা বন্দোবস্ত করতে গিয়ে চাষের জমি বিপুল হারে কমে গেছে। তথাপি মোট খাদ্য উৎপাদন সারা পৃথিবীর হিসাবেই অনেক গুণ বেড়ে গেছে এবং সেই বৃদ্ধির হার লোকসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চাইতে বেশি। বিজ্ঞানের অবাধ বিকাশ ও প্রয়োগ হতে পারলে খাদ্য উৎপাদন আরও উচ্চ হারে হতে পারত। 

অন্য দিকে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির লেখচিত্র—আলাদা আলাদা দেশ ধরেই হোক, কিংবা সারা দুনিয়ার প্রেক্ষিতে—ম্যালথুস যা ভেবেছিলেন তার থেকে একেবারে অন্য রকম হয়ে গেছে। এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার পশ্চাদপদ দেশগুলিতে মূলত তিনটি কারণে—অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের আধিপত্য, পরিবারের স্বার্থে কাজের হাত বেশি পাওয়ার চাহিদা (বিশেষ করে শিশুমৃত্যুর হার বেশি হওয়ায়) এবং সংস্কৃতি চর্চা ও অন্য বিনোদনের অভাব—গরিব ও নিম্নবিত্ত জনগণের মধ্যে শিশু জন্মের হার খুব উঁচু। আবার, অসুখবিসুখ, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপুষ্টি, কৃষিক্ষেত্রে ও কারখানায় অতিরিক্ত শ্রম, শিশু শ্রম, শিল্প দুর্ঘটনা, পরিবেশ দুষণ, ইত্যাদি অসংখ্য কারণে মৃত্যু হার বেশি হয়ে জন্মের হারকে প্রশমিত করে রাখে। এই সব দেশে শিশুমৃত্যু, গর্ভবতী জননীর মৃত্যু, মৃতশিশু প্রসবের ঘটনাও ব্যাপকভাবে প্রকট। অনেক দেশে গরিব জনসাধারণের আয়ুষ্কাল খুব কম, তিরিশ বছরেরও নীচে।

সামান্য কিছু প্রাসঙ্গিকতথ্য দেওয়া যাক। মুম্বাইয়ের সেন্ট্রাল লেবার ইন্সটিটিউট-এর অফিসার ডঃ আর আর নায়ার-এর হিসাবে, আমাদের দেশে প্রতি বছর কারখানা দুর্ঘটনায় গড়ে মোট ৭০০০ মৃত্যু ঘটে, যা ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানায় ১৯৮৪ সালের ভূপাল গণমৃত্যুর সংখ্যার চাইতেও অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, ভারতে প্রতি হাজার শ্রমিকে কারখানা দুর্ঘটনায় মজুর মৃত্যুর হার ০.১৪, যা জাপান (০.০২), ইংল্যান্ড (০.০৩), বা আমেরিকার (০.০৩), পাঁচ থেকে সাত গুণ। [Soni 1986]

আরও কিছু তথ্য দেখে নিই চলুন। আমেরিকায় স্থিত প্রোজেক্ট ফেমিন নামক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে, পৃথিবীতে প্রত্যেক মিনিটে ২৪ জন ব্যক্তি অনাহারে অপুষ্টিতে মারা যায়। শুধু ১৯৮৪ সালের দুর্ভিক্ষেই আফ্রিকায় এক বছরে ৫৯ লক্ষ শিশু উহলোকে চলে যেতে বাধ্য হয়। [Rai 1986]

এই সব দেশে কন্যা সন্তানদের প্রতি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে (এমনকি বাড়ির বয়স্ক মহিলা সদস্যদের মধ্যেও) সচরাচর এক ধরনের একটু অবহেলার মনোভাব থেকে তাদের শিক্ষা স্বাস্থ্য পুষ্টি ইত্যাদির দিকে নজর কম দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও নবজাতক কন্যাশিশুকে মেরে ফেলাও হয়। এর দরুন জনসংখ্যায় স্বাভাবিক লিঙ্গভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে নারীঃপুরুষ অনুপাত এক দিকে কাত (skewed) হয়ে যেতে থাকে, অর্থাৎ, কমে যেতে থাকে। তাতেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

ভারতের কথাই ধরা যাক। এখানে ব্রিটিশ আমল থেকে কন্যাশিশু হত্যা নিষিদ্ধ হয়ে গেলেও গোপনে সেই কুকর্মটি চলতেই থাকে। এখন আবার আধুনিক প্রযুক্তির অবদানকে কাজে লাগিয়ে এই কাজে আরও সূক্ষ্মতা এসেছে। যার নাম ভ্রূণ-পরীক্ষা উত্তর কন্যাভ্রূণহত্যা (post-amniocentesis female-foeticide)। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি পরীক্ষা পদ্ধতির সাহায্যে মানব শরীরের ভেতরে কোথাও কিছু গোলমাল হয়ে থাকলে চিকিৎসার স্বার্থে তাকে চিহ্নিত করা যায়। বিশেষ গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন কোনো সমস্যা আছে কিনা তা জানতে এই প্রযুক্তি খুবই কার্যকর। যেহেতু এই প্রযুক্তিতে গর্ভস্থ ভ্রূণের লিঙ্গও নির্ধারণ করা যায়, আমাদের দেশে এর একটি অন্যতম ব্যবহার হচ্ছে কন্যাভ্রূণ দেখলে গর্ভপাত করিয়ে বাচ্চা নষ্ট করে ফেলা। আইনত দণ্ডনীয় হলেও এই ব্যবসা বেশ ভালো মতোই সক্রিয়। ১৯৭২-৭৮ সালেই এরকম ৭৮০০০ ঘটনার কথা জানা গিয়েছিল। এই সমস্ত প্রক্রিয়ায় ভারতের নারীঃপুরুষ অনুপাত, যা বিংশ শতাব্দের শুরুতে ছিল ৯৭:১০০, ১৯৮১ সালে ৯৩:১০০-তে নেমে আসে। [The Times of India, 29 September 1986]  আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই সব কারবার বেশি চলছে দেশের সচ্ছলতর পরিবারগুলির মধ্যে। যত ধনী পরিবার তত কন্যাভ্রূণ নষ্ট করার প্রবণতা। রাষ্ট্রসংঘের সেন্সাস ও জন তহবিলের রেজিস্ট্রার জেনারেল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানা যায়, ভারতের রাজধানী শহর দিল্লিতে উপরোক্ত অনুপাত এসে দাঁড়িয়েছে ৯০:১০০-তে এবং আরও উচ্চবিত্তদের বসবাসের স্থান দক্ষিণ দিল্লিতে এটা এখন ৮৪.৫:১০০। [Gupta, 2003]

অন্যান্য উন্নতিশীল দেশগুলির অবস্থা যে বিশেষ একটা আলাদা নয়, বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই সব ঘটনাবলির জন্যই ম্যালথুসের সময় থেকে বিশ শতক পর্যন্ত জনসংখ্যা বিস্ফোরণ নিয়ে অনেকের অনেক রকম ভবিষ্যত হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও পশ্চাদপদ দেশগুলিতেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার অভিমুখে।

 

পাশাপাশি, উন্নত দেশগুলিতে শিক্ষিত ও সচেতন পরিবার সমূহে অসুখবিসুখ ও মৃত্যুহার কমে যাওয়ার ফলে শিশুর জন্মহারও অনেকটাই কমে গেছে। এর জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে স্মরণে রাখা দরকার:

১। প্রথমত উপযুক্ত শিক্ষা পেলে তা সন্তান ধারণের ব্যাপারে সামন্তী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে চলে আসা কুসংস্কার দূর করে, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে, অধিক সন্তানের মা হওয়ার মিথ্যা গর্বকে মন থেকে তাড়িয়ে দেয়। ধর্ম বিশ্বাস বা সাম্প্রদায়িক কারণে বেশি বেশি করে বাচ্চার মা হওয়ার আগ্রহ ও গরিমাকে মুছে দেয়।

২। দ্বিতীয়ত, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রকৃত আয় যত বাড়তে থাকে, জীবন ধারণের মানও যত উন্নত হয়, ততই স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে শিশু মৃত্যুর হার কমতে শুরু করে, জীবিত শিশুর গড় আয়ু বৃদ্ধি পায় এবং পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য অতিরিক্ত হাতের আয়োজন করে রাখার দরকার মিটে যেতে থাকে।

৩। খেলাধূলা, নাটক, সিনেমা, গানের জলসা, টিভি ও অন্যান্য বিনোদন তথা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মানসিক খাদ্য সংগ্রহের বিভিন্ন উপায়ের সংখ্যা যত বাড়তে থাকে, সেই অনুপাতে জীবনের শুষ্ক একঘেয়েমি কাটাতে কেবলমাত্র যৌনসঙ্গমের আশ্রয় নেবার আগ্রহ ও প্রয়োজন হ্রাস পায়।

৪। আবার, চতুর্থত, শিশু পালনের ক্ষেত্রে উদ্বেগ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা সচ্ছল পরিবারে বেশি সন্তানের আগমনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সন্তানের লালন পালন, শিক্ষা, চিকিৎসা, ভ্রমণ, ইত্যাদ্দি বাবদ অতিরিক্ত ব্যয়ও জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে কাজ করে।

৫। নারী যত ঘরের বাইরে বেরিয়ে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরিবাকরিতে সামাজিক কাজেকর্মে যোগ দেয়, ততই তাদের পৌনঃপুনিক গর্ভধারণ বাস্তবত অসম্ভব অসুবিধাজনক ও অনাবশ্যক হয়ে পড়ে।

এই সব নানা কারণে পশ্চিমের দেশগুলিতে অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে অনেক দম্পতিই আজকাল সন্তান নিতে চায় না, তার পরিবর্তে তৃতীয় বিশ্ব থেকে সন্তান দত্তক নিতে পছন্দ করে। ফলে এরকম অনেক দেশেই জনসংখ্যা তার উচ্চ অসীমান্তিকের কাছে পৌঁছে গেছে এবং শূন্য-বৃদ্ধির স্তরে আছে।

অন্য দিকে, বিশ্ব জুড়ে জনসংখ্যার “বিস্ফোরণ” হওয়া সত্ত্বেও সেই তুলনায় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ ও হার ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার ম্যালথুসীয় ভীতি অমূলক বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। বস্তুত, “ম্যালথুসের সেই প্রবন্ধ প্রথম বেরনোর পর”, যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বিষয়ক সংসদের সভাপতি ফ্রাঙ্ক নোটস্টাইন (1902-83) ১৯৫৮ সালে লিখেছিলেন, “ব্রিটিশ ও আমেরিকার জনসংখ্যা যথাক্রমে পাঁচ গুণ এবং পয়ত্রিশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং তাদের সাধারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি এমন এক স্তরে পৌঁছেছে, যা ম্যালথুস এই ‘লীলাময় পৃথিবীতে’ সম্ভব বলে স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না।” পক্ষান্তরে, “the population of technologically underdeveloped nations, which comprises more than half the world's present total . . . have grown rather slowly since the beginning of the nineteenth century, and often presents a picture of disease, illiteracy and poverty for the masses with which Malthus was wholly familiar.” [Notestein 1958]

“জনগণের দারিদ্র্য ও দুর্দশা সামাজিক অবিচার থেকে নয়, প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ীই ঘটে”, এবং “দুঃখকষ্ট এবং তারই ব্যাপক সম্ভাবনাই পারে তাদের মধ্যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে” ম্যালথুসের এই বক্তব্যকে নস্যাৎ করে নোটস্টাইন আরও বলেছিলেন: “Yet there is now clear evidence that abysmal poverty induces more of the same, and not prudence. . . . Not poverty and disease, but improved living conditions and rising ambitions motivated the trend towards birth regulation.” [ঐ]

আর একটা ব্যাপারের দিকেও নজর দিতে হবে।

পশ্চাদপদ দেশগুলির জনঘনত্ব সমস্যা নিয়ে আলোচনার সময় বিদ্বান ব্যক্তিরা প্রায়শই একটা বিষয় অগ্রাহ্য করে থাকেন, যে উন্নত দেশগুলির বিপুল সমৃদ্ধির অনেকটাই অনুন্নত দেশ সমূহের চূড়ান্ত দারিদ্র্যের বিনিময়ে তৈরি কেন না তাঁরা এও ভুলে যান যে পশ্চিম ইউরোপের জনসংখ্যা আজকে যে অনেকই কম তার কারণ হল, এই সব দেশ থেকে এক বিরাট সংখ্যক জনসমষ্টিকে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, উত্তর দক্ষিণ আমেরিকায় চালান করে দেওয়া হয়েছেউপনিবেশ স্থাপন করে, দখল করে এবং বাণিজ্য ব্যবস্থা করে অর্থাৎ, সম্পদ চলে গেছে উপনিবেশ থেকে উত্তরে, আর জনসমষ্টি সরে গেছে সমৃদ্ধির কেন্দ্র থেকে দক্ষিণে পৃথিবীর এই দুই অংশের জনগোষ্ঠীর সংখ্যার লেখচিত্রে সেই জন্য দুবার কাতের ঘটনা দেখা যায়

 

ছয়

প্রশ্নটা আবারও মাথায় ঘুরঘুর করবে: এত সব ঘটনার পরেও লোকে ম্যালথুসের নাম ভুলে গেল না কেন? ইতিহাসে তাঁকে তাঁর উপযুক্ত জায়গাটা দেখিয়ে দিল না কেন?এখনও কেন প্রেসে, বৈদ্যায়তনিক অর্থশাস্ত্রের আলোচনায় কিংবা রাজনীতিবিদদের ভাষণে তাঁর নামই উঠে আসে?স্কুল কলেজের বইপত্রেও কেন তাঁর নাম আজও জ্বলজ্বল করে?এই সমস্ত লোকেরা কেউই কেন ফেরহালস্তের নাম মুখে আনেন না?

যদি সত্যিই বুঝতে চান, তবে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন (১৮৭০-১৯২৪) নামক একজন মহান সামাজিক-দার্শনিক-বিপ্লবীর একটা ছোট কথা আপাতত স্মরণ করতে হবে: “There is a well-known saying that if the geometrical axioms affected human interests, attempts would certainly be made to refute them.” [Lenin 1970, 34]স্বার্থের গন্ধ থাকলে লোকে জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধ নিয়েও তর্ক জুড়ে দেবে।

অর্থাৎ?

এর মধ্যে একটা সরল সত্য নিহিত: যে সত্যের মধ্যে শক্তিশালী মানুষের স্বার্থ রক্ষা বা আঘাতের প্রশ্ন রয়েছে, তা একদল দেখে না, আর একদল অস্বীকার করে। বিজ্ঞানের ইতিহাসেও এমন ঘটনা আকছার ঘটেছে। যারা অস্বীকার করে তাদের সচেতন উদ্দেশ্য থাকে—ব্যক্তিগত এবং/অথবা শ্রেণিগত। যারা দেখতে পায় না, তাদের হয়ত ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য কিছু নেই, কিন্তু তারা তাদের কথাবার্তায় দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজেদের অজান্তে এবং অনিচ্ছাতেই উপরোক্ত লোকদের স্বার্থ ও দর্শনের দ্বারা পরিচালিত (আসলে বিভ্রান্ত) হয়। সচেতন না থাকলে যে কোনো লোকই শাসক শ্রেণির প্রচারের ফাঁসে মাথা গলিয়ে দিতে পারে।

এক্ষেত্রেও ঠিক এটাই হয়েছে।

ঠিক ভাবে দেখতে পারলে, মানুষ এক বিরাট সৃষ্টিশীল কাজের শক্তি। সে প্রকৃতির রহস্য ভেদ করেছে। পৃথিবীর উপরিতলের চেহারা বদলে দিয়ে সে মানব সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। সে এখন হিম শীতল মহাকাশের গভীরে ডুব দিয়েছে আরও রহস্য উদ্ঘাটন করবে বলে। একজন দুজন নয়। শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে বা লক্ষে লক্ষেও নয়। অল্প দিনের জন্যও নয়। হাজার হাজার কোটি কোটি মানুষ কয়েক লক্ষ বছর ধরে সেই প্রাগৈতিহাসিক প্লাইস্টোসিন কাল থেকে এই কাজ করে যাচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্ববাসীর এক অতি ক্ষুদ্রাংশ কয়লা, তেল, ধাতু, জল, জঙ্গল, ইত্যাদি সমস্ত প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ একচেটিয়াভাবে ভোগ এবং লুট করছে। যুদ্ধবাজি, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, বিভিন্ন মাত্রায় যুদ্ধ আরও অপচয়ের কারণ। এই যাবতীয় অপচয় আটকাতে পারলে বিশ্ববাসীর আজ আর সুষ্ঠু জীবন ধারণের সামনে কোনো অভাব থাকত না। আর তখন তা জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিপক্ষেই কাজ করত।

মানুষ যদি বর্তমান সঙ্কট এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, তবে সে জীবন ধারণের উপযোগী মূল্যবান সম্পদের এই ভয়াবহ অপচয়কে রুখতে পারবে। সে তখন শুধু প্রকৃতির অন্ধ নিয়মের জেরে প্রজাতির সদস্য সংখ্যা সীমিত রাখার ডারউইনীয় সূত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। সে তখন তার ভবিষ্যত জীবনকে এক সামগ্রিক পরিকল্পনার আলোকে গড়ে তুলবে—শুধু খাদ্য উৎপাদনের কথাই সে ভাববে না, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার কথাও ভাববে। সেই অর্থে মানুষ এক মহান উৎপাদিকা শক্তি, মানব সামর্থ্য মানব সমাজেরও এক বড় সম্পদ। মানুষ তখন বুদ্ধি দিয়ে উৎপাদন এবং জনসংখ্যা দুইই নিয়ন্ত্রণ করবে।

কাদের চোখে এই সত্য ধরা পড়ছে না?

তাদেরই যারা মানুষকে এবং মানুষের সামর্থ্যকে ভয় পায়।

কারা ভয় পাচ্ছে …?

সেই সব মুষ্টিমেয় লোকেরা যারা অন্যদের শ্রম ও মেধার উপর পরজীবীর মতো বসে বসে খায়—পুঁজিপতি শ্রেণি, যারা সমস্ত উৎপাদন ক্ষেত্রের মালিক হয়ে বসেছে, নিজেরা কিছুই করে না, এমনকি মুনাফার দেখাশোনা বা হিসাবও করে না (তা করার জন্যও মাইনে করা চাকুরে পোষে), শুধু মুনাফা ভোগ করে। মুনাফা আসে শ্রমিককে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করার দ্বারা। তার ফলে, এক দিকে মুনাফার পাহাড় জমতে থাকে, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের আয় ও জীবন ধারণের মান নীচে নামতে থাকে। আয় কমল মানে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা অর্থাৎ বাজারের কার্যকরী চাহিদা কমে গেল। বাজার ছোট হয়ে গেলে উৎপাদনে ভাটা আসে, অর্থনীতি ধুঁকতে থাকে। পরিকল্পনার বদলে নৈরাজ্য ক্রিয়া করতে থাকে। জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে, মুদ্রাস্ফীতি জনসাধারণের জীবন নিয়ে খোলাখুলি কুস্তি শুরু করে। সরকারি ভাষ্যে যখন “উৎপাদন বাড়াও” শ্লোগান চলছে, তাকে ব্যঙ্গ করেই যেন উৎপাদন হ্রাস, তালাবন্দি, লে-অফ, ক্লোজার, ছাঁটাই, রুগ্ন শিল্প, ইত্যাদির আওয়াজ শোনা যায়। মুমূর্ষু অর্থনীতির অন্যতম বড় লক্ষণই হল বেকার সমস্যা। বণিক মহল এখন কেবল কারখানা বন্ধ, স্বেচ্ছাবসর প্রকল্প, কর্মী সঙ্কোচন, ইত্যাদি চাই বলে কান্না জুড়েছে; আর সরকারও সেই সব বায়না মেটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।  

এরকম সমাজেই মানুষ হচ্ছে সমস্যা, অনেক মানুষ মানে বিপদ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কথা ছেড়ে দিন, যে কোনো সংখ্যাই ওদের কাছে ঝামেলার বস্তু, ভেতরে ভেতরে তীব্র আশঙ্কা, আর বাইরে স্থিতাবস্থার পক্ষে ঘনায়মান বিপদ। তাই দেখুন, যারা এই সমাজ কাঠামো থেকে লাভবান হয়, যাদের কাছে এই সমাজব্যবস্থা টিকে থাকলেই স্বার্থ সিদ্ধি হবে, তারাই মানুষ এবং মানুষের ক্ষমতাকে ভয় পায়।

শুধু কি তাই?

তাদেরই সমস্ত দুষ্কর্ম আর নস্টামির জন্য তারা অধিক জন্ম হার এবং জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধিকে একমাত্র দায়ী করে থাকে। ফলত, জনসংখ্যার সমস্যাকে একটা সামাজিক সমস্যা হিসাবে দেখার বদলে তারা জনগণের ঘাড়ে সমস্ত দায় চাপিয়ে দেয় এবং একেই তাদের জীবনের যাবতীয় দুঃখদুর্দশার জন্য আসামী সাব্যস্ত করে।

আমাদের দেশেও এখন “ছোট পরিবার” নিয়ে শাসক ও প্রশাসকদের গলায় প্রচুর হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। এটা নিয়ে গত কয়েক দশক ধরে কেন্দ্রীয় সরকার এতই মগ্ন যে তাদের ১৯৮৬ সালে গৃহীত নতুন শিক্ষানীতিতে ছোট পরিবার নিয়ে চলাকে একটা বাঞ্ছনীয় “নৈতিক বিধি” হিসাবে তুলে ধরেছে। আর ওদিকে ন্যাশন্যাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (NCERT) স্কুলে বাধ্যতামূলক ভাবে পড়ানোর জন্য ম্যালথুসীয় জনসংখ্যা নীতির উপরে একটি পাঠক্রম তৈরি করেছে। এইভাবে পরিবার পরিকল্পনার নামে মিথ্যা প্রচারে কোটি কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে জলের মতো অপব্যয় করা হচ্ছে। অথচ সরকারি হাসপাতালে যেখানে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য, তাদের পরিবারের জন্য যথার্থই পরিষেবা পাওয়ার কথা, তারা তা পাচ্ছে না—চাকরি, শিক্ষা, পানীয় জল, ইত্যাদির কথা আর নাই বা তুললাম।

বামপন্থীরাও এই প্রচার থেকে একেবারে পিছিয়ে নেই। এই সেদিন দেখলাম, সিপিআই(এম)দলের মুখপত্র গণশক্তিতে এক পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে অতি-জনসংখ্যাকেই সমস্ত সামাজিক অর্থনৈতিক সমস্যার কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। [Ganashakti 1987]হয়ত আর্থিক প্রয়োজনেই দলের মুখপত্রে বিজ্ঞাপনটা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতাও যে বামফ্রন্ট সরকার! উদাহরণ হিসাবে এটা আদৌ প্রশংসনীয় নয়।

জনসংখ্যা বিস্ফোরণকেই যারা জনগণের সমস্ত দুঃখদুর্দশার জন্য দায়ী করছে, তাদের তো নীচের কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে:

 

১। বিদ্যমান কলকারখানাগুলি একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কেন?জনসংখ্যা এর জন্য দায়ী?যদি না হয়, দায়ী কে?

২। বস্ত্রশিল্পেও শুনি যে অতি-উৎপাদনের সমস্যা দেখা দিয়েছে, উৎপন্ন মাল বিক্রি হচ্ছে না। ওদিকে দেশের অর্ধেকের বেশি সংখ্যক লোক গায়ে জামাকাপড় পরতে পায় না, বা ছেঁড়া শাড়ি জামা পরে বসে আছে। এরই বা ব্যাখ্যা কী?

৩। ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, ইত্যাদি যে দেশগুলোর জনসংখ্যা প্রায় স্থিতিশীল আকার প্রাপ্ত হয়েছে (অভিবাসন জনিত বৃদ্ধির কথা বাদ দিলে), সেখানেও কেন বেকারি, ছাঁটাই, মন্দার কালো মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে?  

৪। একটা সময় পর্যন্ত—অন্তত কমরেড মাও সে-তুং (১৮৯৩-১৯৭৬)-এর জীবদ্দশায়—চিন পৃথিবীর সর্বাধিক জনসংখ্যা নিয়েও এই সব সমস্যা থেকে কীভাবে মুক্ত ছিল?

৫। বর্তমানে আমাদের দেশের মতো রাষ্ট্রগুলি কি তাদের নির্দেশিত জনসংখ্যার দায়িত্বও ভালোভাবে নিতে পারছে?

 

এই প্রশ্নগুলির সঠিক উত্তর খুঁজলেই বোঝা যাবে যে পুঁজিপতি শ্রেণির সংকীর্ণ স্বার্থ রক্ষার্থে অতিরিক্ত জনসংখ্যার দোহাই দিতেই হবে। ম্যালথুসের জনসংখ্যা তত্ত্ব ভ্রান্ত প্রমাণিত হলেও সেদিক থেকে এক আদর্শ অজুহস্ত। তাই ম্যালথুসকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তাঁর ছবিতে মাঝে মাঝেই ধুপ ধুনো মালা দিতে হবে। খামোখা ফেরহালস্তের উল্লেখ করলে ম্যালথুসের ইজ্জত কমে যাবে শুধু নয়, সাধারণ মানুষের নজরটা এক সুবিধাজনক ভুল তত্ত্ব থেকে অসুবিধাজনক সঠিক তত্ত্বের দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা। কটা লোক আর ফেরহালস্তের নাম জানে?

অত সততার দরকার কী?

তবে বুদ্ধিজীবীদের সকলেই পুঁজিপতিও নন, তাদের দালালও নন। কিন্তু তাঁরা বেশিরভাগই পুঁজিবাদের পরে বা তার থেকে উচ্চতর কোনো সমাজব্যবস্থার কথা ভাবতেই পারেন না। তাঁদের এই শ্রেণিগত চিন্তাপদ্ধতির সীমাবদ্ধতার ফলে তাঁরাও—“সমাজতন্ত্রেই বা আপনারা এত বাড়তি লোককে বসিয়ে খাওয়াবেন কী করে” ইত্যাদি—বলতে বলতে কিছু “কিন্তু” “তথাপি” ইত্যাদি সংশয় বাচক অব্যয় ব্যবহারের সাহায্যে ম্যালথুসের তত্ত্বের পক্ষে ওকালতি এবং ভাষণবাজি চালিয়ে যেতে থাকেন।

দুঃখের বিষয়, সত্যটা না জেনেই।

সাত

শেষ করার আগে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে একটা কথা পরিষ্কার করে দিতে চাই। এই প্রবন্ধে আমি কিন্তু জন্ম নিয়ন্ত্রণ বা ছোট পরিবারের ধারণাকে আদৌ বিরোধিতা করতে চাইছি না। আমি মনে করি, মানুষ যথোপযুক্তভাবে শিক্ষিত ও সচেতন হলে তারা নিজে থেকেই শিশু জন্ম হার কমিয়ে আনতে সচেষ্ট হবে—তিনটি উদ্দেশ্যে: পরিবারভুক্ত নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যরক্ষা সুনিশ্চিত করা; নারীর স্বাধীন জীবন যাপন ও সর্বাঙ্গীন বিকাশ ঘটানো; এবং, মানব জাতির সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও মননের উন্নতি সাধন। যতই মানুষের অবস্থার উন্নতি হবে, তারা শিক্ষিত ও সচেতন হবে এবং কুসংস্কারমুক্ত পরিবেশ পেয়ে যাবে, ততই তারা নিজে থেকেই এই কাজে এগিয়ে আসবে।

চিত্র : ডঃ সৌমিত্র ব্যানার্জীর আঁকা নকশা (Breakthrough-তে প্রকাশিত; এখানে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সংযোজিত ও ঈষৎ পরিবর্তিত)

আমি যেটার বিরোধিতা করছি সেটা হল এই ম্যালথুসীয় দাবি যে উচ্চ জন্ম হারের কারণেই গণ মানুষের দারিদ্র্য। উপরে বোধ হয় এটা দেখানো গেছে যে এই প্রশ্নে ম্যালথুস কারণ ও কার্যকে উলটো করে বসিয়েছিলেন। দারিদ্র্য উচ্চ জন্ম হারের পরিণাম নয়, কারণ; ফলে অতি-জনসংখ্যা হ্রাস করতে হলে দারিদ্র্য দূর করাই প্রধান কাজ, এবং সে ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের পেছনে যে সামাজিক কারণ, অর্থাৎ, পুঁজিবাদ—তাকে নির্মূল করতে হবে। সেই পুঁজিবাদকে ম্যালথুসীয় মতবাদ হয় আড়াল করে রাখে নয়ত রক্ষা করতে চায়।

আট

সেই সময় একদিন অচিরেই আসবে যেদিন ম্যালথুস এবং তাঁর তত্ত্বের বস্তার কথা মানুষ ভুলে যাবে এবং ফেরহালস্তইতিহাসের পৃষ্ঠায় তাঁর প্রাপ্য সম্মান ফেরত পাবেন। কিন্তু ম্যালথুস ও তাঁর মতবাদ নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রবল উন্মাদনা এবং বিদ্বান ব্যক্তিদের এক বৃহত্তর অংশের স্বেচ্ছাবৃত মূর্খতাকে কখনও ভুলে যাওয়া যাবে না, ক্ষমাও করা যাবে না।

সূত্রোল্লেখ

 

Eugene Burret (1840). On the Poverty of the Labour in England and France (in French), vol.I; Paris.

Ganashakti(1987).(A Bengali Daily published by the WB State Committee of the CPI(M), 16 January 1987.

Monobina Gupta (2003).“Girl-child graveyard in capital's cradle of rich”; The Telegraph, 21 October 2003. [২০০৩ সালে পুনর্মুদ্রণের সময় সংযোজিত]

V. I. Lenin (1970). “Marxism and Revisionism” in Lenin.Against Revisionism, In defence of Marxism (a collection of essays); Progress Publishers, Moscow.

Thomas Robert Malthus (1803). An Essay on the Principle of Population; or, a View of its Past and Present Effects on Human Happiness; with an enquiry into our Prospects respecting the Future Removal or Mitigation of the Evils which it occasions; 2nd Edition, London.

Karl Marx (1978). Theories of Surplus-Value, Part II; Progress Publishers, Moscow.

Frank W. Notestein (1958). “Introduction” to the anthology On Population containing three essays by T. Malthus, J. Huxley and F. Osborn; New American Library, New York.

Raymond Pearl and Lowell J. Reed (1920). “On the Rate of Growth of the Population of the United States since 1790 and its Mathematical Representation”; Proceedings of the National Academy of Science 6(6); 15 June 1920.

Raymond Pearl (1976). The Biology of Population Growth; Arno Press, New York.

Amar Nath Rai (1986). “The World Languishing in Hunger and Undernutrition” (in Hindi); Hindustan (Hindi), 16 December 1986.

Subhash C. Soni (1986), “Workers' Safety Still a Day Dream”; Hindustan Times, 16 October 1986.

The Times of India, 29 September: 1986A National Awareness Advertising Supplement.

Pierre-François Verhulst (1838). "Notice sur la loi que la population poursuit dans son accroissement". Correspondance mathématique et physique10.

0 Comments
Leave a reply